Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬ (২)
‎আফীফা আফনান

‎ভিডিও অ্যাডটি শেষ হতেই মিটিং রুমের গা-ছমছমে নিস্তব্ধতা ভেঙে একযোগে ফেটে পড়ল জোরালো করতালির শব্দে! প্রজেক্টরের আলোয় স্ক্রিনে ভেসে থাকা শ্রাবণীর সেই নিখুঁত, পেশাদার আর আভিজাত্যপূর্ণ রূপ দেখে উপস্থিত বিদেশি ক্লায়েন্টদের চোখ যেন আটকে গেছে।
‎​”আনবিলিভেবল! মাইন্ড ব্লোয়িং কনসেপ্ট!” প্রধান ক্লায়েন্ট বেশ উৎসাহ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশংসা করতে লাগলেন, “অ্যাডের কালার গ্র্যাডিং, স্টোরিটেলিং আর সবচেয়ে বড় কথা—মডেলের এক্সপ্রেশন! এক কথায় জাস্ট অসাধারণ! এই মডেলকে তোমরা কোথা থেকে খুঁজে বের করলে প্রজেক্টের থিমের সাথে ওনার ফেস অ্যান্ড গ্রেস হান্ড্রেড% পারফেক্ট ম্যাচ করেছে!”

‎​সবার এই প্রশংসার জোয়ারে আরমান যখন হতভম্ব ও তোতলাচ্ছে, ঠিক তখনই মিনার চটপটে ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। সে আরমানের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি কিন্তু চরম দুষ্টামি ভরা হাসি ফুটাল। তারপর ধীরেসুস্থে তাকে আলতো করে একপাশে সাইড করে দিয়ে একদম প্রফেশনাল বিজনেস এক্সিকিউটিভের মতো সবার সামনে এসে দাঁড়াল।
‎​মিনার নিজের স্যুটটা একটু সোজা করে নিয়ে সকলের মনোযোগ নিজের দিকে আকর্ষণ করে বলে উঠল—
‎”লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! আজকের এই স্পেশাল প্রেজেন্টেশন এবং আমাদের ব্র্যান্ড নিউ প্রোডাক্টের এই এক্সক্লুসিভ অ্যাড শুটটি আপনাদের কেমন লাগল, সে বিষয়ে যদি আপনারা আর একটু বিস্তারিত ফিডব্যাক দিতেন, তবে আমরা অত্যন্ত অনুগ্রহীত হতাম।”

‎সাথে সাথেই ​ক্লায়েন্টদের প্রতিনিধি দল একবাক্যে বলে উঠলেন, “ফিডব্যাক? ইটস আ হান্ড্রেড আউট অফ হান্ড্রেট! আমরা এই প্রোডাক্টের লঞ্চিং নিয়ে কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করেই এগোতে চাই। দিস ইজ গোয়িং টু বি আ হিউজ হিট!”
‎​কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই টেবিলে চলে এলো বহুল প্রতীক্ষিত সেই অফিশিয়াল ডকুমেন্টস। মিটিং রুমে উপস্থিত ইকবাল শিকদার সাহেবের স্বাক্ষর আর ক্লায়েন্টদের সইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়ে গেল শতকোটি টাকার সেই কাঙ্ক্ষিত ডিল!
‎​একদিকে আরমানের অবস্থা তখন চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভরা। আনিকার শুট হঠাৎ করে কীভাবে বদলে গিয়ে তারই কলিগের এক্স ওয়াইফ শ্রাবণীর শুট হয়ে গেল—এই আকস্মিক ধাক্কা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। কিন্তু অন্যদিকে, প্রজেক্টের এই বিশাল ডিলটি শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই স্বাক্ষরিত হয়েছে ভেবে মনের কোনায় এক ধরনের চতুর খুশি আর স্বস্তির অনুভূতি খেলা করে গেল। সে ভাবল, যাই হোক না কেন, বড় ফান্ডটা তো অন্তত পকেটে এলো!

‎​কিন্তু একদম বিপরীত অবস্থা আনিকার! ইতিমধ্যে সে আরমানের পাশে এসে উপস্থিত হয়েছে।
‎​নিজের এত দিনের সাজানো স্বপ্ন—এক রাতে ‘শিকদার এন্টারপ্রাইজ’-এর অফিশিয়াল ফেস হয়ে বড় মডেল হওয়ার আশা এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে দেখে তার বুক ফেটে কান্না আসছিল। তার সাজগোজ, কড়া মেকআপ আর রাজকীয় ভাব জমাট বাঁধা অপমানে পরিণত হয়েছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মেহুলই তার এই স্বপ্নটা ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে!

‎​আনিকা বিষাক্ত আর হিংস্র চোখে মেহুলের দিকে তাকাল, ইচ্ছে করছিল এখনই চিৎকার করে সব তছনছ করে দেয়। কিন্তু আরমানের চোখের তীক্ষ্ণ ইশারা আর কনুইয়ের আলতো গুঁতো পেয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে থাকতে বাধ্য হলো।
‎​ডিল সাইন হওয়া শেষ হতেই মিনার আবার ক্লায়েন্টদের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা এবার আরও ধারালো আর রহস্যময় হয়ে উঠল।

‎এদিকে ডিল সফলভাবে স্বাক্ষর হওয়া সম্পন্ন হতেই মিটিং রুমের পরিবেশ ভারী ভাব কাটিয়ে একদম হালকা হয়ে এলো। বিদেশি ক্লায়েন্টরা অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে ইকবাল সাহেবের সাথে হ্যাণ্ডশেক করলেন, আরমানের কাজের আনুষ্ঠানিক ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং পুরো টিমকে শুভকামনা জানিয়ে করতালিতে কক্ষটি ভরিয়ে দিলেন। এরপর একে একে নিজেদের কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে তারা বিদায়ের উদ্দেশ্যে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন।
‎​কোম্পানির চেয়ারম্যান ইকবাল সাহেব নিজে ক্লায়েন্টদের সসম্মানে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার জন্য রুম থেকে বের হতে গেলেন। ওনার পেছন পেছন আরমান এবং অন্য পদস্থ কর্মকর্তারাও শিষ্টাচার বজায় রেখে করিডোরের দিকে এগোতে লাগল।

‎​ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে মেহুল ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার বাবার কাছে।
‎​সবাই যখন ক্লায়েন্টদের বিদায় জানাতে ব্যস্ত, মেহুল মৃদু স্বরে, বাবার একদম কাছাকাছি গিয়ে খুব শান্ত কিন্তু গভীর এক গলায় বলল—
‎”আব্বু, ক্লায়েন্টদের বিদায় জানানো শেষ হলে আপনি কি বোর্ডের সব মেম্বারদের নিয়ে আবারও এই মিটিং রুমে একটু ফেরত আসবেন? খুব জরুরি একটা বিষয়ে সবার উপস্থিতি দরকার।”

‎​ইকবাল সাহেব একটু অবাক হয়ে মেহুলের দিকে তাকালেন। মেহুলের চোখের সেই অচেনা গাঢ়তা আর গম্ভীর ভাব দেখে তিনি বুঝতে পারলেন—মেয়ে তার কোনো সাধারণ কারণে এই অনুরোধ করছে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রহস্য বা হিসাব-নিকাশ লুকিয়ে আছে।
‎অতঃপর ​তিনি মেহুলের মাথায় আলতো করে হাত রেখে ধীর গলায় বললেন, “ঠিক আছে মা, তুই রুমে বস। আমি ওদের এগিয়ে দিয়েই আসছি।”

‎​কথাটা বলেই ইকবাল সাহেব ক্লায়েন্টদের সাথে সামনের দিকে হেঁটে গেলেন। আর এদিকে মিটিং রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আরমানের দিকে মেহুল একবার বরফের মতো শীতল নজরে তাকাল, যার অর্থ ​আজকে এই মিটিং রুমেই যে শিকদার এন্টারপ্রাইজের গোপন সব কালো পর্দা একে একে ফাঁস হতে চলেছে, তার কাউন্টডাউন যেন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে!

‎ক্লায়েন্টরা বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পর বিশাল মিটিং রুমটায় হঠাৎ করেই এক ভারী নীরবতা নেমে এলো। এখন ভেতরে শুধু তিনজন দাঁড়িয়ে—মেহুল, মিনার আর আনিকা।
‎​রুম খালি হওয়া মাত্রই আনিকার এতক্ষণের চেপে রাখা ক্ষোভ, রাগ আর অপমান যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল! সে গজগজ করতে করতে তীব্র রাগ নিয়ে মেহুলের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
‎​উত্তেজিত গলায় প্রায় চিৎকার করে বলতে লাগল, “এই! তুই আমার সাথে এমনটা কেন করলি, বল? তুই-ই ওই এড থেকে আমাকে সরিয়েছিস, তাই না? আমি সব বুঝি মেহুল! তুই আমাকে সহ্য করতে পারিস না, তুই আমাকে হিংসা করিস! ইউ আর জাস্ট জেলাস অফ মি!”

‎​আনিকা বিষোদগার করেই যাচ্ছে, অনবরত গালিগালাজ আর তোপ দেগে চলেছে। কিন্তু মেহুলের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই! বরং সে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে তার বাবা ইকবাল শিকদারের ফাঁকা হয়ে যাওয়া মূল রিভলভিং চেয়ারটায় আয়েশ করে গিয়ে বসলো। আনিকার কোনো কটু কথাই যেন তার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছেই না। এদিকে তার শান্ত, বরফ-শীতল চাহনি আর উদাসীনতা আনিকাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলল।
‎​আনিকা মেহুলকে এমন চুপ থাকতে দেখে চরম রাগে আরও একধাপ মেহুলের দিকে তেড়ে আসতে গেল।
‎​ঠিক তখনই মিনার এক লাফ দিয়ে আনিকার সামনে এসে বাঁধ সেধে দাঁড়াল! সে নিজের দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক চটপটে আর দুষ্টামি ভরা হাসি ফুটিয়ে বলল—
‎”আরে আরে! এত রাগ কিসের হে? একটু ধৈর্য ধরুন জনাবা! কুল, জাস্ট কুল! এত অল্পতেই যদি রক্ত গরম করে ফেলেন, তাহলে তো মুশকিল!”

‎​মিনার এক চোখ টিপে বাঁকা হেসে আবার বলল, “এখনই রেগে গেলে চলে? সামনে যে আসল সাইক্লোন আসছে, তার জন্য তৈরি থাকতে হবে না? তাই বলি কি, ধৈর্য ধরুন… ধৈর্য!”
‎​মিনারের এমন নাটকীয় আর রহস্যময় কথা শুনে আনিকা এক মুহূর্তে পুরো টাব্বুস বনে গেল! রাগ আর বিভ্রান্তিতে তার মুখটা হাঁ হয়ে গেল—এরা দুজন মিলে আসলে কী ষড়যন্ত বাঁধছে, সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
‎​ঠিক সেই মুহূর্তেই—
‎ক্লিক!
‎​মিটিং রুমের ভারী কাচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন ইকবাল সাহেব। আর ওনার ঠিক পেছন পেছন গটগট করে ভেতরে ঢুকলো আরমান এবং কোম্পানির সব সিনিয়র বোর্ড মেম্বার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
‎​ঘরের আবহাওয়ায় তখন উৎসবের আমেজ! বোর্ড মেম্বারদের মুখে আরমানের স্তুতি আর প্রশংসার খেই যেন কাটছেই না।

‎​একজন বয়স্ক বোর্ড মেম্বার পিঠ চাপড়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ব্রিলিয়ান্ট ওয়ার্ক আরমান! ইকবাল সাহেব, মানতেই হবে—আপনার পর এই শিকদার এন্টারপ্রাইজের ব্যাটন সামলানোর মতো একমাত্র যোগ্য উত্তরসূরী হচ্ছে আপনার এই ছেলেটিই!”
‎​পাশ থেকে আরেকজন কর্মকর্তা বেশ হাত তুলে সায় দিয়ে বললেন, “একদম খাঁটি কথা! আরমান সাহেবের যে দূরদর্শিতা আর পেশাদারিত্ব, শিকদার এন্টারপ্রাইজের ভবিষ্যৎ ওনার হাতেই শতভাগ নিরাপদ। সত্যি, হিরে চিনতে আপনার ভুল হয়নি স্যার!”
‎​সবাই যখন আরমানকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছে, আরমান তখন ঠোঁটের কোণে বিজয়ী ও অহংকারী এক কুটিল হাসি ধরে রেখে বিনীত হওয়ার ভান করছে।
‎​কিন্তু তারা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না—চেয়ারে বসে থাকা শান্ত মেহুলের চতুর মগজে আজ এই ‘যোগ্য উত্তরসূরী’র সব মুখোশ এক ঝটকায় টেনে খুলে ফেলার চরম আয়োজন ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে!

‎আরমান তখন সবার এই অকৃপণ প্রশংসায় আর নিজের সাজানো মাস্টারপ্ল্যান সফল হতে দেখে আত্মহারা! তাই সে অত্যন্ত বিনয়ী আর গাম্ভীর্যের ভান ধরে সবার সামনে এসে দাঁড়াল।
‎​ইকবাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে চোখে কৃত্রিম ভক্তি ফুটিয়ে সে বলে উঠল, “আমি সত্যি আমাদের সম্মানিত চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। উনি যদি আমার ওপর এতটা বিশ্বাস না রাখতেন, তবে আজকের এই বিশাল প্রজেক্ট সফল করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। এই প্রজেক্টের পেছনে আমি রাতের পর রাত জেগে কঠোর পরিশ্রম করেছি। আর আমি ওয়াদা করছি—আগামীতেও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে এই শিকদার এন্টারপ্রাইজকে উন্নতির এক অনন্য শিখরে নিয়ে যাব।”

‎​আরমানের এমন নাটুকে বক্তব্য শুনে রুমে উপস্থিত বোর্ড মেম্বার আর কর্মকর্তারা যখন করতালি আর তৃপ্তির হাসি হাসছেন, ঠিক তখনই পুরো ঘরের সেই উৎসবের আমেজ চুরমার করে দিয়ে একটি ধীর, শান্ত অথচ তীব্র বরফশীতল কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল—
‎​”আসলেই কি আপনি আমাদের কোম্পানির উন্নতি চান, মিস্টার আরমান? আমার তো তা মনে হচ্ছে না!”
‎​আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রশ্নে এক মুহূর্তের জন্য গোটা মিটিং রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল! থমকে গেল সকলের প্রশংসার হাসি। বিষম খাওয়ার মতো চমকে উঠে সবাই ঘুরে তাকাল ইকবাল সাহেবের মূল রিভলভিং চেয়ারে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকা মেহুলের দিকে।

‎​আরমান চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, “তুই কি বলতে চাইছিস, মেহুল?”
‎​মেহুল তার তীক্ষ্ণ নজর আরমানের ওপর নিবদ্ধ রেখে বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলে উঠল—
‎​”প্রথমত, ‘তুই’ নয়… আমাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করুন, মিস্টার আরমান! আপনি কি ভুলে গেছেন কোম্পানির ডিরেক্টর আর চেয়ারম্যানের মেয়ের সাথে অফিশিয়ালি কীভাবে কথা বলতে হয়? একজন পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে ন্যূনতম এই কমনসেন্সটুকুও কি আপনার নেই?”
‎​মেহুলের এই সপাটে চড় মারা মতো উত্তরে আরমান একদম থতমত খেয়ে গেল! ভরা মিটিং রুমে সকলের সামনে এভাবে অপমানিত হয়ে তার মুখ এক লহমায় ফ্যাকাশে আর রক্তশূন্য হয়ে গেল। অপরদিকে ​পাসেই দাঁড়িয়ে থাকা মিনার আর তার হাসি চেপে রাখতে পারল না, সে সোজা ‘ফিক’ করে হেসে ফেলল! মিনারকে হাসতে দেখে আরমান রাগে অন্ধ হয়ে যখন মিনারের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। তখনই মিনার খুব নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ‘চুপ’ থাকার ইশারা করল।

‎​এদিকে নিজের ব্যক্তিগত চেয়ারে বসে থাকা মেহুলের এই অভূতপূর্ব ব্যক্তিত্ব আর বিচক্ষণ রূপ দেখে ইকবাল সাহেবের মনের ভেতরের সব উদ্বেগ যেন এক লামহায় মুছে গেল। তিনি নিশ্চুপ হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আর ওনার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পরম তৃপ্তি ও গর্বের এক মুচকি হাসি!
‎”তো মিস্টার আরমান… আপনি কি আদৌ আমাদের এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একটুও চিন্তা করেন?”—মেহুল তার বরফশীতল দৃষ্টি আরমানের চোখে সোজা নিবদ্ধ রেখে আবার প্রশ্নটা করল।
‎​আরমান দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত ও আস্থার সুরে জবাব দিল, “অবশ্যই! আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আর ভবিষ্যতেও করব এই কোম্পানিকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে। শিকদার এন্টারপ্রাইজকে আমি নিজের থেকেও বেশি গুরুত্ব দিই!”
‎আরমানের কথা শুনতেই ​মেহুল তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল, “তাই নাকি? কিন্তু আমার কাছে তো একদম অন্য খবর আছে মিস্টার আরমান! আপনি কোম্পানির কথা তো দূরের কথা, বরং দিনরাত কোম্পানির বারোটা বাজিয়ে কীভাবে নিজের ভাগ্য গুছানো যায়—সেই ভাবনাই বেশি ভেবেছেন।”

‎আকস্মিক মেহুলে এমন কথাতে ​আরমানের মুখ যেন এক লহমায় ফ্যাকাশে হলেও সে গলার জোর বাড়িয়ে প্রতিবাদ করে উঠল, “এসব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন আর মিথ্যা কথা! আপনি বিনা কারণে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সবার সামনে আমাকে হেনস্তা করছেন!”
‎​মেহুল শুধু একটা হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
‎​ঠিক তখনই এতক্ষণ শান্ত থাকা চেয়ারম্যান শিকদার জাফর ইকবাল সাহেব গর্জে উঠলেন, “মেহুল কেন তোমাকে বিনা কারণে হেনস্তা করতে যাবে আরমান? আর তোমাকেই বা অপমান করে ওর কী লাভ, শুনি?”
‎​আরমান এক বিষাক্ত চাল চেলে চতুরতার হাসি দিয়ে বলল, “কারণ একটাই মামু! কারণ আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে না করে তার মামাতো বোনকে বিয়ে করেছি! এই ব্যক্তিগত আক্রোশ আর হিংসা থেকেই মেহুল আজ আমাকে সবার সামনে অপমান করতে এসেছে!”
‎​আরমানের কথা শেষ হতেই সুযোগ বুঝে আনিকা এক পা এগিয়ে এলো। মেহুলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বিষোদগার করে বলল, “মেহুল! তুই আমাদের ওপর এতটা হিংসা করিস? ছিঃ! নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে আজ এতদূর নামলি তুই? তোর থেকে অন্তত এই কুৎসিত হিংসাটা কেউ আশা করেনি! শেষে কিনা নিজের বোনের সংসার নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছিস?”

‎​মিটিং রুমে উপস্থিত কর্মকর্তা ও সিনিয়র বোর্ড মেম্বারদের মাঝে অমনি একপ্রকার মৃদু গুঞ্জন আর কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। আরমানের ঘনিষ্ঠ ও কিছু কেনা চাটুকার কর্মকর্তা তো সরাসরিই মেহুলকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলে উঠল—
‎”হ্যাঁ, ম্যাম… আপনি হয়তো ভুল বুঝছেন! আরমান স্যার অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ একজন মানুষ। ওনার ওপর এমন গুরুতর ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ তোলা একদমই অনুচিত!”
‎​চারপাশের এই গুঞ্জন আর তোপের মুখে মেহুল কিন্তু একদম নিশ্চুপ, নিরুদ্বেগ। সে কারো কথা বা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনও মনে করল না। সে শুধু বিষাক্ত এক চোখে আরমান ও আনিকার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
‎​অতঃপর মেহুল ধীরেসুস্থে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিনারের দিকে একটা সুনির্দিষ্ট ইশারা করল।
‎​ইশারা পাওয়ার সাথে সাথেই মিনার আগে থেকে প্রস্তুত রাখা হাতের ট্যাবে নিজের আঙুলের স্পর্শ রাখলো। আর মুহূর্তের মধ্যে মিটিং রুমের বিশাল প্রজেক্টর স্ক্রিনটির আলো বদলে গেল!

‎​স্ক্রিনে একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল বিস্ফোরক সব তথ্য ও নথিপত্র! বিগত কয়েক বছর ধরে আরমান কীভাবে ভুয়া প্রজেক্ট দেখিয়ে কোম্পানির কোটি কোটি টাকা নিজের বেনামী অ্যাকাউন্টে সরিয়েছে, প্রজেক্টের বাজেট ম্যানিপুলেট করেছে, এমনকি কোম্পানির ফান্ড তছরুপ করে নিজের আর নিজের মায়ের নামে গোপনে দামী জমি ও সম্পত্তি কিনেছে—সবকিছুর পাকা প্রমান, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর রেজিস্ট্রি পেপার সবার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে লাগল!
‎​হঠাৎ করে এত বড় আর লোমহর্ষক সত্য প্রকাশ পেতেই পুরো মিটিং রুম যেন এক নিমেষে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! উপস্থিত সবাই ধপ করে নিজেদের চেয়ারে চেপে বসল। ইকবাল সাহেব তো চরম মানসিক ধাক্কায় যেন তখন রীতিমতো হোঁচট খেলেন! যাকে তিনি নিজের ছেলের মতো বিশ্বাস করে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিলেন, সেই ​বিশ্বাসঘাতক হয়ে এত বড় জালিয়াতি করবে—তা তিনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি!
‎​অন্যদিকে, আরমানের কপাল বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরতে শুরু করল। আনিকার মুখের সব রং উবে গিয়ে সে একদম চুপসে গেল।
‎​বোর্ড মেম্বাররা ক্ষোভে ফেটে পড়ে একে একে আরমানকে তীব্র জেরা করতে শুরু করল—”এসব কী আরমান সাহেব?! উত্তর দিন! আমাদের কোম্পানির ফান্ডের টাকা দিয়ে আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি কীভাবে কেনা হলো?”

‎​আরমান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত উঁচিয়ে এখনো চিৎকার করতে লাগল, “নাহ! এসব ষড়যন্ত্র! সব ফ্যাব্রিকেটেড পেপারস! আমায় ফাঁসানো হচ্ছে!”
‎তখনই ​মেহুল বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তার বাবার বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত সহকারী লিয়াকত সাহেবকে ডেকে পাঠাল। যিনি আগেই দরজার বাইরে ফাইল হাতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেহুলের ডাকে ভেতরে প্রবেশ করে তিনি একটি মোটা লিগ্যাল ফাইল টেবিলের ওপর রেখে সবার সামনে তুলে ধরলেন। সেখানে আরমানের গত কয়েক বছরের প্রতিটি আর্থিক কুকীর্তি, জালিয়াতি এবং পদের অপব্যবহারের হাড়হাভাতে রেকর্ড খোদাই করা ছিল!
‎​উপস্থিত সবাই যখন সেই লিগ্যাল ফাইলের পাতার পর পাতা দেখে তাজ্জব হয়ে গেছে, ঠিক তখনই মেহুল পুরো রুমে চূড়ান্ত বোমটি ব্লাস্ট করল!
‎​মেহুল ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ও গম্ভীর গলায় ঘোষণা করল—
‎”শুধু আর্থিক জালিয়াতিই নয়… বিগত বছরগুলোতে মিস্টার আরমান শিকদার এন্টারপ্রাইজে যতগুলো বড় বড় প্রেজেন্টেশন, আর্কিটেকচারাল ডিজাইন আর কনসেপ্ট সাবমিট করে বাহবা কুড়িয়েছেন… তার একটিও ওনার নিজের তৈরি নয়! ওগুলো সবকটি ছিল আমার তৈরি, আমার নিজের হাতে আঁকা ও ডিজাইন করা!”

‎​কথাটা শোনামাত্রই সবাই আবারও চরম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল!
‎​আরমান নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে পাষণ্ডের মতো চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যা কথা! চরম মিথ্যা! ও কোনোদিন আমাদের বিজনেস পলিসি বা ডিজাইন ডায়াগ্রাম বুঝতেই পারে না! এসব ডিজাইন সম্পূর্ণ আমার নিজের তৈরি!”
‎ঠিক তখনি ​মিনারের ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি হাসি ফুটলো। সে প্রজেক্টরের দিকে তাকিয়ে ট্যাবে একটু জুম ইন করল। তৎক্ষনাত আজ দুপুরে সদ্য সাইন হওয়া সেই শতকোটি টাকার আন্তর্জাতিক ডিলের প্রেজেন্টেশন ও মূল ডিজাইনটি স্ক্রিনে বিশাল করে ভেসে উঠল।
‎​মিনার প্রজেক্টরের আলো স্ক্রিনের একদম নিচের দিকে একটা সূক্ষ্ম ওয়াটারমার্ক কোণায় জুম করল। সেখানে দেখা গেল এক অদ্ভুত ও গোপন জিওমেট্রিক প্যাটার্ন!

‎​মিনার সবার দিকে তাকিয়ে প্রফেশনাল ভঙ্গিতে বুঝিয়ে বলল—
‎”লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! আপনারা হয়তো জানেন যে আরমানের সাথে একসময় মেহুলের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো, তো সেই হিসেবেই আরমান বিগত বছর গুলোতে এই সুযোগটাই লুফে নেয়। সে মেহুলকে ইমোশনাল ব্লকে মেইল করে ওর হাতে ডিজাইন করিয়ে পরে মেহুলের করা ডিজাইন তার থেকে নিয়ে নিজের বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু আরমান জানে না যে মেহুল যখনই কোনো জটিল স্কেচ বা আর্কিটেকচারাল ডিজাইন তৈরি করে, তখন সে নিজের অভ্যাসবশত ক্যানভাসের এক কোণে তার নিজস্ব একটা গোপন সিগনেচার ট্রিক লুকিয়ে রাখে। যা সাধারণ চোখে ধরা পড়া অসম্ভব!

‎ আর আমাদের মহান ‘মাস্টারমাইন্ড’ আরমান তো মেহুলের ফাইল চুরি করে ডিরেক্ট সাবমিট করত, তাই সে কোনোদিন এই সিগনেচারের রহস্য জানতেই পারেনি!”
‎​সত্যের প্রতিটি পর্দা একে একে উন্মোচিত হতেই মিটিং রুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। যে আরমান একটু আগেও সবার চোখে ‘যোগ্য উত্তরসূরী’ ও হিরো হয়ে বিরাজ করছিল—চোখের পলকে সে চরম অপরাধী, চোর ও এক নিকৃষ্ট জিরোতে পরিণত হলো!
‎​ক্লিক!
‎​ঠিক তখনই মিটিং রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল প্রস্তুত থাকা পুলিশের একদল অফিসার! মিনার আগেই সমস্ত প্রমাণসহ পুলিশকে খবর দিয়ে রেখেছিল। যার ফলে পুলিশ অফিসাররা সোজাসুজি এগিয়ে এসে আরমানের হাতে পরাল ঠাণ্ডা ধাতব হাতকড়া! শুধু আরমানই নয়, মিটিং রুমে বসে থাকা তার যে কয়েকজন কেনা ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা তাকে এই জালিয়াতিতে সাহায্য করত, পুলিশ তাদেরও একে একে গ্রেপ্তার করে আটক করল আর এদের মধ্যে শ্রাবনীর প্রাক্তন স্বামী আলতাফ মাহমুদও একজন হিসেবে ছিলো।

‎​আরমানকে যখন পুলিশ টানতে টানতে রুম থেকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আতঙ্কে আনিকা কান্নাকাটি করতে করতে সাথে সাথে সুমনা বেগমকে ফোন করে পাগলের মতো সবটা জানাতে জানাতে পুলিশের পেছন পেছন ছুটে বেরিয়ে গেল।
এদিকে রুমের দরজা ‎​অতিক্রমের ঠিক শেষ মুহূর্তে আরমান একবার পেছনে ঘুরে মেহুলের দিকে তাকাল। আরমানের চোখে তখন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার একরাশ ভয় ও পরাজয়ের তাণ্ডব… আর তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে রয়েছে এক সীমাহীন শান্তি, আত্মবিশ্বাস আর এক পরম তৃপ্তির শেষ হাসি!
‎​আরমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই শিকদার এন্টারপ্রাইজ এর চেয়ারম্যান শিকদার জাবেদ ইকবাল দ্রুত মিটিং ডেকে আরমানের বিরুদ্ধে বিস্তারিত তদন্তের জন্য একটি বিশেষ ‘ইনকোয়ারি কমিটি’ গঠন করলেন। এবং সেখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো—এই জালিয়াতির সাথে শিকদার এন্টারপ্রাইজের ভেতরে বা বাইরে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না; সবার বিরুদ্ধেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে!

‎একই সাথে ইকবাল সাহেব উপস্থিত লিগ্যাল টিম ও পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে সহযোগিতা চেয়ে ঘোষণা করলেন—
‎​”আরমান এবং এই জালিয়াতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকের সমস্ত অফিশিয়াল ও ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে ফ্রিজ ও সিজ করতে হবে! সেই সাথে কোম্পানির ফান্ড তছরুপ করে শিকদার এন্টারপ্রাইজের নামে বা অন্য কোনো বেনামে যেসব সম্পত্তি কেনাবেচা করা হয়েছে, তার সবকটির হিসাব বের করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোম্পানির আইনি মালিকানায় ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করুন!”
‎​ইকবাল সাহেবের এই একচ্ছত্র নির্দেশে উপস্থিত সকলে সর্বসম্মতিক্রমে সম্মতি জানালেন। অন্যদিকে কয়েক মুহুর্তের মাঝেই তাসের ঘরের মতো এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল আরমানের বহু বছরের সাজানো সাম্রাজ্য।
আইনি দলের প্রধানও তখনই প্রমানের সমস্ত নথিপত্র স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সবাই যখন একে একে ‎​রুম ছেড়ে বিদায় নিয়েছে তখন মেহুল জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে পুলিশ ভ্যানটি আরমানকে নিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে শিকদার এন্টারপ্রাইজের সীমানা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখেই মেহুল তার বুকের ভেতর দীর্ঘদিনের এক জমিয়ে রাখা ভার মুক্ত হওয়ার স্বস্তি অনুভব করল। বিচার অবশেষে শুরু হয়েছে!

মেহুলের জানা নেই সে কতোক্ষন ওভাবে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাত কারো হাতের মোলায়েম স্পর্শে তার ধ্যান ভাঙ্গে। পাশ ফিরতেই সে দেখে তার বাবা ইকবাল সাহেব ধীর পায়ে মেহুলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওনার চোখে আজ আর কোনো দ্বিধা কিংবা দুশ্চিন্তার ছায়া নেই, সেখানে শুধুই জমে আছে একরাশ স্বস্তি আর পরম তৃপ্তি।
‎​তিনি মেহুলের একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত পরম মমতায় মেয়ের মাথায় নিজের হাতটা রাখলেন, তারপর চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলে উঠলেন—

‎​”আজকে তুমি প্রমাণ করে দিয়েছ মা… তুমি-ই আমার আসল ও যোগ্য উত্তরসূরী! তুমি জাবেদ ইকবালের রক্ত, অপ্সরী মেহুল ইকবাল! আজ বাবা তোকে নিয়ে খুব গর্ববোধ করছে মা, খুব গর্ব করছে তোকে নিয়ে!”
‎​কথাগুলো বলতে বলতে ইকবাল সাহেবের চোখের কোণে জল জমে উঠল। তিনি আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে, মেয়ের প্রতি অশেষ ভালোবাসা আর ভরসা নিয়ে ধীর পায়ে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
‎​বাবার এই কথাগুলো আর ওনার মাথার ওপর রাখা পরম মায়ার হাতটা মেহুলের হৃদয়ের সবকটি ক্ষত যেন এক লহমায় ধুয়েমুছে সাফ করে দিল! মেহুল এক মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো বুজে শান্ত এক নিঃশ্বাস ফেলল। তখনই ‎​মিনার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে হাসল। মিনার দেখলো ভেঙে গুড়িয়ে পড়া এক রমনীর আবারো মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়ানোর এক চরম দৃশ্য। কজনই বা পারে এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের শাস্তি দিতে।

‎পুলিশ ভ্যানের সাইরেনের শব্দটা অনেক্ষণ হলো শহরের ব্যস্ত কোলাহলে মিলিয়ে গিয়েছে । মিটিং রুমের সবাই ততক্ষণে যার যার কাজে ব্যস্ত হতে শুরু করেছে, আর মেহুল দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কাচের জানালার পাশে। তার চাহনি স্থির, অবয়বে অদ্ভুত এক স্তব্ধতা।
‎​মিনার ধীর পায়ে মেহুলের আরো পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। সচরাচর তার মুখে যে দুষ্টুমি মাখানো হাসিটা থাকে, এখন সেখানে গভীর এক ভাবুকতা। সে মেহুলের দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আরমান তো অবশেষে তার যোগ্য শাস্তি পেলো… জাল বিছিয়ে নিজেই তাতে আটকে গেল। এবার তবে কী করবি মেহুল? মিশন তো কমপ্লিট, তাই না?”
‎​কথাটা শুনে মেহুল হুট করে কোনো উত্তর দিল না। জানালার কাচে নিজের হালকা প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত।
‎​তারপর ধীরেসুস্থে মিনারের দিকে ঘাড় ফেরাল। মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল খুব সূক্ষ্ম, এক বিষাক্ত আর হাড়হিম করা বাঁকা হাসি।

‎​”উহু…” মেহুল মৃদু মাথা নাড়ল, যার কণ্ঠে ভর করে নামল চরম এক শীতলতা— “ও এখনো পুরোপুরি শাস্তি পায়নি, মিনার। যে খেলায় ও আমার জীবনটা বাজি রেখেছিল, সে খেলায় সামান্য পুলিশি ঝামেলা বা জেল খাটা দিয়ে হিসেব মেটে নাকি?”
‎​মিনার ভ্রু কুঁচকে অবাক চোখে তাকাল, “মানে? তুই আর কী ভাবছিস?”
‎​মেহুল তার জিরো পাওয়ারের চশমাটা একহাতে একটু সোজা করে নিল। তার চোখের গভীর অন্ধকার যেন ভেতরের কোনো এক অগ্নিকাণ্ডের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সে মিনারের দিকে একপা এগিয়ে এসে একদম ফিসফিস করে বলল—

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৬

‎​”ওটা তো ছিল কেবল দাবা খেলার ঘুটি সাজানো আর ওদের অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার সূচনা মাত্র… আসল আর চূড়ান্ত চালটা তো এখনো বাকি ব্রো ! যে চালটা এবার ওদের শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলবে।”
‎​মিনারের বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল! মেহুলের এই চোখের চাহনি আর শান্ত কণ্ঠের ভেতরের হিংস্র রূপটা সে আগে কখনো দেখেনি। মিনারের মনে হলো সেযেন এক নতুন মেহুলকে দেখছে। মেহুল আজ যেন সত্যিই এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। ঠিক তখনই ‎​মিটিং রুমের জানালার কাচের বাইরে আকাশ ধীরে ধীরে কালো মেঘে জমে উঠছে—যেন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৭