অভিসৃতি পর্ব ১৫ (২)
নওরিন কবির তিশা
লজ্জা-উৎকণ্ঠার মিশেলে কপোলদ্বয়ে লালিমা ছড়িয়ে পড়েছে রমনীর। পাত্রপক্ষের আগমনী সংবাদ পেয়েছে আরো মিনিট দশেক পূর্বে। অথচ, মুহূর্তের উচ্ছ্বাসের পর মুহুর্তেই নিস্তব্ধতায় ডুব দিয়েছে সমগ্র হল। কেবল ক্ষণে ক্ষণে প্রবেশদ্বার হতে ভেসে আসছে শোরগোলের আওয়াজ।
সজ্জায় সামান্য ত্রুটি থাকার দরুন কায়রাকে মূল মঞ্চ হতে সরিয়ে দোতলার একটি নিরিবিলি বিশ্রামাগারে নিয়ে আসা হয়েছে। রূপসজ্জাকারীরা তড়িঘড়ি ওর মেকআপ আর লেহেঙ্গার ভাঁজগুলো পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ হতেই সহসা বাইরে যাওয়ার অজুহাতে চম্পট দিয়েছে। কক্ষে তখন কায়রা একাকী। কক্ষটা একদম বিল্ডিং কার্নিশ ঘেঁষা হওয়ায় তোরণদ্বার স্পষ্ট দৃশ্যমান সেখান থেকে। আর সেখান থেকে ভেসে আসা তরুণ-তরুণীদের উচ্চকিত কোলাহল ও হাসির আওয়াজ ওর উৎসুক মনকে চঞ্চল করে তুলল।
নূপুরের নিক্কন তুলে কায়রা ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে জানালার রেশমি পর্দা সামান্য সরিয়ে নিচে উঁকি দিল। উন্মুক্ত চোখে ধরা পড়ল প্রবেশদ্বারে ফিতা ধরে রাখা কাজিন আর বন্ধমহলে ভিড়। আর তাদের ঠিক সম্মুখে সুদৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর দুর্জয় আহসানকে।
দুর্জয়ের অনমনীয় অবয়ব আজ সজ্জিত হয়েছে ঘিয়ে রঙা এক আভিজাত্যপূর্ণ কারুকার্যখচিত শেরওয়ানিতে, মাথায় সুবিন্যস্ত ঐতিহ্যবাহী সাফা। বাড়ন্ত বেলার রৌদ্রে, গম্ভীর পুরুষের সৌন্দর্যেরা যেন ঠিকরে পড়ছে। মোহাবিষ্ট করছে দৃষ্টি। আকুল করছে হৃদয়। জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে পরম মুগ্ধতায় ওষ্ঠাধরের কোণে একচিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে কায়রা একধ্যানে চেয়ে রইল সেই পুরুষালী প্রখর রূপের পানে।
কিন্তু হঠাৎই,চৌম্বকীয় আকর্ষণে দুর্জয় অলস ভঙ্গিতে সোজা ওপরে, কায়রার জানালার পানে চোখ তুলল!আকস্মিক ওই প্রখর, অতল কৃষ্ণচোখের মুখোমুখি হতেই কায়রার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! একলহমায় চট করে পর্দার আড়ালে নিজেকে গুটিয়ে নিল ও; হৃদস্পন্দন তখন চরম বেগে আছড়ে পড়ছে বক্ষপিঞ্জরে।
ওদিকে, তোরণদ্বারে দাঁড়িয়ে দুর্জয় শাণিত দৃষ্টিতে দোতলার জানালার পর্দাটুকুর প্রকম্পন মেপে নিল। রেশমি বস্ত্রের আড়ালে নিমেষে মিলিয়ে যাওয়া লাজুক হরিণী চোখের চঞ্চল অবয়বটুকু ওর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এড়াতে পারল না একবিন্দুও।
এদিকে, বিগত দশ মিনিট ধরে ফিতা কাটাকে কেন্দ্র করে ব্যারিস্টার সায়মন রহমান আর পায়রা ইয়াসিরের মধ্যকার বাকযুদ্ধ চরমে উঠেছে! আশেপাশের সকল অতিথি, কাজিন ও বন্ধুরা ফিতা ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে একদম নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যেন কনভেনশন সেন্টারের প্রবেশদ্বারে কোনো টানটান উত্তেজনার কোর্টরুম ড্রামা টিভি টেলিকাস্ট চলছে!
সায়মন অনায়াসে গাঢ় ছাই রঙা স্যুটটার হাতা খানিকটা গুটিয়ে, সুগঠিত চিবুকে অলস হাত রেখে বিদ্রূপের ছলে বলল,
“দেখুন মিস পায়রা! আপনার এই আনরেজনেবল ক্লেইম কোনো সুস্থ মস্তিস্কের জাজও এন্টারটেইন করবে না। বিশ হাজার টাকা? কোন যুক্তিতে?”
পায়রা দুই হাত কোমরে দিয়ে অগ্নিশর্মা রূপে এক পা এগিয়ে এল,
“যুক্তির নিকুচি করেছি! এটা ওয়েডিং স্পট, আপনার প্রফেশনাল কোনো কোর্টরুম নয়, মি. অহেতুক ব্যারিস্টার! কায়রার এক নম্বর ব্রাইডসমেড আর বোন হিসেবে যা চাইব, এক চুলও কম হবে না! টাকা বের করুন, আদারওয়াইজ নো এন্ট্রি!”
সাইমন চশমাটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে পায়রাকে উপর-নিচ এক নজর মেপে নিয়ে শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বললো,,
“বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটা কে রেখেছিল বলুন তো? পায়রা? সিরিয়াসলি? আপনার নাম তো হওয়া উচিত ছিল কাউয়া! যেভাবে কানের কাছে কা-কা করছেন, মাই গুডনেস! আমার লিগ্যাল ক্যারিয়ারে এত বড় হেডেক আমি ফেস করিনি!”
কথাটা শোনামাত্র তোরণদ্বারে উপস্থিত কাজিন আর বন্ধুমহলে হাসির ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটল!অপমানের চোটে, তেজী মেজাজি পায়রার গাল দুটো মুহূর্তেই অগ্নিবর্ণ ধারণ করে ও চেঁচিয়ে উঠল,
“কী বললেন আপনি? কাউয়া? ইউ স্যালমন ফিস! ফালতু কথা বলবেন না একদম! আপনি নিজেকে কী ভাবেন শুনি? অসভ্য,খচ্চর, কাঠখোট্টা একটা স্যালমন মাছ কোথাকার! চুপ থাকুন আপনি!”
সায়মন ভ্রূ দুটো সামান্য উঁচিয়ে সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“স্যালমন ফিস? ওয়াও! অ্যানাটমি আর মেরিন লাইফ সম্পর্কে আপনার জ্ঞানের বহর দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ, মিস কাউ—আই মিন মিস পায়রা! বাট অ্যাট লিস্ট স্যালমন ফিস তো একটা ক্লাসি ওয়াটার ক্রিয়েচার! আর আপনি? জাস্ট ফালতু চিঁচিঁ করছেন!”
“আপনি আমাকে রি-রিপিটেডলি ইনসাল্ট করছেন! টাকা নিয়ে কিংবা নানী সবাইকে ভেতরে ঢুকতে দেবো শুধুমাত্র আপনি ব্যতীত!”
“আই,সি। সবার আগে আমি ভেতরে ঢুকবো দেখবেন, মিস কাউয়া!”
ওদের তীব্র কলহে পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার জোগাড়, ঠিক তখনই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠাম অবয়বটির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। দুর্জয় গম্ভীর, কণ্ঠে বললো,
“এনফ অফ দিস রাবিশ, সায়মন!”
দুর্জয়ের আদেশে মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা পড়ল। দুর্জয় পকেট থেকে নিজের সুদৃশ্য ওয়ালেটটা বের করে অনায়াসে দুই হাজার টাকার একখানা ঝকঝকে বান্ডিল ইভানের দিকে বাড়িয়ে দিলো। অতঃপর সাইমনের দিকে হিমশীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“গেট আউট অফ মাই ওয়ে!”
“আরে ভাই তুই এত কাঠখোট্টা কেন বলতো? জাস্ট একটু এন্টারটেইনমেন্ট করছিলাম! বিয়েতে এমন হয়ই!”
“শাট আপ স্টুপিড!”
“অ্যাই অসভ্য অ্যাই! সম্মান দে,তোর ভবিষ্যৎ মেয়ের ভবিষ্যৎ শ্বশুর আমি।”
দুর্জয় এক পা এগিয়ে এসে সায়মনের কানের কাছে খানিকটা ঝুঁকে অতি নিচু স্বরে বলল,
“তোর বিয়েতে আমি নই বরং আমার বিয়েতে এসেছিস তুই, তাও সিঙ্গেল ডগ হয়ে!”
সাইমন একমুহূর্ত চমকে উঠে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। বুকে হাত দিয়ে আহত হওয়ার ভান করে বলল,
“হোয়াট দ্য হেল! তুই কি আমাকে ব্রুটালি ইনসাল্ট করার চেষ্টা করছিস, দুর্জয়?”
“ ইনসাল্ট-ই করলাম। সো, জাস্ট শাট ইয়োর মাউথ অ্যান্ড কিপ কোয়ায়েট!”
সায়মন এবার তড়িৎ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বলল,
“হেই! মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ ম্যান! আমার ম্যানহুডে অ্যাটাক করবি না একদম! চাইলে যেকোনো মুহূর্তে বিয়ে করে ছক্কা হাঁকিয়ে দিতে পারি!”
“ওহ রিয়েলি?”
“ইয়াহ!”
দুর্জয়ের নির্ভাবনা ঠান্ডা মুখচ্ছবিতে সায়মন দুর্জয়ের কাঁধে চট করে এক হাত রেখে রসিকতার সুরে ফিসফিস করে বলল,
“বাই দ্যা ওয়ে, দোস্ত আর ইউ প্ল্যানিং টু মেক মি অ্যান আঙ্কেল বাই নেক্সট উইক অর হোয়াট? কজ দ্যাটস দ্য অনলি ওয়ে ইউ ক্যান বিট মি, ব্রো!”
সায়মনের ফাজলামিতে দূর্জয়ের ওষ্টাধর প্রান্তে বাঁকা হাসিয়ে দেখা মিলল হঠাৎ। ও এক ভ্রূ উঁচিয়ে শুধু বলল,
“হোল্ড দ্যাট থট, সায়মন! জাস্ট হোল্ড দ্যাট থট!”
এমন উত্তর আশা করেনি সায়মন,
“ওই মামু, তলে তলে এতদূর! বিয়েই করতে চাচ্ছিলে না আর এখন, এক সপ্তাহের ভেতর চাচা বানানোর ট্রাই করছো! ভালো ভালো!”
“সাবধানে ইথি!”
জনাকীর্ণ’তার মাঝে পেছন হতে ভেসে আসা পৌরুষ নিষেধাজ্ঞায় চট করে পিছু ঘুরলো ইথিকা। উজান আর এক মুহূর্ত কাল বিলম্ব না করে দ্রুত এগিয়ে এসে স্ত্রীর হাতখানা সযত্নে মুঠোয় পুরলো। ইথিকা নাকোচ করতে গিয়েও থামলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে একপল পর্যবেক্ষণ করলো পার্শ্ববর্তী দায়িত্ববান পুরুষটিকে। জনকোলাহলে মেয়ে কোলে, ইতিমধ্যেই ঘেমেনেয়ে একসাড় হয়েছে। তার মধ্যেও স্ত্রীয়ের সামান্যতম খেয়ালটাও রাখতে ভুলছে না।
”আরে,ছাড়ো। প্রবলেম নেই আমি যেতে পারবো তো। আর,তোমার কাছে কুহু আছে।”
উজান মুচকি হেসে বলল,,
“মেয়ে যেমন ইম্পর্টেন্ট, তার থেকে হাজার মিনিট সেই মানুষটা যে আমাকে মেয়ে নামক জান্নাত দান করেছে।তো, কথা না বলে যত ভেতরে চলুন ম্যাডাম। গরম লাগছে বেশ।”
ইথিকা জবাব দিতে পারলো না। মৃদু হাস্যে মাথা দুলিয়ে এগিয়ে চললো সম্মুখ পানে।
শুভ লগ্ন সমাগত। পুরুষালীতে সজ্জিত কক্ষে কাজী সাহেবের উপস্থিতিতে দুর্জয়ের বিবাহ নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে খানিক পূর্বেই। এবার অন্দরমহলে কায়রার সম্মতি গ্রহণের পালা। ইসলামিক শরিয়ত ও আইনি নিবন্ধনের কাগজপত্রাদি হস্তগত করে কাজী সাহেব, আনোয়ার ইয়াসির, এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যগণ প্রবেশ করলেন অন্য একটি সুসজ্জিত কক্ষে। সুদৃশ্য ঘিয়ে রঙা লেহেঙ্গায় মোড়ানো কায়রা তখন মখমলের আসনে উপবিষ্ট, ওর পাশে মা নুরা বেগম আর আঞ্জুমান ইয়াসির স্নেহার্দ্র চোখে চেয়ে আছেন।
কাজী সাহেব সহ দুই একজন পুরুষ ভেতরে ঢুকতেই নড়েচড়ে বসলেন ওনারা। কাজী সাহেব সামনে এগিয়ে গুরুগম্ভীর সুকোমল কণ্ঠে বললেন,
“আনোয়ার ইয়াসিরের ছোট কন্যা কায়রা ইয়াসিরের সহিত দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া, জনাব ইকবাল আহসানের একমাত্র পুত্র দুর্জয় আহসানের শুভ বিবাহ ধার্য করা হইয়াছে। আপনি কি এই বিবাহে রাজি আছেন?থাকলে বলুন, কবুল।”
কাজী সাহেবের কণ্ঠস্বর কক্ষে উচ্চারিত হতেই সহসা যেন পুরো ঘরের আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত প্রচ্ছায়াপাত ঘটল। এতক্ষণ যাবৎ ওষ্ঠাধরে ফুটে থাকা লাজুক চপলতার হাসিরেখা উবে গিয়ে, আকস্মিক কালবৈশাখীর তোলপাড় শুরু হলো হৃদয়ে ! জীবনের এই একটি শব্দ’কবুল’-যা এক লহমায় একটি মেয়ের সম্পূর্ণ সত্ত্বাকে অন্য এক পুরুষের সাথে আজীবনের তরে গেঁথে দেয়! এতদিন যাকে কেবল এক প্রকাণ্ড রোমাঞ্চ মনে হচ্ছিল, আজ সেই ক্ষণে এসে কায়রার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। অক্ষিপল্লব বেয়ে অশ্রুর ফোটা গড়িয়ে পড়ল থুতনিতে।
হঠাৎ, চঞ্চল নেত্রে চারপাশটা পিনপতন নীরবতায় মেপে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“আ-আমার আপু কই?”
নুরা বেগম তড়িঘড়ি ওর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বললেন,
“আহা! কাঁদছিস কেন সোনা? তোর আপু তো বাইরে মেহমানদের দেখাশোনা করছে। তুই আগে কাজী সাহেবের কথার উত্তর দে, বাবা!”
কাজী সাহেব পুনরায় কাগজ বাড়িয়ে প্রবীণ হাস্যে বললেন,
“হ্যাঁ মা, শুভ কাজে বিলম্ব করতে নেই। বলুন, কবুল।”
কিন্তু কায়রা সজোরে দু-পাশে মাথা নেড়ে অবাধ্য শিশুর মতো কেঁদে ফেলে বলল,
“না! আমি আপুকে ছাড়া কিচ্ছু বলব না! পায়রা আপুকে ডাকো! আব্বু, আমার আপুকে এনে দাও আগে!”
মেয়ের এমন হঠাৎ ব্যাকুলতা,অশ্রুসিক্ত আবেগে আনোয়ার ইয়াসির সাহেবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। উনি আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে হাঁক ছাড়লেন,
“পায়রা! আম্মা পায়রা, কোথায় তুই? শিগগির ভেতরে আয়!”
বাইরে তখনো সায়মনকে তোপ দাগাতে ব্যস্ত থাকা পায়রা বাবার আকুল ডাক শুনে থমকে গেল। চটজলদি শাড়ির কুঁচি সামলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে এসে উপস্থিত হলো সে। কক্ষে ঢুকেই ছোট বোনের এমন ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখে ওর বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। ও দ্রুত এগিয়ে এসে কায়রার মুখোমুখি দাঁড়ালো। কায়রা একমুহূর্ত কালবিলম্ব না করে ধেয়ে এসে বড় বোনের পেট বরাবর মুখ গুঁজে জড়িয়ে ধরল সজোরে! অশ্রুসিক্ত কন্ঠে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,,
“তুই এতক্ষণ বাইরে কী করছিলি আপু? আমাকে একা ফেলে রাখলি কীভাবে? তুই না থাকলে আমি কীভাবে কবুল বলব, হ্যাঁ?”
পায়রা নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা একফোঁটা অবাধ্য অশ্রুকণা অগোচরে লুকিয়ে কায়রার মাথায় পরম মায়ায় হাত বুলাল। কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে সুকোমল স্বরে বলল,
“গাঁধা একটা! কাঁদিস কেন এভাবে? আমি তো এই ঘরের বাইরেই ছিলাম, কোথাও চলে যাইনি তো! আচ্ছা নে,স্যরি। এবার লক্ষী মেয়ের মতো বল দেখি!”
কায়রা আরও শক্ত করে মুখ গুঁজে, রুদ্ধ, কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে অস্ফুটে তিনবার বলে উঠল,,
“ক-কবুল… কবুল… কবুল!”
মুহূর্তেই আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হলো সমগ্র কক্ষ। বাবা মায়ের নেত্র কার্নিশ হয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ল আনন্দের বারিধারা।
দুর্জয়ের পাশে টুকিটাকি আলাপে মগ্ন সবাই। আকস্মিক সকলের নজর কাড়লো পরিহিত ভারি লেহেঙ্গা টা এক হাতে উঁচিয়ে,অন্য হাত বাবার হাতে হাত রেখে এদিকে এগিয়ে আসা অপ্সরাসম মেয়েটি। লজ্জাবতী লতার ন্যায় আনত অক্ষিপল্লব, আরক্তিম গণ্ডদেশ যেন সাঁঝের আবীর মেখেছে। সকলের দৃষ্টি অনুসরণ করে প্রবল উৎসাহে সম্মুখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে স্থানুর ন্যায় জমে গেল দুর্জয়। অতল কৃষ্ণচোখের সুগভীর দৃষ্টি স্থির হলো সেই লাজুক হরিণীর পানে। মোহাবিষ্টের মতো চেয়ে রইল অপলক।
তবে সেই মোহগ্রস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ব্যক্তিত্বের ভারিক্কিতে চাপা পড়লো সহসা। কায়রা কাছে আসতেই দুর্জয় সুঠাম দেহে দ্রুত উঠে দাঁড়াল এবং বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের প্রশস্ত ডান হাতখানা সামনে বাড়িয়ে দিল।আনোয়ার ইয়াসির সাহেব চোখের কোণে জমে থাকা আনন্দের অশ্রুকণা অগোচরে মুছে, পরম আস্থায় মেয়ের হাতটি দুর্জয়ের শক্ত করতলে সঁপে দিলেন। কায়রা ক্ষণকালের জন্য আনত নেত্রে দুর্জয়ের দিকে চেয়ে নিজের কাঁপাকাঁপা হাতটি সঁপে দিল সেই পরম আশ্রয়ে। দুর্জয় আলতো চাপে ওকে মখমলের বিশেষ আসনে বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশাপাশি বসলো।
অতঃপর কাজী সাহেব ও পরিবারের সদস্যরা বিবাহের মূল রেজিস্ট্রি খাতাটি সামনে এগিয়ে দিলেন। আইনি সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে দুর্জয় অত্যন্ত অকম্পিত, সুদৃঢ় হাতে প্রথমে খাতায় নিজের স্বাক্ষর বসিয়ে দিল। এবার কায়রার পালা। কাজী সাহেব কলমটি কায়রার কাঁপতে থাকা সুকোমল আঙুলের ফাঁকে গুঁজে দিতেই ওর হৃদস্পন্দন প্রকাণ্ড বেগে থরথর করে কেঁপে উঠল। ক্ষণে ক্ষণে অক্ষিপল্লব ভিজে ওঠার উপক্রম হতেই সহসা এক অনাবিল উষ্ণতা অনুভব করল ও।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে, দুর্জয় প্রকাশ্যে সবার সম্মুখেই কায়রার সেই কম্পিত ডান হাতটি নিজের সুগঠিত বলীয়ান করতলে পরম আস্থায় আঁকড়ে ধরল! দুর্জয়ের শক্ত স্পর্শে কোত্থেকে সাহসের সঞ্চার হলো কায়রার অন্তরে। দুর্জয় স্বহস্তে কায়রার হাতটি খাতার পাতায় গাইড করে সুনির্দিষ্ট স্থানে নিখুঁতভাবে স্বাক্ষর করিয়ে দিল।
স্বাক্ষর শেষ হতেই, দুর্জয় কায়রার দিকে সামান্য ঝুঁকে, ওর রেশমি ওড়নার ভাঁজ ঘেঁষে কানের কাছে নিজের ওষ্ঠাধর এনে নিচু, সুগভীর ধাতব কণ্ঠে বলে উঠল,,
“শাদী মোবারক, মিসেস কায়রা দুর্জয় আহসান! আজ থেকে টাইটেলটা আপনার নামের পাশে চিরস্থায়ী হলো। আর এতদিনের আপনি সম্ভাষণটা ডিঙিয়ে, তুমি বলে তোমায় নিজের করে ডাকার পার্মানেন্ট অধিকারটা আজ একান্তই আমার হলো!”
দুর্জয়ের এমন সুপ্রচ্ছন্ন পৌরুষ কণ্ঠস্বরে ও সুমিষ্ট সান্নিধ্যে কায়রার গালে যেন সাঁঝের রাঙা আবীর ছড়িয়ে পড়ল। ডাগর চোখ দুটি লাজে অবনত করে ও আনমনে ওষ্ঠাধরের কোণে পরম তৃপ্তির হাসি হাসলো।
বিদায়ী বেলা বড্ড বেদনাদায়ক। সূর্য তখন পাটে নেমেছে, সমাগত বিদায়ক্ষণ। আনোয়ার ইয়াসির সাহেব এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখলেও, পরম আদরের ছোট মেয়েকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে আর আবেগ সংবরণ করতে পারলেন না। বাষ্পরুদ্ধ নয়নে, কাঁপাকাঁপা হাতে কায়রার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। অতঃপর অশ্রুসজল চোখে দুর্জয়ের সুদৃঢ় হাত দুটি দু-হাতে আঁকড়ে ধরে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,
“খেয়াল রেখো ওর, বাবা! আমার বড় আদরের পুতুল ও… কোনোদিন কষ্ট দিও না ওকে!”
দুর্জয় আনোয়ার ইয়াসিরের হাতের মুঠোয় থাকা নিজের হাতের দিকে চেয়ে চাপ দৃঢ় করলো; অতঃপর আশ্বস্তকারী কন্ঠে বলল,,
“আঙ্কেল, আপনার পুতুলকে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদ করে নিয়ে যাচ্ছি। কথা দিচ্ছি, নিজের চেয়েও বেশি আগলে রাখব ওকে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
পাশেই অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন নুরা বেগম আর ফুফু আঞ্জুমান ইয়াসির। নুরা বেগম কায়রার কপালে এক পরম মমতাময় চুম্বনে এঁকে দিয়ে অস্ফুটে বললেন,
“নতুন সংসারে সুখী হ, সোনা আমার। সব দায়িত্ব যেন ঠিকঠাক সামলাতে পারিস!”
কায়রা তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ঠিক তক্ষুনি সামনে এসে দাঁড়ালো পায়রা। এতক্ষন যাবত নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও বোনের এমন কান্নায় ওর নিজের চোখের কার্নিশ বেয়েও একফোঁটা অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ল। তবে দ্রুত তা সামলে নিয়ে কায়রার গাল দুটো ধরে কৃত্রিম চটে গিয়ে বলল,
“কী বড় গাধী তুই! এমন ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদার কি আছে? এমনিতেই তো খুব লাফাচ্ছিলি মেজর বিয়ে করছি হেনতেন! এখন ঢং করে কাঁদছিস কেন? আর একবার কাঁদবি তো! কত হাজার টাকা তোর মেকআপের পেছনে উড়িয়েছে জানিস? অসভ্য মেয়ে!
কথাটা বলেই পায়রা কায়রাকে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বোনকে আঁকড়ে ধরে কায়রাও ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“আমাকে ভুলে যাবি না তো, আপু?”
পায়রা দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একগাল হেসে বলল,
“তোকে ভুলব মানে? প্রতিদিন ফোন করে তোর ওই গম্ভীর বরের নামে নালিশ শুনব তোর কাছে! যা, সাবধানে যা!”
এ পর্যায়ে ইকবাল আহসান এগিয়ে এলেন। আনোয়ার ইয়াসির সহ ইয়াসির পরিবারের সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,,
“তাহলে, আপনারা সম্মতি দিলে আমরা এবার আমাদের মেয়েকে তার বাড়িতে নিয়ে যাই?”
সকলে হেসে মাথা দুলালেন। আনোয়ার ইয়াসিরের সঙ্গে আলিঙ্গন শেষে ইকবাল আহসান সকলকে নিয়ে রওনা হলেন নিজ ভবনের উদ্দেশ্যে।
দুর্জয় সাধারনত ব্যক্তিগত স্পেস পেতে পছন্দ করে বিধায় বর কনের গাড়িতে আর কেউ ওঠেনি। শুধু দুর্জয় আর কায়রা আর ড্রাইভিং সিটে ড্রাইভার ব্যতীত পুরো গাড়িটাই ফাঁকা। দুর্জয় আর কায়রা পাশাপাশি বসে। গাড়িতে ওঠার পরম মুহূর্তেই হঠাৎ ফোন আসায় সেখানে ব্যস্ত হয়েছে দুর্জয়। এদিকে কায়রার নাজেহাল দশা। সারাদিনের ক্লান্তির সঙ্গে বিদায়ী বেদনা ভর করেছে সর্বাঙ্গে। যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে মাথা।দু-খানি অক্ষিপল্লব কানায় কানায় তন্দ্রায় আচ্ছন্ন।
অথচ পেছনে সজ্জিত ফুলগুলোর মাঝে কিছুতেই নিজের মাথাটা একটু এলিয়ে দিতে পারছে না ও। তাই শঙ্কা-লজ্জায় জোরপূর্বক অক্ষিপল্লব মেলে ধরে রইল ও।তখনো ফোনে অত্যন্ত জরুরি কোনো দাপ্তরিক কথা সারছিল দুর্জয়। তবে তার ক্ষুরধার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি কায়রার এই নাজেহাল দশা। ফোন কানে রেখেই দুর্জয় নিজের, সুপ্রশস্ত, বলীয়ান কাঁধটি কিছুটা এগিয়ে দিল সে। ইশারায় জানিয়ে দিল—“মাথাটা এখানে রাখো।”
কায়রা সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে খানিক থমকে রইল। তা দেখে ফোনটা তৎক্ষণাৎ কেটে দিল দুর্জয়। কায়রার দিকে পরম নির্ভরতার দৃষ্টিতে চেয়ে সুগভীর কণ্ঠে বললো,
অভিসৃতি পর্ব ১৫
“নো নিড টু হেজিটেট অ্যানিমোর, মিসেস দূর্জয়। যেখানে দূর্জয় আহসান নামক এই আমি সম্পূর্ণটাই তোমার নামে রিজার্ভ হয়ে গেছি, সেখানে এটা আর এমন কি?”
