শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৫ (২)
আফীফা আফনান
ল্যাপটপের কিবোর্ডে আরমানের আঙুলগুলো যেন ঝড়ের গতিতে খেলে চলেছে। তার চোখের মণি দুটো ল্যাপটপের নীলচে আলোয় এক হিংস্র ও কুটিল মেজাজে জ্বলজ্বল হয়ে আছে। আজ তার জীবনের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা! তারপর তাকে আর কখনো জীবনের কোনো বাঁকেই পিছু ফিরে তাকাতে হবে না।
বিগত দুই বছর ধরে ‘শিকদার এন্টারপ্রাইজ’-এর চোখ ফাঁকি দিয়ে, পদমর্যাদার অবাধ সুযোগ নিয়ে ধাপে ধাপে যে কোটি কোটি টাকা সে সরিয়েছে—তা তো স্রেফ একটা ট্রেলার ছিল। আসল সিনেমা তো শুরু হতে যাচ্ছে আজ সকালের মহামূল্যবান বোর্ড মিটিংয়ে!
আজকের বিদেশের সেই জায়ান্ট ক্লায়েন্টের সাথে শিকদার এন্টারপ্রাইজের কোটি কোটি টাকার ডিল মিটিংটা যদি একবার সফল হয়, আর কন্ট্রাক্ট পেপারে যদি একবার সাইন হয়ে যায়—তবে ওই প্রজেক্টের পুরো ফান্ডটাই ঘুরপথে চলে যাবে তার বেনামী শেল কোম্পানিতে! ইকবাল শিকদার ভাববেন প্রজেক্টে ক্ষতি হয়েছে, কোম্পানি লসে পড়েছে। আর ওদিকে সেই অগাধ টাকায় মোড়ানো বিছানার ওপর পা ছড়িয়ে ঘুমাবে আরমান!
আরমান চেয়ারে হেলান দিয়ে ঠোঁটের কোণে এক জঘন্য ও বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল। হাতের সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে মনে মনে বলল—“বুড়ো ইকবাল শিকদার ভেবেছিল আমাকে স্রেফ একটা বিশ্বস্ত গোলাম বানিয়ে সারা জীবন খাটিয়ে মারবে! আর মেহুল ভেবেছে আমি ওর দেওয়া অপমান নীরবে গিলে নেব? হাহ্! আজ শুধু চুক্তিতে একবার সই হোক তারপর যখন পুরো শিকদার সাম্রাজ্যের কলকাঠি আমার হাতের তালুতে চলে আসবে, তখন বুঝবি আরমান শিকদার ঠিক কী জিনিস! তোদের অহংকার, তোদের রাজপ্রাসাদ—সব আমি তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দেবো। ইকবাল শিকদারকে আমি আজীবনের জন্য রাস্তায় বসাবো, আর মেহুলকে আমার পায়ের নিচে টেনে আনবো!”
তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে তখন শুধুই বেইমানি, চরম লোভ আর প্রতিশোধের এক ভয়ংকর নীল নকশা কাজ করে চলেছে। নিজের এই নিখুঁত শয়তানি চক্রান্তের পরিণতি যে কতটা রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে—তা ভেবেই আরমানের শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন এক বিকৃত আনন্দের শিহরণ খেলে গেল।
ঠিক এমন সময় ওয়াশরুমের দরজা খুলে ধোঁয়াটে ভেজা আমেজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো আনিকা। স্লিভলেস ব্লাউজ আর শরীর জড়িয়ে থাকা পাতলা জর্জেটের শাড়িতে তার সদ্য গোসল করা চেহারায় এক অন্যরকম মাদকতা। চুল থেকে গড়িয়ে পড়া পানির ফোটাগুলো তার অনাবৃত কাঁধ আর পিঠ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা সে হাতের তোয়ালে দিয়ে ধীরমনে মুছছিল।
চেয়ারে বসে থাকা আরমানের নজর আনিকার ওপর পড়তেই তার ভেতরের চতুর চিন্তাভাবনাগুলো এক লহমায় যেন থমকে গেল। আনিকার এই সুগঠিত ফিগার, তীক্ষ্ণ মেদহীন নিখুঁত শারীরিক আবেদন আর উপচে পড়া হটনেস যেকোনো পুরুষকে মুহূর্তে মাতাল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আরমান মনে মনে এক চরম আত্মতৃপ্তি আর গর্ব অনুভব করল। সে ভাবল—মেহুলের মতো ওই সাধারণ, সাদাসিধে মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলে আনিকাকে আপন করে নিয়ে সে তার জীবনের সবচেয়ে সঠিক ও সেরা সিদ্ধান্তটা নিয়েছে!
অতঃপর আরমান হাতের আধপোড়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে দিল। ধীরপায়ে আবেশ জড়ানো পায়ে এগিয়ে গেল আনিকার দিকে। কোনো কথা না বলে পেছন থেকে আনিকার আলতো কোমরটা জড়িয়ে ধরে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল তার ভেজা গলার খাঁজে।
আরমানের এমন হঠাৎ ও উষ্ণ কান্ড দেখে আনিকা ঠোঁটের কোণে মুচকি হেসে পেছনের দিকে ঘাড় হেলাল। আরমান তার গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গদগদ গলায় বলে উঠল, “তুমি দিন দিন যে পরিমাণ হট আর সুন্দরী হয়ে উঠছ আনিকা, আমার কাজকর্মে মন বসানো দায় হয়ে যাচ্ছে!”
আনিকার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লজ্জার রক্তিম আভায় লাল হয়ে উঠল। সে মিষ্টি হেসে নিজের নজর নিচু করে আরমানের বুকে আলতো ধাক্কা দিল।
ঠিক এই রোমান্টিক মুহূর্তেই টেবিলের ওপর থাকা আরমানের মোবাইলটা তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল।
আরমান একপ্রকার অনিচ্ছা সত্ত্বেই আনিকাকে ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে নাম দেখে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজারের উন্মাদের মতো ভয়ার্ত কণ্ঠ ভেসে এলো—
”স্যার! খুব বড় বিপদ হয়ে গেছে! আমাদের নতুন প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের জন্য যে ফিমেল মডেলকে হায়ার করা হয়েছিল, হঠাৎ ওনার পার্সোনাল কিছু প্রবলেমের কারণে ওনি এই শুটে অংশ নিতে পারছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন! স্যার, হাতে একদম সময় নেই। আজকের প্রজেক্ট লাঞ্চিং মিটিংয়ের আগে আমাদের খুব দ্রুত অন্য কোনো মডেলের ব্যবস্থা করতে হবে, না হলে আজকের প্রেজেন্টেশনে আমরা বিরাট বড় ধাক্কা খাবো!”
কথাটা বলার সময় আরমান কিন্তু আনিকার সামনেই দাঁড়িয়েছিল। সে বাম হাত দিয়ে আনিকার অনাবৃত কোমরটা আরো একবার শক্ত করে নিজের দিকে টেনে জড়িয়ে ধরলো। এদিকে আরমানের কাছাকাছি থাকাতে ফোনের ওপাশের প্যানিক করা কথাগুলো আনিকার কানেও স্পষ্টভাবে পৌঁছাল।
আরমান সামান্য বিরক্ত হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ঠিক আছে, শান্ত হও। আমি দেখছি কী করা যায়।” বলেই সে ফোনটা কেটে দিল।
আনিকা আরমানের চোখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী হলো বেবি? খুব আর্জেন্ট একজন মডেল লাগবে, তাই তো?”
আরমান হালকা “হুম” বলে তৎক্ষনাত নিজের কন্টাক্ট লিস্ট থেকে পরিচিত অন্য এক এজেন্সিকে ফোন লাগাল। কিন্তু শর্ট নোটিশে এত কম সময়ের মধ্যে নামীদামী কোনো মডেলের শিডিউল পাওয়া অসম্ভব বলে জানিয়ে দিল তারা। আরমান রেগেমেগে আরও একজনকে কল করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আনিকা হুট করে হাত বাড়িয়ে আরমানের হাত থেকে ফোনটা একপ্রকার কেড়ে নিয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেলল।
সে আরমানের গলার দুপাশে হাত রেখে, চোখের মণি নাচিয়ে আবেশিত সুরে বলে উঠল, “আমাকে একটা সুযোগ দাও না আরমান! আমি কি কোনো প্রফেশনাল মডেলের চেয়ে কোনো অংশে কম? আফটার অল, আমার সৌন্দর্য আর হটনেস এতটাই কিলার যে… আমার জন্য নিজের দীর্ঘ বারো বছরের পুরানো প্রেম মেহুলকে ভুলতে তোমার এক সেকেন্ডও সময় লাগেনি! আমায় পছন্দ করে তো ওকে ছাড়লে, তাই না?”
আনিকার এই ধৃষ্টতা আর আত্মবিশ্বাসী কথা শুনে আরমান এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। সে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আনিকার শরীর ও চেহারায় একবার চোখ বুলাল। পরক্ষণেই তার ধূর্ত মস্তিষ্কে একটা কুটিল বুদ্ধি খেলে গেল। আনিকাকে যদি আজ প্রজেক্টের ফেস বানানো যায়, তবে মিডিয়া এবং বোর্ড মিটিং—দুটোতেই এক বড় ধামাকা তৈরি হবে, আর ইকবাল শিকদারকে আরও একধাপ অপমান করে নিচে নামানো যাবে!
অতঃপর আরমানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, কামুক ও চতুর হাসি ফুটে উঠল। সে টান মেরে আনিকাকে নিজের আরও কাছে এনে তার ঠোঁটে একটা শক্তপোক্ত ও গভীর চুম্বন বসিয়ে দিল। একটু পরেই ছেড়ে দিয়ে বলল, “পয়েন্ট বেবি! আইডিয়াটা কিন্তু হ্যাভি। আধঘণ্টার মধ্যে আমাদের অফিসে পৌঁছাতে হবে। ১০ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নাও, মাই প্রিটিয়েস্ট ওয়াইফ! কারন আজ আমাদের বিজয়ের দিন।”
আরমানের মুখ থেকে ‘হ্যাঁ’ শুনে আনিকার চোখ-মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আনন্দে একপ্রকার লাফিয়ে উঠল! টিভিতে কিংবা বড় পর্দায় মডেলিং করার স্বপ্ন সে বহু বছর ধরে মনে মনে লালন করছিল, কিন্তু কখনোই সেই সুযোগ পায়নি। আজ সেই স্বপ্ন এভাবে হঠাৎ পূরণ হতে চলায় আনিকা আরমানের গালে একটা গভীর চুমু এঁকে দিয়ে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে রেডি হওয়ার জন্য ড্রেসিং টেবিলের দিকে ছুটে গেল।
ওদিকে আরমানের ঠোঁটে তখন ভেসে উঠছিল আসন্ন এক ঝড় আর জালিয়াতির চূড়ান্ত ছক।
একদিকে যখন আরমান নিজের সীমাহীন লোভ, অন্ধ অহংকার আর কুটিল ষড়যন্ত্র নিয়ে সাজানো সাম্রাজ্য দখলের ছক কষছিল, ঠিক অন্যদিকে বিপরীতমুখী পথে মেহুল প্রস্তুত হচ্ছিল—সেই রক্তচোষা শকুনের দল ও সকল চক্রান্তকারীদের শিকার করতে!
আজকের মেহুল আর আগের সেই সাধারণ, শান্ত বা আঘাত পেয়ে কোণে লুকিয়ে থাকা অসহায় মেয়েটি নেই। তার প্রতিটা পদক্ষেপের মাঝে আজ এক রাজকীয় গাম্ভীর্য আর হিমশীতল প্রতিজ্ঞার ধার।
মেহুলের পরনে আজ এক চমৎকার পেস্ট কালারের সুতি ফর্মাল থ্রি-পিস। স্নিগ্ধ, কিন্তু চোখ ধাঁধানো। ভেজা চুলগুলোকে পেছনে হালকা করে ক্লাচ দিয়ে আটকে রাখা, যার দু-এক গুচ্ছ তার কানের পাশ দিয়ে মুখমণ্ডলে এসে পড়ছে। মেহুলের চোখে নেই কোনো ক্লান্তির ছাপ, বরং ডায়েরির উন্মোচিত সত্য আর আরমানের বেইমানির সব হিসাব মিলিয়ে তার চোখের মণি দুটো আজ অদ্ভুত এক অটল আলোয় জ্বলজ্বল করছে। নিজের রুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো ওড়নাটা সোজা করে নিয়ে সে ধীর, স্থির পায়ে নিচে নেমে এলো।
নিচে নেমেই মেহুল এক মুহূর্তের জন্য বাড়ির থমথমে আবহাওয়াটা পর্যবেক্ষণ করে নিল। সুমনা বেগম আর শিরিনা বেগমরা আড়চোখে তার দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করছেন। কিন্তু মেহুল যেন সেসব তুচ্ছ পরজীবীদের পাত্তাই দিল না। বরং সে শান্ত পায়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল।
ঠিক তখনই চিরচেনা ভারী কদম ফেলে সেখানে উপস্থিত হলেন ইকবাল শিকদার। গতকদিনের মানসিক ঝড় পেরিয়ে মেয়েকে আজ এত দিন পর এমন পরিপাটি, আত্মবিশ্বাসী আর উজ্জ্বল চেহারায় নিচে নামতে দেখে ওনার হৃদয়ে যেন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি নেমে এলো। ইকবাল সাহেব নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে এক পরম স্নেহের ও বাবার পরম মমতাময় হাসি ফুটিয়ে বললেন, “গুড মর্নিং, মা!”
মেহুল বাবার সেই বিষণ্ণ অথচ ব্যাকুল মুখের দিকে তাকিয়ে মনভোলানো মিষ্টি হেসে জবাব দিল, “গুড মর্নিং, বাবা! এসো, খেতে বোসো।”
এদিকে মেহুলকে আজ এতোটা হাসিখুশি আর পরিপাটি দেখে মিনারা বেগম হাসি মুখেই রান্নাঘর থেকে মেহুলের পছন্দের ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগটা এনে মেহুলের সামনে আলতো করে এগিয়ে দিলেন। মেহুলের ড্রেসআপ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথাও যাবি নাকি মা আজ?”
মেহুল কফির মগে এক চুমুক দিয়ে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ মণি, আজ হসপিটালে যাবো।”
মিনারা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, “হসপিটালে কেন রে মা? তুই না এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছিলি? এখনো তো তোর ছুটির দুদিন বাকি আছে!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ডাইনিং টেবিলে ধুপধাপ পা ফেলে এসে দাঁড়াল আরমান আর আনিকা। আনিকার পরনে অতিরিক্ত সাজগোজ আর কড়া মেকআপ, যা দিয়ে সে আজ অফিসে গিয়ে প্রজেক্টের ‘মডেল’ হওয়ার আমেজ প্রকাশ করছে। আর আরমান তার পাশে একরাশ অহংকার নিয়ে দাঁড়িয়ে।
মেহুল আড়চোখে সুসজ্জিত দুই বেইমানকে এসে দাঁড়াতে দেখেই নিজের কফির মগটা টেবিলে রাখল। মিনারা বেগমের দিকে তাকাল, আর গলাটা খানিকটা চড়িয়ে আরমানদের শুনিয়ে উত্তর দিল—
”ছুটি তো নিয়েছিলাম মণি… খুব সুন্দর কিছু ‘বিনোদনের নাটক’ দেখবো বলে! নাটক তো বেশ ভালোই দেখলাম, প্রচুর বিনোদনও পেলাম, চুটিয়ে মজাও নিলাম! তা এখন ঘরে শুধু শুধু অলস বসে থেকে আর সময় নষ্ট করে কী করবো বলো? চিড়িয়াখানার সব বাঁদরগুলোরও তো নাচ দেখা শেষ! তাই ভাবলাম, আজ থেকেই হসপিটালে গিয়ে ডিউটিটা শুরু করি। কোয়ালিফাইড এমবিবিএস ডক্টর তো, প্রচুর চাপ বুঝলে, সবার মতো তো আর রংচং মেখে বসে থাকতে পারি না বলো! তাই এখন থেকে আমার প্রফেশনাল কাজগুলো মনোযোগী হয়েই করি, আর সেই সাথে ভাবছি সমাজের কিছু বিষাক্ত জীবাণু সাফ করার চিকিৎসাটাও শুরু করবো!”
মেহুলের মুখ থেকে ‘চিড়িয়াখানার বাঁদর’ আর ‘বিষাক্ত জীবাণু’ শব্দগুলো শোনামাত্রই আরমানের ফর্সা মুখ মুহূর্তে রগে রগে লাল হয়ে উঠল! সে চড়া চোখে অত্যন্ত রাগ ও হিংস্রতা নিয়ে মেহুলের দিকে তাকাল।
আরমানকে এভাবে রাগে ফুঁসতে দেখে মেহুলের মনের ভেতর এক অদ্ভুত বিজয়ী আনন্দ খেলে গেল। সে আরমানকে আরেকটু খোঁচাতে ও তার জ্বলন্ত রাগে ঘি ঢালতে ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক তীর্যক আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল—
”কী হলো আরমান ভাই? ওভাবে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছ কেন? ও সরি, তোমাকে তো আজ আবার অফিসে দৌড়াতে হবে, তাই না? তবে বেশি তাড়াহুড়ো করো না ভাইয়া, বেশি জোরে দৌড়াতে গেলে কিন্তু আবার নিজের পাতা জালের ফাঁদেই ধুপ করে পা পিছলে নিজেকেই পড়ে যেতে হয়!
কথাটা শেষ করেই মেহুল প্লেটে অর্ধেকটা রুটি রেখেই নিজের ব্যাগটা ঘাড় থেকে ঝুলিয়ে এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
মেহুলকে এভাবে পুরো খাবার না খেয়ে উঠে পড়তে দেখে মিনারা বেগম তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলেন, “কিরে! পুরো খাবারটা না খেয়েই উঠে গেলি যে? কী ব্যাপার মেহু? খাবারটা শেষ কর!”
মেহুল তার ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিমটি ধারালো ও শীতল হাসি ফুটিয়ে বলল, “পেট একদম ভরে গেছে মণি। আসলে খাবার টেবিলের আশেপাশে এত ইনফেকশনের জীবাণুর ছড়াছড়ি যে, আর এক লোকমা খেলে নির্ঘাত আমার পেটের ভেতর থেকে সব বমি হয়ে চলে আসবে!”
কথাটা বলার সময় মেহুলের বিষাক্ত ও ক্ষুরধার দৃষ্টি সরাসরি আরমান আর আনিকার মুখের ওপর গিয়ে পড়ল।
সে আরমানের চড়ে যাওয়া রগ আর ধকধক করতে থাকা চোয়ালের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে যোগ করল, “তাই ভাবছি… ইনফেকশন ছড়ানো ওই সস্তা ক্যানসারাস ভাইরাসের আক্রমণ তো আজকাল বাজারে খুব বেড়ে গেছে! ভাবছি আজ হসপিটালে ডিউটিতে গিয়েই শক্ত ডোজের ভালো একটা পটেনশিয়াল অ্যান্টিবায়োটিক নিজের ইনজেকশন সিরিঞ্জে গুছিয়ে রাখব। বলা তো যায় না মণি… কখন কার বিষাক্ত ছদ্মবেশ আর আসল রূপ বেরিয়ে আসে আর তা চিরতরে ধুয়েমুছে সাফ করে সোজা অপারেশান থিয়েটারে কেটে বাদ দিতে হয়!”
মেহুলের এই শেষ কথাটা ডাইনিং টেবিলের বাতাসে যেন বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সুমনা বেগম আর আরমান স্তব্ধ হয়ে মেহুলের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, মেহুলের কথা অর্থ ধরতে না পারলেও আরমানের হাড়ের ভেতর দিয়ে যেন এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল!
অতঃপর মেহুল আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে, সশব্দে হাই হিলের শব্দ তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে গটগট করে বাইরের দিকে হেঁটে বের হয়ে গেল।
শহরের অন্যতম নামী হসপিটালের সাদা রঙা করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ডা. মেহুলের পরনে থাকা হোয়াইট অ্যাপ্রনটা বাতাসে হালকা উড়ছিল। তার ডান হাতে তখন গাইনি ওয়ার্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেসেন্টের কেস ফাইল।
এইতো সকালের কথা সদা-প্রফুল্ল মেহুলকে আজ ছুটির দিন হসপিটালের করিডোরে হঠাৎ হেঁটে বেড়াতে দেখে তার সহকর্মী ও জুনিয়র ডাক্তার-নার্সরা রীতিমতো চমকে উঠেছিল। সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—যে মেয়ের সদ্য বিয়ে হবার কথা, সেই মেহুল ছুটি শেষ না হতেই হসপিটালে ফিরে এলো কেন? কারণ হাসপাতালের সবাই জানত যে, মেহুলের তার দীর্ঘদিনের ভালোবাসার মানুষ আরমানের সাথে ঘটা করে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।
কেউ কেউ কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এসে জানতে চেয়েছিল নতুন বিয়ের প্রথমদিকের এক্সাইটমেন্ট কেমন লাগছে! কেউ আবার দুষ্টুমি করে জানতে চেয়েছিল হানিমুনে কোথায় যাওয়ার প্ল্যান, কিংবা বাসর রাতে বর তাকে কী স্পেশাল গিফট দিল!
সবার এই শত কৌতূহল আর উচ্ছ্বাসের বিপরীতে মেহুল কোনো বিরক্তি প্রকাশ করেনি। সে শুধু অত্যন্ত শান্ত মুখে, ঠোঁটে এক ফালি হালকা মলিন হাসি টেনে সবার উদ্দেশ্যে জানিয়েছিল—
”আমার বিয়েটা আর হয়নি… কারণ, যার সাথে আমার জীবনের সমস্ত স্বপ্ন জড়ানো ছিল, সেই আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে মাঝপথে ধোঁকা দিয়ে আমারই মামাতো বোনকে বিয়ে করে নিয়েছে।”
মেহুলের মুখ থেকে এই নির্মম সত্যটা শোনার পর করিডোরের বাতাসে যেন পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। কেউ কিছু সময় কথা বলতে পারেনি। কারোর মুখে সান্ত্বনার সুর ছিল—”ভুলে যাও মেহুল, সব অতীত পেছনে ফেলে নতুন করে জীবন শুরু কর।” আবার কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—”জীবন তো থেমে থাকে না, নতুনভাবে সব শুরু করিস।”
কিন্তু চাইলেই কি সব আগের মতো মুছে ফেলে নতুন করে শুরু করা যায়? হৃদয়ের কথা কি সবসময় মানুষ শুনতে পায়? এই বুকভাঙা হৃদয়ের ক্ষত কজনে বা দেখে? আমাদের শরীরে ছোটখাটো কোনো আঘাত লাগলে তা ওষুধে বা মলমে ঠিকই সারিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা এই রক্তক্ষরণ তো চোখে দেখা যায় না! আর চাইলেও কি সেই অদৃশ্য ক্ষত সহজে সারানো যায়?
ঠিক তখনই মেহুলের চিন্তার সেই গভীর স্রোতে বাদ সাধল ওয়ার্ডের এক জুনিয়র নার্স। দৌড়ে এসে সে একটু হাপাতে হাপাতে বলল, “ম্যাম! ৩০২ নম্বর বেডের পেশেন্টের চেকিংয়ের টাইম হয়ে গেছে। উনি তো সদ্য মা হয়েছেন, এইমাত্র কোল আলো করে একটা ফুটফুটে বাচ্চা জন্ম দিয়েছেন। ওনাকে এখন একটু প্রপারলি চেক-আপ করতে হবে।”
নার্সের ডাকে মেহুলের ধ্যান ভাঙল। সে কেস ফাইলের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে এক পলক তাকাল, অতঃপর স্নিগ্ধ গলায় বলল, “হুম, চলো।”
বলেই সে কেস ফাইলটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নার্সের পেছন পেছন ওয়ার্ডের ভেতরের দিকে পা বাড়াল।
মেহুল যখন ৩০২ নম্বর কেবিনের দরজার হুকটা খুলল, ঠিক তখনই এক অচেনা উষ্ণতা আর মমতার সুবাস এসে তার চোখে-মুখে লাগল। কেবিনের ভেতরে নরম আলোয় বিছানায় শুয়ে আছেন এক নব্য মা। সন্তান জন্ম দেওয়ার তীব্র ক্লান্তি তখনও ওনার মুখে লেগে আছে, কিন্তু চোখের কোণে উপচে পড়ছে এক অনাবিল প্রশান্তি। আর বিছানার ঠিক পাশেই ঝুলন্ত ছোট দোলনাটায় পরম শান্তিতে শুয়ে আছে সদ্য জন্ম নেওয়া এক ফুটফুটে পুতুল সদৃশ শিশু।
মেহুল ধীরপায়ে এগোলো। চিকিৎসকের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে ফাইলটা দেখে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল, প্রেশার আর পালস মেপে বেশ কিছু জরুরি টিপস আর নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিল।
ঠিক তখনই নীরব কেবিনটাকে আলোড়িত করে এক মিষ্টি কিন্তু তীব্র স্বরে কেঁদে উঠল দোলনার শিশুটি।
শিশুর কান্নার দাপটে মা-টি ক্লান্ত কণ্ঠে হাত বাড়িয়ে মেহুলকে বিনীত আবদার করে বললেন, “ডাক্তার মেডাম, আমার সোনাটা কাঁদছে… ওটাকে একটু তুলে আমার কোলে দেবেন প্লিজ?”
”হ্যাঁ, অবশ্যই…” মেহুল মৃদু হেসে দোলনাটার দিকে বাড়াল নিজের দুটি হাত। কিন্তু ঠিক যখনই সে তুলতুলে নরম শিশুটিকে স্পর্শ করতে গেল, এক অদৃশ্য বিদ্যুতের ঝটকায় থেমে গেল মেহুলের আঙুলগুলো! হঠাৎ করেই তার দুই হাত থরথর করে কাঁপতে শুরু করল!
মুহূর্তের মধ্যে তার মগজের কোণে, স্মৃতির কোনো অন্ধকার গহ্বর থেকে ভেসে আসতে লাগল সুমনা বেগম, আরমান আর অসংখ্য মানুষের বিভিন্ন সময় তাকে বলা সেই বিষাক্ত, মর্মান্তিক খোঁটাগুলো—
“ও তো অলক্ষ্মী! অপয়া! ওর মতো মেয়ের কপালে বংশের প্রদীপ জ্বালানোর কোনো ভাগ্য নেই… তুই কোনোদিন মা হতে পারবি না, তুই বন্ধ্যা!”
শব্দগুলো যেন কোনো তীক্ষ্ণ তীরের মতো মেহুলের মস্তিষ্কে আঘাত করতে লাগল। ‘অপয়া… বন্ধ্যা…!’ প্রতিটা কটু কথা তার কান দুটোকে ঝাঁঝরা করে দিল। বুকের ভেতর চেপে থাকা সমস্ত ভয়, শঙ্কা আর নিজেকে অপরাধী ভাবার অদ্ভুত এক হীনম্মন্যতা এক নিমেষে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মেহুল শিউরে উঠল—এই নিষ্পাপ দেবদূত রূপী শিশুটিকে ছুঁলে যদি তার সেই কথিত ‘অপয়া’ ছায়া বাচ্চাটার ওপর পড়ে? যদি সে সত্যিই…!
কাঁপতে থাকা হাত দুটো মেহুল হুট করে গুটিয়ে নিল। নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন। বাচ্চাটি তখনও করুণ সুরে কেঁদে চলেছে।
“ডাক্তার মেডাম আমার বাচ্চাটা কাঁদছে তো একটু দিন না, ওকে একটু বুকে নেই! আমি নিলেই কান্না থামিয়ে দিবে!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই মেহুলের ভাগ্যক্রমে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল অন্য একজন ডিউটি নার্স। মেহুল এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে কাঁপানো গলায় নার্সকে ডেকে বলল, “বাচ্চাটা কাঁদছে… ওকে একটু তুলে ওর মায়ের কোলে দাও।”
কথাটা শেষ করেই মেহুল আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে, চোখের কোণে জমে ওঠা উষ্ণ জলবিন্দুগুলোকে কোনোমতে চেপে রেখে সে দ্রুত পায়ে ধাবিত হলো, কেবিন থেকে বের হয়ে সোজা করিডোরের শেষ মাথায় থাকা তার নিজস্ব ডক্টরস রুমে!
কেবিনের রুমে প্রবেশ করেই মেহুল ধপাস করে কেবিনের দরজাটা বন্ধ করে দিল। ভেতর থেকে হাতল ঘুরিয়ে শক্ত করে লক করে দিয়ে সে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে ঢুকলো ওয়াশরুমে। পা দুটো যেন আর তার শরীরের ভার সইতে পারছিল না। সে ধপাস করে বসে পড়ল কমোডের ওপর।
অতঃপর, এতক্ষণ ধরে হৃদয়ের গহীনে শক্ত করে সামলে রাখা ধৈর্যের সব বাঁধ এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল! মেহুল দুহাতে মুখ ঢেকে নিজের মাথাটা হাঁটুতে ঠেকিয়ে দিল। তার বুকের ভেতর চেপে থাকা দীর্ঘদিনের জমে থাকা তীব্র অপমান, অন্যায়ের অপমানজনক যন্ত্রণা আর নিঃশব্দ হাহাকার এক ঝটকায় ফুঁপিয়ে ভেসে উঠল। সারা শরীর যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিয়ন্ত্রণহীন কান্নায় বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে তার।
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৫
যে মেয়েটি কিছুক্ষণ আগেই নিজের বাড়িতে সিংহের মতো দাপটের সাথে গর্জন করে এসেছে, প্রতিপক্ষ বেইমানগুলোকে নিজের চাবুক মার্কা কথায় ছারখার করে এসেছে—সেই দৃঢ়চেতা মেহুল যেন আজ কয়েক মুহুর্তের মাঝে ছোট্ট একটি নিষ্পাপ শিশুর কান্নায় আর সমাজের দেওয়া কুৎসিত অপবাদের বিষাক্ত ঘায়ে একদম ভেঙে চুরমার হয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে আকুল হয়ে কাঁদছে।
কারন হৃদয়ের এই গহীন অদৃশ্য রক্তক্ষরণ ঢাকা দেওয়ার মতো কোনো মলম যে হাজারো চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো বইতেই আজ পর্যন্ত লেখা হয়নি!
