Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৯

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৯

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৯
আয়েশা শেখ

পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ঝিলমিলের পড়ার চাপ আরও বেড়ে গিয়েছে। পরীক্ষা দিয়ে এসে রান্না করে খাবার খেয়ে পড়তে বসা আবার সকালে পরীক্ষা দিতে যাওয়া! পুরো সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেল। আরও কয়েকটা পরীক্ষা আছে তাহলেই শেষ। ঝিলমিল এখন রাতের খাবার বানাচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে তার খুব, তবু কিছু করার নেই। তার কাজের মাঝেই শিউলি বেগম এসে নিজের ফোনটা ঝিলমিলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
— ‘তোমার ফুপি কথা বলবে, নাও।’
​একটু আগেই শিউলি বেগমের ফোন দিয়ে মা আর ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলেছে সে। এখন আবার ফুপি! ঝিলমিল এক হাতে তরকারি নাড়তে নাড়তেই অন্য হাতে ফোনটা কানে ধরল।

​— ‘হ্যালো, ফুপি! কেমন আছো?’
​— ‘তোর ফোন কীভাবে নষ্ট হলো?’ ভালোমন্দের কোনো জবাব না দিয়ে সরাসরি গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল দীঘি।
​ঝিলমিল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বানিয়ে বলল,
— ‘ফোন… হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। কেন?’
​— ‘বারিশ তোকে নতুন ফোন কিনে দেয়নি?’
​— ‘সে দিলেই কি আমি নেব নাকি?’
​কথার মাঝে রান্নার শব্দ ছড়াতেই দীঘি খটকা পেয়ে বলল,
— ‘কোথায় তুই এখন? কিসের শব্দ আসছে? কী করছিস?’
​— ‘আমি রা…’ ঝিলমিল কথা সামলে নিল। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রাঁধছে জানলে ফুপি এখনই এসে তোলপাড় শুরু করে দেবে।
​— ‘কী হলো?’
​— ‘কোথায় আবার, রুমেই তো… রুমেই আছি।’
​— ‘মনে তো হচ্ছে কিচেনে আছিস। তুই কিচেনে গিয়েছিস নাকি?’
​— ‘নাহ…’ ঝিলমিল একবার শিউলি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কিচেনেই দাঁড়িয়ে আছি। ভাবি রান্না করছে, ওটারই শব্দ পাচ্ছ।’
​শিউলি বেগম চোখ পাকালেন। টুম্পা তো অনেক আগেই বাড়ির সবার রান্না শেষ করে রেখে গেছে!
ঝিলমিল শিউলি বেগমকে ভাবি বানিয়ে দেওয়ায় দীঘি প্রথমে বুঝতে পারল না, তারপর বারিশদের ঘরের হিসেব মিলিয়ে বুঝতে পারল।

​— ‘আচ্ছা শোন,’ দীঘি বলল, ‘তোকে দিয়ে ঝর্ণা আন্টি কোনো কাজটাজ করালে আমাকে সোজা বলে দিবি। ওই মহিলা কিন্তু সুবিধার না।’
​— ‘তুমি একদম ভেবো না ফুপি। আমাকে দিয়ে কেউ কাজ করায় না, সবাই অনেক ভালো।’
​আরও কিছুক্ষণ কথা বলে কল কেটে দিল ঝিলমিল। ফোন রাখার পর মনে পড়ল, তাহসিন আঙ্কেলের কথা তো জিজ্ঞেস করাই হলো না!
​— ‘মিথ্যে বললে কেন? তুমি তো সব কাজই করো,’ শিউলি বেগম বললেন।
​— ‘এগুলো কি আর বলা যাবে? বললে তো সব এলোমেলো হয়ে যাবে। ফুপি এখনই এসে আমাকে নিয়ে যাবে, আর আব্বুও নতুন ঝামেলা শুরু করবেন।’ সময় হলে ঝিলমিল নিজেই সব বলবে, এখন না।
​শিউলি বেগম আর কিছু বললেন না। টুম্পাকে সাথে নিয়ে রাতের খাবার ডাইনিং টেবিলে নিয়ে রাখতে লাগলেন। বাড়ির সবাই একে একে এসে টেবিলে বসছে। জারিন, জারিফ, চঞ্চল শেহরিয়ার আর ঝর্ণা বেগম। ফরহাদ সাহেবও এসে বসেছেন। টুম্পা আর শিউলি বেগম খাবার বেড়ে দিচ্ছেন।
​ঝিলমিলেরও রান্না শেষ। লোকটা বাইরে গেছে, এলেই খাবার দিয়ে সোজা ঘুমাতে চলে যাবে সে। ​ঝিলমিলকে রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চঞ্চল শাহরিয়ার ডাক দিলেন,

— ‘ঝিলমিল… মামুনি, এদিকে আসো।’
​তার ডাক শুনে ঝর্ণা বেগম মুখ বাঁকালেন,
— ‘দাদুভাই থেকে এখন মামুনি?’
​— ‘আগের সম্পর্ক বাদ দাও ঝর্ণা! ও এখন আমার ছোট ছেলের বউ।’
​ঝর্ণা বেগম কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই ঝিলমিল এগিয়ে এসে বলল,
— ‘হ্যাঁ বাবা, আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আগের সম্পর্ক নিয়ে পড়ে থাকলে হয়? অথচ দেখুন, এই বাড়িতে একজন বয়সে আমার ছোট হয়েও আমাকে নাম ধরে ডাকে!’
​চঞ্চল সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
— ‘কী বলো? কে সে? জারিন?’
​— ‘না, জারিন না। জারিফ।’
​জারিফ ভাতের লোকমা মুখে তুলতে গিয়ে মাঝপথেই থমকে গেল। ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
— ‘তোকে নাম ধরে ডাকব না তো কী বলব? কে তুই?’
​ফরহাদ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে ধমকে উঠলেন,

— ‘কে মানে কী? আর ওকে তুই নাম ধরে ডাকিস কোন সাহসে?
তোর চাচার বউ সে, আজ থেকে চাচী বলবি।’
​ঝিলমিল একটু মুখভার করে বলল,
— ‘জারিন তো মামুনি বলে ডাকে। ওরও তো মামুনি ডাকা উচিত, তাই না ভাইজান?’
​শিউলি বেগম আর চঞ্চল শাহরিয়ারও সায় দিলেন।
— ‘হ্যাঁ, চাচীরা মায়ের মতোই হয়। তুই আজ থেকে ঝিলমিলকে মামুনি বলে ডাকবি। নাম ধরে ডাকতে যেন না শুনি, আর খবরদার তুই-তোকারি করবি না,’ শিউলি বেগম বললেন।
​— ‘ঝিলমিল, ও আর একবার নাম ধরে ডাকলে আমাকে বলে দেবে,’ ফরহাদ সাহেব যোগ করলেন।
​— ‘আচ্ছা ভাইজান। তবে এখনই একবার ডাকতে বলুন, নইলে পরে আবার ভুলে যাবে।’
​— ‘হ্যাঁ, ডাক। মামুনি বলে ডাক!’
​জারিফ বিরক্ত হয়ে বলল,
— ‘কী শুরু করলে তোমরা? আমি কেন ওকে মামুনি বলে ডাকব? পারব না, আমি নাম ধরেই ডাকব।’
​— ‘কারণ আমি তোমার চাচ্চুর আপন বউ। চাচীকে কি কেউ নাম ধরে ডাকে?’ ঝিলমিল শান্ত গলায় বলল।
​ফরহাদ সাহেব আর সহ্য না করে ছেলের কান চেপে ধরলেন,

— ‘বে”য়াদব ছেলে! চাচীকে নাম ধরে ডাকবি কোন সাহসে? ডাক বলছি, মামুনি ডাক!’
​জারিফ কানের ব্য”থায় কুঁকড়ে গিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। ঝিলমিলের মুখে তখন মিটিমিটি হাসি।
​— ‘কী হলো? ডাক!’
জারিফ ঝিলমিলের চোখের ওপর বিষাক্ত এক দৃষ্টি ধরে রেখেই, রাগে গজগজ করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করল,
​— ‘মমম-মামুনি…’
​জারিন দৃশ্যটা দেখে খুশিতে হাত তালি দিতে লাগল।
—‘ বসো এখানে, আমাদের সঙ্গে খাবে।’ চঞ্চল সাহেব ঝিলমিলকে বললেন।
​— ‘না, আমি এখন খাব না। আর তাছাড়া আমাদের জন্য তো আলাদা রান্না করেছি, ওগুলোই খেতে হবে,’ ঝিলমিল মৃদু স্বরে বলল।
​কথাটা শুনে চঞ্চল সাহেবের মুখটায় বিরক্তি ফুটে উঠল। অনর্থক মেয়েটাকে দিয়ে তার ছেলে এভাবে খেটিয়ে মারছে! না জানি এ খবর চৌধুরী বাড়িতে গেলে কী তুলকালাম কাণ্ড হবে!

— ‘বসো তো এখানে! আজ আমাদের সাথেই খাবে,’ এবার ফরহাদ সাহেবও তাগিদ দিলেন।
​ঝিলমিল কী করবে বুঝতে না পেরে দ্বিধায় পড়ে গেল। সে একবার সদর দরজার দিকে তাকাল। ঘড়িতে রাত দশটার বেশি বেজে গেছে। প্রতিদিন তো রাত নয়টার মধ্যেই লোকটা বাড়ি ফেরে, আজ এত দেরি হচ্ছে কেন বুঝে আসছে না। অবশ্য সে না এলেও ঝিলমিলের তাতে কিছু যায়-আসে না।

— ‘কী হলো? দাঁড়িয়ে আছ কেন?’ চঞ্চল শাহরিয়ার আবারও ডাকলেন।
​— ‘উনি আসুন, তারপর না হয়…’ ঝিলমিল আমতা আমতা করল।
— ‘আজ ওর ফিরতে দেরি হচ্ছে, হয়তো বাইরে থেকেই খেয়ে আসবে,’ চঞ্চল সাহেব বললেন।
​— ‘আরে বাদ দাও তো দাদাভাই! ও হলো চাচ্চুর চাকরানি, চাচ্চুকে ছাড়া খাবে নাকি?’ জারিফের মুখ থেকে কথাটা বের হতে না হতেই ফরহাদ সাহেব আবারও তাকে চোখ গরম করে ধমকে উঠলেন।
​ঝিলমিল এতবার না করার পরও সবাই মিলে তাকে এক প্রকার জোড়াজুড়ি করেই নিজেদের সাথে খেতে বসিয়ে ছাড়ল। চঞ্চল সাহেব ভালোবেসে নিজের পাশে ছোট ছেলের বউকে বসালেন। এ বাড়িতে আসার পর আজই প্রথম মেয়েটাকে নিয়ে একসাথে খেতে বসেছেন তিনি!
​ঝিলমিলের ডান পাশে চঞ্চল শাহরিয়ার আর বাম পাশে জারিফ। ঝিলমিল বসতেই জারিফ আড়চোখে তার দিকে একরাশ রাগ নিয়ে তাকাল। বাকিরা সবাই ততক্ষণে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। ঝিলমিল ভাতের লোকমা মাখাতে মাখাতেই শরীরটা একদম হালকা জারিফের দিকে হেলিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

— ‘খেলি চিনিমিনিচিনিমিনি, চিনিমিনিচিনিমিনি মন নিয়ে ম্যাজিক মামনি!’
​গানের লাইনটা শোনামাত্র জারিফ রগ ফুলিয়ে চরম রাগে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— ‘আমিও দেখব তুই কত দিন এ বাড়িতে থাকিস!’
​— ‘কী করবি তুই?’
​— ‘কত কী করি, শুধু দেখতে থাক!’
ঝিলমিল পাশের দিকে আরেকটু ঝুঁকে জারিফকে পাল্টা জবাব দিল। তাদের দুজনের এই নীরব, চাপা যুদ্ধ ডাইনিং টেবিলের আর কারও নজরে না পড়লেও, সদর দরজায় এসে দাঁড়ানো স্বয়ং বারিশের চোখ এড়াতে পারল না। তার কঠিন নজর আটকে গেছে জারিফের খুব কাছাকাছি ঝুঁকে কথা বলতে থাকা ঝিলমিলের ওপর।
ওদিকে ​আচমকা বারিশকে দেখেই ঝিলমিলের মুখের কথা মাঝপথেই থমকে গেছে। প্লেটের খাবারের একটা লোকমাও তখন পর্যন্ত মুখে তুলতে পারেনি সে। বারিশ দেখল, মেয়েটা ভয়ার্ত চোখে তার দিকে চেয়ে আছে।
​ভারী পায়ে সে ডাইনিং স্পেসের দিকে এগোতে লাগল। ঝিলমিল একপ্রকার আতঙ্কেই চেয়ার ছেড়ে হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকে এভাবে আচমকা উঠে দাঁড়াতে দেখে চঞ্চল সাহেব আর ঝর্ণা বেগম অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

​— ‘কী হলো…’
​ঝিলমিলের মুখের ফ্যাকাসে রঙ দেখে সবাই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকাল। ততক্ষণে বারিশের জোড়া হাত কাচের বিশাল ডাইনিং টেবিলটা স্পর্শ করে ফেলেছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর দু-হাত দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ানো বারিশের হাবভাব দেখে উপস্থিত প্রত্যেকেই বিপদের গন্ধ পেল যেন! নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সকলে। সবাই যেন অজান্তেই কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল।
ব্যস, বিকট শব্দে পুরো শেহরিয়ার বাড়ি কেঁপে উঠল! ভারী কাচের বিশাল টেবিলটা এক ধা’’ক্কায় উল্টে ফ্লোরে পড়ে শত টুকরো হয়ে গেল; সাথে টেবিলে সাজানো সব কাচের প্লেট-বাটি আর রাতের খাবার ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
​এমন তাণ্ডবে দু-হাতে কান চেপে ধরে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলল ঝিলমিল। ভয়ে জারিন গিয়ে শিউলি বেগমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। জারিফ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে নিজের চাচ্চুর দিকে তাকিয়ে আছে। ফরহাদ সাহেব আর চঞ্চল শাহরিয়ার একদম বাকরুদ্ধ। তবে তারা খুব একটা অবাক হননি—যেন এই বাড়িতে এটা নতুন কোনো দৃশ্য নয়। তবে আজ হঠাৎ কী কারণে ছেলেটা এমন রূপ ধারণ করল, তা কারও মাথায় আসছে না। ঝর্ণা বেগম তীব্র বিরক্তি নিয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এ নিয়ে তৃতীয়বার সে ডাইনিং টেবিল ভাঙল। তবে দেশে ফেরার পর এটাই প্রথম।
​কারও মুখ থেকে কোনো কথা বের হওয়ার আগেই বারিশ রক্তচক্ষু নিয়ে গটগট পায়ে এগিয়ে গেল ঝিলমিলের দিকে। বিষাক্ত চেহারার লোকটাকে নিজের দিকে তেড়ে আসতে দেখে ঝিলমিল চঞ্চল সাহেবের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
​ছেলেকে মাঝপথে আটকে দিয়ে চঞ্চল সাহেব ঝিলমিলের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন,

— ‘কী হচ্ছে এসব? কী হয়েছে তোর তরঙ্গ?’
​— ‘সামনে থেকে সরে যাও, বাবা।’ বারিশের গলা থেকে যেন হিংস্র গর্জন ঠিকরে বের হচ্ছে।
​চঞ্চল সাহেবের পেছন থেকে ঝিলমিল কাঁপা কণ্ঠে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইল,
— ‘আমাকে ওনারা সবাই জোর করে এখানে বসিয়েছেন! আমি নিজে থেকে বসতে চাইনি!’
​— ‘হ্যাঁ, ও একদম ঠিক বলেছে তরঙ্গ,’ চঞ্চল সাহেব ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘আমিই ওকে জোর করে আমাদের সাথে বসিয়েছি। আর পরিবারের সবার সাথে বসে দু-টো খেলে তোর এত সমস্যা কিসের?’
​— ‘বাবা, তুমি সরে যাও!’
​— ‘আমি তোকে আগেই মানা করেছি ওর গায়ে আর কখনো হাত না তুলতে! তুই রুমে যা তরঙ্গ, ও একটু পরেই যাচ্ছে।’
​কিন্তু বারিশ কোনো যুক্তির ধার ধারল না। নিজের জন্মদাতাকে একপ্রকার একপাশে ধা’’ক্কা মেরে সরিয়ে দিল সে। তারপর ঝিলমিলের নরম বাহুটা লোহার মতো শক্ত মুঠোতে চেপে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল নিজের রুমের দিকে। ঝিলমিল পেছনের দিকে তাকাতে তাকাতে আর্তনাদ করতে লাগল, কিন্তু ডাইনিং স্পেস থেকে আর কারো কোনো ডাক পৌঁছাল না বারিশের কান পর্যন্ত। ​রুমে ঢুকে শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল সে।

— ‘কার অনুমতি নিয়ে ওখানে খেতে বসেছিলি তুই?’ বারিশ চিবিয়ে চিবিয়ে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল।
​— ‘বললাম তো আমি বসতে চাইনি!’ ঝিলমিল ভয়ে পেছাতে পেছাতে জানাল, ‘আপনার বাবা কেন আমাকে জোর করে বসালেন?’
​বারিশ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কিন্তু ঝিলমিলের কোনো কথাই যেন তার কানে ঢুকছে না; তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ডাইনিং টেবিলে জারিফের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে কথা বলার দৃশ্যটা। নিজের কোমর থেকে চামড়ার চওড়া বেল্টটা চট করে খুলে ফেলল সে। তারপর ধীরেসুস্থে সেটা ডান হাতে পেঁচাতে লাগল।
​সেই দৃশ্যে অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় ঝিলমিলের! ভয়ে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল তার। পেছাতে পেছাতে একপর্যায়ে তার পিঠ গিয়ে ঠেকল রুমের বড় কাচের জানালার সাথে। ততক্ষণে বারিশও একদম গায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ​ঝিলমিল কোনোমতে নিজের ভয়টা চেপে, আঙুল উঁচিয়ে শক্ত গলায় বলল,
— ‘সেদিন আমায় মে”রেছেন, আমি কিছু বলিনি! আজ যদি আবার এমন কিছু করেন, তবে আমি সোজা বাসায় গিয়ে সবাইকে সব জানিয়ে দেব। কোনো অন্যায় ছাড়া আপনি এভাবে যখন-তখন আমার গায়ে হাত তুলতে পারেন না!’
​বারিশ এক চুলও সরল না। উল্টে চট করে নিজের বাম হাত দিয়ে ঝিলমিলের চোয়ালটা শক্ত মুঠোতে চেপে ধরল যে, মনে হলো এক চাপেই হাড়গোড় গুঁড়ো করে দেবে! এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আস্ত এক হিংস্র হায়েনা শিকারকে গিলে খাবে! আ”ক্রোশে এক্ষুনি ফেটে যাবে যেন বারিশের চোখ দুটো।

​— ‘ব্য”থা পাচ্ছি আমি!’ ঝিলমিল ব্য থা য় কঁকিয়ে উঠে।
​মেয়েটার য ন্ত্র ণা য় বুজে আসা মুখটার দিকে হিমশীতল দৃষ্টি রেখেই বেল্ট পেঁচানো নিজের ডান হাতটা সজোরে চালিয়ে দিল ঝিলমিলের মাথার ঠিক পেছনে থাকা জানালার কাচটার ওপর! ​মড়মড় শব্দে জানালার পুরু কাচটায় ফাটল ধরে জায়গাটা মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল, তবে পুরোপুরি ভাঙল না।
​আচমকা আ ঘা তে ঝিলমিল ভয়ে শিউরে উঠে ঝট করে চোখ মেলে তাকাল সেদিকে। হ্যাজেল রঙের বড় বড় চোখ দুটো আ ত ঙ্কে আরও বড় হয়ে গেল। হাতে শক্ত করে চামড়ার বেল্টটা পেঁচানো থাকায় লোকটার হাতটা কেটে র ক্ত বের হয়নি, কিন্তু সেই আ ঘা তের তীব্রতা আর জানালার এই অবস্থা দেখে ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা জমে বরফ হয়ে গেল!
হৃদস্পন্দন কেমন যেন থমকে আসল ঝিলমিলের। অথচ কয়েক সেকেন্ড আগেও বুক ধড়ফড় করছিল। চড়চড় করে নেমে গেল শরীরের র ক্ত চা প। চোখের আলোও ধীরে ধীরে আবছা হয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। পা দুটি আর নিজের শরীরটার ভার ধরে রাখতে পারল না। হাঁটুর জোর হারিয়ে সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে এল তার তনুদেহ।

​বারিশের মুখের দিকে একপলক ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করতেই ঝিলমিলের চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে বুজে এলো। মাথাটা একপাশে ঢলে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল বারিশের গায়ের ওপর!
ঝিলমিলের নিস্তেজ শরীরটা তার ওপর ঢলে পড়তেই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল বারিশ। চোয়ালের ওপর রাখা তার বাম হাতের চাপ আলগা হয়ে এলো আপনাতেই। মেয়েটার মাথাটা বারিশের বুকের ওপর এলিয়ে রয়েছে, হাত দুটো ঝুলছে একেবারে নিষ্প্রাণভাবে।
গালে স্পর্শ করে কয়েকবার ডাকল তাকে বারিশ। কোনো নড়াচড়া নেই। ঝিলমিলের মায়াবী মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ​বারিশ এক মুহূর্ত দেরি না করে দুই বাহুতে ঝিলমিলকে পাঁজাকোলা করে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল ।
​পরক্ষণেই ঝুঁকে পড়ল ঝিলমিলের ওপর। কপালে হাত দিয়ে দেখল—বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে শরীরটা, কপালে জমে উঠেছে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু। ঝিলমিলের বুকের স্পন্দন পরিমাপ করার জন্য সে তার কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরল। পালস চলছে, তবে বড্ড ধীর, ক্ষীণ।

প্যানিক অ্যাটাক নাকি অতিরিক্ত ভয়ে সেন্সলেস হয়ে গেছে বুঝে আসল না বারিশের। সে তড়িঘড়ি করে সাইড টেবিল থেকে পানির জগটা তুলে হাতের তালুতে খানিকটা পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিল ঝিলমিলের বন্ধ চোখের পাতায় আর মুখে।
​— ‘ঝিলমিল! ওপেন ইউর আইজ!’ বারিশের কন্ঠে এবার আদেশের চেয়ে আতঙ্কের সুরই বেশি স্পষ্ট।
​ঝিলমিলের কপালে জমে থাকা ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল সে। পানি ছিটানোর পরও যখন ঝিলমিলের চোখ দুটো খুলল না, বারিশের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে এলো। তবে এবার রাগে নয়, নিজের ওপর এক অজানা নিয়ন্ত্রণে। সে ওয়াশরুম থেকে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে এনে ঝিলমিলের হাত আর মুখ মুছে দিতে লাগল, আর অন্য হাত দিয়ে একটানা তার হাতের তালু ঘষতে থাকল রক্ত সঞ্চালন বাড়ানোর জন্য।
​ঘরের দরজায় ততক্ষণে চঞ্চল সাহেব আর শিউলি বেগম ধাক্কা দিতে শুরু করেছেন,

— ‘তরঙ্গ! দরজা খোল! মেয়েটার সাথে কী করছিস তুই ভেতরে?’
​বারিশ সেদিকে কান দিল না। তার সমস্ত নজর এখন বিছানায় নিস্পন্দ পড়ে থাকা ১৭ বছরের মেয়েটার দিকে। বিরক্তি আর হালকা উদ্বেগ নিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে ডক্টরকে ডায়াল করতে যাবে, ঠিক তখনই সে খেয়াল করল ঝিলমিল এক চোখ সামান্য ফাঁক করে তাকে দেখার চেষ্টা করেই তড়িঘড়ি করে আবার বন্ধ করে ফেলল!
​বারিশের বোঝার আর বাকি রইল না মেয়েটা জ্ঞান হারানোর নাটক করছে! এতটা দুঃসাহস! মুখে কিছুই বলল না সে। থাকুক এভাবেই পেটের ভেতর সব ফন্দি লুকিয়ে! সে ফোনটা যথাস্থানে রেখে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে, ঘরের লাইটটা অফ করে দিয়ে ঝিলমিলের এক পাশে এসে শুয়ে পড়ল।

মোটেও জ্ঞান হারানোর নাটক করেনি ঝিলমিল! ভয়ে সত্যিই জ্ঞান হারিয়েছিল সে। মুখের ওপর ঠাণ্ডা পানির ছিটকা পেয়ে চেতনাটা ফিরছিল ঠিকই, কিন্তু লোকটার থমথমে কণ্ঠ শুনে আর নতুন কোনো ঝামেলার আশঙ্কায় ইচ্ছে করেই আর চোখ মেলেনি।
​কিন্তু এখন সে পড়েছে মহা বিপদে! পেট চোঁ চোঁ করছে ক্ষুধায়, রাতের খাবার এক লোকমাও পেটে পড়েনি। রুমের লাইটও নিভিয়ে দিল! এখন কী করবে সে? ​ক্ষুধার জ্বালায় টিকতে না পেরে একটু নড়েচড়ে উঠে ধীরে চোখ দুটো মেলল। কিন্তু সাথে সাথেই পাশ থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে ভেসে এলো বারিশের গমগমে কণ্ঠ। লোকটা শুয়ে শুয়েই এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

— ‘কী?’
​চট করে আবার শক্ত করে চোখ দুটো বুজে ফেলল ঝিলমিল। তারপর এক ঝটকায় অন্যদিকে মুখ ঘুরে শুয়ে পড়ল। ​বারিশ আর কথা বাড়াল না, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অবজ্ঞা ফুটিয়ে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে নিল।
— [রাইটার পেইজ- Ayesha sheikh Rin- আয়েশা শেখ রিন]—
​— ‘দাদীমা! এই মেয়ে আর কতদিন থাকবে এখানে? আমার কিন্তু ওকে আর একদম সহ্য হচ্ছে না!’
নিজের ঘরে বসে রাতে বই পড়ছিলেন ঝর্ণা শেহরিয়ার। তখনই গটগট করে ভেতরে ঢুকে পড়ল জারিফ। তার চেহারায় স্পষ্ট ক্ষোভ আর অধৈর্য ভাব।
​ঝর্ণা শাহরিয়ার চশমার ওপর দিয়ে একবার চোখ তুলে তাকালেন জারিফের দিকে। তারপর ধীরেসুস্থে বইটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে বেশ ঠান্ডা গলায় বললেন,
— ‘চুপচাপ যা হচ্ছে দেখতে থাক। তোর চাচ্চুকে চিনিস না? ওর কোনো কিছুর প্রতিই কি বেশিদিন আগ্রহ থাকে? এই মেয়ের প্রতিও থাকবে না। খামোখা অস্থির হচ্ছিস কেন?’
​জারিফ দাদীমার এই শান্ত ভাবটা নিতে পারল না।
— ‘কিন্তু আমাদেরও তো কিছু করা উচিত, দাদীমা! তুমি তো নিজেই ওরে দেখতে পারো না, তা-ও এত চুপচাপ আছো কেন?’

​— ‘তোর কী মনে হয়, আমি হাত গুটিয়ে বসে আছি? দুটো মাত্র ছেলে আমার। বড় ছেলের বউ, অর্থাৎ তোর মা আমার মনের মতো হয়নি। ভেবেছিলাম অন্তত ছোট ছেলের বউটা আমার পছন্দের হবে—তা সেখানে এসে জুটল এক নাবালিকা!’
​কথাটার অর্থ বুঝতে পেরে জারিফ এক পা এগিয়ে এলো,
— ‘তাহলে কী করছ তুমি?’
​— ‘শুনে কী করবি তুই? সময় হলে নিজেই জানতে পারবি। এখন গিয়ে ঘুমা তো!’
— ‘যাইহোক, আমার বার্থডে সামনে। আমি এবারের পার্টিটা বাসায় অ্যারেঞ্জ করতে চাই, দাদীমা।’
​ঝর্ণা শাহরিয়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠিন গলায় সোজা না করে দিলেন,
— ‘না! বাসায় এসব ফালতু হট্টগোল একদম হবে না।’
​— ‘দাদীমা, প্লিজ!’ জারিফের গলায় এবার মরিয়া অনুনয়, ‘বাসায় করাটা খুব প্রয়োজন। তুমি বোঝার চেষ্টা করো একটু!’
​ঝর্ণা বেগম কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে নীরব রইলেন। কিছুক্ষণ ভেবে শেষমেশ অনুমোদন দিয়ে দিলেন,
— ‘ঠিক আছে, কর। তবে কোনো ঝুটঝামেলা যেন না হয়!’
—‘ একদম না, দাদীমা। কিচ্ছু হবে না, জাস্ট স্পেশাল কিছু খাওয়া দাওয়া হবে।’ বলতে বলতে জারিফ চলে গেল রুম ছেড়ে।

মাঝরাতে মেঘের বিকট, কর্কশ গর্জনে ঝিলমিলের কাঁচা ঘুমটা এক লহমায় ভেঙে গেল। আ ত ঙ্কে ধক করে উঠল বুকটা। চোখ মেলতেই দেখল, পুরো ঘর জুড়ে বিজলির তীব্র নীলচে আলো চমকে উঠছে। জানালার একপাশ খোলা রয়ে গেছে; সেখান দিয়ে ঝড়ের শোঁ শোঁ হাওয়ায় ভারী পর্দাগুলো ডানা মেলা পাখির মতো উড়ছে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ঝিলমিল এক মুহূর্তও দেরি না করে গায়ের পাতলা কাঁথাটা একদম মাথার ওপর পর্যন্ত টেনে মুড়ি দিল।
​বাইরে তখন যেন প্রলয় নাচছে! একদিকে গোঙাতে থাকা ঝোড়ো বাতাস, অন্যদিকে মেঘের বুক চেরা বিকট হুঙ্কার, আর তার সঙ্গে জানালার কাচে আছড়ে পড়া মুষলধারার বৃষ্টির তীব্র শব্দ। ভীতিতে ঝিলমিলের পুরো শরীর বরফের মতো হিম হয়ে আসতে লাগল। কাঁথার নিচ থেকে কেবল চোখের অংশটুকু বের করে সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জানালার দিকে তাকাল। আজ জানালাটা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল সে।
​বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় পুরো ঘরের থমথমে অন্ধকার একটু পরপর ঝলসে উঠছে। মেঘের পরের গর্জনটা আসতেই ঝিলমিল দু-হাতে কান চেপে ধরে শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল, যেন বাইরের শব্দগুলো তার কান অবধি না পৌঁছায়। এভাবেই গুটিসুটি মেরে কয়েক মুহূর্ত পড়ে রইল সে, কিন্তু ভয় কমছেই না উল্টো মনে হচ্ছে এক অদৃশ্য হাত যেন তার বুক চেপে ধরছে।

​বৃষ্টি থামারও কোনো লক্ষণ নেই। সময়ের সাথে সাথে এর দাপট আরও বেড়ে উঠছে। নিরুপায় হয়ে ঝিলমিল ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকাল বারিশের দিকে। সে অন্যদিকে ঘুরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
​নিজের বাসায় থাকলে এমন ঝড়ের রাতে সে ছুটে গিয়ে দাদীমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাত। বৃষ্টি তার পছন্দ হলেও ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে মেঘের আওয়াজ তার একদম সহ্য হয় না। কিন্তু এই ঘরে আজ তার নিরাপদ আশ্রয় বলতে কেবল এই একটি মানুষই আছে। যে তাকে ভয়ও দেখায়, আবার যার উপস্থিতি তাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দেয়।

​ঝিলমিল খুব সাবধানে, নিঃশব্দে কিছুটা এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। কাঁপতে থাকা দু-হাত বাড়িয়ে বারিশের পিঠের দিকে থাকা টি-শার্টের কাপড়টা পরম আকুলতায় আঁকড়ে ধরল। ভয়ে তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে, মুখের ভেতরের শুকনো জিভ দিয়ে জানা সব দোআ বিড়বিড় করে জপছে সে। ​ঠিক তখনই বাইরে এক বিকট, তীব্রতম শব্দে মেঘ ডেকে উঠল! ঘর যেন কেঁপে উঠল সেই প্রকম্পনে। খুব কাছেই হয়তো বাজটা পড়েছে। ভয়ে-আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ঝিলমিল বারিশের টি-শার্টের কাপড়টা দু-হাতে খামচে ধরে নিজের মুখটা গুঁজে দিল লোকটার চওড়া পিঠের উষ্ণতায়। মেয়েটার তপ্ত ও দ্রুত নিঃশ্বাস গিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল বারিশের পিঠে।

বারিশ যেন এবার শ্বাস আটকে শক্ত হয়ে গেল। চোখটা মেলল। এতক্ষণ ধরে মেয়েটার ছটফটানি অনুভব করছিল সে। ঝড়ের তাণ্ডবে তার নিজেরও ঘুম নেই। কয়েক মুহূর্ত গেলও না লোকটা চোখের পলকে এক পা তুলে ঝিলমিলের দেহের অপর পাশে রাখল, আর দু-হাত বিছানায় দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে পুরোপুরি ঝিলমিলের গায়ের ওপর ঝুঁকে এলো।
মুহূর্তের মধ্যে ঝিলমিল আটকে গেল বারিশের এই সুগঠিত ও সুদীর্ঘ শরীর এবং বাহুর এক নিবিড়, নিছিদ্র ঘেরাটোপে। ওপর থেকে বারিশের প্রশস্ত ছায়া পুরোটা ঢেকে ফেলল ঝিলমিলকে।
পুরো শরীর একদম শক্ত হয়ে বরফের মতো জমে গেল সপ্তদশীর। আতঙ্কে, বিস্ময়ে আর অচেনা আবেশে একদম স্থির গেল চোখ দুটো। পাপড়িগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘনঘন কাঁপছে। বিজলির নীলচে আলো যখন বারিশের তীক্ষ্ণ চোয়াল আর কঠিন মুখের ওপর এসে পড়ছে, ঝিলমিল অপলক চোখে কেবল সেদিকেই তাকিয়ে রইল। চোখ সরানোর শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।
বারিশের এই হঠাৎ এত কাছাকাছি চলে আসায় সপ্তদশীর মনের ভেতরে থাকা মেঘের ভয় নিমেষে উড়ে গিয়ে সেখানে দানা বাঁধল অন্যরকম ধকধকানি। গাল দুটো কান অবধি অজানা উত্তাপে লাল হয়ে উঠতে লাগল। ​সে নড়ার চেষ্টা তো দূরের কথা, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে—পাছে ওপরের লোকটা তার বুকের ভেতরে চলতে থাকা এই অস্বাভাবিক তোলপাড়টা বুঝে ফেলে!

— ‘আমার কাছে কেন এসেছো?’
​বারিশের নিচু, ভারী কণ্ঠস্বরটা ঘরের থমথমে অন্ধকার আর কানফাটা বৃষ্টির শব্দ ভেদ করে ঝিলমিলের কানে এসে পৌঁছাল। ​ঝিলমিল তার হ্যাজেল মণি দুটো বারিশের কুচকুচে কালো চোখের ওপর স্থির রেখে থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে কোনোমতে বিড়বিড় করে বলল,
— ‘ভয় পাচ্ছি…’
— ‘কাকে?’
— ‘কাকে আবার! মেঘ ডাকছে তাই…’ ঝিলমিলের কণ্ঠস্বর আতঙ্কে ছোট হয়ে এলো।
​বারিশের কঠিন চোখের দৃষ্টি আরও গাঢ় হলো,
— ‘আমি তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর। সরো এখান থেকে।’
​আকুল কণ্ঠে মিনতি জানাল ঝিলমিল,
— ‘প্লিজ! মেঘ ডাকা বন্ধ হোক না… খুব ভয় লাগে তো!’
​— ‘কিন্তু তুমি কাছে আসলে আমার ভয় লাগে।’ বারিশের গলায় কেমন যেন এক থমথমে, গভীর সুর।
​ঝিলমিল অবাক হয়ে নিষ্পাপ চোখে তাকাল,

— ‘কেন?’
​বারিশ নীরব রইল। দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড স্থিরতায় তাকিয়ে থাকল মেয়েটার মুখের দিকে। ​তারপর খুব ধীরে, থমথমে গলায় প্রশ্ন করল,
— ‘সেদিন আমি তোমার সাথে কিছু করেছিলাম?’
​ঝিলমিল থতমত খেয়ে গেল। বুকের ভেতর ধা’ক্কা মেরে উঠল এক পুরনো আতঙ্ক। গলার স্বর আটকে গিয়ে বলল,
— ‘ক-কবে?’
​— ‘মে”রেছিলাম যেদিন…’
​ঝিলমিল এক মুহূর্ত ইতস্তত করে মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে বলল,
— ‘নাহ, কিছু করেননি…’
​— ‘সরো এখন…’ বারিশের কন্ঠে আদেশ, কিন্তু তার নিজেরই সরার কোনো লক্ষণ নেই।
​— ‘আপনিই তো এভাবে ঝুঁকে আছেন…’
​বারিশের চোখ দুটো আরও নিবিড় হয়ে এলো। ঝিলমিলের খুব কাছাকাছি মুখটা নামিয়ে এনে শীতল কণ্ঠে বলল,

— ‘এত যে কাছে আসছো, আমি কাছে গেলে সইতে পারবে?’
​কণ্ঠের সেই কঠিন হুমকি ঝিলমিলের কানে পৌঁছানোর ঠিক পর মুহূর্তেই একদম হুট করে, পুরো আকাশ চিরে যেন প্রলয়ংকরী এক বিকট শব্দে মেঘ গর্জন করে উঠল! সাথে সাথে নীলচে বিজলির তীব্র আলোয় ঝলসে উঠল জানালার কাচ। ​সেই ভয়াল শব্দে বাছবিচারের সমস্ত ক্ষমতা এক সেকেন্ডে লোপ পেল ঝিলমিলের। আ ত ঙ্কে বুক ফেটে যাওয়া অবোধ্য শব্দ করে সে হুট করে তার দুটো হাত বাড়িয়ে দিল ওপরের দিকে। বারিশের গলাটা দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে টেনে আনল নিজের দিকে। পুরো শরীর দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বারিশকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরল ঝিলমিল।

বারিশ এমনিতেই তার ওপর ঝুঁকে ছিল, ঝিলমিলের এই হঠাৎ আকুল টানে তার মাথাটা সোজা গিয়ে ঠেকল মেয়েটার বুকে। যে বুকটা তখন ভয়ে আর দ্রুত নিঃশ্বাসের তোড়ে অনবরত থরথর করে কাঁপছে। যুবকের মনে হলো কোনো ছোট্ট পাখির স্পন্দিত হৃদয় এটি।
​বাইরের প্রলয়ংকরী ঝড় যেন হুট করে এসে জাঁকিয়ে বসল বারিশের নিজের ভেতরে। র ক্তের গতিবেগ এক ধা ক্কায় বেড়ে গেল কয়েক গুণ। যে যুবক এতদিন হিং’স্রতায় চারপাশ চুরমার করেছে, সেই এখন নিজের বুকের গহীনে চেপে রাখা নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক ভয়ঙ্কর তাণ্ডব অনুভব করছে। ঝিলমিলের কোমল দুটি বাহু এখনও তার গলা পেঁচিয়ে ধরে আছে। নিজের ভেতরের এই অবাধ্য উথালপাথাল সামলানো যে বাইরের ঝড় সামলানোর চেয়েও শতগুণ কঠিন- তা এই মেয়ে বুঝবে? বুঝলে আর ধরত এভাবে?
​ঝিলমিল তখনো আতঙ্কে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে আছে, বাইরের বিজলির গর্জন থেকে বাঁচতে আঁকড়ে ধরে আছে বারিশকে। কিন্তু সে বিন্দুমাত্র টের পেল না, তার এই আশ্রয়টুকু দান করা শক্ত মানুষটার ভেতরের ঝড়টা এখন বাইরের ঝড়ের চেয়েও কত বেশি বিধ্বংসী ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ​বারিশের চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও কেমন র ক্তি ম হয়ে উঠলো!
সে বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই নিথর হয়ে ঝিলমিলের বুকের স্পন্দন শুনল। পরক্ষণে খেয়াল করল ঝিলমিল তাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। বারিশ তৎক্ষনাৎ চোখ দুটো বুজে ফেলল। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
—‘ বৃষ্টি থেমে গিয়েছে সরুন এখন।’
সারাশব্দ নেই লোকটার। আরও কয়েকবার ডাকার কিন্তু বারিশ নড়ল না এক চুলও। তার ভেতরের ঝড় তুলে দিয়ে এখন বৃষ্টি থেমে যাওয়ার সংবাদ জানাচ্ছে? সরল না বারিশ। ঘুমের ভান করে সেভাবেই পড়ে রইল। বেচারি ঝিলমিলও ঘুমিয়ে পড়ল।

অফিসে দীঘির কাজ করার চেয়ে তাহসিনকে জ্বালানোর প্রবণতাই বেশি। সুযোগ পেলেই সহকর্মীদের সঙ্গে ইচ্ছে করে একটু উসকানিমূলক বা গা-ঘেঁষা ভঙ্গিতে কথা বলে, যাতে দূর থেকে তাহসিনের নজর সেদিকে যায়। সকালেও অফিসে ঢুকে একই দৃশ্য চোখে পড়েছিল তাহসিনের। কাজের চাপ একটু কমতেই সোজা গিয়ে ঢুকল দীঘির কেবিনে।

কোনো ভূমিকা না করে দীঘির কাজের টেবিলে জোরে একটা চাপড় মারল তাহসিন।
— ‘কী চান আপনি? নিজে তো কাজ করেনই না, আমাকেও শান্তিতে কাজ করতে দিচ্ছেন না! এসব বন্ধ করে ভালোভাবে কাজ করতে হলে করুন, নয়তো কাল থেকে অফিসে আসা বন্ধ করুন!’
​দীঘি তখন সবেমাত্র ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে ছবি তুলছিল। আচমকা তাহসিনের এমন হুংকারে ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেও মুখে বিন্দুমাত্র তা প্রকাশ হতে দিল না। ঝটপট ফোনটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। চোয়াল শক্ত করে উল্টো তেড়ে এলো,

— ‘তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলার সাহস পাচ্ছো কোথায়? ভুলে যেও না, তুমি কেবল এই অফিসের একজন অ্যাসিস্টেন্ট!’
​— ‘হ্যাঁ, সেটা আমার খুব ভালো করেই মাথায় আছে! আছে বলেই শত চেষ্টা করি আপনার থেকে দূরে থাকতে, আপনাকে এড়িয়ে চলতে! কিন্তু আপনি কেন এসব করছেন? কেন সবার কাছে নিজেকে এভাবে দিনদিন সস্তা করে তুলছেন?’
​কথাটা শুনতেই দীঘি টেবিল ছেড়ে এগিয়ে এসে সজোরে ধা”ক্কা মারল তাহসিনের বুকে,
— ‘তাতে তোমার কী? আমি গোটা দুনিয়ার কাছে সস্তা হবো, যা খুশি করব! তোমার তাতে কী আসে যায়?’
​তাহসিন এবার দীঘির দুটো বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
— ‘না, হবেন না! কারো কাছে সস্তা হবেন না আপনি। আর না এসব বাজে পোশাক পরে অফিসে আসবেন! দরকার নেই আপনার এভাবে অফিসে আসার।’
​দীঘি স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তাহসিনের দিকে। ছেলেটার চোখ দুটো রাগে রক্তিম হয়ে উঠেছে, চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে থমথম করছে। ডান চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গাল গড়িয়ে নেমে এলো অবাধ্য তরুণীর। ​অত্যন্ত অভিমানী গলায় দীঘি বলল,

— ‘ভালোই তো হতে চেয়েছিলাম… তুমিই তো হতে দিলে না। কী এমন ক্ষতি হতো বলো আমায় একটু ভালোবাসলে? সবার চোখের এই বাজে মেয়েটা না হয় তোমার জন্য একটু ভালো হতো!’
​তাহসিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল, তারপর নিচু গলায় বলল,
— ‘আপনাকে ভালোবাসা সম্ভব হলেও, আপনাকে নিজের করে নেওয়া সম্ভব না।’
​— ‘কেন সম্ভব না?’ দীঘি চিৎকার করে উঠল, ‘তুমি কি কোনো জা”নো”য়ার? নাকি আমি কোনো জ”ন্তু? আমরা দুজনেই র”ক্তমাংসের মানুষ, তাহলে কেন সম্ভব না?’
​— ‘কারণ… ’
​— ‘শাট আপ!’ থামিয়ে দিল দীঘি, ‘শুনতে চাই না আমি তোমার কোনো সামাজিক অজুহাত আর নীতিবাক্য! প্রয়োজন নেই তোমাকে আমার। আমি যেমন ছিলাম, ঠিক তেমনই থাকব। চলে যাও এখান থেকে! জাস্ট গেট আউট!’
​তাহসিন সরল না। দীঘির বাহুর ওপর থেকে তার হাতের মুঠিটা একটুও ঢিলে হলো না। সে দীঘির একদম চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

— ‘কতটা ভালোবাসেন আপনি আমায়? পারবেন আমার সঙ্গে গ্রামে গিয়ে, আমার সেই ভাঙা ঘরে গিয়ে থাকতে? পারবেন… আমার ছোট্ট ছেলেকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে?’
শ্বাস নিতে ভুলে গেল দীঘি। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৮

— ‘কী বললে? তোমার… ছেলে মানে?’
​— ‘হ্যাঁ! আমার ছেলে। আমার নিজের সন্তান। মা-হারা এক অসহায় শিশু। পারবেন তাকে নিজের সন্তানের মতো মায়ের আদর দিতে?’

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২০