Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৭

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৭

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৭
সেঁজুতি আক্তার

ভ্যান এসে একটা পুরনো বাড়ির সামনে থামল। মাইরা ভ্যানওয়ালার ভাড়া দিয়ে নেমে গেল। টিনের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই বিশাল বড় উঠোন। উঠোনের মাঝে বড় একটা কাঁঠাল গাছ। পাশে গোসলখানা আর বাথরুম। আর সামনে পুরনো একটা বাড়ি। মাইরা ভেতরে পা দিতেই লাঠিতে ভর দিয়ে এক বৃদ্ধা এগিয়ে আসলেন। মাইরা সামনে গিয়ে বলল, কেমন আছো দাদি?
-বৃদ্ধা কানে কম শোনে। মাইরার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, এই কেডা রে? তুই কেডা? কাকে চাস? এই ভর সন্ধ্যাবেলায়?

-মাইরা একটু হেসে জোরে বলল, দাদি আমি মাইরা। তোমার মাইরা।
-বুড়ি লাঠিটা শক্ত করে ধরে মাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে কাঁপা হাতে মাইরার গালে হাত রাখলেন।
মাইরা, আমার মাইরা? এতদিন পর? বলেই বুড়ি হাউমাউ করে কান্না করে দিলেন। লাঠি ফেলে, সাথে সাথে মাইরাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন।
-মাইরাও আর থাকতে পারল না। দাদির বুকে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে উঠল। দাদি, তোমাকে খুব মনে পড়ছিলো। আমি আর থাকতে পারিনি, তাই চলে আসলাম।
-হাজেরা বেগম মাইরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন।
আইসোস বুবু, এতদিন পর আইসোস। আমি ভাবছিলাম, আর বুঝি দেখা হবে না।

-মাইরা মাথা তুলে দাদীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কেমন আছো দাদি?
-হাজেরা বেগম শুনতে পেলেন না। বললেন, কিছু কইলি বুবু, শুনতে পাই নাই, আবার বল।
-মাইরা একটু হাসলো। তারপরে জোরে বললো, তুমি কেমন আছো দাদি?
-হাজেরা বেগম এবার ফোকলা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললেন, আমি ভালো আছি রে বুবু, তুই কেমন আছোস?
-আমিও ভালো আছি।
-ও!
-চল বুবু, ভিতরে চল। একাই আইছস নাকি, জামাইরে সাথে লইয়া আইছোস?
-মাইরা দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, না দাদি, উনি আসেনি। আমি একাই এসেছি।
-ওহ, তাইলে চল ভিতরে চল। আজ কিন্তু তোরে যাইতে দিমুনা।
-মাইরা সামান্য হেসে বলল, আচ্ছা দাদি চলো। বলেই মাইরা দাদির হাত ধরে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটা ধরল।

-রাত প্রায় নয়টা বেজে গেছে। শেহরান অস্থির চিত্তে বাড়ির উঠানে পায়চারি করছে।
-রফিক মিয়া একটু আগেই বাড়িতে ফিরেছেন। ইমন বাবাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলতেই, রফিক মিয়া পুরো এলাকা খুঁজে এসেছে। মাইরাকে কোথাও পাওয়া যায়নি।
-সেই থেকেই শেহরান অস্থির হয়ে উঠেছে। মেয়েটা কোথায় গেল? কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করলো না তো? ভাবতেই মাথার মধ্যে ধপ ধপ করছে। আজকে যদি ওর কিছু হয়ে যায়, তাহলে কি হবে? শেহরানের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
-আফিয়া বেগম উঠোনের পাশে একটা চেয়ারে বসে আছেন। তার মধ্যে কোনো রকম অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে না। ইমন বাবার সাথে বসে আছে।
-হঠাৎ রফিক মিয়ার একটা কথা মনে পড়লো। ইমনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ তোর মাইরা আপুর জন্মদিন না?
-ইমন উপর-নিচ মাথা নাড়ালো।
-রফিক মিয়া উঠে দাঁড়ালেন। শেহরানের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, বলছি শেহরান, একটা কথা ছিল।

-শেহরান থেমে গেল। অদ্ভুত চোখে রফিক মিয়ার দিকে তাকালো।
-রফিক মিয়া বলা শুরু করলেন, আমি যদি সঠিক হই, মাইরা সম্ভবত ওর বাবার বাড়িতে আছে।
-শেহরানের ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। বাবার বাড়ি?
-হুম। আমার একটা কথা মাথায় ছিল না। ওর জন্মদিনের দিন, ওর বাবার বাড়িতে যায়।
-শেহরান গলায় একটু ঝাঁঝ নিয়ে বলল, তো এই কথাটা আগে বলতে পারেননি?
-রফিক মিয়া অপরাধীর ন্যায় কণ্ঠ খাদে নামিয়ে কিছু বলতে নিলেই, শেহরান থামিয়ে দিল। তারপরে বলল, আর এক মিনিটও দেরি করা যাবে না। কোথায় ওর বাবার বাড়ি, আমাকে নিয়ে চলুন।
-রফিক মিয়া শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যাবে? আচ্ছা চলো তাহলে। বলেই দুজনে বেরিয়ে পড়ল।

-মাইরা দাদির রুমে বসে আছে। রুমটা বেশ পরিপাটি। মাইরার দাদি বৃদ্ধা হয়ে গেলেও, এখনো বেশ পরিষ্কার। এই রুমের পাশের রুমটাতেই থাকে, মাইরার ছোট চাচা। চাচা শহরে চাকরি করে। চাচি বাড়িতেই থাকে। কিন্তু এখন নেই, গতকাল বাবার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। বুড়ি এখন একাই আছে বাড়িতে।
-হাজেরা বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে রুমের ভেতরে এসে মাইরার পাশে বসলেন।
-মাইরা মুচকি হাসলো।
-হাজেরা বেগম বললেন, তুই তো আমারে ভুইল্লাই গেছোস। জন্মদিনের দিন আসিস, তাছাড়া তো এই বুড়ির কথা তোর মনে পড়ে না।
-মাইরা দাদির কথা শুনে হাসলো। কি করে আসবো, বলো দাদি? আগে তো স্কুলে পড়াশোনা, মামির সংসারের কাজ। সবকিছু করে সময় পেতাম না। আর এখন তো শ্বশুরবাড়ি থাকি।
-হাজেরা বেগম মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমার পোলা মরছে। পোলার বউ মরছে। আমার পোলা রাইখা গেছিল তোরে।

– বাবা মার কথা মনে হতেই, মাইরার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
-কিন্তু দেখ, এই অভাগা বুড়ি তোরে রাখতে পারে নাই নিজের কাছে। আমার পোলার আমানত রে।
-এই কথা বলো না দাদি, তোমার কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে চাই। আমি খুব ক্লান্ত দাদি।
-হাজেরা বেগম হাসলেন। তারপরে দুই পা বিছানার উপরে মেলে দিলেন।
-মাইরা গিয়ে পায়ের উপরে শুয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে দাদির কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলো।
-হাজরা বেগম মাইরার মাথায় বিলি কাঁদতে লাগলেন।

রফিক মিয়া আর শেহরান ভ্যান থেকে নামলো। শেহরান ভ্যানওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিলো। রফিক মিয়া বাড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল, এইটাই হলো মাইরার বাবার বাড়ি। মাইরার মা-বাবা যখন বেঁচে ছিল, এই বাড়িতেই থাকতো। তারা মারা যাওয়ার পরে, ওর ছোট চাচা-চাচি থাকে।
-শেহরান অস্থির কণ্ঠে বলল, তাড়াতাড়ি চলুন।
-রফিক মিয়া সামান্য মুচকি হাসলেন। তারপরে আস্তে করে টিনের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। পিছে পিছে শেহরানও ঢুকলো।

-দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রফিক মিয়া, দরজায় দুইবার টোকা দিলেন।
-শেহরান চারপাশে তাকিয়ে দেখলো, বাড়িটা বেশ অন্ধকার। এলাকার সবাই মনে হয়, এতক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
-হাজেরা বেগম এতক্ষণ মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। মাইরার কেবলই চোখটা লেগে আসছিল। হঠাৎ বাইরে মামার কণ্ঠ শুনে, তাড়াহুড়া করে উঠে পড়ল। দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, দাদি, মামা এসেছে।
হাজেরা বেগম মাইরার কথা এবার একবারেই বুঝে গেলেন। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে বেরিয়ে আসলেন।
পিছে পিছে মাইরাও আসলো। সামনে শেহরানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, চমকে উঠলো।

-আরে রফিক, তুমি রাইতের বেলায় এখানে?
-রফিক মিয়া একটু হেসে বললেন, আর বইলেন না মাওই মা। আপনার নাতনি মাইরা, জামাইরে না বলেই এখানে চলে আসছে। আমার সাথে এই যে, জামাইও আছে।
-শেহরান একটু সামনে এগিয়ে আসলো। মাইরার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল।
মাইরা শেহরানের তাকানো দেখে, ঢোক গিলে সামান্য পিছিয়ে গেল। বেটা বিরাট ক্ষেপেছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

-শেহরান দুই কদম এগিয়ে এসে, কাউকে পরোয়া না করে মাইরার হাত ধরতে নিলেই, হাজেরা বেগম হাতের লাঠিটা শেহরানের দিকে তাক করলেন।
-এই দাঁড়াও। কই যাও আমার নাতনির দিকে? আমি সব শুনছি। একদম আমার নাতনির কাছে আসার চেষ্টা করবা না।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৬

-মাইরা ভেবাচেকা খেয়ে গেল। দাদি এসব কি বলছে? আর কিসের কথা বলছে? ভাবতেই চোখ ছোট ছোট করে দাদির দিকে তাকালো।
-শেহরান অবাক চোখে দাদির দিকে তাকালো।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৮