ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৩
মারিয়াম ফুল
সকাল ৭টা। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে আসা খটখট শব্দে মেহেরের ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ কচলে ড্রয়িংরুমে আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। রুদ্র শুধু একটা শর্টস পরে খালি গায়ে হাতে কফির মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেজা চুল আর সুঠাম দেহটা সকালের আবছা আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মেহের অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।
রুদ্র মেহেরকে দেখে বাঁকা হাসল। “গুড মর্নিং সুইটহার্ট! ওহ স্যরি… বিটারহার্ট! আমি খুব একটা জেন্টলম্যান টাইপ লোক নই, সেটা তো জানোই। কফি নিজে বানিয়ে খেয়ে নিও। একটু পরে নতুন সার্ভেন্ট আসবে, সেই রান্নাবান্না সামলাবে।”
মেহের কোনো উত্তর দিল না। কিচেনে ঢুকে দেখল সবকিছু একদম অগোছালো, একটা ব্যাচেলর ছেলের কিচেন যেমন হয়। তবুও নিজের জন্য কফি বানিয়ে সে বারান্দায় গিয়ে বসল। এই ফ্ল্যাটের মধ্যে এই বারান্দাটাই হয়তো মেহেরের কাছে সবথেকে বেশি পছন্দ হলো।
ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটা অদ্ভুত খসখস শব্দ ভেসে এল। মনে হলো কেউ ভারী কিছু একটা মেঝেতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই বিকট কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো…. মেহের চমকে উঠল।
পরক্ষণেই রুদ্র এসে দাঁড়াল বারান্দার দরজায়। পরনে এখন একটা টি-শার্ট। মেহের কফির মগে চুমুক দিয়ে নির্লিপ্তভাবে বলল, “ আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।”
রুদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে মেহেরের খুব কাছে এগিয়ে এসে বলল, “ট্রাস্ট মি, আমিও তোমাকে নিয়ে যেতাম না। দাদির কথা ফেলি না বলেই যাচ্ছি। সো, জাস্ট মেক শিওর ইউ আর রেডি ইন ফাইভ মিনিটস।”
গাড়িতে বসে রুদ্র বারবার চুলে হাত বোলাচ্ছে, কখনো হাতের দামি ঘড়িটা ঠিক করছে। মেহের পাশে এসে বসল পরনে লং ড্রেস আর মাথায় নিখুঁত হিজাব। রুদ্রর মনে পড়ে গেল প্রথম দিনের সেই প্লেনের দৃশ্যটা। মেহের বসতেই রুদ্র লাউড মিউজিক ছেড়ে দিল। মেহের সাথে সাথে সেটা অফ করে দিল। রুদ্র আবার অন করল, মেহের আবার অফ। রুদ্র এবার দাঁত কিড়মিড় করে মিউজিক সিস্টেম বন্ধ করে দিল।
শপিং মলে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই দেখা হলো রুদ্রর দুই পুরনো বান্ধবী নিশা আর রুমাইশার সাথে। তারা জনসমক্ষেই রুদ্রকে জড়িয়ে ধরল। নিশা মেহেরের দিকে ইঙ্গিত করে রুদ্রকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার সাথে যে এসেছে, ও কে হয় তোমার?”
রুদ্রর বিয়ের কথা তার কোনো ফ্রেন্ড বা কলিগ জানত না। সে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে খুব সাবলীলভাবে বলল,
“রুমমেট!”
রুমাইশা উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, “আউউ! বাংলাদেশে বিয়ে ছাড়া রুমমেট? দ্যাটস সো এক্সাইটিং রুদ্র!” নিশা একগাল হেসে মেহেরের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে অবজ্ঞার সুরে বলল, “টেস্ট তো বদলে গেছে তোমার রুদ্র! আগে তো এই টাইপ পছন্দ ছিল না তোমার। তা… রুমমেট যখন, তখন নিশ্চয়ই খুব ‘অ্যাকোমোডেটিং’, তাই না?”
নিশার বাঁকা কথায় মেহেরের কানের লতি পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। ‘রুমমেট’ শব্দটা এই মেয়েগুলোর কাছে খুব স্বাভাবিক শোনালেও মেহেরের কানে তা বিষের মতো লাগল। তার আত্মসম্মানে যেন কেউ সজোরে থাপ্পড় মারল। মেহের পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে অপমানে। রুদ্র একবারও প্রতিবাদ করল না, বরং বন্ধুদের সাথে এই সস্তা মজাটা উপভোগ করতে লাগল। মেহেরের মনে হলো, সে যেন একটা জীবন্ত পণ্য, যাকে রুদ্র তার বন্ধুদের সামনে সাজিয়ে রেখেছে শুধু বিদ্রূপ করার জন্য।
অ্যাপার্টমেন্টের লিভিং রুমে তখন এক থমথমে নীরবতা। বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের জানলায় আছড়ে পড়ছে, যেন বাইরের আকাশটাও মেহেরের মনের ভেতরের কান্নার সুর ধরেছে। শপিং মল থেকে ফেরার পর মেহেরের বুকের ভেতরটা অপমানে দাউদাউ করে জ্বলছিল। রুদ্রর বন্ধুদের সামনে সেই ‘রুমমেট’ পরিচয়টা তার আত্মসম্মানে এক মরণকামড় বসিয়েছে।
রুদ্র সোফায় হেলান দিয়ে বসে পায়ের জুতো খুলছিল। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং এক ধরণের বিজয়ীর তৃপ্তি। মেহের কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে লাল হয়ে আছে। মেহের ভাঙা গলায় বলল
“আপনি আমাকে সবার সামনে ‘রুমমেট’ বলে পরিচয় দিলেন? আপনি কি জানেন আপনি আমাকে কতটা নিচে নামিয়েছেন? আপনার ওই বন্ধুদের কাছে আমার চরিত্রটা এখন কী দাঁড়িয়েছে সেটা কি একবারও ভেবেছেন?”
রুদ্র জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে মাথা তুলল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিদ্রুপাত্মক হাসি। সে মেহেরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মেহেরের খুব কাছে এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত স্বরে বলল
“কেন? রুমমেট বললে কি তোমার ওই ‘পবিত্র’ ইমেজে দাগ পড়ে গেল? রিয়েলিটি চেক সুইটহার্ট! তোমার মতো এই বোরকাওয়ালী ব্যাকডেটেড মেয়েকে আমার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়াটা আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে কতটা এমব্যারাসিং সেটা কি তোমার কোনো ধারণা আছে? তার চেয়ে ‘রুমমেট’ পরিচয়টাই তোমার জন্য একটা লাক্সারি। অন্তত লোকে ভাববে ক্যাপ্টেনের সাথে থাকার মতো কোনো গুণ তোমার আছে।”
মেহেরের সারা শরীর রাগে রি রি করে উঠল। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল
“ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র, ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট! নিজের আভিজাত্য জাহির করতে গিয়ে অন্যের চরিত্র নিয়ে …… ”
রুদ্র এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।সে মেহেরের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“লিমিট? লিমিট তো তুমি ক্রস করেছ সাওয়াজ সায়েদ মেহের! আই জাস্ট সেড দ্য ট্রুথ। তোমার এত লাগছে কেন? বিয়ের আগে প্রেগন্যান্ট হতে পারো, অথচ একটা ‘রুমমেট’ পরিচয় দিলে তোমার সতীত্বে আঘাত লাগে? ওয়াও! আপনাদের মতো হিজাবওয়ালী মেয়েদের এই ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ দেখেই তো আমার হাসি পায়। পেটে পাপের বোঝা নিয়ে ঘুরছো, আবার বড় বড় নীতিবাক্য শোনাচ্ছো?”
রুদ্রর এই শেষ কথাটা মেহেরের মস্তিষ্কে যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। নিজের পবিত্রতা নিয়ে এমন জঘন্য অপবাদ সে তার অতি বড় শত্রুর কাছ থেকেও আশা করেনি। মেহেরের মনে হলো চারপাশের বাতাস ফুরিয়ে আসছে। রুদ্রর সেই দীর্ঘকায় শরীর আর ডার্ক লিভিং রুমটা যেন গোলকধাঁধার মতো ঘুরছে।
মেহেরের মুখটা মুহূর্তে ছোট হয়ে এল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে গেছে। এক অসহ্য যন্ত্রণায় তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে শুধু বলল, “আল্লাহ…!”
পরক্ষণেই মেহেরের শরীরটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে এক হাত দিয়ে সোফার কোণাটা ধরার শেষ চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চোখের পাতা বুজে আসার আগেই সে দেখল রুদ্রর সেই অবজ্ঞাময় চেহারাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেহের নিথর হয়ে শক্ত ফ্লোরের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১২
রুদ্রর সেই পৈশাচিক হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। তার হাতের চাবিটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল। সে চিৎকার করে মেহেরের দিকে এগিয়ে এল—
“মেহের! মেহের! ওপেন ইয়োর আইজ! হেয়… দিস ইজ নট ফানি!”
