রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩১
ইয়ুশরা রিমু
ঘরের ভেতর সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। টেবিলের ওপর খোলা বই, ছড়িয়ে থাকা খাতা আর একপাশে রাখা কাঠের স্কেল। সব মিলিয়ে যেন পুরো ঘরটাই ছোট্ট একটা পড়ার কক্ষে পরিণত হয়েছে। অথচ সেই পরিবেশের মাঝখানেও বেলার মুখে পড়াশোনার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহের ছাপ নেই।
চেয়ারে বসে সে কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে কখনও জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, কখনও আবার বইয়ের পাতায় অকারণে ছোট ছোট ফুল এঁকে চলেছে।সায়র বেশ কিছুক্ষণ নীরবে সবকিছু লক্ষ্য করলো। তারপর বইয়ের ওপর আঙুল ঠুকঠুক করে কঠোর কণ্ঠে বললো,
—বেলা, এবার যথেষ্ট হয়েছে। বইয়ের দিকে মন দে।
বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে নিরীহ মুখ করে বললো,
—-মন তো দিতেই চাই।কিন্তু মন বসে না পড়ার টেবিলে।
—-মনকে বসাতে হবে কষ্ট করে।
— আজকে না পড়লে কী এমন ক্ষ’তি হবে?
সায়রের চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।
—পড়বি। না হলে কিন্তু শা’স্তি পাবি।
কথাটা শুনে বেলা ভয় পাওয়ার বদলে উল্টো গাল ফুলিয়ে হেলান দিয়ে বসল। চোখে-মুখে দুষ্টুমির ঝিলিক ফুটিয়ে বললো,
—শা’স্তি পেলে পাবো। আপনার শা’স্তি তো জানি স্কেল দিয়ে হাতে দু-চারটা দেবেন, তারপর বলবেন মনোযোগী হো।
বলার পর নিজেই হেসে ফেললো।
সায়র ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা স্কেলটা হাতে তুলে নিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে স্কেলটা নামিয়েই আবার টেবিলে রেখে দিলো। তারপর ঠোঁটের কোণে এমন এক রহস্যময় হাসি ফুটলো, যেটা দেখে মুহূর্তেই বেলার হাসি মিলিয়ে গেলো।সায়র শান্ত, ধীর কণ্ঠে বললো,
—আজকের শা’স্তিটা কিন্তু একদম ভিন্ন হবে।
বেলার ভুরু কুঁচকে গেলো,
—ভভিন্ন মানে?
—সেটা এখন বলবো না। আগে দেখি পড়া পারিস কি না।
সায়রের সেই অদ্ভুত শান্ত হাসিটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠলো। বেলার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন অজানা কাঁপুনি খেলে গেলো। সে অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলে ফেলে বললো,
—আপনি আপনি এমন করে হাসছেন কেন?আর কি শা’স্তি দিবেন বলেন।
— কারণ আমি আগেই বলে দিলে শা’স্তির মজা ন’ষ্ট হয়ে যাবে।
বেলা এবার সত্যিই একটু ঘাবড়ে গেলো। সে তাড়াতাড়ি বইটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে পাতাগুলো উল্টাতে লাগলো,
— আমি পড়ছি তো!
সায়র ভান করে গম্ভীর মুখে বললো,
— এখন পড়ে লাভ নেই। পাঁচ মিনিট আগে পড়তে বলেছিলাম।
—আরে, মানুষ ভুল করতেই পারে!
— ভুল করা যাবে না।
বেলা মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
—বাসায় ও হিটলার বেটার মাস্টারগিরি শেষ হয় না!
— কিছু বললি?
— না।আমি খুব মন দিয়ে পড়ছি।
সায়র হালকা হেসে চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বলে,
— ঠিক আছে, তাহলে এই চ্যাপ্টারটা পড়ে আমাকে শোনা তো।
বেলা গলা খাঁকারি দিয়ে পড়া শুরু করলো। প্রথম দু-লাইন ঠিকঠাক গেলেও তৃতীয় লাইনে এসে শব্দ গুলিয়ে ফেললো। তারপর নিজেই থেমে লজ্জিত মুখে বললো,
—এই শব্দটা খুব কঠিন।
সায়র মাথা নেড়ে বললো,
— শব্দ কঠিন না, তোর মনটাই দুষ্টু।
বেলা এবার অসহায় ভঙ্গিতে দুহাত তুলে বললো,
—আচ্ছা, আজকের জন্য মাফ করে দিন না!
সায়রের চোখে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফিরে এলো,
—মাফ পাবি কি না, সেটা নির্ভর করছে পরের দশ মিনিটের ওপর।আর মনে রাখিস, আজকের শা’স্তি স্কেল নয়।
কথাটা শুনে বেলা আবারও শুকনো ঢোক গিলে বইয়ের দিকে এমন মনোযোগ দিলো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই এখন পড়াশোনা।কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা বড় বড় কথা বলছিলো,সে তাড়াতাড়ি বইটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করলো।মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খেতে লাগলো,
—আজ উনি আবার কী শা’স্তি ভাবছেন।
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। অফিস ছুটির ভিড়ে ফুটপাত জুড়ে মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা। সারাদিনের কাজ শেষে কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ ঝুলিয়ে বিহান বাড়ির দিকে হাঁটছিলো। ক্লান্ত চোখে ফোনের স্ক্রিনে একবার তাকিয়েই সে সামনে এগিয়ে গেলো।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের স্টেশনারি দোকান থেকে নোটবুক হাতে বেরিয়ে এলো ইরা। দোকানদারকে টাকা ফেরত গুনতে গুনতেই সে তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিলো।
—ধুপ!
কারো সঙ্গে হালকা ধাক্কায় ইরার হাতের নোটবুকগুলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো।ইরা বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে বললো,
—এই যে মিস্টার, দেখেশুনে হাঁটতে পারেন না।
কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখেই বাকিটা আর বলা হলো না। রাগী মুখটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেলো, ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো,
— আরে বিহান ভাইয়া!
বিহানও অবাক হয়ে হেসে নিচু হয়ে বইগুলো কুড়াতে লাগলো,
—সরি! আমি একদম খেয়াল করিনি। লাগেনি তো?
ইরা বইগুলো নিতে নিতে মুচকি হেসে বললো,
—দুই সেকেন্ড আগে খুব রাগ হচ্ছিলো। এখন ভাবছি রাগটা রাখবো নাকি ছেড়ে দেবো বেটার উপর।
বিহান হালকা হেসে বললো,
—তাই??
— একদম।
ইরা ইচ্ছে করেই একটু গম্ভীর মুখ করে বললো,
—জানেন, অপরিচিত কেউ হলে আমি কিন্তু অনেক বকাঝকা করতাম।এমনকি মা’রপিট লেগে যেতাম।
— আমি পরিচিত বলে বেঁচে গেলাম?
— হুম।আপনি তো বেলার ভাইয়া। আপনাকে খুব বেশি বকা দিলে পরে বেলাই আমার ওপর রাগ করবে।
বিহান হেসে মাথা নাড়লো,
— বেশ! তাহলে আমার পরিচয়টা আজ কাজে লেগেছে।
ইরা চোখ টিপে বললো,
— একটু তো লাগছেই।
দুজনেই কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। বাতাসে হালকা শিউলির গন্ধ ভেসে আসছে।বিহান নরম গলায় বললো,
— দিনকাল কেমন চলছে?
— ভালোই। কিন্তু বেলার উল্টাপাল্টা কথার জ্বালায় শেষ আমি।
—ও আবার কী করেছে?
ইরা হাসতে হাসতে বললো,
— প্রতিদিন কিছু না কিছু করবেই। ওকে নিয়ে বলতে গেলে আলাদা বই লেখা যাবে।
বিহান হেসে ফেললো।
— সেটা সত্যি।
ইরা ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,
— আচ্ছা ভাইয়া, আজকে আপনাকে মাফ করে দিলাম।
— এত সহজে?
— হ্যাঁ।তবে একটা শর্তে।
— বলো।
— পরেরবার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ফোন না দেখে হাঁটবেন।
বিহান মৃদু হেসে দুহাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো,
— জি ম্যাডাম, কথা দিলাম।
ইরা খিলখিল করে হেসে সামনে এগিয়ে গেলো। আর বিহানও অজান্তেই হাসতে হাসতে তার চলে যাওয়া পথটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো।ইরা সামনে হাঁটতে শুরু করতেই বিহান কয়েক পা এগিয়ে আবার ডাক দিলো,
–এই যে ইরা!
ইরা ঘুরে তাকালো।
— জি, ভাইয়া?
বিহান রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একটা খালি রিকশার দিকে ইশারা করলো,
— রাত হয়ে গেছে। আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো,
–না না, দরকার নেই। আমি চলে যেতে পারব।
—কেন? তোমার বাসা তো আমার পথেই।
— তবুও না। এলাকার মানুষ দেখলে কী ভাববে!
বিহান হেসে বলল,
— মানুষ এত ফ্রি না যে আমাদের নিয়ে ভাববে। আর ভাবলেও তাতে আমাদের কি।
ইরা ঠোঁট কা’মড়ে হাসি চাপলো,
—আচ্ছা
— তাহলে উঠো।
— না।
—ইরা!
বিহানের গম্ভীর ডাক শুনে ইরা নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
— আচ্ছা আচ্ছা, এত জোর করলে আর না বলি কীভাবে!
দুজনেই রিকশায় উঠে বসলো। রিকশা ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে একটু নিরিবিলি পথে এগিয়ে চললো।কিছুক্ষণ নীরবতার পর বিহান বললো,
— তোমার ব্যাগটা মনে হচ্ছে নোটবুকে ভর্তি।
ইরা ব্যাগ আঁকড়ে ধরে বললো,
— অবশ্যই। বেলা তো নিজের নোট না লিখে আমারটাই নিয়ে যায়।তাই মাঝে মাঝে এক বিষয়ে দুটো করে লাগে নোট।
— মানে আমার বোন চু’রি করে?
— একদম শিক্ষিত চু’রি!
বিহান হেসে উঠলো,
—বাসায় গিয়ে আজই ওর বিচার হবে।
— না না! আমার নাম বলবেন না। পরে ও আমাকে কলেজে ছাড়বে না।
— ওহ, তাহলে তুমি বেলা’কে ছাড় দিতে চাইছো?
—অবশ্যই!
দুজনেই হেসে উঠলো।হঠাৎ স্পিডব্রেকারে রিকশা লাফিয়ে উঠতেই ইরা সামান্য দুলে উঠে। বিহান দ্রুত রিকশার পাশটা ধরে বললো,
— সাবধানে বসো!
ইরা হালকা লজ্জা পেয়ে সোজা হয়ে বসলো,
—এই রিকশাটাও না।
—রিকশার দোষ না, রাস্তার।
— আপনি রিকশাওয়ালা মামার পক্ষ নিচ্ছেন নাকি কিন্তু কেন?
— এমনি। কারন আমি সহজ সরল মানুষ কাউকে কটু কথা বা জোরাজুরি করি না। ঝগড়াঝাঁটি ও করি না।
ইরা মুখ বেঁকিয়ে বলে,
— মিথ্যা! পাঁচ মিনিট আগে তো আমাকে জোর করে রিকশায় তুলেছেন।
বিহান হেসে মাথা নিচু করলো,
—সেটা নিরাপত্তার স্বার্থে।
ইরা মুখ ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকানোর ভান করলো, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর নিজেই হেসে ফেললো।রিকশা ধীরে ধীরে ইরাদের গলিতে ঢুকে থামলো।ইরা নেমে ভাড়া দিতে যেতেই বিহান আগে থেকেই টাকা দিয়ে দিলো।
— আরে! আমি দিয়ে দিলাম। আজকে আমার ভুলে ধাক্কা লেগেছিলো। এটাকে জরিমানা ভাবো।
ইরা মুচকি হেসে বলল,
—তাহলে পরেরবার ধাক্কা লাগলে কিন্তু ভাড়াও আপনাকেই দিতে হবে।
—আশা করি পরেরবার ধাক্কা নয়, অন্যভাবে দেখা হবে।
কথাটা শুনে ইরা একটু থমকে গেলো। তারপর নরম হেসে বলল,
—আল্লাহ হাফেজ, ভাইয়া।
—আল্লাহ হাফেজ। সাবধানে ভেতরে যাও।
ইরা গেটের ভেতর ঢুকে একবার পেছন ফিরে হাত নাড়লো। বিহানও হাসিমুখে মাথা নেড়ে রিকশায় উঠে নিজের বাড়ির পথে রওনা দিলো। সন্ধ্যার নরম বাতাসে দুজনের মুখেই অজান্তে রয়ে গেলো এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
ঘড়ির কাঁ’টা তখন রাত আটটার কাছাকাছি। পড়ার টেবিলের ওপর খোলা বই, খাতা আর জ্বলে থাকা স্টাডি ল্যাম্পের হলদে আলো পুরো ঘরটাকে শান্ত এক পরিবেশে মুড়ে রেখেছে। অথচ সেই শান্ত পরিবেশের একমাত্র অশান্ত মানুষটি হলো বেলা। বই সামনে খুলে বসে থাকলেও তার মন পড়ার পাতায় নয়। কখনও কলম দিয়ে গোল গোল দাগ কাটছে, কখনও হাই তুলছে, আবার কখনও জানালার বাইরে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে। ঠিক আগের মতই।সায়র অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়িয়ে অবশেষে বইটা বন্ধ করে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
—আচ্ছা, এতক্ষণ যা পড়ালাম, এবার বল দেখি। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর কী?
বেলা চোখ বড় বড় করে বইয়ের দিকে তাকালো, তারপর নিরীহ মুখে বলল,
—কোন দ্বিতীয় প্রশ্ন?
সায়র ভ্রু কুঁচকে গেল।
—মানে? আমি পনেরো মিনিট ধরে যেটা বুঝালাম!
বেলা শুকনো হাসি দিয়ে বলল,
—আসলে একটু মন অন্যদিকে চলে গিয়েছিলো।
— অন্যদিকে না, পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছিলো।
সায়র চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার গলাটা এবার আগের চেয়ে একটু কঠোর শোনালো।
—পড়া পারিসনি। তার মানে এখন শা’স্তি পাবি।
বেলার বুক ধক করে উঠলেও মুখে সাহস দেখিয়ে বলল,
— না। আগে ধরেন, তারপর শা’স্তি দেবেন!
কথা শেষ করেই সে বিদ্যুতের গতিতে চেয়ার ছেড়ে দরজার দিকে দৌড় দিলো।
— বেলা!
সায়র ডাক দিতেই মেয়েটা খিলখিল করে হেসে করিডোরে বেরিয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে সায়রও তার পিছু নিলো।পুরো দোতলাজুড়ে তখন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে।
—ধরতে পারলে ধরুন, মাস্টার সাহেব!
—আজ তোকে ছাড়ছি না!
বেলা হাসতে হাসতে করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে নিজের ঘরের দিকে ছুটলো।ঠিক সেই সময় নিচতলায় ড্রয়িংরুমে বসে থাকা মমতাজ বেগম উপরের হাসির শব্দ শুনে অবাক হয়ে তাকালেন। কিছুক্ষণ আগেও যে বাড়িটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ডুবে ছিল, সেখানে হঠাৎ এমন দৌড়াদৌড়ি কেন?তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন।এদিকে বেলা নিজের ঘরে ঢুকেই তাড়াতাড়ি দরজা টেনে ছিটকিনি লাগাতে গেলো। কিন্তু ছিটকিনি পুরোপুরি লাগার আগেই বাইরে থেকে সায়র দরজাটা ঠেলে ধরলো,
— আরে না না!
বেলা দুই হাতে দরজা চেপে ধরে বললো,
—খুলবো না!
সায়র হেসে বললো,
–দরজা দিয়ে পালিয়ে বাঁচবি ভাবছিস?
পরের মুহূর্তেই তার শক্ত ঠেলায় দরজাটা খুলে গেলো। বেলা ভারসাম্য হারিয়ে দু-এক পা পেছনে সরে দাঁড়াল।সায়র দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে মুচকি হেসে বলল,
—আজকে কিন্তু শা’স্তি পাবিই, বেলা।
বেলা অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলে বললো,
—আআচ্ছা, শা’স্তি ক্যানসেল করা যায় না?
— না।
—অল্প একটু?
—একদম না।
সায়র এক পা এগোতেই বেলা আরেক পা পেছালো। এভাবে পিছু হটতে হটতে সে খাটের কিনারায় এসে পৌঁছেছে, সেটা খেয়ালই করলো না।
— আর আসবেন না…
— তাহলে পড়া মুখস্থ বল।
—এখনই বলছি!
কথাটা বলতেই হঠাৎ তার পা খাটের কাঠে আটকে গেল।
—আহ্!
ভারসাম্য হারিয়ে বেলা ধপাস করে নরম খাটের ওপর পড়ে গেলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে ধরে সামলাতে গিয়ে সায়রেরও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সেও সামনে ঝুঁকে পড়লো, তবে দুই হাত খাটে ঠেকিয়ে নিজের শরীরের ভর সামলে নিতে চাইলো । যাতে বেলার ওপর পুরো ওজন না পড়ে। কিন্তু সেও ধপাস করে পড়লো বেলার ঠিক উপরে।দুজনেই কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইলো।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালেন মমতাজ বেগম। ভেতর থেকে ভেসে আসা হাসি আর ধপাস শব্দ শুনে তাঁর চোখে আবারও অদ্ভুত এক কঠিন ছায়া নেমে এলো।দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিলো না। মমতাজ বেগম নিঃশব্দে এগিয়ে এসে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই তাঁর চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ধরা পড়লো, তাতেই যেন বুকের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ মুহূর্তে আ’গ্নেয়গিরির মতো বি’স্ফো’রিত হয়ে উঠলো।খাটের ওপর পড়ে আছে বেলা। আর তাকে সামলাতে গিয়ে সায়র দু’হাত খাটে ঠেকিয়ে বেলার উপর পড়ে আছে । বাইরে থেকে দেখলে দৃশ্যটা সহজেই ভুল বোঝা যায়।
মমতাজ বেগমের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠলো। তাঁর চোখের মণি জ্ব’লে উঠল তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভে। দাঁত চেপে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
—আমার ছেলেটাকে পুরোপুরি বাগে এনেছিস, বদমাইশ মেয়ে!
তিনি আরও এক পা এগিয়ে এসে দরজার পাশে মুঠো শক্ত করে দাঁড়ালেন। এরপর বললো,
—ছেলেধরা মেয়েলোক! এতো দিন মাথা চিবিয়ে খেয়েছে।এখন আমার ছেলের র’ক্ত চু’ষে খাবে, অসভ্য কোথাকার! ঠিক নিজের মায়ের মতোই হয়েছে।
রাগে তাঁর বুক উঠানামা করছে। বহু বছরের জমে থাকা অভিমান যেন আবার বেলার মুখের ওপর গিয়ে পড়লো। তাঁর মনে হলো, বেলা ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে সায়রকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে।।ঠিক তখনই ঘরের ভেতর সায়র বেলাকে বলে উঠলো,,
— লেগেছে কোথাও?
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩০
আর সেই সাধারণ কথাটুকুও মমতাজ বেগমের কানে আরও বি’ষের মতো লাগলো। তিনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন, কিন্তু মনের ভেতর একটাই প্রতিজ্ঞা আরও শক্ত হয়ে উঠলো,
— খুব উড়ছিস। তোর পাখনা গজিয়েছে তাই না বেলা? তোর পাখনা খুব দ্রুত ছাঁটাই করবো আমি।
বলে হনহন করে সেখান থেকে চলে গেলো।
