ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০
মারিয়াম ফুল
রুদ্র যখন ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, ঘরের ভেতর তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। একটা ছাই-রঙা ট্রাভেল ব্যাগে প্রয়োজনীয় কিছু ফাইল আর ল্যাপটপটা ঢুকিয়ে চেইনটা টেনে দিল ও। কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ, ফ্যাক্টরির অগ্নিকাণ্ডের খবরটা মাথার ভেতর যেন হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছে।
রুদ্রর অবশ্য মেহেরকে ডেকে তুলে বলে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন অনুভব হলো না। এর আগেও ও যখনই ফ্লাইটে গেছে কিংবা ঢাকার বাইরে গেছে, মেহেরকে কখনো বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তাদের সম্পর্কের সমীকরণটাই এমন—এখানে কোনো অধিকার নেই, নেই কোনো পারস্পরিক জবাবদিহিতা। ও স্রেফ পরিস্থিতির চাপে মেহেরকে আশ্রয় দিয়েছে, এর বেশি কিছু নয়। তাই মেহেরকে ঘুমে রেখেই ও বেরিয়ে গেল।
সকাল ন’টার দিকে মেহেরের ঘুম ভাঙল। বিছানা ছেড়ে যখন মেহের চোখ মেলল, ঘরের জানালা গলে সকালের কোমল রোদ ইতোমধ্যেই তার ঘরে ঢুকে পড়েছে। অন্যদিনের মতো আজ কোনো তাড়া নেই, চারপাশটা অদ্ভুত নিঝুম। রুদ্রর ঘরের দিকে তাকিয়ে মেহেরের মনে হলো, মানুষটা কি এখনো ঘুমোচ্ছে? সে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল।
পুরো অ্যাপার্টমেন্ট খাঁ-খাঁ করছে। কোথাও কেউ নেই। রুদ্রর ঘরের দরজাটা আলগা করে খোলা, ভেতরে নিখাদ শূন্যতা অর্থাৎ রুদ্র এপার্টমেন্টে নেই । মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসল। বুকের ভেতরটা কেন যেন এক অচেনা শূন্যতায় মুচড়ে উঠল, অথচ এই একা থাকাটাই তো সে চেয়েছিল।
দুপুরের দিকে কেয়ারটেকার এসে রান্নাবান্না শেষ করে দিয়ে চলে গেল। লকডাউনের কারণে সেও বেশি সময় থাকতে চাইল না।
কেয়ারটেকার চলে যাওয়ার পর অ্যাপার্টমেন্টের এই বিশালত্ব মেহেরকে গ্রাস করতে লাগল। সে নিজের ঘরের সাথে বারান্দাটায় গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। আকাশটা সকাল থেকেই গোমড়া মুখ করে ছিল,দেখতে দেখতে দুপুরের শেষভাগেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো। ধরণী বেয়ে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
খানিক বাদে বাতাসটা তার রূপ বদলাল। মৃদু হাওয়া রূপ নিল দমকা বাতাসে। আকাশের এক কোণ থেকে অন্য কোণে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি খেলে যেতে লাগল। তুফানের বেগ বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টির ছাঁট বারান্দার ভেতর চলে আসতে লাগল। মেহের বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করায়, সে বাধ্য হয়ে চেয়ার ছেড়ে ঘরের ভেতরে চলে এলো। কাচের স্লাইডিং দরজাটা টেনে দিতেই বাইরের বৃষ্টির শব্দটা কিছুটা দূরবর্তী মনে হলো।
ঠিক তখনই, পুরো ঘর কাঁপিয়ে ড্রয়িংরুমের কলিংবেলটা বেজে উঠল।
মেহের খানিকটা চমকে উঠল, এই ভর-দুপুরে, এই সময়ে কে আসতে পারে? রুদ্র সাধারণত কলিংবেল ব্যবহার করে না। তার কাছে এই ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত চাবি থাকে, সরাসরি লক খুলেই সে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মেহেরের গায়ে তখন কোনো ওড়না ছিল না। ঘরে একা থাকায় সে ওড়নাটা আলগা করে চেয়ারের ওপর রেখে দিয়েছিল। সে তড়িঘড়ি করে চেয়ারের ওপর থেকে ওড়নাটা তুলে নিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল।
বুকের ভেতর একটা অজানা ভয় আর শঙ্কা দলা পাকিয়ে উঠছে। বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি—এই সময়ে কারো আসার কথা নয়। মেহের ধীর পায়ে, প্রতিটি পদক্ষেপে দ্বিধা নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার লক খোলার আগে সে লক-হোল দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অন্ধকার করিডোরে আবছা অবয়ব ছাড়া কিছু দেখা গেল না। সে ভয়ার্ত হাতে দরজার নবটা ঘুরিয়ে একটুখানি ফাঁক করল।
দরজা পুরোপুরি খুলতেই মেহেরের চোখ গিয়ে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ওপর। নিমিষেই মেহেরের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে পাথর হয়ে উঠেছে।
“সায়েদ ইমরান” তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
“বাবা…” মেহেরের কণ্ঠ চিরে খুব মৃদু, প্রায় অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এলো। কিন্তু পরক্ষণেই এক সে নিজেকে সংযত করে ফেলল। চোখের বিস্ময়টা মুহূর্তেই লুকিয়ে ফেলল সে। এক নিমিষেই নিজেকে শক্ত করে নিল।
সৈয়দ ইমরান মেহেরের দিকে তাকালেন। তার চুলগুলো বৃষ্টির বাতাসে উষ্কখুষ্ক, চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ। তাকে ভীষণ ক্লান্ত আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধের মতো দেখাচ্ছে। তিনি দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ভেতরে আসতে বলবি না, মা?”
মেহেরের কানে তার বাবার এই কণ্ঠস্বর কেমন যেন অচেনা ঠেকল। জীবনের দীর্ঘ সময় যে মানুষকে সে প্রবল প্রতাপশালী, অহংকারী হিসেবে দেখে এসেছে, তার এই দীনতা মেহেরকে স্পর্শ করতে পারল না। মেহেরের মনে হলো, আজ এই দরজায় যদি তার বাবার জায়গায় অন্য কোনো অচেনা ব্যক্তিও এসে দাঁড়াত,সে তাকে বসার ঘরে আসতে দিত।
“হুম, আসুন ।”
সে দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার পথ করে দিল। সৈয়দ ইমরান লিভিং এরিয়া এসে দাঁড়ালেন। মেহের পেছন থেকে দরজাটা বন্ধ করে তার বাবার পেছনে এসে দাঁড়াল। কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কঠোর করে সে জিজ্ঞেস করল,
“আর কী দাবি করতে এসেছেন আপনি?”
মেহেরের মুখ থেকে এই ‘আপনি’ সম্বোধনটা শুনে সায়েদ ইমরানের বুকটা কেমন করে উঠলো। তার নিজের সন্তান, যাকে তিনি বুকে আগলে বড় করেছিলেন, সে আজ তাকে পর করে দিয়েছে। তিনি ব্যথাতুর চোখে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি বলতে পারতে, মেহের…। আমি জানি তুমি রেগে আছ। তোমার এই রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তোমার রাগ জাস্টিফাইড।”
মেহের এই কথা শুনে খানিকটা হেসে উঠল। “রাগ আপন মানুষের ওপর হয়। আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন — আপনারা সবাই মিলে আমার জন্য মরে গেছেন। মৃত মানুষের ওপর কি কেউ রাগ করে?”
সায়েদ ইমরান যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। মেহেরের কথাগুলো তার বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে নিজের হাতে থাকা ব্যাগটার চেইন খুললেন। কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ব্যাগ থেকে কিছু ফাইল আর কাগজ বের করলেন। মেহের এক দৃষ্টিতে তার বাবার এই অসহায় কাঁপাকাঁপি দেখছিল….
সায়েদ ইমরান ফাইলগুলো মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এটা রাখো।”
মেহের ফাইলের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, “কী এটা?”
“প্রপার্টি পেপার। যদিও পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ী তোমার বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলে তুমি এটা এমনিতেই পেতে, কিন্তু আমার মনে হলো এটা এখনই তোমাকে দিয়ে দেওয়া উচিত।”
মেহের এক পা পিছিয়ে গেল। সে কাগজগুলোতে হাতও ঠেকাল না। অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমি কেন নেব আপনার প্রপার্টি? টাকার লোভে তো আপনারা আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। এখন এই কাগজ দিয়ে কী হবে?”
“আমার মনে হয় আমি আর বেশিদিন বাঁচব না এই দুনিয়াতে…। আমি যদি মারা যাই, তোমার ভাইয়েরা হয়তো তোমাকে তোমার অধিকার বুঝিয়ে দেবে না। এটা তোমার প্রাপ্য, তোমার হক। তোমার বাবা তোমাকে তোমার প্রাপ্য দিচ্ছে।”
বাবা মরে যাওয়ার কথা শুনে মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত ফেলল না। তার চোখের পাতা একটা বারের জন্যও কাঁপল না। যে বাবার অবহেলায় তার জীবন নরক হয়ে গেছে, তার মৃত্যুর কথায় সে আজ বিচলিত নয়। মেহের বলল, “রেখে দিন আপনার কাগজ। আর আমার সামনে এই প্রাপ্যের কথা বলবেন না। আমি ভুলে যাইনি… আমি কিচ্ছু ভুলে যাইনি।”
বলতে বলতে মেহেরের গলার স্বর কাঁপতে লাগল। এতদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা আগ্নেয়গিরিটা যেন এবার ফেটে বের হতে চাইল। সে তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি ভুলে যাইনি সেদিনকার কথা! সেদিন ওই অন্ধকার ঘরে, নিজের ছেলে আর স্ত্রীর কথায় অন্ধ হয়ে আমাকে যেভাবে একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন আপনি… আমার… আমার বাচ্চার যদি সেদিন কিছু হয়ে যেত? আপনি কি একটা বারও পিছন ফিরে তাকিয়েছিলেন? শোনেননি নিজের মেয়ের আর্তনাদ?”
মেহের এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার দুচোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে নিজের বুক চেপে ধরে বলতে লাগল,
“আপনাদের হাতে আমার স্বামীর রক্ত লেগে আছে। আমি আপনাদের ক্ষমা করব না… কোনোদিন ক্ষমা করব না আমি আপনাদের! আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কোনোদিন তার জন্মদাতাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবে না। সে যখন বড় হবে, যখন জানবে আপনারা তার বাবার খুনি… কী ভাবছেন, ছেড়ে দেবে সে আপনাদের?”
মেহের এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। বুকের ভেতরের পুরনো ক্ষতটায় কে যেন এক মুঠো লবণ ছিটিয়ে দিয়েছে। সেই পুরনো যন্ত্রণাগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “দুনিয়ার সব বাবারা মেয়েদের রক্ষা করে, বুকে আগলে রাখে। সন্তান ভুল করলে বাবা শোধরানোর সুযোগ দেয়। অথচ আপনারা সবাই মিলে… সবাই মিলে মেরে ফেললেন আমার অন্তুকে! মেরে ফেললেন!”
তীব্র কান্নার বেগে মেহের আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে পাশের একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। দুই হাতে মুখ ঢেকে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল।
সায়েদ ইমরান দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি মেহেরের কান্নার শব্দ শুনে নিজের চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তার মানে… এই বাচ্চা অন্তুর?”
মেহের মুখ থেকে হাত সরাল না। সে তার বাবার দিকে তাকানোর কোনো প্রয়োজনই মনে করল না। তার এই নীরবতাই যেন সব উত্তর দিয়ে দিল।
সায়েদ ইমরান আবার বলে উঠলেন, “রুদ্র… রুদ্র কি এই সত্যিটা জানে?”
মেহের মুখ না তুলেই শুধু মাথা নাড়াল। অর্থাৎ—হ্যাঁ, রুদ্র জানে।
“রুদ্র সব জেনেও তোমাকে আশ্রয় দিয়েছে?
মেহের কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “সেটা একান্তই আমার আর আমার হাজব্যান্ডের বিষয়। আপনাদের তা নিয়ে না ভাবলেও চলবে।”
সায়েদ ইমরান শুধু বললেন, “হুম।”
তিনি ফাইলটা টেবিলটার ওপর নামিয়ে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেহেরের বসা চেয়ারটার পাশে, ঠিক মেহেরের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়লেন। একজন পিতা আজ তার মেয়ের পায়ের কাছে নতজানু।
তিনি মেহেরের পায়ের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললেন, “তোমার বাবা তোমার খুশি চেয়েছিল মা… আজকেও সেটাই চাইবে। তোমার এই বাপটা তোমার অযোগ্য পিতা, আসলেই অযোগ্য। তোমার সন্তানের বাবার খুনি…। আমি পৃথিবীর বুকে একজন ব্যর্থ বাবা, মেহের। বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না ওরা তোমার স্বামীকে এভাবে মেরে ফেলবে। আমি সত্যিই জানতাম না…”
মেহের তখনও কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার কারণে তার গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু মাঝে মাঝে তীব্র হেঁচকি উঠছে। সায়েদ ইমরান মেহেরের মাথায় হাত রাখার জন্য একবার হাত বাড়ালেন, কিন্তু স্পর্শ করার সাহস পেলেন না। হাতটা মাঝপথেই ফিরিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, “তোমার প্রতি আমি অনেক অবহেলা করে ফেলেছি। আমি ক্ষমার অযোগ্য। জীবনে সুখী হও, মা…”
বলেই তিনি মেঝে থেকে উঠে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
মেহের তখনও চেয়ারে বসে একইভাবে কাঁদছিল। অথচ আজকে তাদের বাবা-মেয়ের সম্পর্কের সমীকরণটা কত সুন্দর হতে পারত! এই চঞ্চল মেয়েটা তার বাবাকে দেখলে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরত, বাবার বুকে মাথা রেখে সমস্ত আবদার করত। অথচ নিয়তি তাকে সেই সুযোগ দিল কই? সামান্য কিছু সম্পত্তি আর লোভের কারণে এই মানুষগুলো মেহেরের জীবনটাকে নরক যন্ত্রণায় ভরিয়ে দিয়েছে।
খানিকটা সময় পর মেহের নিজের ওড়নার কোন দিয়ে চোখ মুছল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত টানাপোড়েন শুরু হলো। ঘৃণা করলেও, অভিশাপ দিলেও—সে তো তার জন্মদাতা পিতা! মেহের আর বসে থাকতে পারল না। সে ছুটে গেল বারান্দার দিকে। শেষবারের মতো ওপর থেকে বাবাকে একটা নজর দেখবে,ইউ-কে তে গেলে তো আর বাবাকে আর দেখতে পাবেনা । ঘৃণা করতে চাইলেও মন থেকে তো তাকে একেবারে মুছে ফেলা যায় না। মেহের মুখ চেপে ধরে বারান্দার গ্রিল গলিয়ে নিচে তাকাল।
বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। মুষলধারে বৃষ্টিতে চারপাশ ঝাপসা। মেহের দেখল, সায়েদ ইমরান ছাতা ছাড়াই সেই বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ির দরজা খোলার আগে তিনি হঠাৎ করে একবার মুখ তুলে ওপরের দিকে, মেহেরের অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দাটার দিকে তাকালেন।
মেহের তৎক্ষণাৎ বারান্দার দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। সে চায় না তার বাবা তার এই আবেগপ্রবণ মনটা দেখুক। সে নিজেকে শক্ত করে দেয়ালের সাথে লেপ্টে রইল, যতক্ষণ না নিচে গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দ পাওয়া গেল।
সায়েদ ইমরান চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে বিকেলের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো। ঠিক তখনই চারপাশের থমথমে প্রকৃতি চিরে ভেসে এলো মাগরিবের আজানের ধ্বনি।
আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…।
মেহের বারান্দা ছেড়ে ঘরের ভেতরে এলো। বাথরুমে গিয়ে খুব ভালো করে অজু করে নিল। ঠাণ্ডা পানির স্পর্শে তার চোখের জ্বালাটা কিছুটা কমল। সে ঘরের মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিল। কিন্তু নামাজ শেষ করে মোনাজাত করার পরও তার মনের ভেতরের অস্বস্তি আর অস্থিরতা কাটছিল না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে।
সে জায়নামাজ থেকে উঠে আবার বাথরুমে গেল। পুনরায় নতুন করে অজু করে এসে সে জায়নামাজে বসল আউয়াবিনের নামাজ পড়ার জন্য। সাধারণত মাগরিবের পর এই নফল ইবাদত করার মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, বেশি বেশি ইবাদত করা এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করা। সে জায়নামাজে বসে দুই হাত তুলে দীর্ঘক্ষণ ধরে মোনাজাত করল। অন্তুর আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করল, নিজের অনাগত নিষ্পাপ বাচ্চার সুরক্ষার জন্য চাইল, পুরো উম্মাহর জন্য চোখের পানি ফেলল। কিন্তু দোয়ার একদম শেষ পর্যায়ে এসে, হঠাৎ করেই মেহেরের মনে রুদ্রর মুখটা ভেসে উঠল।
কেন যেন ইদানীং মেহের যখনই মোনাজাতে হাত তোলে, রুদ্রর মুখটা আপনআপনি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রত্যেকবার নামাজের পর সে নিজের অজান্তেই রুদ্রর জন্য দোয়া করে বসে। রুদ্র যে পথভ্রষ্ট, সে যে দ্বীন থেকে দূরে সরে আছে—এই চিন্তাটা মেহেরকে ভাবায়। সে মনে মনে বলল, ‘ইয়া আল্লাহ, ও তো পথভ্রষ্ট। ওকে তুমি হেদায়েত দাও, ওকে তুমি সঠিক পথে চালিত করো।’ আজকেও মেহের আকুল হয়ে রুদ্রর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল।
এদিকে রুদ্র সিলেটে এসে আগে চৌধুরী বাড়িতে যায়নি, তার প্রথম গন্তব্য ছিল পুড়ে যাওয়া ফ্যাক্টরি। ছাই আর পোড়া গন্ধের মাঝে দাঁড়িয়েই সে এক জরুরি মিটিং বসিয়ে দিল। মিটিংয়ের শুরুতেই সে কোনো রকম অজুহাত না শুনে ফ্যাক্টরির সিকিউরিটি গার্ডদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দিল। এতগুলো গার্ড থাকতে চোখের সামনে কোটি কোটি টাকার ফ্যাক্টরিটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল, আর কেউ নাকি টেরও পেল না! তারা তখন কোথায় ছিল? বরখাস্ত হওয়া গার্ডদের কয়েকজন আমতা আমতা করে নিজেদের যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করতেই রুদ্র এক ধমকে তাদের থামিয়ে দিল। কোনো কৈফিয়ত শোনার মুডে সে নেই।
নতুন গার্ডদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সে ফ্যাক্টরির দীর্ঘদিনের পুরনো বিশ্বস্ত কয়েকজন শ্রমিকের সাথে একটা গোপন আলাপনে বসল।রুদ্র এক নজর তাদের দেখে নির্দেশ জারি করল , “আগামী ২৪ ঘণ্টার ভেতর আমার এই ফ্যাক্টরির চারপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চাই। যেকোনো মূল্যে।”
সেখান থেকে বের হয়েই সে তার বাবার ব্যক্তিগত সহকারী রমিজ উদ্দিনকে ডেকে পাঠাল। সাফ জানিয়ে দিল, সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার হওয়ামাত্র যেন সেটা তাকে ইমেইল করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সমস্ত দাপ্তরিক কাজ আর প্রাথমিক তদন্তের তদারকি শেষ করে যখন সে চৌধুরী বাড়ির দিকে রওনা হলো, ততক্ষণে আকাশের মুখ আরও কালো হয়ে এসেছে।
বিয়ের পর থেকে চৌধুরী বাড়িতে আর আসা হয়নি রুদ্রর। এবার আসার পেছনে ব্যবসার ঝামেলার পাশাপাশি দাদীর সাথে দেখা করার একটা বড় তাগিদ ছিল। বাড়ির সদর দরজা গলে রুদ্র যখন বসার ঘরে পা রাখল, তখন সামনের দৃশ্য দেখে সে থমকে গেল। সুলতানা চৌধুরী—সোফায় বেশ জাঁকিয়ে বসে আয়েশ করে পেয়ারা খাচ্ছেন।তাকে দেখে মনে হলো না সে অসুস্থ বা কোনো দুশ্চিন্তায় আছে। বেশ সুস্থ-সবল আর প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল ।
রুদ্রর ভেতরের দুষ্টুমিটা হঠাৎই জেগে উঠল। কোনো শব্দ না করে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎই এক লাফে সোফায় উঠে দাদীর গা ঘেঁষে বসে পড়ল।
হঠাৎ এমন অতর্কিত ধাক্কায় সুলতানা চৌধুরী চমকে উঠে পেয়ারা হাত থেকে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিলেন। তিনি বুক চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন, “ওই কে রে? কে রে?”
“তোমার জামাইয়ের সতীন!”
সুলতানা চৌধুরী যখন চশমার ওপর দিয়ে ভালো করে তাকিয়ে বুঝলেন এটা আর কেউ নয়, তার কলিজার টুকরো নাতি , তখন তিনি ক্ষণিকের জন্য ভয় ভুলে রেগে আগুন হয়ে গেলেন। তিনি চট করে হাত বাড়িয়ে রুদ্রর কানটা চেপে ধরে আচ্ছা মতো মোচড় দিলেন।
“আহ্! আহ্! লাগছে দাদী, ছাড়ো! কানটা ছিঁড়ে যাবে তো!” রুদ্র ব্যথায় মুখ কুঁচকে ককিয়ে উঠল।
“বেশ করেছি ধরেছি! কান ছিঁড়ে একবারে হাতে দিয়ে দেব! বাঁদর কোথাকার! বউ পেয়ে একেবারে দাদীকে ভুলে গেলি? একটা বার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না?” সুলতানা চৌধুরী কান না ছেড়েই অভিমানী সুরে বললেন।
রুদ্র হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলল, “আরে ছাড়ো তো! ওসব চার-শো-বিশের দেখা পেয়ে আমি আমার ডার্লিং, আমার সুইটহার্টকে ভুলে যাব? তা কখনো হয়?”
সুলতানা চৌধুরী এবার কানটা ছেড়ে দিয়ে একটু নড়েচড়ে বসলেন। গলার স্বর কিছুটা নিচু করে ফিসফিস করে বললেন, “ওরে ছোকরা, ওসব বাদ দে। আগে এইটা বল—প্রথম প্রথম তো বিয়েই করতে চাস নাই, হাজারটা অজুহাত দেখালি। আর এখন কী শুনছি? বিয়ের নয় মাস না যেতেই বউ তোর প্রেগন্যান্ট ৭ মাসের, হ্যাঁ? কে যেন একজন বলেছিল, জীবনে বিয়েই করবে না! তা এই অলৌকিক ঘটনা ঘটল কী করে, শুনি?”
দাদীর মুখে বাচ্চার কথা শুনে রুদ্রর মনের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্ত মুখ করে বলল, “চুপ করো তো বুড়ি! কী সব আজেবাজে বলছ? তুমি তো কত কথাই বলো। এই যে প্রতিনিয়ত বলো—মরে যাব, মরে যাব। কই, মরছ না তো! যমদূত বোধহয় তোমার ওপর আসার টিকিট কেটে আবার রিফান্ড নিয়ে নিছে। তা আমি কি তোমাকে বলেছি যে, তুমি এখনো মরছ না কেন?”
সুলতানা চৌধুরী এবার গালে হাত রেখে বিরক্ত গলায় বললেন,, “তোর মনে এই ছিল রে রুদ্র? তুই চাস আমি মরে যাই? আচ্ছা ঠিক আছে, মরেই যাব আমি।”
রুদ্র দাদীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল, “তা মরো না কেন? তোমার ছেলে যেমন কিপ্টে, তুমি মরলে অন্তত বাপের পকেট থেকে টাকা খসবে। তোমার চল্লিশার শিন্নিতে যেন ১০-১৫টা আস্ত গরু জবাই করে খাওয়ায়, সেই ব্যবস্থা করে তবেই মরো।”
সুলতানা চৌধুরী সোফার কুশনটা তুলে রুদ্রর গায়ে ছুড়ে মারলেন, “হারামজাদা! তুই চাস আমি মরে যাই!”
রুদ্র হাসতে হাসতে কুশনটা লুফে নিয়ে বলল, “আহা সুইটহার্ট, তোমার এই ওভারঅ্যাক্টিং এবার বন্ধ করো তো। আমার বিয়ে দিয়ে দেখছি তোমার বয়স আরও ২০ বছর কমে গেছে !”
সুলতানা চৌধুরী মুখে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে রুদ্রর পিঠে একটা চাপড় মারলেন। রুদ্র এবার একটু সোজা হয়ে বসে চারপাশটা দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা কোথায়?”
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে লিভিং এরিয়া ঢুকলেন রেহানা চৌধুরী। আচমকা বসার ঘরে নিজের ছেলেকে দেখে তিনি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি দ্রুত পায়ে ছেলের কাছে এগিয়ে এলেন। কিন্তু ছেলের খবর নেওয়ার আগেই তিনি যে প্রথম প্রশ্নটি করলেন, তা শুনে রুদ্রর কপালে ভাঁজ পড়ল।
রেহানা চৌধুরী ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “মেহের এসেছে? মেহের কোথায়?”
রুদ্রর মনের ভেতর এক তীব্র বিরক্তি দলা পাকিয়ে উঠল। তার নিজের মা, অথচ এতদিন পর ছেলেকে দেখে ছেলের খোঁজ না নিয়ে সে আগে জিজ্ঞেস করছে মেহেরের কথা…. ।
“আসেনি।”
রেহানা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কী? নিয়ে আসিসনি কেন তাকে এই অবস্থায়?”
রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জ্যাকেটের চেইনটা টানতে টানতে বলল, “মা, আমি এখানে বেড়াতে আসিনি। আর এই অবস্থায় ওর এখানে আসাটা মোটেও সেফ না।”
রেহানা চৌধুরী ছেলের কথার গুরুত্ব বুঝতে পেরে মাথা নাড়লেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু খেয়েছিস বাবা? মুখটা তো শুকিয়ে গেছে।”
“মুড নেই মা,” রুদ্র হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল। “ফ্লাইটের সময় হয়ে এলো, আমাকে এখনই বের হতে হবে। ঢাকায় ফিরতে হবে।”
সুলতানা চৌধুরী সোফায় বসে পেয়ারার টুকরো মুখে পুরে দিয়ে একটু ব্যঙ্গমিশ্রিত সুরে বললেন,
“ওহোহো! তা তো হবেই! ঘরে বউ রেখে এসেছে তো, মন কি আর সিলেটে টিকবে ? বুঝলাম, সবই বুঝলাম।”
রুদ্র দাদীর রসিকতায় বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিট বাজে। লকডাউনের রাতে রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো থাকে না, তার ওপর ফ্লাইটের কড়াকড়ি। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হামজা চৌধুরী তখনো পার্টি অফিসে ব্যস্ত থাকায় ওনার সাথে আর দেখা হলো না। রুদ্র মা আর দাদীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত পায়ে চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
রুদ্র চলে যাওয়ার পর রেহানা চৌধুরী এসে সুলতানা চৌধুরীর পাশে বসলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মা, দেখেছেন? আমার ছেলেটা কেমন সংসারী হয়েছে?”
সুলতানা চৌধুরী হেসে উঠে বললেন , “হেঁ হেঁ, তোমাকে বলি নাই? বউ পাইলে বনের বাঁদরও মানুষ হয়ে যায়। এই ছেলে যে ঘরের দিকে এভাবে ছুটবে, তা কে জানত!” দুই শাশুড়ি-বউ মিলে রুদ্রর এই পরিবর্তন নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসাহাসি করলেন।
রাত তখন প্রায় ১০টা। সিলেট থেকে ঢাকায় ফিরতে খুব বেশি সময় লাগার কথা ছিল না, কিন্তু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর কিছু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রুদ্রর বেশ খানিকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল। সব ঝামেলা চুকিয়ে সে যখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় এসে দাঁড়াল, ভীষণ ক্লান্ত সে।
রুদ্র নিজের চাবি দিয়ে লক খুলে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকল। লিভিং এরিয়া পার হয়ে সে ভেতরের করিডোরের দিকে এগোতেই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। করিডোরের একদম শেষ মাথায় থাকা ঘরটা—যে ঘরটায় সবসময় তালা ঝোলানো থাকে—সেই ঘরটার নিচ দিয়ে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরের লাইটটা জ্বলছে!
রুদ্রর কপাল কুঁচকে গেল। বুকের ভেতর হঠাৎ অকারণ একটা ভয় কাজ করতে লাগল।
ওই রুমে মেহের গিয়েছে? সে তো মেহেরকে প্রথম দিনই বারণ করে দিয়েছিল এই ঘরের আশেপাশেও না আসতে! তাহলে মেহের তার নিষেধ অমান্য করার সাহস পেল কী করে? রুদ্রর ক্লান্ত মস্তিষ্ক নিমেষেই ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠল। সে হনহন করে সেই রুমের দিকে পা বাড়াল।
আসলে, বেশ কিছুক্ষণ আগে মেহের যখন পুরো অ্যাপার্টমেন্টে পায়চারি করছিল, তখন হঠাৎ করেই তার চোখ পড়েছিল এই ঘরটার দিকে। সে অবাক হয়ে দেখেছিল, ঘরের তালাটা আজ আলগা হয়ে ঝুলছে, আর দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। রুদ্র তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় হয়তো লক করতে ভুলে গিয়েছিল। রুদ্র যে তাকে এই ঘরে ঢুকতে নিষেধ করেছিল, মেহেরের অবচেতন মন সেটা ভুলে গিয়েছিল।নিজের ভেতরের তীব্র কৌতূহল সে দমাতে পারল না।
মেহের খুব ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে দেয়ালের সুইচটা খুঁজে নিয়ে লাইটটা জ্বালিয়েছিল । নিচে খেয়াল না করায় মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট খেলনা গাড়ির সাথে তার পায়ে ধাক্কা লাগলে, সে কিছুটা হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়ে সাবধানে দেয়ালটা ধরে নিজেকে সামলে নিল।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘরটার দিকে চোখ বুলাতেই মেহেরের চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। পুরো ঘরটা ছোট ছোট খেলনা আর একটা বাচ্চার দোলনা দিয়ে সাজানো। দেয়ালে সুন্দর করে আঁকা বেবি পেইন্টিং। বেশ কিছু পুতুল তাকেগুলোর ওপর সারিবদ্ধভাবে রাখা। ঘরটায় যেন একটা অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে।
মেহের কৌতূহলী হয়ে পাশের একটা ছোট কাঠের শেলফের ওপর রাখা একটি পুরনো ফটো অ্যালবাম তুলে নিল। প্রথম পাতাটা খুলতেই দেখাল—একটা ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ের ছবি। সে আরও কিছু পাতা উল্টাতেই দেখল, সেই মেয়ে বাচ্চাটার সাথে রুদ্রর বেশ কিছু ছবি।
মেহের সম্মোহিতের মতো পরের পাতাটা ওল্টাতে চাইল, কিন্তু সে আর পারল না। হঠাৎ করেই তার হাতের ওপর অত্যন্ত শক্ত একটা হাতের স্পর্শ এসে পড়ল। মেহেরের হাতের আঙুলগুলো ব্যথায় অবশ হয়ে গেল।
অন্য হাত দিয়ে রুদ্র এক ঝটকায় ফটো অ্যালবামটা মেহেরের হাত থেকে কেড়ে নিল।
“আমি তোমাকে বলেছিলাম না এই রুমে না আসতে? হাউ ডেয়ার ইউ!”
মেহেরের রুদ্রর এই আকস্মিক চিৎকারে আর হিংস্র চাউনিতে কেঁপে উঠল। সে অতীতে রুদ্রর রাগ দেখেছে, কিন্তু এত বেশি রাগতে কখনো দেখেনি। সে আমতা আমতা বলল, “ও… অ্যাকচুয়ালি… অ্যাকচুয়ালি দরজাটা খোলা ছিল, তাই…”
রুদ্রর রাগ তখন সপ্তম আকাশে চড়ে গেছে। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে মেহেরের কোনো কথাই শুনল না, মেহেরের ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে এক প্রকার টেনে-হিঁচড়ে সেই ঘর থেকে বের করে নিয়ে এলো।
“হাউ ডেয়ার ইউ! আমার পারমিশন ছাড়া তুমি ওই রুমে গেলে কীভাবে? কিসের এত কৌতূহল তোমার? যখন আমি না করেছি, তখন কোন সাহসে তুমি ওখানে ঢুকেছ?” রুদ্র দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচাতে লাগল।
মেহের ব্যথায় ককিয়ে উঠে বলল, “আমি ইচ্ছে করে যেতে চাইনি রুদ্র… আমি জাস্ট…”
“কিন্তু তুমি গিয়েছ! আমার নিষেধ অমান্য করেছ!” রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সোজা মেইন দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা লক খুলে এক ঝটকায় মেলে ধরল।
বাইরের করিডোরের অন্ধকার আর ঠান্ডা বাতাস ফ্ল্যাটের ভেতর আছড়ে পড়ল। রুদ্র দরজার দিকে আঙুল নির্দেশ করে চিৎকার করে বলল, “আউট! আউট ফ্রম মাই হাউস!”
মেহের স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রুদ্র তার দিকে এমন এক ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল যে মেহেরের মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। রুদ্র মেহেরের কোনো আকুতি, কোনো কৈফিয়ত শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে মেহেরকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে, টেনেহিঁচড়ে রাত ১০টার এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে বের করে দিল।
দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, মেহের তার বড় বড় গোল গোল চোখ দুটো মেলে রুদ্রর দিকে চেয়ে রইল।
মেহের করিডোরের আবছা আলোয় দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এখন সে যাবে কোথায়? হ্যাঁ, তার ওই ঘরে যাওয়াটা হয়তো অন্যায় হয়েছিল, কিন্তু তাই বলে রুদ্র তাকে এই অবস্থায়, এই মাঝরাতে এভাবে ঘর থেকে বের করে দেবে?
বাইরে তখন বৃষ্টির মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। জানালার কাচ ভেদ করে ভেতরের দেয়ালে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে। মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের তীব্র চমকানিতে পুরো করিডোরটা বারবার কেঁপে উঠছে। রুদ্রর এই রূপ মেহেরের চেনা ছিল না। সে রেগে গেলে নিষ্ঠুর কথা বলে, চ—তা মেহের জানে। কিন্তু সে যে এতটা অমানুষ হতে পারে, তা মেহেরের কল্পনারও বাইরে ছিল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৯
মেহেরের পায়ে কোনো জুতো ছিল না। সে ঘরের ভেতর খালি পায়েই হাঁটছিল। ওই অবস্থায়, খালি পায়েই সে ধীর গতিতে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। রাতে, এই দুর্যোগে, গর্ভের আট মাসের সন্তানকে নিয়ে সে কোথায় যাবে? তার নিজের কোনো ঘর নেই, কোনো আপন মানুষ নেই।
আকাশে আবার এক তীব্র শব্দে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। মেহেরের বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল, সে দুই হাতে নিজের পেটটা চেপে ধরল। তার দুচোখ বেয়ে তখন নোনতা জল ঝরছে, যা করিডোরের অন্ধকারে কেউ দেখার নেই। দুই চোখ যেদিকে যায়, সে আজ সেদিকেই যাবে। নিয়তির এই নিষ্ঠুর খেলায় তার আর কোনো উপায় অবশিষ্ট রইল না।
