তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৮
noorayn
পরদিন সকাল…
খান বাড়ির কিচেনজুড়ে সকালের ব্রেকফাস্টের আয়োজন চলছে। একে একে সবাই এসে বসেছেন ডাইনিং টেবিলে। বাকি শুধু আরহাম আর ডোরা।
আলিশাও এসে বসেছে। তাকে দেখেই আয়শা জিজ্ঞেস করলেন,
“আরহাম আর ডোরা কোথায়?”
আলিশা সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো,
“আসছে…”
–কিছুক্ষণ আগেই সে রুমে গিয়ে দেখে এসেছে ; আরহাম তখনও ঘুমে বিভোর ছিলো এবং ডোরা সেই সময় মাত্রই ঘুম থেকে উঠে বাবার বুকের ভেতর বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে চোখ পিটপিট করে চেয়ে ছিলো। আলিশা ছেলেকে কোলে নিয়ে ফ্রেশ করিয়ে ; কিছুক্ষন আদর করে তারপর ফিড করিয়ে এসেছে। আসার আগে অবশ্য আরহামকে ডেকে দিয়েছে।
তবে, আরহামের ওঠার কোনো ইচ্ছেই ছিলো না। গত পুরো রাত ছোট মরিচ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ঠিকমতো ঘুমাতে দেয়নি। শেষমেশ ভোরের দিকে গিয়েই তার চোখে ঘুম নেমে এসেছিলো।
আলিশা আর কিছু না বলে ডোরাকে বিছানায় রেখেই চলে এসেছে। বাকিটা এখন ডোরা নিজেই করে নেবে।
বর্তমানে, খান বাড়ির সকলে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে আছে। অপেক্ষা শুধু আরহাম এবং ডোরার।
এই বাড়ির অলিখিত নিয়ম – সকালের নাস্তা সবাই একসাথে করবে। তাই একজনেরও দেরি হলে বাকিরা তার জন্য অপেক্ষা করে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
–কিছুক্ষণ পরেই, ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে ডোরাকে কোলে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো আরহাম।
সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ছাপটা তার চোখেমুখেই স্পষ্ট ; দুচোখ ফুলে লাল হয়ে আছে, ক্লান্তিতে উজ্জ্বল মুখটাও কেমন যেন মলিন দেখাচ্ছে।
ছেলের দিকে তাকিয়ে শাইনা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে তোর? এমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেন? রাতে ঘুম হয়নি?”
আরহাম একবার ডোরার দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো,
“না, এই ছোট মরিচটা কালরাতে একটুও ঘুমাতে দেয়নি।”
শাইনা আর কিছু বললেন না। ছেলের প্লেটে নাস্তা তুলে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
এদিকে, বাবার কোলে দিব্যি গুটিশুটি মেরে বসে আছে ডোরা। এক হাতে মুখে আঙুল পুরে গোল গোল চোখে একবার এদিকে তো আরেকবার ওদিকে তাকিয়ে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছে। মাঝেমধ্যে, আবার মায়ের দিকেও তাকাচ্ছে। গতকাল থেকে মাকে সে খুব কমই কাছে পেয়েছে।
আয়শা মুচকি হেসে নাতির দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন,
“আমার নানুভাই কী খাবে? কী দেবো?”
–তবে, নানুমার কথায় ডোরার যেন কোনো আগ্রহই নেই। বর্তমানে, তার সমস্ত কৌতূহল বাবার সামনে রাখা প্লেটের দিকে। ছোট্ট গুলুমুলু হাত দুটো বারবার প্লেটের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে ; থাবা বসাতে চাইলেও প্লেটটা একটু দূরে থাকায় কিছুতেই সে সেটার নাগাল পাচ্ছে না।
আরহাম পরোটার ছোট্ট এক টুকরো ছিঁড়ে ছেলের মুখে দিয়ে বললো – “আমাকে না জ্বালিয়ে এবার পরোটা খা।”
“উমম, পটা…পটা।”
“পটা না, বল পরোটা।”
বাবার সংশোধন যেন মোটেও পছন্দ হলো না ডোরার। সে সঙ্গে সঙ্গেই হাত-পা ছুড়ে তার জোর গলায় প্রতিবাদ জানালো – “পটা… পটা…”
–ডোরার এমন কিউট প্রতিবাদ দেখে উপস্থিত সকলে হেসে উঠলো।
ইজাজ সাহেব নাতির দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসলেন। ছোট্ট ডোরাকে দেখলেই তার বুকটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে ওঠে ; প্রথম নাতি বলে কথা! টানটা সবার তুলনায় একটু বেশি থাকবে স্বাভাবিক।
তিনি নাতির পক্ষ নিতে মুখ গম্ভীর করার ভান করে বললেন-
“না দাদুভাই, আপনার বাবা ভুল বলেছে। এটা পটাই ; আপনি যা বলবেন, সেটাই ঠিক।”
–দাদাভাইয়ের সমর্থন পেয়ে ডোরা আরো উচ্ছ্বসিত হলো। সে এবার বাবার কোলে থেকেই লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। আরহাম কোনোমতে তাকে সামলে রেখেছে।
আরশাদ একবার তাকে কোলে নিতে চাইলে ডোরা মুখ ফিরিয়ে নিলো। বাবার কোল ছেড়ে সে কোথাও যাবেনা।
এদিকে, আরহামের অবস্থা কাঁদো কাঁদো। গতকাল, বাড়ি ফেরার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সে বিশ্রাম নিতে পারেনি। আলিশা কেমনে সামলায় এই মিনি বুলডোজারকে!
আরহাম একবার অসহায় চোখে আলিশার দিকে তাকালো।কিন্তু, আলিশা যেন কিছুই দেখলো না। সে দিব্যি নিশ্চিন্তে নিজের নাস্তায় মন দিয়েছে।
আরহাম চোখ কটমট করে তার দিকে চেয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলো –
“ভোটকির ঘরের ভোটকি! আমাকে যুদ্ধের ময়দানে একা ফেলে রেখে নিজে নিশ্চিন্তে খাচ্ছে!”
ঠিক তখনই, ডোরা এক থাবায় প্লেটের সিদ্ধ ডিমটা চটকে একাকার করে ফেললো। তারপর একমুঠো ডিম নিজের গুলুমুলু হাতে তুলে নিয়ে মুখে পুরে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
“ডোরা! কী করছিস এসব?”
আরহাম এটা বলেই ডোরার হাতটা সরাতে গেলে শাইনা বেগম বাধা দিলেন।
“এই বয়সে বাচ্চারা এমনই করে। করতে দাও, কিছু হবে না।”
আরহাম আর কিছু বললো না।
কিছুক্ষণ পর ডোরা নিজের হাতে মাখামাখি করা ডিম বাবার মুখের সামনে এগিয়ে ধরলো।
“তুই খা। আমি খাবো না।”
ডোরা আবারও জোর করে হাত বাড়িয়ে দিলো।
“দোরা… দিম…”
“ডোরা যে ডিম..সেটা আমি জানি।”
“আ..উউ..আ।”
“না, আমি খাবো না। হাত সরা।”
–বাবা তার হাতের ডিম না খাওয়ায় ডোরা হাত-পা ছুড়ে রীতিমতো প্রতিবাদ করা শুরু করে দিলো। শেষমেশ, বাধ্য হয়ে আরহাম তার হাতটা মুখের কাছে এনে ডিম খাওয়ার ভান করতেই ডোরা খুশি হয়ে নিজের পা দাপিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলো।
–টেবিলে বসে থাকা সবাই ক্ষনে ক্ষনে তাকিয়ে দেখছে বাবা-ছেলের এই ছোট্ট যুদ্ধ।
–আরহাম ঠিকমতো খেতে পারছেনা দেখে ; আয়শা একবার আলিশাকে বললেন,
“ডোরাকে কোলে নাও, আলিশা।”
কিন্তু, আলিশা নির্বিকার ; যেন কথাটাই শোনেনি। নিজের নাস্তা নিয়েই ব্যস্ত রইলো সে।
আরহাম জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে এক চুমুক দিতেই ডোরা সেটা কাড়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে…
“ডাও… ডা…ও..”
“এটা তুই খেতে পারবি না।”
বলেই আরহাম আরেক চুমুক খেলো।
–হঠাৎ, ডোরা বাবার দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়ে বললো,
“মামা… ডাও…”
–‘মামা’ শব্দটা কানে আসতেই আরহামের মুখভর্তি জুস ছিটকে বেরিয়ে এলো।
–মুহূর্তের জন্য পুরো টেবিল নিস্তব্ধ। সবাই বিস্ময়ে ডোরার দিকে তাকিয়ে আছে। আর এক কোণে বসে থাকা আলিশা ঠোঁট চেপে হাসছে। এতক্ষণ ধরে, সে যেন এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিলো।
আরহাম হতবাক চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
“কী বললি? আরেকবার বল তো।”
ডোরা নিষ্পাপ ভঙ্গিতে আবারও বললো –
“মামা…”
আরহাম কিছু বলার আগেই মেহরোজা আক্তার শুধালেন,
“ও আরশাদ, পোলাডারে তোর কোলে নে। মনে অয়, আপন মামারে খুঁজতাছে। তাই ‘মামা’ বইলা ডাকতাছে।”
–দাদির কথা শুনে আরশাদ ছোঁ মেরে ডোরাকে কোলে তুলে নিলো।
“আমার মামাটা বুঝি আমাকে খুব মিস করছিলো? এইতো, মামা কোলে নিয়েছি। এখন অনেক আদর করবো।”
কিন্তু, বাবার কোল ছাড়া হতেই ডোরা গলা ছেড়ে কেঁদে উঠলো। দুই হাত বাড়িয়ে আরহামের দিকেই ছটফট করতে লাগলো।
“মামা… দাইই…”
–এবার সত্যিই উপস্থিত সকলে বিষম খেলো।
নিজের বাপকেই কিনা “মামা” বলে ডাকছে!
–আরহাম সামনে থাকা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে এক ঢোকে পুরো পানি শেষ করে ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“কে মামা?”
ডোরা দুই হাত আরও বাড়িয়ে দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো – ” মামা… কুলে দাই…”
আরশাদের কোলে তখন ছোট্ট এক যুদ্ধ বেঁধে গেছে। ডোরাকে আর সামলাতে না পেরে সে হেসে আরহামের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
“এই যে নিউ মামা, আপনার ছেলেকে কোলে নিন।”
আরহামের চোখ কপালে উঠে গেছে বিষ্ময়ে।
“কে মামা? কার মামা? কোথাকার মামা? ডোরা… বাবা বল, বাবা…”
কিন্তু, ডোরা একই সুরে আগের মতো শুধু বলেই যাচ্ছে –
“মামা… দাই…”
আরহামের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আর একটু হলেই সে জ্ঞান হারাবে। গতরাতেও তো, এই ছোট মরিচ কত কিউট তাকে করে ‘বাবা’ বলে ডেকেছে! তাহলে, হঠাৎ আজ কী এমন হলো?
–গতরাতের কথা মনে পড়তেই আচমকা তার মাথায় বজ্রপাতের মতো একটা বিষয় এলো। কাল রাতেও তো ডোরা তাকে “গন্ডার” বলে ডেকেছিলো!
নিশ্চয়ই, এসবের পেছনে ওই ভোটকির হাত আছে।
–গন্ডার বলেছে…সেটা না হয় কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে মামা! নিজের ঔরসজাত সন্তানই কিনা তাকে মামা বলে ডাকছে! এ কেমন অবিচার? এটাও কি তবে আলিশার নতুন কোনো কারসাজি?
–কটমট দৃষ্টিতে আলিশার দিকে তাকালো আরহাম। আর আলিশা? সে নির্বিকার মুখে স্যান্ডউইচে কামড় বসাচ্ছে আর মিটিমিটি হেসে আরহামের দিকে তাকাচ্ছে।
দাঁতে দাঁত চেপে আরহাম বললো,
“লিশা…আমাকে মামা ডাকতে কি তুই শিখিয়েছিস?”
“হ্যাঁ।” – আলিশা একটুও না ঘাবড়ালো না।
মেয়ের এমন নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তিতে আয়শা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।
“আলিশা! এটা কী করেছো তুমি? বাবাকে কিনা মামা ডাকতে শিখিয়েছো বাচ্চাকে?”
“মামাকে তো মামাই বলবে, মাম্মা।”
“আলিশা!” আয়শা চিল্লিয়ে উঠলেন।
আরহাম কাঁদতে থাকা ডোরাকে বুকে জড়িয়ে আদর করতে লাগলো। বাবার বুকের উষ্ণতা পেতেই ডোরা কান্না থামিয়ে পিটপিট করে একবার মুখের দিকে তাকালো তারপর আবার বাবার বুকেই মুখ গুঁজে দিলো।
আরহাম অসহায়ের মতো বললো –
“লিশা… সবকিছুর একটা সীমা আছে। আমার ছেলে আমাকে মামা ডাকছে!”
“তুমি তো মামাই ; তাই ডাকছে।”
“আমার আপন আন্ডা কবে থেকে আমার ভাগ্নে হয়ে গেলো?”
“যেভাবে আমি তোমার বোন হই ; মায়ের ভাইকে তো মামাই বলে। আমি যেহেতু তোমার বোন তাহলে আমার বাচ্চা তোমাকে মামা বলেই ডাকবে। ব্যাপারটা খুব সিম্পল।”
“আলিশা! এক থাপ্পড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো তোর।”
–মেয়েকে এমন কথা বলাতে নিয়াজ সাহেব রীতিমতো গর্জে উঠলেন।
“আমার মেয়ের গাল ফাটানোর আগে আমি স্কেল দিয়ে মেরে তোমার পাছা লাল করে দেবো।”
সবার সামনে শ্বশুরের এমন কথায় আরহাম বেশ অপমানিত বোধ করলো।
” আপনার কী লজ্জা-শরম নেই? মেয়ের জামাইয়ের পাছায় হাত দিতে চান?”
নিয়াজ সাহেব ঠোঁট বাঁকিয়ে বিদ্রুপ করে বললেন,
“মেয়ের জামাই হওয়ার আগে আমি তোমার চাচা। ছোটবেলায় তোমার কত ডাইপার বদলেছি, সেই হিসাব আছে?”
“ডাইপার তো আমিও আপনার মেয়ের কম বদলাইনি। কিন্তু, এখন সে আমার বাচ্চার মা। সম্পর্ক বদলে গেলো একটি মুহূর্তে। তাই পুরোনো সম্পর্ক ধরে আর জেরা করবেন না, শুশুউউউ আব্বা…”
–আরহামের এমন লাগামছাড়া কথায় নিয়াজ সাহেব খুক খুক করে কেশে উঠলেন।
“অসভ্য ছেলে।”
“অসভ্য না হলে কী আপনি নানা ডাক শুনতে পারতেন?”
ঠিক তখনই, ডোরা আরহামের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও ডাকলো – “মামা… মামা…”
–আরহামকে জব্দ হতে দেখে নিয়াজ সাহেবের মুখে যেন একরাশ পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।
আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো –
“এই আন্ডা, চুপ! তোর বাপ আমি… তোর মামা না!”
বাবার ধমকে ডোরা তার ফোলা ফোলা গাল আরো ফুলিয়ে ফেললো।
“মামা… মামা…”
–হাল ছেড়ে দিয়ে আরহাম এবার করুণ মুখে আলিশার দিকে তাকালো।
“ভোটকি… এখনই ছেলেকে বাবা ডাকতে শেখা।”
আলিশা টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে নির্বিকার গলায় জবাব দিলো – “মাফ করবেন, ভাইয়া। আমার ছেলে তার মামাকে মামা বলেই ডাকবে।”
কথাটা বলেই সে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডাইনিং রুম ত্যাগ করলো।
ডোরা যেন আজ বাবার গায়ের সাথেই সেঁটে গেছে।
সকাল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আরহামের কোল ছাড়ার নাম নেই। কোলে থাকলেই শান্ত আর নামানোর চেষ্টা করলেই গলা উঁচিয়ে কান্না শুরু।
এদিকে, আরহামের ক্লাস আছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে অথচ ছেলেকে কারও কাছে রেখে যাওয়ার উপায় নেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজও আলিশা ইচ্ছে করেই ডোরাকে কোলে নিচ্ছে না।
আরহাম অসহায়ের মতো একবার ছেলের দিকে তাকালো। কী করবে, কিছুই ভেবে পাচ্ছে না সে।
–ডোরা দুই হাত দিয়ে বাবার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। যেন একটু ছাড়লেই বাবা উধাও হয়ে যাবে।
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“বাপ আমার… এবার ছাড় আমাকে।”
“না… নানাই…”
“ছেড়ে দে আমায়। ছোট মরিচের ঘরের ছোট মরিচ।”
ডোরা রাগান্বিত দৃষ্টিতে বাবার দিকে চেয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে আঙুল উঁচিয়ে বললো –
“আতা… তা… তাইত…”
“তোকেও তাইত!”
–বাবার মুখে “তাইত” শব্দটা শুনেই ছোট্ট ডোরা ঠোঁট উল্টে ফেললো। মুখভঙ্গি এমন যেন আর এক সেকেন্ড দেরি করলেই সে কান্নায় ভেঙে পড়বে।
–ছেলের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে আরহাম আলতো করে ডোরাকে বুকে টেনে নিয়ে গালে আদর করে দিলো।
বাবার আদর পেতেই মুহূর্তেই খুশি হয়ে গেলো ডোরা। সে হাত দিয়ে বাবার হাত আকড়ে ধরে তার বুকে মুখ গুজে দিলো।
“একদম আহ্লাদ দেখাবি না, পুঁটি মাছ। একটু আগেই কিন্তু আমাকে মামা বলে ডেকেছিস। আমি কিছুই ভুলিনি।”
ডোরা নিষ্পাপ মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে আবারও বলে উঠলো – “মামা… মামা…”
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেললো।
“আবার মামা? শালার মামা!”
–ঠিক তখনই, আরশাদ আরহামের রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। “শালার মামা” কথাটা কানে আসতেই সে এক দৌঁড়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“এই শালা! তুই আমাকে গালি দিলি কেন?”
“তোমাকে আবার কবে গালি দিলাম, ব্রো?”
“এইতো একটু আগেই না বললি, শালার মামা! আর ডোরার মামা তো আমিই।”
“তুমি আমার শালা, আমি তোমার শালা… দুজনে মিলে গলায় দেবো গরুর মালা।”
আরশাদ চোখ ছোট করে তাকালো।
“ফাজলামো করছিস?”
“ফাজলামো আমি না, তোমার বোন শুরু করেছে।”
“একদম উচিত শিক্ষা দিয়েছে তোকে।”
“তাই বলে নিজের বাচ্চাকে দিয়ে বাপকে মামা ডাকাবে?”
–দুজনের কথার মাঝেই ডোরা আবারও উচ্ছ্বাসিত গলায় ডেকে উঠলো – “মামা… মামা…”
–ছেলের মুখে আবারও “মামা” ডাক শুনে আরহামের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে এলো। আরশাদ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে হো হো করে হেসে ফেললো।
আরহাম বিরক্ত হয়ে আঙুল তুলে দরজার দিকে ইশারা করে বললো – “আমার রুম থেকে এক্ষুনি বের হও।”
–আরশাদ অবশ্য যাওয়ার পাত্র নয়। তবে, সে হাসতে হাসতেই দরজার বাইরে যেতে যেতে ছন্দ মিলিয়ে গেয়ে উঠলো –
“মামা, মামা…
ডোরা পেয়েছে নতুন মামা,
সবাই মিলে নতুন মামার গলায় দেবো
ফুলের বদলে গরুর মালা!
মামা, মামা…
ডোরা পেয়েছে নতুন মামা…”
আরহাম ছেলেকে সেরেলাক খাইয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিয়েছে।এখন, তার জরুরি কাজ আছে। এভাবে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। আলিশার এখন ভ্যাকেশন চলছে তবে আরহামের ভার্সিটি খোলা।
–সে কোনো উপায় না পেয়ে ডোরাকে কোলে নিয়েই দ্রুত পা বাড়ালো আলিশার খোঁজে।
আলিশার রুমের সামনে এসে আরহাম থামলো। দরজাটা আধখোলা। ভেবেছিলো, আলিশা নিশ্চয়ই ভেতরেই আছে। তবে, রুমে ঢুকে দেখলো কোথাও আলিশা নেই।
–সে আর দেরি না করে ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখলো। কিন্তু না কোথাও আলিশা নেই! এবার যেন,
আরহামের কপালে ভাঁজ পড়লো।
শেষমেশ সে নীলার রুমে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো-
“নীলা, লিশা কোথায়?”
“পুতুল তো একটু আগেই তার ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরতে গিয়েছে।”
–কথাটা শুনে আরহামের বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। আলিশা বাড়ির বাইরে গিয়েছে অথচ একবারও তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলো না? অন্তত একবার হলেও তো তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতো!
–দেরি না করে সে আলিশার নাম্বারে কল দিলো।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
কিন্তু না, ওপাশ থেকে কল রিসিভ হচ্ছেনা।
আরহাম এবার বাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করলো।
“আলিশাকে কোথায় নামিয়েছো?”
“স্যার, ম্যাডাম তো আজ বাড়ির গাড়িই নেননি।”
এই কথা শুনে যেন আরহামের ভেতরের অস্থিরতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।
শেষে, মেজাজ হারিয়ে সে পুরো বাড়িতে একদফা চিৎকার চেঁচামেচি করে ফেলেছে ; কেন তাকে জানানো হয়নি? বাড়ির সকলে কোথায় ছিলো?
এদিকে, বাবার গলা উঁচু হতে দেখেই ডোরার ছোট্ট মুখটা কেমন মিইয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর থেকে ডোরাও মায়ের খোঁজ শুরু করলো।
“মাম… দাই…””
“মাম দাই…ইয়াম ইয়াম।”
–আরহাম নিজের রাগটাকে কোনোমতে চেপে রেখে ডোরাকে কোলে নিয়ে গার্ডেনের দিকে চলে গেলো ; হয়তো খোলা হাওয়ায় থাকলে বাচ্চাটার মনটা একটু ভালো হবে।
–এক হাতে ডোরাকে আগলে রেখে অন্য হাতে বারবার আলিশার নাম্বারে কল করে যাচ্ছিলো সে।
কিন্তু, প্রতিবারই একই ফল : আলিশা কল রিসিভ করছেনা। বরং, সে কল কেটে আরহামকে মেসেজ করলো –
“Don’t disturb me.”
–মেসেজটা পড়তেই আরহামের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
–আরহামের ফোনে একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছে আরাফ। আজ তার শুটিং ছিলো। কিন্তু, ডোরাকে একা রেখে যাওয়ার সাহস হলো না তার। আলিশা বাড়ির বাইরে, আর সেও যদি বেরিয়ে যায় তাহলে, মা-বাবা কাউকে না পেয়ে ছোট মরিচ পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলবে।
–অনেক কষ্টে একটু আগে হাঁটতে হাঁটতেই ডোরাকে ঘুম পাড়িয়েছে সে। এখন বাবার বুকের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট ডোরা।
কিন্তু,আরহামের চোখে ঘুম তো দূরের কথা। একফোঁটা স্বস্তিও নেই।
দুশ্চিন্তায় যেন তার মাথাটা ফেটে যাচ্ছে।
আলিশা এতক্ষণ কোথায়?
–বারবার ফোন করেও কোনো লাভ হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে সে নীলাকে দিয়ে কল করিয়েছিলো। আশ্চর্যজনকভাবে, নীলার ফোন রিসিভ করেছিলো আলিশা। সে শুধু এটুকুই বলেছে – “আমার ফিরতে দেরি হবে। ডোরার খেয়াল রেখো।”
তারপর আবার ফোন বন্ধ।
এদিকে, আরাফের কল এসেই চলেছে। ফোনের স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছে – “Araf is calling..”
স্ক্রিনটার দিকে তাকাতেই গত রাতের ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো আরহামের। ডোরা তার ফোনটা জোরে আছার মেরেছিলো। তবে, কার্পেটের ওপর পড়েছিলো বলে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তবুও, স্ক্রিনের এক কোণে ফাটল ধরেছিলো। সেই কোনের ভাঙা স্ক্রিনটা বারবার চোখে লাগছিলো তার।
তাই রাতারাতি নিজের পার্সোনাল সেক্রেটারি আনিসকে কল করে নতুন একটা ফোন আনিয়ে নিয়েছে সে।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর…
আলিশা বাড়িতে ফিরলো।
সে গিয়েছিল মিথির কাজিনের জন্মদিনের পার্টিতে। যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তার ছিলো না। কিন্তু, আজ যেন জেদটাই বেশি কাজ করেছে তার। তাই শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলো।
বাড়িতে পা রাখতেই আয়শা বেগমের রাগী কণ্ঠ ভেসে এলো।
“দুধের বাচ্চাকে রেখে এভাবে বাইরে যেতে হবে কেন? আর গেলেও এতো দেরি কেন? তোমার কি একটুও কান্ডজ্ঞান নেই আলিশা?”
–আলিশা মাথা নিচু করে সব শুনলো। একটাও প্রতিবাদ করলোনা সে।
–আলিশা তো মা – তার নিজের ভেতরটাই তো অপরাধবোধে পুড়ছে। আরহামকে শাস্তি দিতে গিয়ে সে কি নিজের বাচ্চাকেই কষ্ট দিয়ে ফেলছে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
সকালের পর থেকে ডোরাকে আর দুধও খাওয়ানো হয়নি।
বাচ্চাটা কি কিছু খেয়েছে?
এই চিন্তায় তার বুকটা আরও ভারী হয়ে এলো।
না…আর নয়। যা হওয়ার হবে। তবে, নিজের ছেলেকে আর এক মুহূর্তের জন্যও নিজের থেকে দূরে রাখবে না সে।
–দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো আলিশা।
কিন্তু, আলমারি খুলতেই নতুন বিপত্তি। তার পড়ার মতো একটা জামাও নেই!
তার সব কাপড়ই এখন আরহামের রুমে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় যে ড্রেসটা খুলে গিয়েছিলো সেটাও সম্ভবত মিনু রুম গুছাতে এসে ধোয়ার জন্য দিয়ে দিয়েছে।
–আলিশা হতাশ হয়ে আলমারির ভেতর তাকিয়ে রইলো।
যা আছে, সবই বিয়ের আগের কাপড়।
এখন সেগুলোর একটাও তার গায়ে হবে না। না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
বিয়ে… তারপর প্রেগন্যান্সি।
এই দীর্ঘ সময়ে তার শরীরে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো রোগা, পাঠকাঠি মেয়েটা আর নেই।
শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে আলমারির এক কোণে ভাঁজ করে রাখা আরহামের একটি টি-শার্ট বের করলো সে।
টি-শার্টটা গায়ে দিতেই হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
এটা অনেক পুরোনো টি-শার্ট।
তাদের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের পর, সবার থেকে লুকিয়ে আরহাম যখন গভীর রাতে চুপিচুপি তার রুমে আসতো এটা তখনকার টি-শার্ট।
আরহামের এমন আরও বেশ কয়েকটা পুরোনো কাপড় আজও তার আলমারিতে রাখা আছে।
আলিশা সব যত্ন করে রেখে দিয়েছে। কিছুই ফেলেনি সে। থাক না কিছু জিনিস স্মৃতি হয়ে।
আলিশা ধীর পায়ে আরহামের রুমে প্রবেশ করলো।
ডোরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে বাবার বুকের ওপর। আর আরহাম? সে মাথাটা বেডের হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে, চোখের ওপর এক হাত রেখে নিশ্চুপ বসে আছে। রেগে আছে নাকি শান্ত ; কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা।
দরজা খোলার শব্দে আরহাম হাত সরিয়ে তাকালো। দেখলো, আলিশা এসেছে।
তবে, কোনো প্রতিক্রিয়া সে দেখায়নি।
আলিশা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ডোরাকে কোলে নিতে হাত বাড়াতেই আরহাম খপ করে তার হাত চেপে ধরে বাধা দিলো।
কোনো কথা না বলে সে আলতো করে ডোরাকে নিজের বুক থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো ; তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আবারও আলিশার পথ আটকে দাঁড়ালো।
আলিশা দ্বিতীয়বার ডোরার দিকে এগোতেই আরহাম পেছন থেকে তার হাতটা মুচড়ে ধরে ফেললো।
“আহ! ব্যথা পাচ্ছি আমি… হাত ছাড়ো।”
আরহামের কণ্ঠটা অস্বাভাবিক শান্ত অথচ ভেতরে জমে থাকা রাগ স্পষ্ট।
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“বাইরে।”
“কাকে বলে গিয়েছিলি?”
“আগে হাত ছাড়ো। ডোরার কাছে যাবো। গতকাল থেকে আমার ছেলে আমার বুকে আসেনি।”
“ছেলে? বাহ! এখন ছেলের কথা মনে পড়ছে? সারাদিন কোথায় ছিলো এই চিন্তা?”
“আমার বাচ্চা… আমি বুঝবো।”
কথাটা শেষ করার আগেই আরহাম তার অন্য হাতটা দিয়ে আলিশার কোমরে শক্ত করে চেপে ধরলো ; একপ্রকার নখ দাবিয়ে দিলো।
“আরহাম!”
ব্যথায় আলিশা কেঁপে উঠতেই আরহাম হাতের চাপ আরও বৃদ্ধি করলো।
“চুপ… একদম চুপ। আগে বল, কোথায় গিয়েছিলি?”
“তোমাকে বলা প্রয়োজন মনে করি না।”
“তাহলে কাকে বলা প্রয়োজন মনে করিস?”
“সেটা বলতে আমি বাধ্য নই।”
“অবশ্যই বাধ্য। আমার বিয়ে করা বউ কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে ; সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”
“তবে, আমার অধিকারের বেলায়?”
“তোর কোন অধিকার অপূর্ণ রেখেছি আমি? যা চাস, তা চাওয়ার আগেই এনে দেই। যেভাবে আবদার করিস, সেভাবেই পূরণ করি।”
“আমি সেসবের কথা বলছি না…”
আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে আলিশার চোয়াল ধরে বললো-
“তো আর কিসের অধিকার? সব অধিকার তোকে দিয়েছি আমি। তুই কি কোনোভাবে ফিজিকাল…সেটা হলেও তোকে বিছানায় সুখে রেখেছি আমি। নাকি তোর কম পড়েছে? কম পড়লে বল পুষিয়ে দিচ্ছি আ…”
“আরহাম!”
সর্বশক্তি দিয়ে আরহামের বুকের ওপর ধাক্কা দিলো আলিশা।
“মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ! আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলার সাহস কীভাবে পাও তুমি?”
আরহামও আর নিজের রাগ চেপে রাখতে পারলোনা।
“যেভাবে তুই আজ আমাকে না বলে বের হয়েছিস ঠিক সেভাবেই। তোর একবারও কলিজা কাঁপল না? দুধের বাচ্চাটাকে রেখে, আমাকে কিছু না জানিয়ে বের হতে?”
“আমার বাচ্চার খেয়াল আমার আছে।”
“তাই? তাহলে সারাদিন কোথায় ছিলি? আমার ছেলে দুধের জন্য কেঁদেছে। কেন কাঁদবে ও? আমার ছেলেকে নিয়ে একফোঁটা অবহেলাও আমি সহ্য করবো না, আলিশা।”
আলিশার চোখে রাগ আর কষ্ট একসাথে ভেসে উঠলো।
“ওর দায়িত্ব কি শুধু আমার? তোমার নেই?”
“আছে বলেই তো ওকে ফেলে কোথাও যাইনি।”
“তুমি ইচ্ছে ক…”
আলিশার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরহাম আবারও একই প্রশ্ন করলো –
“কোথায় গিয়েছিলি?”
“বলেছি তো, তোমাকে বলতে আমি বাধ্য নই।”
“আলিশা…” আরহাম গর্জে উঠলো।
“তোমার বেলায় সবকিছুর নাম অধিকার, আর আমার বেলায় শুধু আবদার আর ফিজিক্যাল নিড! তাই তো?”
কথাটা বলেই এক মুহূর্ত থামলো সে।
তারপর আবারও বললো –
“তুমি কোথাও গেলে আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করো না। জিজ্ঞেস করলে বলো, “তোর না জানলেও হবে।” কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবারও জানাও না। নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারো। অথচ আমি একবার একই কাজ করলেই সেটা দোষ হয়ে যায়?”
আরহাম নিশ্চুপ।
আলিশা ভেজা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আবার বললো-
“তুমি যে অধিকার আমার ওপর খাটাও, সেই একই অধিকার আমাকে কেন দাওনি?”
“তোমার বাচ্চাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য রেখে বাইরে গিয়েছি বলেই আমি অবহেলা করেছি! আর তুমি মাঝরাতে বাইরে থেকে ফিরলেও প্রশ্ন করলে বলো, “তোর না জানলেও হবে।” এটাই তোমার দেওয়া অধিকার?”
শেষ কথাটা বলতে বলতেই কেঁদে উঠলো আলিশা। এতদিনের জমে থাকা অভিমান, কষ্ট যেন একসঙ্গে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো।
আরহাম নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আলিশার প্রতিটি কথাই যেন তীরের মতো এসে বিঁধছে তার বুকে। আলিশা কোনো মিথ্যে বলেনি।
বরং, এতদিন সে নিজেই বুঝতে পারেনি ; নিজের অজান্তেই কতটা একপাক্ষিক হয়ে উঠেছিলো আরহাম। আর আলিশাও কখনো এভাবে নিজের ভেতরের কথাগুলো খুলে বলেনি। অপরাধবোধ চেপে ধরলো তাকে।
সে ধীরে ধীরে কান্নারত আলিশার দিকে এক পা বাড়ালো।
কিন্তু, আলিশা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়েছে।
“প্লিজ… আমাকে একটু সময় দাও। কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই।”
আরহাম আর এক পা-ও এগোলো না।
সে বুঝলো, এই মুহূর্তে কোনো ব্যাখ্যা কিংবা কোনো যুক্তিই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করবে না। বরং কথা বললে এখন তা আরো বাড়বে।
–আরহাম নিঃশব্দে একবার ঘুমন্ত ডোরার দিকে তাকালো।
তারপর খুব ধীরে আলিশার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে গেলো কামরা থেকে।
সেই রাতে কাঁদতে কাঁদতেই ডোরাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আলিশা।
অন্যদিকে, আরহাম বসে আছে আরাফের বাসায়।
একের পর এক ওয়াইনের গ্লাস খালি করে যাচ্ছে সে। কিন্তু নেশার চেয়েও বেশি তাকে গ্রাস করে আছে অপরাধবোধ।
বারবার কানে ভেসে আসছে আলিশার বলা কথাগুলো।
“তুমি যে অধিকার আমার ওপর খাটাও, সেই একই অধিকার আমায় কেন দাওনি?”
প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতর ধারালো ছুরির মতো বিঁধেছে।
সে এতদিন কেন বিষয়গুলো এভাবে ভেবে দেখেনি?
ডোরাকে মাত্র একটা দিন সামলাতেই তার হিমশিম খেতে হয়েছে। অথচ আলিশা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বিন্দুমাত্র অভিযোগ না করে সবকিছু সামলে এসেছে।
আরহাম যতটুকু সম্ভব সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছে তবে, কিন্তু, উঠতি বয়সী আরহামের চার দেওয়ালের ভেতর যেন মন টিকতোনা।
–অপরাধবোধে নিজের চুল নিজের হাতেই খামচে ধরলো, আরহাম। পাশ থেকে আরাফ তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বললো – “আমি তো আগেই সাবধান করেছিলাম, বন্ধু। সেদিন যদি আমার কথাটা শুনতিস, তাহলে আজ ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না।”
কিন্তু, আরহাম যেন কিছুই শুনছে না।
সে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারও গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে দিলো।
এবার আরাফ আর বসে থাকতে পারলো না। দ্রুত গ্লাসটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে শুধালো –
“পাগল হয়ে গেছিস নাকি? প্রায় এক বোতল শেষ করে ফেলেছিস। আর এক ফোঁটাও খাবি না। এতে সমস্যার সমাধান হবে না, উল্টো তোরই ক্ষতি হবে।”
আরহাম অসহায় দৃষ্টিতে আরাফের দিকে তাকালো।
“আজ বাধা দিস না, আরাফ… আমার একটু শান্তি দরকার। লিশার কান্নাভেজা মুখটা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না।”
–প্রিয় মানুষটার নাম অন্য একজন পুরুষের মুখে শুনে আরাফের বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠলো।
একসময় সেই নামটা নিজের জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেখার স্বপ্ন দেখেছিল সে।
কিন্তু, পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো আরাফ।
কারণ, যে মানুষটা আজ সেই নাম উচ্চারণ করছে, সে আলিশার স্বামী আর তার জীবনের চেয়ে প্রিয় বন্ধু…
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আরাফ বললো –
“মাফ চেয়ে নে।”
“মাফ করবে আমায়?”
“মানুষ মাত্রই ভুল। চেষ্টা করে দেখ।”
আরহামের আর কোনো জবাব দিলোনা।
মদের নেশা আর মানসিক ক্লান্তি মিলেমিশে তাকে সম্পূর্ণ অবসন্ন করে ফেলেছে।
তার মাথাটা ধীরে ধীরে আরাফের কাঁধে হেলে পড়লো।
আরাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে সামলে নিলো।
পরদিন সকালে…
ঘুম ভাঙতেই আলিশার মনে হলো, চারপাশটা যেন অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ ফুলের সুবাসে ভরে আছে। সুবাসটা এতটাই মিষ্টি যে, কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করেই সে সেই ঘ্রাণ অনুভব করতে লাগলো।
ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো সে।
চারপাশে চোখ বুলাতেই বিস্ময়ে তার চোখজোড়া বড় হয়ে এলো। এ কী!
যেদিকে তাকায়, সেদিকেই শুধু ফুল আর ফুল। পুরো রুমটাই যেন রঙিন ফুলের সাজে নতুন করে সেজে উঠেছে।
পাশে তাকাতেই খেয়াল করলো, ডোরা বিছানায় নেই।
আলিশা বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই আরও একবার অবাক হলো। মেঝেজুড়েও সারি সারি ফুলের পাপড়ি বিছানো যেন সেগুলোই তাকে কোথাও নিয়ে যেতে পথ দেখাচ্ছে।
সবকিছুই যেন তার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।
আলিশার অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা গেলো।
ফ্রেশ হওয়ার জন্য কাপড় নিতে ড্রেসিং রুমে ঢুকতেই আরেক দফা চমকে উঠলো সে।
–ড্রেসিং রুমের বিশাল আয়নাজুড়ে বড় বড় অক্ষরে অসংখ্য “SORRY” লেখা। তার চারপাশে সাঁটানো রয়েছে ছোট ছোট কয়েকটি রঙিন নোট।
কৌতূহল নিয়ে আলিশা একে একে নোটগুলো খুলে পড়তে শুরু করলো।
নোট : এক
“আমার মিনি গন্ডারের মাম্মাকে তার পাপার পক্ষ থেকে অনেকগুলো স্যরি।”
নোট : দুই
“এই অধমটাকে কি একটুখানি মাফ করা যায়?”
নোট : তিন
“স্যরি অ্যাকসেপ্ট না করলে কিন্তু ডোরার বাবা অনেক রাগ করবে… সঙ্গে ডোরাও!”
নোট : চার
“এই যে আমার ফুলটুসি বউ! মুচকি মুচকি না হেসে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে ছাদে চলে আসুন।”
নোট : পাঁচ
“Once again… I am really sorry.”
একটার পর একটা নোট পড়তে পড়তে আলিশার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হলো।
গন্ডারটা যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে তাকে মানানোর, সেটা বুঝতে তার আর বাকি রইলোনা।
তবুও…
এত সহজে কি আর তাকে ক্ষমা করা যায়?
একটু শাস্তি তো গন্ডারের প্রাপ্য আছেই!
এই ভেবেই নোটগুলো বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আবারও মুচকি হেসে ফেলল আলিশা।
আরহাম সেই সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত। তবে, এবারের ব্যস্ততা তার পেশা, শুটিং কিংবা নিজের কাজ নিয়ে নয় বরং আলিশার রাগ ভাঙানোর ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা নিয়ে।
ভোরবেলা হুঁশ ফিরতেই আরাফের বাসাতেই শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিল সে। এরপর টানা দুই ঘণ্টা ধরে শুধু আলিশাকে নিয়েই পরিকল্পনা করেছে।
আলিশার সবসময় একটা অভিযোগ ছিলো ; এত বড় গায়ক হয়েও কেন আরহাম কখনো তার জন্য একটা গান লেখেনি?
এই বিষয়টা নিয়ে তাদের কত মান-অভিমানই না হয়েছে!
প্রতিবারই আরহাম একই কথা বলতো –
“তোর কথা চিন্তা করি বলেই তো তোর জন্য গান লিখি না।”
“এই! আমাকে নিয়ে আবার কিসের চিন্তা?”
আরহাম গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলতো –
“এই যে, আমার আদরের ভোটকির জন্য একটা গান লিখবো তারপর সেটা গেয়ে শোনাবো… এতে তো তুই আরও ফুলে যাবি, তারপর…”
“তারপর…তারপর?”
“তারপর যদি তুই বেলুনের মতো ফেটে যাস! তখন আমি আর ডোরা কী নিয়ে থাকবো? তাই তোর ভালোর জন্যই আমি তোর জন্য গান লিখি না।”
“গন্ডারররর!”
পুরোনো সেই কথোপকথনের কথা মনে পড়তেই আরহাম আপনমনেই হেসে ফেললো।
আজ সে ঠিক করেছে ; আলিশার বহুদিনের সেই ছোট্ট ইচ্ছেটা পূরণ করেই তার রাগ ভাঙাবে।
এদিকে, ছোট্ট ডোরা ফোলা ফোলা মুখ করে গম্ভীর দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
তার ভীষণ রাগ হয়েছে।
এতো সকালে বাবা কেন তাকে মায়ের বুক থেকে টেনে নিয়ে এসেছে? তার এত সাধের ঘুমটা নষ্ট হওয়ার কারনে ক্ষনে ক্ষনে সে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করছে।
তাই সুযোগ পেলেই সে ছোট্ট ছোট্ট পা দুটো দিয়ে আরহামের বুক বরাবর ঠুসঠাস লাথি মেরে নিজের প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
আরহাম যখনই তার গুলুমুলু পা দুটো ধরে থামানোর চেষ্টা করে অমনি ডোরা গলা ছেড়ে কান্না জুড়ে দেয়।
শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ ছেলের প্রতিটা লাথিই সাদরে গ্রহণ করতে হচ্ছে তাকে।
–এইসবের মাঝেই হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠলো।
একটা জরুরি কল।
এদিকের কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই আলিশার ঘুমও ভেঙে গেছে।
আরহাম নীলাকে ডেকে প্রায় জোর করেই ডোরাকে তার কোলে তুলে দিলো।
ডোরা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ শুরু করলো। কিন্তু এবার আর তাকে কোলে নিলো না আরহাম।
এখন নিলে এই ছোট মরিচ আর কোনো কাজই করতে দেবে না তাকে।
যাওয়ার আগে ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে হেসে বললো –
“আচ্ছা, আমাকে একটা টাটা দে তো, ডোরা।”
ডোরা মুখ ফিরিয়ে রইলো অভিমানে।
“কী হলো? তোকে না টাটা দেওয়া শিখিয়েছি? এবার দে দেখি… টাটা দে।”
ডোরা কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলো
তারপর হঠাৎ করেই নিজের গুলুমুলু একটা পা উঁচু করে আরহামের দিকে তাক করে পা নেড়ে দিব্যি “টাটা” দিলো।
–ডোরার এমন কিউট “টাটা” দেখে উপস্থিত সবাই একসাথে হেসে ফেললো।
আরহাম ডোরার রাগ বুঝতে পেরে উল্টো ঘুরে যেতে যেতে বললো –
“কাউকে বেশি দাম দিতে নেই ; বেশি দাম দিলে পরে সে আপনাকেই এমন ঠ্যাং দেখিয়ে টাটা দিবে।”
সকাল ১০টা…
সব আয়োজন শেষ।
এখন শুধু অপেক্ষা – আরশানের মাম্মার।
জীবনে অসংখ্য শো, কনসার্ট, এমনকি ইন্টারন্যাশনাল স্টেজেও পারফর্ম করেছে আরহাম। হাজার হাজার দর্শকের সামনে দাঁড়িয়েও কখনো তার গলা কাঁপেনি। অথচ আজ তার কেন যেন নার্ভাস ফিল হচ্ছে।
–তার ছোট মরিচের মায়ের রাগ কি ভাঙবে?
–খান বাড়ির বিশাল ছাদটা এমনিতেই চোখজুড়ানো সুন্দর। কিন্তু, আজ আরহাম সেটাকে যেন এক টুকরো রূপকথার রাজ্যে পরিণত করেছে।
চারপাশজুড়ে আলিশার প্রিয় রজনীগন্ধার সারি। তাদের মিষ্টি সুবাসে পুরো পরিবেশটা মোহময় হয়ে উঠেছে। ছাদের কাচের রিট্র্যাক্টেবল রুফটা টেনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাইরের দিনের আলো প্রায় ঢুকতেই পারছে না। কাচের নিচে চারদিকে ঝুলছে অসংখ্য ফেয়ারি লাইট, উষ্ণ সোনালি আলোয় পুরো ছাদটা যেন সন্ধ্যার আবহ ধারণ করেছে। আলো, ফুল আর হালকা বাতাসের মিশেলে জায়গাটা এতটাই অপার্থিব লাগছে যে, এক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাসই হয় না যে, বাইরে এখন দিনের বেলা!
–ছাদে এখন সকলেই উপস্থিত রয়েছে।
আরহামের বন্ধুদের পাশাপাশি এসেছে আলিশার বেস্টফ্রেন্ড দিহান আর মিথিও।
এদিকে, নীলা আলিশার চোখে নরম কাপড় বেঁধে ধীরে ধীরে তাকে ছাদের দিকে নিয়ে আসছে।
–ছাদে পা রাখতেই চারদিকের হালকা শব্দ তার কানে এসে ঠেকছে।
ঠিক তখনই, তার কানে ভেসে উঠলো আরহামের তোলা গিটারের প্রথম সুর।
–নীলা আলতো করে আলিশার চোখের বাঁধন খুলে দিয়েছে।
চোখ খুলেই কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে গেলো আলিশা।
বিস্ময়ে তার চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেছে!
“এসব কি? কখন করেছে?”
–কই সে তো কিছুই টের পায়নি!
ভাবনার মাঝেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরহামের ওপর।
–আলিশার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আরহাম মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিয়ে চিল্লিয়ে বললো –
“This one is for my Mrs.”
–কথাটা শুনেই চারদিক থেকে শিস, হাততালি আর উল্লাসে ফেটে পড়লো সবাই।
আরহাম চোখ সরালো না আলিশার দিক থেকে।
তারপর ধীরে ধীরে গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে শুরু করলো আলিশার জন্য লেখা তার নিজস্ব গান…
চুপ করে কেন সোনা,
তুমি কথা কেন বলছো না…
চুমু দিয়ে কি রাগ ভাঙাবো?
তা একবার বলো না…
চুপ করে কেন সোনা,
তুমি কথা কেন বলছো না…
চুমু দিয়ে কি রাগ ভাঙাবো?
তা একবার বলো না…
তুমি রাগলে আমি মানাবো,
আমি রাগলে তুমি মানাবে…
এভাবে একটু একটু করে
#তোমার_আমার_গল্প আগাবে…
চুপ করে কেন সোনা…
এখনও কি কথা বলবে না…?
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৭ (২)
গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো।
আর আলিশা?
সে এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখের কোণে চিকচিক করছে অস্রু।
–আরহাম ধীরে ধীরে নীলার কোলে থাকা ডোরাকে নিজের কোলে তুলে নিলো। তারপর, অন্য হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা নিয়ে সবার সামনে আলিশার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো।
“আমার ভোটকি… আমার ছোট মরিচের ধানিলঙ্কা মাম্মা… এক গন্ডারের সুন্দরী বউ… এই অধমটাকে কি একটুখানি মাফ করা যায়?”
