অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪১
রুপা
বিছানায় বাবু হয়ে বসে আছে পুষ্প, এখনো আর্যর প্যান্ট আর টি-শার্ট পরনে। আর্য তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছে দিচ্ছে, পুষ্প বারণ করলেও শুনছে না। আর্য চুলগুলো মুছে দিয়ে তোয়ালে কাউচে রেখে দিল। সোফায় রাখা নাস্তার প্লেট নিয়ে এসে রমণীর সামনে রেখে তার পাশে বসে পড়ল। পুষ্প একবার নাস্তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আবার আর্যর দিকে তাকালো। মাথায় এল না, নাস্তা কে বানাল আর তারা আছে কোথায়? সরকার সাহেবই বা এখানে কীভাবে এল?
এদিকে পুষ্পকে না খেয়ে নাস্তার দিকে আর তার দিকে তাকাতে দেখে—হয়তো রমণীর ভাবনা বুঝতে পেরে—গলা খাঁকাড়ি দিয়ে আর্য বলল—
– “ফ্লাওয়ার, তোমার মতো তোমার ব্রেনও যথেষ্ট ছোট; তাই তোমার ছোট ব্রেনে এত প্রেসার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন ভালো মেয়েদের মতো নাস্তা শেষ করো।”
পুষ্প আর কিছু না বলে নাস্তা খাওয়া শুরু করে। নাস্তা খাওয়ার মাঝেই মাথায় এল, নিশ্চয়ই সরকার সাহেবও কিছু খায়নি! একবার চোখ তুলে তাকায়, আবার ভাবে—খেতে বললে যদি কিছু বলে? রমণীর দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই শোনা গেল আর্যর গলা—
– “কী হয়েছে, ফ্লাওয়ার? নাস্তা ভালো হয়নি?”
– “নাহ্, ভালো!”
মিনমিন করে উত্তর দিল সে।
– “তাহলে কী এত ভাবছ না খেয়ে?”
– “আপনি খেয়েছেন?”
বেশ অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল পুষ্প। এদিকে রমণীর মুখের কথা শুনে আর্য যেন অকারণেই খুশি হয়ে গেল! চোখ দুটো চকচক করে উঠল—তার ফ্লাওয়ার তার কথা ভাবে, সে খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করছে! নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হয় আর্য—একটা মেয়ে খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করায় তার এত খুশি লাগছে কেন? নিজের ভেতরের উচ্ছ্বাস কোনো রকম প্রকাশ না করে স্বাভাবিকভাবেই বলল—
– “নাহ্, খাইনি। আগে তুমি খেয়ে নাও, তারপর খাবো!”
মুখে কথাটা বললেও মনের কোথাও এক কোণ থেকে খুব করে আশা করে চাইল, যেন তার ফ্লাওয়ার নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। আর্যর কথা শুনে অবাক হলো—দুপুর হতে চলল, এখনো খায়নি? নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে! নাস্তার প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নাস্তা—সে এতটা খেতে পারবে না। তাই তো সে যেদিকে হাত লাগায়নি, সেদিকে দেখিয়ে দিয়ে আস্তে করে বলল—
– “এদিকে আমি হাত লাগাইনি, আপনি খেতে পারবেন?”
রমণীর কথা শুনে মন ক্ষুণ্ন হলো মানবের। সে তার ফ্লাওয়ারের হাতে খেতে চেয়েছিল, আর তার ফ্লাওয়ার তাকে যেদিকে তার ছোঁয়া নেই, সেদিকে খেতে বলছে! কোনো ব্যাপার না, আর কিছুদিন পর তার ফ্লাওয়ার নিজে তাকে একই প্লেট থেকে খাইয়ে দেবে! সে কিছু না বলে রমণী যেদিক দিয়ে নিজে খেয়েছে, সেদিক দিয়েই খাওয়া শুরু করল। সেটা দেখে পুষ্প বিস্মিত হলো—সরকার সাহেব কীরকম পাল্টে যাচ্ছে! আগে তার ছোঁয়া সহ্য করতে পারত না, এখন তার এঁটো খাবার খাচ্ছে! রমণী বেশ জড়তা নিয়ে ডাকল—
– “সরকার সাহেব?”
রমণীর মুখে নিজের এই ইউনিক নাম বেশ লাগল—কী রকম বুক জুড়িয়ে যায়! বেশ আবেশে উত্তর দিল—
– “হুমম!”
– “আপনি আমার খাওয়া কেন খাচ্ছেন?”
– “এইটা কি প্রথমবার যে আমি তোমার খাওয়া খাচ্ছি?”
আর্যর কথা শুনে পুষ্পর স্মৃতিতে ভেসে উঠল আরও একবার খাওয়ার কথা। তাই ভাবতে ভাবতে বলল—
– “নাহ্!”
আর্য একপলক ভাবুক রমণীর দিকে তাকিয়ে বলল—
– “আর ভাবতে হবে না, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। তারপর বেরোতে হবে, এখনো অনেক কাজ বাকি!”
কাজের কথা শুনে পুষ্পর ভ্রু কুঁচকে গেল—কী কাজ আছে এখানে? তারা বাড়িতে যাবে না? ফুফুমণি নিশ্চয়ই তার জন্য চিন্তা করছেন! আর্যকে জিজ্ঞেস করল—
– “কী কাজ আছে এখানে? আর আমরা বাড়িতে কখন যাবো?”
পুষ্পর কথা শুনে আর্যর খাওয়ার হাত থেমে গেল, তবে সে আবার খেতে খেতে স্বাভাবিকভাবেই বলল—
– “আমরা বাড়িতে যাবো না, ফ্লাওয়ার! আমরা দুজনে এখানেই থাকবো!”
আর্যর কথা শুনে চমকে উঠল পুষ্প! তারা এখানেই থাকবে মানে? এটা কার বাড়ি? আর এখানেই বা তারা একা কেন থাকবে? বাড়িতে সবাই নিশ্চয়ই তাদের জন্য দুশ্চিন্তা করছে! এই ভুতুড়ে বাড়িতে সে কিছুতেই থাকবে না—কীরকম সব কালো রঙের জিনিসপত্র! সব কালো! বাড়ির আশেপাশে আর কোনো বাড়ি নেই, শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল, যেন ভূতের রাজ্য! পুষ্পকে না খেয়ে ভাবতে দেখে আর্য কিছু বলবে, তার আগেই পুষ্প বলে উঠল—
– “আমি এখানে থাকবো না, আমি ফুফুমণির কাছে যাবো! আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসুন।”
পুষ্পর কথা শুনে আর্যর শান্ত মেজাজ বিগড়ে গেল, তবুও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “সম্ভব নয়!”
– “কেন সম্ভব নয়? আমাকে ফুফুমণির কাছে দিয়ে আসুন, ফুফুমণি নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন।”
– “ঠিক এই কারণেই সম্ভব না—তুমি স্বামীর চেয়ে শাশুড়িকে বেশি ভালোবাসো! আর তোমার স্বামী মোটেও ততটা ভালো মানুষ নয় যে, বউ-শাশুড়ি একে অপরকে ভালোবাসে দেখে খুশি হবে। তার চেয়ে যদি বউ-শাশুড়ি ঝগড়া করে, বউ তার বুকে এসে শাশুড়ির নামে নালিশ করে, তবে তোমার স্বামী আরও বেশি খুশি হবে!”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প আহাম্মক বনে গেল, আশ্চর্য না হয়ে পারছে না! সে নাকি শাশুড়িকে বেশি ভালোবাসে? তো বাসবে! ছোটবেলায় আব্বু-আম্মু মারা যাওয়ার পরে ফুফুমণিই প্রথম মানুষ, যে তাকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবাসা দিয়েছে, বিনিময়ে কিছু না চেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবেসেছে! অদ্ভুতভাবে রমণী চুপ করে রইল না, ফট করে বলেও ফেলল—
– “ফুফুমণিকে বেশি ভালোবাসি, আরও ভালোবাসবো! কারণ ফুফুমণি আমাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে!”
রমণীর কথা শুনে আর্যর হিংসে হচ্ছে—ভীষণ হিংসে! অন্যান্য পুরুষ নাকি মা-বউয়ের মিল দেখলে খুশি হয়, তাহলে সে কেন খুশি হতে পারছে না? বউ তার থেকে বেশি মাকে ভালোবাসছে কেন? তার বউ তার চেয়ে বেশি তার মাকে কেন ভালোবাসবে? তার সাথে থেকে তার মায়ের কথা কেন ভাববে? সে আছে মানে পুরো দুনিয়া ধ্বংস হোক, তার বউয়ের ধ্যান-জ্ঞান সব তো তার দিকে থাকার কথা! তাহলে কেন এই উতপাত? এই উৎপাতে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে! নিজের বিগড়ানো মেজাজ শান্ত করার চেষ্টা করে নিজে খেতে খেতে নাস্তা রমণীর মুখের সামনে ধরে বলল—
– “বেশি কথা না বলে চুপচাপ নাস্তা শেষ করো! আর এত ভাবার প্রয়োজন নেই, তুমি চাও বা না চাও—তোমাকে এই বাড়িতে আমার সাথেই থাকতে হবে।”
কথাটা শুনে পুষ্পর ফর্সা মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেল। সে এখানে থাকতে চায় না, বাড়িতে যেতে চায়! সে তো দুই দিন কলেজে যায়নি, এখন কলেজে যাবে কী করে? আর্য পুষ্পর কালো হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই ভাবনা—তার ফ্লাওয়ার তার সাথে থাকতে চায় না? তার সাথে থাকার কথা শুনেই মুখ কালো হয়ে গেছে! তবুও হুট করে রেগে গেল না আর্য। নিজেকে দেখে সে অবাক হয়—জীবনে কোনো সময় কি এভাবে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করেছে? মনে পড়ে না! কিন্তু এই মেয়ের জন্য সে এমন সব কাজ করছে, যা জীবনেও করেনি। ভুলেও যাতে এই মেয়েকে চোট না পৌঁছায়, তাই নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে সে—শুধু একবার নয়, বারবার নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে!
নাস্তা শেষ করে আর্য প্লেটগুলো কিচেনে রেখে রুমে এসে দেখল, পুষ্প ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজের চুল আঁচড়াচ্ছে। কিন্তু আর্য সরকারের সেটা সহ্য হলো না! সে থাকতে তার ফ্লাওয়ার কেন চুল আঁচড়াবে? সে এগিয়ে গিয়ে পুষ্পর পেছনে দাঁড়িয়ে বলল—
– “ফ্লাওয়ার, আমাকে দাও, আমি আঁচড়ে দিই!”
আর্য স্বাভাবিকভাবে বললেও রমণী অস্বাভাবিক রিঅ্যাক্ট করে উঠল! কিছুটা জোরেই বলে উঠল—
– “একদম না!”
চোখের সামনে ভেসে উঠল সেদিন সেই চুল আঁচড়ানোর দৃশ্য—তার চুল জট পাকিয়ে পাখির বাসা বানিয়ে দিয়েছিল! পরে ফুফুমণি না থাকলে নিশ্চয়ই তার চুল কেটে ফেলতে হতো! এদিকে পুষ্পর এমন রিঅ্যাক্ট করা দেখে আর্য কিছুটা ভড়কে গেল। রমণীর মুখের আতঙ্ক দেখে হয়তো বুঝতে পারল, রমণী কেন এমন রিঅ্যাক্ট করছে। তাই তো সে নরম গলায় বলল—
– “ফ্লাওয়ার, ডোন্ট স্ক্যায়ার্ড! ভয় পেও না, আমি চুল আঁচড়ানো শিখে গেছি, আর জট পাকাবো না!”
আর্যর কথায় পুষ্প বিশ্বাস করেছে বলে মনে হচ্ছে না, সে এখনো চিরুনি শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে, আর্যকে দিতে চাচ্ছে না। সেদিনও তার থেকে জোর করে চিরুনি নিয়ে আঁচড়ানোর নাম করে তার চুলের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল; আবারও যদি এরকম করে, এবার তার চুলের জট কে ছাড়িয়ে দেবে? এখানে তো ফুফুমণিও নেই! আর্য অনেক বোঝানোর পরে পুষ্প চিরুনি আর্যর হাতে দিল, তবে মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগল—যেন তার চুলগুলো অক্ষত থাকে! আর্য চিরুনি হাতে নিয়ে আলতো হাতে চুলের নিচের দিক থেকে আঁচড়াতে লাগল, যাতে আগেরবারের মতো জট না লাগে। পুষ্প অবাক হলো আর্যকে সুন্দর করে চুল আঁচড়াতে দেখে! সেদিনের এলোমেলোভাবে আঁচড়ানোর চেয়ে আজকেরটা একদম সুন্দর, নিখুঁতভাবে আঁচড়াচ্ছে সে!
পুষ্প এখন যেমন অবাক হয়েছে, তার থেকেও বেশি অবাক হতো যদি এইটা জানতে পারত—এই নিখুঁত চুল আঁচড়ানোর পেছনে আর্য সরকারের ঠিক কতটা আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল! সেদিন পুষ্পর চুল জট পাকিয়ে দেওয়ার পরে, যখন চুলের সেই জট দেখে রমণী মুখ কালো করেছিল, তখন সেই কালো মুখটা আর্যর সহ্য হয়নি! তাই তো সেদিন মেয়েদের চুল আঁচড়ানোর বিষয়ে একজন বিউটি আর্টিস্টের কাছে টানা ছয় ঘণ্টা অনলাইন ক্লাস করেছে সে—শুধু কীভাবে জট না করে সুন্দরভাবে লম্বা চুল আঁচড়ানো যায়, তা শেখার জন্য!
আর্য সুন্দর করে পুষ্পর চুল আঁচড়ে দিল। নিজেও হয়তো এতক্ষণ আল্লাহ আল্লাহ করছিল, যাতে তার ফ্লাওয়ারের চুল জট না পাকিয়ে আঁচড়ে দিতে পারে এবং আবার যেন তার ফ্লাওয়ারের মুখ কালো না হয়। সুন্দর করে চুল আঁচড়ে দেওয়ার পরে সে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। পুষ্প এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে আয়নার ভেতর আর্যর প্রতিচ্ছবি দেখছিল; যে মানুষটা এত মন দিয়ে চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত, সে চিনতেই পারছে না এই সরকার সাহেবকে! সেই সরকার সাহেব কোথায়, যে তাকে দেখলেই রেগে ধমক দিত, তার ছোঁয়া জিনিস ছুড়ে ফেলত!
হঠাৎ আর্য চোখ তুলে তাকাতেই রমণী চোখ নামিয়ে নিল—যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে! আর্য বুঝতেও পারল না যে তার ফ্লাওয়ার এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল মুগ্ধ দৃষ্টিতে; বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই তার মন আবারও পুলকিত হতো!
– “তোর ভাই ক্রাইম করেছে, আমার মা সেই ক্রাইমের শাস্তি পাকাপোক্ত করতে সাহায্য করেছে—আমার মায়ের কাজই হচ্ছে সেটা! কিন্তু মাঝখানে তুই আমার পিচ্চি বউটাকে কেন টানতে গেলি? বউটা একটু এদিক-ওদিক হলেই ভয় পেয়ে কুঁকড়ে যায়, সেখানে তুই কিডন্যাপ করতে চেয়েছিলি! ওই টুকু শরীরে তুই হাইডোজের স্লিপিং ড্রাগ ইনজেক্ট করেছিস! বল, আমার বউয়ের কষ্ট হয়নি? বল, কষ্ট হয়নি?”
কথাগুলো বলতে বলতে সামনের যোবককে হিংস্র হয়ে একের পর এক আঘাত করতে লাগলো। ইতিমধ্যে আধমরা করে ফেলেছে!আর্যর মারা এক একটা জোরালো লাথি-ঘুষির তোপে লোকটার নাক-মুখ ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আর্যর রাগ যেন তবুও শান্ত হচ্ছে না—লোকটাকে মেরে পুঁতে ফেলতে ইচ্ছে করছে! এই লোক কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল বলে আজকে তার ফ্লাওয়ারের মনে ভয় ঢুকেছে। কিছুক্ষণ আগে অনেক জিজ্ঞেস করার পরে পুষ্প আর্যকে বলেছিল, ঘুম থেকে উঠে নিজেকে এখানে অচেনা জায়গায় দেখে ভয় পেয়ে গেছিল, মনে করেছিল তাকে আবারও কেউ কিডন্যাপ করেছে! সেটা শুনে মুহূর্তেই আর্যর ভিতরের হিংস্র মানব যেন জেগে উঠেছিল।
পুষ্পকে ফিরে পাওয়ার পরে আর্য পুলিশের ভরসায় বসে ছিল না—কে বা কেন পুষ্পকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল, সেটা জানার জন্য সে নিজে আলাদা লোক লাগিয়েছিল। সেই লোকগুলো গতকাল জানতে পারে, এসবের পেছনে ছিল কুখ্যাত অপরাধী ইকরামের ভাই আকরাম। শেহনাজ সরকার এই ইকরাম নামের অপরাধীকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। সেদিন যদি শেহনাজ সরকার সেই কেসটা ছেড়ে দিতেন, তাহলে ইকরাম জেলে যেত না; কিন্তু শেহনাজ সরকার কেস ছেড়ে না দিয়ে উল্টো আরও শক্ত প্রমাণ পেশ করে শাস্তি আরও জোরালো করেছিলেন।
সেটার প্রতিশোধ নিতে ইকরামের ভাই আকরাম শেহনাজ সরকারের ওপর নজর রাখে ক্ষতি করার জন্য। সেখানে খেয়াল করে, পুষ্পকে শেহনাজ সরকারের সাথে এবং শেহনাজ সরকার অতিরিক্ত প্রটেক্টিভ পুষ্পকে নিয়ে। তাই পুষ্পকে কিডন্যাপ করে শেহনাজ সরকারেক দুর্বল করে ওনাকে দিয়েই আবারও নিজের ভাইকে জেল থেকে বের করতে চেয়েছিল আকরাম; কিন্তু কিছুই প্ল্যানমাফিক করতে পারেনি!
গতকাল আর্যর লোকেরা আকরামকে ধরে এনেছে এই ফার্মহাউসের বেসমেন্টে। সকালে আর্যর লোকেরা যখন আকরামকে মারধর করে, তখনই জানতে পারে—এই সবের সাথে নিশিও জড়িত ছিল! নিশির লোক যখন পুষ্পর ওপর নজর রাখছিল, তখন আকরাম ও শেহনাজ সরকার আর পুষ্পর ওপর নজর রাখছিল। তখন দুজনের দেখা হয়। ব্যাপারটা নিশি জানতে পারলে আকরামের সাথে দেখা করে সে নিজের রাস্তা থেকে পুষ্পকে সরানোর জন্য আকরামকে বলে। পুষ্প হচ্ছে একমাত্র শেহনাজ সরকারের দুর্বলতা—পুষ্পর জন্য শেহনাজ সরকার সবকিছু করতে পারবেন। নিশির ভাবনা ছিল, পরে লোক জানাজানি হলে আকরামকে ধরবে, সে ধরা পড়বে না। আকরামের কথা শুনে সাথে সাথে আর্যকে মেসেজ করে জানিয়ে দেয় আর্যর লোক। এবং আর্য এইটাও জানতে পারে, তাকে যেই আননোন নম্বর থেকে মেসেজ আর ছবি পাঠিয়েছিল, সেটা ও নিশিরই আরেকটা নম্বর! সকালে সেই মেসেজটা দেখেই আর্য নিশিকে আধমরা করে ছেড়েছে।
এখন এই আকরামকে মারতে এসেছে। এত মার খাওয়ার পরেও আকরামকে কিছু বলতে না দেখে আর্যর আরও হিংস্রতা আরো বেড়ে যায়! সে এবার পাশে থাকা একটা কাঠের চেয়ার তুলে সজোরে আঘাত করল আকরামের হাতে। চেয়ারটা সাথে সাথে ভেঙে টুকরো টুকরো হলো, তবে আর্য শান্ত হলো না; সেই ভাঙা কাঠ নিয়েই একের পর এক আঘাত করতে লাগল আকরামের হাতে। দেখে মনে হচ্ছে, সে পুরো উন্মাদ হয়ে গেছে! এদিকে আকরাম গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে, আর্যর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে একের পর এক জোরালো আঘাত হানে। হিংস্র কণ্ঠে গর্জে উঠল—
– “এই হারামির বাচ্চা, চুপ করে আছিস কেন? বলছিস না কেন, আমার বউয়ের দিকে কেন নজর দিয়েছিস তুই? এই হাত দিয়ে তুই ওকে ছুঁয়েছিস! কেন ছুঁয়েছিস? তোর এই হাত থাকার প্রয়োজন নেই! যেই হাত আমার বউকে ছুঁয়েছে, সেই হাত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি ব্যতীত পৃথিবীতে অন্য যে পুরুষের হাত আমার ফ্লাওয়ারকে ছুঁবে, সেই হাতের অস্তিত্ব থাকবে না এই পৃথিবীতে, আমি রাখবো না!”
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪০
ইতিমধ্যে আর্যর আঘাতে আকরামের হাত থেঁতলে গেছে। তার চিৎকারে পুরো রুম ভয়ংকর শোনাচ্ছে। আর্য এবার ভাঙা কাঠের টুকরো দিয়ে সজোরে আঘাত করলো আকরামের মাথায়। সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। সাদা টাইলসের ফ্লোরে লাল তাজা রক্তে ফ্লোর ভেসে গেল। ভয়ংকর চিৎকার রুমে প্রতিধ্বনিত হতে হতে মিলিয়ে গেল। এই মুহূর্তে আর্যকে দেখে একটুও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না, আস্ত এক উন্মাদ লাগছে! আচ্ছা, যেই রমণীর জন্য এত উন্মাদনা, সেই রমণীর সামনে আর্যর এই রূপ বেরিয়ে এলে রমনী তা মেনে নেবে তো?
