ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৪
শানজানা আলম
ঢাকায় পৌঁছে উবার বুক করে এহসান বাসায় ফিরল।
বাসায় ঢুকতে ঢুকতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। সিকিউরিটিকে ডেকে তুলে লিফট খুলতে হলো।
বাসায় ঢুকে অথৈ হতভম্ব। বাসা এত এলোমেলো হয়ে আছে! পুরো ড্রয়িং রুমে জামাকাপড় ছড়ানো। বড় সোফা সিটে চাদর ফেলে রাখা, বালিশও আছে, বোঝাই যাচ্ছে এখানে ঘুমিয়ে থাকেন এহসান সাহেব।
কি অবস্থা! অথৈ বলল হতভম্ব হয়ে।
এহসান বলল, ব্যাচেলর বাসা, এমনি হয়।
সমস্যা নেই, বউ নিয়ে এসেছি, কাল থেকে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আর সকালে
বুয়াকে ফোন করে দিব, চলে আসবে।
-বুয়া এসে করবে টা কি, মেঝে তো পরিস্কার! গোছাতে হবে সব কিছু! হায় আল্লাহ, কেউ কিভাবে থাকে এভাবে!
-মেঝে পরিস্কার কারন সন্ধ্যার পরে বুয়া এসে ঘর মোছে, ওয়াশরুম ক্লিন করে, রান্নাঘর ক্লিন করে। এসো ভেতরে এসো তুমি।
অথৈ কে সেকেন্ড বেডে নিয়ে ঢুকলো এহসান৷ অথৈ এর ব্যাগটা রেখে বলল, ফ্রেশ হয়ে এসো তুমি।
আমি ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানা ঠিক করে দিচ্ছি। তুমিও চেইঞ্জ করে নাও।
ওয়াশরুম পরিস্কার আসলেই, অথৈ উঁকি দিয়ে দেখল, যাক তাও ভদ্রলোক অপরিস্কার নয়, একটু এলোমেলো হয়ে আছেন। অথৈ ঢুকলো ফ্রেশ হতে।
ওয়ারড্রব থেকে বেডশিট আর বালিশের কভার বের করে রাখল এহসান। এরপরে নিজের বেডরুমে চলে গেল। হাত পা ধুয়ে, চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হয়ে ব্যাকপেক থেকে জিনিসপত্র বের করে রাখছিল।
অথৈ এসে উঁকি দিলো, এহসান বলল, ফ্রেশ হয়েছ?
-হুম। কি করছেন?
জিনিসপত্র বের করে রাখছি, সকালে অফিস আছে আমার। ওয়েট, আসছি!
অথৈ সেকেন্ড বেডে এসে ঢুকল। সেকেন্ড বেডে এসে এহসান বেডশিট পাল্টে দিলো। অথৈ বালিশের কভার পাল্টে নিলো।
এহসান বলল, শুয়ে পড়ো তাহলে, রাত কম হয় নি। একা ভয় লাগবে?
অথৈ একটু কনফিউজড হয়ে গেল, একা মানে কি,
এহসান কি আলাদা বেডরুমে ঘুমাবে!
-একা মানে?- অথৈ প্রশ্নটা করেই ফেলল।
এহসান একটু হেসে বলল, আমি আজই তোমার সাথে থাকলে তোমার আনইজি লাগবে না? আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং তো এতখানি ডেভলপ করে নি এখনো! তুমি সময় নাও অথৈ।
অথৈ এবার বুঝতে পারল। এহসান এখনো ইতস্ততবোধ করছে।
অথৈ বলল, আনইজি লাগবে না। এখানে চলে এসো। তবে তোমার আনইজি লাগলে থাকো আলাদাই।
এহসান বলল, সিওর তো?
অথৈ বলল, হুম, সিওর, কেন, নিজের উপর বিশ্বাস নেই?
এহসান হাসতে হাসতে বলল, তুমি কিন্তু অনেক দুষ্টু আছ অথৈ, বোঝা যায় না বাইরে থেকে।
অথৈ বলল, বোঝার মতন সম্পর্ক কখনো হয় নি, তাই বোঝা যায় নি।
এহসান বাইরের রুমের লাইট নিভিয়ে নিজের কোলবালিশ নিয়ে এসে শুয়ে পড়ল।
অথৈ কাল আমার একটা মিটিং আছে, আমি তাড়াতাড়ি ব্যাক করার চেষ্টা করব। তুমি রেস্ট নিও, রান্নাবান্না করতে হবে না। দুয়েকদিন আমরা বাইরে থেকে ম্যানেজ করে নিব। ঠিক আছে?
অথৈ বালিশে হেলান দিয়ে বসল।
-কি হলো, ঘুমাবে না?
-হুম, এখনো ঘুম আসে নি।
-কি বলছ, এত স্ট্রেস গেল, আমার তো ঘুম আসছে।
-তো ঘুমিয়ে পড়ো, আমি কি আটকে রেখেছি।
এহসান উঠে বালিশ তুলে দিয়ে অথৈ এর পাশে হেলান দিয়ে বসল।
অথৈ জিগ্যেস করল, ঘুম আসছে না?
-হুম।
-তাহলে?
এহসান অথৈ এর হাত ধরে ওকে কাছে টেনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বসল। অথৈ কিন্তু নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো না, ওর অস্বস্তিও হলো না।
এহসান অথৈ এর চুল সরিয়ে ঘাড়ে চুমু খেলো, ওর নাকে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল, সময় নিচ্ছি, একবারে সব কিছু চাইছি না। সবই তো এখন আমার। হামলে পড়ার দরকার কি! তাই না?
অথৈ বলল, তাই বুঝি?
-হুম, তাই তো!
অথৈ এহসানের নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছিল, নিজেকে নিবৃত্ত না করে এহসানের ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে সরে যাচ্ছিল। এহসান সরতে দিলো না। অথৈ এর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। অথৈ এহসানকে দু হাতে আঁকড়ে ধরলো। পূর্বের সম্পর্ক সব এই মূহুর্তে মিথ্যে হয়ে গেল, এই বিশ্ব চরাচরে অথৈ এর জন্য একমাত্র সত্য এহসান।
কিছু সময় পরে এহসান বালিশ ঠিক করে অথৈকে শুইয়ে দিয়ে ওর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, গুড নাইট।
অথৈ হাসল মিষ্টি করে।
এহসান উঠে পড়েছিল সকালেই। নিজে তৈরি হয়ে নিলো লাল চেক শার্ট আর জিন্স পরে। অথৈ ঘুমাচ্ছে।
অথৈ- এহসান ডাকল।
অথৈ চোখ মেলে দেখল এহসান ঝুঁকে আছে। কাল রাতের কথা মনে পরে গেল অথৈ এর। এহসানকে চুমু খেয়েছে নিজের আগ্রহে। যদিও শুধু এটুকুই, তবুও লজ্জা লাগল ভীষণ। অথৈ চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিভাবে পারল সে!
শোনো, এই বাসার চাবি, আলমারির চাবি, আর কিছু টাকা আছে। ফ্রিজে পরোটা রাখা আছে, ডিম আছে, আরো কিছু লাগলে জিরোতে ফোন করে দুলালকে বললে এনে দিবে। আমি চলে আসব আজ তাড়াতাড়িই। টেক্সট করবে আমাকে। ওকে।
অথৈ ঘাড় নাড়ল।
এহসান ড্রেসিং টেবিলে ফিরে শার্টের হাতা গোটাতে শুরু করল। অথৈ চোখ মেলে এহসানকে দেখছিল, এভাবে কখনো কাউকে দেখে নি অথৈ, এহসান আয়নায় অথৈ এর পিটপিট করে তাকানো দেখে পেছনে ফিরতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল অথৈ।
এহসান হাসল, অথৈ বুঝতে পারেনি, এহসান যে তাকে দেখেছে।
-অথৈ এসো, দরজা বন্ধ করে দাও।
অথৈ উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হলো।
এহসান ফিরে অথৈ এর কপালে চুমু খেয়ে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, যেটা এক্সপেক্ট করছ, ফিরে এসে দিচ্ছি! তৈরি থেকো!
অথৈ লজ্জায় লাল-নীল হয়ে গেল। কি ভীষণ পাজি লোক একটা! এভাবে কেউ বলে! আর অথৈ একা এক্সপেক্ট করছে, নিজে মনে হয় কিছুই চাচ্ছে না!
অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে এহসান অফিসে বের হয়ে গেল।
সব কিছু স্বাভাবিক লাগছে, সুন্দর একটা সকাল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৩
একটা চমৎকার জীবন এহসান ডিসার্ভ করে, অথৈ এর সাথে। এই লুকোচুরি চাউনি, আলতো চুমু খাওয়া, স্পর্শের তিরতিরে সূক্ষ অনুভূতি সব কিছু এহসানের প্রাপ্য। ঐশি এহসানের যোগ্য ছিল না। অথৈ এর সাথে ঐশির সম্পর্ক কি, এহসানের তাতে সত্যিই যায় আসে না।
