Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১১
মারিয়াম ফুল

সকালের মায়াবী রোদটা জানালার ভারী পর্দা ভেদ করে মেহেরের মুখে এসে পড়ল। মেহের চোখ মেলতেই দেখল সে বিছানায়, আর রুদ্র সেই সরু সোফাটায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। দীর্ঘদেহী হওয়ার কারণে বেচারা সোফায় ঠিকঠাক আঁটছে না, এক পা সোফার বাইরে ঝুলে আছে। হঠাৎ ঘুমের ঘোরে রুদ্র ওপাশ ফিরতেই শরীরটা সোফা থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। মেহের একদম বিদ্যুৎবেগে বিছানা থেকে নেমে রুদ্রকে আটকাতে গিয়ে তার খুব কাছে চলে এল।
মেহেরের হাত দুটো রুদ্রর চওড়া কাঁধ চেপে ধরল যাতে সে ফ্লোরে আছড়ে না পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে রুদ্রর চোখ খুলে গেল। জানালার ওপাশ থেকে আসা ভোরের আলো মেহেরের কালো চোখের মনিতে তির্যকভাবে পড়ছে। এই প্রথম মেহের এত কাছ থেকে রুদ্রকে দেখল। রুদ্রর সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্য মাখানো ‘চিল’ মেজাজটা এখন নেই, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি মুখে ছেয়ে আছে।

রুদ্র কয়েক সেকেন্ড পলকহীনভাবে মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেরের হার্টবিট তখন ড্রাম পিটছে। সে অপ্রস্তুত হয়ে যেই সরে যেতে চাইল, রুদ্র চট করে মেহেরের কবজিটা ধরে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফিরে এল। সে মেহেরকে নিজের দিকে একটু টেনে নিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল
“কী ব্যাপার মিস অ্যারোফোবিয়া? আকাশ থেকে পড়ার ভয় পাও বলে কি এখন মাটিতে পড়া মানুষকে জাপ্টে ধরছো? নাকি সকাল সকাল ক্যাপ্টেনের সাথে ‘ক্লোজ ল্যান্ডিং’ করার নতুন কোনো বাহানা খুঁজছো?”
মেহের ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে দাঁড়াল। মেহেরের বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “আ .. আপ… আপনি পড়ে যাচ্ছিলেন, তাই আমি জাস্ট সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। তার ছাড়া কিছু না।

রুদ্র সোফায় উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙল। তার অবিন্যস্ত চুল আর খালি গায়ের পেশিগুলো ভোরের আলোয় আরও স্পষ্ট। সে তাচ্ছিল্যের সুরে হাসল। “সাহায্য? নাকি সুযোগ? চৌধুরী বাড়ির বউরা বুঝি সকালেই বরের ওপর এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে? ডেম ইট মেহের!
মেহের আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে আর লজ্জায় তার চোখ ভিজে এল। সে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নেমে এল।
নিচে দাদি সুলতানা চৌধুরী মেহেরকে আদর করে নিজের কাছে বসালেন। আলমারি থেকে একটা পুরনো কাঠের বক্স বের করে একজোড়া শাহি নকশার সোনার বালা মেহেরের হাতে পরিয়ে দিলেন। দাদি স্নেহের সুরে বললেন, “মেহের, বিয়ের প্রথম সকালে এটা আমাদের বাড়ির নিয়ম। আজ থেকে এই বাড়ির সবকিছুর ওপর তোমার সমান অধিকার। রুদ্র একটু জেদি, একটু উড়নচণ্ডী—কিন্তু মানুষটা খারাপ না। তুমি ওকে আগলে রেখো।”
একটু থেমে দাদি মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে আবার বললেন, “আর হ্যাঁ, চৌধুরী বাড়ির একটা নিয়ম আছে—বিয়ের প্রথম সকালে বাড়ির নতুন বউকে নিজের হাতে কিছু একটা রান্না করতে হয়। যদি তোমার আপত্তি না থাকে…”

মেহের দাদির এই স্নেহমাখা আবদার ফেলতে পারল না। সে মৃদু হেসে উত্তর দিল, “না দাদি, আমি রান্না করব।”
দাদি খুশি হয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বললেন, “আমি রুদ্রকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। স্বামী-স্ত্রী মিলে একসাথে রান্না করলে ভালোবাসা বাড়ে। তোমরা দুজন মিলে কিছু একটা বানাও কেমন ।”
রুদ্রর নাম শুনে মেহের মনে মনে একটু ইতস্তত বোধ করলেও মুখে কিছু বলল না। ওদিকে রুদ্র সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কাল রাতের মেহেরের সেই ‘বাটার নাইফ’ দিয়ে ভয় দেখানোর কথা ভেবে মনে মনে হাসছিল। সে আপন মনে বিড়বিড় করল, “বড্ড অদ্ভুত তুমি মিস অ্যারোফোবিয়া!”
মেহেরকে সাহায্য করার পেছনে রুদ্রর মনের গভীরে যে এক অদৃশ্য উদ্দেশ্য কাজ করছে, উদ্দেশ্য ছাড়া ক্যাপ্টেন রাইহান চৌধুরী রুদ্র এক পা-ও এগোয় না।
রুদ্রর মা রেহানা চৌধুরী ছেলেকে ড্রয়িংরুমে দেখে স্নেহমাখা ধমকের সুরে বললেন, “রুদ্র, আজ বিকেলে মেহেরকে নিয়ে শপিংয়ে যাবি। বিয়ের আগে মেয়েটার ঠিকমতো হয়তো কোন কেনাকাটাই করতে পারে নি।
রুদ্রর কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে মুখটা একটু বাঁকা করে বলল, “আমি? আমায় কি যেতেই হবে মা? আজ একটু কাজ ছিল…”
কথাটা শেষ করার আগেই রুদ্রর বাবা হামজা চৌধুরী খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে গম্ভীর গলায় বললেন, “কাজ পরে হবে। বিয়ে করেছ যখন, বউয়ের শখ-আহ্লাদ মেটানো এখন তোমার প্রধান কাজ। তুমিই ওকে নিয়ে যাবে, এটাই আমার শেষ কথা।”

রুদ্র বাবার ওপর কথা বলার সাহস পেল না। দাদি ঠিক সেই মুহূর্তে সুযোগ বুঝে ফোড়ন কাটলেন, “যাবে, আমার দাদা ভাই নিশ্চয়ই যাবে। যাবে না ?
রুদ্র দমে গিয়ে ম্লান হেসে বলল, “আচ্ছা দাদা, নিয়ে যাব।”
দাদি এবার মিটিমিটি হেসে রুদ্রর কাঁধে হাত রাখলেন। “শপিং তো বিকেলে, এখন গিয়ে রান্নাঘরে মেহেরকে একটু সাহায্য কর তো দেখি। মেহের আজ প্রথম সকালের নাস্তা বানাচ্ছে। চৌধুরী বাড়ির প্রাচীন নিয়ম—বউ যখন প্রথম রাঁধবে, স্বামী তাকে সঙ্গ দেবে।
রুদ্র আকাশ থেকে পড়ল। সে চোখ কপালে তুলে বলল, “আমি? কিচেনে হেল্প করব? ইটস ইমপসিবল দাদি! তোমরা কি চাও আমি ওর আঁচল ধরে হাটি ?”
শেষমেশ দাদির চাতুর্যই জয়ী হলো। তার কথার জালে আটকা পড়ে রুদ্র বাধ্য হলো কিচেনের দিকে পা বাড়াতে, যেখানে মেহের একাই সব সামলাচ্ছিল।”
মেহের আজ একটা ছাই রঙের লম্বা ড্রেস পরেছে। রান্নাঘরের কাজের সুবিধার্থে সে তার লম্বা রেশমি চুলগুলো হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ওপরের দিকে একটা আলগা খোঁপা করে নিয়েছে। ওড়নাটা কাজের জন্য পাশের একটা চেয়ারে রাখা। কপালে দু-এক গাছি অবাধ্য চুল ঘামের বিন্দুতে লেপ্টে আছে, আর মেহের খুব মনোযোগ দিয়ে আটার মণ্ড তৈরি করছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রুদ্র রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। পরনে সাদা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট। রুদ্র নিঃশব্দে কাউন্টারে হেলান দিয়ে মেহেরকে দেখতে লাগল। মেহেরের এই ঘরোয়া আর অগোছালো রূপটা রুদ্রর কাছে বড্ড অচেনা। রুদ্রর সেই অতর্কিত আর অস্বস্তিকর চাহনি মেহেরের নজরে আসতেই সে চট করে ঘুরে দাঁড়াল।
রুদ্রর চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে মেহের অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে তড়িঘড়ি করে পাশের চেয়ার থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে মাথায় তুলে নিল। রুদ্রর ঠোঁটের কোণে তখন সেই চিরচেনা তাচ্ছিল্য মাখানো হাসি। সে এক পা এগিয়ে এসে মেহেরের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

রুদ্র নিচু স্বরে, মেহেরের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“কী হলো? আমাকে দেখে এত চমকে যাওয়ার কী আছে? নাকি সকাল সকাল নিজের এই ‘ন্যাচারাল লুক’টা আমাকে দেখিয়ে ইমপ্রেস করার নতুন কোনো টেকনিক বের করেছো?”
মেহেরের ফর্সা মুখটা লজ্জায় আর রাগে মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে হিজাবটা একটু টেনে ঠিক করে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, “আপনার মতো রুচিহীন মানুষকে ইমপ্রেস করার কোনো শখ আমার নেই। দয়া করে নিজের সীমা বজায় রাখুন।”

রুদ্র এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। সে কাউন্টার থেকে এক মুঠো শুকনো ময়দা তুলে নিল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত ধূর্ততা। সে মেহেরের খুব কাছে গিয়ে ধীরলয়ে বলল—
“সীমা? রুদ্র চৌধুরীকে ওসব নীতিকথা শুনিও না মেহের। আমি যেখানে দাঁড়াই, সীমা সেখান থেকেই শুরু হয়।”
বলেই রুদ্র হুট করে মেহেরের নাকের ডগায় ময়দা মাখিয়ে দিল। মেহের চমকে উঠল, ওর বড় বড় চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। মেহের হাতের আটার দলাটা নিয়ে সজোরে রুদ্রর সাদা টি-শার্টের ওপর লেপে দিল।
রুদ্রর হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে তার টি-শার্টে মেহেরের হাতের আঠালো ছাপ দেখে বিরক্তিমাখা চোখে তাকাল। দুজনের মাঝখানে এখন এক অদৃশ্য পাহাড়।

ঠিক সেই মুহূর্তে দাদির গলার আওয়াজ ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে এল। রুদ্র এক ঝটকায় মেহেরকে ছেড়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় আর তাচ্ছিল্যের হাসি। মেহের তখন কাঁপছে, দ্রুত ওড়নাটা সামলে নিয়ে সে।রুদ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে কিচেন থেকে বের হয়ে এল।
কিছুক্ষণ পর ডাইনিং টেবিলে সবাই নাস্তা করতে বসল। মেহেরের বানানো গরম গরম লুচি আর আলুর দমের ঘ্রাণে পুরো ঘর ম ম করছে।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১০

হামজা চৌধুরী এক টুকরো লুচি মুখে দিয়েই চোখ বুজলেন। “আহা! মা , তোমার হাতের রান্নায় তো জাদু আছে। রেহানা, তোমার ছেলের কপাল তো দেখি ভালোই।”
সবাই যখন মেহেরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, রুদ্র তখন প্লেটে হাতও দেয়নি। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখল।
রেহানা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন, “কিরে, নাস্তা না করেই উঠে পড়লি যে? মেহের কত কষ্ট করে বানালো!”
রুদ্র আলগা হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা নেই। সে মেহেরের দিকে একবার তাকিয়ে বলল—
“ক্ষুধা নেই মা। বাইরে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে হবে ওখানে গিয়েই কিছু একটা খেয়ে নেব।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১২