Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮
মারিয়াম ফুল

পানি খাওয়ার পর রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি গাড়িতে যাও, আমি আসছি দুই মিনিট।”
মেহের আর কোনো কথা বাড়াল না। ধীর পায়ে সে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ও কিছুটা দূরত্বে চলে যেতেই রুদ্র নিজের শরীর থেকে জ্যাকেটটা পুরোপুরি খুলে একপাশে রাখল। তারপর টিউবওয়েলের হাতল চেপে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে নিজের ট্রাউজার আর হাত-মুখ খুব ভালো করে ধুয়ে নিল। চোখে-মুখে পানির তীব্র ঝাপটা দিয়ে ও নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু যেন শান্ত করার চেষ্টা করল। গত কয়েকটা দিন ওর ওপর দিয়েও কম ঝড় যায়নি।

সেই ঘটনার পর নিঃশব্দে কেটে গেছে আরও তিন দিন, সেদিন হামজা চৌধুরী ফোন করে রেহানা চৌধুরীকে জানিয়েছিলেন যে মেহেরকে সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ।খবরটা শোনামাত্রই তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েছিলেন। মেহেরকে তারা কতটা ভালোবাসেন, তা তাদের প্রতিটা আচরণেই প্রকাশ পায়।
সেদিন রাত ঠিক একটায় রুদ্র আর মেহের অ্যাপার্টমেন্টে এসে পৌঁছেছিল। পরদিন সকালে দুজনের সাথে দেখা হয় রেহানা চৌধুরীর । আর আজকে উনাদের সিলেট যাওয়ার পালা। বেশ কয়েকটা দিন তো এখানে কাটল। ছেলের বউর পাশে থাকার একটা তাগিদ উনার ভেতর সবসময়ই ছিল, নিজেদের দায়িত্ব থেকে কেউ পিছু হটেননি। মেহেরের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাঁরা তার পাশে থেকেছেন । হামজা চৌধুরীর মনে মনে ইচ্ছা ছিল, যদি সম্ভব হতো তবে মেহেরকে তিনি নিজের সাথেই সিলেটে নিয়ে যেতেন। এই বিষয়ে তিনি রুদ্রের সাথে কথাও বলেছিলেন।
কিন্তু রুদ্র সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সে দুই মাসের ছুটি নিয়েছে। এই সময়টায় মেহেরের দেখাশোনার দায়িত্ব সে নিজেই নিবে। রেহানা চৌধুরীও নিরুপায়। এভাবে শাশুড়িকে একা রেখে এত দিন ঢাকাতে থাকা যায় না। ওদিকে শাশুড়িও অসুস্থ, আবার তিনি নিজেও শারীরিকভাবে খুব একটা সুস্থ নন। তার ওপর লকডাউন খুলেছে,সামনে নির্বাচন ।
এখন হামজা চৌধুরীকে নির্বাচনকে ঘিরে বেশ দৌড়ঝাঁপ করতে হবে।ঢাকার দিকের ফ্যাক্টরি আর রিয়েল এস্টেটের বিজনেসগুলো না হয় রুদ্র সামলে দেবে, কিন্তু বাকি কাজগুলোর জন্য উনাদের সিলেট যেতেই হবে।
আজ বিকেল তিনটায় উনাদের ফ্লাইট। এখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর দেড়টা বাজে। রেহানা চৌধুরী নিজের ঘরের বিছানায় কাপড় গুছাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মেহের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। ধীর, পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে ও মৃদু স্বরে ডাকল,

“মা, আসবো?”
রেহানা চৌধুরী একটা কাপড় ভাঁজ করে ল্যাগেজে রাখছিলেন। মেহেরের কণ্ঠস্বর পেয়ে তিনি ঘুরে তাকালেন। মেয়েটার মায়াবী মুখটা দেখে উনার ঠোঁটের কোণে এক গাল হাসি ফুটে উঠল। মেহেরকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনিও নিজের কাজ ফেলে ওর দিকে এগিয়ে এলেন। রেহানা চৌধুরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেহের উনাকে শক্ত করে জাপটে ধরল।
রেহানা চৌধুরী প্রথমে কিছুটা অবাক হলেন। তারপরই উনার মনে হলো, গত কয়েকদিনে এই মেয়েটার ওপর দিয়ে কত ধকল গেছে। এখন তারা চলে গেলে মেয়েটা হয়তো আবার একা হয়ে যাবে, এই ভয়েই হয়তো এমন করছে। তিনি পরম মমতায় আলতো হাতে মেহেরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। হঠাৎ উনার কাঁধটা ভিজে উঠছে বলে মনে হলো। খেয়াল করলেন, তপ্ত নোনাজল উনার কাঁধ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
“মেহের, কাঁদছো তুমি?” রেহানা চৌধুরী কিছুটা ব্যস্ত হয়ে মেহেরকে নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে উনার মুখোমুখি দাঁড় করালেন। “এই বোকা মেয়ে, কাঁদে নাকি এভাবে? এই সময়ে তো আরও কাঁদতে হয় না। রুদ্র কিছু বলেছে তোমাকে?”

মেহের কান্নাভেজা চোখেই মাথা দুলিয়ে ‘না’ করল।
“তাহলে? বাড়ির কথা মনে পড়ছে?”
মেহের আবারও মাথা দুলিয়ে না করল। রেহানা চৌধুরী পরম স্নেহে মেহেরের কপালে একটা চুমু এঁকে দিলেন। তারপর ওর হাত ধরে বিছানার পাশে নিয়ে বসালেন, নিজেও ওর মুখোমুখি বসলেন।
“দেখো মেহের… তোমার বাবার বাড়ির সাথে তোমার কী সমস্যা হয়েছে, কিংবা আদেও কোনো সমস্যা হয়েছে কি না— তা আমি জানিনা, জানতেও চাই না। কিন্তু এইটুকু মনে রেখো মা, তোমার শ্বশুরবাড়ির লোক তোমার পাশে সবসময় আছে। তোমার যখন যা ইচ্ছা হবে, আমাদের কাছে আবদার করবে। কিছু খেতে ইচ্ছা হলে বলবে। এই তো কয়েকটা দিন, আমি থাকবো না এখানে। কোনো প্রয়োজন হলে রুদ্রকে বলবে। ও যদি কথা না শোনে, তবে সোজা আমাকে কল দেবে, তোমার বাবাকে কল দেবে। আমিও দেখবো ও কীভাবে কথা শোনে না… আর না শোনার তো কথা নয়, আমার ছেলেটা বাইরে থেকে দেখতে যেমনই হোক না কেন, ও আসলে এমন না। ও আসলে এমন ছিল না তারপর হঠাৎ একদিন …”

ঠিক এই সময়ে রেহানা চৌধুরীর ফোনে একটা কল এলো। বাকি কথা উনি সম্পূর্ণ করতে পারলেন না, উনাদের ড্রাইভার ফোন করেছে।
“ম্যাম, গাড়ি নিয়ে চলে এসেছি। আপনারা এবার চলে আসুন।”
রেহানা চৌধুরী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। ফোনটা রেখে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যেতে হবে মা, গাড়ি চলে এসেছে।”এরপর তিনি লিভিং রুমের দিকে উদ্দেশ্য করে একবার জোরে হাঁক ছাড়লেন, “হামজা, রেডি তুমি?”
লিভিং রুম থেকে হামজা চৌধুরীর ভারী গলা ভেসে এলো, “হুম, বের হও তুমি। আমি রেডি।”
রেহানা চৌধুরী মেহেরের দিকে তাকালেন। তারপর তাড়াহুড়ো করে খাট থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎ নিজের কপালে হাত দিয়ে বললেন, “উফ! এই তো, ভুলেই যাচ্ছিলাম….”
তিনি দ্রুত উনার আলমারির ওপর থেকে একটা কাঁচের বয়াম নামিয়ে আনলেন। সেটা মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “নাও, এটা রাখো।”

মেহের বয়ামটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “এটা কী মা?”
“লাড্ডু। ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে কালকে রাতে বানিয়ে রেখেছিলাম তোমার জন্য। তখন আর দেওয়া হয়নি। এটা খাবে প্রতিদিন , এই সময়ে শরীরের জন্য খুব ভালো। সব রকমের ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে বানিয়েছি।”
বাইরে থেকে হামজা চৌধুরী আবার ডাকলেন, “রেহানা, বের হলে?”
মেহের আর রেহানা চৌধুরী দুজন মিলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কয়েক মিনিটের মাথায় ।সেদিন রাতের পর থেকে এই তিন দিনে রুদ্রের সঙ্গে মেহেরের তেমন কোনো কথা হয়নি।বড়জোর দুই-একবার চোখাচোখি হয়েছে মাত্র, তার বেশি কিছু না। রুদ্র তখন লিভিং রুমের সোফায় বসে মনোযোগ দিয়ে কোনো একটা বই পড়ছিল। মেহের একবার ওর দিকে তাকিয়েই দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।
মা-বাবা চলে যাচ্ছেন দেখে রুদ্র বই থেকে মুখ তুলে তাকাল। প্রশ্ন করল, “চলে যাচ্ছো?”
হামজা চৌধুরী বললেন, “হুম। কালকেই তো বললাম তোমাকে, সামনে নির্বাচন। তার ওপর তোমার দাদার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তা ছাড়া তুমি এবার দেশে বেশ কিছুদিন ধরে আছো শুনলাম। ভালো, আমি খুব খুশি হয়েছি যে তুমি দায়িত্বশীল হচ্ছো।”

রুদ্র, এ বিষয়ে তেমন কিছু বলার প্রয়োজন বোধ মনে করল না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“বাবা, সিলেট অফিসে পাঠানো ফাইলগুলো যেন পরশুর মধ্যেই আমার হাতে আসে। ম্যানেজারকে বলে দিও। এতদিন কোথায় কী হয়েছে, প্রতিটা খুঁটিনাটি হিসাব এবার আমার জানা দরকার।”
হামজা চৌধুরী সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
“পাঠিয়ে দেব। এখন আমরা উঠি।”
তারপর বিদায়ের ক্ষণ এসে উপস্থিত হলো। হামজা চৌধুরী মেহেরের মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই মা। আমরা আবার আসবো। নিজের খেয়াল রেখো। এখন না চাইতেও যেতে হচ্ছে।”
এই বলে উনারা বিদায় নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেন। মেহের দরজায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কয়েক মিনিট পর যখন ও বুঝতে পারল যে উনারা আসলেই চলে যাচ্ছেন, মেহের দ্রুত গতিতে বারান্দার দিকে ছুটে গেল। বারান্দা থেকে থেকে তাকিয়ে দেখল, ড্রাইভার ল্যাগেজগুলো গাড়ির ডিকিতে তুলছে।
মেহেরের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। উনারা তো জানেন না যে, হয়তো এটাই মেহেরের সাথে উনাদের শেষ দেখা। কিন্তু মেহের তো জানে। না চাইতেও ওর ভেতর থেকে কান্না উথলে উঠছে। এই মানুষগুলোর সাথে হয়তো আর কোনোদিন দেখাই হবে না, ভেবে ওর বুকটা কেঁপে উঠল। উনারা ওকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। যে আদর ও নিজের পরিবারে কখনো পায়নি, সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছে।

মনে মনে মেহের ভাবল—আচ্ছা, উনাদের সাথে কি আর কোনোদিন দেখা হবে? যদি কখনো দেখাও হয়, উনারা কি মেহেরকে ভুল বুঝবেন?মেহের বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে দেখল, উনাদের গাড়িটা ধীরে ধীরে দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে যাচ্ছে। এক চরম শূন্যতা নিয়ে মেহের নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটায় ফিরে এলো। বিছানায় মাথাটা এলিয়ে দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ও পারল না। ঠিক তখনই ওর ফোনটা সশব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের ওপর ‘মেজো ভাইয়া’ নামটা ভেসে উঠেছে।
মেহের কলটা রিসিভ করে কানে নিল। ও মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে মাশফি বলে উঠল, “মেহের, কেমন আছিস?”

মেহের কিছু উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না। মাশফি একনাগাড়ে বলতে লাগল, “দেয়ার ইজ আ গুড নিউজ মেহু! তোকে একটা দারুণ খবর দেওয়ার জন্য ফোন করেছি।”
মেহের মনে মনে আন্দাজ করতে পারল মাশফি কী বলবে। ওর ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে মাশফি আনন্দের সাথে বলে উঠল, “ইউ গট ইউকে ভিসা! তোর লন্ডনের ভিসা হয়ে গেছে মেহু! আমি দুই সপ্তাহ পর দেশে আসছি। এসে তোকে আর মেঘলাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো।”
মেহেরের এখন এই খবরটা শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা ছিল। অবশেষে সে এই লোকদেখানো বিয়ে আর দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি পেতে যাচ্ছে। কিন্তু মেহেরের মনের গভীরে অদ্ভুত এক তোলপাড় বয়ে যেতে লাগল।

মনে হলো, কোথাও যেন একটা বড় অংশ খালি হয়ে যাচ্ছে। হয়তো দেশ ছেড়ে সারা জীবনের জন্য চলে যেতে হবে….এই কথা ভেবেই ওর মনটা এমন খারাপ হচ্ছে ।
মাশফির কণ্ঠ আবার ওর ভাবনায় ছেদ টানল, “মেহের? শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা?”
মেহেরের ঘোর কাটল। ও কোনোমতে বলল, “হুম ভাইয়া, শুনছি।”
“আমি তোর অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছি। লাগলে আরও দেবো। এখন টুকটাক যা শপিং করার করে নে। আর এখানে আসার সময় ভালো গরম কাপড় নিয়ে আসিস, ইউকেতে এখন বেশ ভালোই ঠাণ্ডা পড়েছে।”
মেহের মাশফির কথাগুলো শুনছিল বটে, কিন্তু ও এতটাই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল যে মাশফি আসলে ঠিক কী বলছে, তা ওর মাথায় ঢুকছিল না। মেহের কোনোমতে বলল, “ভাইয়া, কলটা রাখি এখন? পরে কথা বলবো।”

এই বলে ও মাশফিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কলটা কেটে দিল।
ওদিকে ইউকে-তে বসে মাশফি খানিকটা আশ্চর্য হলো। ভাবল— যাক বাবা, মেয়েটা কলটাই কেটে দিল? হয়তো মন খারাপ দেশ ছেড়ে চলে আসবে তাই।এখানে চলে আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেহের ফোনটা রেখে বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। পুরো অ্যাপার্টমেন্টে কোনো সাড়াশব্দ নেই, চারদিক নিঝুম। এখন বিকেল চারটা বাজে। মেহের টের পেল, ওর ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি।

রান্নাঘরের কাউন্টারের দিকে যেতেই ও দেখল রুদ্র সেখানে দাঁড়িয়ে কফি বানাচ্ছে। রুদ্র বেশিরভাগ সময়ই কফি খায়। দুপুরের এই নির্জনতায় কফির সুবাস পুরো রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।রান্নাঘরে রুদ্রের উপস্থিতি টের পেয়েও মেহের ওমন একটা ভাব করল, যেন সে কিছুই দেখেনি। দেখেই না দেখার ভান করে সে সোজা এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে। ওদিকে রুদ্রই বা কম কীসে! সে-ও নিজের গম্ভীর ভাব বজায় রেখে মেহেরকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না, যেন রান্নাঘরে কেউ আসেইনি। মেহের আগে থেকে রান্না করে রাখা পাস্তা বাটিতে বেড়ে নিয়ে লিভিং এরিয়ার দিকে হাঁটা দিল।
তবে যাওয়ার আগে মেহের কৌতুহল সামলাতে না পেরে আড়চোখে আরেকবার ঘুরে তাকাল। দেখল, রুদ্র একহাতে ব্ল্যাক কফির মগ আর অন্যহাতে পটেটো চিপস খাচ্ছে।কড়া তিতকুটে কফির সাথে নোনতা পটেটো চিপস—এমন অদ্ভুত কম্বিনেশন দেখে মেহেরের কপাল কুঁচকে উঠল। তবে এই বিষয়ে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না ও। মনে মনে ভাবল,

‘যার যা ইচ্ছে খাক, আমার কী!’
মেহের যেই চোখ ফিরিয়ে চলে যেতে যাবে, তখনই রুদ্র নিজের মগে চুমুক দিয়ে না তাকিয়েই আচমকা বলে উঠল, “তাকিয়ে আছো কেন?”
হুট করে ধরা খেয়ে মেহের চরম তটস্থ হয়ে গেল। থতমত খেয়ে ও কিছু বলার আগেই রুদ্র এবার কফির কাপ থেকে মুখ তুলে নিজের পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মেহেরের দিকে। মেহের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য কোনোমতে বলল,
“নাথিং!”

বলেই ও দ্রুত পায়ে লিভিং এরিয়ার সোফায় গিয়ে বসে পড়ল।বেশ কিছুটা পাস্তা খাওয়ার পর মেহেরের হঠাৎ মনে পড়ল, মেজো ভাইয়া মাশফি বলেছিল ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মেহের তো ঢাকা শহরের কিছুই চেনে না, কোথায় ব্যাংক আর কোথায় এটিএম বুথ—তার বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই ওর।
ঠিক তখনই কফি শেষ করে রুদ্র নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। মেহের সুযোগ বুঝে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এখান থেকে ব্যাংক বা বুথ কেমন দূর?”
রুদ্র নিজের ঘরের দরজায় ঢোকার মুখে মেহেরের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো যেন মেহেরের মনের কথা পড়ে ফেলল। ভ্রু কুঁচকে রুদ্র বলল, “টাকা প্রয়োজন?”
মেহের দ্রুত মাথা নাড়াল, অর্থাৎ—না।

“মিসেস অ্যারোফোবিয়া, আমি কি বলিনি যে তোমার কোনো টাকার প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে? আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড! এটা কোনো মেজর ইস্যু না, কত টাকা লাগবে আমাকে বলো?”
“লাগবে না আপনার টাকা! মেজো ভাইয়া টাকা পাঠিয়েছে…”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রুদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কপালের রগ আর হাতের পেশিগুলো রাগে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে ধীর কিন্তু ভারী পায়ে মেহেরের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এল।
“মেজো ভাইয়া মানে?”
“আমার ইউকে-র ভিসা হয়ে গেছে। তাই ভাইয়া টাকা পাঠিয়েছে, যাওয়ার আগে কিছু টুকটাক শপিং করার জন্য।”
মেহেরের মুখে ভিসার কথা শুনে রুদ্রের রাগের পারদ যেন আরও কয়েক মাত্রা চড়ে গেল। সে চোখ ছোট করে বলল, “যখন আমি বলেছি কোনো টাকা লাগলে আমার থেকে নেবে, তাহলে তুমি উনাদের কাছে টাকা চাইলে কেন ? আমার কাছে টাকা নেই? নাকি আমি তোমাকে টাকা দেব না বলেছি?”
রুদ্রের এমন রণমূর্তি দেখে মেহের মনে মনে কিছুটা ভয় পেলেও মুখে অবাক হওয়ার ভান করল। ও চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি টাকা চাইনি, ভাইয়া নিজে থেকে দিয়েছে। আর ভাইয়া তো জানে যে…” মেহের একটু থামল।

“কী জানেন যে ?” রুদ্রের গলার আওয়াজ আরও গম্ভীর হলো।
” আপনি… আই মিন, আপনি আমার হাজব্যান্ড, মানে হাজব্যান্ড কিন্তু হাজবেন্ড নন । আমরা তো আর সাধারণ কাপলদের মতো নই।”
মেহের আবার চেয়ারে বসে পড়ে ড্যাম-কেয়ার ভাব নিয়ে বলল, “প্রথমত আমি টাকা চাইনি, ভাইয়া নিজে থেকে দিয়েছে। আর আমি কেনইবা আপনার টাকা নেব? ”
“ওহ!” রুদ্র মেহেরের খুব কাছে এসে দাঁড়াল,
“কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ, তুমি এখন আমার জিম্মাদারিতে আছ। উনার টাকা তুমি এখনই ফিরিয়ে দেবে। নয়তো আমি নিজেই ফিরিয়ে দিচ্ছি।”
“কিন্তু আমি কেন আপনার টাকা নেব?”
“কারণ, ইউ নো… আমি তোমার মুখবলি স্বামী হই।”
“মুখবলি?”

“হ্যাঁ, মুখবলি! আর এটাতে আমার প্রেস্টিজের বিষয় জড়িয়ে আছে।” মেহের কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই রুদ্র আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র যখন রুম থেকে বের হয়ে এল, ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট। রুদ্রের পরনে একটা স্টাইলিশ ব্ল্যাক হুডি, সাথে ক্যাজুয়াল শট প্যান্ট, আর গলায় একটা লকেট দুলছে। তাকে দেখে যে কেউ ভাববে সে কোনো কনসার্টে গান গাইতে যাচ্ছে !
মেহের এতক্ষণ চেয়ারেই বসে ছিল। রুদ্রকে এভাবে সেজেগুজে বের হতে দেখে মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “কোথায় যাচ্ছেন?”
রুদ্র নিজের স্নিকার্সের ফিতা বাঁধতে বাঁধতে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দেওয়ার ভান করে বলল,
“বউ খুঁজতে ”
মেহের এবার একটু নড়েচড়ে বসল। রুদ্রের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “আই মিন, আপনাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।”

রুদ্র সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একদিকের ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কীরকম? হ্যান্ডসাম? ”
মেহের জবাব দেওয়ার আগেই রুদ্র চরম নির্লজ্জের মতো মেহেরের দিকে একটু ঝুঁকে এক অদ্ভুত ইঙ্গিত করে বলল, “মে আই হেল্প… আরো ভালো লাগবে?”
রুদ্রের এমন আকস্মিক ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় মেহের পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল, রুদ্রের এই এক স্বভাব, সে নিজেই মুখে এমন সব ইঙ্গিত -পূর্ণ কথা বলবে যে মেহের পাল্টা কিছু বলতে গেলেই উল্টো কথার মোড় ঘুরিয়ে দোষটা মেহেরের ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে। তখন নির্ঘাত বলবে, “তোমার চিন্তাধারাই খারাপ, মিস জেদি মহিলা। নিজের চিন্তাভাবনা ঠিক করো।” অথচ মেহের খুব ভালো করেই জানে, রুদ্র ঠিক কী ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মেহেরকে চুপ থাকতে দেখে রুদ্র টিপ্পনী কাটল,

“কী হলো? মুখে মিসাইল পড়েছে নাকি?”
“জি! আপনি যদি ইসরাইল হন, আমি না হয় ইরান হয়ে আপনার ওপর মিসাইল ফেলব….”
রুদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আর আমি বুঝি চুপচাপ বসে বসে দেখব?”
মেহের এই ফালতু তর্কে আর মাথা ঘামাল না। মূল কথায় এসে বলল,
“আমাকে একটু সঙ্গে নিয়ে যাবেন?”
“কোথায়?” রুদ্র ভান করা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল।
“হুহ! ওই যে বললেন, বউ খুঁজতে যাচ্ছেন ”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৭

রুদ্র মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ, তোমার সতীন আনতে যাচ্ছি। যাবে?”
মেহের বিরক্ত গলায় বলল,”সবসময় আপনার এই ইয়ার্কি ভালো লাগে না। প্লিজ, নিয়ে যান না…..”
দরজার নব ধরে রুদ্র ঘুরে দাঁড়াল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮ (২)