Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৯

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৯
বন্যা সিকদার

রোহান রড উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল‚ “জানিস না মানে? তোদের কোন বাপ বলেছে আমার এই প্রাণ দুটোকে এখানে ধরে আনতে‚ বল আমাকে?
​ঠিক তখনই পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে কারো এক কুটিল‚ পৈশাচিক হাসির শব্দ সশব্দে ভেসে এলো। ​সেই চেনা হাসির আওয়াজ শুনে রোহান হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকাল‚ আর পেছনে তাকাতেই মুহূর্তে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মেয়র সাহেব নিজে। ​এই তিনিই সেই ক্ষমতাধর লোক‚ যিনি দেশের ভেতর থেকে নির্দোষ মেয়েদের সংগ্রহ করে বিদেশে পাচার করেন। আর বিদেশ থেকে রোহান নিজে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ট্রান্সফার করে। মেয়র সাহেবকে এখানে দেখে রোহানে’র ভেতরের রাগটা এক ধাক্কায় যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। ​রোহান ধুপধাপ পা ফেলে হিংস্র বাঘের মতো ধেয়ে গেল মেয়র সাহেবের দিকে। পাশে থাকা কাঠের চেয়ারটায় সজোরে এক লাথি মেরে মেয়র সাহেবের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে গর্জন তুলে উঠল।

​“আপনার এত বড় সাহস কীভাবে হলো যে আমার কলিজা দুটোকে কিডন্যাপ করার অর্ডার দিয়েছেন? আপনি কি ভুলেই গেছেন এই রোহান তালুকদার কে?
​মুহূর্তের মধ্যে মেয়র সাহেবের দু’জন সশস্ত্র বডিগার্ড এগিয়ে এসে রোহানে’র থেকে মেয়র সাহেবকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু রোহানে’র শক্তির সামনে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। ​কিছুক্ষণ পর রোহান নিজেই এক ঝটকায় তাঁর কলার ছেড়ে দিল। নিজের মেজাজ কিছুটা সামলে নেওয়ার জন্য দু-হাত দিয়ে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। পরিস্থিতি বুঝে মেয়র সাহেব নিজ থেকেই কিছুটা নরম হয়ে রোহানে’র কাঁধে হাত রাখলেন। ​রোহান মাথা নিচু করে একটু নিচু স্বরে বলল„
“সরি মেয়র সাহেব। মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল।
​মেয়র সাহেব কুটিল হেসে মাথা নাড়লেন। রোহানে’র এই অনিয়ন্ত্রিত রাগ সম্পর্কে তাঁর খুব ভালো করেই জানা আছে। তবে তিনি ফের কিছু বলার আগেই‚ রোহান হঠাৎ চোখ তুলে কঠোর গলায় বলে উঠল।
​“মেয়র সাহেব‚ আপনি লোক ডেকে এখনই আমার জান দুটোকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন। ওদেরকে এমন কুৎসিত আর নোংরা জায়গায় এক সেকেন্ডের জন্যও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার সহ্য হচ্ছে না।
​রোহানে’র এই আকস্মিক হুকুম চাবুকের মতো এসে বাজল মেয়র সাহেবের কানে। রোহানে’র এমন প্রস্তাবে তিনি বিন্দুমাত্র খুশি হতে পারলেন না বরং তাঁর ফর্সা মুখের রঙ এক লহমায় হিংস্র রূপ নিল। তিনি কণ্ঠস্বর চরম শক্ত করে বলে উঠলেন। ​

“এসব কী ফালতু কথা বলছো রোহান? আজ রাত ১২টার আগেই বায়ারদের কাছে আমাদের গুনে গুনে ঠিক একশত মেয়ে বিদেশে পাচার করতেই হবে। এখন যদি ওই দুটো মেয়েকে ছেড়ে দিই‚ তবে এই শেষ মুহূর্তে বাকি দুজন মেয়ে আমি কোথা থেকে এনে দেব? ওদের আমি কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দিতে পারব না রোহান।
​রোহানে’র চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণ লাল হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছিল হাতের কাছে থাকা রডটা দিয়ে লোকটাকে এখনই পিটিয়ে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিতে কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতির শিকলে সে বড্ড নিরুপায়। সে রাগে দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে আওড়াল‚
​“মেয়র সাহেব‚ আপনি যদি বয়সে আমার বাবার সমতুল্য না হতেন‚ তবে এতক্ষণে আপনাকে নিজের হাতে আমি এখানে জ্যান্ত কবর দিতাম। আপনি আমার নিজের প্রাণদের পাচার করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন? আপনার কলিজা কাঁপছে না? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন যে এই রোহান তালুকদার চাইলে কী কী করতে পারে? তার সাথে উঁচ গলায় কথা বলার পরিণাম কী হতে পারে‚ তা কি ফের মনে করিয়ে দিতে হবে?

​“রোহান তুমি আমার সাথে গলা চড়িয়ে কথা বলছ?
​মেয়র সাহেব বিকট চিৎকার দিয়ে উঠলেন! কিন্তু সেই চিৎকারকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করল না রোহান। সে বিষাক্ত ও তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঠান্ডা গলায় বলল‚ “যে রোহান তালুকদারকে জেল থেকে মুক্ত করে বের করে এনেছিল। তাকে কিন্তু নিজের হাতেই রোহান তালুকদার এই পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য তার অস্তিত্ব মুছে দিয়েছিল। মনে আছে তো সেটা?
​মেয়র সাহেব এক লহমায় বুঝতে পারলেন রোহানে’র সাথে শক্তি বা কথার লড়াইয়ে এখন সে কোনো ভাবেই পেরে উঠবেন না। তিনি এক নজর নিস্পৃহ মুখে তাকিয়ে থাকা মৌ’য়ের দিকে তাকালেন, তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে এক কুৎসিত ও পৈশাচিক বাঁকা হাসি হাসলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রোহানে’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে উঠে বললেন।

​“রোহান…তুমি হয়তো নিজেও আজ ভুলেই যাচ্ছো যে‚ এই মেয়র সাহেব আসলে কী কী জিনিস করতে পারে। এই নারী পাচার আর কোটি কোটি টাকার বিজনেসে বাধা দেওয়ার অপরাধে একদিন আমার নিজের সঘোষিত ওয়াইফকে আমি নিজের হাতে খুন করেছিলাম। অথচ সেই নারীকে আমি অসম্ভব ভালোবাসতাম।
কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসার চেয়ে এই টাকার মূল্য অনেক অনেক বেশি। আজ পর্যন্ত পুলিশ বা মিডিয়ার কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি যে মেয়র সাহেবের ওয়াইফকে আসলে কে মেরেছে। সবাই এটাই ভেবে বসে আছে যে আমার ওপর কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল বলে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আর শোনো‚ যেখানে নিজের ভালোবাসার ওয়াইফকে মারতে আমার হাত একটুও কাঁপেনি‚ সেখানে তুমি আমার কাছে কিচ্ছু না রোহান।
​রোহান রাগে ফেটে পড়ে কিছু একটা বলার জন্য উদ্যত হলো কিন্তু সে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই মেয়র সাহেব বানিয়ে বানিয়ে তীব্র আফসোসের নাটুকে সুর তুলে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন।

​“রোহান তুমি আমাকে এখন অহেতুক মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছো কেন? আচ্ছা‚ আমি কেন তোমার ফুলকে পাচার করার ঝুঁকি নেব বলো তো? তুমি নিজে নির্দেশ দিলে বলেই তো আমার লোক গুলো ওদের তুলে নিয়ে এলো। আমার লোক গুলো ভুলবশত ওকে তুলতে গিয়ে পাশে থাকা তোমার ওই বোনকেও তুলে নিয়ে এসেছে। তাছাড়া তোমার হুকুম আর প্ল্যানিংয়েই তো আমরা সিআইডি ডিপার্টমেন্টের সিক্রেট এজেন্ট উজান চৌধুরীকে গুলিতে মেরে দিলাম। যাতে তুমি খুব সহজেই মৌ’কে নিজের করে কাছে পাও। আর আজ কাজ হাসিল হয়ে যাওয়ার পর সব দোষ একা আমাকে দিয়ে সাধু সাজছো‚ তাই না?
​কথাটা শেষ করেই লোকটা এক ভয়ংকর পৈশাচিক হাসিতে মেতে উঠল। আর ঠিক তখনই রুমের এক কোণে থাকা পাথরের মতো জমে যাওয়া মৌ আর মেহেরে’র কানে যখন মেয়র সাহেবের এই পৈশাচিক সত্যের প্রতিটি কথা স্পষ্ট এসে আছড়ে পড়ল। তারা দু’জনেই এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল।
মৌ আর এক মুহূর্তও নিশ্চুপ থাকতে পারল না। ক্ষিপ্ত হয়ে এক প্রকার ঝড়ের গতিতে সামনে এগিয়ে গিয়ে সজোরে রোহানে’র শার্টের খাঁমচে ধরল। নিজের সমস্ত জোর দিয়ে উন্মাদের মতো এলোপাতাড়ি ভাবে আঘাত করতে শুরু করল রোহানে’র চওড়া বুকে। তার দু-চোখ বেয়ে তখন অঝোর ধারায় গরম অশ্রুর বয়ে যাচ্ছে। মৌ দু-হাত দিয়ে হিংস্রতায় তাকে পিটিয়ে চলেছে অথচ রোহান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আত্মরক্ষার জন্য একটা টু শব্দ পর্যন্ত করল না। সে কেবল এক অপরাধবোধ আর অসহায় দৃষ্টি নিয়ে মৌ’য়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ​মৌ কাঁদতে কাঁদতে ডুকরে উঠে চিৎকার করে অভিযোগ ছুড়ে দিল।
​”তুমি এটা কেন করলে‚ রোহান ভাইয়া? আমি তোমাকে ভালোবেসে তোমার বুকে আশ্রয় দিইনি বলে সেই আক্রোশে আমার প্রফেসর সাহেবকে আমার বুক থেকে এভাবে চিরকালের মতো কেড়ে নিলে তুমি? এত খারাপ তুমি? তুমি একটাবারও এই মেয়েটার কথা ভাবলে না যে উজান চৌধুরীকে ছাড়া এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরী বাঁচতে পারবে না? কেন করলে এত বড় অপরাধ?

​বলতে বলতেই মৌ’য়ের সমস্ত শারীরিক শক্তি যেন এক লহমায় নিঃশেষ হয়ে গেল। সে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে ধপাস করে ধূলোবালি মাখা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল সে। ​মৌ’য়ের সেই আর্তচিৎকার আর বুকচেরা কান্নার শব্দে রোহানে’র পুরো শরীর বারবার শিউরে শিউরে উঠতে লাগল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা‚ অসহ্য যন্ত্রণায় অস্বাভাবিক ভাবে মোচড় দিয়ে উঠল। রোহান কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে সোজা মৌ’য়ের চোখের সামনে বসে পড়ল। পরম আকুলতায় মৌ’য়ের বরফ শীতল দুটো হাত নিজের মুঠোয় আকড়ে ধরে মিনতিভরা গলায় আকুতি করল।
​“ফুল তুই এসব কী আবোল-তাবোল বলছিস? আ আ আ আমি মারিনি উজান’কে। কসম সত্যি মারিনি। উজান আমার সবচাইতে প্রিয় বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল…আমার নিজের ভাইয়ের মতো ছিল সে। ওকে আমি নিজ হাতে কীভাবে মারতে পারি‚ তুই বল? আমি সত্যি মারিনি উজান’কে। এই কু**ত্তার বাচ্চা একদম মিথ্যা কথা বলছে।
​মৌ আচমকা উন্মাদের মতো ঝোঁক মেরে রোহানে’র শার্টের কলার দুটো আবার শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠল‚

​”সবাই মিথ্যা বলে আর এই দুনিয়ায় শুধু তুমি একাই ধোঁয়া তুলসী পাতা আর সত্যবাদী‚ তাই না? তুমি তো সেই গ্রামে থাকতেও হুমকি দিয়ে বলেছিলে না‚ আমাকে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে আমার প্রফেসর সাহেবকে খুন করে ফেলবে? আজ সত্যি সত্যি নিজের সেই হিংস্র মনের বাসনা পূর্ণ করলে তুমি। আমার প্রফেসর সাহেবকে মেরে ফেললে। একটা বারও এই মৌ’য়ের কথা চিন্তা করলে না। তাকে ছাড়া যে এই মৌ আজ একদম শূন্য‚ একটা আত্মাহীন নিঃস্ব পুতুল। সেটা তুমি কেন ভাবলে না?
​মৌ‘য়ের গলার স্বর কান্নায় অবরুদ্ধ হয়ে এলো। তবুও সে থামল না।
“আমি তো তোমাকে সবসময় নিজের আপন বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধার চোখে দেখে ‘রোহান ভাইয়া’ বলে ডেকে এসেছি। তবে কীভাবে আমার জীবনের এত বড় সর্বনাশ করতে পারলে তুমি? কীভাবে আমি এখন একাকী এই বিশাল শূন্যতায় বাঁচব তাকে ছাড়া‚ বলতে পারো? তা ছাড়া…তুমি এই নারী পাচারের মতো জঘন্য‚ নিকৃষ্ট আর ঘৃণ্য কাজের সাথেও জড়িত?? এতখানি নিচে নেমে গিয়েছ তুমি?

এই তোমার ভালোবাসার নমুনা? এত গুলো নিষ্পাপ নারীর জীবন ও ভবিষ্যৎ নরকের মুখে ঠেলে দিয়ে আমাকে ভালোবাসার নাটক দেখাচ্ছো তুমি?? এই হারাম আর নোংরা টাকা দিয়ে আমাকে নিজের বউ বানিয়ে ঘরে তুলতে চেয়েছিলে? ছিঃ রোহান ভাইয়া ছিঃ। তুমি কখনো আমার সেই রোহান ভাইয়া হতেই পারো না। আমার রোহান ভাইয়া কখনো এত নিচু‚ নিকৃষ্ট পশুর মতো ছিল না। সে তো সবসময় নারী জাতিকে সম্মান করতে শিখিয়েছিল। আর আজ তুমি নিজে সেই নারী জাতিকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছো?
​রোহান আর সহ্য করতে না পেরে দুই কানে হাত চেপে রুদ্ধ গলায় চিৎকার করে উঠল।
“ফুল প্লিজ‚ এত অভিযোগ করিস না। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আর সহ্য করতে পারছি না আমি।
​”এখন কেন সহ্য করতে পারবে না তুমি‚ বলো? তুমি এই স্বার্থপর ভালোবাসায় এতটাই অন্ধ আর পশুতুল্য হয়ে গিয়েছ যে তোমার ভেতরের ন্যূনতম মনুষ্যত্ব আর বিবেকটুকুও আজ মরে পচে গেছে।
​রোহান এবার নিজের সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে এক ঝটকায় মৌ’য়ের দুটো ফর্সা গাল নিজের শক্ত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে গর্জে উঠল।

​“থাম ফুল। একদম মুখ বন্ধ কর। আমি শখ করে এই অন্ধকারের জঘন্য জগতে পা বাড়াইনি। শুধুমাত্র তোর জন্য‚ তোকে নিজের করে পাওয়ার তীব্র লোভে এই পাপের পথে এসেছি আমি। তোর বাবা তো আমাকে কথা দিয়েছিল‚ আমি যেদিন অনেক অনেক টাকার মালিক হব৷ সেদিন তোকে আমার হাতে তুলে দেবে। কিন্তু তোর বাবা তার দেওয়া সেই পবিত্র কথা রাখেনি ফুল। তোর বাবা তার নিজের মেয়েকে অন্য এক পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়ে আমাকে চিরকালের মতো নিঃস্ব‚ দেউলিয়া বানিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল।
​”রোহান ভাইয়া‚ থামো প্লিজ। নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে অহেতুক আমার আব্বুকে দোষ দেবে না। আব্বু তোমাকে কখনো এমন নোংরা‚ পৈশাচিক আর নারী পাচারের কাজ করে কোটিপতি হতে বলেনি। চলে যাও তুমি আমার চোখের সামনে থেকে…আমি মরে গেলেও কখনো তোমার মতো এক পশুর হব না। তুমি ভীষণ খারাপ।

​“তোর বাবা তো আমাকে এটাও বলে দেয়নি যে আমাকে সৎ আর বৈধ পথে কোটি টাকা ইনকাম করতে হবে। তাছাড়া এত গুলো বছর অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মাঝে থেকে আমি আর কী-ই বা করতাম যে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে তোকে ছিনিয়ে আনতাম‚ বল?? ফুল…আমি স্বীকার করছি আমি মহাপাপী‚ আমি অপরাধী। কিন্তু তুই বিশ্বাস কর‚ আমার হৃদয়ের ভালোবাসাটা একদম খাঁটি। তার মাঝে বিন্দু পরিমাণ কোনো পাপ নেই। তুই প্লিজ একবার আমার হয়ে যা না ফুল‚ আমার বুকে ফিরে আয়। সারাজীবন ভালোবাসবো তোকে।

​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মৌ নিজের পুরো শক্তি দিয়ে সজোরে দুটো থাপ্পড় দিল রোহানে’র গালে। ​রোহান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ ও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মৌ তখন চিৎকার করে উঠল।
​”লজ্জা করে না তোমার এমন নোংরা কথা মুখে আনতে? ঘৃণা করি তোমায় আমি। চরম ঘৃণা করি। তোমার মতো একটা পশুর কারণে আজ আমি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় প্রফেসর সাহেবকে চিরকালের জন্য হারিয়েছি। আর সেই তোমার হাত ধরে আমি তোমার হব? কোনোদিনও না। কোনোদিন কোনো জন্মেও নয়। মরে গেলেও কোনোদিন এই মৌ তোমার হবে না।
​“ফুল! তুই কেন বিশ্বাস করছিস না যে আমি উজান’কে মারিনি? ইভেন কসম খেয়ে বলছি‚ এই মাত্র মেয়র সাহেবের মুখ থেকেই আমি প্রথম জানতে পারলাম যে উজান আর এই পৃথিবীতে নেই।
​মৌ আর এই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিল না। তার বুকের ভেতরটা দগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে একের পর এক ঘৃণার বাণ ছুড়তে লাগল।
​”তুমি চলে যাও এখান থেকে। তোমাকে এক সেকেন্ডের জন্যও আর আমার এই চোখের সামনে দেখতে চাই না আমি। অসহ্য লাগছে তোমাকে আমার। মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার। চলে যাও তুমি।
​রোহানে’র চোখে এক তীব্র আফসোস ও আক্ষেপের আগুন জ্বলে উঠল। সে বিষণ্ণ ও ভাঙা গলায় আওড়াল‚ “তুই কেন মরবি ফুল? আমি মরবো‚ আমি মরে গিয়ে তারপর তোকে চিরকালের জন্য মুক্তি দিয়ে দেবো।
​”মরে যাও তুমি‚ রোহান ভাইয়া। তুমি মরে গেলে সত্যি সত্যি আমি কাঁদব না। তুমি অনেক খারাপ। তোমার জন্য আমার প্রফেসর সাহেব আমার কাছে নেই। তুমি একটা খুনি। ঘৃণা করি তোমাকে আমি। আই হেট ইউ‚ রোহান ভাইয়া। আই রিয়্যালি হেট ইউ।

​কথা গুলো চাবুকের মতো এসে রোহানে’র বুকে আছড়ে পড়ল। ​রোহানে’র বুকের ভেতরের খাঁচায় যেন কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ড অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ গতিতে লাফাতে লাগল। বুকের ভেতরটা এমনভাবে কাঁপতে লাগল যেন পাঁজরের হাড় গুলো সব মড়মড় করে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো জলে ঝাপসা হয়ে এলো তার। ​সে কাতর ও অসহায় স্বরে কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিসিয়ে শেষ আকুতি জানাল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৮

“আমি মরে গেলেও তোর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রুও ঝরবে না‚ ফুল?
​মৌ চোখের পানি এক ঝটকায় মুছে নিয়ে একবিন্দু দয়া না দেখিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দিল।
​”না। এক ফোঁটাও ঝরবে না। এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরী তোমার মতো….

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬০