মৌটুসী পর্ব ৩৩
ঋতস্বিনী মাহবিশ
প্রশস্ত কোনো নদী নয়; পদ্মারই একটি ছোট শাখা এটি। বসন্তের শেষে পানি অনেকটাই নেমে গেছে। নদীর বুক আগের মতো ভরা নেই। মাঝখানে সরু একধারা স্বচ্ছ পানি ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। আকাশের প্রতিবিম্বে রংহীন পানিগুলোও গাঢ় নীল দেখা যাচ্ছে। দুই তীরে বিস্তীর্ণ বালুচর জেগে উঠেছে। সূর্যের আলো পড়ে পানির তলায় ছোট ছোট বালুকণাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির কিনারায় কচি ঘাস মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝে ফুটে আছে নীল, সাদা, হলুদ নানান রঙের ছোট ছোট ঘাস ফুল।
বোরাক আর মৌটুসী ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলো। পায়ের নিচে নরম বালু।
মৌটুসী চারদিকে তাকাল, এমন দৃশ্য সে আগেও দেখেছে। কোথায়? ছবিতে। হ্যাঁ, ছোটবেলায় স্কুলে প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকাতে দিলে সে এভাবেই এঁকে তাতে রং করত। আজ তার কল্পিত কাগজের সেই দৃশ্য বাস্তব অস্তিত্বে ধরা দিয়েছে। মৌ আর নিজেকে সামলাাতে পারল না। মুহূর্তেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল তার চোখেমুখে।
”অহ মি. বোরাক! আপনি আমাকে এটা কোথায় নিয়ে এলেন? আমি পাগল হয়ে যাব আজকে। আপনি থামাতে পারবেন না।”
বলেই জুতো দুটো খুলে এক দিকে ছুড়ে দিল রমনী। খালি পায়ে উষ্ণ নরম বালুর ওপর উদ্দেশ্যহীন দৌড়াতে শুরু করল। কয়েক কদম এগিয়েই দু’হাত বাড়িয়ে বাতাসটাকে বুকে ভরে নিল। তারপর ছোট্ট মেয়েটির মতোই এক দৌড়ে চলে গেল পানির ধারে। পায়ের আঙুল ডুবিয়ে আনমনেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
মুহূর্ত পর ধপ করে বসে পড়ল ভেজা বালুর ওপর। দু’হাতের তালু পেছনে ভর দিয়ে শরীরটা সামান্য হেলিয়ে দিল। পা দুটো ডুবিয়ে রাখল হালকা স্রোতে।
মুক্ত পাখি মৌটুসী মনের সুখে পা দিয়ে পানি ছিটিয়ে ও ছোট ছোট ঢেউ তুলে জলকেলি খেলতে ব্যস্ত। এদিকে পরনের স্কার্টের নিচের অংশ ততক্ষণে ভেজা বালুতে মাখামাখি হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। এই মুহূর্তে সে দিনদুনিয়ার ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন এক বাঁধনহারা প্রাণী।
হঠাৎ সে মুখ তুলে তাকাল বিশাল নীল আকাশের দিকে। তারপর কোনো রকম দ্বিধা ও সংকোচ ছাড়াই গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল—
-এমন যদি হতো আমি পাখির মতো,
-উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ,
-পালাই বহুদূরে ক্লান্ত ভাবঘুরে,
-ফিরব ঘুরে কোথায় এমন ঘর…
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বোরাক নীরবে রমনীকে দেখে চলেছে। সকল দ্বিধা কাটিয়ে সে আজ নিশ্চিত, মেয়েটা অসম্ভব প্রাণখোলা, মুক্তমনা, চঞ্চলা। যার মাঝে এক ফোঁটাও কৃত্রিমতা নেই। যেটুকু কৃত্রিমতা দেখা যায়, তা আসলে সংযম নামের শক্ত খোলশ। জীবন ও বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে যার মাঝে সে নিজের উচ্ছল-কোমল শিশুসত্তাকে আবৃত করে রেখেছে। আর আজ একটু সুযোগ ও আস্কারা পেতেই সেই খোলস ভেঙে আসল পাখিটা ডানা ঝাপটে বেরিয়ে এসেছে।
মৌটুসীর মতো বোরাকেরও মুগ্ধতা আকাশ ছুঁল। তবে দুজনের ক্ষেত্র ভিন্ন। রমনী আজ প্রকৃতির ওপর বিমোহিত। আর যুবক প্রকৃতির কন্যার ওপর। এতদিন শুধু প্রকৃতিকেই দেখেছে, আজ দেখছে প্রকৃতির উত্তরসূরিকে। এই বসন্ত বিকেল, সবুজ, বাতাস, নদী, বালি আর তার প্রাণখোলা চাঞ্চল্য— সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
মৌয়ের গান থামতেই বোরাক কয়েক কদম হেঁটে এগিয়ে এল। তার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কখনো পাহাড় কিংবা সমুদ্রে যাওনি, তাই না?”
মৌটুসী মাথা তুলে পিটপিট চোখে তাকাল বোরাকের দিকে। চোখেমুখে উল্লাস বজায় রেখেই বলল,
— “না… যাইনি। তবে খুব যেতে চাই। মৃত্যুর আগে একবার হলেও আমি পাহাড় আর সমুদ্র দেখতে চাই। শুধু দূর থেকে না… ওদের মাঝে হারিয়ে যেতে চাই।”
বোরাক আর কিছু বলল না। শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনের গভীরে নীরবে একটা প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল তার—
যদি ভাগ্য কোনোদিন অনুমতি দেয়, তবে এই মেয়েকে নিয়ে শুধু দেশ নয়, পৃথিবী ঘুরবে সে। প্রকৃতির কন্যাকে প্রকৃতির কাছেই সঁপে দেবে।
মৌটুসী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— “চলুন, ওদিকটাতে যাই।”
— “হুম, চলো।”
দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
হাঁটতে হাঁটতে মৌয়ের চোখ গেল বালুর বিশাল বিস্তারের মাঝখানে কয়েক হাত জায়গা জুড়ে জন্মানো সবুজ ঘাসের ওপর। বিস্ময়ে সে জিজ্ঞেস করল,
— “আচ্ছা, বালুর মধ্যেও এত সুন্দর ঘাস জন্মায় কী করে?”
বোরাকও হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
“বর্ষার সময় এই জায়গাটা পানির নিচে ডুবে থাকে। আর পানি নেমে যাওয়ার পর পলিমাটি জমে যায়। সেই পলিতে আর্দ্রতা অনেক দিন ধরে থাকে। তাই পানি নেমে যাওয়ার পর এই সময়টাতে কিছু কিছু জায়গায় এমন ঘাস গজায়।”
কথা বলতে বলতে সেই জায়গায় চলে এল তারা। মৌটুসী ঘাসের ওপর হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ইস, কী নরম আর ঠান্ডা ঘাস! আমার তো পা দিতেও মায়া লাগছে। আচ্ছা, আপনি এত সুন্দর একটা জায়গার খোঁজ পেলেন কীভাবে?”
বোরাক মৃদু হেসে বলল,
“প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এসব সন্ধান বাতাসেই চলে আসে, বুঝেছ?”
মৌটুসী এবার পা ফেলে বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
“হুম। কেবল আমিই পাই না। জন্মের পর থেকেই ওই এক শহর দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত, বিরক্ত।”
বোরাকও একটু দূরত্ব রেখে পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, “কেন, গ্রামের দিকে তোমাদের কোনো আত্মীয় নেই?”
”না, আর থাকলেও আমার জানা নেই। কাছের আত্মীয়রা সবাই রাজশাহীর আশেপাশেই থাকে। তাই বেড়াতে যেতেও মন চায় না।”
বোরাকের হাতের নাগালে ঘন সবুজ ঘাসের ফাঁকে একটা ছোট্ট হলুদ ফুল বাতাসে দোল খাচ্ছে। নামটা বোরাকের অজানা নয়, সিঙ্গাপুর ডেইজি ফুল বলে একে। যুবকের খুব করে ইচ্ছে করল, ফুলটা ছিড়ে তার সামনে বসা ডানাহীন পাখিটার কানে গুঁজে দিতে।
কিন্তু তা আর আপন উদ্যোগে বাস্তবায়ন হওয়ার অবকাশ রইল না। তার ভাবনার মাঝেই একটা কোমল, নমনীয় হাত এগিয়ে গেল সেদিকে। সরু আঙুলে খুব আলতো করে ঘাসের ডগা থেকে ফুলটিকে বিচ্ছিন্ন করল মৌটুসী। তারপর তা নিরদ্বিধায় নিজের কানের পাশে গুঁজে নিল। সাথে সাথে রমনীর গোলাপ পাপড়ির ন্যায় গোটানো ঠোঁট দুটোর সাথে টুকটুকে সুন্দর চেহারাটাও ঝলমলিয়ে হেসে উঠল।
নীরবতায় কেটে গেল কিছু সময়। তার রেশ কাটিয়ে বোরাক হঠাৎ বলে উঠল,
— “এই মৌটুসী পাখি, এক কাজ করো; ঘাসের ওপর দু’হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়ো তুমি।”
মৌটুসী একটু অবাক চোখে তাকাল তার দিকে।
বোরাক মুচকি হেসে বলল,
— “চিন্তা কোরো না, আমি অন্য পাশ ফিরে বসছি, তাকাব না তোমার দিকে। আর আশেপাশে দেখো, কেউও নেই। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর করে নিঃশ্বাস নেবে। দেখবে, পৃথিবীর সব শব্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, শুধু প্রকৃতির ভাষা শুনবে। একটা অন্যরকম অনুভূতি, মিস কোরো না।”
কথাটা বলেই বোরাক নিঃশব্দে উঠে কয়েক কদম দূরে গিয়ে অন্যপাশ ফিরে বসল।
মৌটুসী একবার সেদিকে তাকিয়ে কোনো রূপ সংকোচ ছাড়াই ধীরে ধীরে ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিল। নরম, শীতল ঘাসগুলো পিঠ ছুঁয়ে রইল তার। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল বিছানাটাতেই যেন এই মুহূর্তে শুয়ে আছে সে। চোখের সামনে বিশাল এক আকাশ।
অসীম নীলের বুকে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। হঠাৎই একঝাঁক কালো বক ডানা মেলে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে গেল। মৌটুসী তাদের চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ দুটোও বন্ধ করে নিল।বোরাকের কথা মতোই মুহূর্তেই যেন গোটা পৃথিবীটাই বদলে গেল। কোনো মানুষের কোলাহল নেই। কোনো গাড়ির হর্ন নেই। কোনো ব্যস্ততার শব্দ নেই। শুধু আছে প্রকৃতির নিজস্ব সুর।
দূরে কোথাও নাম-না-জানা একটা পাখি একটানা ডেকে চলেছে। নদীর স্বচ্ছ পানি হালকা স্রোতে বয়ে গিয়ে মৃদু কলকল ধ্বনি তুলছে। দক্ষিণের বাতাস বয়ে গিয়ে ঘাসের ডগা আর গাছের পাতায় ফিসফিস শব্দ তুলছে। মাঝেমধ্যে সেই বাতাস আলতো করে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার কপাল, গাল আর তনু দেহ। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটা তার একান্ত অনুভব।
বিকেলের দিকে সাফওয়ান বীর আর চড়ুইকে নিয়ে পার্কে এসেছে। এখন দু’জন পার্কে আসা আরও অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে দৌড়ঝাপ করে খেলতে মত্ত। সাফওয়ান একটু দূরে একটা পাবলিক বেঞ্চে বসে ওদের দেখছিল। এক হাতে ফোন, অন্য হাতটা বেঞ্চের পেছনে রাখা। মাঝেমধ্যে ফোনের স্ক্রিনে চোখ যাচ্ছে, আবার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসছে বীর আর চড়ুইয়ের দিকে।
সাফওয়ানের চোখ তখন সামনের দোলনায় বসে থাকা বীর আর চড়ুইয়ের দিকে। আর তাদের দোল দিচ্ছে ছয়-সাত বছরের একটা নাদুসনুদুস ছেলেবাবু। ছেলেটার সাথে এসে পর্যন্ত ভালো ভাব জমে উঠেছে দুজনের। ছেলেটা ওদের থেকে একটু বড় হওয়ায় সিনিয়রের মতো ভালো গাইড করতে পারছে দু’জনকেই।
ঠিক তখনই তার সামনের সরু রাস্তাটা দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে পার হচ্ছিল। কাঁধে ছোট একটা ব্যাগ। পথের দিকে খুব একটা খেয়াল নেই তার।
এক পা… তারপরই মৃদু চিৎকার— আহ!
পথে পড়ে থাকা কলার খোসার ওপর পা পড়তেই মেয়েটার শরীর আচমকা ভারসাম্য হারাল। পেছনের দিকে পড়ে যাওয়ার আগেই পাশ থেকে বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল সাফওয়ান। এক হাত বাড়িয়ে দিল সেদিকে। আর সাথে সাথেই মেয়েটার রোগা পাতলা দেহটা তার হাতের ওপর আছড়ে পড়ল। তাল সামলাতে সাফওয়ানও কিছুটা ঝুঁকে গেল সামনের দিকে।
মুহূর্তটা যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
মেয়েটা ভয়ে চোখ বন্ধ করে শরীর শক্ত করে আছে। পেছনে কারও ঠাঁই অনুভব করে ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ান নামক অচেনা যুবকটির সঙ্গে চোখাচোখি হলো তার। ভারসাম্য ফিরে পেতেই লজ্জিত মুখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সাফওয়ানও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— “দেখে-শুনে হাঁটবেন না? এক্ষুণি পড়ে যাচ্ছিলেন।”
মেয়েটা কোনো উত্তরই দিল না।
একবার কাচুমাচু চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকাল। তারপর মাথায় পেঁচানো ওড়নাটা একটু ঠিক করে নিয়ে কোনো কথা না বলেই ঘুরে হাঁটা ধরল।
সাফওয়ান কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার পেছনের দিকে। এত বড় একটা বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে সাহায্য করল, অথচ বিনিময়ে একটা ‘থ্যাংক ইউ’ পর্যন্ত বলল না!
মনে মনে একটু বিরক্তই হলো সে।
— কী অহংকারী মেয়ে!
তবে পরক্ষণেই তার চোখ গেল মেয়েটার পায়ের দিকে। ডান পা টেনে, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে সে। একইভাবে হেঁটে মেয়েটা পাশের বেঞ্চটাতে বসে পড়ল। এরপর একটা পা তুলে নিয়ে পায়ের গোড়ালির কাছে হাত বুলাতে লাগল। মুখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু চুপচাপ বসে আছে।
এদিকে বীর আর চড়ুইকে দোল দিতে থাকা সেই ছেলেটা বিষয়টা খেয়াল করে তাদের কাছ থেকে ছুটে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল।
তার দেখাদেখি পেছন পেছন বীর ও চড়ুইও কৌতূহলী হয়ে ছুটল সেদিকে।
ছেলেটা মেয়েটার পায়ের কাছে গিয়ে বসে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “আপু, তোমার পায়ে কী হয়েছে?”
মেয়েটা এবারও কোনো কথা বলল না। শুধু মাথাটা দু’দিকে নেড়ে বোঝাতে চাইল, কিছু হয়নি।
সাফওয়ান নিজের জায়গা থেকেই দৃশ্যটা দেখল। তারপর কী যেন ভেবে ধীরে ধীরে সেদিকেই এগিয়ে গেল।
তাকে এগিয়ে আসতে দেখে চড়ুই সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে বলল,
— “সাফওয়ান চাচ্চু, দেখো! আপুটা ব্যথা পেয়েছে।”
সাফওয়ান মেয়েটার পায়ের দিকে তাকাল। বাইরে থেকে তেমন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো বেকায়দায় স্লিপ করার কারণে ভেতরের দিকে একটু মচকে গেছে। কিন্তু মেয়েটা তো কিছুই বলছে না!
সাফওয়ান একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
— “বেশি ব্যথা করছে?”
মেয়েটা এবারও চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই পাশে বসে থাকা ছেলেটা সরল স্বরে বলে উঠল,
— “আমার আপু কথা বলতে পারে না।”
কথাটা শুনে সাফওয়ান কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল যেন। তারপরই চট করে চোখ তুলে তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। হালকা গোলাপি ওড়নার আড়ালে সরল-মায়াবী ছোট্ট এক খানা মুখ। বয়স খুব একটা হবে না। কিশোরী না-কি তরুনী? এর মাঝামাঝি রেখারই হবে হয়তো! মাথাটা নিচু করে রেখে মাটির দিকে চেয়ে আছে সে। তবে চেহারায় ব্যথার ছাপ স্পষ্ট।
সাফওয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকল না। পার্কের একটা আইসক্রিমের দোকান থেকে একটা কাঠি আইসক্রিম কিনে এনে মেয়েটার হাতে দিল। এরপর ইশারায় ব্যথার জায়গায় ঘষতে বলল সেটাকে। মেয়েটা কথামতো তাই করতে লাগল।
চড়ুই সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, ” আপু, তোমার ব্যথা কমেছে?”
মেয়েটা মৃদু হেসে মাথা ওপর-নিচ দোলাল।
সাফওয়ানের বিশ্বাস হলো না তা। সে বলল, “বেশি ব্যথা করলে ডাক্তার দেখাতে হবে, বাসায়…”
বলতে বলতেই মনে হলো, মেয়েটা তো কথা বলতে পারে না, হয়তো শুনতেও পারে না।
ওকে থেমে যেতে দেখে মেয়েটা এই প্রথম মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। ব্যগ থেকে একটা খাতা কলম নিয়ে কিছু লিখে সাফওয়ানের সামনে ধরল। সাফওয়ান পড়ল লেখাটা, “আমাকে একটা রিকশা ডেকে দিতে পারবেন? বহুমুখী স্কুলের পেছনে যাব।”
সাফওয়ান মাথা নেড়ে উঠে গিয়ে একটা রিকশা ডেকে নিয়ে এল। মেয়েটা আবার খাতায় ছোট করে ‘ধন্যবাদ’ লিখে সাফওয়ানের সামনে ধরল। সাফওয়ান মৃদু হেঁসে মাথা নাড়ল।
মেয়েটা উঠে বসল রিকশায়, এরপর ছেলে বাবুটাও। রিকশায় বসে সে বীর আর চড়ুইকে হাসিমুখে টাটা দিল,
“বীর চড়ুই থাকো তোমরা। কালকে আবার এসো। তারপর আমরা আরো খেলব।”
চড়ুই আর বীরও হাত নেড়ে টাটা দিল ওকে।
সাফওয়ান জিজ্ঞেস করল,” বাবু তোমার নাম কি?”
বাচ্চাটা হাসিমুখে উত্তর করল,
“লাবিব। আর আমার আপুর নাম, কুমকুম।”
রিকশাটা চোখের আড়ালে চলে যেতেই চড়ুই সাফওয়ানকে বলল, “চাচ্চু আমার মাম্মাকে ফোন করো তো! একটু কথা বলব।”
“চড়ুই পাখি মাম্মার সাথে একটু কি কথা বলবে শুনি?” ফোনটা পকেট থেকে বের করতে করতে হাসিমুখে সাফওয়ান বলল।
“মাম্মার সাথে কথা বলে আইসক্রিম আনতে বলব, তাই।”
চড়ুইয়ের এইটুকু সরল কথা শুনতেই থমকে ওর দিকে তাকাল সাফওয়ান। চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“চড়ুই পাখি আইসক্রিম খেতে চায়, এজন্য মাম্মার সাথে কথা বলবে?”
“হুম।” উপর নিচ মাথা নাড়ল চড়ুই।
বীরও এবার বলল,”চাচ্চু বীলও আইসক্লিম খাবে!”
সাফওয়ান ফোনটা পুনরায় পকেটে ঢুকিয়ে দু’জনকে দুই হাতে কোলে তুলে নিয়ে আইসক্রিমের দোকানের দিকে হাঁটা দিল। যেতে যেতে বলল,
“বীর সোনা আর চড়ুই পাখির সাথে এখন সাফান চাচ্চুও মজা করে আইসক্রিম খাবে।”
নদীর পাড় থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে আসার উপক্রম হলো। পৃথিবীর বুকেই একটুকরো স্বর্গীয় সৌন্দর্য পেছনে ফেলে গাড়িতে এসে বসল দুজন। প্রায় ত্রিশ মিনিট ড্রাইভিং করে শহরের ভেতরে ঢুকতেই শহরের অস্বাভাবিক অবস্থা চোখে পড়ল। পুরো শহর থমথমে। রাস্তার পাশের একের পর এক দোকানের শাটার নামানো। যেখানে সন্ধ্যার এই সময়ে মানুষের ভিড় থাকার কথা, সেখানে অস্বাভাবিক নীরবতা। বড় বড় গাড়িগুলো— ট্রাক, প্রাইভেটকার রাস্তার ওপর থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে।
বোরাক গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ সামনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক পথচারীকে ডেকে জানতে চাইল,
— “ভাই, সামনে কী কিছু হয়েছে? সবকিছু এত থমথমে কেন?”
লোকটার জানালার কাছে এসে বললেন,
— “ভাই, ভালো চান তো পেছনে ব্যাক করে যান। সামনে যায়েন না। বিরাট গণ্ডগোল। বিকেলে কলেজ রাস্তার সামনে রাজনৈতিক সমাবেশে বিরোধী দলের লোকজন হামলা করছে, গোলাগুলি করে অবস্থা শেষ। রাস্তা আপাতত বন্ধ করে দিছে পুলিশ। এরপরেও যে আশেপাশে যাচ্ছে তাকেই গ্রেপ্তার করতেছে।”
”অহ! আচ্ছা। ”
কিছু একটা ভেবে বোরাক আবারও বলল,” আচ্ছা ভাই, এখান থেকে বের হওয়ার জন্য পেছনে একটা বাইপাস আছে না, ওটার কী অবস্থা কিছু জানেন?”
এবার পাশের একজন লোক কিছুটা বিরক্ত নিয়ে বললেন,
“ভাই, সব রাস্তা বন্ধ! আজকে রাতে কেউ শহর ছাড়তেও পারবে না, ঢুকতেও পারবে না। বুঝতেছেন না কেন, বড় ঝামেলা! এমপির গায়ে গুলি লাগছে।”
বোরাক মাথা নেড়ে বলল,
— “আচ্ছা, ধন্যবাদ ভাই, আমরা দেখি কী করা যায়।”
লোকদুটো চলে যেতেই মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে হেলান দিল।
— “আল্লাহ! এখন কী হবে? মি. বোরাক, কী করব আমরা?”
বোরাক নির্বিকার ভঙ্গিতে ফোন বের করে কললিস্ট ঘেটে দেখতে দেখতে বলল,
— “আমি দেখছি কী করা যায়।”
মৌটুসী বিরক্ত মুখে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— ” তখনই যদি আমরাও বাকিদের সঙ্গে চলে যেতাম, তাহলে এই ঝামেলায় পড়তে হতো না। সব দোষ আপনার।”
— “আরে, কে জানত হুট করে এমন একটা ঘটনা ঘটবে আর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে? আমি কি ভবিষ্যৎ বাণী জানি, বলো?”
মৌটুসী আর কিছু না বলে চিন্তিত ভঙ্গিতে মুখ কাচুমাচু করে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। বোরাক কাউকে একটা কল করে কথা বলল কিছুক্ষণ। এরপর কল কেটেই গাড়িটা পাশের এক সরু রাস্তায় ঢুকিয়ে দিল।
মৌটুসী সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ফিরে তাকাল। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
— “কী হলো? কাকে ফোন করেছিলেন, কী বললেন উনি?”
বোরাক ফাঁকা শ্বাস ফেলে বলল,
— “আজ আর ফেরা সম্ভব না। অবস্থা ভয়াবহ। এখান থেকে বের হওয়ার দুটো রাস্তা, দুটোতেই ব্যারিকেড বসিয়েছে পুলিশ। সকালের আগে খোলার সম্ভাবনা নেই।”
”মানে কী? আমরা সাধারণ মানুষ কী করেছি? আমাদের কেন এভাবে জিম্মি করে রাখা হবে? ইমার্জেন্সিও তো থাকতে পারে, তাই না?”
”হুম। কিন্তু এখন তো আর এই যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো যাবে না। এদেশে হুটহাট রাজনৈতিক হুড়োহুড়ি, অবরোধ— এসব যে কখন কোথা থেকে শুরু হয়, তার কোনো ঠিক নেই। আর শেষ পর্যন্ত এর ভোগান্তিটা পোহাতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে। এসব ভেবে নিজেদের আফসোস বাড়িয়ে লাভ নেই।”
মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “এখন তাহলে কী করব আমরা? সারা রাত কী এভাবে গাড়িতেই বসে থাকব?”
”গাড়িতে কেন বসে থাকব? হোটেলে উঠব!”
মৌটুসীর চোখ কপালে উঠে গেল।
— “মানে? এখন আপনার সঙ্গে হোটেলে উঠব আমি?”
— “আরে, এত নেগেটিভলি নিচ্ছ কেন তুমি? হোটেলে উঠলেই কি তুমি আমার সঙ্গে থাকছ? অবশ্যই সেপারেট রুমে উঠব আমরা।”
মৌটুসী কপাল চেপে হতাশ গলায় বলে উঠল,
“আল্লাহ এই বিপদে ফেললে কেন তুমি? আমার মেয়েটাকে রেখে এসেছি আমি…”
বোরাক ফোনে আবাসিক হোটেলের লোকেশন চেক করতে করতে বলল,
“চিন্তা করো না, আপাতত একটা হোটেলে উঠি, দেরি করলে রুম পাওয়া যাবে না। এরপরও রাতের মধ্যে রাস্তা খুললেই রওনা দেব আমরা।”
”আর যদি না খোলে?”
— “তাহলে কাল সকাল ছাড়া আর কোনো বুদ্ধি নেই।”
একটু থেমে বোরাক বলল,
— “আচ্ছা, চড়ুই সোনা কি একটা রাত তোমার মা মানে আন্টির কাছে থাকতে পারবে না?”
মৌ চিন্তায় মাথা নেড়ে বলল,
”জানি না। কখনো থাকেনি ও আমাকে ছাড়া।”
”আচ্ছা, নাহলে আমাদের বাড়িতেই সাফওয়ানের কাছে থাকবে। বীরের সাথে থাকলে অতটা খারাপ লাগবে না।”
”আর বীর? সেও আপনাকে ছাড়া থাকতে পারে না। সেদিন রাতে আমার কাছে থেকেও কীভাবে পাপা পাপা করছিল!”
”সাফওয়ান, রাবেয়া আপা— ওরা আছে। বীর সাফওয়ানের কাছে ভালো অভ্যস্ত। একটা রাত ওভাবেই ম্যানেজ হয়ে যাবে। সকালেই তো ফিরছিই!”
লোকেশন দেখে বোরাক আর মৌ পাশের একটা আবাসিক হোটেলে গেল। কিন্তু রুম পেল না। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত এক ঘণ্টায় সেখানকার সব রুম ইতিমধ্যেই বুক হয়ে গেছে। এবার তারা সেখান থেকে আরেকটি হোটেলের দিকে রওনা দিল।
দ্বিতীয় হোটেলটিতেও একই অবস্থা। সব হোটেলেই যাত্রীদের ভিড় জমেছে। রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে বোরাক বলল,
মৌটুসী পর্ব ৩২
— “এক্সকিউজ মি ভাই, দুইটা সিঙ্গেল রুম পাওয়া যাবে?”
রিসেপশনে বসা লোকটা কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে কয়েক মুহূর্ত খুঁজল। তারপর মাথা নাড়ল।
— “না ভাই, হবে না। এখন কেবল একটাই ডাবল রুম খালি আছে।”
মৌটুসী-বোরাক একে অপরের দিকে তাকাল। মৌয়ের চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। বোরাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এই পরিস্থিতিতে এখন দুটো আলাদা রুম পাওয়াটা প্রায় অনিশ্চিত।
