Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৫৬

এই অবেলায় পর্ব ৫৬

এই অবেলায় পর্ব ৫৬
সুমনা সাথী

বিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে। সোনাঝরা আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। গাড়ি থামাল কায়েফ। গাড়ির কাচ নামাতেই হালকা ঠাণ্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল ঊর্মির মুখ। পরনে একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতি শাড়ি। চুলে সাধারণ খোপ। কায়েফ গাড়ি থেকে নেমে এসে দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,
“আসুন।”
ঊর্মি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কায়েফের শক্ত হাতের ওপর নিজের নরম হাতের তালুটা রাখল। কায়েফ তাকে নিয়ে এল একটা শাড়ির দোকানে। ভেতরে পা রাখতেই ঝকঝকে আলো আর থরে থরে সাজানো পোশাকের বাহার দেখে ঊর্মি একটু যেন গুটিয়ে গেল। কায়েফ তা বেশ টের পেল। সে সেলসম্যানকে ডেকে একপাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“উনাকে ভালো কিছু শাড়ি দেখান। বিশেষ করে গাঢ় রঙের শাড়ি।”
কাচের টেবিলে একে একে একে বিছিয়ে দেওয়া হতে লাগল সুন্দর সুন্দর সব শাড়ি। একটার থেকে যেন অন্যটা সুন্দর। প্রতিটি শাড়ির মূল্যমান আঁচ করতেই ঊর্মির চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সে কায়েফের কাছাকাছি সরে এসে একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“এসব কী করছেন? আমার এত শাড়ির একদম প্রয়োজন নেই। সাধারণ শাড়ি হলেই হবে!”
কায়েফ পকেটে হাত গুঁজে হালকা হেসে বলল, “ওগুলো আপনাকে তেমন মানায় না। আমি আমার বউকে নিজের পছন্দে সাজাব। আপনার কোনো সমস্যা আছে?”
কথাটা বলেই কায়েফ নিজেই শাড়ি দেখতে লাগল। হঠাৎই তার নজর আটকে গেল একটা কালচে-নীল রঙের বেনারসির ওপর। শাড়িটার পুরোটায় রূপালী সুতোর সূক্ষ্ম কাজ। কায়েফ শাড়িটা হাতে নিয়ে ঊর্মির গায়ের কাছে ধরে দেখল। বললো,

“এটা ট্রাই করে দেখুন তো।”
“এখানে বদলে আসব? কিন্তু…!”
“ট্রায়াল রুম ওই যে সামনে। যান।”
ঊর্মি বাধ্য মেয়ের মতো শাড়িটা নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকল। বেশ কিছুটা সময় পার হওয়ার পর যখন সে আস্তে করে কাঠের দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল, কায়েফ তখন অন্য একটা ড্রেস দেখছিল। খসখস শব্দে ঘুরে তাকাতেই থমকে গেল সে। কালচে-নীল শাড়িতে ঊর্মিকে মনে হচ্ছে যেন এক পশলা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পূর্ণিমার চাঁদ। স্নিগ্ধ, অপরূপা। এলোমেলো চুলগুলো কাঁধের একপাশে পড়ে আছে। লজ্জায় মেয়েটার চোখ দুটো মেঝের দিকে নিবদ্ধ। কায়েফ ধীর পায়ে এগোলো ঊর্মির দিকে। ঊর্মি দ্বিধাগ্রস্ত গলায় শুধাল,
“খারাপ লাগছে?”
কায়েফ প্রত্যত্তুর করলোনা। আলতো করে হাত বাড়িয়ে ঊর্মির আঁচলটা সুন্দর করে টেনে কাঁধে বসিয়ে দিয়ে বললো,

“অপূর্ব লাগছে।”
কায়েফের চোখের গভীর আর গাঢ় দৃষ্টিতে আড়ষ্টতায় নুনিয়ে গেল মেয়েটা। শপিং শেষ করে শপ থেকে বের হওয়ার মুখেই ঘটনাটা ঘটল। কায়েফের হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ। অন্য হাতে সে খুব যত্ন করে ঊর্মির হাতটা আগলে রেখেছে। ঊর্মি অবাক হয়ে দেখছে ছেলেটাকে। সবকিছুতে কতটা গোছানো সে। তারা পার্কিং জোনের দিকে এগোতেই কায়েফ ঘড়ির দিকে একঝলক তাকিয়ে বলল,
“সন্ধ্যা তো হয়েই এসেছে। চলুন, হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।”

ঊর্মি মুখে কিছু বলল না, শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল। শপিং মলের ঠিক সামনেই গড়ে ওঠা ক্যাফেটার দিকে পা বাড়াল দুজন। হাঁটতে হাঁটতেই আচমকা কায়েফের চোখ আটকে গেল ক্যাফের এক কোণে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আনায়া! আনায়ার ডান হাতে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট, আর তা ঠোঁটে ছোঁয়াতেই মুহূর্তে চমকে উঠল কায়েফ। এতদিন সে যে আনায়াকে দেখে এসেছে আর তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটার মধ্যে যেন যোজন যোজন ফারাক! তার পরনে ওয়েস্টার্ন জিন্স আর শার্ট, চুলের বিন্যাস ও সাজপোশাকও পুরোপুরি আলাদা। চোখেমুখে এতদিন ধরে দেখে আসা সেই স্নিগ্ধতা বা নম্রতার ছিটেফোঁটাও নেই, বরং সেখানে জমে আছে একধরনের চটুল ঔদ্ধত্য। আরও দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে এসে তার কাছে থামতেই সে কৃত্রিম হেসে তাদের সঙ্গে কথা বলল। তারপর হাতের আধপোড়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পা বাড়াল ক্যাফের ভেতরে। কায়েফকে এভাবে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঊর্মি বেশ মৃদু কণ্ঠে শুধাল,

“কী হলো? ভেতরে যাবেন না? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
কায়েফ এক চিলতে শুকনো হেসে মাথা নেড়ে বোঝাল, না। কোনো সমস্যা নেই। অতঃপর দুজন একই ক্যাফেতে প্রবেশ করল। ভেতরে তেমন একটা কোলাহল বা ভিড় নেই। মাত্র আটটা টেবিলের একটায় গিয়ে বসেছে আনায়ারা, আর অন্য টেবিলে এক জোড়া দম্পতি তাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত। কায়েফ ঊর্মিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখাচোখি হয়ে গেল আনায়ার সাথে। কায়েফের ধারণায় ছিল, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে হয়তো মেয়েটি কিছুটা বিব্রত বোধ করবে। কিন্তু আনায়ার চোখেমুখে তেমন কোনো সংকোচ দেখা গেল না। বরং কায়েফকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একধরনের বাঁকা, তির্যক হাসি। ঊর্মি ও আনায়াকে দেখে বেশ অবাক হলো। এতদিন তার ভেতরে একপ্রকার প্রচ্ছন্ন ধারণা ছিল যে আনায়াই হয়তো কায়েফের মনের মানুষ বা গার্লফ্রেন্ড। তাই মনে মনে এক অপরাধবোধের অপরাধী হয়ে থাকত সে। কিন্তু আজ আনায়ার এমন খোলামেলা সাজপোশাক আর চালচলন দেখে সে ভেতরে ভেতরে চমত্কৃত হলো। সে তো মেয়েটিকে ওড়না জড়িয়ে, মার্জিত পোশাকে গুরুজনদের সামনে অগাধ বিনীত আচরণ করতেই দেখে এসেছে!

“আসুন, এখানে বসবেন।”
কায়েফের নিচু গলার ডাকে ঊর্মির চিন্তা ভাঙল। সে মাথা নেড়ে ধীর পায়ে গিয়ে কায়েফের মুখোমুখি একটা টেবিলে বসল। কায়েফ ওয়েটারকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি বসুন। আমি ওয়াশরুম থেকে একটু আসছি।”
ঊর্মি সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। কায়েফ দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যাওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আনায়া এসে দাঁড়াল ঊর্মির একদম গা-ঘেঁষে। কৃত্রিম এক হাসি মুখে টেনে বলল,
“হেই! তোমার নামটা যেন কী?”
ঊর্মি চোখ তুলে আলতো স্বরে বলল, “ঊর্মি। আপনি আনায়া আপু, তাই না?”
“হ্যাঁ। বসতে পারি?”
ঊর্মি বিনীত হেসে বলল, “জী, অবশ্যই।”
আনায়ার সঙ্গে তার এক পুরুষ বন্ধুও এগিয়ে এল। ছেলেটি আড়চোখে ঊর্মিকে এক নজর দেখে বেশ ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল,

“এই মেয়েটার জন্য ওই ছেলেটা তোকে রিজেক্ট করল?”
আনায়া অত্যন্ত বিরক্তিকর মুখে বলল, “ও আমাকে রিজেক্ট করতে যাবে কেন? আমরা দুজনেই তো দুজনকে পছন্দ করতাম। এই মালটা মাঝখান থেকে টপকে সব ঝামেলা পাকালো! নয়তো আজ আমি আর কায়েফ একসাথে সংসার করতাম।”
কথা শেষ হতে হতেই ওয়েটার ট্রে-তে করে খাবার নিয়ে এল। ঊর্মি অপমান আর লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে। আনায়া আবার খোঁচা মেরে বলে উঠল,
“তোমার নিজের প্রতি রাগ হয় না? এভাবে একটা ছেলের জীবন বরবাদ করে দিলে! আর এখন আবার তার ঘাড়ে চেপে বহাল তবিয়তে আছ! অবশ্য তোমাদের মতো মেয়েদের তো এটাই স্বভাব। গেঁও, অশিক্ষিত আর সুযোগসন্ধানী! ইচ্ছা করে কায়েফকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে এখন খুব সুখে দিন কাটাচ্ছ, তাই না?”

ঊর্মির জোড়া চোখে মুহূর্তে নোনা জল টলমল করে উঠল। গলাটা আতঙ্কে বুজে আসছে। প্রত্যুত্তরে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না সে। আনায়ার সাথে আসা ছেলেটি চড়া গলায় ধমকে উঠল,
“কী হলো, কথা বলছ না কেন? বোবা নাকি তুমি? খাবার ও খাচ্ছ না? চামচ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস নেই বুঝি?”
কথাটা বলেই ছেলেটা বিকট শব্দে হেসে উঠলো। তার সঙ্গে যোগ দিল আনায়াও।
“ও পরপুরুষের সাথে কথা বলে না।”
আচমকা পেছন থেকে ভেসে আসা কায়েফের শীতল গম্ভীর কণ্ঠে চমকে উঠল সবাই। একমুহুর্তে আনায়ার মুখের মেকি হাসিটা উবে গিয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ঝটপট বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সামলে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,
“কায়েফ! কেমন আছেন? বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে?”

কায়েফ মৃদু হেসে উত্তর দিল, “আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো। তা, আপনারা বোধহয় ঊর্মির সাথে কিছু বলছিলেন? ঊর্মি, উনারা কী বলছিলেন আপনাকে?”
ঊর্মি আঁতকে উঠে কায়েফের দিকে তাকাল। জলভরা চোখে ভয় স্পষ্ট। এখনি বুঝি বাঁধ ভাঙা কান্না নেমে আসবে তার গালে। কায়েফ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শান্ত ভঙ্গিতে ঊর্মির ঠিক পাশের চেয়ারটায় এসে বসল। তারপর আনায়াদের দিকে চেয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
“আসলে ও এসব আধুনিক কায়দাকানুনে অভ্যস্ত নয়। তবে সমস্যা নেই। আমি তো পারি।”
কায়েফ নিজের হাতে চামচ তুলে নিয়ে কিছুটা পাস্তা ঊর্মির ঠোঁটের সামনে ধরল। ঝাপসা চোখে বিস্ময় নিয়ে অপলক চেয়ে রইল ঊর্মি। অতঃপর কায়েফ আনায়ার পানে সোজা তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আপনারা চাইলে বসতে পারেন। আমি কি আপনাদের জন্য কিছু অর্ডার করব?”
আনায়া কোনোমতে নিজের অস্বস্তি ঢাকা দিতে কাঠখোট্টা গলায় বলল,
“নো থ্যাংকস!”

কথাটা বলেই আনায়া আর তার টেবিলে ফিরল না। দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। কায়েফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আনায়ার প্রতি তার মনে এতদিন দূর সম্পর্কের যতটুকু সৌজন্যবোধ বা সম্মান অবশিষ্ট ছিল, এক মুহূর্তেই তা তীব্র ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় রূপ নিল। মানুষ যে কেবল বাইরের কৃত্রিম রূপ আর ভণ্ডামির আড়ালে আসল চরিত্রটা লুকিয়ে রাখে, তার বড় জলজ্যান্ত প্রমাণ পেয়ে গেল সে। কিন্তু আনায়ারা চলে গেলেও ঊর্মির থমথমে বিষণ্ণ মুখটা আর স্বাভাবিক হলো না। পুরোনো ক্ষতটা যেন আবার নতুন করে দগদগে হয়ে উঠে বসেছে তার হৃদয়ে।

“পাপ্পা, দেখো আমি ড্রয়িং করেছি!”
বেশ উৎসাহিত ভঙ্গিতে নিজের প্রিয় ড্রয়িং খাতাটা দুই হাতে উঁচিয়ে দিব্যের সামনে এনে দাঁড়াল দিয়া। দিব্য তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসা। পাশে বসে শান্তমনে শাড়ির ভাঁজ করছে নবনী। দিব্য বানানো অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“ওয়াও! কত সুন্দর আর্ট!”
দিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভার করে নিরাশ গলায় বলল, “উফ, পাপ্পা! তুমি তো এখনো খাতাটা খুলে দেখোইনি!”
দিব্য মৃদু হেসে ফেলল। দিয়া বাধ্য মেয়ের মতো খাতাটা খুলে একটা নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা দিব্যের চোখের সামনে তুলে ধরল। দিব্য মনোযোগ দেওয়ার ভান করে বলল,
“এখানে কী কী এঁকেছ শুনি?”
দিয়া ছোট্ট আঙুল ছুঁইয়ে ব্যাখ্যা দিল, “এটা পাপ্পা, এটা মাম্মা, আর এটা দিয়া! আর এই যে পুচকেটা… এটা বেবি!”
নবনী ততক্ষণে আগ্রহ নিয়ে পেছনের দিকে ফিরে তাকাল। দিয়া ততক্ষণে খিলখিল করে হাসছে। দিব্য মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,

“সত্যিই ভীষণ সুন্দর হয়েছে! দিয়া তো সব সময় বেস্ট!”
“ইয়াআআ!”
দিয়া বেশ আনন্দ পেয়ে হেসে উঠল। নবনী একপাশে বসে একটু অনুযোগের সুরে বলল,
“আমাকে দেখালে না যে? পাপ্পাকেই বেশি ভালোবাসা হচ্ছে, তাই না?”
দিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “মাম্মা, তুমি দেখোনি? তোমার কি চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছে নাকি? এই নাও, ভালো করে দেখো!”
নবনী হেসে মেয়ের হাত থেকে খাতাটা নিল। কিছুক্ষণ অপলক সেদিকে চেয়ে থেকে মিষ্টি হেঁসে বলল,
“খুব খুব সুন্দর হয়েছে সোনা!”
“থ্যাঙ্ক ইউ মাম্মা!”
এক গাল হেসে কথাটা বলেই দিয়া যেভাবে ঝড়ের বেগে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।নবনী আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল। তবে তার মুখের অভিব্যক্তি পার করে দিল মনের ভেতর জমে থাকা মেঘ। দিব্য খেয়াল করল তার মুখটা বেশ ভার হয়ে আছে। কাছে এসে হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“তোমার আবার কী হলো? মুখে এত মেঘ কেন?”
নবনী কোনো জবাব দিল না, চুপচাপ হাত চালিয়ে শাড়ি ভাঁজ করতে লাগল। দিব্য আর কথা না বাড়িয়ে তাকে আলতো করে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। তারপর কৃত্রিম যন্ত্রণা ফুটিয়ে চোখমুখ কুঁচকে বলল,
“উফ! মনে হচ্ছে আজ আমার পা-টাই ভেঙে যাবে!”
নবনী অবাক হয়ে চাইল, “কেন?”
“আসলে মনে হচ্ছে খুব ভারী কোনো বস্তু কোলে তুলে নিয়েছি!”
কথাটা শোনা মাত্রই নবনী চোখ দুটো গোল গোল করে তাকাল। ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
“আপনি আমাকে ভারী বললেন? আপনার কি আমাকে মোটা মনে হচ্ছে?”
“না, মানে… আমি তো আসলে ওভাবে বলতে চাইনি…!”
“তাহলে কী বলেছেন?”

নবনী চেয়ে রইল। রাগে তার নাকের ডগা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। পাতলা ঠোঁট জোড়াও যেন থরথর করে কাঁপছে। মাতৃত্বের এই বিশেষ সময়টায় শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে সত্যি, তবে এতে তার সৌন্দর্য কমেনি। রূপ যেন দ্বিগুণ উপচে পড়ছে। দিব্য অপলক চোখে স্ত্রীর সেই লালচে রূপের দিকে চেয়ে রইল। হালকা হেসে বলল,
“এত রেগে আছ কেন? আমি তো আজ অফিস থেকে কত তাড়াতাড়ি চলে এলাম!”
নবনী কিছুক্ষণ নীরব থেকে অভিমানী গলায় বলল, “দিয়াকে আপনি কী বলেছেন? ও আজকাল আমার কাছে আসতেই চায় না! আমি আগ বাড়িয়ে কথা বললে উত্তর দেয় ঠিকই, কিন্তু নিজে থেকে তো তেমন এসে গল্প করে না…!”
দিব্য আশ্বস্ত করে বলল, “তুমি অকারণেই এত বেশি চিন্তা করো। বারবার দিয়াকে নিয়ে এত ভয় পাও কেন বল তো? তুমি ওর মা! ওকে বকার বা শাসন করার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে। এটা নিয়ে এত ভাবার কী আছে?”
নবনী নিচু গলায় বলল, “আমি চাই না, কেউ…!”

কথা শেষ হওয়ার আগেই দিব্য নবনীর ঠোঁটে নিজের হাতের তর্জনী রেখে থামিয়ে দিল,
“আমি বাইরের কোনো মানুষের পরোয়া করি না, বুঝতে পেরেছ? আজকের পর থেকে এসব ফালতু বিষয় নিয়ে আর একদম ভাববে না। এখন বলো, কিছু খাবে? নিয়ে আসব?”
নবনী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। হালকা হেসে বলল, “থাক। চলুন বসার ঘরে যাই। সবার সাথে গিয়ে নাস্তা করবেন। আর জানেন, ঊর্মি মেয়েটা কিন্তু অসম্ভব সুন্দর রান্না করে! তবে কেমন যেন সব সময় চুপসে থাকে। আমার মনে হয় ও খুব ভয় পায়।”
দিব্য নিশ্বাস ফেলে বলল, “স্বাভাবিক। নতুন পরিবেশ তো, কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমি কায়াফকে দেখে সত্যিই অবাক হই। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা এত বেশি বুঝদার! সবকিছুতে আগে-পরে কী হতে পারে, ও আগেই আঁচ করতে পারে। আমি সত্যি চাই ও যেন খুব সুখী হয়। শুধু কলরবকে নিয়েই যা চিন্তা হয়।”

নবনী বলল, “কেন? ভাইয়া তো এখন নিয়মিত কাজ করছে!”
“কাজ করছে নাকি কী করছে, সেটা অফিসে গেলে বোঝা যায়! একদিনে সবকিছু এত এলোমেলো করে রেখেছিলো যে, আমার গুছিয়ে পারফেক্ট করতে পুরো আট ঘণ্টা লেগেছে!”
নবনী হেসে বলল, “আস্তে আস্তে ঠিক শিখে যাবে।
“হুম, শিখলেই ভালো।”
“আপনারা অযথাই ওর ওপর রাগ করেন। সবাই কি আর একরকম হয়? একটা স্কুলের সব বাচ্চাই তো ফার্স্ট হয় না! তবে চেষ্টা করলে লাস্ট বেঞ্চের বাচ্চাটাও কিন্তু ফার্স্ট হতে পারে। পারে কিনা বলুন? ভাইয়া একটু অন্যরকম, ব্যস!”
দিব্য নিঃশ্বাস ফেলে হার মানার ভঙ্গিতে বলল, “আমারই ভুল হয়েছে যে তোমার ওই গুণধর ভাইয়ের নামে কিছু বলেছি! যাও, আর জীবনেও কিছু বলব না! ও একদম বিশ্বসেরা! একদিন ও ইলোন মাস্ককেও ছাড়িয়ে যাবে। কিলোন মাস্ক হবে! চল এবার, নিচে যাই।”
দিব্যের কথা বলার ধরনে নবনী খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়ল স্বামীর বুকে।

ঊর্মি রান্নাঘরে একমনে কাজ করছিল। কায়েফ বরাবরের মতোই সামনে বেসিনের ওপর উঠে পা দুলিয়ে বসে আছে। ঊর্মির আড়ষ্ট আর অস্বস্তি লাগছে। কারণ বসার ঘরে পরিবারের অনেকে উপস্থিত। কায়েফকে এভাবে রান্নাঘরে বসে থাকতে, কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে! কায়েফই প্রথম নীরবতা ভাঙল,
“আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেন?”
ঊর্মি একবার চোখ তুলে চেয়ে আবার তড়িঘড়ি মাথা নিচু করে নিল,
“তেমন কিছু না।”
“আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?”
ঊর্মি একটু থমকে বলল, “নাহ তো! আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে একটা কথা বলি। আপনি রাখবেন? আমি কয়েকদিন ধরে আপনাকে বলতে চাইছি।”
কায়েফ তৎক্ষণাৎ নড়েচড়ে বসে আগ্রহ নিয়ে বলল,
“অবশ্যই রাখব। বলুন।”

ঊর্মি হাতের কাজ থামিয়ে ধীর গলায় বলল, “আমাকে গ্রামে দিয়ে আসুন। আনায়া আপু আমাকে সব বলেছে। আপনি বাধ্য হয়ে, শুধু পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমাকে জোরপূর্বক মেনে নিচ্ছেন। আমি আপনার দিকটাও বুঝতে পারছি। তখন আসলে আবেগের বশে অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম। আমি গ্রামে ফিরে গেলেও তেমন কিছু বদলাবে না। আগের মতোই থাকব।”
কথাটা শোনামাত্র কায়েফের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তপ্ত গলায় বলল,
“মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার? আপনাকে আমি কীভাবে বিশ্বাস করাব বলুন তো? আমার সাথে আনায়ার কোনো প্রেমের সম্পর্কই ছিল না! আম্মু ওকে আমার জন্য পছন্দ করেছিলেন, ব্যাস এতটুকুই! আপনি সত্যি আমাকে বিশ্বাস করেন না?”

ঊর্মি চমকে উঠে তাকাল। কায়েফ এতটা আক্ষেপ মাখা গলায় তাকে বিশ্বাস করতে বলছে! ছেলেটাকে অবিশ্বাস করতে অবশ্য ঊর্মির মনও সায় দেয় না। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি তো তাকে দ্বিধায় পড়তে বাধ্য করেই। তবে কায়েফের কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে ঊর্মির ভেতরের জমে থাকা মেঘ এক নিমিষেই কেটে গেল। এ ছেলে আর যাই হোক, অন্তত মিথ্যা বলছে না। এত কাঁচের মতো স্বচ্ছ চোখে চেয়ে কেউ অমন মিথ্যা বানাতে পারে না। ঊর্মি খুব মৃদুস্বরে বলল,
“ঠিক আছে।”
কায়েফ তাও অস্থির গলায় শুধাল, “কী ঠিক আছে?”
“আরে, তোর সমস্যাটা কী বল তো?”
হঠাৎ কলরবের গমগমে কণ্ঠে চমকে উঠল কায়েফ। থতমতো খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের সমস্যা?”

কলরব চোখমুখ কুঁচকে মজা করে বলল, “উনি এই বাড়িতে আসার পর থেকেই দেখছি, তুই সারাক্ষণ উনার পেছন পেছন ঘুরঘুর করিস! এখন তো দেখছি রান্নাঘরে এসেও বসে আছিস। কিপারের দায়িত্ব পালন করছিস নাকি?”
কায়েফ বিব্রতবোধ করল। বসার ঘর থেকে মৌনিতা হেসে উঠে বলল,
“আসলে কী জানো ভাইয়া? কায়েফ ভাইয়া মনে হয় ভয় পায়! তার এত ছোটখাটো বউটা যদি এই মস্ত বড় বাড়িতে হারিয়ে যায়! তাই একদম পার্সোনাল সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব পালন করছে আরকি!”
অলেখা রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে হাসতে হাসতে যোগ করল,
“বা এমনও তো হতে পারে যে, ছেলেটা আমাদের সবাইকে ভয় পাচ্ছে! বাড়িতে দু-দুটো শাশুড়ি, দুটো জা, একটা ননদ। সবাই মিলে যদি তার একলা বউয়ের ওপর অত্যাচার শুরু করে! আমরা আবার বাংলা সিনেমার দাজ্জাল শাশুড়ি কিনা!”
কায়েফ অসহায় চোখে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাই বলে তোমরা সবাই মিলে এভাবে আমার পেছনে লাগবে?”

সবাই একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠল। ঊর্মি বিস্ময় সামলাতে না পেরে অবাক চোখে চেয়ে রইল। তার চোখেমুখে তখনও ঘোর। এ বাড়ির প্রতিটা মানুষ সত্যি কতটা সহজ, আন্তরিক আর কতটা ভালো! কলরব এগিয়ে এসে কায়েফের পিঠে সজোরে একটা চাপড় মেরে হেসে বলল,
“আরে দূর বাল! তুই এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন? তোরই তো বউ! সিকিউরিটি দেওয়া কি খারাপ কিছু নাকি? প্রয়োজন হলে সারাদিন কোলে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াবি, কার কী!”
অলেখা তৎক্ষণাৎ কড়া চোখে তাকিয়ে ধমক দিলেন,
“কলরব! ভাষা সংযত কর! নিজের বউকে যদি সেভাবে রাখতে, তাহলে সে বাড়ি ছেড়ে যেত না। এসেছে জ্ঞান দিতে।”
আমতা আমতা করে মুহূর্তের মধ্যে একদম চুপসে গেল কলরব। অলেখা আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘর ছেড়ে চলে গেলেন। কায়েফ এতক্ষণ নিজের হাসি সামলানোর চেষ্টা করছিল, এবার ঠোঁট টিপে মুচকি হাসতে লাগল। ঊর্মি ও হেঁসে ফেলল। সবাইকে হাসতে দেখে কলরব বিরক্ত গলায় বলল,
“হাসুন, আপনিও হাসুন! এমনিতে তো এই বাড়িতে কারোর কাছেই আমার কোনো মান-সম্মান অবশিষ্ট নেই। তবে ভেবে কিছুতেই কূল পাচ্ছি না, আমার মায়ের গায়ে তার পুত্রবধূর বাতাস কীভাবে লেগে গেল!”

কায়েফ হাসতে হাসতে কলরবকে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হলো। কলরব হুট করে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ভালোবাসিস মেয়েটাকে?”
কায়েফ ক্ষণিক চুপ থেকে বলল, “মায়া হয় শুধু৷”
কায়েফ পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, “আনায়ার ব্যাপারে কীভাবে জানতিস তুই?”
“খোঁজ নিয়ে ছিলাম। তোকে কী যার তার হাতে ছাড়তে পারি? ওকে বাড়িতে দেখার দিনই আমার মনে হয়েছিলো, ওকে আমি আগেও কোথাও দেখেছি৷”
কায়েফ বলল, “কোথায় দেখেছিলিস?”
“সেটা তো বলা যাবেনা। তবে, ভাবি পছন্দ হয়েছে, ভাই। মন দিয়ে সংসার করো। তোমার সংসার জীবন শান্তির হোক। আসলেই, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে৷ কিন্তু আমার সাথেই খালি এমন করে।”

প্রচণ্ড চিন্তায় হাত-পা হিম হয়ে কাঁপছে নিযানার। স্পন্দনের শব্দটা যেন সে নিজেই নিজের কানে শুনতে পাচ্ছে। তার পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র কয়েকদিন হলো। ভেবেছিল আজ অথবা কালকের মধ্যেই হয়তো সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলবে। কিন্তু গতকাল রাতে একটা ভয়ংকর খবর জানতে পারার পর থেকেই তার সমস্ত ভাবনার মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। হ্যাঁ, খবরটা নিযানার কাছে ভয়ংকরই বটে! তার ওপর একটু আগে আরশাদ তালুকদার স্বশরীরে হাজির হয়েছেন তাদের বাড়িতে। আর সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো, তিনি নাকি সাথে করে নিয়ে এসেছেন কলরবের সই করা ডিভোর্স পেপার! সাথে দিব্য আর কাব্যও এসেছে। কুহু জোরপূর্বক তাদের সাথে চলে এসেছে নিযানার সাথে দেখা করার বাহানায়। রুমে ঢুকতেই নিযানা হাত চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে শুধাল,
“তোর ভাই, সত্যি সত্যি এটা করেছে কুহু?”
নিযানার বিধ্বস্ত মুখটার পানে চেয়ে কুহু অভয় দিয়ে বলল,
“আরে না! ভাইয়া এসব কিছুই করেনি! সে তো সকাল সকালই বেশ ফুরফুরে মেজাজে অফিসের একটা কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে। গতকাল রাতেও তো আমাকে বলল, খুব শীঘ্রই তোকে এ বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে। আমি অলরেডি ভাইয়াকে কল করে দিয়েছি।”
নিযানা তেঁতে উঠে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল, “তোর ভাই কি দুধের বাচ্চা? ওকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে বলবে ডিভোর্স পেপারে সই করো, আর ও অমনি সই করে দেবে? ও যা করছে, সব ইচ্ছা করেই করছে! এই কটা দিনে হয়তো খুব বিরক্ত হয়ে গেছে আমার ওপর। বেশ তো। আমিও সই করে দেব কাগজটায়! চিরতরে মুক্তি দিয়ে দেব ওকে।”
“উফ নিযানা, এসব আজেবাজে কথা বলিস না তো! ভালো লাগছে না একদম! ভাইয়া অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিল। তাই ফিরতে সামান্য দেরি হচ্ছে। তবে এখনি চলে আসবে। দাঁড়া, আমি আবার কল দিচ্ছি।”
কুহু কল দিতেই দ্বিতীয় রিংয়ে রিসিভ করল কলরব। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে ড্রাইভ করছে সে। বেশ গম্ভীর গলায় শুধাল,

“বল।”
“ভাইয়া তুমি কতদূর আছো?”
কলরব কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার গাড়ি ততক্ষণে এসে থামল নিযানাদের বাড়ির গেটের ঠিক সামনে। গাড়ি অফ করে হাঁপ ছাড়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“নিযানা কোথায়?”
কুহু বলল, “আপু আমার পাশেই বসে আছে। ফোন লাউডস্পিকারে দেওয়া। তুমি কিছু বলতে চাইলে বলতে পারো। ফুপি এখনি আপুকে ডিভোর্স পেপারে সই করানোর জন্য নিচে ডেকে নিয়ে চলে যাবে।”
কলরব ওপাশ থেকে একটু নিস্তব্ধ রইল। তারপরেই গর্জে উঠল,
“ও এখনো কাউকে কিছু বলেনি? একবারও স্পষ্ট করে বলেনি যে ও আমাকে ডিভোর্স দিতে চায় না?”
নিযানা চড়া গলায় বলল, “না, বলিনি! বেশ করেছি! তুমি বলেছিলে বুঝি? তা তুমি যদি না-ই বলে থাকো, তবে ডিভোর্স পেপারে তোমার সই কীভাবে এলো? আর ওই কাগজ নিয়ে মামা আমাদের বাসায় কীভাবে এলেন, বলো?”
“তোর মাথায় সত্যি সমস্যা আছে, তাই না? আমি সই করতে পারি, তুই এটা এত সহজে বিশ্বাস করে নিলি? আর তোকে কে বলল আমি আব্বুকে বারণ করিনি? কুহুকে জিজ্ঞেস কর, যাকে খুশি তাকে জিজ্ঞেস কর! কিন্তু তুই? তুই নিজে এখনো কেন বাড়িতে কোনো কিছু বলছিস না? তুই সত্যি এখনো চাস যে আমাদের ডিভোর্সটা হয়ে যাক, তাই না?”
নিযানা জেদের বসে জবাব দিল, “হ্যাঁ! তুমি আমাকে একদম ঠিক চিনেছ! কুহু চল নিচে। আমি এখনই সই করে দেব।”

কুহু একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমাদের দুজনেরই কি একসাথে মাথা খারাপ হয়েছে? এমন সময়ও দুজন মিলে ঝগড়া করছ?”
কলরব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ঠিক আছে, করিস সই! আমিও আসছি। ওই নকল সাইনটা আসল করবো! তবে তার আগে তোর থোতমাটা একটু সামনে থেকে দেখতে চাই আমি। অসভ্য, ফাজিল মেয়ে কোথাকার! এক চড়ে তোর গাল লাল করে দেব আজ! কুহু, তুই একবার ওদের বাড়ির পেছনের গেটটা খুলে দে তো। আমি পেছনের দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকছি। সামনের গেটেই দাঁড়িয়ে আছি।”

নিযানা বলল, “বাহ্! বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নাটক করা হচ্ছে? কিসের অপেক্ষা কিসের? সে কি নতুন বর নাকি, যে কেউ তাকে গিয়ে বরণ করে তবে ভেতরে নিয়ে আসবে?”
কুহু আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিল। যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নিযানা চট করে ওর হাতটা চেপে ধরল। তারপর মুখটা কাছে এনে কুহুর কানে কানে কিছু একটা বিড়বিড় করে বলল। কথাটা শুনে কুহুর মুখের মেঘ কেটে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মিষ্টি হাসি। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনের গেটটা খুলতেই করিডোরে কলরবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল কুহু। ছেলেটার চোখমুখের অবস্থা রীতিমতো ভয়ানক। উসকোখুসুস চুল, কপালে ভাঁজ আর চোখে রাগ। কুহুকে দেখেই গটগট করে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আওড়ালো,
“কোথায় ওই বেয়াদবটা? ডিভোর্স দেবে আমাকে? কত বড় সাহস! ওকে সহ ওর টাক বাপকে আজই কিডন্যাপ করে নিয়ে সোজা বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেব! ওর সব ত্যাড়ামি ছুটিয়ে দেব!”
কুহু ব্যস্ত হয়ে কলরবের পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভাইয়া, তুমি এক মিনিট এখানে দাঁড়াও। আমি একটা ব্যবস্থা করছি। প্লিজ এখন হুট করে ঘরে যেও না! জাস্ট এক মিনিট!”

কলরব কিছু একটা বলার আগেই কুহু করিডোর ধরে পাশের ঘরটার দিকে হনহন করে চলে গেল। কলরব নিজের রাগ কোনোমতে চেপে আরও দু-পা এগিয়ে নিযানার বন্ধ ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কুহু হাতে একটা ছোট রুমাল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। রুমালটা কলরবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ভাইয়া, এতে অজ্ঞান করার ওষুধ মেশানো আছে। তুমি এটা দিয়ে সোজা ওকে কিডন্যাপ করে নিয়ে কেটে পড়ো!”
কলরব এক মুহূর্তের জন্য পুরাই তাজ্জব হয়ে গেল! অবাক চোখে চেয়ে বলল,
“তুই… তুই সত্যি বলছিস কুহু?”
কুহু গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ! নিজের সেফটির জন্য আমি এটা সবসময় সাথে রাখি। কাব্য ভাইয়া এনে দিয়েছিল।”
কথাটা শোনামাত্র ফট করে রুমালটা কুহুর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিল কলরব। কুহুর মুখটা টেনে ধরে বলল,

“এই না হলে আমার বোন! তুই সত্যিই আজ একদম আদর্শ বোনের মতো কাজ করেছিস রে! তুই যে আমাকে এত ভালোবাসিস, আমি আজ পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি! আমার সোনা বোন একটা!”
কুহু এক হাত দিয়ে কলরবকে সরিয়ে দিয়ে মুখ বাঁকাল,
“এত ওভার-অ্যাক্টিং আর নাটক করতে হবে না! যা করার, আমি নিযানার জন্যই করেছি।”
কলরব ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করল, “তা তো বলবিই! তোকে কি আর সাধে কাঠি বলি? গিরগিটির বেস্ট ফ্রেন্ড কাঠি। পুরো একদম মেড ফর ইচ আদার জুটি তোদের!”
কুহু কিছু একটা বলে পালটা ধমক দেওয়ার আগেই কলরব সোজা ধুম করে ঢুকে গেল নিযানার ঘরে। হুট করে ঘরে কলরবকে ঢুকে পড়তে দেখে বিছানায় বসে থাকা নিযানা এক প্রকার লাফিয়েই উঠে দাঁড়াল! কিন্তু কলরব তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। না নিজে একটা শব্দ উচ্চারণ করল। নিযানার একদম কাছে এসে মুখের ওপর চেপে ধরল সেই রুমালটা! নিযানা চোখ বড় বড় করে কয়েক সেকেন্ড ছটফট করার চেষ্টা করল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ঢুলুঢুলু হয়ে এল তার চোখের পাতা। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে অবশ হয়ে ঢলে পড়ল কলরবের গায়ের ওপর। কলরব এক মুহূর্তও দেরি না করে নিয়ানাকে খুব যত্নে নিজের কোলে তুলে নিল। কুহু আগে আগে গিয়ে করিডোর আর পেছনের গেটের পথ ফাঁকা আছে কি না দেখলো৷ নিখুঁতভাবে ওদের পেছনের গেট দিয়ে বের করে গাড়ি অব্দি পৌঁছে দিল।

অনেকটা সময় পার হওয়ার পর যখন আনতাসা ফিরে এলেন এবং কুহুকে বসার ঘরে একা পেলেন, তখনই শুরু হলো মূল হট্টগোল। কুহু নিজেকে সামলে নিয়ে প্রথমটায় বেশ সাহসের সাথেই বলেছিল যে নিযানা নিজের ইচ্ছেতেই বাড়ি থেকে চলে গেছে। কিন্তু নওয়াজ চৌধুরী ততক্ষণে পেছনের দরজার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে ফেলেছেন। ফুটেজ দেখা মাত্রই একদম তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি,
“এই হচ্ছে আপনার ছেলের নমুনা! দিব্য, ফোন করো তোমার ভাইকে! ও যেন এখনই আমার মেয়েকে নিরাপদে ফেরত দিয়ে যায়। নয়তো আমি পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হব!”
কাব্য হতবাক হয়ে বিড়বিড় করল, “কিন্তু কলরব এলো কীভাবে? ওর তো আজ অফিশিয়াল কাজে ঢাকার বাইরে থাকার কথা ছিল!”
নীরবতা চিরে একটা অপ্রত্যাশিত ঝড়ের মুখোমুখি হলো কুহু। এই প্রথমবার, জীবনের প্রথমবার আরশাদ তালুকদার অত্যন্ত চড়া মেজাজে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন কুহুর গালে! চড়ের আকস্মিক আঘাতে থতমতো খেয়ে মেয়েটা কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল। আরশাদ তালুকদার কড়া গলায় গর্জে উঠলেন,
“কোথায় গেছে তোমার ওই কুলাঙ্গার ভাই? বলো!”
কুহুকে সঙ্গে সঙ্গে আগলে ধরে একপাশে সরিয়ে নিল দিব্য। গাল চেপে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেলেছে কুহু। নিজের বাবার এমন ভয়ঙ্কর রূপ সে জীবনে কখনো দেখেনি। কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“আমি সত্যি জানি না, আব্বু…!”

নওয়াজ চৌধুরী তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলেন, “জানো না মানে কী? তুমি নিজেই তো নিজের ভাইকে এই কাণ্ডটা ঘটাতে সাহায্য করেছ!”
দিব্য বলল, “আপনারা প্লিজ একটু শান্ত হন! আমি কথা দিচ্ছি, কলরবকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসব। ওরা কোথায় বা যাবে? আব্বু, তুমি এখন বাসায় চলো।”
নওয়াজ চৌধুরী শীতল কণ্ঠে বললেন, “মেয়েকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত এনে দিতে পারলেই আপনাদের জন্য ভালো! নয়তো আমার সবচেয়ে খারাপ রূপটা আমি দেখাতে বাধ্য হব। নিজের মেয়ের জন্য আমি কী কী করতে পারি, সে ধারণা আপনাদের কারও নেই! আপনাদের কাছে কাল সকাল অব্দি সময় আছে। এর মধ্যেই আমার মেয়েকে আমার চোখের সামনে অক্ষত হাজির দেখতে চাই!”

একদম শুনশান নির্জন জায়গা দেখে গাড়ি থামাল কলরব। নিযানা এখনো নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে পাশের সিটটায়। কলরব নিযানার দিকে একনজর চেয়ে একটা সিগারেট ধরাল। নিযানার মুখটা অবশ্য এতক্ষণ কলরবের কোটটা দিয়ে সুন্দর করে ঢাকা ছিল।
“এই তোমার শুধরে যাওয়ার নমুনা? সিগারেটটা অন্তত বাইরে গিয়ে খাও!”
হুট করে পাশ থেকে ভেসে আসা গম্ভীর কণ্ঠে একঝটকায় চমকে উঠল কলরব! নিযানা নিজের গায়ের ওপর থেকে কোটটা একপাশে সরিয়ে চোখমুখ কুঁচকে তাকাল। গাড়ির জানালার কাচ গলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে শুধাল,

“আমরা এখন ঠিক কোথায় আছি?”
কলরব সিগারেটে এক টান দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“মঙ্গলগ্রহে। জীবনের প্রথম হানিমুন বলে কথা!”
নিযানা কপাল সামান্য টিপে বলল, “অহেতুক মেজাজ খারাপ কোরো না তো! একটু পানি দাও তো আমাকে।”
“আমি কি তোর বাপের চাকর নাকি?”
“আমাকে হুট করে এখানে নিয়ে এলে কেন?”
“ডিভোর্সের ভূত নামাতে!”
নিযানা কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইল। গাড়ি ড্রাইভিং সিটের পাশ থেকে নিজেই পানির বোতলটা খুঁজে বের করতে যেতেই কলরব ছাঁ মেরে সেটা ওর হাত থেকে কেড়ে নিল। তারপর দুমড়ে-মুচড়ে গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল বোতলটা! নিযানা অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে তোমার? এটা কী করলে, হ্যাঁ?”
কলরব হাতে ধরা অর্ধেক সিগারেটটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে সোজা ঝুঁকে এলো নিযানার একদম মুখোমুখি! এক হাত শক্ত করে ওর এক গালে রেখে, দাঁতে দাঁত পিষে গাঢ় গলায় বলল,
“হ্যাঁ, মাথা খারাপ হয়ে গেছে! কাজটাই তোরা তেমন করেছিস!”

নিযানা প্রতিবাদে কিছু একটা বলতে গিয়েও কলরবের চোখের অতল দৃষ্টিতে আটকে গিয়ে থমকে গেল। একদৃষ্টিতে ওর মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল কলরব। এই চেনা মুখটা এত কাছ থেকে দেখার জন্য কতগুলো নির্ঘুম রাত ছটফট করেছে সে! এই কয়েকটা দিনে মেয়েটার চেহারাটা ভেঙে গেছে। শুকিয়ে গেছে যেন। কলরব খসখসে গলায় বিড়বিড় করল,
“তোর অত বড়লোক বাপ তোকে ঠিক মতো খেতেও দেয়নি? চেহারার এমন হাল বানিয়েছিস কেন? একদম তো ঠাকুমার ঝুলির ওই শাঁকচুন্নিটার মতো লাগছে! এই অবস্থায় তোর বাপে আবার অন্য কোনো বড়লোক ঘরে তোকে গছিয়ে দিত কীভাবে? বিচ্ছেদের বিরহের কারন? আমার কথা ভাবছিলি নাকি? মনেও পড়েছিলো? মনও পুড়ে ছিলো তাইনা?”

নিযানা অবশ্য কোনোরকম জবাব দেওয়ার সুযোগটুকুও পেল না। তার আগেই কলরবের উষ্ণ ওষ্ঠ জোড়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরল ওর কোমল ঠোঁট! কিন্তু পরক্ষণেই নিযানা কলরবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। খোলা জানালার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে গড়গড় করে বমি করে দিল! কলরব মুহূর্তের জন্য পুরো হতভম্ব হয়ে গেল! তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে গাড়ির ব্যাকডোর থেকে নতুন একটা পানির বোতল এনে নিযানার হাতে ধরিয়ে দিল। নিযানা হাঁপাতে হাঁপাতে পানি দিয়ে কুলকুচি করে জোর জোর শ্বাস নিতে লাগল। কলরব পিঠে হাত বুলিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“ঠিক আছিস তুই? আচমকা এভাবে বমি করছিস কেন?”
নিযানা ওকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো,
“একদম দূরে সরো তুমি! গা থেকে সিগারেটের বিশ্রী গন্ধ আসছে। বমি কেন করছি? শখ হয়েছে, তাই শখ করে বমি করছি!”

“ওহ! তোর তো আবার দুনিয়ার যত বিচিত্র সব শখ!”
কলরবের এমন বোকা আর নির্লিপ্ত ব্যবহার সহ্য হলো না নিযানার। বুকের ভেতরের সব অভিমান উগরে দিয়ে বলল,
“আমাকে কষ্ট দিতে কেন এখানে নিয়ে এসেছ? আমি শাঁকচুন্নি, আমি রক্তচোষা! আমি এক মুহূর্তও আর থাকতে চাই না তোমার সাথে! আমাকে এখনই বাড়িতে দিয়ে এসো। তুমি যা চাইছ, আমি সোজা সেটাই দেব!”
কলরব থমকে জিজ্ঞেস করল, “কী দিবি?”
“ডিভোর্স!”
কলরব তির্যক হেসে বলল, “সে তো তুই এমনিতেও দিতিস!”
নিযানা এক হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল, “তুমি আমাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করো না, তাই না?”
কলরব রূঢ় গলায় বলল, “তোকে কীভাবে বিশ্বাস করব বল? আমি যদি ঠিক সময়ে আজ না আসতাম, তুই ঠিকই ওই ডিভোর্স পেপারে সই করে দিতিস। তারপর বাপের মতো টাক, টাকা ওয়ালা কাউকে বিয়ে করতিস!”

নিযানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল! দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তাহলে পেটের এই পেটের টাকে কী করতাম? তুমি না প্লিজ একটু চুপ করো কলরব! নয়তো আমি সত্যিই তোমাকে গাড়ি থেকে লাথি মেরে ফেলে দেব! আমার ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে এখন!”
কলরব যেন এক সেকেন্ডে পুরোপুরি হ্যাং হয়ে গেল! থমকে গেল তার চারপাশের পৃথিবী। মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরাগুলো যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। পুরো কথাটার মূল অর্থ কিছুটা আঁচ করতেই আতঙ্কে শবিস্ময়ে কেঁপে উঠল তার কণ্ঠ,
“এ্যাঁ…?”
নিযানা হাত দুটো বুকে বেঁধে চোখ বুজে বলল, “হ্যাঁ! তোমার কী মনে হয়, তুমি একাই আমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছ? আমি নিজে ইচ্ছে করে কিডন্যাপ হয়ে তোমার সাথে পালিয়ে এসেছি! তোমার রক্ত, তোমার অস্তিত্ব নিজের শরীরে বয়ে বেড়িয়ে আমি তোমাকে কোনোদিন ডিভোর্স দিতে পারতাম, বলো? কীভাবে ভাবলে তুমি এটা, কলরব? আমি তোমাকে ভালোবাসি। কতটা ভালোবাসি! তোমাকে সেটা কীভাবে বোঝালে, তুমি বুঝবে?”

কলরব তোতলাতে তোতলাতে বলল, “এক… এক মিনিট! এক মিনিট একটু চুপ কর তুই! আমাকে পুরো জিনিসটা আগে হজম করতে দে। আমার অংশ মানে? আমার? আমাদের সন্তান?!”
কলরবের চোখেমুখে উপচে পড়ছে তীব্র বিস্ময়। নিযানা শান্ত, স্নিগ্ধ চোখে ওর এই ব্যাকুল রূপটা দেখে চলেছে। কলরব পাগলের মতো অস্থির হয়ে কখনো নিজের মাথার ঘন চুলে হাত বুলাচ্ছে, আবার কখনো গালে হাত দিচ্ছে। নিযানার আচমকাই খিলখিল করে হেসে ওঠার ইচ্ছা হলো, কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের হাসিটা চেপে সামলে রাখল সে। সত্যি, এমন একটা অদ্ভূত নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে, এত ঝড়ের মাঝে যে সে কলরবকে তার জীবনের সেরা খবরটা দেবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি! কিডন্যাপ হওয়ার নাটক করতে গিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো কে জানে৷ ঘুম ভেঙেছে গাড়ি থামাতে। এখন কোথায় আছে তারা? আচমকা নিযানার একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের মাথার ওপর রাখল কলরব। নিযানা খানিকটা চমকে উঠল! কলরব কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,
“সত্যি করে বল নিযানা! এটা সত্যি আমার বাচ্চা? মানে, তুই একদম ভুলভাল ভাবিস না! আমি… আমি বলতে চাইছি, তোর পেটে সত্যিই বাচ্চা আছে? মানে আমার বাচ্চা তোর পেটে বেড়ে উঠছে? তুই সত্যি প্রেগন্যান্ট? আমার জন্য? মানে একদম সত্যি তো…?”

নিযানা বিরক্ত গলায় বলল, “এক কথা কয়বার বলব? বললাম তো হ্যাঁ!”
কলরব কয়েক সেকেন্ড একদম নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তারপরই আচমকা গাড়ির ভেতরেই লাফিয়ে উঠল! হাত-পা ছুড়ে ছোট বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে উঠল,
“ইয়েস! ইয়েস! ইয়েস! জীবনে প্রথমবার আমি একদম সঠিক সময়ে পারফেক্ট কাজটা করেছি! হাঃ! এবার? এবার কী করবে তোর টাক বাপ, হ্যাঁ? শালা! এবার আমি আর আমার বাচ্চা। দুইজনে মিলে উনার মাথায় যে কয়টা অবশিষ্ট চুল আছে, সব উপড়ে ফেলব! বাচ্চা দিয়ে প্রতিশোধ নেব। কুটনি শ্বশুর! এবার আপনি শেষ।”
নিযানা সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই কলরবের অতি-উচ্ছ্বাস একটু যেন ধামাচাপা পড়ল। সে তোতলাতে তোতলাতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“মানে… মানে আমি বলতে চাইছি এবার তো আর কেউ ঝামেলা করবে না তাইনা?”
নিযানা মুখ একপাশে ফিরিয়ে বিরস গলায় বলল,
“জানি না! তুমি সত্যি খুশি হয়েছ?”

“কেন, আমার কি ডুকরে ডুকরে কান্নাকাটি করা উচিত ছিল? আমার এই মুহূর্তে ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে, তোকে আমি কীভাবে বোঝাব নিযানা! দাঁড়া, আমি পাঁচ মিনিটের জন্য বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি। আমার একটু হাঁটাচলা করা দরকার। নয়তো হজম হবে না! দিস ইজ আ ভেরি বিগ নিউজ! কিন্তু এটা হুট করে হলো কীভাবে বল তো?”
কথাটার শেষ অংশ শোনামাত্র নিযানা গরম চোখ চাইলো। কলরব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না! খিলখিল করে হাসতে হাসতে তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে সোজা বাইরে নেমে গেল।

সেদিন কায়েফ বাড়ি ফিরল বেশ রাত করে। ঊর্মি ঘরেই বসেছিল। তাকে দেখা মাত্রই বোঝা গেল, কায়েফ ভীষণ বিধ্বস্ত। সেভাবে তেমন কোনো কথা বলল না সে। কোটটা খুলে আলনায় রেখে নিঃশব্দে চলে গেল ওয়াশরুমে। হাত-মুখ ধুয়ে বের হতেই ঊর্মি নরম কণ্ঠে শুধাল,
“আপনার খাবারটা কি ঘরে নিয়ে আসব?”
কায়েফ ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসে সংক্ষেপে বলল,
“এখন একদম খেতে ইচ্ছা করছে না।”
ঊর্মি আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ গিয়ে বিছানার এক কোণে বসল। কায়েফ ল্যাপটপের স্ক্রিনে একমনে কী যেন করছে। ঊর্মি একহাতে গাল ঠেস দিয়ে ওর দিকেই অপলক চেয়ে রইল। এ কটা দিন যেন সত্যিই কোনো অলৌকিক স্বপ্নের মতো কেটেছে তার কাছে। এখনো যেন সবকিছু কেমন এক রঙিন ঘোরের মতো ঠেকে। তাকাতে তাকাতেই ঊর্মি খেয়াল করল, কায়েফ বারবার নিজের একহাত দিয়ে কপাল আর রগ টিপছে। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আপনার কি খুব মাথা ব্যথা করছে?”
কায়েফ স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে চেয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
“আজ রাতে কাজ করাটা কি খুব বেশি জরুরি?”
কায়েফ মাথা নেড়ে বোঝাল না। তেমন কোনো জরুরি কাজ নয়। ঊর্মি কথা না বাড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে সোজা ড্রেসিং টেবিল থেকে মলমের কৌটোটা নিয়ে এল। কায়েফ নীরব চোখে পুরো বিষয়টাই খেয়াল করল। সে নিজে থেকেই ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে রেখে জায়গা করে দিল। ঊর্মি বিছানায় পা তুলে বসতেই, পরমুহূর্তে কায়েফ একদম সহজ ভঙ্গিতে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল! আকস্মিক এই সান্নিধ্যে শিউরে উঠল মেয়েটার নাজুক শরীর। রক্তে শিরশির করে উঠল এক অচেনা অনুভূতি। কায়েফ চোখ দুটো বুজে নিয়েছে। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ। ঊর্মির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মিহি হাসি। আলতো হাতে কপালে মলম ঘষে ম্যাসাজ করতে করতে বলল,
“আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

কায়েফ চোখ না খুলেই গম্ভীর স্বরে বলল, “আপনি কিছু বলার আগে বারবার এভাবে অনুমতি কেন নেন? যা খুশি বলতে পারেন। এভরিথিং!”
“আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত?”
কায়েফের বন্ধ চোখের পাতা দুটো থমকে গেল। মেয়েটা এত সহজে টের পেল কীভাবে? এ ঘরে আসার আগে সত্যি বলতে মাজহার সাথে দেখা হয়েছিল তার। কলরবের বিষয়টা শুনেছে। তার উপরে মাজহার রাগ এখনো কমেনি। তিনি বারবার সতর্ক করেছেন। ইদানিং তিনি কায়েফের সাথে ঠিক করে কথা বলছেন না। কায়েফের কাছে তার মা শুধুই মা নন। একদম বন্ধুর মতো। তাই মায়ের এই নীরব দূরত্ব তাকে ভেতর থেকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। তাকে এভাবে নিস্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে ঊর্মি অনুতপ্ত কণ্ঠে আবার বলে,
“ভুল কিছু বলে ফেললাম?”
কায়েফ মৃদু হেঁসে বলল, “আরে না! আসলে অফিসে আজকাল বেশ স্ট্রেস যাচ্ছে, এই আর কি। কলরবের বিষয়টা নিশ্চয়ই শুনেছো? হাস্যকর না? ছেলেটা পুরো পাগল। এই বিষয়টাকে এখন চিন্তার বানিয়ে দিয়েছে।”

ঊর্মি শুধু মৃদু হাসলো। বেশ কিছুক্ষণ ভারী নীরবতার পর কায়েফ নিজেই চোখ খুলে বলল,
“আপনি খেয়েছেন?”
ঊর্মি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বোঝাল সে খায়নি। কায়েফ চমকে উঠে শুধাল,
“কেন খাননি?”
“আপনাকে রেখে একা একা খাই কী করে?”
কায়েফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনার খিদে পায়নি?”
“নাস্তা খেয়েছিলাম।”
কায়েফ কোল থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। ঊর্মি বিছানা থেকে নেমে খাবারের দিকে যেতে উদ্যত হতেই কায়েফ চট করে ওর একটা হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসতে।”
“একদম প্রয়োজন নেই।”
ঊর্মি অবাক হয়ে তাকাল। কায়েফও স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল বিধায় মুহূর্তে দুজনের চারজোড়া চোখ আটকে গেল এক সুতোয়। ঊর্মি আড়ষ্ট হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার আগেই অনুভব করল, একটা উষ্ণ ও শক্ত হাত শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে তার উদর স্পর্শ করেছে! সেই সাথে নিজের খুব কাছে, একদম ঘাড়ের নিকট কারো তপ্ত নিশ্বাসের ওঠানামা। কেঁপে উঠল রমণীর সর্বাঙ্গ। কর্ণের ঠিক নিকটে গাঢ় হয়ে ভেসে এল কায়েফের নিচু গলা,

“আম্মু খুব রেগে আছে আমার ওপর। আমি আর সহ্য করতে পারছি না ঊর্মি।”
ঊর্মি অবুঝ চোখে চাইল। বুকটা এত জোরে ধড়ফড় করছে যে মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা এখনই পাঁজর ভেঙে বাইরে চলে আসবে! নিজেকে সামলে নিয়ে জড়ানো গলায় বলল,
“দেখুন… আমি…!”
“উনাকে যেভাবেই হোক খুশি করতে হবে।”
ঊর্মি শুকনো ঢোক গিলে বলল, “আমি…আমি চেষ্টা করছি তো। বিষয়টা একটু কঠিন।”
“আমি একটা খুব সহজ উপায় জানতে পেরেছি।”
“কী?”
কায়েফ নিজের হাতের তালুতে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল মেয়েটার মৃদু কাঁপুনি। নিজের ভেতরের প্রচ্ছন্ন হাসিটা আড়াল করে একদম কাছে গিয়ে বলল,
“তার ছোট ছেলের ঘরে একটা নাতি কিংবা নাতনি এলে, সব অভিমান এক নিমিষে ঠিক হয়ে যাবে।”

কথাটার গভীর ভাবার্থ বুঝতে মুহূর্তকাল সময় লাগল মেয়েটার। পরক্ষণেই লাজুক গাল দুটো আরও লালিম রক্তিম আভায় ভরে উঠল! কায়েফ ক্ষান্ত হলো না। কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“আপনার মতামত কী? বলতে পারেন অনুমতি চাইছি!”

এই অবেলায় পর্ব ৫৫

পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়ল মেয়েটা! কায়েফের তপ্ত ওষ্ঠের ছোঁয়া কানে লাগতেই যেন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুনের শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। লজ্জা আর আবেশে নিজেকে সামলাতে না পেরে পেছনের দিকে ঘুরে একেবারে সোজা আছড়ে পড়ল ছেলেটার চওড়া বুকের ওপর! ব্যস! এই অনাবিল আত্মসমর্পণেই বোধহয় সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পেয়ে গেল কায়েফ। এক নিমিষেই বুঝে নিল তার অর্ধাঙ্গিনীর নীরব সম্মতি ও গোপন ইশারা।

এই অবেলায় শেষ পর্ব