প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১১
সাদিয়া সাদু
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে ধরণী জুড়ে। সূর্যের তেজ কমে এসেছে , খান বাড়ির ছাদে হালকা বাতাস বইছে । দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। নিচতলায় সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত, আর ছাদটা প্রায় ফাঁকা।
ছাদে মেলে দেওয়া শুকনা কাপড়াগুলো জারুল নামিয়ে ভাঁজ করছে। এক হাতে কাপড়, অন্য হাতে ক্লিপ খুলছে। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। কাজ শেষ করেই নিচে নেমে যাবে, এমন সময় খোঁপা করা চুলগুলো এক টানে ছেড়ে দেয় । কোমর ছড়িয়ে পড়ে কিছু চুল নাকে মুখে লেপ্টে যায়। অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে জারুল বিরক্তিতে নাকমুখ খিচে হিসহিসিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে কিছু বলে গিয়ে পিছনে দাঁড়ানোর ব্যক্তিকে দেখে গিলে ফেলে ।
দিগন্ত জারুল এর মুখের ভাব দেখে মিটিমিটি হাসছে সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। দুই হাত পকেটে রেখে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।
জারুল চোখ নামিয়ে নিল। পিছু ফিরে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।
হাত চালাতে চালাতেই বলে ।
_’ এইখানে কি চাই । ‘
_’তোমাকে ।’
দিগন্ত চটপট উত্তর দিতে দেখে জারুল এর হাত থেমে যায় । তল পেট মুচড়ে উঠলো।
দিগন্ত ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো।
পিছন থেকে কোমড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে দেয় ।
হঠাৎ এরকম করায় জারুল হকচকিয়ে গেল। অস্তির লাগছে , বুক ধড়ফড় করছে ।
পায়ের পাতাও শিরশির করছে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । জারুল দুর্বল হাতে দিগন্তের ভারী দেহটা সরাতে সরাতে অস্পষ্ট স্বরে বলল ।
_’ কি করছো ! সরো । কেউ দেখে ফেলবে । ‘
_’ দেখুক । দেখালেই তো ভালো হবে । তোমার আর আমার বিয়েটা আবারো হয়ে যাবে । ‘
জারুল শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ধাক্কা দিয়েও নড়াতে পারছে না ।
ভালোও লাগছে আমার দিগন্তের কথায় রাগ ও হচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে
_’তুমি ঠিক কি চাচ্ছো বলো তো আমাকে । ‘
_’ ও মা কি চাচ্ছি সেইটা তুমি এখনি বুঝতে পারছো না ! ‘
_’ না পারছি না । ছাড়ো ।’
দিগন্ত ছাড়ে না । আগের ন্যায় জড়িয়ে ধরেই বলে ।
_’ ও মাই আল্লাহ , তুমি মাত্র জিজ্ঞাস করছো আমি কি চাচ্ছি ! আমার চাওয়া খুবই কম । দিয়া’র একটি ভাই হলেই হবে । ‘
জারুল দাঁতে দাঁত কটমট করছে । কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলে শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে । দিগন্ত তার চেষ্টা দেখে একটু খানি হেসে ছেড়ে দাঁড়ায়। পকেটে দুই হাত গুজে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ে ।
_’অসভ্য লোক । কোনো কাজ পারে না শুধু অশ্লীল ইঙ্গিত দিতে পারে । ‘
জারুল কথা বলতে বলতে পা বাড়িয়ে নামতে যায় জারুল অস্বস্তিতে এক পা পেছাতে গিয়েই কাপড়ের ঝুড়িতে হোঁচট খেল। পড়ে যাওয়ার আগেই দিগন্ত দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
এক মুহূর্তে চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
দিগন্তের শক্ত হাতের মুঠোয় নিজের হাত আটকে থাকতে দেখে জারুলের বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল। জারুল এক পলক তাকায় কিছু বলতে যাবে
ঠিক তখনই বাতাসে উড়ে আসা একগুচ্ছ চুল মুখ ঢেকে দিল। দিগন্ত আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
_’আমার সকল অশ্লীল আর নির্লজ্জতা শুধুই আমার জারুলফুলের জন্য। আমার প্রিয় জারুলফুল বোকা জারুলফুল। ‘
জারুলের চোখ এবার দিগন্তের চোখের সঙ্গে মিলল। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ। সেই নীরবতায় হাজারো না-বলা অনুভূতি যেন একে অপরের কাছে পৌঁছে গেল।
দিগন্ত ধীরে তার কপালের ওপর নেমে আসা চুলে আঙুল ছুঁইয়ে মৃদু হেসে বলল
_’ তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে , চলো একটু অসুন্দর করে দিই নয়তো নজর লাগবে কারো । ‘
দিগন্তের নীরব কণ্ঠে অসাধু ইঙ্গিত দেওয়া কথাগুলো কর্ণপাত হতেই জারুল আবারও গরম চোখ নিক্ষেপ করলো দিগন্তের পানে ।
_’ অশ্লীল লোক । কোনো কালেই ভালো হবে না । ”
দিগন্ত একটু হেসে এক হাত চেপে নিজের বলিষ্ঠ বুকের সাথে মিশিয়ে নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদের দরজার কাছে এসে থেমে গেলেন দীনা বেগম।
তিনি মূলত জারুলকে নিচে ডাকার জন্যই ছাদে উঠেছিলেন। কিন্তু দরজার আড়ালে দাঁড়াতেই সামনে দেখা দৃশ্যটি তাকে স্থির করে দিল।
তার ছেলে দিগন্ত—একজন কাজের মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের চোখে চোখ, মুখে এমন এক নীরবতা, যা সাধারণ কথোপকথনের নয়।
দীনা বেগমের মুখের রঙ ধীরে ধীরে বদলে গেল।
তিনি নিঃশব্দে দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে রইলেন। একটিও শব্দ করলেন না। তবে তার ভেতরে অস্বস্তি আর সন্দেহ একসঙ্গে জন্ম নিল।
“দিগন্ত আর একটা কাজের মেয়ে? না এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে বিষয়টা এখানেই থামাতে হবে। কঠিন হয়ে উঠল তার দৃষ্টি।
আর ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দিগন্ত ও জারুল—দুজনের কেউই বুঝতে পারল না, দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে একজন সবকিছু নিজের চোখে দেখে ফেলেছেন।
তার সাথে আরেকটা রহস্যময় চোখ।
সন্ধ্যা ৭ টা , দিগন্ত নিজের রুমে বসেই ল্যাপটপের কিবোর্ড চেপে কাজে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় দীনা বেড়ায় শান্ত মুখে দরজার অপরপাশ থেকে উচ্চস্বরে বলল ।
_’দিগন্ত আমার রুমে আয় তো । আর্জেন্ট কথা আছে । ‘
দীনা আর দাড়ায় না । বড় বড় পা ফেলে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে । দিগন্ত ও মায়ের ডাকের অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো ।
_’ কিছু বলবে ? ‘
দিগন্তের উপস্থিতি টের পেয়ে শান্ত মুখশ্রী ভয়ংকর হয়ে উঠে । রাগে শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে , কয়েক রাগের তোপে শিরার রগ গুলো চিটছে।
দীনা বেগম নিজেকে কিছুটা সময় নিয়ে শান্ত করে শক্ত কণ্ঠে বলল ।
_’ জারুল এর সাথে তোর কি সম্পর্ক? ওই মেয়ের একটা বাচ্চা আছে তুই জানোস। তারপরও তুই অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করছিস । এই শিক্ষা দিয়েছি আমি ।’
দিগন্ত মায়ের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে ।
তার মা তাকে কি বলছে ‘অবৈধ সম্পদ স্থাপন করছে ‘ তার নিজের বিয়ে করা স্ত্রীর সাথে কথা বলাও অবৈধ!
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১০
_’ আমার সাথে তার কোনো অবৈধ সম্পর্ক নেই সে আমার বিয়ে করা বৈধ স্ত্রী । আর মেয়েটাও আমার , আমার বাচ্চা আর স্ত্রীকে নিয়ে কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলবা না আম্মু । ‘
দীনা বেগম স্তব্ধ হয়ে যায় । নির্বাক পলকহীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ছেলের পানে
