প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৬
insia isha chowdhury
বেশ কয়েকটি দিন কেটে গেছে। আজ থেকে শুরু হয়েছে সূচনার ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সূচনা ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করে নিল। এরপর রুমে ফেরত এসে কলেজের ইউনিফর্ম পরে নিল। এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব যত্ন করে হিজাবটা পরে নিল।
যদিও আগে সে কমবেশি হিজাব পরত, তবে এখন বিষয়টা একেবারেই ভিন্ন। প্রণয়ের একটাই কথা সূচনা যখনই ঘরের বাইরে যাবে, অবশ্যই যেন হিজাব পরে যায়। হিজাব ছাড়া যেন কোথাও না যায়। প্রণয়ের সেই কথাকে সূচনা সানন্দে মেনে নিয়েছে। তাই এখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সে সবসময় যত্ন করে হিজাব পরে নেয়। এমনকি ঘরের দরজা পেরোনোর মুহূর্ত থেকেই মাথায় ওড়না টেনে রাখে। সূচনা দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো সকালের নাস্তা করার জন্য। নাস্তা শেষ করে কলেজে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যতটুকু সময় হাতে থাকবে, ততক্ষণ অংকের সূত্রগুলো আরেকবার ঝালিয়ে নেবে। আজ কলেজে ম্যাথ ক্লাস টেস্ট। এই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য গত কয়েকদিন ধরে সে ভীষণ পরিশ্রম করেছে। যাতে পরবর্তীতে টেস্ট পরীক্ষাতেও একটি ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারে।
সূচনা নিচে নামতেই শায়লা খাতুন স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“আম্মু, তাড়াতাড়ি বসে পড়ো। সকালের নাস্তাটা করে ফেলো।”
কথাটা শুনে সূচনা মুচকি হেসে একটি চেয়ার টেনে বসে পড়ল। ঠিক তখনই সুপ্তি আর ঋতুও বসার ঘরে চলে এলো। ভার্সিটির পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যে ছুটিটুকু ঋতু পেয়েছে, সেটাই এখন পরিবারের সঙ্গে কাটাচ্ছে। আর হয়তো মাত্র
বিশ-পঁচিশ দিন পরই তাকে আবার কানাডায় ফিরে যেতে হবে। এরপর এত দীর্ঘ ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ আদৌ কবে হবে, তা তার নিজেরও জানা নেই।
কিছুক্ষণ পর শায়লা খাতুন চারপাশে তাকিয়ে সূচনাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“সূচনা, প্রণয় এখনো নিচে আসছে না কেন?তোমাদের তো কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে গেল।”
সূচনা একবার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আবার মায়ের দিকে ফিরে হালকা হেসে বলল,
“এই তো মা, উনি আর একটু পরেই চলে আসবেন।”
ঠিক তখনই রবিন আর প্রণয় একসঙ্গে নিচে নেমে এলো। এদিকে রিমা ইতোমধ্যে সবার সামনে নাস্তা পরিবেশন করে দিয়েছে। সবাই একসঙ্গে খাওয়া শুরু করল। প্রনয়ের খাবার শেষ করার আগেই সূচনা কে তার খাবার শেষ করতে হবে যেন সূচনা আরো একবার রিভিশন দিতে পারে। তাই সূচনা বেশ তাড়াহুড়ো করেই খেতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ করেই খাবার গলায় আটকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে কাশতে শুরু করতেই টেবিলে উপস্থিত সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে তার দিকে তাকাল। তবে সবার আগে প্রণয়ই উঠে দাঁড়াল। দ্রুত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে খাইয়ে দিল। তারপর নিজের রুমাল দিয়ে সূচনার মুখটা আলতো করে মুছে দিয়ে একটু শাসনের সুরে বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার কী আছে? এখনো অনেক সময় আছে। আস্তে ধীরে খাও।”
সূচনা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ আবার খেতে শুরু করল। তবে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“হুহ! আমাকে নিয়ে কত চিন্তা! অথচ পড়ানোর সময় একটুও মায়া-দয়া ছিল না। এমনভাবে পড়িয়েছে যে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারিনি।”
মনে মনে কথাগুলো বলতেই প্রণয়ের গম্ভীর কণ্ঠ আবার ভেসে এলো,
“বললাম তো, আস্তে ধীরে খাও।”
সুপ্তি ঠিক ওদের সামনাসামনি বসেছিল। নীরবে শুধু দেখছিল, কী গভীর যত্নে প্রণয় সূচনার প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ের খেয়াল রাখছে। দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর পুরোনো এক ব্যথাকে আবারও নাড়া দিল। অথচ এতদিনে সুপ্তি বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখেছে। এখন আর আগের মতো কষ্ট হয় না, শুধু হৃদয়ের এক কোণে হালকা একটা ব্যথা রয়ে যায়। সুপ্তি জানে, যেদিন এই অনুভূতিটাকেও নিজের ভেতর থেকে মুছে ফেলতে পারবে, সেদিনই হয়তো সত্যিকারের ভালো থাকতে পারবে।
সবাই খাওয়া শেষ করতেই নীরবতা ভেঙে ঋতু বলল,
“সুপ্তি, আমার আজ খুব জরুরি শপিং মলে যেতে হবে। আমি চাই তুই আমার সঙ্গে চল।”
ঋতুর কথায় সুপ্তি একটু মন খারাপ করেই বলল,
“আমি অবশ্যই তোর সঙ্গে যেতাম। কিন্তু আজ আমাদের ভার্সিটিতে কিছু অতিথি আসবেন। সিনিয়র হিসেবে কিছু দায়িত্ব আমার ওপর পড়েছে। এখন আর সেটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তুই তো আমাকে আগেও কিছু বলিসনি। এখন চাইলে আর কিছু পরিবর্তন করতে পারব না। বেশি দরকার হলে খালামণিকে নিয়ে যা।”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“একদম অসম্ভব! আম্মুকে নিয়ে গেলে তো পুরো প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে।”
হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়তেই সুপ্তির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ও আচ্ছা! এটা তো আমার একদম মনেই ছিল না। আমি যেতে না পারলেও তুই চাইলে ভাবিকে নিয়ে যেতে পারিস।”
ঋতু তাড়াতাড়ি আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না না! ভাবিকে নিয়ে গেলে তিনি গল্প করতে করতে ঠিকই আম্মুকে সব বলে দেবে। আমি চাই না আমার প্ল্যান সম্পর্কে এখনই কেউ কিছু জানুক।”
সুপ্তি হালকা হেসে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর কথাটা বুঝেছি। তবে চাইলে কাল আমি তোর সঙ্গে যেতে পারি। কাল আমি একদম ফ্রি আছি।”
ঋতু দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,
“কিন্তু আমার তো আজই যাওয়া খুব দরকার। অনেক কিছু কেনাকাটা করতে হবে, আবার সবকিছু গুছিয়েও রাখতে হবে। আর আমি তো হয়তো আর এক মাসের মতোও দেশে থাকব না। এরপর কবে আবার এভাবে সময় পাব, সেটাও জানি না। তাই আজই যেতে চাই। তুই নিশ্চিন্তে ভার্সিটিতে যা। আমি একাই সব সামলে নিতে পারব।”
সুপ্তি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
প্রণয় সূচনাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নিজের অফিস রুমের দিকে চলে গেল। আর সূচনা ধীর পায়ে নিজের ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বসে পড়ল। রুটিন অনুযায়ী আজকে প্রথম ক্লাসটা নেবে প্রণয়। এরপরই রয়েছে তাদের বহু প্রতীক্ষিত ম্যাথ ক্লাস টেস্ট।
এমন সময় একটি মেয়ে এসে সূচনার পাশের সিটে বসল। প্রীতি ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার পর থেকে সূচনা আগের মতো কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না। তাই সে চুপচাপ নিজের মতো বসে ছিল।
হঠাৎ পাশের মেয়েটি মিষ্টি হেসে সূচনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হ্যালো, আমি জিয়া। তোমার নাম কী?”
সূচনাও হাসিমুখে তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে উত্তর দিল,
“হ্যালো, আমি সূচনা।”
জিয়া হাসতে হাসতেই বলল,
“আমি আসলে ট্রান্সফার স্টুডেন্ট। কিছুদিন হলো এই কলেজে ভর্তি হয়েছি।”
সূচনা মাথা নেড়ে বলল,
“ওহ, তাই বল! এর আগে তোমাকে কখনো দেখিনি।”
সূচনার কথায় জিয়া বেশ খুশি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“আচ্ছা, তাহলে আজ ক্লাস টেস্ট শেষ হওয়ার পর আমরা দু’জন মিলে ফুচকা খেতে যাবি? কি বলো?”
সূচনা একটু ইতস্তত করে বলল,
“দেখো, ফুচকা খেতে তো আমারও খুব ভালো লাগে। কিন্তু তোমাকে এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে যেতে পারব। আমাকে ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতে হবে।”
জিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আরে, একটু দেরি করলে কী এমন হবে…”
জিয়া কথাটা শেষ করার আগেই পুরো ক্লাসরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। প্রণয় ক্লাসরুমে প্রবেশ করেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তার দিকে। আর জিয়া তো একদৃষ্টিতে হা করে তাকিয়েই রইল।
আজ প্রণয়ের পরনে ছিল নিখুঁতভাবে পরা একটি ব্ল্যাক স্যুট। পরিপাটি করে ব্রাশ করা চুল, হাতে ব্র্যান্ডের ঝকঝকে সিলভার রঙের ঘড়ি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর গম্ভীর ব্যক্তিত্ব সব মিলিয়ে জিয়া শুধু প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। পিছন থেকে দু’জন মেয়ের কথোপকথন শুনতে পেল জিয়া। একটা মেয়ে অপর একটি মেয়েকে বলছে,
“না জানি প্রণয় স্যার আজকে কি কঠিন প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা নেবে”
অন্য একটি মেয়ে বলল,
“হ্যাঁ আমারও ভীষণ ভয় করছে।”
আর তারপর জিয়া ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আহা আমি তো প্রেমে পড়ে গেলাম। কলেজে এতো হ্যান্ডসাম স্যার আছে আমি তো জানতামই না। এখন থেকে আমি নিয়মিত কলেজ করব।”
সূচনা অবাক হয়ে জিয়ার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“কি বললে তুমি?”
জিয়া মুচকি হেসে বলল,
“কেন? তুমি শুনতে পেলে না আমি কী বললাম। আমি তো প্রণয় স্যারের প্রেমে পড়ে গিয়েছি। উনি কতটা হ্যান্ডসাম।”
সূচনা হাতে থাকা কলমটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“কোন দিক থেকে হ্যান্ডসাম?”
জিয়া চোখ বড় বড় করে বলল,
“সবদিক থেকেই হ্যান্ডসাম।”
কথাটা শুনেই সূচনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কলমটা বেঞ্চের ওপর জোরে রেখে। অতিরিক্ত ক্রোধে বলে উঠলো,
“খবরদার এখুনি নিজের চোখ নামা! আর একবার যদি তুই প্রণয়ের দিকে নিজের কুনজর দিয়ে থাকিস তবে আমি তোর চোখ খুলে লুডু খেলবো বলে দিলাম।”
জিয়া বিস্ফোরিত নয়নে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ আগেও মেয়েটা তার সঙ্গে কতটা স্বাভাবিক আর আন্তরিকভাবে কথা বলছিল। অথচ প্রণয় স্যারকে নিয়ে একটা কথাই বলতেই হঠাৎ এমন রাগ! ব্যাপারটা যেন কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না তার। একজন কলেজ স্টুডেন্ট হিসেবে নিজের কলেজের সুদর্শন একজন প্রফেসরকে দেখে যদি সামান্য ক্রাশ খেয়েই থাকে, তাতে এমন অপরাধের কী আছে?
অবাক দৃষ্টিতে সূচনার দিকে তাকিয়ে জিয়া প্রশ্ন করল,
“মানে? আমি প্রণয় স্যারকে পছন্দ করলে তোমার কিসের সমস্যা?”
সূচনা বিরক্তিভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত অথচ কড়া গলায় বলল,
“কারণ, ওই প্রণয় স্যার আমার হাজব্যান্ড, আর আমি তার ওয়াইফ। তাই তোকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি খবরদার, আমার হাজব্যান্ডের দিকে আর কখনো ওই দৃষ্টিতে তাকাবি না।”
কথাটা শুনে জিয়া মুহূর্তেই নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। সত্যিই তো! কোনো মেয়ের সামনেই যদি তার স্বামীকে নিয়ে অন্য একটা মেয়ে বলে বসে যে সে তার ওপর ক্রাশ খেয়েছে, তাহলে রাগ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। একটু অপ্রস্তুত আর বোকা বোকা মুখ করে সে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সরি, সূচনা। আমি তো জানতামই না যে তুমি স্যারের ওয়াইফ। তাছাড়া স্যারকে দেখেও তো কোথাও থেকে বোঝার উপায় নেই যে উনি ম্যারিড। আমার কথায় যদি তোমার খারাপ লেগে থাকে… আই এম রিয়েলি সরি।”
এদিকে প্রণয় ইতোমধ্যেই পড়ানো শুরু করে দিয়েছে। বোর্ডে একের পর এক লিখে যাচ্ছে। সূচনা সেগুলো খাতায় নোট করতে করতেই বলল,
“ইটস ওকে। তুমি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছ, এটাই অনেক।”
সূচনার কথা শুনে জিয়ার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। মুচকি হেসে সে বলল,
“ঠিক আছে, এত কিছুর মাঝেও একটা জিনিস কিন্তু ভালো হয়েছে।”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী ভালো হয়েছে?”
জিয়া দুষ্টু হেসে বলল,
“এই যে, তুমি আমাকে “তুই” করে বললে।”
সূচনা হালকা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“ওটা তো রাগের মাথায় বের হয়ে গেছে।”
“কোনো সমস্যা নেই। আমরা তো ক্লাসমেট, তাই না? তুমি-আপনি করে বললে কেমন যেন ফর্মাল লাগে। আমরা ক্লাসমেট, একে অপরকে তুই করেই বলতে পারি। আর এখন তো আমি তোর ব্যাপারে সবকিছুই জেনে গেছি। তুই যে স্যারের ওয়াইফ!
জিয়ার কথায় সূচনা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পুরো ক্লাসরুমে প্রণয়ের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে উঠল,
“ফোর্থ নাম্বার বেঞ্চে কী সমস্যা হয়েছে? তোমরা এত কথা বলছ কেন? বাকিরা ডিস্টার্ব ফিল করছে। এনি প্রবলেম?”
প্রণয়ের কথায় দুজনই চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে একসঙ্গে বলল,
“নো, স্যার।”
অন্যদিকে ঋতু তার ফেভারিট কেক শপে এসে সুন্দর করে একটি রেড ভেলভেট কেকের অর্ডার দিয়ে দিল। সঙ্গে রেফারেন্স পিকচারও দেখিয়ে দিল, ঠিক কেমন ডিজাইনে কেকটা বানাতে হবে। এরপর ঋতুর মনে হলো, তার উইমেন্স সেক্টরে যাওয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখার জন্য স্ক্রিনে চোখ রাখল। ফোনের দিকেই নজর রাখতে রাখতে সে লিফটের ভেতরে প্রবেশ করল।
লিফটের ভেতরে আগে থেকেই আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। ঋতু ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পাশে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। তার একেবারে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেই গম্ভীর, ঝগড়াটে, শয়তান জঙ্গল হিসেবে আখ্যায়িত করা রাফি। অবশ্য রাফি তখনও ঋতুকে খেয়াল করেনি। সে এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে ডান দিকে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু এমন অপ্রস্তুত মুহূর্তে হঠাৎ রাফিকে সামনে দেখে ঋতু এতটাই চমকে গেল যে তার হাত থেকে ফোনটা ফসকে মেঝেতে পড়ে গেল। ফোন পড়ার তীক্ষ্ণ শব্দে রাফিও মুখ ফিরিয়ে বাম পাশে তাকাল। আর তখনই তার চোখ পড়ল ঋতুর ওপর।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ পুরো শপিং মল অন্ধকারে ডুবে গেল। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চলন্ত লিফটটি আচমকা থেমে গিয়ে হালকা একটি ঝাঁকুনি খেল। আকস্মিক সেই ধাক্কায় দুজনেই সামান্য ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল আর পেছনের দিকে হেলে পড়ল। আর চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে রইল। শুধু লিফটের ভেতরের জরুরি আলোর ক্ষীণ আভা ফুটে উঠল।
আচমকা এমন পরিস্থিতিতে ঋতুর মনে বহুদিন আগের কিছু বিভীষিকাময় স্মৃতি ঝড়ের মতো ফিরে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে দু’হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরল, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়াতে লাগল এপাশ-ওপাশ। নিঃশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে, ঠোঁট কাঁপছে। পরমুহূর্তেই ভয়ে কেঁদে ফেলল। আর খুব কষ্টে বলল,
“প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও! প্লিজ…”
ঋতুর কাঁপা কণ্ঠস্বর শুনে রাফি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। কী হচ্ছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইট অন করল। ক্ষীণ সাদা আলোয় লিফটের ভেতরটা খানিকটা আলোকিত হয়ে উঠতেই রাফির দৃষ্টি গিয়ে থামল ঋতুর ওপর।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৫
মেয়েটা পুরো শরীর কাঁপছে। চোখের কোণ ভিজে গেছে, মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে রাফির বুকের ভেতরটা অকারণেই মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে হলো, হয়তো অন্ধকারেই ভয় পেয়ে এমন অবস্থা হয়েছে। কোনো দ্বিধা না করে রাফি ধীরে ধীরে ঋতুর কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। তার নিজের কণ্ঠেও অজানা এক অস্থিরতা মিশিয়ে বললো,
“ইটস ওকে কিছুই হয়নি। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। দেখো চারপাশে আর অন্ধকার নেই। আমি আছি… শান্ত হও।”
