Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১১

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১১
অধরা মিনহা

আনতারা চুপচাপ বসে বই পড়ছে। হঠাৎ কানে এল অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ শব্দ। শব্দটা শুনে সে বেডের দিকে তাকাতেই দেখে, ইফরাদের মাথার পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে চলেছে। অ্যালার্মের শব্দে ইফরাদের ঘুম ভেঙে গেছে। সে বিরক্ত মুখে চোখ মুখ কুচকে, চোখ বন্ধ রেখেই হাতড়ে ফোনটা খুজে নেয়। তারপর ধীরে চোখ খুলে অ্যালার্মটা বন্ধ করে। মুখে তখনো ঘুমঘুম ভাব আর হালকা বিরক্তির ছাপ। ফোনটা আবার জায়গামতো রেখে ধীরে উঠে বসলো।
চারপাশে তাকাতে গিয়ে তার চোখ গিয়ে থামে পাশে রাখা চেয়ার টেবিলের দিকে। সেখানে আনতারা বসে আছে, হাতে গতকালের একটা বই। তবে বই পড়ার বদলে আনতারা ইফরাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইফরাদ বেড থেকে নেমে উঠে দাড়িয়ে একটু অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নিজের কালো টি শার্টটা টেনে ঠিক করে, তারপর স্লিপার পায়ে দিয়ে কোনো কথা না বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। ইফরাদ চলে যেতেই আনতারা আবার বই পড়ায় মন দেয়। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছে কাভার্ডের সামনে গিয়ে কাভার্ডটা খুলে।
ইফরাদকে কাভার্ডের কাছে যেতে দেখে আনতারা বই বন্ধ করে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— কোথাও যাচ্ছেন আপনি?
ইফরাদ কাপড় বের করতে করতে স্বাভাবিক কন্ঠেই বলে,
— হুম। আজকে আমাদের বিজনেসের নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ হবে। সন্ধ্যায় ইভেন্ট আছে।
আনতারা ছোট করে বলে,
— ওহ।
ইফরাদ কাভার্ড থেকে একটা স্কাই ব্লু টি-শার্ট আর পিচ রঙের প্যান্ট বের করে। কোনো অস্বস্তি কিংবা সংকোচ ছাড়াই পরনের টি শার্ট খুলে স্কাই ব্লু টি-শার্ট টা পড়ে নেয়। তারপর কোমরে টাওয়াল পেঁচিয়ে দ্রুত প্যান্ট বদলে ফেলে। সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে হাত চালিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নেয়।
আনতারা এবার নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

— খেয়ে যাবেন না?
ইফরাদ উদাস গলায় বলে,
— হুম।
বলেই পাল্টা জিজ্ঞেস করে,
— খেয়েছো তুমি সকালে?
আনতারা ভদ্রভাবে বলে,
— জি, খেয়েছি।
— কী খেয়েছো?
আনতারা হালকা হাসি নিয়ে বলে,
— সারীদ আর খেজুর খেয়েছি।
ইফরাদ পারফিউম স্প্রে করছিলো গায়ে। কথাটা শুনে সে থেমে যায়। ভ্রু কুঁচকে, খানিকটা অবাক কণ্ঠে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— এটা আবার কী?
আনতারা মুচকি হেসে বলে,
— রুটিকে গরুর মাংসের ঝোলের মধ্যে কিছুইক্ষণ ভিজিয়ে রেখে খাওয়াকে সারীদ বলে। সারীদ একটা সুন্নতি খাবার। আমাদের নবিজি (সা.)-এর খুব পছন্দের ছিল।
ইফরাদ আনতারার মুখের হাসিটা খেয়াল করে। চোখ সামান্য সরু করে বলে,
— তোমারও অনেক পছন্দের মনে হচ্ছে?
আনতারা এবার একটু লজ্জা মেশানো হাসি দিয়ে বলে,
— জি, আমার খুব ভালো লাগে সীরাদ খেতে। এটা অনেক সুস্বাদু। আপনার কেমন লাগে খেতে?
ইফরাদ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলে,
— আমি কখনো খাইনি সীরাদ।
— কখনোই না?
— না। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি।
বলে ইফরাদ বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আনতারা হঠাৎ একটু তাড়াহুড়ো করে পেছন থেকে ডাক দেয়,

— শুনুন
ইফরাদ দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনি আনতারার ডাকে থেমে যায়। দাঁড়িয়ে পড়ে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পেছনে তাকায়। আনতারা দ্রুত উঠে ইফরাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আনতারা ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দে কিছু পড়তে শুরু করে। ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে, চোখ সামান্য সরু করে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে চেষ্টা করছে, আনতারা ঠিক কী করছে।
আনতারা কোনো শব্দ না করে শুধু ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে পড়তে থাকে,
— আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহু ওয়া খাইরা মা ফীহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহি ওয়া শাররি মা ফীহি।
একটু থেমে আগের মতোই আবার পড়তে থাকে,

— রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।
দোয়া পড়া শেষ করে আনতারা ইফরাদের দিকে ঝুকে ইফরাদের সারা শরীরে ফুঁ দেয়। ইফরাদ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো বাধা দিল না, কোনো প্রশ্নও করল না। বরং শান্ত, নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আনতারার দিকে। ইফরাদের মুখে এখন আর আগের মতো কোনো বিরক্তি নেই। চেহারায় একধরনের স্থিরতা ফুটে উঠেছে।
আনতারা ফুঁ দেওয়া শেষ করে মৃদু হেসে নরম কণ্ঠে বলে,
— ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর উপর আস্থা রাখবেন। সাফল্য আল্লাহই দান করবেন।
বলেই আনতারা হালকা সংকোচ আর ভদ্রতা মেশানো কন্ঠে বলে,
— আমি নিচে যেতাম আপনার সাথে কিন্তু নিচে অনেক পরপুরুষ আছে, তাই যেতে পারছি না। এটার জন্য আপনি কোনো দাবি রাখবেন না।
— সমস্যা নেই। আমি যাই এবার।
— আচ্ছা, সাবধানে যাবেন।

ইফরাদ দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। আনতারা দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে এসে শান্ত ভঙ্গিতে জায়নামাজ বিছিয়ে দেয় মাটিয়ে। আনতারার আগেই ওযু করা ছিল। সে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নফল নামাজের নিয়ত করে। শান্তভাবে, মনোযোগী হয়ে নামাজ পড়তে থাকে। এই নফল নামাজের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইফরাদের আজকের ব্যবসায়িক কাজে যেন আল্লাহ সফলতা দান করেন। কোনো ভালো কাজের আগে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নফল নামাজ পড়া উত্তম। এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। এবং সেই কাজে বরকত আসে। ফলাফল কল্যাণকর হয়। দুই রাকাআত নফল নামাজ শেষ করে আনতারা হাত তুলে মোনাজাতে ধরে,

— হে আল্লাহ, আপনি ওনাকে হালাল রিজিক, সফলতা ও সব ধরনের কল্যাণ দান করুন এবং ওনাকে সব বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
চৌধুরী গ্রুপের পারফিউম লঞ্চ ইভেন্ট হচ্ছে ঢাকার InterContinental Dhaka হোটেলে। আন্তর্জাতিক মানের এই হোটেলটা দেশের অন্যতম বড় ও বিলাসবহুল। ইভেন্ট উপলক্ষে পুরো জায়গাটা নতুন করে সাজানো হয়েছে। চারপাশে সাদা লিলি ফুলের সাজ। লিলি ফুল দিয়ে সাজানোর একটা বিশেষ কারণ আছে। তাদের মূল পারফিউমটা লিলি ফ্রেগ্রেন্সের। তাই ডেকোরেশনও রাখা হয়েছে সেই সুগন্ধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। ইফরাদ, ইরাইনা এবং ইফতিন ব্যস্তভাবে পুরো আয়োজন তদারকি করছে। কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কিনা, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা, সবকিছু তারা খেয়াল রাখছে খুব মনোযোগ দিয়ে।
ইফরাদ ঘুরে ঘুরে মিডিয়া জোন পরিদর্শন করছে। তার ঠিক পেছনেই সাফিন ঘুরছে। সকাল থেকেই সাফিন ইফরাদের পেছনে ছায়ার মতো লেগে আছে। অবশ্য এটাই তার কাজ। হঠাৎই ইফরাদের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। সে ফোন বের করে দেখে, ইরাইনা হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়েছে। কি ছবি পাঠিয়েছে জানার আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলো খুলতেই ইফরাদের চোখ স্থির হয়ে যায়। ইরাইনা তিনটা ছবি পাঠিয়েছে। ছবিগুলো গতকাল সন্ধ্যার। ছবিগুলো তখনকার, যখন আনতারা ইফরাদকে খাইয়ে দিচ্ছিল।

একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইফরাদ ফোনে কথা বলছে আর আনতারা তার মুখের সামনে লোকমা ধরে আছে। আরেকটাতে, ইফরাদ ফোনে কথা বলতে বলতে আনতারার হাত থেকে সেই লোকমা খাচ্ছে। তৃতীয় ছবিটাতে, ইফরাদ খেতে খেতে আনতারার দিকে তাকিয়ে আছে। ইফরাদের এমন মনোযোগী দৃষ্টি দেখে সাফিনের কৌতূহল জাগে। সে একটু উঁকি দিয়ে ফোনের স্ক্রিন দেখতে চায় কিন্তু মোবাইল স্ক্রিন বন্ধ। সে আবার ইফরাদের দিকে তাকাতেই দেখে, ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
সাথে সাথে সাফিন হ্যাবলার মতো হেসে বলে,

— কিউরিওসিটি থেকে উঁকি দিয়ে ফেলেছি। ক্ষমা করবেন স্যার৷
ইফরাদ বিরক্তি নিয়ে চোখ সরিয়ে কণ্ঠে কিছুটা ঝাঁঝ মিশিয়ে বলে,
— এদিকটা ভালো করে দেখো। একটুও যেন এদিকসেদিক না হয়। হলে তোমার এদিকসেদিক করে ফেলবো!
সাফিন চুপসে গিয়ে বলে,
— ওকে স্যার।
ইফরাদ সেখান থেকে সরে যায়। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় ফ্রেগ্রেন্স এক্সপেরিয়েন্স জোনে, যেখানে ইরাইনা আছে।
সেখানে গিয়ে দেখে, ইরাইনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেবিলের উপর ছোট ছোট পারফিউম কিট সাজানো দেখছে। স্টাফদের দিয়ে সবকিছু নিখুঁতভাবে গুছিয়ে নিচ্ছে।
ইফরাদ গিয়ে সেখানে থাকা তিনজন স্টাফকে বলে,

— তোমরা এখন এখান থেকে যাও।
স্টাফরা চলে যায়। ইরাইনা স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। ওরা যেতেই ইফরাদ সরাসরি বলে উঠে,
— কিসব ছবি পাঠিয়েছো তুমি?
ইরাইনা দুষ্টামির সুরে বলে,
— দেখোনি?
ইফরাদ বিরক্ত দৃষ্টিতে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।
ইরাইনা আবার বলে,
— কালকে একটা কাজে তোমার কাছেই এসেছিলাম। তখন দেখি রুমে এই ঘটনা। আই নো, কারো পারমিশন ছাড়া তার রুমে উঁকি দেওয়া ঠিক না। বাট একটা থ্যাংক ইউ আমি ডিজার্ভ করি, এতো সুন্দর মোমেন্টটাকে ক্যাপচার করে রাখার জন্য।
ইফরাদ বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,

— কিসের থ্যাংকস আর কিসের সুন্দর মোমেন্ট? এটা কোনো সুন্দর মোমেন্ট না, ওকে?
ইফরাদের কথা শুনে ইরাইনা অবাক হয়। তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখে ভেসে উঠল সন্দেহ। সে ভেবেছিল ছবিগুলো দেখে ইফরাদ লজ্জা পাবে কিংবা খুশি হবে। কিন্তু তার বদলে ইফরাদের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। ইরাইনার ওমন সন্দিহান দৃষ্টি দেখে ইফরাদ জোরে শ্বাস ফেলে। নিজেকে শান্ত করে ইরাইনাকে বোঝানোর মতো করে বলে,
— লিসেন, আমি জাস্ট কথাটা তোমাকেই বলছি। কালকে লিভিং রুমে যা যা বলেছি, সব মিথ্যে ছিল। আনতারাকে আমি কখনো বউ হিসেবে মানি নি আর মানবও না। আমি ওকে ছয় মাস পরে ডিভোর্স দিয়ে দেব। তাই ওর সঙ্গে আমার কোনো রোমান্টিক সিন হতে পারে না।
এই কথা শুনে ইরাইনা যেন আকাশ থেকে পড়ে। এমন কিছু সে একদমই আশা করেনি। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— এসব কখন ভাবলে তুমি?
ইফরাদ পাল্টা জানতে চাইল,
— ডিভোর্সের কথা বলছো?
— হুম!
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,
— ডিভোর্সের কথা তো আমি বিয়ের আগেই ভেবে রেখেছি। আনতারাকে বিয়েই করেছি এই ভেবে যে ছয় মাস পর ডিভোর্স দিয়ে দেব।
ইরাইনা অবাক হয়ে বলে,
— বিয়ের সময় পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল, কিন্তু এখন তো সব বদলে গেছে!
ইফরাদ ঠান্ডা গলায় বলে,
— কোনো কিছুই বদলায়নি, সব আগের মতোই আছে।
ইরাইনা এবার একটু নরম হয়ে আসে,

— তোমার মনে কি আনতারা বউ হিসেবে একটু জায়গাও পায়নি?
ইফরাদ বিদ্রুপ হেসে বলে,
— আনতারাকে যদি কখনো বউ হিসেবে মানতাম, তাহলে না হয় জায়গা পেত।
ইরাইনার এবার রাগ হয়। শক্ত মুখে জিজ্ঞেস করে,
— যদি বউ হিসেবে না মানো, তাহলে আনতারা ক্যামেরার সামনে আসতে চায়নি বলে ওই মহিলার ফোন ভেঙেছিলে কেন? নিজের ফ্যানদের সামনে খারাপ হলেও? আনতারার জন্য এতো অস্থির হলে কেন?
ইফরাদ এবার গম্ভীর গলায় বলে,

— কারণ আমি নিজের লাভটাই দেখছি। ছয় মাস পর যখন আমি আনতারাকে ডিভোর্স দেব তখন মিডিয়া ওর পেছনে ঘুরবে। তখন যদি আনতারা আমাদের বিয়ের আসল ঘটনা ফাঁস করে দেয়? তাই আমি চাই না আনতারা মিডিয়ার সামনে আসুক বা কেউ ওকে চিনুক। ছয় মাস পর ডিভোর্স হলে ও আমার জীবন থেকে সরে যাবে, আর এসব ঘটনাও চাপা পড়ে যাবে।
ইরাইনা ইফরাদের কথাগুলো মেনে নিতে পারছে না। রাগ চেপে বলে,
— তাহলে সেদিন আনতারাকে হোটেলের মেয়ে বলায় তুমি এত রেগে গেলে কেন?
ইফরাদ আগের মতোই বলে,
— মানুষ আনতারাকে আলাদা করে চেনে না, ওকে চেনে আমার পরিচয়ে। ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউ হিসেবে। এখন আমার বউকে খারাপ কথা বলা মানে আমাকে বলা। আমি যে সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছি, সেটা যেমন হেডলাইনে এসেছে, আমি যদি কিছু না বলতাম, তাহলে হেডলাইন হতো ‘ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউকে হোটেলের মেয়ে বলেছে এক সাংবাদিক’। সো আমি নিজের সম্মানটাই বাঁচিয়েছি।

— বাকি দুটো কারণ তো বুঝলাম। কিন্তু মাম্মার সঙ্গে বলা কথাগুলো? মাম্মা আনতারার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে তোমার এত খারাপ লাগল কেন? ওই বিষয়টা তো মিডিয়ায় যাচ্ছিল না। তাহলে আনতারার পক্ষ নিয়ে মাম্মার সঙ্গে ঝগড়া করলে কেন?
ইফরাদ এবার একটু নরম স্বরে বলে,
— কারণ আমি চাই না ও কারো কাছে অত্যাচারিত হোক। আমি যদি কাল ওর পক্ষ না নিতাম, তাহলে মাম্মা আবার ওকে খাবার নিয়ে কষ্ট দিত। যেহেতু ছয় মাস ও এই বাড়িতে থাকবে, অন্তত খাবার নিয়ে কষ্ট না পায়। এই সময়টা যেন ভালোভাবে থাকতে পারে।
ইরাইনা সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠে,
— আর তুমি? তুমি ওর সাথে ভালো ব্যবহার করবে তো?
ইফরাদ বাঁকা হেসে বলে,
— আমি ওর জোর করে বিয়ে করা হাসবেন্ড। ওকে অত্যাচার করার অধিকার আমার আছে।
ইরাইনা কপাল কুঁচকে বলে,
— একটু আগেই তো বললে তুমি ওকে বউ মনে করো না।
ইফরাদ এবার শব্দ করে হেসে বলে,

— না মানা বউয়ের ওপর তো আরও বেশি অত্যাচার করার অধিকার আছে।
— আনতারাকে বউ হিসেবে মানতে চাও না কেন? কী কারণ? আনতারা কি সুন্দর না?
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে বলে,
— আনতারা সুন্দর কিন্তু একটা ফিলিংসের ব্যাপার আছে। ওর জন্য আমার কখনো কোনো অনুভূতি আসেনি, আর ভবিষ্যতেও আসবে না। কারণ ও আমার টাইপ না।
ইরাইনা সন্দেহের সুরে বলে,
— তাহলে কি সোনিয়ার জন্য এখনও তোমার মনে কিছু আছে? তাই আনতারার জন্য ফিলিংস আসছে না?
ইফরাদ নির্লিপ্তভাবে উত্তর দেয়,
— সোনিয়ার সাথে যা ছিল, দেড় বছর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। যদি কোনো ফিলিংস থাকত, তাহলে আজ আমরা একসাথে থাকতাম।
এবার ইরাইনা চুপ হয়ে যায়। ইফরাদ ইরাইনাকে চুপ থাকতে দেখে চলে যেতে উদ্যত হয়। ঠিক তখনি পেছন থেকে ইরাইনা আবার ডেকে ওঠে,

— তুমি বলছো আনতারাকে বউ মানো না, ওর প্রতি কোনো ফিলিংসও নেই। অথচ ও না খেয়ে আছে বলে তুমি নিজে বাইরে গিয়ে খাবার এনে দিলে! ব্যাপারটা কেমন না? এতটা ব্যাকুল হলে কেন?
এই প্রশ্নে ইফরাদ কিছুটা থমকে যায়। তার চেহারায় ধরা পড়ে যাওয়ার অস্বস্তি ফুটে ওঠে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলে,
— বললাম তো, ফিলিংস নেই। আসলে ও রোজা রেখেছে। এখন যদি ইফতার করতে না পায় আর কষ্ট পেয়ে বদদোয়া দেয়? ও তো কুরআনে হাফেজা। ওর বদদোয়া তো সরাসরি কবুল হয়ে যাবে! সেই ভয়েই বাইরে থেকে খাবার এনেছি।
ইরাইনা হেসে ফেলে। ইফরাদের অস্বস্তি তার চোখ এড়ায় না। ইফরাদকে সে কথায় ধরতে পারছে।
— আচ্ছা, রোজা রেখেছে বলে খাবার এনেছো, এটা বুঝলাম। কিন্তু আনতারার হাত থেকে লোকমা খাওয়ার বিষয়টা? তুমি তো কারো হাত থেকে খাও না। তোমার তো অরুচি লাগে! এমনকি আমরা খাবারে হাত দিলেও তুমি সেটা খাও না। খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মানুষ তুমি।
শেষ কথাটা বলার সময় ইরাইনা ভ্রু উঁচিয়ে হেসে তাকায়। ইফরাদ একটু তোতলাতে তোতলাতে বলে,

— বললামই তো, ও কুরআনে হাফেজা। মুখের সামনে লোকমা ধরছিল! যদি না খেতাম, পরে বদদোয়া দিয়ে দিত? তাই খেয়েছি। আর ওর হাত স্যানিটাইজ করা ছিল!
ইরাইনা ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে। সেটা দেখে ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— হাসছো কেন?
ইরাইনা হেসে বলে,
— তুমি ফেঁসে গেছো, ব্রো!
ইফরাদ থমকে গিয়ে বলে,
— আমি ফাঁসবো কেন?
ইরাইনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলে,
— মুখে বলছো বউ মানো না কিন্তু মনে ঠিকই আনতারার জন্য ফিলিংস তৈরি হচ্ছে। আমি যে ছবিগুলো পাঠিয়েছি, সেগুলো ভালো করে দেখলেই বুঝবে।
ইফরাদ বিরক্ত হয়ে বলে,

— অতিরিক্ত চাপের কারণে তুমি পাগল হয়ে গেছো। গিয়ে রেস্ট নাও।
এই কথা বলে সে আর দাঁড়ায় না। দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। আসলে ইরাইনা তাকে কথার জালে আটকে ফেলছিল। তার প্রতিটা প্রশ্ন ইফরাদের নিজের মনকেই নাড়িয়ে দিচ্ছিল। আনতারাকে নিয়ে এমন এমন প্রশ্ন করছিল, যার জবাব দিতে গিয়ে ইফরাদ নিজেই দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিল। আর একটু সময় থাকলে হয়তো ইরাইনা তার মুখ থেকেই স্বীকার করিয়ে নিত, সে আনতারাকে ভালোবাসে। কি আশ্চর্য!

বিকেলের দিকে ইফরাদ, ইরাইনা আর ইফতিন রেস্ট রুমে গিয়ে ইভেন্টের জন্য রেডি হয়ে নেয়। ইফরাদের পরনে ছিল কালো শার্ট, কালো প্যান্ট এবং তার ওপর সাদা ব্লেজার। একেবারে স্মার্ট ও পরিপাটি লুক। ইফতিনও কালো শার্ট, কালো প্যান্ট আর কালো ব্লেজারে। আর ইরাইনা পরেছিল ব্ল্যাক অফ-শোল্ডার মিনি ফ্লেয়ার ড্রেস, যেটাতে ইরাইনাকে খুবই সুন্দর লাগছিলো। তিন ভাইবোনই একসাথে পুরো পার্টির আকর্ষণ। কিছুক্ষণ পর শার্লিন ইমরোজ ও ইখতিয়ার চৌধুরীও রেডি হয়ে সেখানে উপস্থিত হন। সবাই মিলে অতিথিদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয়।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, সব অতিথিরা আসতে থাকে। আর ঠিক ছয়টা বাজতেই ইভেন্ট শুরু হয়। একজন একজন করে মডেল, অভিনেতা, অভিনেত্রী আর ইনফ্লুয়েঞ্জাররা এসে পৌঁছাতে থাকে। তারা গাড়ি থেকে নেমে লাল কার্পেট ধরে হেঁটে ভেন্যুর ভেতরে ঢুকছিল। কার্পেটের দুপাশে কালো ব্যারিকেড, তার ওপর ছোট ছোট স্পটলাইট জ্বলছে, যা পুরো জায়গাটাকে আরও ঝলমলে করে তুলছিল। সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক জ্বলে উঠছিল, আর সব ফোকাস ছিল অতিথিদের উপর।

রেড কার্পেট শেষ হলেই একপাশে ছিল মিডিয়া জোন। একটু উঁচু প্ল্যাটফর্মের মতো করে সাজানো জায়গা, যাতে সবাই স্পষ্টভাবে দেখতে পারে। সেখানে বিভিন্ন মডেল ও অভিনেত্রীরা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, আর সাংবাদিকরা মাইক্রোফোন হাতে লাইভ সম্প্রচার করছিল। তাদের পেছনে বড় করে লাগানো ছিল ‘চৌধুরী গ্রুপ’–এর লোগো, যার ওপর আলো পড়ে ঝকঝক করছিল। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় একটা বড় করিডোর, যার দুপাশে ছিল বিশাল ইনস্টাগ্রাম ওয়াল। একদিকে ছিল আর্টিস্টিক ডিজাইন, ফুল, নানা টেক্সচার আর ধাতব ফিনিশে লেখা ‘চৌধুরী গ্রুপ’ নাম।
অন্যদিকে ছিল আলো দিয়ে তৈরি মিনিমালিস্ট সাজসজ্জা, যা খুবই আধুনিক ও চোখে পড়ার মতো।
ভেতরের দিকে ছিল ফ্রেগ্রেন্স এক্সপেরিয়েন্স জোন। গোল করে সাজানো টেবিলগুলোর ওপর রাখা ছিল ছোট ছোট কাচের বোতল। মানুষ সেখানে কাগজে পারফিউম স্প্রে করে ঘ্রাণ নিচ্ছিল, নতুন অভিজ্ঞতা উপভোগ করছিল। তার পাশেই ছিল একটা আরামদায়ক লাউঞ্জ এরিয়া।
সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশ ছিল প্রাণবন্ত ও জমজমাট। ইফরাদ, ইরাইনা, ইফতিনসহ সবাই মিলে অতিথিদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছিল, আর চারদিকে উৎসবের মতো এক রমরমা আবহাওয়া ছড়িয়ে পড়ছে।

রাত তখন ঠিক বারোটা। আনতারা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। আসলে ঘুম আসেইনি। সে অপেক্ষা করছিল ইফরাদের জন্য। মনটা অস্থির হয়ে আছে। বারবার ভাবছে, ইফরাদ কখন ফিরবে, তার দিনটা কেমন কেটেছে, সব ঠিকঠাক হয়েছে তো? ইফরাদ আসলে বেলকনি থেকে দেখা যাবে। সেজন্য বেলকনিতে দাড়িয়ে ইফরাদেরই অপেক্ষায় আছে। অপেক্ষায় বেখেয়ালি করে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আনতারা।
হঠাৎ নিচে গাড়ির হর্ণের শব্দ কানে আসে। সে একটু ঝুঁকে নিচে তাকায়। গেট খুলে দুটো গাড়ি ভেতরে ঢুকে। প্রথমে নামে ইফতিন, তারপর ইফরাদ আর ইরাইনা। অন্য গাড়ি থেকে নামে ইখতিয়ার আর শার্লিন ইমরোজ। উপর থেকে সবই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আনতারার দৃষ্টি গিয়ে থামে ইরাইনার ওপর। পোশাকটা চোখে পড়তেই আনতারা থমকে গেল। গলা, ঘাড়, হাত, বুকের ওপরের অংশ, এমনকি হাঁটুর নিচ থেকেও খোলা। এমন নগ্নতা দেখামাত্র আনতারা চোখ নামিয়ে নেয়। খুব আস্তে নিজের অজান্তেই আনতারার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে আসে,
— আস্তাগফিরুল্লাহ।

আনতারা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। চুপচাপ বেলকনি ছেড়ে নিজের রুমে ফিরে আসে। রুমে এসে বসতেই কিছুক্ষণ পর দরজার কাছে কারোর পায়ের হেটে আসার শব্দ শোনা যায়। তারপরই দরজার হ্যান্ডেল ঘুরে দরজা খুলে গেল। ইফরাদ ঢুকে ভেতরে। আনতারা উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। ইফরাদও ক্লান্ত গলায় জবাব দেয়। সালামের জবাব দেওয়া শেষে ইফরাদের চোখ গিয়ে থামে রুমের ডান পাশে থাকা নতুন আনা বুকস্ট্যান্ডটার উপর। তাতে সুন্দর করে বই সাজানো। সন্ধ্যায় সাফিনের পাঠানো লোক এসে দিয়ে গিয়েছিল, তারপর আনতারা বইগুলো গুছিয়ে রেখেছে বুকস্ট্যান্ডে।
ইফরাদ সাদা কোট খুলে বেডে রাখতে রাখতে বলে,
— বাহ, সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলেছো বুকস্ট্যান্ড?
আনতারা ছোট করে বলে,
— জি।

ইফরাদ শার্ট খুলে বেডের মাথার দিকে গিয়ে বসে। আনতারা বসেছিল পায়ের দিকে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে আনতারা অস্থির হয়ে আছে। ইরাইনার পোশাকটা আনতারার চোখে লেগে আছে। বারবার মনে প্রশ্ন উঠছে, ইফরাদ কিছু বলে না কেন? নিজের বোন এমন পোশাক পরে সামনে আসে, তবু সে চুপ থাকে কিভাবে? তার কি একটুও অস্বস্তি হয় না?
এত মানুষের সামনে, বিশেষ করে পর পুরুষদের সামনে নগ্ন হয়ে থাকা কি লজ্জার না? ইফরাদের কি লজ্জায় মাথাটা নিচু হয় না? তার চোখের সামনে তার বোনের দিকে পরপুরুষরা বাজে নজরে তাকাচ্ছে, এসব কি ইফরাদের কাছে স্বাভাবিক লাগে? ইফরাদ, ইফতিন, কিংবা তাদের বাবা কিছু বলে না কেন? ভাবনাগুলো ধীরে ধীরে ভয়ে রূপান্তর করে আনতারার ভেতরে। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ এসব কি তাদের মনে পড়ে না? শাস্তির কথা ভাবলে কি একটুও ভয় লাগে না? আনতারার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়। এইসবের জন্য না জানি কত হিসাব জমা হচ্ছে!

শরীরের ক্লান্তি কিছুটা কমলে ইফরাদ উঠে দাঁড়ায়।টাওয়াল আর কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
আনতারা হঠাৎ ভাবে, ইরাইনার সঙ্গে তার কথা বলা দরকার। কিছু একটা করা উচিত। এভাবে ইরাইনার গুনাহের পাল্লা ভারী করা যাবে না। আনতারা উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও থেমে যায়। আগে ইফরাদের অনুমতি নিতে হবে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোথাও যাওয়া উচিত না। আনতারা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওড়নাটা ঠিক করে নেয়। মাথা থেকে শরীর পর্যন্ত ভালো করে জড়িয়ে নেয়। মুখটাও ঢেকে নেয়।
তারপর আবার এসে বেডে বসে ইফরাদের অপেক্ষা করতে থাকে। আজ ইফরাদ বেশি সময় নেয় না। সারাদিনের ক্লান্তি তাকে দ্রুত শাওয়ার শেষ করতে বাধ্য করেছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ইফরাদ বের হয়। ভেজা চুলে হাত চালাতে চালাতে। আনতারা উঠে দাঁড়ায়। একটু ইতস্তত করে ধীরে বলে,

— আমি একটু ইরাইনা আপুর কাছে যাই?
আনতারা আস্তে বলায় ইফরাদ ঠিকমতো শুনতে পায় না। সিউর হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করে,
— রাইনার রুমে?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি।
ইফরাদ এবার একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— হঠাৎ রাইনার রুমে কেন?
আনতারা আস্তে করে জবাব দেয়,
— একটু কাজ ছিল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইফরাদ বলে,
— আচ্ছা, যাও।

অনুমতি পেয়ে আনতারা রুম থেকে বেরিয়ে আসে। করিডোর পেরিয়ে ইরাইনার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। প্রথমবার ইরাইনার রুমে এসেছে। মনকে বুঝিয়ে অস্বস্তি ঠেলে দরজায় নক করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। সে আবার নক করে। এবার ভেতর থেকে ইরাইনার কণ্ঠ শোনা যায়,
— ওয়েট, খুলছি।
আনতারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। এক মিনিট, দুই মিনিট করে সময় বাড়তে লাগল। প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল কিন্তু দরজা আর খুলল না। সে মনে মনে ভাবে, পরে আসবে। সেজন্য ঘুরে চলে যাবে, ঠিক তখনি দরজাটা খুলে গেল। দরজাটা পুরোটা না খুলে অর্ধেক খুলে মাথা বের করে ইরাইনা। মাথায় তোয়ালে জড়ানো, মুখ ভেজা।
চুলগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে ভেজা। অর্থাৎ ইরাইনা মাত্রই গোসল করে বের হয়েছে।
আনতারা ইরাুনাকে দেখেই সালাম দেয়,

— আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
ইরাইনা আনতারাকে এই মুহুর্তে দেখে একটু অবাক হয়। বিকেলে ইফরাদের বলা কথাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল ইরাইনার। আনতারার মুখের দিকে তাকাতেই তার ভেতরে মায়া কাজ করতে লাগল। ভীষণ শান্ত, মায়াবী একটা মুখ। সত্যিই কি ইফরাদ আনতারাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে? তাহলে আনতারা কোথায় যাবে? তার তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গাও নেই। এইসব ভাবনা দ্রুত সরিয়ে রেখে ইরাইনা দরজাটা পুরো খুলে বলে,
— ওয়ালাইকুম সালাম।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— উহু, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহুআ’। সম্পূর্ণ সালামের জবাব দিলে বেশি ফজিলত।
ইরাইনা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে,

— ওহ। আমি শাওয়ার নিচ্ছিলাম, তাই দরজা খুলতে দেরি হয়ে গেল।
আনতারা নরম স্বরে বলে,
— সমস্যা নেই।
ইরাইনা একটু সরে দাঁড়িয়ে বলে,
— ভেতরে এসো।
আনতারা ভেতরে ঢুকতেই ইরাইনা দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর আনতারাকে বসতে ইঙ্গিত করে,
— বসো।
আনতারা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। রুমটা পিংক রঙের, সাজানো গোছানো। মাঝখানে বড় বেড, ডান পাশে কাভার্ড আর ড্রেসিং টেবিল। আর বাম পাশে সোফা রাখা, সামনে ছোট একটা টেবিল। সবকিছুতেই একটা পরিচ্ছন্নতা আর আধুনিকতার ছাপ। আনতারা গিয়ে বেডের পায়ের দিকটায় বসে। ইরাইনা বেডের মাথার দিকে বসে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে,

— কেমন আছো?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।
ইরাইনা মাথা নেড়ে বলে,
— গুড। সবকিছু ঠিকমতো চলছে তো?
— জি।
ইরাইনা খেয়াল করছে, আনতারা বারবার নিজের হাত দুটো কচলাচ্ছে। আনতারার চেহারায় একটা অস্বস্তি, একধরনের জড়তা স্পষ্ট। যদিও আনতারা সেটা আড়াল করার চেষ্টা করছে। ইরাইনার বুঝতে অসুবিধা হলো না, আনতারার মনে কিছু একটা চলছে, কিন্তু সেটা বলতে তার সংকোচ হচ্ছে। ইরাইনা আনতারাকে স্বস্তি দিতে কিছু বলতে যাবে,ঠিক তখনি আনতারা একটু ইতস্তত করে ধীরে জিজ্ঞেস করে,

— কিছু কথা বলার ছিলো। রাগ করবেন না তো?
ইরাইনা সরাসরি বলে,
— কথা শোনার আগে কিভাবে বলি রাগ করবো না? যদি রাগ করার মতো কথা হয় তাহলে তো অবশ্যই রাগ করবো।
এই উত্তর শুনে আনতারা চুপ হয়ে গেল। তার ভেতরে দ্বিধা কাজ করছে, কথাগুলো বলা ঠিক হবে কি না। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে আনতারা নিজের মনকে শক্ত করে। সে ভাবে, যেহেতু বলতে এসেছে, বলে ফেলাই ভালো। হয়তো কিছুটা রাগ হবে কিন্তু যদি বোঝাতে পারে, তাহলে অন্তত একটা ভালো কাজ হবে। না বললে নিজের কাছেই দায় থেকে যাবে।
একটু সাহস জোগাড় করে আনতারা ধীরে বলে,

— আপু? আপনি মুসলিম না?
প্রশ্নটা শুনে ইরাইনা অবাক হয়ে গেল। কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলে,
— এটা কেমন প্রশ্ন? অবশ্যই মুসলিম আমি।
আনতারা শান্ত স্বরে বলে,
— কিন্তু আপনার পোশাক তো বলে না আপনি মুসলিম। মুসলিমদের পোশাক তো এমন না। আল্লাহ মুসলিম নারীদের পর্দার ভেতর থাকতে বলেছেন। এটাই সর্বোত্তম।
ইরাইনা অবাক হয়ে বলে,
— হঠাৎ এমন কথা?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— মনে করুন আপনার রুমে একটা সাপ ঢুকেছে। আপনি কি সেই সাপটাকে রুমে রেখে ঘুমাতে পারবেন?
ইরাইনা একটু থেমে আস্তে করে বলে,
— না।
আনতারা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— রুমটা দুইশো স্কয়ার ফিট তবুও রুমে যদি একটা সাপ ঢুকে আপনি সাপটাকে না মারা পর্যন্ত ঘুমাতে পারবেন না।

অথচ আপনি বেপর্দা হয়ে ঘুরে কবরে শত শত কোটি সাপের জন্ম দিচ্ছেন। বেগানা পুরুষকে দেখানো আপনার প্রতিটা উন্মুক্ত চুল একটা একটা সাপ হবে কবরে। আপনি মারা যাওয়ার পর আপনাকে তিন হাত কবরে রাখা হবে। সেই তিন হাত কবরে শত শত কোটি কোটি সাপ থাকবে। আপনার দেহটাকে দংশন করবে, ক্ষতবিক্ষত করবে। তিন হাত কবরে আপনি ছোটাছুটি করতে পারবেন না। না সেই সাপ থেকে বাঁচতে পারবেন। আপনি চিৎকার করবেন আপনাকে বাঁচাতে, আপনাকে সাহায্য করতে। কিন্তু কেউ শুনবে না আপনার চিৎকার। সাপ আপনাকে ক্ষত বিক্ষত করবে আর আপনি চিৎকার করবেন। আপনার শরীরের এদিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বের হবে সাপ। কি ভয়ংকর না? কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আপনার সাথে কবরে এমনই হবে।
আনতারার কথাগুলো ইরাইনার ভেতরে গভীরভাবে ধাক্কা দেয়। সে চুপ হয়ে যায়। মনে প্রশ্ন আসে, সত্যিই যদি তার রুমে একটা সাপ ঢুকে যায়, সে কি শান্ত থাকতে পারবে? যতক্ষণ না সাপটা সরানো হচ্ছে, ততক্ষণ কি সে সেখানে থাকতে পারবে? নিশ্চয়ই না। এতটুকু কল্পনা করতেই ইরাইনা অস্থির হয়ে যায়। ইরাইনার ভাবনা আরও গভীর হলে তার বুক কেঁপে ওঠে। তিন হাত কবরে যদি এমন সাপ থাকে, তখন কি হবে? কতগুলো সাপ হবে সেখানে?

যতগুলো চুল আছে, প্রতিটা চুল যদি সাপ হয়ে যায়, তাহলে তো তা গোনাও অসম্ভব। সেই অসংখ্য সাপের মাঝেই থাকবে কিভাবে? ছোবল দিলেই বা বাঁচবে কিভাবে? কবর থেকে তো বেঁচে আসা যায় না। আজ পর্যন্ত কাউকেই সে বেঁচে কিংবা পালিয়ে আসতে দেখেনি। কবরে যে একবার যায় সে আর ফিরে আসে না। ইরাইনার শরীরের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সদ্য গোসল করা শরীরেও ঘাম জমে যায়। কানের পাশটা গরম লাগে, মাথাটা ভারী হয়ে আসে। বুকের ভেতর অজানা ভয় দানা বাঁধে।
ইরাইনার ইচ্ছে করে এই সত্যটা থেকে সে পালিয়ে যেতে। পরমুহূর্তেই আবার মনে পড়ে মৃত্যু, কবর, আখিরাত এসব থেকে পালানো অসম্ভব। যতদিন দুনিয়ার জীবন, ততদিনই শুধু সুযোগ। তারপর শুরু হবে নিঃসঙ্গ, অন্ধকার এক বাস্তবতা।
ইরাইনার অস্থির, দিশেহারা অবস্থাটা দেখে আনতারা আবার ধীরে গলায় বলে,

— আজকে আপনি যে পোশাকটা পড়ে বাহিরে গেছেন তার জন্য আপনার কত গুনাহ হয়েছে জানেন? আজকে যতজন পুরুষ যতবার আপনার শরীর, ঘাড়, গলা, চুল কিংবা বুকটা দেখেছে ততবারই আপনার জেনার গুনাহ হয়েছে! আর জেনাকারীর কবর সাপ, বিষাক্ত পোকা মাকড় দ্বারা ভর্তি থাকবে। নাউজুবিল্লাহ।
ইরাইনা ভারী ভারী শ্বাস নিতে থাকে। এই মুহূর্তে তার কাছে চারপাশটা অস্বস্তিকর, ভারী আর বিষাক্ত মনে হচ্ছে। কিছুই ভালো লাগছে না। এমনকি বাতাসের প্রতিটা নিঃশ্বাসও তার কাছে অসহ্য লাগছে।
আনতারা এবার ইরাইনার পরনে থাকা টি-শার্ট টাকে ইশারা করে বলে,

— আপনার এই পড়নে থাকা কাপড়টাও আপনাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে যদি না আপনি তওবা করে ফিরে আসেন! আমাদের মহানবী (সা.) লানত দিয়েছেন সেই নারীর উপর যে পুরুষের পোশাক কিংবা বেশভূষা ধারণ করবে! সেই নারী কখনো জান্নাতে যেতে পারবে না।
ইরাইনার মনে হচ্ছে তার মাথা ফেটে যাবে। কি ভয়ংকর কথা। জান্নাত হারাম। তাহলে সে কি জাহান্নামে পুড়বে? ইরাইনা জোরে শ্বাস নিতে চায়। কিন্তু এবারও আগের বারের মতো বিষাক্ত লাগে বাতাস। ভয় ইরাইনারকে গ্রাস করে ফেলে। অতীতের গুনাহগুলো যেন একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠছে ইরাইনার। তার ভেতর প্রশ্ন জাগে, সে কি এত ভয়ংকর ভয়ংকর শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে?

ইরাইনার ভয়ার্ত মুখ দেখে আনতারার ভেতরে এক ধরনের স্বস্তি অনুভূত হয়। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। ইরাইনা যে কথাগুলো বুঝতে পারছে। আল্লাহ তাকে এই উপলব্ধির তৌফিক দিয়েছেন, যা অনেকের ভাগ্যে জোটে না। অনেকেই তো বুঝার সুযোগই পায় না। আল্লাহ দেন না তাদের সুযোগ। তাদের কাছে দ্বীনের বাণী পৌঁছালেও তাদের হৃদয়ে পৌঁছায় না।
আনতারা মন থেকে চায়, ইরাইনা যে সত্যটা বুঝতে পারে। শয়তানের ধোকায় পড়ে আখিরাত যেন নষ্ট না করে। তার ভেতরে যেন আল্লাহর ভয় ফিরে আসে। সে যেন গুনাহের পথ থেকে ফিরে আসে, নিজের নফসের ওপর জয়ী হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। তওবার মাধ্যমে নিজের আখিরাতকে যেন রক্ষা করতে পারে।
আনতারা আবার বলে,

— এতোক্ষণ তো আপনি বেপর্দা হয়ে চলার কারণে আপনার গুনাহ সম্পর্কে বলেছি। আপনার বেপর্দা হয়ে চলার জন্য আপনার বাবা ভাইদেরও গুনাহ হচ্ছে। অর্থাৎ বিয়ের আগ পর্যন্ত আপনি বেপর্দা হয়ে যত গুনাহ করছেন সেই গুনাহের ভাগ আপনার বাবা ভাইরাও পাবে। আর বিয়ের পর বেপর্দা হয়ে চললে আপনার স্বামী সেই গুনাহের ভাগ পাবে। হাদিসে আছে যে পুরুষ জীবিত অবস্থায় তার অধিনস্ত স্ত্রী, কন্যা, বোন বেপর্দাভাবে চলে সেই পুরুষের জন্য জান্নাত হারাম! অর্থাৎ আপনি বেপর্দা হয়ে চলার কারণে নিজের জন্য জান্নাত হারাম হচ্ছে তো, সাথে আপনার বাবা ভাইদেরও জন্যও জান্নাত হারাম হচ্ছে। আস্তাগফিরুল্লাহ!
ইরাইনা চমকে তাকায় আনতারার দিকে। এই হাদিসটা সম্পর্কেও সে জানতো না। আজই প্রথম শুনেছে। আনতারা এবার নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

— নিজের বাবা ভাইকে কবরে শাস্তি পেতে দেবেন নিজের জন্য? আপনার কষ্ট হবে না? আপনি তাদের কত ভালোবাসেন অথচ আপনার কারণেই তাদের আখিরাতে লাঞ্চিত হতে হবে। কবরে কষ্ট পেতে হবে।
ইরাইনা চুপচাপ তাকিয়ে আছে। কথা বলার শক্তিটুকু তার আর নেই। ভেতরের অস্থিরতা আর ভয় তাকে একেবারে স্থবির করে দিয়েছে। সে দিশেহারা হয়ে গেছে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার মনে হচ্ছে, তার ভেতরের আত্মাটা যেন ছটফট করছে। শাস্তির কথাগুলো শুনে কেঁপে উঠছে। রুহটা যেন ভয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে।
আনতারা এবার ইরাইনার হাতটা ধরে ফেলে। ইরাইনা চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। চোখে ভয়, দ্বিধা আর আবছা আবছা জল। চোখেই ভাসছে ভেতরের লড়াই।
আনতারা আকুতির গলায় বলে,

— দুনিয়ার মোহে পড়ে ইমান হারাবেন না। গুনাহ করার পরও যদি আপনার ভয় না হয় তাহলে বুঝে নিবেন আপনি ইমান হারিয়ে ফেলেছেন। ইমানহীন ব্যক্তি জান্নাতের আশা করতে পারে না। কারণ ইমান বিহীন জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। আমরা এখানে চিরস্থায়ী না। আজ অথবা কাল যেতেই হবে। দুনিয়াও চিরস্থায়ী না। কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। দুনিয়াতে যদি আল্লাহর ইবাদত করেন, আদেশ নিষেধ মেনে চলেন তাহলে আখিরাতে সুখ রয়েছে। জান্নাতে কোনো দুঃখ নেই হতাশা নেই। তাহলে কেন দুনিয়া নিয়ে পড়ে চিরস্থায়ী সুখটা নষ্ট করে দিচ্ছেন?

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১০

কি আছে এই দুনিয়াতে? মৃত্যু তো এখনও হতে পারে! তখন কি আপনি দুনিয়া নিয়ে কবরে যেতে পারবেন? কবরে কেবল আপনার পাপ পূর্ণ্য যাবে। ভালো কাজ করলে কবরে শান্তি পাবেন আর খারাপ কাজে শাস্তি পাবেন। আল্লাহর আদেশ অমান্য করে বেপর্দাভাবে চলার আগে ভাববেন, তিন হাত অন্ধকার কবরে সাপ বিচ্ছুর বিষাক্ত ছোবল সহ্য করতে পারবেন তো?

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২