প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৬
সাদিয়া সাদু
সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছে ধরণীজুড়ে।
সূর্য তখন মধ্যগগনে স্থির হয়ে আগুনঝরা তেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। সকালের কোমল আলো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে তার জায়গা নিয়েছে প্রখর রৌদ্রের কঠিন দীপ্তি। রাস্তাঘাটে রোদের তীব্র ঝাঁঝ, বাতাসেও যেন উষ্ণতার ভার।
ধানমন্ডির ব্যস্ত সড়কগুলোয় যানবাহনের ভিড় থাকলেও দুপুরের রোদের তাপে চারপাশে এক ধরনের ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও রিকশার ঘণ্টা, কোথাও গাড়ির হর্ন—সবকিছুর মাঝেও দুপুরের একটা ভারী স্থবিরতা যেন চারদিকে জড়িয়ে আছে।এই তপ্ত দুপুরেই জারুল, সালমা আর দিয়াকে নিয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হলো দিগন্ত। দিগন্তে নানী বাড়ি কিশোরগঞ্জের দিকে এগোল তাড়া । গাড়ির ভেতরে দিয়া জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। শহরের পরিচিত ভবনগুলো একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। কখনো বড় বড় দালান, কখনো দোকানের সারি, আবার ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে রাস্তার দুপাশে দেখা দিতে শুরু করল খোলা মাঠ আর সবুজের বিস্তার।
জারুল চুপচাপ বসে আছে।
তার মুখে এখনও উদ্বেগের ছাপ। গত কয়েকদিনের আতঙ্ক যেন তার চোখের নিচে ক্লান্তির রেখা হয়ে জমে আছে। তবুও আজ তার মনে সামান্য স্বস্তি—অন্তত দিয়া এখন দিগন্তের সঙ্গে আছে। মেয়েটাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
দিগন্ত গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝেমধ্যে রিয়ারভিউ মিররে তাকাচ্ছে।
পেছনের সিটে দিয়া শান্ত হয়ে বসে আছে, আর তার পাশে জারুল , তার পাশে সামলা। এই দৃশ্যটা দেখলেই দিগন্তের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসছে। দুপুরের সূর্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গাড়ির কাচ ভেদ করে আসা আলো দিয়ার মুখে পড়ছে। দিগন্ত হাত বাড়িয়ে গাড়ির সানশেডটা একটু নামিয়ে দিল, যাতে রোদের তাপ সরাসরি মেয়েটার মুখে না পড়ে।
জারুল চুপচাপ সেই দৃশ্য দেখল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
শহর ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে চলল অজানা এক আশ্রয়ের দিকে।
দিয়া এইবার পিছন থেকে সামনে চলে আসে বাবার ঊরুতে বসে আদুরে গলায় প্রশ্ন করে ।
_’ পাপা , কোথায় যাচ্ছি আমরা ? ‘
দিগন্ত গাড়ি চালানোয় মন দিয়ে সেও আদুরে মাখা গলায় প্রতিত্তর করল ।
_’ এই তো মা গ্ৰামে বেড়াতে যাচ্ছি।’
_’ তুমিও থাকবে ? ‘
দিয়া কালবিলম্ব না করেই বাবার কথায় চটপট প্রশ্ন করে বসে ।
দিগন্ত মেয়ের করা প্রশ্ন কর্ণপাত হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়ের স্নিগ্ধ মুখের দিকে কিছু সেকেন্ড তাকিয়ে । ভিউয়ার মিররে জারুল এর দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ।
অসুস্থ সালমার সামনে বেশি কোনো কথা না বলায় ভালো । তাই জারুল অত্যান্ত দৃঢ় আর নিম্ন স্বরে বলল ।
_’ তোমার পাপার কাজ আছে দিয়া ।
তুমি আমি আর নানুমনি থাকবো ।’
ছোট দিয়া আর কোনো কথা বলেনি ।
সেও চুপচাপ বাবার উরু থেকে নেমে জানলার কাছে এগোল দুই হাত ভাজ করে দরজার সামনে মাথা এলিয়ে বাতাস অনুভব করতে রাখল । বাহির থেকে ধমকা হাওয়া দিয়াল বড় চুলগুলো তাল মিলিয়ে দুলিয়ে দিচ্ছে । দিগন্ত গাড়ির গিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে মেয়েকে এক হাতে নিজের কোলে রেখে শান্ত কণ্ঠেই বলল ।
_’ নিরাপদ জায়গাই বসে থাকো মা । এইখানে বসে বাতাস অনুভব কর । ‘
দিয়া আর কথা বলেনি ।
বাবার কোলে চুপচাপ বসে আছে ।
দিগন্ত গাড়ি চালানোর কাজে মনোযোগ দেয় ।
দীর্ঘ চার ঘন্টা পারি দিয়ে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ এসে পৌছায় দিগন্ত।
তিনজনকে সুন্দর করে পোঁছে মামিদের সাথে পরিচয় করিয়ে আবারো ঢাকার উদ্দেশে পা রাখে দিগন্ত।
দিগন্ত বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে । দিগন্ত যখন খান বাড়ির বিশাল দরজার সামনে এসে গাড়ি থামাল,ঠিক তখনই দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আভাটুকু ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। সন্ধ্যার নরম অন্ধকার চারপাশে নেমে আসছে, আর সেই আবছা আলো-আঁধারির মধ্যেই খান বাড়িটা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক রূপ ধারণ করেছে।
গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোতেই দিগন্ত থমকে দাঁড়াল।
তার চোখের সামনে যে দৃশ্য, সেটা কয়েক ঘণ্টা আগের পরিচিত খান বাড়ির সঙ্গে যেন কোনোভাবেই মিলছে না।
পুরো বাড়ি বিয়ের সাজে সেজে উঠেছে।
প্রধান দরজা থেকে শুরু করে বারান্দার রেলিং পর্যন্ত ঝুলছে অসংখ্য আলোকসজ্জা। ছোট ছোট বাতির সারি অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনের বাগানে ফুলের সাজ, প্রবেশপথে রঙিন কাপড় আর ফুলের মালা। জানালার কার্নিশ, সিঁড়ির ধাপ, বারান্দার খুঁটি—কোথাও যেন সাজসজ্জার কমতি নেই।
ভেতর থেকেও ভেসে আসছে মানুষের ব্যস্ত কণ্ঠস্বর। বাবা চাচারা সবাই বাড়িতে , নিকটতম আত্মীয় স্বজন ও এসেছে
বাড়িটা যেন বিয়ের আনন্দে মুখর।
অথচ সেই আনন্দের কেন্দ্রে যার নাম, সেই দিগন্তই দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নিয়ে।
সে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে সারার বাড়ি চোখ ঘুরিয়ে দেখল
চোখ ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটার ওপর ঘুরে গেল।তারপর হঠাৎ বুকের ভেতর একটা ভারী অনুভূতি জমে উঠল।
জারুল আর দিয়াকে নিরাপদে রেখে এসেছে।মেয়ের ঘুমন্ত মুখ, জারুলের ক্লান্ত চোখ—সবকিছু এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে।
আর এখানে?
এখানে তার বিয়ের প্রস্তুতি চলছে!
তার অনুমতি ছাড়াই।
তার অনুপস্থিতিতে।
তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাই এমনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন তার মতামতের কোনো অস্তিত্বই নেই।
দিগন্তের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
চোখের দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য কঠোরতা নেমে এলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
না।
এখানে আবেগ দেখালে চলবে না।
নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে হবে।
সে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখের সমস্ত অস্থিরতা আড়াল করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে বাড়ির ভেতরে পা বাড়াল।
তার হাঁটায় ছিল অদ্ভুত স্থিরতা।
ক্লান্ত শরীর, সারারাতের অনিদ্রা, সারাদিনের দীর্ঘ পথ—সবকিছু সত্ত্বেও তার মুখে কোনো দুর্বলতা প্রকাশ পেল না।
সিঁড়ির কাছে এসে সে এক মুহূর্ত থামল।
তারপর উপরে ওঠার জন্য প্রথম ধাপে পা রাখতেই—
পেছন থেকে ভেসে এলো একটি ভারী, রাশভারী কণ্ঠস্বর।
— ‘ দাঁড়াও। ‘
দিগন্তের পা থেমে গেল।
কণ্ঠস্বরটা চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।জহুরা খান।
ধীরে ধীরে দিগন্ত ঘুরে দাঁড়াল।
সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন জহুরা। মুখে সেই চেনা কঠোরতা, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। চারপাশের ঝলমলে আলোয় তাঁর অবয়ব আরও কর্তৃত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দিগন্ত কয়েক সেকেন্ড দাদির দিকে তাকিয়ে রইল।কদিকে বিয়ের আলোয় ঝলমল করছে পুরো খান বাড়ি।
অন্যদিকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই প্রজন্মের দুই কঠিন মানুষ।
একজন নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অটল।
অন্যজন নিজের মেয়েকে রক্ষা করার সিদ্ধান্তে অনড়।
দিগন্তের চোখে তখন আর বিস্ময় নেই।
আছে গভীর সতর্কতা।
_’ কাল তোমাদের হলুদ। আজ সন্ধ্যার পর তোমাদের মেহেদী অনুষ্ঠান, আশা করব আমার কথার বাহিরে কোনো কাজ করবে না । এবং কি , কোথাও যাবে না ।’
_’ কেনো ? আপনি কে ? আপনার কথায় চলতে হবে । ‘
দিগন্ত কথাগুলো উচ্চস্বরেই বলে উঠে । আশপাশ থেকে কিছু মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে পড়ল । দীনা ছেলের কন্ঠস্বর পেয়ে তাড়াহুড়ো করেই রান্নাঘর থেকে পা বাড়াল । জহুরা সবার চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ।
_’ বেয়াদবি করছ দিগন্ত! আমি কে সেইটা তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো ? তুমি জানো না। তোমার এই খামখেয়ালির জন্য তুমি ঠিক কতটা বিপদে পড়তে পারো । ‘
দিগন্ত ঘার কাত করল । একটু নাট্যকিয় ভঙ্গিতে হেসে বলল ।
_’ ওহ রিয়েলি । ‘
কথাটা বলে দিগন্ত সোফায়। গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসল । তার উপস্থিতি টের পেয়ে জিসা দৌড়ে এগিয়ে এসে দিগন্ত কে জড়িয়ে ধরতে গেলে দিগন্ত রামধমক দেয় তার ধমক খেয়ে ন্যাকা কান্না জুড়ে দেয় । বিয়ের খুশিতে সব ভুলেই বসেছিল ।
জহুরা তেতে আসল । হাত উঁচু করে শ্বাসিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগে দিগন্ত বলে ।
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৫
_’শেয়াল একটু বুদ্ধিমান দেখে কিন্তু সে কখনোই বনের রাজা হয় না । যতই গুটি নাড়াচাড়া করুক দিনশেষে কিন্তু তাকে কেও গুনাই ধরে না। একটু ছলচাতুরি আর বুদ্ধি খাটিয়ে আমাকে বিদেশ পাঠালেই কেও আমার থেকে বড় মাদ***** হতে পারবে না । একটা একটা করে বের করে টুক*রো টুক*রো করব আমি দিগন্ত ।’
