এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৮
সেঁজুতি আক্তার
শেহরান রাগি চোখে মাইরার দিকে এগিয়ে যেতেই হাজেরা বেগম লাঠি দিয়ে তাকে আটকে দিলেন। এই বেটা, দাঁড়াও। কই যাও?
শেহরান ভ্রু কুঁচকে হাজেরা বেগমের দিকে তাকালো।
মাইরা হা করে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝার চেষ্টা করছে দাদি আসলে কি বলছে।
হাজেরা বেগম শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার নাতনিকে কষ্ট দিয়ে আবার আমার নাতনির কাছে আসছো? লজ্জা করছে না? বেহায়া পুরুষমানুষ।
মাইরা আর শেহরান দুজনেই ভেবাচেকা খেয়ে গেল।
মাইরা বিষম খেয়ে শেহরানের দিকে তাকালো। শেহরানও ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
মাইরা একটু হেসে দাদির পিছনে গেল। দাদির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, দাদি, তুমি এসব কি বলছো?
হাজেরা বেগম মাইরার কথা ভালো বুঝতে পারলেন না। তাই চিল্লিয়ে বললেন, কি বললি? ও তোরে কিস করবে?
হাজেরা বেগমের কথা শুনে শেহরান বিষম খেলো। কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ।
মাইরারও একই অবস্থা। আরে দাদি, কিস না। তুমি এসব কি বলছো?
আরে ছুরি, তুই চুপ কর। আমি যা করছি চুপচাপ দেখ। বলেই হাজেরা বেগম মাইরাকে থামিয়ে দিলেন।
দাদির ধমক শুনে মাইরা চুপ করে গেল।
রফিক মিয়া হাজেরা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মাওই মা। ওরা ঝগড়া করবে কেন? ওরা তো আজই বেড়াতে এসেছে।
রফিক মিয়াকে আর কিছু বলতে দিলেন না হাজেরা বেগম।
আরে রফিক, তুমি বুঝবা না। আমারে চুলগুলো এমনি এমনি পাকে নাই। আমি ওদের কথা-বার্তা দেখেই বুঝছি কিছু একটা হইছে। ওরা ঝগড়া করছে।
মাইরা অবাক চোখে তাদের দিকে তাকালো। দাদি কিভাবে বুঝলো?
রফিক মিয়া মাইরার দিকে তাকালেন। মাইরা, মাওই মা এসব কি বলছেন? সত্যি এসব?
মাইরা সাথে ডানে-বামে মাথা নাড়ালো।
রফিক মিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।
শেহরান এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার দাদির দিকে এগিয়ে গেল।
দেখুন দাদি, আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি। আপনি ভুল বুঝছেন।
হাজেরা বেগম কান খাড়া করে বললেন, কি কি কইলা? তোমাদের মধ্যে বাগড়া হয়নি?
বাগড়া না দাদি, ঝগড়া।
ওহ! তাই? একদম মিছা কথা কইবা না। আমি সব বুঝি। তাই আমার নাতনি আমি দিমু না। তুমি এখন যাইতে পারো। রফিক, তোমার জামাইরে লইয়া তুমি বাড়িতে যাও। আমি আমার নাতনি আর দিমু না।
শেহরান এবার রাগি চোখে মাইরার দিকে চাইল।
মাইরা যেন বুঝে গেছে দাদি কি চায়। তাই দাদির সাথে পাল্লা দিয়ে ভাব দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিড়বিড় করে বলল, ঠিক আছে, এবার মজা বুঝুন।
শেহরান দাদিকে মানানোর উদ্দেশ্যে বলল, দাদি প্লিজ দেখুন। আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের মাঝে কিচ্ছু হয়নি। মাইরার সাথে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। বলেই শেহরান একটু এগিয়ে যেতে নিল।
হাজেরা বেগম হাতের লাঠিটা দিয়ে শেহরানকে একটা খোঁচা দিলেন।
শেহরান একটু ব্যথা পেয়ে পিছিয়ে গেল।
মাইরা চোখ বড় বড় করে দাদির দিকে তাকালো। দাদি, তুমি এসব কি করছো? উনি ব্যথা পেলেন তো। বলেই ও শেহরানের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি ঠিক আছেন?
শেহরান হাঁটুতে হাত দিয়ে মাইরার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল। মনে মনে বলল, আমাকে অপদস্ত করে এখন আবার ঢং দেখাতে আসছে।
মাইরা অপরাধীর মতো মাথা নত করে শেহরানের হাঁটুর দিকে হাত দিতে গেল।
শেহরান একটু পিছিয়ে গেল।
মাইরার হাতটা থেমে গেল। মাথা তুলে শেহরানের মুখের দিকে চাইল। শেহরানও ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মাইরা একটু পিছিয়ে গেল। আসলেই মানুষের স্বভাব কখনো পরিবর্তন হয় না।
হাজেরা বেগম সবটা পর্যবেক্ষণ করলেন। মূলত তিনি ওদের সম্পর্কটা কেমন দেখার জন্যই এমনটা করেছেন। আর তিনি খুব সহজেই বুঝেও গেলেন কাহিনী অন্য কিছু। তাই তিনি কাশতে কাশতে শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ আমি আমার নাতনি দিমু না।
শেহরান আশাহত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালো।
কিন্তু হাজেরা বেগম তার সিদ্ধান্তে অনড়।
এবার রফিক মিয়া বললেন, দেখুন মাওই মা, ওরা যেহেতু স্বামী-স্ত্রী। ওদের যদি ঝগড়া হয়েও থাকে, ওদেরটা ওরাই মিটিয়ে নেবে। আপনি আমি ওদের মধ্যে না ঢোকাটাই ভালো। তাই বলছি কি, আপনি মাইরাকে ছেড়ে দিন। আর না হয় এক কাজ করুন, আমি দুজনকে আপনার কাছে রেখে যাচ্ছি। কাল সকাল হলে না হয় ওরা বাড়িতে যাবে।
সাথে সাথে হাজেরা বেগম বললেন, একদম না রফিক। তুমি তোমার জামাইরে লইয়া বাড়িতে যাও। আমি আমার নাতনি দিমু না তো দিমু না।
রফিক মিয়া শেহরানের দিকে তাকালেন।
শেহরান দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে দাদি। আপনাকে আপনার নাতনি দিতে বলছি না। কিন্তু আমিও এখানেই থাকবো।
মাইরা অবাক হয়ে শেহরানের দিকে চাইল। এই লোক পাগল হয়েছে, কি বলছে।
রফিক মিয়া শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, শেহরান, তুমি এখানে থাকতে পারবা?
শেহরান কিছু বলতে যাচ্ছিল।
মাঝপথে হাজেরা বেগম বলে উঠলেন, কও কি রফিক? তোমার জামাই কি এমপি মন্ত্রী নাকি যে আমার বাড়িতে থাকতে পারবে না?
রফিক মিয়া হাহা করে হাসলেন। মাওই মা, আপনি জানেন না। ওহ আপনাকে কেউ বলেনি?
সাথে সাথে শেহরান বলল, আহ মামা, থামুন। কিছু বলতে হবে না। তারপরে বলল, আমি এখানেই থাকবো। কোনো সমস্যা হবে না। আপনি গেলে চলে যান।
রফিক মিয়া আর কিছু বললেন না। ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারটা ওদের মধ্যেই ছেড়ে দিলেন।
উনি মাইরার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। মাইরা মামাকে আস্বস্ত করলো যে সবটা সে সামলে নেবে। রফিক মিয়া চলে গেলেন।
হাজেরা বেগম শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, চইলা যেহেতু আইছোই, তাড়াই দিমু না। কিন্তু আমার নাতনির লগে কথাও কইতে দিমু না। তুমি ওই পাশের ঘরটাই ঘুমাবা।
হাজেরা বেগম লাঠি দিয়ে ইশারা করলেন।
শেহরান মাইরার দিকে বিরক্ত চোখে তাকালো। মাইরা পাত্তা দিলো না। রুমের দিকে চলে গেল।
হাজেরা বেগম শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি আসো আমার সাথে। বলেই লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন।
শেহরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাজেরা বেগমের পিছে পিছে এগিয়ে গেল।
হাজেরা বেগম শেহরানকে নিয়ে ছোট ছেলের রুমে নিয়ে গেলেন।
শেহরান রুমের চারপাশটা দেখলো। রুমটা বেশ বড়, অনেক গোছালো। হাজেরা বেগম একটা লুঙ্গি এনে শেহরানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। এই নাও, এইটা পইড়া এই ঘরে ঘুমাই যাও। রাইতে খাওনের মতো কিছু নাই। সকালে খাইবা।
শেহরান দাদির হাত থেকে লুঙ্গিটা নিয়ে নিলো। সমস্যা নেই দাদি, আমি ম্যানেজ করে নিবো।
হাজেরা বেগম শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাপ-মা মরা নাতনি আমার। তুমি তারে কখনো কষ্ট দিও না।
শেহরান অবাক হয়ে দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ওনারা কিভাবে মারা গেছে?
হাজেরা বেগম বিছানায় বসলেন। শেহরানের দিকে তাকিয়ে চোখের চশমাটা খুলে চোখ মুছলেন। চোখে পানি। শেহরান এগিয়ে গিয়ে দাদির পাশে বসলো।
হাজেরা বেগম বলতে লাগলেন, মাইরার যখন দশ বছর, আমার বড় পোলা আর পোলার বউ চিটাগাং যাচ্ছিল।
আমার পোলা চাকরি করতো চিটাগাং। মাইরা আর ওর মা দুজনেই আমার কাছেই বাড়িতে থাকতো। একবার আমার বড় পোলা বাড়িতে আইলো আর কইলো, আম্মা আমি তোমার বউমা আর মাইরাকে নিয়ে যাইতে চাই। কিছু দিনের জন্য আমার সাথে।
কথাটুকু বলে থামলেন হাজেরা বেগম। তারপরে চোখ মুছে আবার বলা শুরু করলেন, আমি আমার পোলারে মানা করি নাই। বউ নিয়া যাইতে চায় ভালো কথা। কিন্তু আমি কইলাম আমার নাতনিটারে রাইখা যাইতে। ওরা ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগতো না। আমার পোলাও রাজি হইয়া গেল। পরেরদিনই ওরা চিটাগাং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। পথের মধ্যেই ওদের গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে। দুজনেই মারা গেল।
হাজেরা বেগম কথাটা বলেই চুপ করে গেলেন। চশমাটা আবার চোখে দিলেন।
কিন্তু চোখের পানি আটকাতে পারলেন না। চুপচাপ বসে রইলেন। মাথা নিচু করে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন।
শেহরান পাশে বসে ছিল। কিছু বলল না প্রথমে। শুধু হাজেরা বেগমের কাঁপা হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল।
একটু পর আস্তে করে বলল, দাদি।
হাজেরা বেগম উত্তর দিলেন না।
শেহরান আবার বলল, কাঁদবেন না।
হাজেরা বেগম এবার মুখ তুলে তাকালেন। বাপ-মা হারা মেয়েটা আমার। কত ছোট ছিল তখন। কিছুই বুঝতো না।
শেহরান চুপ করে শুনলো। তারপর আস্তে করে বলল, আমি জানতাম না দাদি।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
শেহরান উঠে গিয়ে টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি এনে দিল।
এই নেন পানি খান।
হাজেরা বেগম পানিটা হাতে নিলেন।
চুমুক দিয়ে বললেন, তুমি রাগ করে আসছো তাই না?
শেহরান মাথা নাড়ল। না। টেনশন হচ্ছিলো। আমি জানি না তোমাদের দুজনের মাঝে কি হয়েছে। কিন্তু যাই হয়ে থাক, নিজেরা নিজেরাই ঠিক করে নিবে সবসময়। আমার নাতনি ছোট মানুষ। ভুল অন্যায় করলে তুমি ওরে বুঝাইয়া কইও। ও ঠিক বুঝবো তোমার কথা।
শেহরান হালকা হাসলো। ঠিক আছে দাদি।
হাজেরা বেগম ছেলের মতো করে শেহরানের মাথায় হাত রাখলেন। তুমি ওরে সামলায়া রাইখো। আমার বয়স হইছে। আমি তো ওরে দেখতে পারি না। ছোটকালে ওর মামা ওরে নিয়া গেছে। আমার ছোট পোলার বউ রাখবো না দেইখা। আমি ওরে রাখতে পারি নাই নিজের কাছে। দাদুভাই আমার একটাই চাওয়া, আমার নাতনিটাকে তুমি দেইখা রাইখো। কখনো তুমি ওরে একা ছাইরো না।
শেহরান কিছু বলল না। শুধু দাদির হাতের উপর নিজের হাতটা রাখলো।
হাজেরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আচ্ছা ভাই তাহলে তুমি ঘুমাও, আমি যাইগা। বলেই হাজেরা বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শেহরান ওনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপরে হাতের রাখা লুঙ্গিটা পড়ে ফেলল। এখন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। শেহরান আর কিছু না ভেবে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রাত হয়ে গেছে অনেক। বিছানায় শুয়ে শেহরানের কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো। বুকের মধ্যে ছটফট করছে। বিছানায় এপাশ ওপাশ ফিরতে লাগলো।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৭
রাত হয়েছে গভীর। আনুমানিক ১২:৩০।
মাইরা পাশে তাকিয়ে দেখলো দাদি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। নাক ডাকছে জোরে জোরে। মাইরা আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। ওড়নাটা নিয়ে দরজার দিকে এক পা বাড়াতেই হাজেরা বেগম বলে উঠলেন, এই ছুরি কই যাস?
মাইরার পা জোড়া থেমে গেল।
