Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫ (২)
আয়াত বিনতে নূর

কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে নিশিতাকে ছেড়ে দিল ফারিস। কিন্তু নিশিতা যেন নিজের বাকশক্তিই হারিয়ে ফেলেছে। কী বলবে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে— কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। অদ্ভুত এক অনুভূতি তার পুরো অস্তিত্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হৃদস্পন্দন যেন স্বাভাবিক ছন্দ ভুলে ছুটে চলেছে।
ফারিস আলতো করে নিশিতার কোমর থেকে হাত সরিয়ে দু’হাত দিয়ে তার মুখটা ধরে রাখল। ঠোঁটের কোণে একরাশ রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ধীর, গভীর কণ্ঠে বলল—
**”প্রতিটা ঘণ্টা… প্রতিটা মিনিট… প্রতিটা সেকেন্ড… এমনকি প্রতিটা ক্ষুদ্রতম মুহূর্তেও তোকে আমার চাই। শুধু আজ না, শুধু কাল না— যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন। আমার সকাল তুই, আমার রাত তুই, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের কারণও তুই।
তুই আমার অভ্যাস না, যে একদিন বদলে ফেলব। তুই আমার নেশাও না, যে সময়ের সঙ্গে কেটে যাবে। তুই এমন এক অনুভূতি, যাকে আমি নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি। তাই পৃথিবী বদলে যাক, ঋতু বদলে যাক, সময় থেমে যাক কিংবা ছুটে চলুক— আমার একটাই চাওয়া থাকবে… প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা স্পন্দনে, শুধু তোকেই আমার লাগবে… মানে লাগবেই।”**

ফারিসের প্রতিটি শব্দ যেন নিশিতার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে গিয়ে আঘাত করল। মুহূর্তের মধ্যেই তার সব রাগ, অভিমান আর অভিযোগ যেন কোথাও মিলিয়ে গেল। চোখের কোণে অজান্তেই চিকচিক করে উঠল একফোঁটা সুখের অশ্রু।
আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না সে। কোনো দ্বিধা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফারিসও নিজের প্রাণের মানুষটাকে বুকের সঙ্গে এমনভাবে আগলে নিল, যেন পুরো পৃথিবী থেকে তাকে আড়াল করে রাখতে চায়।
দু’জনেই হারিয়ে গেল নিজেদের ছোট্ট এক ভালোবাসার জগতে।
ঠিক তখনই—
খট… খট… খট…
হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এলো।
ওপাশ থেকে রিয়ার চেনা কণ্ঠ ভেসে উঠল—

“এই নিশি, নিশুর বাচ্চা কোথায় তুই? তোর জন্য আজকে আমাদের দেরি হয়ে যাবে। বের হহ এক্ষুনি, ৯ টা বেজে গেছে।”
কণ্ঠটা শুনেই চমকে উঠল নিশিতা। তড়িঘড়ি করে ফারিসকে ছেড়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।
সত্যিই তো! নয়টা বেজে গেছে।
অন্যদিকে মুহূর্তের মধ্যেই ফারিসের মুখের ভাব বদলে গেল। এই মুহূর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল রিয়াকে গিয়ে কয়েকটা উত্তমমধ্যম দিতে।
রাগ কোনোমতে সংযত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“বা*লের বউ বিয়ে করেছি যেই একটু আদর করি জ্বর চলে আসে আর এদিকে একদল গজব রোমাঞ্চের মুহূর্তে এসে ব্যাঘাত ঘটায়। রোমাঞ্চ না বা করবো।”**
বিরক্ত মুখে কথাটা বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল ফারিস।
এদিকে ফারিসের গম্ভীর গলায় বলা কথাগুলো এতটাই স্পষ্ট শোনা গেল যে, রিয়ার কানেও পরিষ্কার পৌঁছে গেল।

ব্যস!
এক সেকেন্ডও দেরি করল না রিয়া। ভয়ে একপ্রকার দৌড়ে ফারিসের রুমের সামনে থেকে পালিয়ে গেল। এত সকালে তার মার খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।
দৌড়ে সিঁড়ির কাছে এসে থামতেই হাঁপাতে লাগল সে। কয়েকবার বুকে হাত রেখে গভীর শ্বাস নিল। তারপর রাগে কটমট করতে করতে বিড়বিড় করে বলল—
**”বাবা রে। আমি তো ডাকতে গেছিলাম জানো দেরি না হয়। তাহলে আমি কিভাবে জানবো সকাল সকাল দুটো মিলে দুজনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
ওফ্ফ জোর বাঁচান বেঁচে গেলাম নাহলে আজকে মার কনফার্ম ছিলো।”**
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না রিয়া। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। কারণ, যখন-তখন ফারিস বেরিয়ে আসতে পারে।

রিয়া নিচে নেমেই দেখল, আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী ব্যস্ত হাতে সকালের নাস্তা পরিবেশন করছেন।
ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছেন আরাফাত চৌধুরী আর তনয়া। আর একটু দূরে সোফায় বসে সকাল সকাল টিভি চালিয়ে খবর দেখছেন আলতাফ চৌধুরী।
ঠিক তখনই রাজীব এসে চেয়ার টেনে বসতেই তার চোখ পড়ল রিয়ার দিকে।
রিয়াকে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল—
“কি রে শাঁকচুন্নি দাড়িয়ে আছিস কেনো..? কোনো বট গাছ দেখে বসে পড়।”
কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠল সে।
রিয়া রাগে ফসফস করতে করতে নিচে নামতে নামতে বলল—
“তুমি গিয়ে বসো তোমার না হওয়া বউকে নিয়ে আমাকে বলছো কেনো..?”
কথা শেষ করতেই রাজীব কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আফিয়া চৌধুরী ধমকের সুরে বলে উঠলেন—
“চুপ করবি তুই রাজীব? সকাল সকাল মেয়েটাকে জ্বালাস না তো। এমনি আজকে পরীক্ষা রয়েছে সব গুলিয়ে ফেলবে।”
রিয়া ডাইনিং টেবিলে বসতে বসতে বিড়বিড় করে বলল—

“তোমার বড় ছেলের তাড়া খেয়ে এমনিতেই সব গুলিয়ে গেছে, আম্মু।”
রিয়ার কথাটা স্পষ্ট বুঝতে না পেরে আফিয়া চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“কিছু বললি মা?”
রিয়া দ্রুত মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক ইঙ্গিত দিল। আফিয়া চৌধুরীও আর বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামালেন না।
ঠিক তখনই আমেনা চৌধুরী রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“হ্যাঁ রে রিয়া, নিশি কোথায়? উঠেনি নাকি এখনও ঘুম থেকে? পরীক্ষা আছে না আজ ওর?”
রিয়া মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
“উঠেনি আবার! সে তো তার বরের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। মাঝে আমি ডাকতে গিয়ে নিজেই বাঁশটা খেলাম। এখন ভাইয়া আসলে আমার কী করবে, কে জানে!”
রিয়াকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আমেনা চৌধুরী আবারও বললেন—
“কী রে, কী হলো তোর? কোথায় হারিয়ে গেলি? কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো।”
রিয়া আমতা আমতা করে বলল—
“ইয়ে… মানে… হ্যাঁ, উঠেছে। নিশি আসছে একটু পরে। তুমি ওর কথা বাদ দাও তো, আগে আমাকে খাবার দাও ছোট আম্মু।”
আমেনা চৌধুরী মুচকি হেসে রিয়ার প্লেটে নাস্তা তুলে দিলেন।
এদিকে তনয়া নাস্তা করতে করতেই ফোনে কী যেন দেখছিল। বিষয়টা চোখ এড়াল না আফিয়া চৌধুরীর।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে বললেন—

“এটা কী তনয়া? খাবারের মাঝে কেউ ফোন দেখে? রাখ ফোনটা।”
ধমক শুনে তনয়া একটু ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি ফোনটা নামিয়ে রাখল।
সুযোগটা হাতছাড়া করল না রাজীব। সে তনয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“কী রে? ছেলেটা কে রে?”
প্রশ্নটা শুনে তনয়া ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেও মুখে তা প্রকাশ হতে দিল না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল—
“কো… কোন ছেলে? কে?”
রাজীব ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হাসি হেসে বলল—
“তলে তলে পানি এত দূর গড়িয়েছে, মনা! এবার তাহলে বাড়িতে বলতে হচ্ছে।”
কথাটা শুনে তনয়ার মুখের রঙই যেন বদলে গেল। ভীতু চোখে কিছুক্ষণ রাজীবের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই যেন মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি এলো।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল—
“ওকে বলে দাও ভাইয়া। তাহলে আমিও বলে দিই যে তুমি অহনা কে….!”
কথাটা শেষ করার আগেই রাজীবের কাশি শুরু হয়ে গেল।
দৃশ্যটা দেখে তনয়া ফিক করে হেসে উঠল।
আফিয়া চৌধুরী চিন্তিত হয়ে বললেন—

“আহা, আস্তে খাবি তো। এত কিসের তাড়াহুড়ো তোর?”
রাজীব কোনো রকমে পানির গ্লাস তুলে ঢকঢক করে কয়েক ঢোক পানি খেল। তারপর চোখ রাঙিয়ে কটমট করে তনয়ার দিকে তাকাল।
তবে তনয়া যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে নিশ্চিন্তে নিজের নাস্তা খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
এসবের মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো ফারিস আর নিশিতা।
ফারিসকে দেখেই রিয়া একটু নড়েচড়ে বসল। মনে মনে এখনও কয়েক মিনিট আগের ঘটনাটা ঘুরপাক খাচ্ছে।
ফারিস এসে চেয়ার টেনে বসল। তারপর নিজের পাশের চেয়ারটা টেনে নিশিতাকে বসাল।
ওদের দু’জনকে বসতে দেখে আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরীও নিজেদের জন্য নাস্তা নিয়ে টেবিলে বসলেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ডাইনিং টেবিলটা পরিবারের সবার উপস্থিতিতে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল।
ফারিস নিজের প্লেটে খাবার তোলার আগেই প্রথমে নিশিতার প্লেটে নাস্তা তুলে দিল। দৃশ্যটা দেখে আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেললেন। ছেলের এই ছোট ছোট যত্নগুলো তাদের চোখ এড়ায় না কখনোই।
তবে ফারিস সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে স্বাভাবিকভাবেই নিজের নাস্তা খেতে শুরু করল।
দেখতে দেখতেই সবার নাস্তা প্রায় শেষ হয়ে এলো। হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে ভরপুর একটা সুন্দর সকাল কাটছিল সবার।
নাস্তা শেষ করে ফারিস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

“আমার হয়ে গেছে। নিশি আর রিয়া, তোরা আয়। আমি গাড়িতে ওয়েট করছি।”
কথাটা বলেই আর কারও উত্তরের অপেক্ষা না করে বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করল।
অন্যদিকে, একে একে সবাইও খাওয়া শেষ করে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
রাজীব বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মাত্র এক পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই হঠাৎ টিভির শব্দটা পুরো ঘরের নীরবতা ভেঙে দিল।
টিভির সংবাদ উপস্থাপকের কণ্ঠ ভেসে এলো—

**”ব্রেকিং নিউজ… ব্রেকিং নিউজ…
দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী রাহুল হোসেনের একমাত্র ছেলে আকাশ হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, দুর্বৃত্তরা হত্যার পর মরদেহ এমনভাবে বিকৃত করেছে যে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেহ টুকরো টুকরো করার পর তা গরম পানিতে ফুটিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে নিশ্চিত হওয়া যায়, নিহত ব্যক্তি আকাশ হোসেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য— তা জানতে ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ঘটনার আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন।”**

মুহূর্তের মধ্যেই রাজীবসহ সবার পদক্ষেপ থেমে গেল।
কেউ আর বাইরে যাওয়ার কথা ভাবল না। একে একে সবাই টিভির সামনে এসে দাঁড়াল।
পরক্ষণেই টিভির পর্দায় ভেসে উঠল নিহত আকাশ হোসেনের ছবি।
ছবিটা দেখেই নিশিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। এই ছেলেটাই তো গতকাল তার সঙ্গে জঘন্য আচরণ করেছিল। অথচ আজ… আজ সে এমন ভয়াবহ ও নৃশংস মৃত্যুর শিকার!
নিশিতার বুকের ভেতরটা কেমন অজানা এক শীতল অনুভূতিতে কেঁপে উঠল। মানুষটা যতই খারাপ হোক না কেন, এমন নির্মম মৃত্যু কল্পনাতেও আনা যায় না।
সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল তার কাছে।
একটা মানুষ হঠাৎ করে এভাবে খুন হয়ে যেতে পারে? তাও এতটা নিষ্ঠুর আর ভয়ঙ্করভাবে?
নিশিতা ধীরে ধীরে রিয়ার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
“এটা ওই কালকের ছেলেটা না, যে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলো? আর আজকে এভাবে হুট করে এতটা ভয়ঙ্করভাবে মৃত্যু হলো। কী অদ্ভুত না?”
রিয়া নিশিতার দিকে তাকিয়ে বলল—
“ঠিক হয়েছে। পাপের শান্তি আল্লাহ দেয়, নিশি। দেখলি? কালকে যা করলো, তারপর ওনার সাথে এটায় হওয়া ছিলো।”

নিশিতা আর কিছু বলতে পারল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বিষয়টা তাকে ভীষণভাবে অবাক করে দিয়েছে, সেটা তার মুখের অভিব্যক্তিই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল।
এতক্ষণ ধরে নিশিতা আর রিয়ার পুরো কথোপকথন নীরবে শুনছিল ফারিস।
হঠাৎ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—
“এর থেকেও আর ভয়ঙ্কর মৃত্যু হবে যে আমার লিটিল হার্টবিটকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবে। তাকে আমি মাটিতে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতেও দুইবার ভাববো না। পারলে এর থেকেও আরও বেশি কষ্ট দিয়ে মারতাম সুয়রের বাচ্চাকে।”
শেষের কথাগুলোয় স্পষ্ট ক্ষোভ আর প্রচণ্ড রাগের ছাপ ফুটে উঠল।
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ফারিস। দীর্ঘ পায়ে হেঁটে বাড়ির বাইরে চলে গেল।
আর বাকি সবাই যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরজুড়ে নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা।
পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার জন্য রাজীব সবার উদ্দেশ্যে বলল—
“তোমরা যে যার কাজে যাও। আর রিয়া, নিশি— তোরা যা। তোদের জন্য ভাইয়া ওয়েট করছে। আমাকেও অফিস যেতে হবে।”

রিয়া আর নিশিতা মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেল।
তনয়াও নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। একটু পরেই তার ভার্সিটি, তাই দ্রুত তৈরি হতে হবে।
রাজীব আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল—
“তোমরা ধীরে সুস্থে এসো। আমি এখন আসি।”
কথাটা বলেই সেও বেরিয়ে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই সবাই আবার নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
রাজীব অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আর ফারিস নিশিতা আর রিয়াকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নিজেও অফিসে চলে গেল।

কলেজে পৌঁছেই নিশিতা আর রিয়া দু’জনে মিলে অহনাকে খুঁজতে শুরু করল।
এত মানুষের ভিড়ের মাঝেও কোথাও অহনার দেখা মিলল না। পুরো ক্লাসরুম, করিডোর— চারপাশে ভালো করে খুঁজেও তাকে দেখতে পেল না নিশিতা।
হয়তো এখনও এসে পৌঁছায়নি মেয়েটা।
এমনিতেই ঢাকা শহরের যানজট পার হতে প্রায় এক-দুই ঘণ্টা লেগেই যায়। তার ওপর রাস্তায় মানুষের ভিড়— সব মিলিয়ে দেরি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তাই অহনার জন্য আর অপেক্ষা না করে রিয়া আর নিশিতা গিয়ে নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল।
রিয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, পরীক্ষা শুরু হতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি।
মুহূর্তেই তার মাথায় দুষ্টুমি চেপে বসল।
মনে মনে ভাবল, এই ফাঁকে নিশিতাকে একটু খেপানো গেলে মন্দ হয় না।
সেই ভাবনা থেকেই স্বাভাবিক গলায় নিশিতার দিকে তাকিয়ে বলল—
“বলছিলাম ভাবী জান, সকাল সকাল হাসবেন্ড আর ওয়াইফ মিলে তো ভালোই রোমাঞ্চ করছিলেন। তা কী করলেন আমাদেরও একটু বলেন। আমিও জানি কী কী করলেন।”
রিয়ার ঠাট্টা-ভরা কথাগুলো শুনে লজ্জায় নিশিতার গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। একই সঙ্গে বিরক্তিও লাগল তার।

এই মেয়েটা সুযোগ পেলেই তাকে নিয়ে মজা করবে। যেন এটাই ওর সবচেয়ে প্রিয় কাজ।
নিজেকে গম্ভীর দেখানোর চেষ্টা করে নিশিতা বলল—
“এসব বড়দের বিষয়ে তোকে জানতে হবে না। চুপচাপ পরীক্ষা চিন্তা কর তুই।”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে ভেংচি কেটে বলল—
“এ্যাহ্! আইছে রে আমার বড় ভাবী। জামাইয়ের সাথে রোমাঞ্চ করতে গিয়ে আমাকে যে বাঁশটা খাওয়াতি তখন কী? ভাগ্যিস তখন আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম। নাহলে ভাইয়া আমাকে আজকে শিওর মারতো। তোর ভালো করতে গিয়ে আমি মার খেতাম।”
রিয়ার কথা শুনে নিশিতা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হুহু করে হেসে ফেলল। তার হাসি দেখে রিয়াও ঠোঁট চেপে মুচকি হাসল।
ঠিক সেই সময়ই অহনা ওদের কাছে এসে হাজির হলো।
নিশিতার পাশের সিটে বসে কৌতূহলী দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল—
“কি রে..? কী চলে তোদের মধ্যে? আমাকেও বল।”
রিয়া সব বলে দেওয়ার জন্য মুখ খুলতেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নিশিতা চোখ গরম করে তাকাল তার দিকে।
ব্যস!

রিয়া সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল। মুখে আর একটা শব্দও বের হলো না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই স্যার ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন।
শুরু হয়ে গেল পরীক্ষা।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ক্লাসরুম নীরব হয়ে গেল। স্যাররা চারদিকে নজর রেখে গার্ড দিতে শুরু করলেন।
নিশিতা প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়া মাত্রই উত্তর লেখা শুরু করে দিল।
অন্যদিকে রিয়া পড়েছে মহা বিপদে। কিছুই যেন মাথায় আসছে না তার। কী লিখবে, কী লিখবে না— কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। এদিকে কারও খাতা দেখারও বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
মনে মনে শুধু একটাই দোয়া করতে লাগল—
“আল্লাহ… আল্লাহ… পাশ মার্কটুকু তুলতে পারলেই শান্তি।”
এদিকে অহনার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।
প্রায় বেশির ভাগ প্রশ্নই আনকমন এসেছে। আর সারারাত রাজীবের সঙ্গে ফোনে কথা বলার কারণে ঠিকমতো পড়াশোনাও করা হয়নি।
তবে আগে যতটুকু পড়েছে, সেই ভরসাতেই পরীক্ষা দিতে এসেছে সে।
মাথা থেকে সব অযথা চিন্তা ঝেড়ে ফেলে মনোযোগ দিয়ে লেখা শুরু করল অহনা।
ছাত্রী হিসেবে সে খারাপ নয়। টপ না করলেও মোটামুটি ভালোই পড়াশোনা করে।

এদিকে ফারিস অফিসে পৌঁছেই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং অ্যাটেন্ড করে যাচ্ছে।
আজ বড় বড় কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে হওয়া ডিলগুলোর টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার কথা। তাই সকাল থেকেই এক মুহূর্তেরও ফুরসত নেই তার।
দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা ১টা ১৫ মিনিট ছুঁয়ে ফেলল।
পরীক্ষা শেষ হয়েছে আরও কিছুক্ষণ আগে।
কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একে একে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে এসেছে। কেউ প্রশ্ন মিলিয়ে দেখছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কেউ আবার ক্যাম্পাসের পাশের দোকানে গিয়ে টুকটাক কেনাকাটায় ব্যস্ত।
এসবের মাঝেই একপাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল নিশিতা, রিয়া আর অহনা।
তবে নিশিতার মনটা যেন কোথাও আটকে আছে।
সে অন্যমনস্ক হয়ে বারবার একই বিষয় নিয়ে ভাবছে।
সকালের সেই খবরটা মাথা থেকে কিছুতেই সরাতে পারছে না সে।
একটা মানুষ হঠাৎ করেই এভাবে নৃশংসভাবে খুন হয়ে যেতে পারে?
আর কে-ই বা এমন নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে?
প্রশ্নগুলো সকাল থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়।
বাইরে থেকে স্বাভাবিকভাবে সবার সঙ্গে কথা বললেও ভেতরে ভেতরে বিষয়টা তাকে অস্বস্তিতে ফেলেই চলেছে।
নিশিতাকে গভীর চিন্তায় ডুবে থাকতে দেখে অহনা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—

“কি হয়েছে তোর নিশু? কী নিয়ে ভাবছিস এত?”
অহনার কথায় নিশিতার ধ্যান ভাঙল।
ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে সে অহনার দিকে তাকিয়ে বলল—
“আচ্ছা তোর মনে আছে, কালকে পরীক্ষা শেষে আমার সাথে যেই ছেলেটা খারাপ আচরণ করেছিলো?”
অহনা মাথা নাড়ল।
মানে, তার মনে আছে।
নিশিতা ধীরে ধীরে বলল—
“সেই ছেলেটায় কালকে রাতে খুন হয়েছে। তাও ভয়ঙ্করভাবে। বিষয়টা ভাবার নয় কি?”
কথাটা শুনে অহনাও থমকে গেল।
হুট করে কীভাবে খুন হতে পারে ছেলেটা?
তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠল। এই মুহূর্তে কী বলবে, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারল না সে।
কিছুক্ষণ তিনজনের মাঝেই নীরবতা নেমে এলো।
পরিস্থিতিটা বদলানোর জন্য রিয়া হঠাৎ বলল—

“আচ্ছা বাদ দে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে তো। এগুলো নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আর দেখ না নিশু, আমাদের নিতেও কেউ আসলো না। এখন কিভাবে বাড়ি ফিরবো? আর আকাশ দেখে মনে হচ্ছে খুব জোরে বৃষ্টি নামবে।”
রিয়ার কথায় আগের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নিশিতা আকাশের দিকে তাকাল।
সত্যিই পুরো আকাশজুড়ে কালো মেঘ জমে চারপাশ অন্ধকার করে ফেলেছে।
যে কোনো মুহূর্তেই প্রবল বৃষ্টি নেমে যেতে পারে।
আর বাড়ি থেকেও এখনও কাউকে পাঠানো হয়নি।
আর একটু পরেই কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে।
তখন কী হবে?
এই ভাবনার মাঝেই অহনা বলল—
“তোরা বাড়ি ফিরবি কিভাবে? আকাশে তো মেঘ করেছে। যখন তখন বৃষ্টি হতে পারে। আমি বরং থাকি তোদের সা….!”
অহনাকে কথাটা শেষ করতে দিল না নিশিতা।
তাড়াতাড়ি বলে উঠল—

“না… না অহনা, তুই বাড়ি যা এখুনি। আমাদের তো গাড়ি চলে আসবে। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হলে তুই ফিরবি কিভাবে ভেবে দেখেছিস? আর আন্টিও চিন্তা করবে তোর জন্য। তুই যা, চিন্তা নাই, গাড়ি চলে আসবে।”
নিশিতার কথা শুনে অহনা থমকে গেল।
সত্যিই তো!
এতক্ষণ সে নিজের কথাটাই ভাবেনি। এমন ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে তার বাড়ি ফেরাটাই কঠিন হয়ে যাবে।
তার ওপর বাড়িতে মা-ও নিশ্চয়ই চিন্তা করবেন।
তবুও মনটা চাইছিল না এভাবে নিশিতা আর রিয়াকে রেখে চলে যেতে।
কী করবে, কী করবে না— সেই দ্বিধাতেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল অহনা।
অহনার মুখের চিন্তিত ভাবটা দেখে রিয়া মৃদু হেসে বলল—
“এত চিন্তা করিস না তো। বাড়ি যা, আমাদের গাড়ি চলে আসবে।”
অহনা আর কথা বাড়াল না। সত্যিই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আরও দেরি করে বাড়ি ফিরলে মা নিশ্চয়ই বকবে।
তাই শেষবারের মতো দু’জনের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর ধীরে ধীরে কলেজ গেট পেরিয়ে চলে গেল।

অহনা চলে যাওয়ার প্রায় পনেরো মিনিট হয়ে গেছে। তবুও গাড়ির কোনো খোঁজ নেই।
রিয়া বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো এই বুঝি গাড়িটা এসে থামবে।
কিন্তু না…
এখনও কোনো দেখা নেই।
এদিকে পুরো আকাশ যেন কালো মেঘের দখলে চলে গেছে। চারপাশে অদ্ভুত এক গুমোট পরিবেশ।
হঠাৎ করেই—
ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো।
নিশিতা আর রিয়া আগেই রাস্তার পাশের একটি দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টি শুরু হতেই নিশিতার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।
কতদিন হয়ে গেছে বৃষ্টিতে ভেজা হয় না তার!
আজ এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া করলে যেন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকবে।
এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।

ছাউনির নিচ থেকে বেরিয়ে সোজা বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল।
পরম আনন্দে দু’হাত সামান্য ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করল।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যখন তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তখন অদ্ভুত এক প্রশান্তি আর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছিল তার পুরো অস্তিত্বজুড়ে।
চারপাশের মানুষ যেখানে বৃষ্টির তীব্রতা থেকে বাঁচতে আশ্রয় খুঁজছে, সেখানে নিশিতা যেন মুক্ত পাখির মতো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিকে আপন করে নিচ্ছে।
দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখে রিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর জোরে চিৎকার করে বলল—
“এই নিশুর বাচ্চা! এদিকে আয়। এভাবে ভিজিস না, অসুস্থ হয়ে যাবি। দেখ না, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যখন তখন ডাক পড়বে। এখানে আয়।”
কিন্তু চারপাশে ঝুম বৃষ্টির শব্দ এতটাই প্রবল ছিল যে, রিয়ার পুরো কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেল না নিশিতা।
তবুও কিছুটা আন্দাজ করে হেসে বলল—

“আরে না, কিছু হবে না। দেখ না, কী সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে! এখন না ভিজলে আবার কবে হবে তার ঠিক নেই।”
রিয়া অসহায়ের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এখন আর বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই।
যা করার, নিশিতা তো ইতোমধ্যেই করে ফেলেছে।
তবুও মনে মনে ভয়টা ক্রমেই বাড়তে লাগল তার।
এত প্রবল বৃষ্টি…
তার ওপর বারবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
যদি হঠাৎ কোথাও বাজ পড়ে?
আবার বাড়ির গাড়িরও কোনো খোঁজ নেই।
এই মেয়েটাকে যতই ডাকা হোক, কোনো লাভ হবে না। সে তো নিজের আনন্দেই মগ্ন হয়ে আছে।
এরই মাঝে বৃষ্টির তীব্রতা যেন আরও বেড়ে গেল।
মনে হচ্ছে যেন আকাশ ভেঙে একসঙ্গে সব পানি মাটিতে নেমে আসছে।
একের পর এক বিদ্যুতের ঝলক পুরো আকাশ চিরে যাচ্ছে।
আর গাড়ির এখনও কোনো দেখা নেই।
রিয়া একবার রাস্তার দিকে তাকায়, আরেকবার নিশিতার দিকে।
মেয়েটা যদি এভাবে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে কী হবে?

আর ফারিস যদি জানতে পারে…
তাহলে সবার আগে তাকেই জবাবদিহি করতে হবে।
‘রিয়া কেন খেয়াল রাখেনি?’
এই প্রশ্নটাই আগে করবে সে।
তার কাছে নিজের বউয়ের কোনো দোষই নেই।
ছোট বাচ্চারা ভুল করতে পারে, কিন্তু তার বউ যেন সবসময়ই নির্দোষ।
এসবই ভাবছিল রিয়া।
ঠিক তখনই—
কড়াআআক…!!
বিকট এক বজ্রপাতের শব্দে রিয়ার চিন্তায় ছেদ পড়ল।
শব্দটা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, ভয়ে পুরো শরীর কেঁপে উঠল তার।
মনে হলো, আকাশ থেকে ছুটে আসা বজ্রটা যেন ঠিক তার কানের পাশেই মাটিতে আঘাত করেছে।
বিকট বজ্রপাতের শব্দটা কানে আসতেই রিয়ার বুক ধক করে উঠল।
পরক্ষণেই তার মনে পড়ল—
নিশিতা তো বৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিল!

ভয়ে মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অস্থির চোখে চারদিকে নিশিতাকে খুঁজতে লাগল সে। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক, কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ।
নিশিতা ঠিক আছে তো? ওর কিছু হয়নি তো?
একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল তার মাথায়।
হঠাৎই রিয়ার চোখ পড়ল ফারিস আর নিশিতার দিকে।
ফারিসকে সেখানে দেখে সে খানিকটা অবাক হয়ে গেল।
মনে মনে বলল—
“ভাইয়া এখানে কী করছে?”
এক মুহূর্ত আগেও চোখে যে ভয় ছিল, সেটার জায়গা দখল করে নিল বিস্ময়।

ফারিস তখন অফিসে একটি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিল।
ঠিক সেই সময় আফিয়া চৌধুরী ফোন করে জানিয়েছিলেন, আজ ড্রাইভার আসেনি। তাই নিশিতা আর রিয়াকে কলেজ থেকে নিয়ে আসতে হবে।
কথাটা শোনামাত্রই এক মুহূর্ত দেরি করেনি ফারিস। মিটিং মাঝপথেই শেষ করে তাড়াহুড়ো করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছিল।
তবে পথে প্রবল বৃষ্টির কারণে খানিকটা দেরি হয়ে যায় তার।
আর আজ যদি সেই দেরিটা আরও কয়েক মিনিট বেশি হতো…
তাহলে হয়তো নিশিতার ওপর ভয়ংকর বিপদ নেমে আসতে পারত।
বজ্রপাত হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই ফারিস দৌড়ে এসে নিশিতাকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিয়ে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছিল।

নিশিতার পুরো শরীর এখনও থরথর করে কাঁপছে।
বিশেষ করে তার গোলাপি ঠোঁট দুটো কাঁপুনি থামাতে পারছে না।
মেয়েটা যে ভীষণ ভয় পেয়েছে, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না।
এদিকে বৃষ্টির তীব্রতাও অনেকটা কমে এসেছে। শুধু দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি টুপটাপ করে পড়ছে।
প্রবল বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা।
চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা।
ফারিস এখনও নিশিতাকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
যেন তাকে ছেড়ে দিলেই সে আবার হারিয়ে যাবে।
আর নিশিতার ছোট্ট শরীরটা সম্পূর্ণভাবে লেপ্টে আছে ফারিসের বুকের সঙ্গে।
তাদের মাঝখানে যেন এক ইঞ্চি দূরত্বও নেই।
নিশিতা নিশ্চুপ।

কিন্তু ঠিক তখনই ফারিসের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা চিন্তা এসে আঘাত করল।
যদি একটু আগে পড়া বজ্রটা নিশিতার গায়েই পড়ত…?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
পরক্ষণেই সে এক টানে নিশিতাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল।
হঠাৎ এমন আচরণে নিশিতা হতভম্ব হয়ে গেল।
বিস্মিত চোখে ফারিসের দিকে তাকাতেই—
ঠাস…!
ঠাস…!
পরপর দুটো চড় এসে পড়ল তার গালে।
নিশিতা হতবুদ্ধির মতো হা করে তাকিয়ে রইল।
হুট করে কী হলো ফারিসের?
সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
এদিকে রাগে ফারিসের ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

রক্তিম চোখ দুটো ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে স্থির হয়ে আছে নিশিতার ওপর।
মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে যেন নিজের সমস্ত রাগ দৃষ্টির মাধ্যমেই উগরে দিচ্ছে।
নিশিতা এখনও নিশ্চুপ।
তার মাথা যেন কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে।
ছলছল করছে দুটো চোখ।
আর এক মুহূর্ত পরেই হয়তো অশ্রু গড়িয়ে পড়বে।
এত জোরে চড় খাওয়ার কারণে তার দুটো গাল জ্বলে উঠেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই লাল হয়ে গেছে পুরো মুখ।
অবশেষে দু’ফোঁটা অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
কোনো শব্দ নেই।
কোনো প্রতিবাদ নেই।
শুধু নিঃশব্দ কান্না।
আর সেই দৃশ্য দেখেই ফারিস ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল—

“চুপ। একদম কাঁদবি না। কাঁদলে আজকে তোর জান নিয়ে নিবো আমি। ইউ ইডিয়ট! পাগল হয়েছিস? বৃষ্টিতে এভাবে ভিজছিস। যদি বাজটা তোর উপর পড়তো, এই তিরিংবিরিং করতে পারতি? মরতে চাস? মরার খুব ইচ্ছে হয়েছে না তোর?”
একটু থেমে ফারিস আবার বলল—
“আয়, আজ আমি তোকে মারবো। এতই যখন মরার ইচ্ছে তোর। বেয়াদব! ভুল করবি আর শাসন করতে পারবো না আমি তোর হাসবেন্ড হয়ে?”
এবার নিশিতার ভীষণ রাগ হলো।
সে এমনিতেই কাঁদছে। তার ওপর এই লোকটা আবারও তাকে এভাবে কথা শুনাচ্ছে।
দুটো গাল যেন আগুনের মতো জ্বলছে। মনে হচ্ছে এখনই খুলে পড়বে। এতটাই ব্যথা করছে।
“মারবেই যখন, তাহলে বাঁচাতে আসলো কেন?”
মনে মনে ফুঁসতে লাগল সে।

“অসভ্য লোক একটা!”
চোখের পানি মুছে নাক টেনে নিশিতা রাগে-অভিমানে বলল—
নিশিতা: “ছেড়ে দেব আমি আপনাকে। সব সময় শুধু মারেন আপনি! আমি কি জানতাম নাকি এখানে বাজ পড়বে? এত জোরে কোথা থেকে ভূতের মতো এসে আমাকে মারা শুরু করলেন! বেয়াদব, অসভ্য, খবিশ লোক একটা!”
রাগে-অভিমানে নিশিতার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে।
আর ঠিক তখনই ফারিসের মাথায় ধাক্কার মতো করে উপলব্ধি হলো— এতক্ষণকার দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক থেকেই সে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। নিশিতাকে রক্ষা করতে গিয়েই উল্টো তাকেই আঘাত করে ফেলেছে।
ভুল যখন করেই ফেলেছে…
তখন সেই ভুলের দায়ও তো তারই।
ধীরে ধীরে নিজের রাগ সরিয়ে রেখে অনেকটা নরম গলায় বলল—
ফারিস: “তুই ছাড়বি আমাকে?”

নিশিতা ঠোঁট ফুলিয়ে কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না ফারিস।
হঠাৎই নিশিতাকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তাদের মাঝখানে এক সেন্টিমিটার দূরত্বও রাখল না।
নিশিতাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে খুব নরম স্বরে আবার বলল—
ফারিস: “তুই আমাকে ছাড়বি?”
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে যোগ করল—
ফারিস: “ওকে, ছেড়ে দিস। কিন্তু তার আগে আমার বাচ্চার মা হবি, আমার সঙ্গে সংসার করবি… তারপর ছেড়ে দিস।”
বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল নিশিতা।
সে এখনও রাগ করে আছে।
আর এই লোকটা কিনা ঠিক এই মুহূর্তে সংসার আর বাচ্চার স্বপ্ন দেখাচ্ছে!
নিশিতার বিস্মিত মুখটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফারিস আবার বলল—
ফারিস: “জোঁকের মতো একবার আঁটকে গেছি, মেডাম। এখন আবার ছেড়ে দেওয়ার কথা কীভাবে বলেন?”
কিন্তু নিশিতার মন এতটুকুও গলল না।
উল্টো আরও ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল—

“ছাড়ুন আমাকে। ছুবেন না একদম। ছাড়ুন বলছি।”
এবার সত্যিই মহা বিপদে পড়ল ফারিস।
এই তো সকালেই কত কিছু করে বউয়ের রাগ ভাঙিয়েছিল।
আর এখন…
দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এমন একটা কাজ করে ফেলেছে, যার জন্য নিজেকেই এখন অপরাধী মনে হচ্ছে।
রাগের মাথায় তার নিজের মাথাই যে কাজ করে না…
সেই কথাটা এই বোকা মেয়েটাকে কীভাবে বোঝাবে?
নিশিতা জোর করে নিজেকে ফারিসের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু দু’পা এগোতেই—
পেছন থেকে ফারিস খপ করে তার হাতটা চেপে ধরল।
মুহূর্তেই থেমে গেল নিশিতা।
দূর থেকে পুরো দৃশ্যটাই অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল রিয়া।
ঘটনাটা পুরোপুরি না বুঝলেও অনেকটাই আন্দাজ করতে পেরেছে সে।
তাই আর কাছে এগোল না।
বরং দূরেই দাঁড়িয়ে রইল।
দেখতে লাগল— শেষ পর্যন্ত কী হয়।

ফারিস নিশিতার হাত ধরে আলতো টানে নিজের সামনে নিয়ে এলো।
নিশিতার মুখজুড়ে স্পষ্ট অভিমানের ছাপ।
আজ সে স্বপ্নেও ভাবেনি, ফারিস তাকে এভাবে মারবে।
সর্বোচ্চ বকাঝকা করবে— এটাই ভেবেছিল।
কিন্তু চড়…
সেটা একদমই কল্পনায় ছিল না।
নিশিতার দিকে তাকাতেই ফারিসের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
দুটো গাল এখনও টকটকে লাল।
সামান্য ফুলেও গেছে।
হিজাবটাও এলোমেলো হয়ে রয়েছে।
ফারিসের চোখে এবার স্পষ্ট অনুতাপ।
তার কষ্টগুলো কখনও মুখে প্রকাশ পায় না।
হৃদয় ভাঙলেও সে নীরব থাকে।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
একরাশ অনুতাপ নিয়ে সে নিশিতার চোখে চোখ রাখল।
এই মুহূর্তে তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে কিংবা আশেপাশে কে কে তাদের দেখছে— সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফারিস ধীর, শীতল কণ্ঠে বলল—

“কি চাস তুই?”
কথাটা কানে আসতেই নিশিতার বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
এতটা ঠান্ডা, শান্ত কণ্ঠেও অদ্ভুত এক ভয় কাজ করল তার ভেতরে।
তবুও নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল না সে।
নিজেকে শক্ত দেখিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল—
“কি চাইবো?”
ফারিস ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল—
—”মেরে ফেলতে চাস আমাকে, তাই না? আই নো দ্যাট। আমি রাগ দেখিয়েছি বলে এভাবে চলে যাবি আমাকে রেখে? মারবো আমি, আর তা আদর করে পুষিয়েও দিবো আমি। সেই অধিকারটুকু কি আমার নেই?”
একটু থেমে আবার বলল—
“ডু ইউ নো? একটা টাইমে আমি নিজেকে এক্সপ্লেইনও করতাম না। কিন্তু আজ তোর সামনে করলাম। কতটা বদলে দিয়েছিস তুই আমাকে! ভাবলে নিজেই নিজেকে চিনি না।”
নিশিতা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল।
মনে মনে আবারও ভাবতে লাগল—
“আমি কি বেশি বলে ফেললাম? মানুষটাকে কি খুব কষ্ট দিয়ে ফেললাম?”
সত্যিই তো…

তার ভালোর জন্যই তো ফারিস তাকে মেরেছে।
আজ যদি সত্যিই তার কিছু একটা হয়ে যেত, তাহলে কি সে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত?
ফারিস ঠিক সময়ে এসে তাকে বাঁচিয়েছে বলেই না সে এখনও জীবিত।
নিশিতা ধীরে ধীরে চোখ তুলে ফারিসের দিকে তাকাতেই ফারিস তার হাতটা ছেড়ে দিল।
একবার চারপাশে তাকাল।
তারপর আবার দৃষ্টি স্থির করল নিশিতার ওপর।
পরের মুহূর্তেই—
নিশিতাসহ আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজের দুই কান ধরে ফেলল সে।
নিশিতা হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল।
লোকটা কী করছে?
কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ফারিস সবার সামনে কান ধরে উঠবস শুরু করল।
নিশিতা যেন নিজের বাকশক্তিই হারিয়ে ফেলল।
সে শুধু বিস্মিত চোখে অপলক তাকিয়ে রইল ফারিসের দিকে।
ফারিসের অবশ্য সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
সে নিজের কাজ করেই যাচ্ছে।

আর এদিকে রিয়া হা করে তাকিয়ে আছে।
যে ছেলেটার অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না…
যে সবসময় গম্ভীর, রাগী আর বদমেজাজি…
সেই মানুষটাই আজ নিজের বউয়ের রাগ ভাঙানোর জন্য রাস্তার মাঝে সবার সামনে কান ধরে উঠবস করছে!
দৃশ্যটা বিশ্বাসই করতে পারছিল না রিয়া।
“কীভাবে একজন মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে?”
“এটা কি সত্যিই সেই ফারিস, যাকে আমরা চিনি… নাকি সম্পূর্ণ অন্য কেউ?”
তার বিস্ময় যেন কিছুতেই কাটছে না।
এদিকে নিশিতার অবস্থাও প্রায় একই।
মুখটা হা হয়ে গেছে।
সে কী বলবে, কী করবে— কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
স্বপ্নেও ভাবেনি, ফারিস তার রাগ ভাঙানোর জন্য এতটা করবে।
রাস্তার মাঝখানে, সবার সামনে…
এভাবে কান ধরে উঠবস করবে!

আশপাশের পথচারীরাও বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছে।
কয়েকজন তো মোবাইল বের করে ভিডিও করাও শুরু করে দিয়েছে।
সেটা চোখে পড়তেই নিশিতা তাড়াহুড়ো করে ফারিসের কাছে গিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল—
“দয়া করে উঠুন ফারিস ভাই। আমার আর কোনো রাগ নেই। এমনটা করবেন না প্লিজ। সবাই দেখছে।”
কিন্তু ফারিস যেন কিছুই শুনল না।
সে নিজের মতো করেই উঠবস করতে থাকল।
চারপাশের এত মানুষের দৃষ্টি নিশিতাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলছিল।
কিন্তু ফারিসের যেন সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।
সে পুরোপুরি নিজের কাজেই মগ্ন।

শেষ পর্যন্ত কী বলবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না নিশিতা।
অবশেষে টানা ত্রিশবার কান ধরে উঠবস করার পর থামল ফারিস।
নিশিতা এখনও বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ফারিস ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিশিতার সামনে দাঁড়াল।
তারপর দু’হাত দিয়ে আলতো করে নিশিতার দুই গাল চেপে ধরে নরম কণ্ঠে বলল—
“এবারের মতো মাফ করে দে, জান। এমন ভুল আর কখনো হবে না। তুই তো জানিস, রেগে গেলে আমার কিছু মাথায় থাকে না। যা খুশি তাই করে ফেলি। সরি, আমার জান বাচ্চা।”
নিশিতার কী হলো, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
সেই ছোট্ট সম্মতিটুকুই যেন ফারিসের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে দিল।
সে বুঝে গেল—
তার এতক্ষণকার সব চেষ্টা বৃথা যায়নি।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সবার সামনেই নিশিতাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।

বাংলাদেশের মতো একটা সমাজে, যেখানে অনেক স্বামী-স্ত্রী প্রকাশ্যে হাত ধরতেও সংকোচ বোধ করেন, সেখানে ফারিস কোনো দ্বিধা না করেই আলতো করে নিশিতার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
নিশিতা নির্বাক।
তার গলায় যেন সব কথা আটকে গেছে।
ফারিসের এমন কাণ্ড সে আজ কল্পনাও করেনি।
কিন্তু এই সমস্ত দৃশ্যের মাঝেও একজন মানুষের হৃদয় যে নিঃশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল…
সেদিকে কারও চোখ পড়ল না।
হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতির ঝড় আর সামলাতে না পেরেই রিভান শেষবারের মতো নিশিতাকে এক নজর দেখার উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিল।
লন্ডনে ফিরে গেলে কবে আবার দেশে আসতে পারবে, তা তার নিজেরও জানা নেই।
তাই ফ্লাইটে ওঠার আগে একবার…
শুধু একবার…
নিজের হৃদয়ে তাণ্ডব তোলা সেই মায়াবিনীকে দূর থেকে দেখেই চলে যেতে চেয়েছিল।
সেই একটুখানি লোভই তাকে এখানে টেনে এনেছিল।
কিন্তু কে জানত…

এই শেষ দেখাটাই তার হৃদয়ের ক্ষতকে আরও গভীর করে দেবে।
এতটা ব্যথা যে বুকের ভেতর অনুভব করা যায়, তা তার জানা ছিল না।
নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে অন্য একজন পুরুষের ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকতে দেখা—
এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কী হতে পারে?
গাড়ির ভেতর বসে রিভানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
না…
এই দৃশ্য সে আর সহ্য করতে পারছে না।
একদমই না।
ভাঙা কণ্ঠে নিজের সঙ্গেই বিড়বিড় করে বলল—
“শুনেছিলাম আল্লাহ তায়ালা নাকি মানুষকে ততটাই কষ্ট দেন, যতটা সে সহ্য করতে পারে। তাহলে আমার বেলায় আল্লাহ তায়ালা এত নিষ্ঠুর কেন, মায়াবিনী?”

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার গলাটা ভেঙে এলো।
কেউ একজন বলেছিল—
পুরুষ নাকি কখনো কাঁদে না।
কিন্তু রিভান বিশ্বাস করে—
পুরুষও কাঁদে।
যখন সে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে…
যখন তার যত্ন করে গড়া স্বপ্নগুলো চোখের সামনেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়…
তখন সেও ছোট্ট শিশুর মতো ভেঙে পড়ে।
আজ ঠিক তেমনটাই হলো রিভানের সঙ্গে।
ধীরে ধীরে গাড়ির কাচ তুলে সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর ড্রাইভারকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল।
কারণ, আর এক মুহূর্তও এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা মানেই—
নিজের সমস্ত স্বপ্নের সমাধি নিজ চোখে দেখা।
ফারিস নিশিতা আর রিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে কিছুক্ষণ আগেই। পুরো রাস্তা গাড়ির ভেতর কেউ কোনো কথা বলেনি। নীরবতাতেই কেটে গেছে পথটা।
এতটুকু একটা বিষয় নিয়ে ফারিস সবার সামনে কান ধরে উঠবস করবে— এমনটা রিয়া কিংবা নিশিতা, কেউই কল্পনা করতে পারেনি।

বিশেষ করে রিয়া এখনও বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না। সবার সামনে যে মানুষটা সবসময় গম্ভীর, রাগী আর বদমেজাজি, নিশিতার সামনে সেই মানুষটাই যেন সম্পূর্ণ উল্টো। মনে হয়, দুটো ভিন্ন মানুষকে একসঙ্গে দেখছে সে। কিছুতেই দুটোর মিল খুঁজে পাচ্ছে না।
পুরো রাস্তা এই কথাগুলোই ঘুরপাক খেয়েছে তার মাথায়।
বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে কারও তেমন দেখা হলো না। যে যার রুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
রিয়া রুমে ঢুকেই সোজা শাওয়ার নিতে চলে গেল।
আর নিশিতা তো বৃষ্টিতে একেবারে কাকভেজা হয়ে ফিরেছে। রুমে ঢুকেই ফারিস কোনো কথা না বলে তাকে সরাসরি ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এরপর নিজেও জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে নিল।
জামাকাপড় বদলানোর পর ফারিস যেন হঠাৎ কিছু একটা ভাবল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা নিচে নেমে গেল।
পুরো বাড়িটা অদ্ভুত রকম ফাঁকা লাগছে। চারপাশে নীরবতা ছাড়া আর কিছুই নেই। মনে হচ্ছে সবাই নিজেদের রুমেই রয়েছে।
ফারিস কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর কিচেন থেকে বের হলো সে।
হাতে একটা ট্রে।
ট্রের ওপর ধোঁয়া ওঠা এক বাটি স্যুপ।
হয়তো নিশিতার জন্যই বানিয়েছে।
ট্রে হাতে রুমে ফিরে এসে দেখল, নিশিতা এখনও ওয়াশরুম থেকেই বের হয়নি।
সে টেবিলের ওপর স্যুপটা রেখে দিতেই পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল।
ফারিসের দৃষ্টি সেদিকে গেল।
স্ক্রিনে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে—
‘নিহান’।
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নিহানের কণ্ঠ—
—”হ্যালো স্যার, আপনি কোথায়? একটু পর আপনার আরও ইমপরট্যান্ট তিনটা মিটিং রয়েছে। আপনি কি অ্যাটেন্ড করবেন না?”
ফারিস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
—”আজকের মতো যত মিটিং আর কাজ আছে, সব ক্যান্সেল করে দাও। পরের কোনো ডেটে রাখো। বউ রাগ করেছে। আপাতত বউয়ের রাগ ভাঙানোটা জরুরি, মিটিং নয়।”
ফারিসের কথা শুনে ওপাশ থেকে নিহান হেসে উঠল।
হাসির শব্দটা কানে যেতেই বিরক্ত হয়ে গেল ফারিস।
সে এখানে নিজের দুঃখের কথা বলছে, আর লোকটা কিনা হাসছে!
গম্ভীর গলায় বলল—

—”খুব হাসছো না? কপালে আমার মতো কথায় কথায় রেগে যাওয়া বউ জুটুক— এই দোয়া করি। তারপর তোমার হাসি বের হবে। ইসটুপিড।”
কথাটা বলেই আর কিছু না শুনে কল কেটে দিল।
এদিকে ফোনের ওপাশে নিহান হতভম্ব।
সে তো শুধু একটু হেসেছিল!
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
“সত্যিই যদি কপালে এমন বউ জোটে, তাহলে তো জীবনটাই শেষ!”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা নামিয়ে রাখল সে।
আজকের পুরো দিনের মুডটাই নষ্ট করে দিল ফারিস।
এখন সারাদিন মাথায় এই কথাটাই ঘুরবে।

অন্যদিকে রিভান এখন বিমানে বসে আছে।
কিন্তু সে কোথায় আছে, কী করছে— কোনো কিছুতেই যেন তার মন নেই।
তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান জুড়েই এখন শুধু একজন মানুষ…
নিশিতা।
নিজের ভেতরেই নেই সে।
বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফারিস আর নিশিতার সেই আলিঙ্গনের মুহূর্তটা।
প্রতিবার দৃশ্যটা মনে পড়তেই রাগে তার হাতের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠছে।
কিন্তু রাগের চেয়েও বেশি জ্বলছে তার হৃদয়।
এই বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ কীভাবে থামাবে সে?
জীবনে এই প্রথম নিজের অনুভূতিগুলোর কাছে এতটা অসহায় লাগছে নিজেকে।
যে মানুষটা গত এতগুলো বছরেও কোনো মেয়ের দিকে দ্বিতীয়বার তাকায়নি…
সেই মানুষটাই কীভাবে যেন অদ্ভুতভাবে একটা ছোট্ট মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল।
নিশিতা যেন তার মস্তিষ্ক, মন— সবকিছুর ভেতর নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছে।
রিভান চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল।

না…
এভাবে ভাবতে থাকলে সে আরও ভেঙে পড়বে।
যত এসব নিয়ে ভাবছে, ততই একের পর এক স্মৃতি মাথায় ভিড় করছে।
আর সেই স্মৃতিগুলো তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে।
অবশেষে মাথাটা সিটের সঙ্গে এলিয়ে দিল সে।
এই মুহূর্তে তার পক্ষে আর কিছু ভাবা সম্ভব নয়।
চারপাশটা যেন অন্ধকার লাগছে।
সে ভাবতে চায় না।
একদমই চায় না।
কিন্তু মস্তিষ্ককে থামানো গেলেও মনকে কি কখনও থামানো যায়?
মন বড় অদ্ভুত।
সে আমাদের অনুমতি নেয় না।
কখন, কীভাবে, কার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে— সেটা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।
আর একসময় এমন একটা সময় আসে…
যখন সেই মানুষটাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথাটাও কল্পনায় আনতে ইচ্ছে করে না।

তিনতলা বিশিষ্ট জামান বাড়িটা আজ অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। অনেক দিন পর বাড়িতে ফিরেছেন সবাই, অথচ সেই বাড়িতে নেই কোনো প্রাণচাঞ্চল্য, নেই হাসি-আনন্দের শব্দ। চারপাশে শুধু ভারী নীরবতা।
মেয়ের এই অবস্থা দেখে উর্মি জামানের মনে হচ্ছে যেন মাথার ওপর বাজ ভেঙে পড়েছে।
যে মেয়েটা একসময় সারাক্ষণ হাসি-খুশিতে মাতিয়ে রাখত পুরো বাড়ি, আজ সে যেন জীবন্ত কাঠের পুতুলে পরিণত হয়েছে।
ফারিসের দেওয়া আঘাত, কষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণায় নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছে আরিশা।
ইচ্ছে হলে খায়, না হলে সারাদিন না খেয়েই থাকে।
কত দিন হয়ে গেছে আয়নার সামনে দাঁড়ায় না। চুলগুলো জট বেঁধে গেছে, তবুও সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
হঠাৎ হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই কেঁদে ওঠে। যেন বাস্তব পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, নিজের তৈরি এক অচেনা জগতে হারিয়ে গেছে সে।

ডাক্তাররাও জানিয়ে দিয়েছেন, তার মানসিক অবস্থা আর স্বাভাবিক নেই।
এভাবে চলতে থাকলে হয়তো তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না।
এই কয়েক মাসে আরিশ জামান ও কম চেষ্টা করেনি।
আরিশাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে, সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে শেখাতে, অতীত থেকে বের করে আনতে— নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করেছে।
কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
আরিশা তার সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, একবার চোখ তুলে তাকিয়েও দেখেনি।
হয়তো এ কারণেই বলে—
প্রাণের চেয়েও বেশি কাউকে ভালোবাসতে নেই।
কারণ সেই মানুষটাই একসময় তোমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
আরিশার জীবনেও ঠিক সেটাই হয়েছে।

মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিল বলেই আজ তার সমস্ত কষ্টের কেন্দ্রবিন্দু সেই একজন মানুষ।
উর্মি জামান মেয়ের অবস্থা দেখার পর থেকে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছেন না।
বিশেষ করে আরিশ জামানের ওপর তার ভীষণ রাগ।
এত বড় একটা বিষয় তিনি তাকে জানালেন না!
একজন মা হয়ে কি তার জানার অধিকার ছিল না?
এতবার ফোন করার পরও যখন আরিশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি, তখনই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন— নিশ্চয়ই বড় কিছু হয়েছে।
কিন্তু আরিশ জামান সবসময়ই বিষয়টা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
হয়তো ভেবেছিলেন, উর্মি জামান নিজের কাজে মন দিতে পারবেন, সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পারবেন, অযথা ভেঙে পড়বেন না।
কিন্তু…

মায়ের মন কি আর কোনো যুক্তি মানে?
রাগে-অভিমানে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছেন তিনি।
এদিকে আরিশ জামান পড়েছেন মা আর মেয়ের মাঝখানে।
দুজনকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন।
কেউই তার কথা শুনতে রাজি নয়।
জীবনের এই বয়সে এসে এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি।
তার মেয়েটা নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিজের হাতেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
কারও কথা শুনছে না।
কারও বারণ মানছে না।
একজন মানসিক রোগীর মতো আচরণ করছে।
একজন বাবা হিসেবে এসব সহ্য করা তার জন্য ভীষণ কষ্টের।
পিতা বলে হয়তো চোখের পানি লুকিয়ে রাখতে পারেন।
কিন্তু নিজের সন্তানকে চোখের সামনে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখার যন্ত্রণার চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে খুব কমই আছে।

রাত সাড়ে সাতটার দিকে দিনের শেষ আলোটুকুও মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে নেমে এসেছে রাতের কালো আধার।
ফারিস তখন স্যুপ খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে নিশিতাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল।
এমন বৃষ্টিতে ভিজলে যে জ্বর আসবেই, সেটা সে আগেই বুঝেছিল।
তাই আজকের সব জরুরি মিটিং বাতিল করে বাড়িতেই থেকে গেছে।
ল্যাপটপ খুলে অফিসের কাজ করছে, আর মাঝেমধ্যেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিশিতার দিকে তাকিয়ে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।
অন্যদিকে নিশিতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
শাওয়ার নেওয়ার পর থেকেই শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছিল তার।
মনে হচ্ছে ঘুমটাই যেন এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় বিশ্রাম।
এভাবেই সময় কেটে গেল।
রাত প্রায় দশটা।

এরই মধ্যে বাড়ির সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিজ নিজ রুমে চলে গেছে।
আফিয়া চৌধুরী ফারিসের রুমে খাবার দিয়ে গেছেন।
তিনি ভালো করেই জানেন, বউকে রেখে তার ছেলে কখনো একা নিচে গিয়ে খাবে না।
তাই খাবার ঢেকে টেবিলের ওপর রেখে গেছেন।
একবার টেবিলের দিকে তাকিয়ে ফারিস দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাল।
রাত দশটা পেরিয়ে গেছে।
সে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
হঠাৎই মনে পড়ল—
এত রাত হয়ে গেল, অথচ নিশিতা এখনও কিছুই খায়নি।
আর এখনও তার ঘুমও ভাঙেনি।
ফারিস ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
নিঃশব্দে গিয়ে বসল ঘুমন্ত নিশিতার পাশে।
কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
কী শান্ত, কী নিষ্পাপ লাগছে তাকে।
এত মায়াভরা মুখ নিয়ে কেউ ঘুমালে সেই ঘুম ভাঙাতে কারই বা মন চাইবে?
মনে মনে কথাটা ভেবেই মৃদু হাসল ফারিস।

কিন্তু না খাইয়ে তো আর রাখা যায় না।
এই ভেবেই সে আলতো করে নিশিতার গালে হাত রাখল।
পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক রকম গরম।
এতটাই গরম যে বেশিক্ষণ হাত রেখেই থাকতে পারল না।
মুহূর্তেই ফারিসের মুখের রঙ বদলে গেল।
হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল নিশিতার দিকে।
এত জ্বর নিয়ে কেউ এভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে পারে?
তার ছোট্ট লিটিল হার্টবিট-এর গা যেন আগুনের মতো জ্বলছে।
এক অজানা আতঙ্ক ধীরে ধীরে চেপে বসল তার বুকের ভেতর।
ফারিসের মনে হলো, হয়তো জ্বরের ঘোরেই নিশিতা অচেতন হয়ে পড়েছে।
নইলে এতটা জ্বর নিয়ে কেউ এভাবে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না।
ফারিসের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে তাড়াহুড়ো করে বেড থেকে নেমে নিশিতার জন্য ওষুধ খুঁজতে লাগল।
তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।

কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর প্রয়োজনীয় ওষুধ হাতে নিয়ে দ্রুত আবার নিশিতার কাছে ফিরে এলো।
এই মুহূর্তে তাকে কিছু খাওয়ানো সম্ভব নয়।
কিন্তু ওষুধটা খাওয়াতেই হবে।
ফারিস খুব যত্ন করে নিশিতাকে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে বুকে আগলে নিল।
পাশ থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে ওষুধটা আলতো করে নিশিতার মুখে দিল। তারপর অল্প অল্প করে পানি ঢালল।
কয়েক সেকেন্ড পর জ্বরের ঘোরেই নিশিতা ধীরে ধীরে ওষুধটা গিলে ফেলল।
পানির গ্লাসটা পাশে রেখে আবারও তাকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল ফারিস।
তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে খুব নরম গলায় বলল—
“কি হলো তোর, জান? এতটা জ্বর কিভাবে এলো?”
একটু থেমে আবার বলল—

“আমাকে একবার বলতেও তো পারতি। এভাবে একা একা কষ্ট সহ্য করলি কেন? আমাকে বুঝতেও দিলি না তোর কী হয়েছে। এখনও কি আমার ওপর রাগ করে আছিস, জান?”
ফারিস জানে, এই মুহূর্তে নিশিতা কোনো উত্তর দেবে না।
তবুও কথাগুলো বুকের ভেতর আটকে রাখতে পারল না।
জ্বর না আসে, সে জন্য আগেই ওষুধ খাইয়েছিল।
তারপরও এতটা জ্বর হবে— সেটা কল্পনাতেও ভাবেনি।

সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও রাতের কালো আঁধারে মিলিয়ে গেল।
নিস্তব্ধ হয়ে এলো পুরো ঢাকা শহর।
রাস্তায় যানবাহনের চলাচলও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
কেউ দিনের ক্লান্তি শেষে বাড়ি ফিরছে, কেউ ইতোমধ্যেই গভীর ঘুমে ডুবে গেছে।
রাতের নীরবতার একটা আলাদা ভার থাকে।

যেন চারপাশের সব শব্দ গিলে নিয়ে শুধু নিস্তব্ধতাকেই বাঁচিয়ে রাখে।
এই পুরো সময়টাতেই ফারিস একইভাবে নিশিতাকে আগলে বসে আছে।
আর নিশিতা ছোট্ট বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তার বুকের ভেতর।
অচেতন অবস্থাতেও দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে নিজের শখের মানুষটাকে।
শরীরের তাপমাত্রা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
গা এখনও জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
ফারিস মাঝেমধ্যেই আলতো করে তার কপাল আর গালে হাত রেখে দেখছে জ্বর কমছে কি না।
ইচ্ছে করলে এতক্ষণে জ্বরের পট্টির ব্যবস্থা করতে পারত।
কিন্তু নিশিতাকে বুক থেকে নামিয়ে রেখে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যেতে মন সায় দিচ্ছে না তার।

এর মাঝেই ধীরে ধীরে নিশিতা চোখ দুটো মেলে তাকাল।
মাথাটা ভীষণ ভারী লাগছে।
মনে হচ্ছে যেন মাথার ভেতর কেউ হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে।
অনেকক্ষণ অচেতন থাকার কারণে ঘরের লাইটের আলো সরাসরি চোখে লাগতেই চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল।
সবকিছু ঠিকভাবে বোঝার আগেই সে বুঝতে পারল—
সে ফারিসের প্রশস্ত বুকের ভেতর আশ্রয় নিয়ে আছে।
মুহূর্তেই অবাক হয়ে গেল নিশিতা।
সে এখানে কীভাবে এলো?
ফারিসই বা তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরে আছে কেন?
অন্যদিকে নিশিতার জ্ঞান ফিরতেই যেন প্রাণ ফিরে পেল ফারিস।
তাকে আগের মতোই বুকে আগলে রেখেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল—
“তুই ঠিক আছিস তো, জান? এখন কেমন লাগছে? আগের থেকে কি বেটার ফিল করছিস?”
মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে নিশিতার।
কথা বলার মতো শক্তিও নেই।

সে শুধু আস্তে করে মাথা নাড়ল।
ইশারায় বোঝাল— এখন কিছুটা ভালো লাগছে।
কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফারিসের একবারও মনে হলো না যে সে সত্যিই ভালো আছে।
তবুও আর কিছু বলল না।
ধীরে ধীরে নিশিতাকে নিজের উরুর ওপর থেকে নামিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল।
তারপর একটা বালিশ এনে বিছানার সঙ্গে হেলান দিয়ে আরাম করে বসিয়ে দিল তাকে।
নিশিতা চুপচাপ চোখ বন্ধ করে রইল।
ফারিস উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে ঢেকে রাখা খাবারটা হাতে তুলে নিল।
তারপর আবার এসে নিশিতার পাশে বসল।
খাবার দেখেই মুখটা কুঁচকে গেল নিশিতার।
সেটা দেখে ফারিস হালকা হেসে বলল—

“এখন এমন করে লাভ নেই, মেডাম। আমি যখন বৃষ্টিতে না ভিজতে বলেছিলাম, তখন শুনোনি কেন?”
ফারিসের কথা শুনে নিশিতা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
“প্লিজ না, ফারিস ভাই… আমি খেতে চাই না। বমি হয়ে যাবে আমার। এমনটা করবেন না, প্লিজ।”
জ্বর হলে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় খাবারেরও স্বাদ থাকে না।
গন্ধটুকুও সহ্য হয় না।
ফারিস সেটা খুব ভালো করেই জানে।
তারপরও সে নিশিতার কথা শুনল না।
খাবার না খাইয়ে ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।
আর ওষুধ না খেলে জ্বরও কমবে না।
তাই নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল সে।
নিশিতার শত অনুরোধ, মিনতি— কোনোটাই তার মন গলাতে পারল না।
ছোট ছোট লোকমা করে ধীরে ধীরে নিশিতার মুখে খাবার তুলে দিতে লাগল।
নিশিতা চোখে পানি নিয়ে কষ্ট করে একেকটা লোকমা গিলে ফেলছে।
সে বুঝে গেছে—

আজ আর রেহাই নেই।
এই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো—
সামান্য এক টুকরো খাবারও গলা দিয়ে নামানো।
খুব কষ্ট করেই খাবারটুকু গিলল নিশিতা।
নিশিতার এমন অবস্থা দেখে ফারিসও আর জোর করল না। যতটুকু খেয়েছে, আপাতত তাতেই হবে। পাশে রাখা মাথাব্যথার ওষুধটা হাতে নিয়ে আলতো করে নিশিতার মুখে তুলে দিল।
ওষুধটা খেয়ে নিশিতা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। এমন হাড়কাঁপানো জ্বর হয়তো এর আগে কখনোই আসেনি তার। তাই শরীরের কষ্টটাও যেন আজ কয়েক গুণ বেশি অনুভব হচ্ছে।
ফারিস ওষুধ খাইয়ে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাল। রাত ঠিক ১২টা ৩০ মিনিট। এতটা রাত হয়ে গেছে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
সে তাড়াহুড়ো করে উঠে ঘরের মূল লাইটটা বন্ধ করে দিল। শুধু কোণের হলুদ বাল্বটা মৃদু আলো ছড়িয়ে পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত শান্ত অথচ বিষণ্ণ পরিবেশে মুড়ে রেখেছে।
ফারিস আবার এসে নিশিতার পাশে বসল। খুব যত্ন করে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। নিশিতা চোখ বন্ধ করেই রইল। হয়তো শরীরের ক্লান্তিতে, হয়তো কষ্টে—একটুও চোখ মেলতে ইচ্ছে করছে না তার।
ঘরের ভেতর নেমে এলো গভীর নীরবতা।

হঠাৎ…
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই নিশিতা বমি করে ফেলল।
মুহূর্তের মধ্যেই বিছানা, চাদর আর ঘরের একাংশ নোংরা হয়ে যেতে লাগল। দৃশ্যটা দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল ফারিস।
একটু আগেও তো সব ঠিক ছিল!
তাহলে হঠাৎ এমন কেন হলো?
নিশিতা তো অতিরিক্ত কিছু খায়ওনি!
আর কিছু না ভেবে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে যেতেই বমিরত অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে নিশিতা বলল—
—”কাছে আসবেন না, ফারিস ভাই… আপনিও নোংরা হয়ে যাবেন।”
কথাটা শুনে ফারিসের রাগ যেন মুহূর্তেই সপ্তম আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে একপ্রকার ধমক দিয়েই বলল—

—”চুপ কর, বেয়াদব! তোর হাসবেন্ড আমি। তোর কাছে এসে আবার কিসের নোংরা হবো আমি? দরকার পড়লে আমার পুরো শরীরেই বমি করবি, তবুও আমাকে এভাবে আটকাতে আসবি না।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে নিশিতার কাছে চলে এলো।
নিশিতা তখনও অনবরত বমি করছে।
ফারিস এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের দু’হাতই তার সামনে বাড়িয়ে দিল, যেন একফোঁটা বমিও নিশিতার গায়ে না লাগে। এক হাত দিয়ে খুব সাবধানে তাকে উঠিয়ে ধরল, আর অন্য হাতটা তার মুখের সামনে ধরে রাখল।
তার সমস্ত চিন্তা একটাই—যেভাবেই হোক, নিশিতাকে আর কষ্ট পেতে দেওয়া যাবে না।
দ্রুত তাকে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
এতক্ষণে ফারিসের নিজের জামাকাপড়, হাত—সব নোংরা হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ জুড়ে শুধু একটাই মানুষ—নিশিতা।
ওয়াশবেসিনের সামনে দাঁড় করিয়ে এক হাত দিয়ে শক্ত করে তাকে আগলে রাখল।
নিশিতা যা খেয়েছিল, সবকিছু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উগরে বের করে দিল।
ফারিসের মুখজুড়ে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
এত রাতে হঠাৎ করে নিশিতা এতটা অসুস্থ হয়ে পড়বে—এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
কিছুক্ষণ পর বমিটা থামল।
শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হতেই ফারিস আর কোনো কথা না বলে খুব ধীরে ধীরে নিশিতাকে আবার রুমে নিয়ে এলো।

এবার শরীরটা আগের চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল লাগছে তার। কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই।
ফারিস তাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে কিছু না বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নিশিতা সেটা দেখেও চুপ করে রইল।
হয়তো মনে মনে ভাবল, বিরক্ত হয়েই রুম থেকে বেরিয়ে গেছে ফারিস।
এমনিতেই শরীর এতটাই অবসন্ন লাগছে যে তাকে ডাকার বা কিছু জিজ্ঞেস করার শক্তিটুকুও নেই তার।
সময় গড়িয়ে রাত প্রায় একটা।
কিছুক্ষণ পর আবার রুমে ফিরে এলো ফারিস।
নিশিতার দিকে তাকিয়েই তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
চোখের নিচে মুহূর্তেই কালচে দাগ পড়ে গেছে। মুখটা ভীষণ ফ্যাকাশে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন মেয়েটা আরও শুকিয়ে গেছে।
দৃশ্যটা দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল ফারিসের।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নিশিতার কাছে।

যেদিকটা নোংরা হয়ে গেছে, তার পাশের শুকনো জায়গায় হেলান দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে নিশিতা। এই মুহূর্তে যেন পৃথিবীর সব রঙ তার চোখে ফিকে হয়ে গেছে।
ফারিস কোনো কথা না বলে হাতে আনা লবণ-পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
খুব ধীরে ধীরে, কোনো রকম তাড়াহুড়ো না করে নিজের হাতে তাকে লবণ-পানি খাইয়ে দিল।
লবণ-পানি খাওয়ার পর নিশিতার মনে হলো, এবার যেন একটু হলেও শরীরে শক্তি ফিরে এসেছে। আগের চেয়ে কিছুটা স্বস্তিও অনুভব করল সে।
ফারিস গ্লাসটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল।
তারপর একদৃষ্টিতে নিশিতার দিকে তাকিয়ে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
—”আসছি আমি। তার আগে কোথাও নড়বি তো পা ভেঙে রেখে দিবো।”
নিশিতা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ বসে রইল। শরীরের দুর্বলতার সঙ্গে যেন অভিমানটাও এখনও জড়িয়ে আছে তার।
কিছুক্ষণ পর ফারিস পুরো ঘরটা পরিষ্কার করে একেবারে শাওয়ার নিয়ে বের হলো।
ভেজা চুল থেকে এখনও টপটপ করে পানি পড়ছে। পরিষ্কার কাপড় পরে আগের তুলনায় অনেকটাই ফ্রেশ লাগছে তাকে।

নিশিতা পিটপিট করে চোখ মেলে সবকিছুই দেখছিল। তবে কিছু বলার ইচ্ছে তার একদমই হচ্ছে না। শরীরের ক্লান্তি আর জ্বরের ঘোরে সে শুধু নীরবে ফারিসের প্রতিটা কাজ দেখেই যাচ্ছিল।
ফারিস ধীরে ধীরে এসে নিশিতার পাশে বসল।
একটুও দেরি না করে আলতো করে হাত রাখল তার কপালে।
কয়েক সেকেন্ড এভাবেই কপালের তাপমাত্রা অনুভব করল সে।
তারপর যেন বুকভরা স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
আগের মতো অতটা জ্বর নেই। শরীর এখনও গরম, তবে অনেকটাই কমে এসেছে।
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে অদৃশ্য পাথরটা চেপে বসেছিল, সেটা যেন অবশেষে নেমে গেছে।
নিজের ধড়ে প্রাণটা যেন আবার ফিরে পেল ফারিস।
নিশিতার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল—

—”এটা তুই কী করলি জান? ভেবেছিলাম আজ তোকে প্র্যাক্টিক্যালি শেখাবো—কার বউ লাগে আর কার লাগে না। আর তুই তার আগেই এমন করে জ্বর বাঁধিয়ে ফেললি?”
কথাটা শুনেই নিশিতার প্রচণ্ড রাগ হলো।
সে এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, আর এই লোকটা কিনা এমন সময়ও মজা করছে!
রাগে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ফারিসের বুকে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল।
তবে তাতে ফারিসের কিছুই হলো না।
উল্টো সে আরও মজা পেয়ে গেল।
নিশিতা রাগে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—

—”বাজে লোক! আমি অসুস্থ, আর আমার সঙ্গে এসব মজা করছেন! যান তো… আপনার সঙ্গে আমি কথা বলব না। একদমই না। বাজে লোক একটা!”
ফারিস শুধু বাঁকা হেসে তাকিয়ে রইল।
তার পবিত্র ফুলটা রেগে গেছে।
আচ্ছা, মানুষ রেগে গেলেও এতটা সুন্দর লাগতে পারে?
প্রশ্নটা নিজের মনেই করল সে।
এদিকে ফারিসকে একদৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিশিতা বিরক্ত হয়ে বলল—
—”কী দেখছেন? আগে কখনো দেখেননি?”
ফারিস শান্ত, স্থির কণ্ঠে উত্তর দিল—

—”আমার ব্যক্তিগত ফুলকে দেখছি। সবাই নিজের প্রেয়সীকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করে। কিন্তু আমি কখনোই তা করব না। কারণ চাঁদ তার আলো সবাইকে দেয়। আর একটা ফুলের বাগানের মালিক কিন্তু একজনই হয়। তুই আমার ফুল, জান। শুধু আমারই।”
কথাগুলো শুনে নিশিতা একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
এই মানুষটাকে বোঝা সত্যিই বড় কঠিন।
এই রাগ দেখায়…
এই তাকে জ্বালায়…
আবার এই মানুষটাই তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
ফারিসকে বোঝা যেন সত্যিই অসম্ভব।
নিশিতা এত জটিল হিসাব বোঝে না।
সে শুধু এটুকুই বোঝে—এই মানুষটা শুধু তার।
তার জীবনে অন্য কারও কোনো ভাগ নেই।
আর কোনো দিন থাকবেও না।
মনে মনে নিঃশব্দে প্রার্থনা করল—

‘এই মানুষটা যেন সারাজীবন শুধু আমারই হয়ে থাকে। অন্য কারও নয়।’
ফারিস নরম গলায় ডাকল—
—”কী ভাবছিস জান?”
ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো নিশিতা।
ফারিসের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
—”নাহ… কিছু না। আমি ঘুমাব, ফারিস ভাই। খুব ক্লান্ত লাগছে।”
আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না ফারিস।
মুহূর্তের মধ্যেই নিশিতাকে হতবাক করে দু’হাতে কোলে তুলে নিল।
হঠাৎ এমনটা হওয়ায় ঘাবড়ে গেল নিশিতা।
—”আরে… আরে… কী করছেন? এটা কী?”
ফারিস মৃদু হেসে বলল—
—”মাথাব্যথা আর জ্বরে এত কষ্ট পাচ্ছিস… বিছানায় না। আজ আমার কোলেই ঘুমাবি। ছোটবেলার মতো আবার তোকে কোলে করেই ঘুম পাড়িয়ে দেব।”
নিশিতা আর কিছু বলল না।
নিঃশব্দে মুখটা ফারিসের গলায় গুঁজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।
আর ফারিস…

সে যেন নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাকে বুকে আগলে রেখেছে।
একটা ছোট্ট শিশুর মতো করে নিশিতাকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে পুরো ঘর জুড়ে হাঁটতে লাগল।
কখনো তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে…
কখনো কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছে…

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫

আবার কখনো খুব আস্তে আস্তে দোলাতে দোলাতে তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মুহূর্তটা এতটাই শান্ত, এতটাই প্রশান্তিময় ছিল যে, মনে হচ্ছিল পুরো ঘরজুড়ে অদৃশ্য এক ভালোবাসার আবরণ ছড়িয়ে পড়েছে।
চারপাশের নীরবতাও যেন তাদের দু’জনকে ঘিরে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই নীরবতার মাঝেই দুই কপোত-কপোতীর হৃদয় ধীরে ধীরে খুঁজে নিল এক টুকরো নির্মল শান্তি।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৬