তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৯
noorayn
সামনে আরহামের কনসার্ট আছে। ছোটখাটো কোনো শো নয় ; দেশের অন্যতম বৃহৎ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল। তাই সকাল থেকেই ব্যস্ততার শেষ নেই এ.এম.কে মিউজিক স্টুডিওতে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় মিউজিক লেভেল ও ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম নাম এখন এ.এম.কে মিউজিক স্টুডিও। তারা মূলত নিজেদের লেখা, নিজেদের সুর করা মৌলিক গান প্রকাশ করে। দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্টেজেও বহু কনসার্ট করেছে তারা। বিদেশের নামকরা মিউজিক লেভেল থেকে একের পর এক অফার এলেও নিজেদের স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে তারা কখনোই সহজে কারও সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। বরং এখন অবস্থা এমন যাতে – এ.এম.কে এর সঙ্গে একটি কন্ট্রাক্ট সাইন করার সুযোগ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় অনেকের।
এই ব্যান্ডের প্রাণ, প্রতিষ্ঠাতা এবং মেইন ভোকালিস্ট আরহাম মেহতাব খান। তার সঙ্গে লিড ভোকালে রয়েছে আরাফ ও কাহাফ। রিহান ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট আর আদি কিবোর্ডিস্ট ও মিউজিক কম্পোজার। নেহা ফিমেল আর্টিস্ট ; প্রয়োজন অনুযায়ী গান গাওয়ার পাশাপাশি পুরো টিমের শিডিউল, রিহার্সাল এবং কাজের সমন্বয়ও সে করে। আর নিধি ব্যান্ডের ইভেন্ট ডিরেক্টর – কোন আয়োজকের সঙ্গে কাজ হবে, কোন কনসার্টের চুক্তি চূড়ান্ত হবে, কবে কোথায় পারফর্ম করবে ; সবকিছুই তার আন্ডারে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
এই সাতজন কেবল সহকর্মী নয় ; সেই সাথে ছোটবেলার বন্ধুও। তাদের বন্ধুত্বই একসময় জন্ম দিয়েছিলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড এ.এম.কে মিউজিক স্টুডিও’কে।
তারা সাধারণত কনসার্ট করে না। বছরে হাতে গোনা কয়েকটি বিশাল আয়োজন ছাড়া তাদের মঞ্চে দেখা মেলে না। মাঝে মধ্যে যা করে তাও শুধুমাত্র লাখো ফ্যানদের আবদার রাখতে।
আরহামের গান শোনার জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ অপেক্ষা করে। অল্প বয়সেই নিজের কণ্ঠ, নিজের লেখা আর নিজের সুরে সে তৈরি করেছে এক আলাদা পরিচয় – রকস্টার আরহাম মেহতাব খান।
–কিন্তু এই পথটা তার জন্য কখনোই সহজ ছিলো না।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আরহামের অদ্ভুত এক নেশা ছিলো। বন্ধুদের আড্ডায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান গাইত সে। আরাফ সেই গানগুলো মোবাইলে রেকর্ড করে মাঝেমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দিতো। একদিন হঠাৎ করেই আরহামের গাওয়া একটি গান বিপুল পরিমানে ভাইরাল হয়। সেটাই যেন ছিলো আরহামের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।
সেই ভাইরাল গানকে কেন্দ্র করেই বন্ধুদের নিয়ে ছোট্ট একটা ব্যান্ড গড়ে তোলে আরহাম। সেই ছোট্ট স্বপ্নটাই আজ দেশের সেরা মিউজিক ব্র্যান্ডগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
তবে, তার এই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন ইজাজ খান। উনি কোনোমতেই আরহামের গান গাওয়াকে সাপোর্ট করতেন না ; উনার একটায় কথা,
“খান পরিবারের ছেলে খানদের ব্যাবসা করবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে। এসব গান-বাজনা আবার কি? এসব রঙ তামাশা এই বংশের কেউ আগে করে নি আর পরবর্তীতেও করবেনা।”
এই বিষয় নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে অসংখ্য তর্ক, ঝগড়া আর অভিমান হয়েছে। তবুও আরহাম কোনোদিন নিজের স্বপ্ন ছাড়েনি। আর সেই জেদের মূল্য হিসেবে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কেও ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
–যখন আরহাম প্রথম ব্যান্ড শুরু করেছিলো ; তখন এই ব্যাপারে তার বাড়ির কেউই কিছু জানতো না।
কেবল জানতো আলিশা।
সেই সময় ব্যান্ড গড়তে গিয়ে ভয়ে কাঁপতো আরহাম। যদি বাড়িতে জেনে যায়? যদি সবকিছু বন্ধ করে দিতে হয়?
তখন আলিশা আরহামকে সাহস দিতো। সে ছিলো আরহামের লাইফের ফার্স্ট ফ্যান ; যে কিনা তার গানের জন্য পাগল ছিলো। উঠতে বসতে যেকোনো সময় আবদার জুড়ে দিতো গান শোনার। আলিশা সবসময় বলতো,
“তুমি শুধু শুরু করো। বাকিটা আমরা দেখবো।”
–সেই সময় স্টুডিও বানানো, ইন্সট্রুমেন্ট কেনা, রেকর্ডিং সেটআপ – সব মিলিয়ে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন ছিলো। টিনেজ বন্ধুদের সবার সামর্থ্য মিলিয়েও সামান্য কিছু জোগাড় হয়েছিলো। কিন্তু, মোট খরচের প্রায় আশি শতাংশই তখনও বাকি।
পরবর্তীতে, হতাশ হয়ে একসময় আরহাম ঠিক করেই ফেলেছিলো হাল ছেড়ে দেবে। আর হবেনা।
–ঠিক তখনই মাত্র চৌদ্দ বছরের আলিশা নিজের জন্মদিনে পাওয়া কয়েকটি সোনার চেইন চুপিচুপি এনে দেয়। শুধু তাই নয় বরং নিজের দাদিকে রাজি করিয়ে আরহামের জন্য বড় অঙ্কের টাকারও ব্যবস্থা করে। মেহরোজা আক্তার এমনিতেই আরহামের প্রতি দুর্বল তাই তিনিও এগিয়ে এসেছিলেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।
–সেই টাকা দিয়েই প্রথম যাত্রা শুরু হয় এ.এম.কে মিউজিক স্টুডিওর।
তবে, এর মূল্যও দিতে হয়েছিলো আলিশাকে।
বিষয়টা বাড়িতে জানাজানি হতেই আয়শা বেগমের হাতে বেশ কয়েকটি থাপ্পড় খেতে হয়েছিলো তাকে ; তবুও নিজের সিদ্ধান্তের জন্য একবারও অনুতপ্তবোধ করেনি সে।
সেদিন যদি আলিশা পাশে না দাঁড়াতো…
তবে, হয়তো আজকের এ.এম.কে কখনোই জন্ম নিতো না।
–শুটিং শেষে গভীর রাতে যখন ক্লান্ত শরীরে আরহাম বাড়ি ফিরতো তখন পুরো খান বাড়ি ঘুমিয়ে থাকলেও জেগে থাকতো আলিশা।
সেই সময়, বাড়ির মেইন দরজায় কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক ছিলো না। তাই প্রতিরাতে নিঃশব্দে দরজা খোলা লাগতো তার। আর যখন আরহাম কোনো গান লিখতে না পেরে, কোনো সুর ঠিক না হওয়ায় ভেঙে পড়তো…
তখন, আলিশাই জোর করেই গিটারটা তার হাতে ধরিয়ে দিতো।
তারপর শাসিয়ে বলতো,
“আজ তুমি লিখবে, তুমি গাইবে আর আমি শুনবো। তারপর একদিন সবাই তোমার গান গাইবে তখন তুমি হবে রকস্টার আরহাম মেহতাব খান।”
কিশোরী আলিশার সেই কথাগুলোই যেন নতুন করে আশা দিতো আরহামকে।
তবে, একদিন সবকিছু জেনে যান ইজাজ খান।
রাগে তিনি আরহামের পকেটমানি বন্ধ করে দেন। ফোন পর্যন্ত কেড়ে নেন।
আর সেই ফোনটাও পরে ফিরিয়ে এনেছিলো আলিশাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নাকাটি আর অনুরোধ করে শেষ পর্যন্ত ইজাজ খানকে রাজি করিয়েছিলো সে।
–খান বাড়ির সবাই ভাবতো – বড় হলে আরহামের এই শখ নিজে থেকেই চলে যাবে অথচ…
আজ সেই ছেলেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রকস্টারদের একজন।
এখন সময় বদলেছে ; সবকিছু পাল্টে গেছে। শখ আর জেদ থেকে শুরু করা আরহামের এ.এম.কে স্টুডিওকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি।
সে এখনো প্রায় সময় আলিশাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“তুই না থাকলে কিছুই হতোনা। তুই না থাকলে আজকের আরহাম হতোনা। আমার গান শুরু হয়েছিলো তোকে নিয়ে আর শেষ হবেও তোকে নিয়েই। আমার গানের অক্ষরের কল্পনা তুই ; আমার সুরের বাস্তবতা তুই।”
আলিশা তখন হেসে জবাব দেয়,
“যেহেতু সবকিছু আমার জন্যই হয়েছে তবে আমাকে একটা হাতির বাচ্চা এনে দাও।”
“হাতির বাচ্চা দিতে না পারলেও একটা কিউট গোলগাল গন্ডারের বাচ্চা ঠিকই দিয়েছি। সামনে চাইলে আরো দেবো।”
“ছিহ! অশ্লীল পুরুষ।”
কনসার্টের প্রস্তুতির জন্য টানা দুদিন হলো আরহাম বাড়ি ফেরেনা। তার প্রায় পুরো সময়টায় কাটছে স্টুডিওতে। কনসার্টের পাশাপাশি তাদের নতুন একটি গানও রিলিজ হবে তাই আপাতত স্টুডিওই যেন তার দ্বিতীয় বাড়ি।
আর কিছুদিন পরই তার সেমিস্টার ফাইনাল। তাই এখনই গান, রিহার্সাল সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। তারপর মনোযোগ পড়াশোনায় দিবে সে। শুধু আরহাম নয় ; তার সঙ্গে বাকিদেরও ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে সামনে।
তবে, এই দুদিনে আরহাম বাড়িতে না ফেরায় সবচেয়ে বেশি মন খারাপ করেছে ছোট্ট ডোরা।
একদিন মাত্র বাবাকে না পেয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিলো সে। আলিশার কাছেও থাকতে চায়নি।
ভিডিও কলে বাবাকে দেখলেই ছোট্ট হাত দুটো ফোনের দিকে বাড়িয়ে এমনভাবে কান্না করতো যেন এখনই স্ক্রিন ভেদ করে বাবার কোলে চলে যাবে।
শেষ পর্যন্ত আরহামের কথাতে আলিশা ডোরাকে নিয়ে স্টুডিওতেই চলে আসে।
–বাবাকে সামনে দেখামাত্রই ডোরার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো।
“বাবা।”
ছোট্ট শরীরটা ঝাঁপিয়ে পড়লো আরহামের কোলে।
তবে কোলে উঠতেই ডোরা আগে আরহামের দিকে রাগান্বিত মুখ করে তাকালো। যেন প্রতিবাদ জানাচ্ছে ‘কেন এতটা সময় বাবা ডোরার কাছে আসেনি?’ তারপর নিজের ছোট ছোট গুলুমুলু পা দুটো আরহামের বুকের উপর তুলে ঠুসঠাস করে কয়েকটা লাথি বসিয়েছে।
আরহাম বুঝলো ছেলের রাগ তাই কিছু না বলে সাদরে গ্রহন করলো ছোট ছোট পায়ের লাথি।
–লাথি শেষ হলে ডোরা এবার মায়া মায়া চোখ করে আরহামের দিকে তাকালো তারপর নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে আরহামের মুখ হাতড়ে তার গাল টেনে নিজের ছোট্ট জিহ্বা দিয়ে বাবার গাল ভিজিয়ে আদর করে দিলো।
“বাবা… দোরা মিচ্চি ইউ।”
“মিস করলে লাথি দিয়েছিস কেন, ঢোলের বাচ্চা?”
ডোরা অবাক হয়ে মাথা কাত করে বললো,
“লাটি দিচি?”
“হ্যাঁ, তাও আবার অনেকগুলো।”
ডোরা মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করলো,
“আপা ডিচি।”
“আপ্পা না, লালা দিয়েছিস লালা।”
ডোরা কিছুক্ষণ খুব ভাবুক মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ করেই নিজের গুলুমুলু হাতে আরহামের চুলের মুঠি চেপে ধরে নিজের কপালটা বাবার কপালে ঠেকিয়ে আবারও গালে লালা মাখিয়ে দিলো।
“দোরা আডর ইউ।”
আরহাম তাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেলো।
“আমার ছোট্ট মরিচের বাচ্চা… তোকে আমি এত এত মিস করেছি। তোর লাথি না খেলে এখন আর আমার ঘুমই আসেনা।”
ব্যস!
নিজের লাথির এমন প্রশংসা শুনে ডোরা উচ্ছ্বসিত হয়ে
আবারও নিজের গুলুমুলু দুই পা তুলে ঠুসঠাস করে আরহামের বুকে আরও কয়েকটা লাথি বসিয়ে দিলো।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই সেই দৃশ্য দেখছে।
সবাই শুধু অপেক্ষা করছে ; বাপ-ছেলের এই মিলনমেলা শেষ হলেই ডোরাকে কে আগে কোলে নেবে।
এই আদুরে, গোলগাল বাচ্চাটাকে দেখলে কার না কোলে নিতে ইচ্ছে করে!
মায়ের মতো হালকা বাদামি রঙের নরম চুল, বাবার মতো ছাইরঙা চোখ আর টুকটুকে ফোলা গাল ; দেখলেই ইচ্ছে করে গপাগপ কয়েকটা চুমু খেতে।
সবাই যখন ডোরার জন্য অপেক্ষা করতে ব্যাস্ত তখন শুধু নেহাই দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো।
এমন নয় যে সে ডোরাকে আদর করে না। বরং খুবই করে। তবে এভাবে কাড়াকাড়ি করে কোলে নেওয়া তার স্বভাবে নেই। সবাই আদর শেষ করলে তবেই সে শান্তভাবে কোলে নেবে।
আরহাম যখন মাত্রই ডোরাকে নামাতে যাবে…
অমনি সবাই একসঙ্গে দৌড়ে এলো।
“আমি নিবো।” নিধি।
“না আগে আমি!” আদি।
“সরে যা!” কাহাফ।
মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেলো ডোরাকে নিয়ে টানাটানি।
শেষ পর্যন্ত কাহাফই বিজয়ী হলো।
ডোরাকে কোলে নিয়েই গপাগপ করে কয়েকটা চুমু খেলো সে।
কিন্তু মা-বাবা ছাড়া কারও চুমুই ডোরার বিশেষ পছন্দ নয়।
সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাল হাত দিয়ে ডলতে ডলতে কাহাফকে কড়া গলায় শাসালো,
“কাপ চা… ডোন আপ্পা দোরা।”
নিজের নামের এমন বিকৃতি শুনে কাহাফ মুখ বাঁকালো।
সে কত চেষ্টা করেছে “কাহাফ চাচ্চু” শেখাতে!
কিন্তু ডোরা শুরু থেকেই “কাহাফ” আর “চাচ্চু” মিশিয়ে তাকে ডাকে – “কাপ চা।”
কাহাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“কাপ চা হবে না ডোরা। বলো… কাহাফ চাচ্চু।”
ডোরা মাথা চুলকে চোখ পিটপিট করে অনেক ভেবে আবারও বলল,
“কাপ চা।”
পাশ থেকে আদি হেসে চিৎকার করে উঠলো
“সাথে বিস্কুটও দেব নাকি ডোরা?”
“আরে! চা-পাতা ছাড়া আবার কাপ চা হয় নাকি?” নিধি।
“শুধু চা-পাতা না, চিনিও লাগবে।” আদি।
“শুধু চিনি দিয়ে হবে না ভাই। প্লেবয় কাহাফের আবার মধু লাগে… বেডিগো মধু!” রিহান।
“শালা!”
ডোরাকে এক হাতে ধরেই নিজের পায়ের মোজা খুলে রিহানের দিকে ছুড়ে মারলো কাহাফ।
রিহান মোজাটা হাতে নিয়েই মুখ কুঁচকে ফেললো।
“ইয়াক! কী গন্ধ রে তোর মোজায়!”
বলেই না তাকিয়েই সেটা পাশের দিকে ছুড়ে মারলো।
ঠিক সেই পাশেই দাঁড়ানো ছিলো আলিশা।
মোজাটা তার গায়ে লাগার আগেই আরহাম দ্রুত আলিশার কোমর জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে আনলো।
তারপর রিহানের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো,
“ব্যাটা, তুই আন্ধা নাকি? চশমার পাওয়ার বাড়া। পাশে আমার বউ দাঁড়িয়ে ছিলো, দেখিস নাই?”
রিহান সঙ্গে সঙ্গে দুই কান ধরে আলিশার দিকে চেয়ে বললো,
“স্যরি..আলিশা।”
এদিকে ডোরা এখন নিধির কোলে।
নিধি আদর করে গালে একটা চুমু খেলেও এবার ডোরা কিছুই বললো না ; বরং সে এখন নিধির গলায় ঝুলে থাকা পেনডেন্টটা ধরে মন দিয়ে টানাটানি করছে।
কাহাফ সেটা দেখে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“আমি চুমু দিতেই ‘ডোন ডোন’… আর নিধি দিতেই একদম চুপ! দেখে রাখ আরহাম, এই বয়সেই মেয়ে মানুষ চিনে ফেলেছে তোর ছেলে। বড় হয়ে বাপের থেকেও বড় প্লেয়ার হবে।”
আলিশা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে আরহামের দিকে তাকালো।
“এটা কেন বললে ভাইয়া? বাপের থেকেও বড় প্লেয়ার মানে?”
রিহান আর আদির তো এমন সুযোগই চাই।
“আরেহ আলিশা, তুমি জানো না? বিয়ের আগে এই ছেলের কত মেয়ের সঙ্গে একসঙ্গে টাইমপাস চলতো! সবই আবার রিলেশনশিপের নামে!”
আলিশা এবার আরহামের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
চোখ দুটো সরু করে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলো,
“কয়জন ছিলো?”
“এইসব মিথ্যা অপবাদ! এরা নিজেরা বিয়ে করতে পারছে না তাই আমাদের সংসারে আগুন লাগাতে চাইছে। চল, আমরা ওইদিকে যাই।”
কথা শেষ করেই এক হাত দিয়ে আলিশার হাত আরেক হাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে নিজের রেস্টরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
যেতে যেতেই পেছন ফিরে হুমকি দিয়ে গেলো,
“আমার বাচ্চার খেয়াল রাখবি। ওর কান্নার শব্দ যদি আমার কানে আসে…তবে তোদের প্রত্যেকটার পাছার ছাল তুলে নেবো আমি!”
“আমাকে এখানে কেন এনেছো? আমি শুনবো ওরা কী বলতে চায়। কই, সব কথা বললেও নিজের টাইমপাসের কথা তো কোনোদিন বলোনি আমাকে!”
রুমে ঢুকেই আরহামের হাত ছাড়িয়ে বললো আলিশা।
“দেখ লিশা, এসব অনেক আগের কথা। তখন আমাদের বিয়েও হয়নি। আর এসব কথা তোকে তখন বললে তুই ঝগড়া হলেই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতিস।”
“সরো তুমি। যাও, সেই মেয়েগুলোর কাছেই যাও।”
আরহাম দুষ্টু হেসে এক পা এগিয়ে এলো।
“আগে তোর কাছে আসতে দে। দুদিন ধরে অভুক্ত আমি।”
আলিশা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কেন? এখানে খাবার নেই?”
“এই খাবার সেই খাবার না রে, ভোটকি।”
“আবার ভোটকি বলেছিস? কোন দিক দিয়ে ভোটকি আমি? এক ফোঁটা মেদ নেই আমার তাও কিনা ভোটকি বলিস! আজ শুধু ঘরে আসিস তুই!”
“তুই গন্ডার বলিস কেন?”
“আমার ইচ্ছা।”
“ভোটকি বলাও আমার ইচ্ছা।”
“সরো এখান থেকে।”
এবার আর আলিশাকে সুযোগ দিলো না আরহাম। এক টানে তাকে নিজের কাছে টেনে এনে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।
দুজনেই যখন নিজেদের একান্ত মুহূর্তে ডুবে ছিলো,
ঠিক তখনই, নক না করেই দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো নেহা।
ভেতরে ঢুকেই চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখে তার পা থেমে গেলো। মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
আজও সে মন থেকে আলিশাকে আরহামের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। একসময় সে আরহামকে পছন্দ করতো ; এবং কি এখনো করে। তার বিশ্বাস ছিলো যদি আলিশা তাদের মাঝে না আসতো তাহলে হয়তো আরহাম আজ তারই হতো।
হঠাৎ এমন সময়ে নেহাকে দেখে আলিশা লজ্জায় আরহামকে ঠেলে দূরে সরাতে চাইলো কিন্তু আরহাম একটুও সরলো না।
বরং আরও শক্ত করে আলিশাকে নিজের কাছে ধরে রাখলো।
লজ্জায় আলিশার কান থেকে যেন ধোয়া বের হচ্ছে।
আরহাম এবার শক্ত কন্ঠে নেহাকে বললো,
“হাসবেন্ড-ওয়াইফ একা থাকলে নক করে আসতে হয়, জানিস না?”
“খেয়াল ছিলো না আমার।”
“বের হও।”
“তোর জন্য ইম্পর্ট্যান্ট একটা কল এসেছে।”
“পরে কথা বলবো আমি। এখন যা।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না নেহা।
অপমানিত মুখে ঘুরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
নেহা বেরিয়ে যেতেই আলিশা আরহামের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
“এভাবে বললে কেন নেহা আপুকে?”
“কীভাবে বলতাম? এতটুকু কমন সেন্স নেই যে নক করে আসতে হবে?”
“এটা তো আমাদের বেডরুম না। ছাড়ো এখন।”
“বেডরুম না হলেও এটা আমার রেস্টরুম। তাই নো ছাড়াছাড়ি।”
তারপর আরহাম আবারও বললো,
“আর তুই নিজেই তো নেহাকে তেমন পছন্দ করিস না। তবে ওর হয়ে বলছিস কেন?”
“তার হয়ে বলছি না। তবে এটা সঠিক জায়গা না।”
“জাস্ট শাট আপ।”
এরপর আবারও আলিশাতে মগ্ন হয়ে পড়লো আরহাম।
অন্যদিকে…
নেহা প্র্যাকটিস রুমে গিয়ে রাগে ফুঁসছে।
রাগে তার হাত মুঠো হয়ে আছে।
আরহাম কোনোদিনই তার সঙ্গে এমন রুড ব্যবহার করে না। যতবারই করেছে তা আলিশার জন্য করেছে।
যদিও আলিশার সঙ্গে নেহার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই, তবু আরহামের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে, বিশেষ করে ডোরার জন্মের পর থেকে আলিশাকে সে একদমই সহ্য করতে পারে না।
তার মনে হয়, আলিশাই তার সব না-পাওয়ার কারণ।
যে জায়গাটায় একসময় নিজেকে কল্পনা করেছিলো, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আলিশা। আর সেই অপূর্ণতাই ধীরে ধীরে তার মনে ঈর্ষা, ক্ষোভকে আরও গভীর করে তুলছে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে মা-বাবা—দুজনের কাউকেই কাছে না দেখে ডোরা ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।
“মাম দাই… মাম দাই…”
ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে কাঁদতেই আছে সে।
রিহান, কাহাফ, নিধি – সবাই মিলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও ডোরার থামার কোনো নামই নেই।
“মাম দাই… বাবা…”
শেষ পর্যন্ত আদি হাল ছেড়ে দিয়ে ডোরাকে কোলে তুলে নিলো।
“চল, তোর বাপ-মাকে উদ্ধার করেই আনি।”
বলেই সে সোজা আরহামের রেস্টরুমের দিকে হাঁটা শুরু করলো।
এদিকে, সময় যেন থেমে আছে।
বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেলেও আলিশাকে ছাড়ার কোনো ইচ্ছেই নেই আরহামের।
সে যেন পুরোপুরি ডুবে আছে তার লিশার মধ্যে।
আরহামের বেপরওয়া আচরনে এক পর্যায়ে আলিশা বলে উঠলো,
“বেহায়া ছেলে… ছাড়ো আমাকে।”
“চুপ।”
“এটা তোর স্টুডিও, গন্ডার। সেই খেয়াল আছে?”
আরহামের কোনো উত্তর নেই।
সে আপাতত নিজের কাজেই মগ্ন।
ঠিক তখনই রুমের দরজায় টোকা পড়লো সেই সাথে ভেসে এলো ডোরার কান্নার স্বর।
“মাম দাই… বাবা… দোরা…”
ছেলের কান্না কানে আসতেই আলিশা জোর করে নিজেকে আরহামের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলো।
অন্যদিকে, আরহামের মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।
সে রাগে গজগজ করে বলতে লাগলো,
“এই ছোট মরিচটা বড্ড হিংসুটে হচ্ছে। একটুও মা-বাপকে একা থাকতে দেয়না।”
আলিশা হেসে ফেললো আরহামের এমন কথায়।
“সরো।”
তারপর তাড়াতাড়ি নিজের কাপড় ঠিক করে নিলো সে। নিচ থেকে ওড়নাটা তুলে ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলো।
আরহাম ওয়াশরুমের দিকে ইশারা করে বললো,
“ফ্রেশ হয়ে আয়।”
আলিশা কোনো কথা না বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো।
আরহামও নিজেকে একটু ধাতস্থ করে দরজার দিকে এগিয়ে দরজা খুলতেই বাবাকে সামনে দেখে ডোরা একপ্রকার ঝাঁপিয়েই তার কোলে উঠে পড়লো।
দু’হাত দিয়ে আরহামের গলা জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা গলায় বললো – “বাবা… বাবা… দোরা ক্রাই ক্রাই।”
আরহাম হেসে ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো।
এদিকে আদি দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণ করলো।
“তোর ছেলেকে তুই সামলা। আমি গেলাম।”
আদি ঘুরে চলে যেতে নিতেই আরহাম পেছন থেকে ডাক দিলো।
“এই শোন!”
আদি ফিরে তাকাতেই আরহাম শুধালো,
“আলিশার ব্যাগটা আর এক কাপ কফি পাঠিয়ে দিস আমার জন্য।”
আদি থাম্বস-আপ দেখিয়ে “ওকে” বলে চলে গেলো।
রেস্টরুমের ডিভানের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে আরহাম ; তার কোলে ডোরা।
ছোট্ট ডোরা এক মুহূর্তও স্থির হয়ে বসে থাকছেনা।
একটু পরপরই নিজের ছোট্ট দুটো পা দাপিয়ে আরহামের পেটের ওপর লাফাচ্ছে, কখনো তার বুকে উঠে বসছে আবার কখনো গলা জড়িয়ে ধরে কুটিকুটি করে হাসছে।
কিছুক্ষণ আগেই আদি গার্ডের হাতে এক কাপ গরম কফি পাঠিয়ে দিয়েছে।
আরহাম কফির মগটা টেবিলের ওপর রেখে আলিশার ব্যাগ থেকে ডোরার ফিডার বের করলো ; তারপর ডোরাকে আরেকটু আরাম করে কোলে বসিয়ে তার হাতে ফিডার ধরিয়ে ; নিজের এক হাতে তুলে নিলো কফির কাপ।
ডোরার হাতে ফিডার থাকলেও তার নজর বাবার হাতে থাকা কফির দিকে। ওটা তার চাই-ই চাই।
ডোরাও কফি খাবে।
তাই একদম নিষ্পাপ, ইনোসেন্ট একটা মুখ করে বাবার দিকে চেয়ে আছে।
ডোরার এমন নিষ্পাপ চেহারা দেখেই আরহাম সন্দেহের চোখে তাকালো তার দিকে।
“কীরে? এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? তুই তো এতো ভালো বাচ্চা না। তোর মতলব কিন্তু ভালো ঠেকছে না ছোট মরিচ।”
ডোরা ধরা পড়ে যেতেই রাগান্বিত মুখে বাবার দিকে তাকালো।
“আ…তা…তাইত!”
ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলিয়ে বাবাকে নিজের ভাষায় বকা দিলো সে।
তারপর আবার মুহূর্তের মধ্যেই মুখের ভাব পাল্টে ফেললো।
এক হাতে ফিডার ধরে অন্য হাতটা ধীরে ধীরে আরহামের কফির মগের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে সে ; যেন যেকোনো মুহুর্তেই ছোট হাতের থাবা বসাবে সে।
আরহাম তা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে মগটা সরিয়ে নিলো।
“এই! সর… আমার কফিতে হাত দিচ্ছিস কেন তুই?”
“আ…বা…ব্বাবাবা…”
“না। তোর মা দেখলে এখন আমাকে মারবে।”
ডোরা আবারও মায়া মায়া চোখে বাবার দিকে তাকালো।
“দা…দাদা…বা…”
“তাকিয়ে আছিস কেন? চোখ সরা আমার কফি থেকে। মায়ের মতো খালি আমার জিনিসের দিকেই নজর।”
ডোরা হাত সরানোর বদলে এবার পা দাপিয়ে আরও উৎসাহ নিয়ে কফি ছিনিয়ে নেওয়ার পায়তারা করছে।
“কীরে কীরে! হাত সরা…তুই তোর ফিডার খা।”
ডোরা গম্ভীর মুখ করে মাথা নাড়লো। না সে ফিডার খাবেনা।
“ফিডি… ইয়াম নাই নাই। তুমি ফিডি কাও।”
বলেই নিজের ফিডারটা আরহামের মুখের সামনে এগিয়ে দিলো ; যেন ডিল করতে চাইছে ফিডারের বদলে কফি।
আরহাম ফিডারটা মুখের সামমে থেকে সরিয়ে এবার ডোরার দিকে তাকালো ; যে কিনা এখনো ঠোঁট ফুলিয়ে মায়া মায়া চোখে তার দিকে চেয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে আরহাম চারপাশে একবার তাকালো।
“খাবি?”
“আচ্ছা… নে, একদম অল্প করে খা। তোর মা দেখলে আবার আমাকে মারবে। তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেল…”
যেই না আরহাম কফির মগটা ডোরার মুখের কাছে নিতে যাবে ; ঠিক তখনই কানের পাশ থেকে বজ্রপাতের মতো একটা চিৎকার ভেসে এলো।
“গন্ডারের ঘরেররর গন্ডাররর! তুই আমার বাচ্চাকে এসব কী দিচ্ছিসসস?”
আলিশার সেই চিৎকারে আরহাম এমনভাবে চমকে উঠল যে হাতে থাকা কফির মগটা প্রায় ফেলে দিচ্ছিলো সে।
বুকে থুথু দিয়ে ঘুরে তাকিয়ে কোনোমতে বলতে লাগলো,
“ক… কইইই? আমি… আমি কিছু দিচ্ছি না! এটা তো এই ছোট মরিচ খেতে চেয়েছে বলে… মানে… ওই আর কী…”
আলিশা দুই হাত কোমড়ে রেখে চোখ রাঙিয়ে এগিয়ে এলো।
“তুই আমার বাচ্চাটাকে পুরো বরবাদ করে দিবি!”
আরহাম অসহায়ের মতো ডোরার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো,
“আমি না! সব দোষ এই ছোট মরিচের। ও’ই কফি খাওয়ার জন্য আমার সাথে ঝগড়া করছিলো।”
ডোরা বাবার কথা শুনে প্রতিবাদ করতে লাগলো পা দাপিয়ে। যেন সে কিছুই করেনি ; সব দোষ বাবার। সে তো ভালো বাচ্চা।
আর সেই মুখ দেখে আলিশার রাগ আরও বেড়ে গেলো।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৮ (২)
“ও ছোট! ও বুঝে না। কিন্তু তুই? তোরও কি ডোরার সমান বুদ্ধি?”
আরহাম কাশির ভান করে নিচু গলায় বিড়বিড় করলো,
“মাঝে মাঝে তো মনে হয়… আমার বুদ্ধি ওর থেকেও কম…”
“আ..তা..তাইত! বাবা তাইত।”
“দোরা কুফি কায় না।”
আরহাম বড় বড় চোখ করে তাকালো ডোরার দিকে। কত বড় পল্টিবাজ ছানা…ভাবা যায়!
