তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪৩
নীতি জাহি
টিচার্স রুমে বসে আছে মোনা, মঞ্জু স্যার এবং এমপি রামিজ হালদার সহ আরো দুজন ডিপার্টমেন্ট হেড। মোনা আকাশী রঙ এর জামদানী পরেছে। হাতে একটা জামদানী ভ্যানিটি ব্যাগ। চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে টেবিলে রেখে ভদ্র ভঙিতে বসে আছে। অপেক্ষা করছে ভিসি স্যার এর জন্য। উনি একটা মিটিং এ আছেন। উনি ও চলে আসলেন এখন। প্রথমে মোনাকে দেখে কেউ বিশ্বাসই করেনি ইশানের মা। ভিসি স্যার নিজেও কিছুটা চমকে গিয়েছিলেন। এমপি কটাক্ষ করে বললো,
‘আরে স্টেপ মম।’
‘আসল কথায় আসুন এমপি সাহেব। ছেলের স্টেপ মম না বায়োলজিকাল মম দিস ইজ নট ইউর ইস্যু। অন এ সিরিয়াস মুড আই কান্ট এক্সেপ্ট ইউর গ্র্যান্ড ডটার এজ মাই ডটার ইন ল। টেল হার নট টু ডিস্টার্ব মাই সান।’
‘ মুখ সামলে কথা বলো মেয়ে, ভদ্রতা শিখোনি তুমি।’
‘ শিখেছি বলেই আমার ভদ্র ছেলেটার পেছনে আপনার অভদ্র নাতনী চরকির মত ঘুরছে।’
‘ আমিও আমার নাতনী দিব না। তোমার মত শ্বাশুড়ি যে ঘরে আছে সে ঘরে তো অসম্ভব। নেহাৎ মঞ্জু বলেছিলো সমঝোতায় আসতে, তাই এসেছি।’
‘ কিন্তু দাদাভাই আমি ইশানকে ভালোবাসি।’
সিমি মেয়েটা পাশ থেকে বলে উঠলো। মোনা নিজেকে সংযত করে বললো,
‘ দেখো আম্মু, তোমার বয়সটা আবেগের। আমি নিজেও এই বয়স পার করেছি। শুধু তুমি ভালোবাসলেও তো হবে না, ইশান ও তো বাসতে হবে তাই না! এছাড়া ইশানের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তাই আমি চাচ্ছিনা এটা নিয়ে ঝামেলা হোক। বুয়েটে টিকতে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়। তুমিও পড়াশোনা করে টিকেছো পাগলামি না করে পড়ায় মন দাও। আমার ছেলের পড়াশোনায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে স্যার, আপনি একটু খেয়াল রাখবেন।’
ভিসির দিকে তাকিয়ে মোনা কথাটি বলল। ভিসি খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে জানান দিলো যে,
‘ ইশান আমাদের ব্রাইট স্টুডেন্ট। আমরা আপনার মত গার্ডিয়ান পেয়ে খুশি। ইশানের বাবার সাথে দেখা হয়নি কখনো। আপনাকেই দেখেছি।আপনি কনসার্ন ওর ব্যাপারে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
‘ ধন্যবাদ স্যার আসি তাহলে আজ।’
মোনা ব্যাগ থেকে সানগ্লাস টা বের করে চোখে দিয়ে ইশানের হাত ধরে বের হয়ে আসলো। ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্টের হেড ম্যাম সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ এতটুকু মেয়ে কি ধা*র দেখেছেন। শুনেছি ইমরান শরীফের বিজনেস,সংসার,সন্তান পড়াশোনা সব নিজ হাতে সামলাচ্ছে। পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে,ইংরেজি সাহিত্যে।’
‘ মা হলে এমন হওয়া উচিত।’
মঞ্জু আর রামিজ এর পছন্দ হয়নি এমন কথা। কেনো ওর সম্পর্কে সুনাম করবে। তবে মঞ্জু কিছুটা আশাহত এবং লজ্জিত ভাইঝির কাজে। সিমি কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গিয়েছে। মোনা ইশানকে নিয়ে গাড়ির সামনে চলে গেলো।
‘ ঠিক আছে বাবা,মা আসি।ক্লাস আছে তো, একটু ক্যাম্পাসে যাব।’
‘ মা তোমার ক্যাম্পাসে নিবে? ক্লাস করতে ভালো লাগছে না।’
মোনা ছেলের অবস্থা বুঝে আর কথা বাড়ায়নি নিজ থেকেই নিয়ে যেতে চাইলো ইশানকে। ক্যাম্পাস পর্যন্ত এসে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। চয়নকে ফোন দিলো। সাথে আরো কয়েকজন বন্ধুও এলো। সবাই কার্জন হলের সামনে আসলো। ইশানকে শুধু চয়নই চেনে। ইশান কথা বলছেনা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সবাই একসাথ হলে মধুর ক্যান্টিনে চলে গেলো নাস্তা করতে। মোনার বন্ধু শাহীন এর কাজিন ল’ ডিপার্টমেন্টে পড়ে। সিনিয়র ওদের।ওদের সাথেই এসে বসেছে। বেশ কিছুদিন ধরে মোনা খেয়াল করেছে এই ছেলে মোনাতে ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে চয়ন ছাড়া তেমন কেউ জানেই না মোনা ম্যারিড। গত তিন চার মাসে বিয়ের পর থেকে মোনা ঠিকভাবে ক্যাম্পাসেই আসতোনা। ঝামেলা হবে বলে কাউকে জানানো হয়নি। নোট নিয়ে পড়তো। বাচ্চা ছেলেটা চা দিয়ে গেলো ওদের টেবিলে। টুকটাক নাস্তা হিসেবে সিঙ্গারা, সমুচা ও ছিলো। ইশান কিছু খেতে চাচ্ছে না। মোনা এক ধমক দিলো সবার সামনে,
‘ ইশান খাও। সকালে কিছুই খাওনি। আমিও জোর করিনি। অন্য কিছু খাবে? রাইস আইটেম?’
ইশান কেমন যেন অন্যমনস্ক। ওর মাথায় ঘুরছে অন্যচিন্তা। মোনা কিছুটা আঁচ করলেও এখন চুপ।বাসায় গিয়ে ওটা নিয়ে আলোচনা করবে। মোনা ভাবছে ইশান নিজের বিয়ের কথা বলায় চিন্তিত। ইশান চুপচাপ একটা সমুচা নিলো। আস্তে আস্তে খাচ্ছে। এমন সময় শাহীনের কাজিন মাহিন বলে উঠলো,
‘ মোনাশা কেমন আছো? বেশ করেকদিন তো আসোনি।’
‘ একটু ঝামেলায় ছিলাম বাসায়। শরীরটাও ভালো ছিলোনা তাই।’
‘ কি হয়েছে শরীরের,ডাক্তার দেখাওনি। চল আজ নিয়ে যাই তোমাকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসবো।কালকে তোমাকে মেসেজ দিয়েছিলাম তোমার আইডিতে। সীন করে রিপ্লাই দিলেনা যে।’
‘ ভাইয়া আমি রাতে ফোনে কারো সাথে কথাও বলিনা মেসেজ তো দূরের কথা। ওই টাইম টা আমার একান্ত আপন মানুষদের জন্য।’
‘ আমাকে তোমার পর মনে হয় কেনো?’
চায়ের চুমুক দিলো মোনা। ভাবলেশহীন ভাবে ওর দিকে তাকালো। চয়ন ইশানকে দেখছে। ইশান মাকে দেখছে এবং আস্তে আস্তে খাচ্ছে। মোনা কথাটা এড়িয়ে গিয়ে ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ কি হয়েছে এভাবে খাচ্ছো কেনো? শরীর খারাপ?’
ইশান কেনো যেন সবার সামনে মা ডাকতে ইতস্তত বোধ করছে। কিন্তু মোনা চাচ্ছে ইশান একবার মা ডাকুক।ইশান উত্তর দিলো,
‘ এটা খেতে ইচ্ছে করছে না।’
মোনার ততৎক্ষনাৎ মনে হলো ইশান সিঙ্গারা সমুচা খুব একটা খেতে পারেনা। মোনা পিচ্চি ছেলেটাকে একটা ডাক দিলো। ব্যাগ থেকে দু’শ টাকার নোট বের করে বললো,
‘ যাও তো দুইটা চিকেন খিচুড়ি নিয়ে আসো। একটা তোমার আরেকটা এই ভাইয়ার। তাড়াতাড়ি আনবে কেমন।’
মোনা ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ ইশান এটা রেখে দাও খেতে হবে না। সকালে কিছু খাওনি তো তাই খারাপ লাগছে।’
ইশান খেয়াল করেছে, মা ওকে আব্বু নাহয় বাবা ডাকে।আজ নাম ধরে ডাকছে। তাই ও আর কথা বাড়াচ্ছেনা।ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে বলে, এটা খাও। ইশান অবাক হয়ে দেখে বক্সে নসিলা লাগানো ব্রেড। বন্ধুরা তাকিয়ে তাকিয়ে ওদের দেখছে। মোনা মুচকি মুচকি হাসছে। ইশান মায়ের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতামূলক হাসি দিয়ে আরাম করে খাচ্ছে। শাহীন বলে উঠলো,
‘ মোনা ও কি তোর কোন কাজিন ভাই?’
‘ ওকে দেখলে কি আমার ভাই লাগে?’
‘ হ্যাঁ অনেকটাই?’
মাহিন উত্তর দিলো। চয়ন পুরো ব্যাপারটার মজা নিচ্ছে। এরমধ্যে পিচ্চি খিচুড়ি নিয়ে এসেছে। মোনা শাড়ির আঁচলটা গুটিয়ে নিয়ে হাত ধুয়ে আসলো। প্লেটে খিচুড়ি টা বেড়ে নিলো। অন্যরা চা, সিঙ্গারা খাচ্ছে। মাংস নিয়ে এক লোকমা ইশানের মুখে ডুকিয়ে দিয়ে মাহিনের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখ নিয়ে বললো,
‘ ও আমার ছোট ভাই না। তাই না ইশান?’
এটা মনে হয় ইশানের জন্য ইঙ্গিত ছিলো মাকে মা সম্বোধন এর। ইশান হাসি মুখে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিচ্ছে। চয়ন তখন বলে উঠলো,
‘ দাঁড়া তোর শাড়ির আঁচল গুজা অবস্থায় একটা ছবি তুলি।’
মাহিন ইশানকে প্রশ্ন করলো,
‘কিসে পড় তুমি?’
‘ বুয়েটে আছি সফটওয়্যারে’
‘ ভেরি গুড। মাঝে মাঝে তো ঘুরে যেতে পারো।’
‘ আমি নিজেই তো আসিনা ওকে কি নিয়ে আসবো।এখন থেকে নিয়ে আসব মাঝে মাঝে। বাসায় একা থাকে। একটু একটু করে সারভাইভ করা শিখতে হবে। আমি চাইনা বাবা, তুমি ভেজা বিড়ালের মত হও।’
বাবা সম্বোধনে একটু ধাক্কা খেলো সবাই। তখনই মাহিন বলে উঠলো,
‘ এতক্ষন আমি পুরোপুরি কনফিউশানে ছিলাম তোমাদের সম্পর্ক নিয়ে। এখন আর সন্দেহ নেই। তোমার কোনো ভাতিজা বা ভাইগ্না তাই না?’
এবার ইশান ও হাসছে। তখনই ইশানের ফোন বেজে উঠলো। ইশান ফোন বের করে কল ধরতেই ও পাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠে বললো,
‘ ইশান প্লিজ আমাকে বিয়ে করো নাহলে দাদা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিবে। আমি ম*রে যাব’।
ইশান রাগে ফোনটা কেটে দিলো। বার বার ফোনে রিং হচ্ছে।মোনা ইশানের দিকে তাকাতেই ইশান রাগে গদগদ করে বলে উঠলো,
‘ মা আমি আর পারছিনা,এখন ফোন দিয়ে বলছে আমি নাকি ওকে বিয়ে না করলে ও ম*রে যাবে। আমার বিরক্ত লাগছে।’
মোনা শেষ লোকমা মুখে দিয়ে ইশানের কাছ থেকে ফোনটা নিলো। আশেপাশে সবাই যে তাজ্জব বনে গিয়েছে সেটা লক্ষ্য করলেও এখন উপেক্ষা করে ফোন রিসিভ করলো,
‘ হ্যাঁ সিমি, আমি ইশানের মা,বলো কি সমস্যা?’
ওপাশ থেকে কি যেন বলছে। তার উত্তরে মোনা বললো,
‘ দেখো সিমি,আমি তোমাকে আমার পুত্রবধূ করবোনা। ইশান তোমাকে পছন্দ করেনা। আর আমি তো বললাম আমার ছেলের বউ আমি আরো আগেই ঠিক করে রেখেছি। আমার পুত্রবধূ হবে আমার মনের মত।যাকে আমি শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করবো নিজের মেয়ের মত।তুমি তার বিপরীত। কেন বার বার ছেলেটাকে বিরক্ত করছো। ডাক্তার দেখাও। আমার পরিচিত একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট আছে। আমি নিজেও মাঝে মাঝে যাই যদি তোমার মত পাগলামি করার শখ জাগে। আমার পাগলামি করাটা হালাল। আমি করি তোমার আংকেল এর জন্য। কিন্তু তুমি তো নাজায়েজ পাগলামি করছো মা। যত পাগলামি আছে বিয়ের পর জামাই এর জন্য কইরো। ঠিক আছে ভালো থাকো। ইশানকে আর কল দিবে না।’
ফোন কেটে ইশানের দিকে ফিরে বলে,
‘ ফোন মায়ের কাছে থাক। তুমি আমার গ্রামীন নাম্বারটা ইউজ করবে। তোমার পাপা ছাড়া ওটা কেউ জানেনা। আর এখন থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় রবিন আংকেলকে সাথে নিয়ে যাবে। আমি তোমার ক্ষেত্রে কোনো গাফেলতি চাই না।’
‘ তুমি কি আমাকে বডিগার্ড ঠিক করে দিচ্ছ মা?’
‘ অবশ্যই। ‘
ইশান মুখটা ফ্যাকাসে করে সবার দিকে তাকিয়ে দেখে সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। মোনা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘ ইশান আমার ছেলে।’
মাহিন বিস্মিত হয়ে বললো,
‘ বিয়ে কখন হলো তোমার?’
‘ বিয়ে না হলে ছেলে কিভাবে আসলো?’
‘ এত বড় ছেলে?’
‘ আমার ছেলেটা সুন্দর না? মেয়েদের বদ নজর থেকে বাঁচাতেই পারছিনা।’
শাহীন আর জায়ান রাগ করে বললো,
‘ এটা কি ঠিক করলি। দাওয়াত ও দিলি না। ভাই এর সাথে ও তো পরিচয় করালি না। কবে ট্রিট দিবি বল’
সকাল থেকে মাথা পেইন করছিলো। কেউ জানেনা আজকে সারাদিনের রহস্য। বার বার সবাই ইমরানের কথা জিগ্যেস করছে। আজকে ওর বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে। সেদিন সবার সামনে কাঁদার পর নিজেকে সামলে নিয়েছিলো। আজ আর পারছেনা। হাতটা ধুয়ে চুপচাপ বসে পড়লো চেয়ারে। মুখে কোনো শব্দ নেই। ইশান মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ মা তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?’
‘ বাবা তোমার জিনিয়া আন্টিকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করো তো ফ্রি আছে কিনা? মা যাবো।’
‘ তুমি না কাল গেলে। আন্টি তো মনে হয় আজ ঢাকার বাইরে যাবে। সাইকোলজির উপর রাজশাহী মেডিকেলে একটা সেমিনার আছে বললো না?’
‘ বাবা বাসায় চলো মায়ের শরীর খারাপ লাগছে।’
‘ অসম্ভব আমি তোমাকে এখন কিছুতেই বাসায় নিবনা। তুমি এখানে থাকো সবার সাথে।’
‘ কেনো?’
‘ মা আমি এতটাও ছোট না। আমার যে কারনে মন খারাপ তোমার ও একই কারনে মন শরীর দুটোই খারাপ হয়েছে।বাসায় নিব আর তুমি পাগলামো করবে!! সেটা আমি সহ্য করবো?? আজকে দুনিয়ার কারো সাধ্য নেই তোমার পাগলামো সামলানোর। তুমি এখানে থাকো মা। সবার সাথে থাকো। প্লিজ মা আমার প্রতি একটু সহায় হও। আমি নিজেই আর পারছিনা। ফুফি একটু আগে ফোন দিয়েছে কেঁদেছে। ছোট চাচ্চু,চাচী আম্মু কেউ বাসায় আসছে না। তোমাকে আমি এখান থেকে নানাভাইয়ের বাসায় নিয়ে যাব। আমি আজকে ভুলেও ‘ঔশান প্যালেসে’ যাব না।’
চয়ন ঘটনার আকস্মিকতায় জিগ্যেস করলো,
‘ কি হয়েছে ইশান।কি সমস্যা বাসায়?’
‘ আন্টি আজকে পাপার জন্মদিন। ‘
চয়ন মুখে হাত দিয়ে চুপ করে আছে। বাকিরাতো ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছেনা। মোনা টেবিলে মাথা দিয়ে হেড ডাউন করে আছে। ইশান বলে উঠলো,
‘ আমার জন্মের পর থেকে একটা বছর ও কাটেনি যেদিন আমি আর পাপা মিলে পাপার জন্মদিন পালন করিনি। পাপা কেক কাটা পছন্দ করেনা। এতিম খানা,মাদ্রাসায় খাবার দিয়ে দে। আমি সকালেই সব বুঝিয়ে দিয়েছি সবাইকে। কালকে সারা রাত রুমে পাগলামো করেছে মা। আমি থামাই নি। আজ আমি কোনো ভাবেই বাড়ি যেতে দিব না।’
মোনা ভারী গলায় বলে উঠলো,
‘ ইশান বাবা, আমাকে যেতে দে। আমি ওই রুমে যাব। ওখানে আমার সব। আর না হয় আমার কাছে তোর পাপাকে এনে দে না।আমি আর পাগলামো করবোনা। আর জ্বালাবো না বাড়ির কাউকে।’
‘ দেখেছো আন্টি।আবার শুরু করেছে। মা,আমি কোথায় থেকে এনে দিব পাপাকে। তুমি চিৎকার দিতে পারো,আমি তাও পারিনা। ওই একটা মেসেজ, ইশান মাকে দেখে রেখো। পাপার না থাকাটা আমাকে আজ চেয়ারম্যান ইশান ইমরান বানিয়ে দিয়েছে। আমি নিতে চাইনি অফিসের দায়িত্ব। পাপার চেয়ারে বসলে মনে হয় এই বুঝি পাপা এসে বলছে, সাবাশ আমার ইশান।’ মা তুমি কি চাও আমি কাঁদি। উঠো। প্র্যাকটিস আছে। যেতে হবে।’
‘ আজ না গেলে হয় না।’
মাহিন এতক্ষন পর মুখ খুলে জিজ্ঞেস করলো,
‘ আমি তো ডিটেইলস জানিনা বা জানতেও চাই না। শুধু জিগ্যেস করবো তোমার পাপার কি হয়েছে।’
‘ পাপা নিখোঁজ আজকে চার মাস। আমার পাপাকে অনেকেই চিনে। আপনিও হয়তো চিনবেন?’
‘ কে তোমার পাপা?’
‘ টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল এর ওনার ইমরান শরীফ খান।’
‘ কি বলো তুমি ইমরান আংকেল এর ছেলে? মোনা উনার ওয়াইফ? আমি শুনেছিলাম উনার বিয়ের কথা। আমার আব্বু তো আংকেল এর অনেক পরিচিত। আব্বু তো গিয়েছিলো রিসিপশনে। আমি ট্যুরে ছিলাম বলে যেতে পারিনি’
‘ আপনি গেলে হয়তো মাকে মনে মনে পছন্দ করতেন না। কারণ আমার মায়ের একজন ইমরান শরীফ খান ছিল…।
‘আছে,থাকবে… আমি যেন আর কখনো না শুনি ছিলো শব্দটা। মনে থাকবে ইশান।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪২
‘ এই জেদটাই তো চাচ্ছিলাম মা,উঠো। পাপা এসে দেখবে তার মোনালিসা কেঁদে সমুদ্র বানিয়েছে। তুমি পাপার গর্ব মা। তুমি, আমি মিলে পাপাকে চমকে দেব। জন্মদিনের বেস্ট গিফট টা দিব।’
আরো বেশকিছুক্ষন থেকে দুজনই চলে গেলো প্র্যাকটিসে। নতুন ভাবে নিজেদের তৈরি করছে মা-ছেলে। নতুন সংগ্রামে।
