Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৯ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৯ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৯ (২)
‎আফীফা আফনান

‎বাইরের প্রখর রোদ আর তপ্ত হাওয়ার মাঝেই হেঁটে আসার কারণে মেহুলের অবস্থা তখন ঘেমে নেয়ে একাকার। হাতের রুমাল দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘামের ফোঁটাগুলো বারবার মুছতে মুছতে সে হুমার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে কলিং বেলটা চেপে ধরল।
‎​কয়েক সেকেন্ড পরেই ভেতর থেকে লক খোলার শব্দ হলো এবং হুমা দরজাটা খুলে সামনে দাঁড়াল। মেহুলের এমন লালচে হয়ে থাকা ঘামে ভেজা মুখ আর ক্লান্ত চেহারার দশা দেখে হুমা বেশ অবাক চোখে চেয়ে রইল। অন্যদিকে মেহুল কোনো কথা না বলে সোজা ভেতরে প্রবেশ করে ধীরপায়ে ড্রয়িং রুমের সোফাটার ওপর ক্লান্ত শরীরে বসে পড়ল।
‎​হুমাও পিছু পিছু এগিয়ে এসে সোফায় হেলান দিয়ে ভ্রু দুটি কুঁচকে শুধাল—
‎”অ্যাই মেহু! তোর এই অবস্থা কেন! এত ঘেমেছিস কিভাবে? চেহারাটা কেমন লাল হয়ে আছে।”

‎​মেহুল সোফার হেলানদানিতে মাথা রেখে বিষণ্ন স্বস্তির এক নিঃশ্বাস ফেলল। হাত থেকে ভিজে যাওয়া রুমালটা টেবিলে রেখে বলল, “হেঁটে হেঁটে এসেছি তাই।”
‎”গাড়ি পাসনি?”
‎”না রে… একটাও খালি রিকশা পেলাম না আজ শেষমেশ হেঁটেই আসলাম।”
‎​বলতে বলতেই মেহুল তার পাশে রাখা রঙিন শপিং ব্যাগটার ভেতর থেকে সুন্দর প্যাকেটটি বের করে হুমায়রার দিকে এগিয়ে দিল, “ধর এটা!”
‎​হুমা একটু বিস্ময় নিয়ে মেহুলের হাত থেকে প্যাকেটটি নিল, “কি আছে এটাতে?”
‎”খুলেই দেখ।”
‎মেহুলের কথাতে হুমা প্যাকেটের চেইন খুলে ভেতর থেকে আলতো করে বের করে আনল গাঢ় বেগুনি রঙের ছোট্ট একরত্তি ফ্রকটি!
‎​জামাটা হাতের ওপর ছড়িয়ে ধরতেই হুমায়রার চোখ দুটো খুশিতে চমকে উঠল! সে মুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল—
‎”ওয়্যাঁও! বেশ সুন্দর তো ! কালারটা তো ভীষণ মিষ্টি, একবারে চোখে লাগার মতো! কোন দোকান থেকে নিলি! ”

‎হুমার প্রতিক্রিয়াতে ​মেহুলের ক্লান্ত কন্ঠে হালকা কৌতূহল আর এক চিলতে অমলিন আনন্দ ফুটে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে মৃদু হেসে বলল—
‎”আসার সময় রাস্তার ধারের দোকানে ঝুলতে দেখে প্রথম দেখাতেই দূর থেকে এত সুন্দর লাগল… ভাবলাম পুঁচকু বাবুটার জন্য নিয়ে নিই। আচ্ছা বাবুটা কে মানাবে ড্রেস টা?”
‎মেহুল একটু থেমে, “সত্যি বলতে, বাচ্চা-কাচ্চার জামাকাপড়ের ব্যাপারে তো আমার তেমন কোনো আইডিয়া নেই, কখনো তো এত ছোট বাচ্চার জন্য জামা কাপড় কিনে নি … তুই একটু পরিয়ে দেখিস তো, সাইজটা ঠিকঠাক আছে নাকি। না হলে দোকানি বলেছে চেঞ্জ করে দেবে।”
‎​হুমা জামাটি নিজের বুকের কাছে ধরে আহ্লাদী গলায় বলে উঠল—
‎”আরে ধুর! সাইজ একদম পারফেক্ট হবে! দেখিস, ওটা গায়ে দিলে একদম পরীর মতো লাগবে পুঁচকুটাকে!”

‎​কথাটা বলেই হুমা অধৈর্য হয়ে ফ্রকটি হাতে নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল—ছানাটিকে নতুন পোশাকটা পরিয়ে সাজিয়ে তোলার জন্য। হুমা যেতেই মেহুল সোফায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে ধুয়ে-মুছে ফ্রেশ করার উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেল।
‎​আধ ঘণ্টা পর—
‎​মেহুল শাওয়ার নিয়ে, হালকা সুতির থ্রি-পিস পরে, ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের রুম থেকে বের হয়ে এলো ড্রয়িং রুমে।
‎​আর ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই মেহুলের চোখ দুটো এক পরম মায়ায় যেন থমকে গেল!
‎​সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে হুমা, আর তার কোলের ওপর পরম শান্তিতে চুপচাপ শুয়ে আছে বেগুনি পোশাক পরা একরত্তি পুঁচকু ছানাটি!

‎​তুলতুলে ফর্সা শরীরে গাঢ় বেগুনি রঙের সেই নরম ফ্রকটি পরায় ছানাটিকে সত্যি সত্যিই স্বর্গের এক ফুটফুটে পরীর মতো রূপসী দেখাচ্ছে! তার নরম দুটি হাত ফ্রকের বেগুনি সুতোর সাথে ঘষা খাচ্ছে, আর গোলগোল উজ্জ্বল কালো চোখ দুটি দিয়ে সে এক দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ছে। যেন সে নিজেও ফ্রকটি পড়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইছে। সেই সাথে তার নরম তুলতুলে গালের মিষ্টি গোলাপি আভা আর পরনের বেগুনি জামার বৈপরীত্যে তার প্রতিটি অঙ্গ থেকে যেন অলৌকিক এক নিষ্পাপ সৌন্দর্য ঠিকরে বের হচ্ছে!

‎​মেহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরপায়ে এগিয়ে এলো সেই সুদৃশ্য মায়াবীনির কাছে। পুঁচকু বাচ্চাটির সামনে দাঁড়াতেই তার সব ক্লান্তি আর বিষাদের ছায়া যেন চোখের পলকে হারিয়ে গেল সেই একরত্তি পরীর মায়াবী রূপে!
‎এদিকে ড্রয়িং রুমে পা রেখে মেহুল ধীরপায়ে সোফার দিকে এগিয়ে আসতেই যেন ছানাটি মেহুলের সেই অতি পরিচিত উপস্থিতি আর গায়ের ঘ্রাণ পেয়ে গেল! আর ​এক লহমায় যেন বদলে গেল তার হাবভাব। এতোক্ষন হুমার কোলে নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা বাচ্চাটি হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠলো, নিজের তুলতুলে হাত-পাগুলো এলোমেলো ভাবে নাড়াচড়া করতে করতে হঠাৎই তীব্র স্বরে কেঁদে উঠল—
‎​”ওয়্যাঁ… ওয়্যাঁ… আঁআআ!”

‎​হুট করে এমন কান্নায় হুমা যেন হঠাৎই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে ছানাটিকে বুকের কাছে নিয়ে হালকা দোল দিতে দিতে বাচ্চাটিকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে লাগল—
‎​”কী হলো আমার পুঁচকু? হঠাৎ এভাবে কাঁদছে কেন? কী হয়েছে সোনা পাখিটার? কোথায় ব্যথা পাচ্ছে বল তো মামকে?”

‎হুমা বলেই চলছে ​কিন্তু ছানাটি যেন হুমার কোনো শান্ত্বনাই কানে তুলছে না! বরং সে ক্রমাগত হাত-পা ছুড়ে কেঁদেই চলছে।
‎এদিকে ছোট্ট পুঁচকুর কান্না দেখে ​মেহুল আর স্থির থাকতে পারল না। সে হুমার দিকে তাকিয়ে আলতো করে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “দে তো আমাকে…”

‎মেহুল বলাতে হুমা তড়িঘড়ি করে পুঁচকুকে তার কোলে সাবধানে তুলে দিলো। ​আশ্চর্যের বিষয়! মেহুল হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটিকে নিজের কোলে তুলে নেওয়া মাত্রই পুঁচকুর কান্না যেন এক সেকেন্ডে ম্যাজিকের মতো গায়েব হয়ে গেল! ​বাচ্চাটি এক নিমেষে তার কান্নারত সুর থামিয়ে দিল। মেহুলের গলার কাছে নিজের মুখখানা একদম লেপ্টে ধরে, ছোট ছোট দুটি হাত দিয়ে মেহুলের থ্রি-পিসের কাপড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইল। যার ফলে মেহুলের নাকে এসে মৃদু ধাক্কা দিল বেবি পাউডারের অতি পরিচিত আর মায়াবী এক মিষ্টি ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে মেহুল আকস্মিক চোখ দুটো বুজে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস টেনে নিল; যার ফলে তার ভেতরে যেন এক অজানা, অপার্থিব অনুভূতির সৃষ্টি হলো!

‎অপরদিকে ​হুমা অবাক চোখে এই অলৌকিক রূপান্তর দেখে হা হয়ে গেল! সে চোখ গোল গোল করে কৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে উঠল—
‎​”অ্যাই! এটা কী হলো বল তো? সারাদিন আমার সাথে থেকে, এত খাতির জমিয়ে, এত আদর খেয়ে এখন এক মুহূর্তে দল পাল্টে ফেলল! পুঁচকু, তুই তো দেখছি ভীষণ সেয়ানা রে!”
‎উম….উম
‎সাথে সাথে ​বাচ্চাটি হাত নেড়ে শব্দ করে উঠলো, যা শুনে মেহুল কোলে থাকা ছানাটির দিকে চেয়ে পরম মায়ায় হেসে উঠল। তারপর হুমার দিকে তাকিয়ে শুধাল—
‎​”জামাটার সাইজ একদম ঠিকঠাকই হয়েছে তাই না?”

‎​হুমা এক গাল হেসে উত্তর দিল, “একদম পারফেক্ট! দেখ কেমন সুন্দর লাগছে, যেন ওর সাইজ মেপেই বানানো হয়েছে।”
‎​মেহুলের চুলে তখনো হালকা ভেজা ভাব। কিন্তু পুঁচকু কোলে থাকাতে আর চুল মোছার অবকাশ নেই তাই সে ভেজা তোয়ালেটা হুমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, একটু রোদে দিয়ে দিবি হুমা?
‎”অবশ্যই”
‎বলেই হুমা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জিজ্ঞেস করল, “এক কাপ চা খাবি নাকি মেহু?”
‎​মেহুল বাচ্চাটির পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটিয়ে বলল, “এই সময়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হলে কিন্তু একদম মন্দ হয় না!”
‎​”ঠিক আছে, তুই বস। আমি তোর আর আমার জন্য ঝটপট দু-কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।”—বলেই হুমা মুচকি হেসে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।

‎হুমা যেতেই ​ড্রয়িং রুমের নীরবতায় এখন কেবল মেহুল আর পুঁচকু। অতঃপর ​মেহুল সযত্নে বাচ্চাটিকে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো। পরম আকুলতায় সে পুঁচকুর ফর্সা গোলাপের পাপড়ির মতো তুলতুলে দুটো গাল, ছোট্ট লালচে ঠোঁট আর একরত্তি নরম আঙুলগুলোতে নিজের হাতের আঙুল আলতো করে বুলাতে লাগল। অপরদিকে ছানাটিও তার সেই গাঢ় ডাগর ডাগর কালো চোখ জোড়া মেহুলের দিকে স্থির রেখে নরম গলায় শব্দ তৈরি করতে লাগল—
‎​”আঁআ… উঁউঁ… গু!”
‎​যেন সে মেহুলের সাথে দুনিয়ার সব গোপন কথা বলার আকুল চেষ্টা করছে! এদিকে মেহুল বাচ্চাটির এমন শব্দ করা দেখে তার নরম আঙুলে আলতো একটু চাপ দিয়ে ঠান্ডা স্বরে শুধাল—
‎​”তুমি জানো তুমি কতটা সুন্দর, পুঁচকু? পুঁচকু হুমমম হুমা তোমার নাম একদম ঠিক মতোই দিয়েছে। তুমি আসলেই পুঁচকু, তুমি এত ছোট, এতো ছোট যে… জানো, তোমাকে কোলে নিতেও মাঝে মাঝে আমার ভীষণ ভয় করে! যদি আমার অজান্তে তুমি কোথাও কষ্ট পাও…?”

‎​বাচ্চাটি যেন মেহুলের প্রতিটি দরদী কথা বুঝতে পারল। তাইতো মেহুলকে অবাক করে দিয়ে সে তার কচি কচি দুটি হাত বাড়িয়ে দিলো মেহুলের মুখের দিকে যেন মেহুলকে ছুতে চাইছে, আর যা দেখে মেহুল পরম সুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল তার মুখাবয়বে।
‎​মেহুল আর ছানাটির মাঝখানের এই মৌনতায় যেন এক অদৃশ্য, শ্বাশ্বত মাতৃস্নেহের গাঢ় বন্ধন ফুটে উঠল! রক্ত কিংবা জন্মদাত্রীর পরিচয় না থাকলেও—এই একরত্তি প্রাণটি যেন মেহুলের বুকের মাঝে কেমন এক অদ্ভুত মায়ায় নিঃশব্দে মিশে গেল! যেন তার মৃতপ্রায় হৃদয়ে সঞ্চার করে তুললো ভালোবাসার এক অদ্ভুত সমীকরণ।

‎একটু পরেই রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা দুই কাপ চা ট্রেতে করে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ফিরে এলো হুমা। হুমাকে আসতে দেখেই ​মেহুল আলতো হাতে বাচ্চাটিকে সোফার নরম তোশকের ওপর শুইয়ে দিল এবং ছানাটি যাতে নড়াচড়া করে গড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তার দু-পাশে দুটি ছোট কুশন গুঁজে দিল। অতঃপর একটু এগিয়ে এসে টেবিল থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটি তুলে নিয়ে তাতে হালকা একটা চুমুক দিল। ​চায়ে চুমুক দিতে দিতে হুমা সোফায় মেহুলের মুখোমুখি বসল। সে কড়া নজর রেখেছিল মেহুলের মুখের ভাবান্তরের ওপর। অতঃপর একটু ইতস্তত করে হুমা শুধাল—
‎”মেহু…একটা কথা জিজ্ঞেস করি, যদি কিছু মনে না করিস?
‎”হুম কর এখানে মনে করার কি আছে!” চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই বললো মেহুল।
‎”পুঁচকুকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী ভাবলি তুই! আমাকে একটু বল তো?”

‎​কথাটা শুনে মেহুলের চোখের দৃষ্টি একমুহূর্তে বিষণ্ণ হয়ে এলো। সে চায়ের কাপের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
‎”কী করব সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না রে, হুমা। বাচ্চাটা যেন কেমন এক অদৃশ্য মায়ায় আটকে ফেলছে আমাকে..কদিন আগে পর্যন্ত জীবনে কাউকে লাগবে না বলা এই আমাকে কেন যেন মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। ওকে ছেড়ে কিচ্ছু ভাবতে পারছি না।”

‎​হুমা মেহুলের কথার সাথে পুরোপুরি একমত পোষণ করে মাথা নাড়ল। তার চোখেও ফুটে উঠল করুণা আর মায়া। তবে পরক্ষণেই একটু বাস্তবতার সুরে সে বলল—
‎”তোর অনুভূতিটা আমি একদম বুঝতে পারছি মেহু। সত্যি বলতে, তুই যদি এখানে থাকতিস, তবে আমরা দুজনে মিলে একে বড় করে তুলতে পারতাম। আমি নিজেই ওকে রেখে দিতাম কিন্তু তোর তো নিজস্ব জীবন আছে। তুই চলে গেলে আমার পক্ষে একলা নিজের বুটিক সামলে এই একরত্তি পুঁচকুকে সামলানো ভীষণ কষ্টকর হয়ে যাবে।”

‎​মেহুল হুমার কথাগুলো নিঃশব্দে শুনল। সত্যি তো, বাস্তবতা তো এটাই! সেও তো পারবে না পুঁচকুকে নিজের কাছে রাখতে। অতঃপর সোফায় শায়িত ঘুমন্ত পরীর মতো ছানাটির দিকে মায়ামাখা চোখে চেয়ে থেকে বলল—
‎”আশেপাশে কোনো ভালো চাইল্ড কেয়ার হোম পাওয়া যাবে? যেখানে আমরা ওর সব ব্যবস্থা সুন্দর ভাবে করতে পারব? অন্তত ও যেখানেই থাক, ওর যাবতীয় লালন-পালন আর পড়ালেখার খরচপাতি না হয় আমিই নিয়মিত সামলাব আর তুইতো এখানেই থাকবি সব সময় খোঁজখবর রাখবি।”

‎​মেহুলের কথা শুনে হুমার মনে পড়ে গেল আজকের বিকেলের ঘটনাটি! সে চট করে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল—
‎​”মেহু! শোন না, আজকের বিকেলে আমার বুটিকে আমার রেগুলার কাস্টমার শাহানা আফরোজ আপু এসেছিলেন! উনি তো পুঁচকুকে দেখে অনেক অনেক প্রশংসা করলেন। তারপর ওনার এক দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের কথা বলছিলেন—যিনি সরকারের উচ্চপদস্থ সচিব!”

‎​হুমা মেহুলের দিকে আরেকটু ঝুঁকে বিস্তারিত বোঝাতে লাগল—
‎”শাহানা আপু বললেন, ওনাদের অঢেল টাকা-পয়সা, সম্মান—সব আছে, কিন্তু বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও কোনো সন্তান নাকি হয়নি। তারা নাকি অনেক দিন ধরেই একটা ভালো ও সুন্দর বাচ্চা দত্তক নেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছেন! তাই শাহানা আপু প্রস্তাব দিল পুঁচকুকে ওনাদের দত্তক দেওয়ার। এখন তুই কি বলিস! আমার মতে ওনারা যদি পুঁচকুটাকে পান, তবে পরম আদরে নিজেদের সন্তানের মতো রাজকন্যার মতো করে বড় করবেন!”

‎​কথাটা শুনে মেহুলের বুকের ভেতরে একটু মোচড় দিলো কিন্তু পরক্ষনেই একজন সরকারি সচিবের সম্ভ্রান্ত পরিবার, অঢেল ভালোবাসা আর হুমার পরিচিত শাহানা আফরোজের মাধ্যমে আসা প্রস্তাব! মেহুল মনে মনে ভাবল—হ্যাঁ, এই একরত্তি ছানাটির ভবিষ্যৎ, পরিচয় আর পরম নিরাপত্তার জন্য এর চেয়ে ভালো স্থান আর হতে পারে না।
‎অতঃপর ​মেহুল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে থমথমে গলায় বলল, “তাহলে তো ভীষণ ভালো হয় হুমা… তুই তোর শাহানা আপুর সাথে কথা বলে এগোতে পারিস। আমি চাই পুঁচকু যেখানেই থাকে যেন ভালো থাকে।”

‎একদিকে পুঁচকে ছানাটি একটি ভালোবাসায় ঘেরা সুন্দর পরিবার পাবে—একথা ভেবে মেহুলের মনের এক কোণে স্বস্তির আলো ফুটে উঠলেও, বুকের একদম গহীন ভেতরটায় যেন অচেনা এক চাপা কষ্ট আচ্ছন্ন করে ফেলল। এক অজানা হাহাকার যেন ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে লাগল হৃদয়ে।
‎​’বাচ্চাটার সাথে তো আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই… তাহলে কেন ভেতরটা এত মোচড় দিয়ে উঠছে? কেন আমার এত অস্বস্তি হচ্ছে?’—মেহুল মনে মনে নিজেকেই প্রশ্নটা করল, কিন্তু উত্তর মিলল না।

‎​সে চোখ ফিরিয়ে সোফায় শায়িত বাচ্চাটির দিকে তাকাল। যে এখন পৃথিবীর সব চিন্তা-ভাবনা আর জটিলতা থেকে দূরে গিয়ে পরম সুখে নিস্পাপের মতো ঘুমাচ্ছে। আহা, কী এক অপার্থিব নিষ্পাপ চেহারা!
‎​বাচ্চাটির ঘুমান্ত মুখের দিকে চেয়ে মেহুলের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে ভেবে উঠল সে—কে সেই নারী, যার হৃদয় এতটা পাথরের মতো শক্ত? এমন সতেজ ফুলের মতো একটা বাচ্চাকে কী করে সে নিজের বুক থেকে ছিটকে আলাদা করে দিল! একটা নারী এতটা হৃদয়হীন, এতটা মমতাহীন কীভাবে হতে পারে? মেহুল নিজেও তো একজন নারী, কই সে তো সামান্য কিছু ঘণ্টার পরিচয়েই এই বাচ্চাটিকে দূরে ঠেলে দিতে পারছে না! তবে সেই নারী কীভাবে পারল নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে এভাবে ফেলে দিতে?

‎​চিন্তাটা শেষ হতেই মেহুলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদমাখা তাচ্ছিল্যের হাসি।
‎​হঠাৎ মেহুলকে এমন অদ্ভুতভাবে একা একা হাসতে দেখে হুমা ভীষণ অবাক হলো। সে একটু ভ্রু কুঁচকে শুধাল—
‎”মেহু? এভাবে একা একা অকারণেই হাসছিস যে?”
‎​মেহুল হুমা দিকে তাকাল। বিষণ্নতার ছায়া ঢাকা সেই হাসিটা বজায় রেখেই ম্লান গলায় বলল, “দুনিয়ার অদ্ভূত সব নীতি আর নিয়ম ভেবে হাসছি রে হুমা…”
‎​হুমা বুঝতে পারল না। সে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে শুধাল, “মানে? কিসের রীতিনীতি?”

‎​মেহুল চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে অস্ফুটে বলল—
‎”এই যে… কেউ কেউ সারা জীবন হাজার প্রার্থনা করেও যা পায় না, সেই না-পাওয়াটাই তার পুরো পৃথিবীটাকে বিষাক্ত আর অন্ধকার করে দেয়। অথচ আরেকজন না চাইতেই তা অনায়াসে পেয়ে যায়! আর পাওয়ার পর তার বিন্দুমাত্র মূল্য না বুঝে ধুলোবালির মতো ছুঁড়ে ফেলে দেয়…”

‎​হুমা মেহুলের প্রতিটি কথার ভেতরের আসল অর্থটা এক মুহূর্তেই ধরে ফেলল। সেই সাথে মেহুলের বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা গোপন বেদনার আঁচ পেয়ে তার নিজের মনটাও ভারী হয়ে উঠল। অতঃপর সে আস্তে করে মেহুলের বরফের মতো ঠান্ডা হাতটা নিজের দু-হাতে জড়িয়ে ধরে দরদী গলায় বলল—
‎​”মন খারাপ করিস না মেহু… অন্তত এটা ভেবে মনে একটু সুখ দে যে, তোর জন্যই একটা ছোট্ট শিশু আজ নতুন এক জীবনের দিশা পাচ্ছে। এই বিশাল পৃথিবীতে তো লাখ লাখ মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাই না? তাহলে সেদিন রাতে কেন পুঁচকুর সাথে শুধু তোরই দেখা হলো? কারণ সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন তোর হাত ধরেই যেন ওর জীবনে সুন্দর এক আলো আসে।”

‎​হুমা থামল। মেহুল স্থির হয়ে হুমার কথাগুলো শুনল। তারপর চোখের কোণে জমে ওঠা এক ফোঁটা জল অলক্ষ্যে মুছে নিয়ে ভারি এক নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
‎​”সৃষ্টিকর্তা চাইলে তো সবই করতে পারেন… তাহলে তিনি আমার ভাগ্যটা কেন এমন লিখলেন বল তো, হুমা? আমার ভাগ্যে কেন এত অপূর্ণতা?”

‎​হুমা মেহুলের হাতটায় আরেকটু শক্ত করে চাপ দিল। চোখে তার পরম নির্ভরতা আর সান্ত্বনার আলো ফুটিয়ে ধীরকণ্ঠে বলে উঠলো —
‎​”হয়তো তিনি তোর জন্য এরচেয়েও অনেক বড়, অনেক সুন্দর কিছু জমিয়ে রেখেছেন মেহু… তাই তোকে এত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। বিশ্বাস রাখবি, অন্ধকার সব সময় ক্ষনিকের, পরমুহূর্তেই কিন্তু অন্ধকার ভেদ করে আলো আসবেই।”

‎মেহুল শুনলো পরক্ষণেই দুজনেই ​সোফায় শুয়ে থাকা বেগুনি জামা পরা মিষ্টি পরীটির দিকে তাকালো, যার ওপর এখন জানালা ভেদ করে শেষ বিকেলের এক চিলতে সোনাঝরা রোদ এসে পড়ছে। আর দুই বান্ধবীর এই নীরব মৌনতার মাঝে যেন এক গভীর পরম মমতার আকাশ রচিত হয়ে রইল।

‎’শাহ নেওয়াজ নিবাস’-এর দ্বিতল ভবনের দক্ষিণমুখী ঘরটিতে থমথমে নীরবতা। বিপাশা শিকদার নিজের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে যত্ন নিয়ে শাড়িগুলো গোছাচ্ছেন।
‎​গতকালই গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন তার স্বামী মিনহাজ শাহ নেওয়াজ। আর প্রতিবারের মতো এবারও স্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রেখে বেশ কিছু চমৎকার ঢাকাই জামদানি আর সিল্কের শাড়ি উপহার হিসেবে কিনে এনেছেন। বিপাশা শিকদারের বহু পুরোনো অভ্যাস—স্বামী ঢাকা থেকে ফিরলে তার আনা উপহারগুলো নিখুঁত হাতে গুছিয়ে আলমারিতে সাজিয়ে রাখা। বাড়িতে কাজ করার জন্য বুয়া-চাকর থাকলেও, এই ছোটখাটো ব্যক্তিগত কাজগুলো বিপাশা শিকদার অন্য কাউকে ছুঁতেও দেন না। বিশেষ করে শাড়ি ভাঁজ করা আর কাবার্ডে থরে থরে সাজিয়ে রাখার মাঝেই যেন তিনি এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি পান।

‎তাইতো ভরসন্ধ্যাতে বসে বসে ​শাড়িগুলো কাবার্ডে তুলতে গিয়ে হুট করেই চোখে পড়ল আলমারির একদম নিচের তাকের কাঠের পার্টিশনটা। কিছুটা ধুলো জমেছে সেখানটায়। তাই পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে কাপড় দিয়ে মুছতে গিয়েই বিপাশা শিকদারের হাত গিয়ে ঠেকল একটা কাঠের বাক্সে। বহুদিন যেন বাক্সটিতে কেউ হাত দেয় নি। তাই তিনি বাক্সটি বের করে আনলেন, উপরের অংশটা মুছে তা।খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কোনো এককালের লাল ভেলভেটে মোড়ানো, জীর্ণ হয়ে আসা একটা পুরোনো ছবির অ্যালবাম।

‎​অ্যালবামটা হাতে নেওয়া মাত্রই বিপাশা শিকদারের বুকটা কেঁপে উঠল। তার কাছে যে অতীতের জীবন্ত স্মৃতি বাক্স ছিল সময়ের সাথে সাথে তিনি তো ভুলেই বসে ছিলেন। অতঃপর অ্যালবামটা হাতে নিয়ে তিনি ধীরপায়ে এসে খাটের একপাশে বসলেন। কভারের ওপর জমানো ধুলোটুকু আলতো করে মুছতেই হৃদয়ের ভেতরের জমে থাকা স্মৃতিগুলো যেন এক ধাক্কায় জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগল। পলিথিনের আবরণে বাঁধানো শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলোর একের পর এক ছবি উল্টাতে লাগলেন বিপাশা শিকদার। প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথে তার ঠোঁটের কোণের হাসিটাও যেন চওড়া হতে লাগলো। কিন্তু ​হঠাৎই একটি নির্দিষ্ট পাতায় এসে তার হাতের আঙুল জোড়া স্থির হয়ে গেল।

‎​যেন এক নিমেষে চোখের সামনের চারপাশটা থমকে গেল! থমকে গেল বিপাশা শিকদারের শ্বাস-প্রশ্বাসও। চোখেমুখে ভর করল এক অদৃশ্য বিষাদের ঘোর আর অসীম কষ্টের ছাপ। চোখের কোণে জমা জলগুলো আর বাধা মানল না—টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ল অ্যালবামের সেই পুরোনো ছবির ওপর!
‎​ঠিক তখনই কামরার দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন মিনহাজ শাহ নেওয়াজ। অফিস আর রাজনৈতিক ঝক্কি-ঝামেলা শেষে কিছুটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে স্বভাবসুলভ গম্ভীর কিন্তু আবেগি গলায় ডেকে উঠলেন—
‎”বিপাশা…?”

‎​বহু বছরের পুরোনো নিয়ম—মিনহাজ সাহেব বাইরে থেকে এলেই বিপাশা বেগম এগিয়ে গিয়ে তার গায়ের ব্লেজার খুলে নেন, হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলটায় রাখেন। পানির গ্লাস এগিয়ে দেন, গল্প করেন কিন্তু আজ বিপাশা শিকদার নিজের জায়গায় অনড়। কোনো সাড়াশব্দ নেই, মোহের মতো চেয়ে আছেন সেই ছবির দিকে।

‎​স্ত্রীর এমন অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে মিনহাজ সাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি চটজলদি বিপাশার কাছে এগিয়ে এলেন। পরম মমতায় বিপাশার কাঁধে হাত রেখে নিচু হয়ে তাকাতেই চমকে উঠলেন—বিপাশা কাঁদছেন!

‎বহু বছর পর স্ত্রীকে হঠাৎ কাঁদতে দেখে ​ব্যস্ত হয়ে মিনহাজ সাহেব হাঁটু গেড়ে বিপাশা শিকদারের সামনে বসে পড়লেন। অত্যন্ত ব্যাকুল কণ্ঠে শুধালেন—
‎”বিপাশা, কী হয়েছে বল তো? কাঁদছো কেন? শিশির কিছু বলেছে? নাকি অন্য কোনো সমস্যা? বলো তো আমাকে!”

‎​বিপাশা শিকদার কথা বলতে পারলেন না, শুধু কেঁপে উঠলেন। ঠিক তখনই মিনহাজ সাহেবের চোখ অ্যালবামের সেই ছবিটার দিকে চলে গেছে। ছবিটিতে এক কিশোরী বিপাশা শিকদারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক ডানপিটে, প্রাণবন্ত কিশোর!
‎​সবটা এক নিমেষে ধরে ফেললেন মিনহাজ শাহ নেওয়াজ। এক গহীন দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে তিনি স্ত্রীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভারী গলায় বললেন—
‎”জাবেদের কথা মনে পড়ছে, বিপাশা?”

‎​বিপাশা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে কেবল মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালেন। তারপর স্বামীর হাতটা আঁকড়ে ধরলেন, ঠিক তখনি তীব্র আকুলতায় মিনহাজ সাহেব স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন—
‎”আমাকে ক্ষমা করো বিপাশা… তোমার এই দীর্ঘ বছরের তিলে তিলে বিধ্বস্ত হওয়া আর কান্নার কারণ হয়তো আমিই!

‎ কিন্তু বিশ্বাস করো, সেদিন চেয়েও আমি কিছু করতে পারিনি… পরিস্থিতিটাই এমন ছিল।”
‎​বিপাশা বেগম চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকালেন। নোনা জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে করুণ মিনতি ফুটিয়ে বললেন—
‎”আমি কি আর কোনোদিন আমার ভাইটার দেখা পাব না, মিনহাজ? আজ এতগুলো বছর পার হয়ে গেল… অথচ আমার আপন ভাইটার চেহারা পর্যন্ত একনজর দেখতে পারি না! আদৌ সে কোথায় আছে, কেমন আছে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে—কোনো হদিস পেলাম না! আমার ভাইটা কি আমাকে কখনো ক্ষমা করবে, মিনহাজ?”

‎​মিনহাজ শাহ নেওয়াজ পরম যত্নে স্ত্রীর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললেন—
‎”অবশ্যই পাবে, বিপাশা! পাবে না কেন? ভাইরা কি কখনো তাদের বোনেদের চিরতরে ফেলে দিতে পারে? এই যে ধরো আমি… আমার বোনটা যতই অন্যায় করুক, জেনেশুনেও কি আমি পেরেছি তার দিক থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিতে? পারি নি তো! ওই যে রক্ত টান… তুমিও দেখবে একদিন জাবেদ ঠিক ফিরে আসবে।”

‎​মিনহাজ সাহেব যখন স্ত্রীকে এভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘরের দরজার সামান্য বাইরে, আড়ালে নিঃশব্দে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল সালমান!
‎​বাপ-মায়ের ভেতরের এই রুদ্ধশ্বাস কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ না চাইতেও আড়ি পেতে শোনার পর সালমানের চোখের দৃষ্টিতে যেন কালবৈশাখীর ঝড় নেমে এলো!
‎​জাবেদ? তার একজন মামা আছে?! অথচ জীবনে প্রথমবার আজ সে এই নামটা শুনল! এত বছর ধরে যার কোনো অস্তিত্বের কথা পরিবারের কেউ তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেয়নি! তার ওপর বাবা বলল—’ফুফুর অন্যায় জেনেও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি নি!’

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৯

‎​তার ফুফু এমন কী গুরুতর অপরাধ করেছিল, যা তার বাবাকে আজও অপরাধীর মতো কথা বলতে বাধ্য করছে? আর তার মায়ের এই গোপন রাখা ভাই জাবেদই বা কে আর কোথায় হারিয়ে গেল?
‎​এক অদৃশ্য গভীর রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেল সালমানের চারপাশ। মনের ভেতরে শুরু হলো এক নতুন তোলপাড়!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২০