ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৪
মারিয়াম ফুল
“আপনি তো আমার স্বামী নন, ? তাহলে কোন অধিকারে আমাকে স্পর্শ করেছেন? কোন হকের কথা বলছেন আপনি?”
“…অতএব, আদালত আসামিকে সাত বছরের কারাদণ্ড প্রদান করল।”
বিচারকের শেষ শব্দটা যেন পুরো আদালত কক্ষে ঝড় তুলে দিল। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই একপাশে বসে থাকা রেহানা চৌধুরী অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। এতক্ষণ যে পাথরের মতো নিজেকে সামলে রেখেছিলেন, সেই কৃত্রিম বাঁধ আর টিকল না। পাশে বসা হামজা চৌধুরী বাকরুদ্ধ হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রেহানা চৌধুরীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা তাঁর জানা নেই, নিজেকে সামলাবেন না নিজের স্ত্রীকে সামলাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি।
অন্যদিকের বেঞ্চে বসা মেঘলা—কতদিন… কতদিন পর আজ বোনকে দেখল সে!অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, বোনকে একটা বার বুকে জড়িয়ে ধরতে পারল না, তার ভালো-মন্দের খবরটুকুও নেওয়ার সুযোগ হলো না। সায়েদ ইমরানের অবস্থাও ক্রমশ ভেঙে পড়ছেন।
আর রুদ্র?
তাহলে কি তাদের বিচ্ছেদ এভাবেই অবধারিত ছিল? ভাঙা কাচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে গেল সব লালিত স্বপ্ন?
সাত বছর… এই দীর্ঘ সাতটি বছর! এই অন্তহীন সময়ে মেহের আর অন্তুর নিষ্পাপ অনাগত সন্তানের কী হবে?
“নাহ…!”
একটা তীব্র আর্তচিৎকার করে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল মেহের। বুকটা দ্রুত উঠানামা করতে থাকল, যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।কপালে জমে উঠেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আজকেই আদালত থেকে ফিরে আসার পর ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরে কখন যে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না।
ঘরের জানলা-দরজা সব বন্ধ। চারপাশটা নিস্তব্ধ, শুধু দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটায় তখন ‘টিক টিক’ শব্দ অনবরত এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে চলেছে। মেহের দুই হাতে নিজের মুখটা ঢাকল। শরীরটা এখনো কাঁপছে। না, ওটা সত্য ছিল না! ওটা শুধুই একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্নটা এতটা জীবন্ত আর ভয়াবহ ছিল যে, মেহেরের রূহ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে।সাত বছরের কারাদণ্ডের সেই নির্মম রায় যেন এখনো তাঁর কানে অবিরাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
নিজেকে সামলাতে মেহের বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে ওয়াশরুমে গেল। চোখে-মুখে বেশ কয়েকবার ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিতেই ওর ভেতরের অবশ ভাবটা কিছুটা কাটল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ও যখন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল, ওঁর হাত দুটো আপনা-আপনি ওর পেটের ওপর চলে গেল। আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে, বিবর্ণ অবয়বটার দিকে তাকিয়ে মেহেরের মনের ভেতর এক জোড়া প্রশ্ন অনবরত কুঠারাঘাত করতে লাগল—
রুদ্র কেন ওর স্বপ্নে আসবে? কেন ওর অবচেতন মন রুদ্ররের মাঝেই নিজের মুক্তি খুঁজছে?
মেহের কোনোমতে নিজের বিক্ষিপ্ত মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই ঘরের বন্ধ জানালার ওপাশ থেকে, আকাশ চিরে ভেসে এলো মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি। ‘আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…’
আজানের সুর মেহেরের আহত মনে যেন এক অদৃশ্য শান্তির প্রলেপ হয়ে নেমে এলো।সে পরম একাগ্রতায় আজানের জবাব দিল। তারপর বেশ খানিকটা সময় নিয়ে, ওযু করল। ওযুর পানির প্রতিটি ফোঁটা যখন ওর শরীর ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, ওর মনে হচ্ছিল এই শীতল পানির সাথে ওর মনের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অবসাদ আর পাপ যেন ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে।
নামাজের মুসাল্লাটা বিছিয়ে মেহের জায়নামাজে দাঁড়াল। মাগরিবের নামাজ শেষ করতে ও আজ অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিল। প্রতিটি সেজদায় ও যেন নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিচ্ছিল।
নামাজ শেষে ও যখন দোয়ার জন্য দুই হাত তুলল, ওর হাত দুটো যেন স্বাভাবিকের চেয়ে আরও একটু বেশি প্রশস্ত হয়ে ওপরে উঠে গেল। সচরাচর মানুষ এভাবে হাত তোলে না। দূর থেকে যে কেউ ওর এই আকুতি দেখলে বলতে বাধ্য হতো…. এই বান্দা আজ তার রবের দরবারে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, চলমান কঠিন সময় থেকে মুক্তি এবং জীবনের সকল অন্ধকারের অবসান প্রার্থনা করছে। জাগতিক সব অবলম্বন যেন একে একে ফুরিয়ে এসেছে। তাই শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা আর শেষ আবেদনটুকু সে তুলে দিয়েছে তাঁরই কাছে, যিনি কখনো তাঁর বান্দাকে নিরাশ করেন না।
দোয়ার শুরুতে মেহের বেশ কয়েকবার দরুদ শরিফ পাঠ করল। দাদীর কাছে কতবার শুনেছে—যেকোনো দোয়া বা ইবাদতের আগে ও পরে দরুদ পাঠ করলে, আল্লাহর দরবারে সেই দোয়া নাকি আর ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; মনের ভেতর এক স্বর্গীয় প্রশান্তি নেমে আসে। মেহের আজ তার আল্লাহর ওপর সেই পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করল।
ওঁর চোখ বেয়ে তখন অশ্রুধারা নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে। মেহের কম্পিত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল,
“ইয়া সামী’… হে সর্বশ্রোতা, নিশ্চয়ই আপনি আপনার এই অসহায় বান্দার ফিসফিসানি শুনতে পাচ্ছেন। ইয়া আল্লাহ, এই বিশাল দুনিয়াতে আপনার কত লক্ষ-কোটি বান্দা আছে, যাদের ইবাদতে আপনার আরশ মুখরিত। কিন্তু আপনি ছাড়া আমার তো আর কোনো দ্বিতীয় রব নেই!
আপনি সবকিছু শুনতে পান, সবকিছু দেখতে পান। ইয়া রব, আমি এই অথৈ সাগরে ভেসে যাওয়া এমন এক ভাঙা নৌকার মতো, যার কোনো কূল-কিনারা নেই, কোনো মাঝি নেই। ইয়া আল্লাহ, আমি জানি আমি গুনাহগার, আমি অপরাধী। কিন্তু আমি এটাও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, আপনার ক্রোধের চেয়ে আপনার দয়া অনেক বড়। আপনি আপনার বান্দাদের ভালোবাসতে কোনো কার্পণ্য করেন না।”
মেহের নিজের ওড়নার আঁচলটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল,
“ইয়া আল্লাহ! আজ আমি আপনার দরবারে কোনো সাধারণ পরিচয়ে দাঁড়িয়ে নেই… আজ আমি আপনার কাছে একজন অনাগত নিষ্পাপ বাচ্চার জননী হয়ে হাত পেতেছি। ইয়া আল্লাহ, আপনি তো সব জানেন, আপনি তো অন্তর্যামী। মায়ের জঠরে থাকা এই সন্তানের কি কোনো অপরাধ আছে? নিশ্চয়ই আপনি সব অবগত আছেন। আমাকে এভাবে মাঝপথে হেরে যেতে দিয়েন না আল্লাহ… আপনার এই দুর্বল বান্দাকে দুনিয়ার মানুষের কূটচালের কাছে হেরে যেতে দিয়েন না!ল।”
মেহেরের চোখের জল তখন জায়নামাজ ভিজিয়ে দিচ্ছে। মেহের তার কান্নায় রুদ্ধ হয়ে যাওয়া গলায় আবার বলল,
“আর যদি… যদি আপনার কোনো মহৎ ইচ্ছায় আমার কপালে পরাজয়ই লেখা থাকে, তবে আমি মাথা পেতে নেব, মেনে নেব এটাই আপনার সর্বোত্তম ফায়সালা। ইয়া আল্লাহ, আপনার ফায়সালা আর হুকুমের বাইরে যাওয়ার সাধ্য আমার মতো নগণ্য বান্দার নেই। ইয়া আল্লাহ, আপনি চাইলে পাহাড় ভেঙে সমুদ্র করতে পারেন, মরুভূমিতে নদী বহাতে পারেন ; নিশ্চয়ই আপনি আমাকেও এই রহস্যঘেরা বিপদের অন্ধকার মুখ থেকে টেনে তুলতে পারেন। ইয়া আল্লাহ… আমি আজ এমন এক কালস্রোতে সাঁতার কাটছি, যার গভীরতা আমি জানি না।আপনি আমার জন্য সাহায্যের কোনো অদৃশ্য দূত পাঠিয়ে দিন ইয়া আল্লাহ… ইয়া রব্বুল আলামীন”
দোয়া শেষ করে মেহের যখন মুখের ওপর দুই হাত মোনাজাত টেনে নিল, তার মনের ভেতরের সেই পাহাড়সম ভয়টা যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেল। এক অদ্ভুত শীতল শান্তিতে তার বুকটা ভরে উঠল।
আসলে, মানুষের জীবনের এই কঠিন পরীক্ষা আর সংকটগুলো কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয় ; এগুলো আল্লাহর তরফ থেকে আসা এক একটি ডাক। মানুষ যখন চরম বিপদে পড়ে, তখন সে এমন এক পরম নির্ভরতায় রবের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা স্বাভাবিক স্বস্তির সময়ে কখনো সম্ভব হতো না। দুঃখের এই অগ্নিপরীক্ষাই বান্দা ও তার রবের সম্পর্ককে পরিশুদ্ধ করে, যেমন আগুন সোনার খাদ দূর করে তাকে খাঁটি করে তোলে।
সৃষ্টির সব দরজা যখন একে একে রুদ্ধ হয়ে যায়, তখনই মানুষ উপলব্ধি করে—স্রষ্টার অসীম করুণার দরজাটি কখনো বন্ধ হয় না। বরং সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোতেই সেই দরজা আরও প্রশস্ত হয়ে খুলে যায়। মেহেরও আজ জীবনের চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার বিশ্বাসের নোঙরটি আল্লাহর দরবারেই ফেলেছে। পৃথিবীর সব ভরসা যখন টলমল করছে, তখন একমাত্র তাঁর রহমতের ওপরই নির্ভর করছে ওর সমগ্র সত্তা।
জীবনটা যেন আড়াই পাতাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক জটিল গণিতের সমীকরণ। এখানে প্রতিনিয়ত কিছু ভাঙে, কিছু গড়ে; নতুন কিছু যোগ হয়, আবার পুরোনো কিছু চিরতরে বিয়োগ হয়ে যায়। এই বিশাল সমীকরণের সব হিসাব মানুষের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মেলে না, সব অঙ্কের উত্তরও তার জানা হয় না। তবু তাই বলে ঝড়ে দিশেহারা নাবিক যেমন তার কম্পাস ফেলে দেয় না, তেমনি জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। কারণ অনেক সময় উত্তর জানা না থাকলেও সঠিক পথের দিশা ঠিকই থেকে যায়।
বান্দা যখন ভাঙা হৃদয়, ক্লান্ত আত্মা আর নিঃশেষ হয়ে আসা আশা নিয়ে তার রবের দিকে এক কদম এগিয়ে যায়, তখন রব তাঁর অসীম দয়ায় বান্দার দিকে বহু গুণ বেশি এগিয়ে আসেন। মেহেরও জীবনের এই ভয়াবহ দুর্যোগের মাঝেও এক মুহূর্তের জন্য তার ধৈর্য ও বিশ্বাসের সুতোটি হাতছাড়া করেনি।
সে কেঁদেছে, বারবার ভেঙে পড়েছে, দুঃখের ভারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে; তবু তার অন্তর থেকে রবের প্রতি নির্ভরতার আলো নিভে যায়নি। বরং প্রতিটি অশ্রুবিন্দু হয়ে উঠেছে এক একটি নীরব ইবাদত, এক একটি অব্যক্ত প্রার্থনা। সেই কান্না কোনো মানুষের করুণা পাওয়ার জন্য ছিল না; তা ছিল সরাসরি আরশের মালিকের দরবারে নিবেদিত একান্ত আর্তি যেখানে শব্দের চেয়েও হৃদয়ের ভাষা অধিক স্পষ্ট, আর অশ্রুর চেয়েও আন্তরিক কোনো সাক্ষ্য নেই।
নামাজ শেষে মেহের যখন জায়নামাজটুকু আলগোছে গুটিয়ে রাখছিল, তখন তার শরীরের আর মনের ভেতরের ভারী ভাবটা অনেকটাই হালকা মনে হলো। কিছুক্ষণ আগের দীর্ঘ মোনাজাতের পর মনের একদম গহীন কোণে যে অদ্ভুত প্রশান্তিটুকু এসে ভর করেছে, তা তার ভেতরের গত কয়েকদিনের সবটুকু ক্লান্তি আর ভয় নিমেষেই শুষে নিয়েছে। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে মেহের ঘরের চারপাশটায় তাকাল।
ঠিক তখনই ঘরের বন্ধ দরজায় টোকা পড়ল।
“মেহের… মা, ভেতরে আসতে পারি?”
রেহানা চৌধুরীর অত্যন্ত ক্লান্ত, কিছুটা ভাঙা আর কাঁপো কাঁপো কণ্ঠস্বর শুনে মেহের একটু ব্যস্ত হয়ে উঠল। ও তাড়াহুড়ো করে গায়ের ওড়নাটা ভালো করে মাথায় টেনে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর একটু উঁচু গলায় বলল,
“হ্যাঁ মা, আসুন না। দরজা খোলাই আছে, লক করা নেই।”
রেহানা চৌধুরী আলতো করে দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। উনার ডান হাতে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ আর বাঁ হাতে একটা ছোট বাটিতে দুটো খেজুর। মেহের শাশুড়ির দিকে তাকিয়েই থমকে গেল। ও লক্ষ্য করল, গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ রেহানা চৌধুরীর মুখটা অনেক বেশি ফ্যাকাশে আর মলিন দেখাচ্ছে। মেহেরের ওপর দিয়ে চলতে থাকা এই মিথ্যে মামলার মানসিক চাপ এই প্রবীণ মানুষটাকে ভেতরে ভেতরে কতটা শেষ করে দিচ্ছে, তা উনার চোখের নিচের কালি আর ধীর পায়ের চলন দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নিজের একমাত্র ছেলের বউকে নিয়ে উনার এই বয়সে যে কী পরিমাণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে, তা উনার মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়।
তিনি বিছানার এক কোণে এসে বেশ ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসলেন। মেহেরের দিকে তাকিয়ে তার ফ্যাকাশে ঠোঁটে একটা ম্লান, মমতাময়ী হাসি ফুটিয়ে বললেন, “কখন ঘুম থেকে উঠেছ মা? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এখনো ঘুমাচ্ছ, তাই ডাকিনি। ”
মেহের ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রেহানা চৌধুরীর ঠিক পাশে বসল। তার বাড়িয়ে দেওয়া দুধের উষ্ণ গ্লাসটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “ঘুম ভেঙেছে একটু আগে মা। কিন্তু আপনি কেন এই অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্নাঘরে গেলেন? কাজের লোক তো আছেই। শরীরটা তো আপনার ভালো যাচ্ছে না কয়েকদিন ধরে।”
“আমি ভালোই আছি মা,” রেহানা চৌধুরী পরম মমতায় মেহেরের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “আমার কথা বাদ দাও। এখন তোমাকে নিজের আর নিজের সন্তানের খেয়াল রাখতে হবে। ও-ই তো আমাদের সব। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা আছে রে মা… তারপর কোর্টের চূড়ান্ত রায়। এই দিনগুলো যে আমার কেমন কাটার মতো কাটছে, তা আমি আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”
শাশুড়ির মুখে ‘চূড়ান্ত রায়’ শব্দটা শুনতেই মেহেরের চোখের সামনে আবারও সেই দুঃস্বপ্নের মতো দিনগুলোর কথা ভেসে উঠল। যদি তার সাজা হয়ে যায়? এই চিন্তায় মেহেরের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল, গ্লাসের দুধটুকু একটুখানি দুলে উঠল। তবে মেহের এবার আর আগের মতো ভেঙে পড়ল না। জায়নামাজে বসে একটু আগে রবের কাছ থেকে যে মানসিক শক্তি ও কুড়িয়ে এনেছে, তা তার বুকটাকে আজ পাথরের মতো শক্ত করে তুলেছে।
মেহের দুধের গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে স্থির গলায় বলল,
“মা, ওপরওয়ালা কপালে যা ফয়সালা করে রেখেছেন, ঠিক সেটাই হবে। আমি আল্লাহর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি। আপনি অহেতুক দুশ্চিন্তা করে নিজের শরীরটা আরও খারাপ করবেন না। যা হওয়ার তা হবেই।”
রেহানা চৌধুরী মেহেরের এই আকস্মিক শান্ত ভাব আর চেহারার দৃঢ়তা দেখে কিছুটা অবাক হলেন। যে মেয়ে দুদিন আগেও মাঝরাতে ভয়ে কেঁদে উঠত, সেই মেহেরের কণ্ঠে আজ এক অদ্ভুত স্থিরতা। তিনি মেহেরের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে নিয়ে বললেন, “তোমার এই বিশ্বাসটাই যেন আল্লাহ শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখেন মা। তোমাকে এতটা শক্ত দেখলে আমার নিজের বুকের ভেতরের সাহসটাও কেমন যেন বেড়ে যায়।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলেন। ঘরের ভেতর একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো। রেহানা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন। রাত বাড়ছে, অথচ হামজা চৌধুরী আজক ফিরতে বেশ দেরি করছেন। মেহেরও ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, “মা, বাবা এখনো আসেননি ?”
মেহেরের এই কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ড্রয়িংরুমের কলিং বেলটা বেজে উঠল। রেহানা চৌধুরী একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই তো, উনির কথাই বলছিলাম মনে মনে, আর উনি চলে এলেন। তুমি বাকি দুধটুকু আর খেজুর দুটো চটপট খেয়ে নাও মা…” এই বলে তিনি হামজা চৌধুরীর জন্য দরজা খুলে দিতে ঘরের বাইরে গেলেন।
রেহানা চৌধুরী দরজা খুলে হামজা চৌধুরীকে একটা সোফায় বসতে বললেন এবং রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এলেন। মূলত আজকের শুনানির পর হামজা চৌধুরী মেহেরের কেসের ব্যাপারে ওনাদের উকিলের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলেন, যার কারণে উনার ফিরতে এতটা রাত হয়ে গেছে। হামজা চৌধুরীর চোখে-মুখেও ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ।
পানি এগিয়ে দিয়ে রেহানা চৌধুরী অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে হামজা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনো ভালো খবর আছে? কোনো হাল বের করতে পেরেছেন ওনারা?”
হামজা চৌধুরী কোনো কথা বললেন না। তিনি শুধু অত্যন্ত নিরাশ হয়ে মাথা নেড়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন—না, ওনারা কোনো সমাধান পাননি। আর এর স্পষ্ট মানে দাঁড়ায়, মেহেরের শাস্তি হওয়া এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার মাত্র। ত
মেহের নিজের ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ড্রয়িংরুমের এই সব কিছু খুব কাছ থেকে দেখছিল। হামজা চৌধুরি আর রেহানা চৌধুরীর এই অসহায়ত্ব, তার জন্য ওনাদের এই হাহাকার দেখে মেহের আর নিজেকে আড়ালে লুকিয়ে রাখতে পারল না। মেহেদির পায়ে এগিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়াল।
“বাবা…”
হুট করে মেহেরের মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে হামজা চৌধুরী চমকে উঠে মেহেরের দিকে ঘুরে তাকালেন। মেহেরকে বাঁচানোর কোনো পথ তিনি খুঁজে পাননি—এই চরম ব্যর্থতায় তিনি মেহেরের সামনে কেমন যেন অপরাধী বোধ করলেন। উনার মনে হলো তিনি একজন বাবা হিসেবে হেরে গেছেন। কী বলবেন ভেবে কথা হারিয়ে ফেললেন উনার চোখের কোণ জল জমে ভিজে উঠতেই তিনি চশমাটা খুলে তা পরিষ্কার করার বাহানা করতে লাগলেন, যাতে কেউ উনার চোখের পানি দেখতে না পায়।
মেহের আরও কিছুটা এগিয়ে এসে ওনাদের দুজনের একদম সামনে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে আজ কোনো ভয়, দ্বিধা বা জড়তা নেই।
“বাবা, একটা কথা বলি? কিন্তু তার আগে কথা দিন যে, আমি এখন যে কথাগুলো বলব আপনি আমাকে তার জন্য কোন প্রশ্ন করবেন না।
“হামজা চৌধুরী মেহেরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, মেহেরকে তিনি কোন প্রশ্ন করবেন না।
মেহেরাবার বলতে শুরু করল,
“আজ আপনাদের একটা সত্য কথা বলি? মেহেরের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। রেহানা চৌধুরী আর হামজার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে সে মৃদু হাসলো।
“সায়েদ বাড়িতে আমার একটা পরিবার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল কেবলই নামমাত্র। পরিবারের ছায়া ছিল, কিন্তু উষ্ণতা ছিল না। সত্যিকারের পরিবার কাকে বলে, একে অপরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা কাকে বলে, কাউকে আপন করে নেওয়ার অর্থ কী…সেটা আমি এই চৌধুরী বাড়িতে পা রাখার পর আপনাদের কাছ থেকেই শিখেছি।”
মেহেরের চোখদুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এলো।
“আপনারা আমাকে শুধু আশ্রয় দেননি, দিয়েছেন একটা পরিবার। এমন একটা জায়গা, যেখানে আমি প্রথমবারের মতো নিজেকে আপন মনে করেছি। আপনাদের এই ভালোবাসা, স্নেহ আর গ্রহণযোগ্যতার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আপনাদের প্রতি।”
মেহেরের সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক যে খুব একটা ভালো নয়, সে বিষয়ে রেহানা চৌধুরী আগেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তবে মেহেরের মুখে কথাগুলো শোনার পর তাঁর সেই ধারণা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তবুও তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মেয়েটার অতীতের ক্ষতগুলো অকারণে নাড়াচাড়া করার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তাই সব প্রশ্ন নিজের মাঝেই চেপে রেখে শুধু স্নেহভরা দৃষ্টিতে মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“কালকে খুব বেশি হলে কী হবে বাবা? আমার জেল হবে? ফাঁসি হবে?” কিন্তু আমি পরম তৃপ্তি আর শান্তি নিয়ে যাব যে, আপনারা আমাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবেসেছেন, কোনোদিন পর ভাবেননি।
আজ আমি আপনাদের সব কথা বলব, সব সত্যি আজ আপনাদের সামনে একদম খুলে বলব…”
— আমার না আগে … বাকি কথাগুলো মেহের আর সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই
মেহেরের হাতের নরম কবজিতে একটা শক্ত, হাতের টান পড়ল। মেহের সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ধাক্কা খেয়ে ঘুরে তাকিয়েই বড় বড় চোখ করে আতঙ্কে বলে উঠল,
“ক্যাপ্টেন সাহেব…! আপনি? কখন এলেন?”
হামজা চৌধুরী অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকার করার পর তাড়াহুড়োয় রেহানা চৌধুরী দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ই রুদ্র সেখানে এসে পৌঁছায়।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেহেরের কথাগুলো শুনে ফেলে। পুরোটা না শুনলেও এতটুকু বুঝতে তার অসুবিধা হলো না যে মেহের কোন সত্যটা বলতে যাচ্ছে…
মেহেরের কবজিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে রুদ্র তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কালকে সকালে আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট ফ্লাইট আছে। ইন্টারন্যাশনাল রুটগুলো নতুন করে ওপেন হচ্ছে, তাই আমাকে ডিউটিতে যেতেই হবে। তার আগে আমার ফ্লাইটের লাগেজটা ঠিকঠাক গোছানো প্রয়োজন। তুমি এখনই আমার সাথে রুমে এসো এবং লাগেজটা গুছিয়ে দাও।” রুদ্র এক প্রকার মেহেরের কোনো কথার তোয়াক্কা না করে মেহেরকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে টানতে টানতে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
মেহের তার সেই লোহার মতো শক্ত হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ছটফট করে বলে উঠল, “কিন্তু ক্যাপ্টেন সাহেব… আমার কথা তো শুনুন!আমার বাবার সাথে কথা আছে ”
“কোনো কিন্তু না মেহের!” রুদ্র মেহেরকে তার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল, “আগে আমার কাজ করে দাও। স্বামী হিসেবে তোমার ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে, সুতরাং আমার হুকুম তোমাকে মানতে হবে।” এই বলে সে মেহেরকে এক প্রকার জোর করেই টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল এবং এক ঝটকায় মুখের ওপর দরজাটা টেনে লক করে দিল।
এদিকে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী সম্পূর্ণ স্তব্ধ আর বাক্যহারা হয়ে দুইজন বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রবীণ এই দম্পতি কিছুই বুঝতে পারলেন না যে মেহের আসলে ওনাদের কাছে শেষ মুহূর্তে কী বলতে চাইছিল, আর রুদ্রই বা কেন এত তাড়াহুড়ো করে মেহেরেকে এভাবে জোর করে নিজের রুমে নিয়ে চলে গেল।
রুদ্র মেহেরকে রুমে নিয়েছে এসে দরজার লকটা আটকে দিয়ে, মেহেরের কবজিটা ছেড়ে দিতেই মেহের যেন এতক্ষণে একটু শান্তি অনুভব করল। ব্যথায় লাল হয়ে যাওয়া হাতটা অন্য হাত দিয়ে ডলতে ডলতে মেহের তীব্র ক্ষোভ আর বিস্ময় নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল। কিছুটা চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি তো আমার স্বামী নন, ? তাহলে কোন অধিকারে আমাকে স্পর্শ করেছেন? কোন হকের কথা বলছেন আপনি? ”
——— “যে অধিকারে তুমি আমার মা-বাবাকে ‘মা’ আর ‘বাবা’ বলে ডাকো, সেই অধিকারে।”
রুদ্রেরের এহেন উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিল না মেহের। তাই কী বলবে, ভেবে পেল না সে। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে শুধু রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু মেহের এত সহজে দমে যাওয়ার মেয়ে ছিল না। রুদ্রের কথায় মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে।
নাকের পাটা ফুলিয়ে রুদ্রের দিকে তাকাল মেহের। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
—বাহ! কী সুন্দর যুক্তি…. আপনার মা-বাবাকে মা-বাবা বলে ডাকি বলেই বুঝি আপনি যা খুশি তাই করার অধিকার পেয়ে গেলেন?
কথাগুলো বলেই সে দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে নিল।
—”আর কিছু আছে? নাকি অধিকারের তালিকাটা এখনও শেষ হয়নি?”
রুদ্রের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে।
“ আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো? আমাকে এভাবে সবার সামনে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসছিলেন কেন? কী প্রমাণ করতে চান আপনি?”
রুদ্র মেহেরের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখের চাউনি ভীষণ তীক্ষ্ণ। ও অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় পালটা প্রশ্ন করল, “তুমি ওনাদের সামনে সব সত্যি বলতে যাচ্ছিলে, তাই না?”
মেহের একটুও না দমে বুক ফুলিয়ে বলল, “হ্যাঁ, যাচ্ছিলাম। আমার মনে হয়েছে এখন সত্যিটা বলে দেওয়া খুব দরকার। আর কতদিন আমরা এভাবে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলব?
আপনার তো কোনো সমস্যা নেই, আমি যদি সব সত্যি বলেও দিই,তাহলে আপনিই বেঁচে যাবেন। আপনাকে তো আর নতুন করে কিছু বলতে হচ্ছে না, সব দোষ আমার ওপর আসবে আর আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন। তাহলে আপনার এত ভয় কিসের?”
মেহেরের মুখে এই কথা শুনে রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও একটু চিৎকার করে বলে উঠল,
“আর ইউ ম্যাড, মেহের? তোমাকে কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি কি জানো তোমার একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমার মা-বাবার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাবে? ওনারা এই বয়সে ওই সত্যটা নিতে পারবেন না।”
মেহের এবার আর কোনো কথা বলল না, ও শুধু স্তব্ধ হয়ে রুদ্ররের দিকে তাকিয়ে রইল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৩
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, “মিস অ্যারোফোবিয়া ফোবিয়া যদি চুপ থাকেন।আপনি, তাহলেই আমি বাঁচি। আমি সামনে নেব আমার ফ্যামিলিকে, যা করার আমি নিজেই করব, কিন্তু এখন না। আমার হাতে এখন একদম সময় নেই। আমাকে এখনই একটা লম্বা ফ্লাইটে যেতে হবে। এমনকি আমি এটাও জানি না যে আমি কোন দিন ব্যাক করতে পারব…”
