Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৭
নুসাইবা আরা নুরি

শ্রেয়সী তোহার ঘাড়ে মাথা রেখে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাদছে।কতদুর চলে এসেছে তোহারা এখোনো বুজতে পারেনি।তোহার নিজেরই খারাপ লাগছে শ্রেয়সীর জন্য। ভেবেছিলো অন্তত গাড়িতে উঠে কাওকে না কাওকে ডিরেক্ট কল করবে।কিন্তু তাও হলো না ফোন নিয়ে নিলো।এখন কি করবে।ওদিকে বাড়িতে বোধ হয় এতক্ষনে ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে।মারামারি বেধে যাবে না তো আবার।
তোহার ভাবনার মাঝেই তাদের পাশ কাটিয়ে একটা সাদা মাইক্রোবাস চলে যায়।তারপর কিছুদুর গিয়েই রাস্তায় আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে যায় পুরো রাস্তা ব্লজ করে।রাস্তাটা বেশ শুনশান।চারিদিকে মাঠ আর মাঠ মানুষের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।আর রাস্তার ধারে সারি বাধা শিশু মেহগ্নির গাছ।তোহাদের গাড়ির ড্রাইভার কিছুদুর গিয়েই জোরে ব্রেক কশে।

হটাৎ ব্রেক করার কারনে তোহা আর শ্রেয়সী সামনের সিটে ধাক্কা খেতে খেতে বেচে যায়।পাশাপাশি নজর যায় সামনে আড়ায়াড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা মাইক্রোবাসের দিকে।তোহার মনে কু ডেকে উঠে।এতক্ষন চুপ থাক্লেও এবার ড্রাইভার এর উদ্দেশ্যে বলে,
-সামনে ওই গাড়িটা ওভাবে রাস্তার মাঝে দাড় করানো কেন।কোনো বিপদ আপদ হবে না তো??
তোহার কথায় ড্রাইভার কোনো উত্তর দেয় না কিছুক্ষন।তারপর বলে,
-অনেক্ষন ধরেই দেখছি গাড়িটা আমাদের ফলো করছে তবে কেনো বুজতে পারছি না।আমার ও মনের ভিতরে বিপদের আশংকা দেখা দিচ্ছে।
ড্রাইভারের কথায় তোহা বলে,
-তাহলে গাড়ি পিছনে নেন।গাড়ি ঘুরান সময় থাকতে।
তোহার কথায় শ্রেয়সী ও তালে তাল মিলিয়ে বলে,
-হুম ভাবি ঠিক বলেছো।

কথাটা বলে শ্রেয়সী আরো তোহার গা ঘেঁষে বসে।ভয় পাচ্ছে সে।তোহা শ্রেয়সী ভয় বুজতে পেরে বলে,
-ভয়ের কিছু নেই ননদিনী।আমি আছিতো।ড্রাইভার গাড়ি ঘুরান সময় থাকতে।
তোহার কথায় ড্রাইভার গাড়ি পিছিয়ে নিয়ে ঘুরাতে যায়।তখন চোখ পড়ে সামনে আড়ায়াড়ি রাখা সাদা মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন লোক নেমে এলো।সবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো পোষাকে ঢাকা।হাতে অস্ত্র।ড্রাইভার গাড়ি ঘুরানোর আগেই কালো পোষাকে আবৃত একজন লোক পর পর দুটো গুলি করে তোহাদের গাড়ির চাকায় সাথে ব্লাস্ট হয়ে যায় চাকা।

তোহারা চমকে উঠে।ক্ষনিকের ভিতরেই লোকগুলো ছুটে গাড়ির কাছে চলে আসে।তখনই ড্রাইভার নিজের কাছে থাকা বন্দুক বের করে গুলি করতে যেতেই অপর জানলা দিয়ে একজন সোজা লোক্টার মাথা গুলি করে তোহাদের সামনেই মেরে দেয়।শ্রেয়সী এসব দেখে সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে তোহার কোলে।এদিকে তোহার গলা শুকিয়ে আসে।একজন পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের অফিসার হওয়াই সে অনেক ট্রেনিং ই করেছে তবে এখানে সবার কাছেই অস্ত্র।সে কি পারবে।তোহা আর কিছু বুজে উঠার আগেই কেও একজন দরজা খুলে ক্লোরোফর্ম মেশানো রুমাল চেপে ধরে তোহার মুখে।তোহা ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে তবে শ্রেয়সী তার গায়ের উপর থাকায় বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনি।জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে সেও।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়।নিলয় মির্জা এবার রেগে যায় আলতাফ শেখ আর সিয়ামের উপর।পুলিশ কে কল করতে যায় রেগে।তখন খাদিজা খাতুন এসে নিলয় মির্জা হাত ধরে কেদে ফেলে তারপর সত্যি টা বলে দেয়।যে ড্রাইভার ফোন ধরছে না এমনকি সিয়াম এখোনো খোজ নিয়ে ফেরেনি।পুলিশে যেনো কল না করে নিলয় মির্জা।
আলতাফ শেখ নিজেও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন চুপচাপ কিছু বলার নেই সিয়াম যখন বলেছে যে গাড়ির ড্রাইভার কে কেও রাস্তার মাঝে গুলি করে মেরে রেখে গেছের শ্রেয়সী আর তোহা গায়েব তখনই আলতাফ শেখ এর মাথায় বাজ পড়েছে।সিয়াম এখন শ্রেয়সীদের খুজ্জে।তবে সে কথা আলতাফ শেখ এখোনো বলেনি।বললে আরো ঝামেলা বাধবে।

বিয়ে বাড়ির অনেক মানুষ আলতাফ শেখ কে নানান ধরনের কথা বলে অপমান করে চলে গিয়েছে।শুধুমাত্র বর পক্ষের লোক গুলোই আছে।ইরু মাহির হাত ধরে বসে আছে।তার ও মাথায় অনেক চিন্তা শ্রেয়সী তো ফোন ঘরে পড়ে আছে।মেয়েটা কোথায় ইরু জানেনা।অনেক চিন্তা হচ্ছে।
নিলয় মির্জা খাদিজা খাতুনের কথায় পকেটে ফোন রেখে দেয়।কিছুক্ষন আগে মেহেরাজ এসেছিলো কোয়ার্টারে ফিরে যাবে তাই বিদায় নিতে।কোনো প্রকার কারোর সাথে কোনো ঝামেলা করেনি।শুধুমাত্র আলতাফ শেখ এর সামনে গিয়ে ফিশফিশ করে বলেছিলো,
-আপনাকে আমি দেখে নিবো।
তারপর আর দাড়ায়নি।নিলয় মির্জা ও ছেলেকে আটকান নি।কি বলে আটকাতেন তিনি।মুখে কিছুই ছিল না।ছেলের চলে যাওয়ায় আরো রেগে গেছেন আলতাফ শেখ এর উপর।সন্ধ্যা সাতটার দিকে নিলয় মির্জারা বাড়িতে ফিরলো।শুধু খালি বাড়িতে পড়ে রইলো ডেকোরেয়র এর কয়েকজন লোক।আর নিজেদের জালে নিজেরা পুরো পুরি ফেশে যাওয়া আলতাফ শেখ আর তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন।
মির্জা বাড়ির গেট এর সামনে গাড়ি থামার পর সকলেই ভিতরে আসে।মেহেরাজ এখোনো যায়নি।তখন বাড়ি আসার পর থেকেই রাগে ফুশছে নিজের ঘরে বসে।নাহিদা খাতুন অনেক কান্না কাটি করে ছেলেকে থামিয়ে রেখেছেন সবার বাড়ি ফেরা অব্দি।তার ও বলার কিছু নেই।ছেলেটার কপাল টাই খারাপ।একবার বিয়ে হলো তো অফিসে ডাক পড়লো তো আর একবার এমন বড় একটা চক্রান্ত।

মেহমান রা সব এক এক করে বিদায় নিয়ে রাতেই সব চলে গেলো।যেখানে নতুন বউ নেই।তাহলে বউ ভাত ও হবে না।আর এমন একটা ঝামেলা।তাই আর কেও থাকেনি।নাহিদা খাতুন ও আর কাওকে আট কান নি।
সবাই চলে গেলে রাত দশটায় একটা ল্যাগেজ নিয়ে নিচে নেমে আসে মেহেরাজ।চোখ মুখ শান্ত।মেহেরাজ কে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখে উঠে দাঁড়ায় নাহিদা খাতুন শাড়ির আচল মুখে চেপে শব্দহীন কেদে উঠে।সোফায় বসে আছে তুহিন,,মিলি,,ইভান।ফাহিম আর ইরুকে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে ফাও এখানে বসে থেকে কি করবে।হাসান সাহেব ঘুমিয়ে গেছেন অসুস্থ লাগছিলো বলে।মেহেরাজ এগিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের সামনে থামে তারপর দাদির সামনে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে শারমিন খাতুন চোখের পানি ফেলেন।
এখন কিছু বললে যদি মেহেরাজ রেগে যায় সেজন্য কিছু বলেন না।নিলয় মির্জার পায়ে হাত দিতে গেলে নিলয় মির্জা পা সরিয়ে নেন।চোখে পানি।সাথে আলতাফ শেখ এর উপরের সেই ক্ষোভ স্পষ্ট। আসার আগে তিনদিন সময় দিয়েছ।মেহেরাজের তিন দিনের কাজ পড়েছে তাই অফিসে ফিরতে হবে সেই তিনদিন ই সময় দিয়েছে যেখানে উচিত ছিলো কয়েক ঘন্টা নিলায় মির্জা ছেলের দিকে না তাকিয়ে বলে,

-সাবধানে যেয়ো।
মেহেরাজ একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ে তারপর মায়ের কাছে এগোতেই নাহিদা খাতুন মেহেরাজকে জড়িয়ে ধরে কেদে উঠে।মেহেরাজ দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।তারপর ঘড়ির টাইম দেখে নিজের থেকে মাকে ছাড়ায়।নাহিদা খাতুন কান্নারত কন্ঠে বলে,
-আজকেই চলে যেতে হবে।কাল গেলে হয় না বাবু??
-আমিতো একেবারে যাচ্ছি না আম্মু।মাত্র তিন দিনের জন্য। কাজ শেষ হলেই আসবো। কিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে তাই ডেকেছে।আর এখানকার পরিস্থিতি যা এখান কার চেয়ে সেখানে অন্তত শান্তিতে থাকবো।এখানে থাকলে রেগে কিছু একটা করে ফেলবো।
ছেলের কথায় নাহিদা খাতুন আর কিছু বললেন না।মেহেরাজ ইভান,,মিলি,,তুহিনের থেকে বিদায় নিয়ে ইভানকে এদিক টা সামলাতে বলে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।পার্কিং থেকে নিজের গাড়ি টা নিয়ে চোখের পলকেই মেন গেট থেকে গাড়িটা বের হয়ে সড়কে উঠে যায়।যা চোখে টলমলে পানি নিয়ে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন নাহিদা খাতুন।

মেহেরাজ গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দেয়।সাথে জানালার কাচ উঠিয়ে এসি চালু করে দেয়।বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর মেহেরাজ ফোন চালু করে কাওকে একটা কল দেয়।সাথে সাথেই রিসিভ হয় ওপাশ থেকে।মেহেরাজ কানে ব্লুতুথ গুজে গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলে,
-জ্ঞান ফিরেছে ওদের।এখন কি অবস্থা??
-না বস।এখোনো সেন্সলেস।আপনার কথা মতো ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন পুশ করেছে শরীরে।বারো ঘন্টা পর সেন্স আসবে।
-আচ্ছা।খেয়াল রাখো আমি এদিক টা সামলিয়ে নিয়ে এখন বের হলাম।ঘন্টা দুই এর ভিতরে পৌছে যাবো।
-আচ্ছা স্যার।
-আচ্ছা ফুয়াদ শুনো।
-জি স্যার??
ফুয়াদের কথায় ফোনের এপাশে থাকা মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তারপর বলে,
-ফ্লাট খুজেছিলে??
-জ্বি স্যার সব রেডি।আপনি আসুন আমি আপনাকে নিয়ে যাবো।
-ওকে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৬

মেহেরাজ কল কেটে দিয়ে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো।ফুয়াদ ছেলেটা বরাবর প্রচুর বিশ্বস্ত আর কাজের।এই জন্য মেহেরাজের ভিষন ভালো লাগে।বাইরে থেকে ফুয়াদকে দেখলে সরল সোজা মনে হলেও ভিতরে ভিতরে ভিষন শক্ত একটা ছেলে।ফুয়াদ কে মেহেরাজ ব্যাক্তিগত ভাবে দুই বছরের উপরে চিনে।প্রচুর বিস্বস্ত একটা ছেলে।মেহেরাজ এর বন্ধুমহল কে ফুয়াদ চিনলেও মেহেরাজের বন্ধু মহলের কেও ফুয়াদ কে চিনে না।বরাবর মেহেরাজ এর বন্ধুদের পরে সব থেকে বিশ্বস্ত মানুষ ফুয়াদ।তাদের বন্ধুত্ব উপরের মিশনে।তবে ফুয়াদ আর মেহেরাজের বন্ধুত্ব রাতের অন্ধকারে ধোয়াশায় মিশে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৮