Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৬

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৬

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৬
শানজানা আলম

অথৈ – কি খাবে? – এহসান বাসার কাছে এসে ফোন করল।
দুপুরে এহসান খাবার পাঠিয়েছিল এ্যাপ থেকে। রাতে নিজে নিয়ে আসতে চাইছে।
অথৈ বলল, রাতে বাসায়ই খাব, কিছু আনতে হবে না, অল্প কিছু রান্না করেছি।
রান্না করতে গেলে কেন, বললাম তো, দুয়েকদিন আমরা ম্যানেজ করে নেই- এহসান জোর দিয়েই বলল।
সমস্যা নেই, বাসায় এসো এখন। বিকেলে ফেরার কথা বলে এখন রাত সাড়ে নয়টা বাজে। এতক্ষণ একা একা, ভূতে ধরে নি যে, এটাই বেশি।
আসছি, কাছাকাছি চলে এসেছি। একটু কাজ পড়ে গেল – এহসান বলল।
হাত ভর্তি কিছু শপিংব্যাগ নিয়ে এহসান বাসায় ঢুকলো।
বাসায় ঢুকে এহসান রীতিমতো চমকে গেল। চেনাই যাচ্ছে না, এটা তার বাসা!

এহসান বলল, এটা কি আমার ম্যাসি মেস? নাকি মিসেস অথৈ ম্যাডামের বাসা! পিচ অফ প্যারাডাইস!
ইশ, মোটেই এমন কিছু সুন্দর হয় নি, শুধু পরিস্কার করেছি, আর কিছু জিনিস ফেলে দেয়ার জন্য বারান্দায় রেখেছি। কিছু জিনিস বের করে নিয়েছি, মানে চাবি যখন আমার কাছে, সব আমারই মনে করে নিয়েছি৷ কিছু বাজার করেছি, বুয়াকে দিয়ে সব পরিস্কার করিয়েছি, ফ্রিজ ক্লিন করে কিছু ফ্রুট এনে রাখলাম, কোল্ড ড্রিংকস এনেছি। কাঁচা বাজার করেছি, হিসেব লিখে রাখা আছে, আর বুয়াকে পাঁচশ টাকা বখশিশ দিয়েছি, সারাটা দিন আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে
এহসান শপিং ব্যাগগুলো সোফার উপরে রেখে অথৈ কে কাছে টেনে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, এহসান এবং এহসানের সব কিছুই তোমার! একদম পুরোপুরি তোমার। যা মন চায় করো, কিছুই জিজ্ঞেস করতে হবে না।
আচ্ছা, যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো তো! তোমার গা থেকে বেলী ফুলের ঘ্রাণ আসছে, ফুল এনেছ?
এহসান বলল, কই না তো! কি জানি কোন মেয়ে আবার শার্টে বেলী ফুল লাগিয়ে দিলো!
অথৈ হাসতে হাসতে বলল, তাহলে আমি তাকে এক হাতে খু★ন করে ফেলব।
এহসান গ্রীজার অন করে চারপাশের পরিবর্তনটা দেখতে লাগল। অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে অথৈ। জিজ্ঞেস করে নি। ভালোই করেছে, যা মন চায় করুক, পুরো বাসায় অথৈ এর রাজত্ব হোক।

সকাল থেকে অথৈ এর সময়টা ব্যস্ততায় কেটেছে, এহসান চলে যাওয়ার পরে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছে। তারপরে সব ছড়ানো জামাকাপড় গুলল বারান্দায় নিয়ে রেখেছে। ওয়ারড্রব আলমারি থেকে খুঁজে পুরনো কাপড় বের করে রেখেছে। এর মধ্যে বুয়া চলে এসেছে৷
বুয়া অথৈ এর সাথে আগেরবার কাজ করেছিল।
সে একটু দ্বিধায় ছিল, অথৈকে দেখে। অথৈ বলেছে, এখন থেকে আমি থাকব। আমাকে ম্যাডাম বলার দরকার নেই, আপু ডাকলেই হবে আগের মতন।
বুয়া জিজ্ঞেস করল, স্যারের সাথে বিয়া হইছে?
অথৈ হেসে ঘাড় নেড়েছে। তবে বুয়া মোটামুটি বিবিসির কাজ করে দিবে বিল্ডিংয়ে, সে বিষয়ে অথৈ নিশ্চিত।
তাকে কিছু না বলতে বলার চাইতে, বলুক মন মতো। যা সত্য ঘটেছে, কিছু আঁচ তো গায়ে আসবেই।
অথৈ বুয়াকে দিয়ে পুরো বাসার প্রতিটা কর্ণায় মুছিয়েছে৷ ফার্নিচার মুছিয়ে নিয়েছে। টি টেবিলের নিচে ঐশির এমবিএর কিছু বই পত্র ছিল, সব তুলে বারান্দায় রেখে এসেছে৷ শোকেসের তুলে রাখা শোপিস জায়গা পরিবর্তন করেছে।

খাবার টেবিলের পুরনো ম্যাট ধরে ফেলে দিয়ে তুলে রাখা ম্যাট, প্লেট গ্লাস বের করেছে। টেবিলের উপর ছোট্ট একটা ফুলদানী রেখেছে। তারপরে বুয়াকে নিয়ে বাসার সামনের সুপার শপ থেকে টুকটাক কেনাকাটা করে, ভ্যান থেকে সবজি কিনে উপরে এসেছে।
ফ্রিজটা পরিস্কার ই ছিল, আরেকবার ট্রেগুলো ক্লিন করে খাবার গুলো সাজিয়ে রেখেছে অথৈ।
এহসানের পাঠানো খাবার পর্যাপ্ত ছিল, বুয়াকে পেট ভরে খাইয়ে বখশিশ দিয়ে দেওয়ায় সে বিকেলে এসে তরকারি কেটেকুটে দিয়ে বলে গেছে, সে দুইবেলাই কাজ করবে, অথৈ এর সাথে কাজের হিসেব সে করবে না। অথৈ বুয়া থাকতেই রান্নাও করে ফেলতে পেরেছে।
এই ছিল অথৈ এর সারাদিনের কাজের রুটিন।
কিন্তু এত কাজ করার পরেও অথৈ কিছুটা সময় একাই বসেছিল, সময় কাটছিল না। সামনের দিনগুলোতে এই সময় কাটানোই সমস্যা হয়ে যাবে।

এহসান বের হয়ে ডাইনিংয়ে এসে পরিবর্তনটা আবার টের পেল। গ্লাস প্লেট সব নতুন নামানো হয়েছে।
তুলে রাখা সেট অথৈ দুটো করে নামিয়ে নিয়েছে।
গেস্টদের জন্য তুলে রাখা বাটিতে ডাল, ডিমের তরকারি রাখা। সাদা ভাতগুলো মনে হচ্ছে এহসানের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা সবজিও আছে দুই তিনটা আইটেম মিলিয়ে।
অথৈ প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, এসিডিটির ওষুধ দেখলাম অনেক পাতা।
এহসান বলল, হ্যা, বাইরে কন্টিনিউ খাচ্ছি না কত মাস ধরে!
আর খেতে হবে না-
দুপুরের খাবার ভালো ছিল?
অথৈ বলল, হুম, ভালো ছিল।
এহসান খেতে খেতে বলল, তুমি চমৎকার রান্না করো অথৈ।
অথৈ বলল, অনেক দিন বাইরে খেয়েছেন, এখন আপনাকে যাই খাওয়াব, সেটাই অমৃত মনে হবে!
গ্রাহ্য করলে না কথা টা?

অথৈ বলল,আমি জানি আমি ভালো রান্না করি। কিন্তু একটা সমস্যা- আজ যে সারাদিন আমি এতকিছু করলাম, তাও শেষ মুহূর্তে বসেই ছিলাম। এরপরে সারাদিন সময় কাটবে কি করে!
এহসানের হঠাৎ পুরনো কথা মনে পড়ল। সেম কথাটা ঐশিও বলেছিল, তবে অন্য ভাবে।
আমি একা একা বোর হব, এমবিএ করে ফেলি তার চাইতে!
এহসান মাথা থেকে ঐশিকে সরিয়ে বলল, তুমি গ্রাফিকস ডিজাইন শিখতে পারো, আউটসোর্সিংয়ের কাজ শিখতে পারো, জবের জন্য কোচিং করতে পারো, ল বা এমবিএ ভর্তি হতে চাইলেও হতে পারো।
রান্নার ক্লাশ চাইলেও করতে পারো, এনি থিং, চিন্তা ভাবনা করে ডিসাইড করা যাবে, কোনটা তোমার জন্য ভালো হয়।
অথৈ বলল, এই ছাড় দিয়ে এক বউ ভেগে গেছে, আবার একই কাজ করবে!
অথৈ, তুমি পিন্চ করতে ছাড়ো না সুযোগ পেলে – এহসান হেসে বলল।
অথৈ বলল, গাজরের পায়েস করেছিলাম, দেই একটু?
এটা কখন করলে?

সব রান্না বুয়া থাকতেই করেছি। এমন কিছু কঠিন তো নয়!
অথৈ ফ্রিজ খুলল। এহসান ফ্রিজের দিকে তাকিয়ে একটা প্রশান্তি অনুভব করল, একদম সাজানো, মনে হচ্ছে বিজ্ঞাপনের জন্য গুছিয়ে রাখা। অথৈ অসম্ভব গোছানো মেয়ে। এমনকি দুধের বোতলও খালি নেই, রিফিল করা, সেটাও করে রেখেছে।
বুয়া বলেছে, দুইবেলাই আসবে।
এহসান বলল, আসুক। তুমি সব কাজের জন্যই ঠিক করে নিও। স্যালারি কত চায় কথা বলে নিও। এমাউন্টে
সমস্যা নেই, তবে এদের তো কথা ঠিক থাকে না, ফিক্সড করে নিও।
আচ্ছা-
এহসান সোফার উপর থেকে দুটো ব্যাগ দিয়ে বলল, ঘরে ইউজ করার মতন দুটো কাপ্তান এনেছি আপাতত, চেইঞ্জ করে নিতে পারো ইচ্ছে করলে। শুক্রবারে আমরা শপিংয়ে যাব। লিস্ট করে রেখো কি কি লাগবে। কাজ শেষ তোমার?
অথৈ বলল, হুম, অলমোস্ট। কিচেনে একটু কাজ আছে।
ওহ, তোমাদের বাসা থেকে ফোন করেছিল কেউ?
অথৈ বলল, নাহ।
আচ্ছা। কাজ শেষ করে এসো।

অথৈ হাতের কাজ শেষ করে এহসানের রুমের ওয়াশরুমে ঢুকল। এই রুমেই এসি গ্রীজার লাগানো হয়েছে। এহসানের হয়তো অস্বস্তি লাগছে বলে অথৈকে নিয়ে এখানে থাকতে আসে নি। এই অস্বস্তি দূর করে দিতে হবে। নিজের বোনের এক্স হাজবেন্ডকে ভালোবেসে বিয়ে করার পরে অভিমান বিষয়টা আপাতত দূরে ঠেলে সব জায়গায় নিজের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে নেওয়াই বুদ্ধিমতীর কাজ হবে। সময় নিক এহসান। অথৈ এর কাছে এহসান প্রথম পুরুষ, এহসানের প্রথম নারী তো অথৈ নয়! তবে ভেঙে যাওয়া এহসানের শেষ নারী অথৈ হবে, এটুকু গুছিয়ে অথৈয়ের নিতে হবে। বারবার মনে হচ্ছে, আপু কি বোকা, এই সাজানো ঘর সংসার স্বামী সব পায়ে ঠেলে কিসের আশায় সে চলে গেল!
পানি গরমই ছিল। অথৈ একটু ফ্রেশ হয়ে এহসানের নিয়ে আসা একটা পোশাক বদলে নিলো। খোলা চুলে ওদের বর্তমান রুমে এসে দরজায় ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।

অথৈ আসার আগেই এহসান সেকেন্ড বেডে ঢুকে পড়ল। এক ব্যাগ ভর্তি করে বেলি ফুলের মালা নিয়ে এসেছে। বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে এহসান সাথে আনা স্টার লাইট দুটোর ঝুলিয়ে সুইচ চেক করে নিলো। একটা ওয়াশরুমের সুইচ বোর্ডে, আরেকটা বেডের পাশে।
লাইট অফ করে স্টার লাইট জ্বালিয়ে দরজার পাশে দাঁড়াতেই অথৈ এসে ঢুকলো দরজা ঠেলে। একটা তীব্র বেলী ফুলের সুবাস এসে নাকে লাগল। কি করেছে এহসান!
আঁধো আলো অন্ধকারে এহসান অথৈ কে কাছে টেনে নিলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এহসান অথৈকে কোলে তুলে নিলো। ভর সামলাতে অথৈ এহসানকে আঁকড়ে ধরলো।
এহসান অথৈকে বলল, বলেছিলাম না, যেটা চাও, ফিরে এসে দিচ্ছি।
অথৈ লজ্জা পেলেও অপ্রতিভ হলো না। এই সম্পর্ক তার অজানা নয়। অথৈ বলল, শুধু আমি চাই মনে হচ্ছে, তুমি চাও না?

এহসান বলল, আমি আদর চাই অথৈ, যত্ন চাই, ভালোবাসা চাই, আমি চাই তোমার পৃথিবী জুড়ে শুধু এহসান থাকবে। তুমি আমাকে ভালোবাসবে অথৈ, আমার এলোমেলো জীবনটা তুমি গুছিয়ে দেবে। আমার সব অপূর্ণতা তুমি দূর করে দেবে।
অথৈ বলল, আমি কি পারব তোমার এত চাওয়া পূরণ করতে?
এহসান বলল, আমি জানি, শুধু তুমিই পারবে অথৈ।
অথৈকে বিছানায় বসিয়ে এহসান গয়নার প্যাকেটটা বের করল। একটা চেইন বের হলো, হার্টশেপ লকেটে ই লেখা।এহসান চেইন নিয়েছে, আংটি দুটো নিলো, একটা তিন চুড়ির মধ্যে গোল্ডের বল ঘোরে, এমন ব্রেসলেট নিলো, ছোট একটা কানের দুলও নিলো, পেছনে আংটা দেওয়া, নাকফুল নিলো পছন্দ করে।
এহসান লকেট সহ চেইন পরিয়ে দিয়ে বলল, এহসানকে গলায় ঝুলিয়ে দিলাম, বুকের ভেতর রেখে দিও। হাতটা দেখি…

এহসান আংটি, ব্রেসলেট, কানের দুল, নাকফুল সব নিজের হাতে অথৈকে পরিয়ে দিলো।
কি করেছ, সব গোল্ড? এত টাকার জিনিস, বললে তো ফিনানশিয়াল ক্রাইসিস আছে। তাহলে এত কিছু এখনি কিনলে কেন?
এহসান বলল, এখানে শুধু ঘরে পরার জন্য ছোট গয়না কিনেছি। বড়গুলো শুক্রবার তোমাকে নিয়ে গিয়ে কিনব,পছন্দ হয়েছে?
অথৈ আংটি দেখতে দেখতে বলল, ভীষণ সুন্দর।
এহসান বলল, এখন বউ বউ লাগছে, আমার বউ।
অথৈ বলল, একটা মাইক ভাড়া করে চিৎকার করে বলো।
আচ্ছা কালকে মাইক নিয়ে আসব। এসে সবাইকে জানাব। তুমি বললে যখন!
অথৈ এর হাত ধরে এহসান বলল, আমাকে আজ ভালোবাসবে অথৈ?
অথৈ এহসানকে জড়িয়ে ধরল। এহসান অথৈ কে শুইয়ে দিলো ৷ তারপর জোনাকির মত ঘরে আনা স্টার লাইটগুলো জ্বলতে নিভতে শুরু করল। বেলীফুলের তীব্র সুবাসে কেমন ঘোরলাগা একটা মুহুর্ত তৈরি হলো।
এহসান ঠোঁট ডুবিয়ে চুমু খেলো অথৈ কে।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৫

এহসান আর অথৈ নিজেদের আবিষ্কার করল চির চেনা কিন্তু চির রহস্য আবৃত সেই সম্পর্কে। এহসান ডুবল, ভাসল, অথৈ জেগে উঠল! এহসানকে ভালোবাসল, আদর করে কাছে টেনে নিলো, এহসানের বুকের পশমে আশ্রয় খুজে নিলো! ঘোরলাগা সময়টা দীর্ঘ স্থায়ী হলো। অথৈ এর নিজেকে পূর্ণ মনে হলো, এহসান নিজেকে সমর্পন করতে পেরেছে, আজ থেকে ওদের মাঝে আর কোনো দূরত্ব নেই।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৭