Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১
অধরা মিনহা

আংশিক আবৃত অবস্থায় এক অচেনা ছেলের বুকে ঘুমিয়ে আছে আনতারা। সেই ছেলেটি আর কেউ না—দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা ইফরাদ রিদান চৌধুরী।
দেখতে সুদর্শন, লম্বা-চওড়া গড়ন, ফর্সা গায়ের রং। বয়স চৌত্রিশের কাছাকাছি। বর্তমান সময়ের অসংখ্য মেয়ের একমাত্র ক্রাশ। ইফরাদকে নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনার শেষ নেই। শুধু দেশেই না, দেশের বাইরেও তার সমান জনপ্রিয়তা। বিদেশ থেকে বহু সিনেমার প্রস্তাব এসেছে, আর সেখানেও সে নিয়মিত কাজ করছে। বলা যায়, দেশ-বিদেশ মিলিয়ে তার বিশাল এক ফ্যানবেজ রয়েছে।
ঘুমের মধ্যেই আনতারা একটু নড়ে ওঠে। অজান্তেই আরও শক্ত করে জাপটে ধরে ইফরাদকে। কিন্তু হঠাৎই যেন তার টনক নড়ে ওঠে। সে কাকে জড়িয়ে ধরে আছে? এত শক্তপোক্ত শরীর কার? পিটপিট করে চোখ খুলে মাথা তুলে তাকাতেই আনতারার বুক কেঁপে ওঠে। সামনে এক অচেনা পুরুষ। তার গায়ে কোনো শার্ট বা টি-শার্ট নেই। একদম উন্মুক্ত বুক। এতক্ষণ এই মানুষটিকেই জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছিল সে! মাথায় যেন বজ্রপাত হয়।

আনতারা তড়িঘড়ি করে ইফরাদকে ছেড়ে সরে যায়। উঠে বসে নিজের দিকে তাকাতেই আরও এক দফা অবাক হয়। বরং আগের চেয়েও বেশি। তার গায়ে সাদা রঙের বড় একটা শার্ট আর কালো প্লাজু। শার্টটা দেখে বুঝতে আর বাকি থাকে না, এটা নিশ্চয়ই ইফরাদের। কিন্তু তার নিজের কাপড় কোথায়? তার কালো সুতি কামিজ? তার বোরখা? হিজাব? নিকাব? দ্রুত চারপাশে মাথা ঘুরায়। চোখ থামে বেডের সামনের সামনের টেবিলটার কাছে।
দেখে সেদিকটার মেঝেতে পড়ে আছে তার কালো সুতি কামিজ। একটু দূরে ছড়িয়ে আছে বোরখা, হিজাব আর নিকাব। আনতারা এভাবে হঠাৎ ছিটকে সরে আসায় ইফরাদের ঘুম ভেঙে যায়। চোখমুখ কুঁচকে সে তাকায় সামনে। প্রথমে ঝাপসা দেখলেও, একটু স্পষ্ট করে তাকাতেই দেখে সামনে সত্যিই একটি মেয়ে বসে আছে।
ইফরাদ দ্রুত উঠে বসে। ভ্রু কুঁচকে কিছুটা জোরেই বলে,

— এই মেয়ে, কে তুমি? এখানে কি করছো?
ইফরাদের প্রশ্ন শুনে আনতারা তার দিকে তাকাতেই চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। বুকের ওপর স্পষ্ট লাল খামচির দাগ। দেখেই বোঝা যায়, দাগগুলো একেবারে নতুন। শুধু এক-দুটো না, পুরো বুক জুড়েই আঁচড়ের চিহ্ন। ইফরাদের বুকের সেই দাগ আর নিজের গায়ে ইফরাদের ঢিলেঢালা সাদা শার্ট, দুটো মিলিয়ে আনতারার বুক ধক করে ওঠে। ভয়ে যেন রক্ত হিম হয়ে যায়। মুহূর্তেই ঘামে ভিজে যায় শরীর, গলা শুকিয়ে কাঠ।
রাতে কী হয়েছে? মাথায় ভেসে ওঠে এক ভয়ংকর, জঘন্য ভাবনা। আসলে এটা শুধু ভাবনা না। দাগ আর এই শার্ট যেন সবকিছু স্পষ্ট করে দিচ্ছে। নিশ্চয়ই বড় কোনো অঘটন ঘটে গেছে! এই উপলব্ধি হতেই আনতারা জোরে কেঁদে ওঠে।
ইফরাদের উত্তর পাওয়ার বদলে আনতারার কান্না শুনে আরও ক্ষেপে যায়। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। আঙুল তুলে রাগে গর্জে ওঠে,

— এই মেয়ে, কি জিজ্ঞেস করছি আমি? কে তুমি? আমার রুমে কি করছো? আর তোমার পড়নে আমার শার্ট কেন?
কিন্তু আনতারার কানে যেন কিছুই পৌঁছায় না। সে শুধু ভয়ে কাঁদছে। তার মনে হচ্ছে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে গেছে। এত বছরের ইবাদত-বন্দেগি সব বৃথা! তার সতিত্ব, তার চরিত্র, এক মুহূর্তেই যেন শেষ হয়ে গেল। সে পরিবারকে কী জবাব দেবে? আল্লাহর কাছে কী বলবে? যে মেয়ে বুঝ হওয়ার পর থেকে কখনো কোনো বেগানা পুরুষের সামনে যায়নি, এমনকি নিজের বাবার সামনেও পর্দা করে এসেছে। সেই মেয়েই কি না বিয়ের আগেই এক অচেনা পুরুষের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে!
এই চিন্তায় আরও ভেঙে পড়ে আনতারা। হঠাৎই ইফরাদ এগিয়ে এসে তার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে। পেছন দিক থেকে চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে টেনে তোলে। ব্যথায় আনতারা ‘আহ’ করে ওঠে। চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কষ্টে মুখ তুলে তাকায় ইফরাদের দিকে। ইফরাদের চোখ রক্তলাল। একেবারে আগুনের মতো জ্বলছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, সে ভীষণ রেগে আছে। ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে ওঠে,

— এই মেয়ে, কে তুই? তোর সাহস কি করে হয় আমার রুমে ঢোকার? আর রাতে আমার নেশা করে থাকার সুযোগ নেওয়ার?
চুলের টানে আনতারার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে। গাল দুটোও চেপে ধরায় অসহ্য ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে হাড় ভেঙে যাবে। চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরা অবস্থায়, কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে আনতারা বলে,
— আ… আমি… কি… কিছু করিনি! আমি জা… জানি না কিছু।
ইফরাদ চুলের মুঠি আরও শক্ত করে চেপে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— মিথ্যে বলবি না। বল, কে পাঠিয়েছে তোকে? নাম বল!
আনতারা ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে বলে,
— সত… সত্যি বলছি! কেউ পাঠায়নি!
ইফরাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়।
— ওহ, তাহলে আমাকে দেখে লোভ সামলাতে পারিসনি? আমি নেশা করে ছিলাম, সেই সুযোগ নিয়ে আমার রুমে ঢুকে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিস, নষ্ট মেয়ে?
আনতারা মাথা নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

— না, না!
ইফরাদ আরও ক্ষেপে ওঠে।
— কি না না? তোকে ইচ্ছে করছে জানে মেরে ফেলতে!
বলেই ইফরাদ আনতারাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দেয়। আনতারা বিছানা থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায়। এবার ইফরাদ নিজের চুল খামচে ধরে। রাগে যেন তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। ধীরে ধীরে তারও মাথায় আসতে থাকে, রাতে নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু ঘটে গেছে দুজনের মধ্যে। আর যদি এই খবর মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে যায়? তাহলে তার মান-সম্মান, ক্যারিয়ার, সব শেষ! না, এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।
ইফরাদ চোখ ঘুরিয়ে মেঝেতে পড়ে কাঁদতে থাকা আনতারার দিকে তাকায়। ঠান্ডা কিন্তু হুমকিভরা কণ্ঠে বলে,

— শোনো মেয়ে, রাতে যা হয়েছে ভুলে যাও! ভুলটা তোমার! তুমি দায়ী! কাউকে কিছু বলবে না। ভুল করেও যেন মিডিয়ার কানে খবর না যায়। যদি মনে করে থাকো মিডিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে আমাকে ট্রেপে ফেলবে তাহলে শুনো তোমাকে আমি জ্যান্ত দাফন করবো। আর ইফরাদ রিদান চৌধুরী যা বলে, তাই করে।
কান্নার মাঝেও দুটো শব্দ আনতারার মাথায় ধাক্কার মতো লাগে। ‘মিডিয়া’ আর ‘ ইফরাদ রিদান চৌধুরী’।
নামটা যেন কোথাও শুনেছে সে।
আনতারা ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে, নিচু স্বরে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,

— মিডিয়ায় খবর যাবে মানে? আপনি কে? মিডিয়ার কথা আসছে কেন এখানে?
আনতারা কথা শুনতেই ইফরাদের ভ্রু কুঁচকে যায়। বিস্ময় আর বিরক্তির মিশ্র দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমি কে মানে? তুমি চিনো না আমি কে? নাটক করছো?
আনতারা আগের মতোই বলে,
— নাটক কেন করবো? আমি সত্যিই আপনাকে চিনি না।
ইফরাদ দাঁত খিচিয়ে ওঠে।
— না চিনেই রাত কাটিয়েছিস, প্রস্টিটি**?
কথাটা শুনে আনতারা আবার কেঁদে ওঠে,
— প্লিজ, আমাকে এসব বলবেন না। আমি এমন মেয়ে না।
ইফরাদ আনতারার দিকে এগিয়ে আসে।
— তুই কেমন মেয়ে, সেটা আমি বুঝে গেছি!
বলেই ইফরাদ আনতারার হাত ধরে টান দিয়ে মাটি থেকে তোলে। তারপর দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে আনতারার গলা শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
— এখন আমি যেটা বলছি, সেটাই করবি। যা হয়েছে সব ভুলে যাবি। মনে করবি, রাতে কিছুই হয়নি। যদি আমার কথা না শুনিস, তাহলে তোকে মেরে তোর লাশ এমনভাবে গুম করবো যাতে রাস্তার কুকুরও খুঁজে পাবে না ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য।
আনতারা চোখ বড় বড় করে ছটফট করতে থাকে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। কান্নায় এমনিতেই চোখমুখ লাল হয়ে ছিল, তার ওপর গলা চেপে ধরায় মুখ আরও লাল হয়ে যায়। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ বের হয়,

— উম… উমম…
আনতারা প্রাণপণে ইফরাদকে সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ইফরাদের শক্তির কাছে কিছুই করতে পারে না। মনে হয়, এই বুঝি শরীর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। চোখে পানি চলে আসে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসতেই হঠাৎ ইফরাদ গলা ছেড়ে দেয়। আনতারা চোখ বন্ধ রেখেই জোরে একটা শ্বাস নেয়, যেন নতুন করে বেঁচে উঠলো। ইফরাদ কয়েক সেকেন্ড বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে আনতারার দিকে। তারপর হঠাৎ আনতারার গায়ে থাকা শার্টের প্রথম বোতাম খুলতে হাত বাড়ায়।
আনতারা আঁতকে উঠে চোখ খুলে ফেলে। তাড়াতাড়ি নিজের বুক দুহাতে চেপে ধরে বলে,
— কি করছিলেন আপনি?
ইফরাদ বিরক্ত গলায় বলে,
— আমার শার্ট নিচ্ছি আমি! এটা আমার শার্ট।
আনতারা কাঁপা গলায় বলে,
— জানি, এটা আপনার শার্ট। আমি ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আপনার শার্ট আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
ইফরাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
— এত নাটক করছো কেন? রাতে আমার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতে তো এমন ইতস্তত বোধ হয়নি!
আনতারা অসহায় কণ্ঠে বলে,

— বিশ্বাস করেন, আমি কিছু করিনি।
ইফরাদ বিরক্তি আর রাগে আনতারাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়।
— দুমিনিট সময় দিলাম। দ্রুত আমার শার্ট এনে দাও, মেয়ে। নয়তো এখনই জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো।
আনতারা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। মাটি থেকে নিজের কামিজ তুলে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। চল্লিশ-পঞ্চাশ সেকেন্ডের মধ্যেই দরজাটা সামান্য ফাঁক করে হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতে ইফরাদের শার্ট। ইফরাদ টান দিয়ে শার্টটা নিয়ে নেয়। সঙ্গে সঙ্গেই আনতারা দরজা বন্ধ করে দেয়। ইফরাদ শার্ট হাতে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজের বুকের দিকে তাকায়। পুরো বুক জুড়ে লাল খামচির দাগ। জায়গাগুলো ফুলে আছে। দৃশ্যটা দেখে তার রাগ আরও বেড়ে যায়। সামনে মুভির শুটিং আছে, এ অবস্থায় কীভাবে করবে? সে দ্রুত শার্টটা ঝাড়া দিয়ে গায়ে জড়ায় এবং বোতাম লাগাতে থাকে।
এদিকে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হয় আনতারা। পরনে তার কালো সালোয়ার-কামিজ। বেরিয়েই মেঝে থেকে ওড়না তুলে গায়ে জরিয়ে মাথায় দেয়। তা দেখে ইফরাদ তাচ্ছিল্যের সুরে বিরবির করে বলে,

— রাত হলে ম্যাডাম সানি লিওন, আর দিন হলেই আলেম হয়ে যান!
ইফরাদ দ্রুত শার্ট পরে নেয়। তারপর বিছানা থেকে নিজের ফোন আর মানিব্যাগ তুলে নেয়। সোফা থেকে কোটটা হাতে নিয়ে আনতারার দিকে তাকায়। শক্ত চোখে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলে,
— তোমার আর আমার কাহিনি এখানেই শেষ। এই কাহিনী এখানেই পুঁতে ফেলো। জীবনের আর কোনো মোড়ে যেন তোমার সাথে দেখা না হয়। হলে বাকিটা বুঝে নাও, কি করবো।
ভয়ে আনতারা নিজের কামিজ খামচে ধরে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ইফরাদ আর একবারও আনতারার দিকে না তাকিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই ইফরাদ থমকে যায়। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একগাদা মিডিয়ার লোক। সবার হাতে ক্যামেরা আর মাইক। মুহূর্তেই ইফরাদের মুখের ভাব বদলে যায়। বিস্মিত চোখে একটু পেছনে সরে দাঁড়ায়। মিডিয়ার লোকজন একসাথে রুমে ঢুকে পড়ে। তাদের দেখে আনতারার বুক আবার কেঁপে ওঠে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি করে আনতারা ওরনার টেনে মুখটা ঢেকে ফেলে।
সাংবাদিকরা একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ইফরাদের দিকে,

— স্যার, এই মেয়েটি কে? সে কি আপনার গার্লফ্রেন্ড?
— আপনারা কি লিভ-ইনে আছেন?
— আপনারা কি এভাবেই বিভিন্ন হোটেলে যাতায়াত করেন? নাকি এই মেয়ে একদিনের সঙ্গী?
— স্যার, আপনার সাথে এই মেয়ের কি সম্পর্ক?
এতগুলো প্রশ্নে ইফরাদ থতমত খেয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারে না। চোখ ঘুরিয়ে একবার আনতারার দিকে তাকায়। আনতারা ভয়ে কাঁপছে, চোখে পানি টলমল করছে। এবার কয়েকজন সাংবাদিক আনতারার দিকেও এগিয়ে যায়। মাইক আনতারার মুখের সামনে ধরে প্রশ্ন করে,
— আপনার সাথে বাংলাদেশের সুপারস্টার ইফরাদ রিদান চৌধুরীর কি সম্পর্ক?
— আপনি কাঁদছেন কেন?
— আপনাকে কি উনি ফোর্স করে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফরাদ চিৎকার করে ওঠে,

— হেই ইউ! মুখ সামলে কথা বলো! নয়তো মুখ ভেঙে ফেলবো!
ঠিক তখনি প্রায় দশ-বারো জন গার্ড নিয়ে এক যুবক দ্রুত রুমে ঢুকে পড়ে। মিডিয়ার লোকদের ধাক্কা দিয়ে সরাতে সরাতে বলে,
— এই, সবাই বের হন! বের হন!
তারপর ইফরাদের কাছে গিয়ে বলে,
— স্যার, চলেন। নিচে গাড়ি রেডি আছে।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— সাফিন, সাথে ওই মেয়েটাকেও সেফ এক্সিট করাও। নয়তো মিডিয়ার প্রশ্নে ঘাবড়ে মুখ খুলে ফেলতে পারে। আমি গার্ডদের নিয়ে বের হচ্ছি।
কথা শেষ করেই ইফরাদ গার্ডদের সাহায্যে সাংবাদিকদের সরিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। এদিকে আনতারা ভয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে, কিন্তু কিছু বলছে না। সাংবাদিকরা এখনও নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে যাচ্ছে।
সাফিন আনতারার পাশে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার লোকদের সরাতে সরাতে বলে,
— ম্যাম, চলেন আমার সাথে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।
আনতারা চুপচাপ মাথা নাড়ে। সাফিনের সাহায্যে আনতারা ভিড় ঠেলে বাইরে বের হয়। ক্লাবের বাইরে এসে সাফিন দ্রুত একটা গাড়ি ডেকে আনে।
আনতারাকে গাড়িতে বসিয়ে বলে,
— আপনি দ্রুত বাড়ি চলে যান। আর স্যারের ব্যাপারে মুখ খুলবেন না।
বলেই সাফিন চলে যেতে উদ্যত হলে আনতারা ডেকে ওঠে,

— ভাইয়া?
সাফিন ফিরে তাকায়।
— জি?
আনতারা নিচু স্বরে বলে,
— আমার কাছে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার টাকা নেই।
সাফিন আর কিছু না বলে দ্রুত পকেট থেকে এক হাজার টাকা বের করে ড্রাইভারের হাতে দেয়।
— ম্যাম যেখানে বলবে, তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— ধন্যবাদ, ভাইয়া।
ঠিক তখনি সাফিন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, কিছু মিডিয়ার লোক তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
সাফিন তাড়াতাড়ি বলে,
— দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দাও।

ড্রাইভার কথামতো গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাইভার ঠিকানা জানতে চায়। আনতারা ঠিকানাটা বলে দেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামে একটা পুরনো কিন্তু ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। গেটের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা : ‘শেখ নিবাস’। আনতারা গাড়ি থেকে নেমে মাথায় ওড়না ঠিক করে গেট খুলে ভেতরে ঢোকে। বাড়ির দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকেই আনতারা থমকে যায়।
লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে আছেন আনতারার বাবা আজাদ শেখ, সৎ মা রাবেয়া মল্লিকা আর ছোট বোন আনাবি। সামনে বড় টিভিতে চলছে নিউজ। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ইফরাদের হোটেলের ছবি। দেখা যাচ্ছে, আনতারা দাঁড়িয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে, চারপাশে মিডিয়ার ভিড়। এক মুহূর্তেই আনতারা বুঝে যায়, সবাই সব দেখে ফেলেছে। শুধু তার পরিবার না, হয়তো পুরো দেশই জেনে গেছে।
আনতারাকে দেখেই রাবেয়া মল্লিকা তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠেন,
— এসেছে নিলজ্জ বে*টা! বে*গিরি করে পুরো দুনিয়ার সামনে ইজ্জত খেয়ে এখন এসেছে!
বলেই এগিয়ে এসে আনতারার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ভেতরে আনে এবং মাটিতে ছুড়ে ফেলে।
রাবেয়া আবার বলেন,

— বাসায় পর্দা করে, বাইরে বুঝি এমন বে*গিরি করে ঘুরে বেড়াস?
আনতারা কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ায়। বলে,
— না আম্মা, বিশ্বাস করেন আমি কিছু করিনি।
রাবেয়া বিদ্রুপ করে বলেন,
— তোকে আর বিশ্বাস?
তারপর আজাদ শেখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— দেখেছো তোমার আদরের মেয়ে কি করেছে? এখনো চুপ থাকবে? খুব তো গর্ব ছিল মেয়েকে নিয়ে! তোমার মেয়ে পর্দা করে! ভালো! তা এই ভালোটা কোথায় গেল?
আনতারা আর কিছু না ভেবে বাবার কাছে ছুটে যায়। আজাদ শেখের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আব্বা, আপনি বিশ্বাস করেন! আমি সত্যিই কিছু করিনি! আমি জানি না আমি ওই লোকের রুমে কিভাবে গেলাম! আমি তো আনাবির সাথে ছিলাম!
তারপর সে আনাবির কাছে যায়। আনাবির হাত ধরে বলে,

— এই আনু, বলো না? আমি তো তোমার সাথেই ছিলাম। তুমিই তো জোর করে ক্লাবের ওই পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিলে! আমি না করেছিলাম, তুমি রাগ করেছিলে! বলেছিলে এটা তোমার লাস্ট ব্যাচেলর পার্টি! তারপর বিয়ে করে চলে যাবে! সেজন্যই তো গিয়েছিলাম! নয়তো তুমি তো জানো, আমি এসব জায়গায় কখনো যাইনি, পছন্দও করি না!
আনাবি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
— আপি, তোমার দোষ আমার উপর চাপাচ্ছো কেন? এখন পাপা আমাকে বকবে! আমি তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম, এটা সত্যি। কিন্তু পার্টির মাঝে রাহুল ডাকলে আমি তার কাছে চলে যাই। পরে এসে শুনি তোমার নাকি শরীর খারাপ লাগছিল, তাই বাসায় চলে এসেছো।
আনতারা হতভম্ব হয়ে বলে,
— না, আমার তো এমন কিছু মনে নেই। সত্যি বলছি, রাতের কিছুই আমার মনে নেই।
আনতারা আবার বাবার কাছে গিয়ে হাত ধরে বলে,
— আব্বা, সত্যি আমি ওই লোকের রুমে কিভাবে গেছি, কিছুই মনে নেই।
কথা শেষ হতেই ঠাস করে একটা চড় পড়ে আনতারার গালে। চড়টা মেরেছেন আজাদ শেখ। আনতারা গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে।
আজাদ শেখ কঠোর কণ্ঠে বলেন,

— তুমি আমাকে আব্বা ডাকবে না। তুমি আমার মেয়ে না। তুমি আমার সব সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছো! তোমাকে নিয়ে আমি গর্ব করতাম। কিন্তু আজ তুমি যা করলে!
আনতারা আবার বাবার হাত ধরতে গেলে তিনি সরে যান। আনতারা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আব্বা, আমি এমন না! আপনি তো আমাকে চেনেন! আমি কখনো কোনো পুরুষের সামনে যাইনি! সবসময় পর্দা করে চলেছি!
রাবেয়া মুখ বাঁকিয়ে বলেন,
— সেটাই তো! আমাদের সামনে পর্দা করিস আর আড়ালে পুরুষদের সাথে রাত কাটাস! বল তো, এই ইফরাদ রিদান চৌধুরী কত নম্বর? তার আগে কয়টা ছেলেকে ঘুরিয়েছিস? আর এই ছেলের সাথে কতবার হোটেলে গেছিস?
আনতারা অসহায় কণ্ঠে বলে,
— আম্মা, এই লোককে তো আমি কখনো দেখিইনি! আজই প্রথম দেখেছি!
রাবেয়া হেসে বলেন,

— না দেখেই রাত কাটিয়ে ফেলিস! বাহ, কি চিজ তুই!
আজাদ শেখ গম্ভীর, কঠোর কণ্ঠে বলেন,
— আফসোস! তোমার মতো মেয়ের জন্য তোমার মা জীবন দিয়ে দিয়েছে! তোমাকে জন্ম দিয়েছে! সেদিন যদি তুমি মরে যেতে, তাহলে আজ আমাকে এত অপমানিত হতে হতো না। তুমি কেন জন্মের সময় মরে গেলে না? কেন? আজ এই দিন দেখানোর জন্য বেঁচে ছিলে?
কথাগুলো শুনে আনতারা স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসতো, সেই মানুষ আজ তার মৃত্যুকামনা করছে। এরই মধ্যে আজাদ আনতারার হাত শক্ত করে ধরে বলেন,
— তোমাকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এই বাড়িতে তোমার আর কোনো ঠাঁই নেই।
বলেই আনতারাকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যান। পেছনে রাবেয়া আর আনাবিও বেরিয়ে আসে। গেটের বাইরে এনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন আনতারাকে। আনতারা ছিটকে পড়ে যায় মাটিতে।
আজাদ শেখ কড়া গলায় বলেন,

— কোনোদিনও এই বাড়ির আশেপাশে যেন না দেখি তোমাকে! চলে যাও! আবার যদি আসার চেষ্টা করো, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবে!
কথা শেষ করে তিনি ভেতরে চলে যান। রাবেয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— ঠিক হয়েছে ন*ষ্ট মেয়ে মানুষ! কত বড় সাহস হলে পুরুষ নিয়ে হোটেলে রাত কাটায়! তার ওপর আবার এত জনপ্রিয় অভিনেতার সাথে!

বলেই আনাবিকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়। গেইট টা বন্ধ হয়ে যায় সাথে বাড়ির দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। আনতারা কিছুক্ষণ মাটিতেই বসে থাকে। তার কানে বারবার বাজতে থাকে বাবার কথা : ‘তুমি কেন জন্মের সময় মরে গেলে না?’ ধীরে ধীরে আনতারা উঠে বসে। তারপর দাঁড়ায়। চোখ ভেজা। বুকটা একদম ফাঁকা। একবার তাকায় নিজের বাড়িটার দিকে। যেখানে ২২ বছর কাটিয়েছে।
আজ সেই বাড়িতেই তার কোনো জায়গা নেই। ফিরে এলে বাবার মরা মুখ দেখতে হবে। তার ঠোঁটে ফিকে, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। মাথায় কাপড় টেনে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে, গন্তব্যহীন পথে। কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? সে জানে না। তার তো কেউ নেই। মা মারা যাওয়ার পর বাবার ছায়াটুকুও আজ সরে গেল।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২