রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭ (২)
অধরা মিনহা
ইফরাদের ঠোঁটের হাসিটা আরো গভীর হয়ে উঠে।
— তুমি আনতারা তো?
— কী মনে হচ্ছে? অন্য কেউ?
ইফরাদ ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। তারপর দ্রুত টাইপ করে,
— এসে দেখছি। কে তুমি।
মেসেজটা পাঠিয়েই ইফরাদ ফোনটা পকেটে রেখে নিজের মনে হাসতে লাগল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে মিটিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। মিটিং রুমের দরজা খুলতেই ইরাইনা কথা বলতে বলতে থেমে গেল।
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— রাইনা, আমার একটা জরুরি কল এসেছে। আমি মিটিংয়ে থাকতে পারছি না। পরে সাফিনের কাছ থেকে সব আপডেট নিয়ে নেব।
ইরাইনা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তবু স্বাভাবিকভাবেই বলে,
— ওকে।
ইফরাদ অফিস থেকে বেরিয়ে সামনে পার্কিং এরিয়ায় এসে গাড়িতে উঠে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়েই দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে শুরু করে। তার এখন শুধু একটাই অপেক্ষা, কখন বাড়ি পৌঁছাবে। আজ যেন সময়ই কাটছে না। মনে হচ্ছে, যদি উড়ে বাড়ি যাওয়া যেত! স্বাভাবিকভাবে এই পথ পাড়ি দিতে দেড় ঘণ্টা লাগে, কিন্তু আজ সেই দেড় ঘণ্টাই তার কাছে অসহ্য দীর্ঘ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই রাস্তার যেন আর শেষ নেই। তবু ইফরাদ দেড় ঘণ্টার পথ শেষ করে মাত্র এক ঘণ্টা তেরো মিনিটে। বাড়ির মেইন গেটের সামনে পৌঁছাতেই ইফরাদের মুখে ভেসে উঠে এক বিজয়ীর হাসি। অবশেষে সে বাড়ি এসেছে।
দুজন সিকিউরিটি গার্ড বড় গেট খুলে দেয়। ইফরাদ গাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে পার্ক করে না। বাড়ির সামনে রেখেই গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে বাড়ির মইন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং কলিংবেল চাপে। পাঁচ সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারে না। বিরক্ত হয়ে একটানা কলিংবেল বাজাতে লাগল। কী ভীষণ অধৈর্য! মেইড ছুটে এসে দরজা খুলতেই ইফরাদ দ্রুত ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে গম্ভীর গলায় বলে,
— নেক্সট টাইম দরজা খুলতে এত দেরি হলে তোমার চাকরি আর থাকবে না, মাইন্ড ইট।
মেইড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কলিংবেল বাজার ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে সে দরজা খুলেছে! এর চেয়েও দ্রুত আর কিভাবে সম্ভব? কিন্তু কথাগুলো বলার সাহস হলো না তার। অবশ্য ইফরাদও সেখানে বেশিক্ষণ থাকে না। ইফরাদ ইতোমধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেছে। নিজের রুমের সামনে এসে দরজা খুলতেই দেখে, মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে আনতারা নামাজ পড়ছে। ইফরাদ হাতঘড়ির দিকে তাকায়। সময় ছয়টা পঁয়তাল্লিশ। আন্দাজ করে, আনতারা সম্ভবত মাগরিবের নামাজ আদায় করছে।
দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ইফরাদ জুতা খুলে ফেলে। যেহেতু আনতারা নামাজে রয়েছে, তাই জুতা পরে রুমে ঢুকে না। মোজা পরা পায়ে হেঁটে গিয়ে আনতারার পাশেই মেঝেতে বসে পড়ে। ডান হাঁটু উঁচু করে তার ওপর কনুই রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে রইল। আনতারা তখন সিজদায়। সিজদাহ্ শেষ করে মাথা তুলে তাশাহহুদে বসতেই ইফরাদের চোখে পড়ে, আনতারার খিমারের মাথার দিকের ফিতাটা খুলে গেছে। ইফরাদ আস্তে করে উঠে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে আসে। তারপর খুব যত্ন করে আনতারার খিমারের ফিতাটা বেঁধে দেয়।
আনতারা তখনো তাশাহহুদে বসে। সে স্পষ্টই অনুভব করে, ইফরাদ তার খিমারের ফিতা বেঁধে দিচ্ছে। ফিতাটা প্রথম রাকাআতের সিজদায় গিয়েই খুলে গিয়েছিল। কিন্তু নামাজে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিকে মনোযোগ বা দৃষ্টি দেওয়া যায় না। তাই আনতারা ফিতাটা ঠিক করতে পারেনি। ইফরাদের স্পর্শ আনতারা অনুভব করলেও মনোযোগের এক বিন্দুও সেদিকে সরায় না। তার সমস্ত মনোযোগ অটুট রইল নামাজেই। ফিতা বেঁধে দিয়ে ইফরাদ আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। দোয়া শেষ করে আনতারা দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে। তারপর ইফরাদকে দেখে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— আসসালামু আলাইকুম।
ইফরাদও হাসি দিয়ে সালামের জবাব দেয়।
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। নামাজ শেষ?
আনতারা মাথা নেড়ে বলো
— না। আরো দুই রাকাআত আছে।
— ওহ।
— জি। আজ এত তাড়াতাড়ি বাসায়?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— কী অদ্ভুত! পাগল করে নিয়ে আসলে, এখন আবার কারণ জিজ্ঞেস করছো?
আনতারা হাসিটা সংযত রাখে। সে এখনো জায়নামাজে, ওজু অবস্থায়। তবু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে রইল।
— আচ্ছা, আমি দুই রাকাআত নামাজ পড়ে নিই। তারপর কথা বলছি।
— হুম, দ্রুত পড়ো।
কথাটা বলেই নিজের ভুলটা বুঝতে পারে ইফরাদ। আনতারা কিছু বলার আগেই সে দু হাত তুলে নিজের কথাই সংশোধন করে,
— সরি, সরি। নামাজ দ্রুত পড়া যায় না। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুন্দরভাবে নামাজ শেষ করো। আমি অপেক্ষা করছি।
আনতারার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরো প্রশস্ত হয়ে উঠে। ইদানীং লোকটা এমন এমন বুঝদার কথা বলে যে, আনতারা আর তার দিক থেকে চোখ সরাতে পারে না। বরং ইচ্ছে করে শুধু তার কথা শুনে যেতে।
আনতারা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে,
— এভাবেই এখানে বসে অপেক্ষা করবেন?
ইফরাদ হালকা হেসে উত্তর দেয়।
— হুম, শুধুই তোমার জন্য।
আনতারা আবারও হাসে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দুই রাকাআত নফল নামাজের নিয়ত করে নামাজে দাঁড়ায়।ইফরাদ আগের মতোই বসে রইল। মুগ্ধ চোখে আনতারার নামাজ পড়া দেখছে। এবার আর ইফরাদের বুকজুড়ে সেই অস্থিরতা নেই। হয়তো নামাজরত আনতারাকে দেখেই বুকের সব অস্থিরতা মিলিয়ে গেছে। সেখানে এখন জমেছে এক আকাশ প্রশান্তি। সামনে স্নিগ্ধতায় মোড়া খিমার পরা নিজের স্ত্রীকে দেখে ইফরাদের মন ভরে উঠে।তার স্ত্রী! হ্যাঁ, তারই তো। ভাবনাটা মাথায় আসতেই নিজের অজান্তেই একটু শব্দ করে হেসে ফেলে ইফরাদ।
তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়। আনতারা নামাজে আছে। তার মনোযোগ নষ্ট হোক, সেটা ইফরাদ চায় না।তাই শান্ত হয়ে বসে রইল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আনতারার নামাজ দেখা আর তার অপেক্ষা করাই এখন তার একমাত্র কাজ।কিছুক্ষণ পর আনতারার নামাজ শেষ হলো। সালাম ফিরিয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— কিছু দোয়াদরুদ ছিলো……
ইফরাদ আগের মতোই শান্ত। হালকা হেসে বলে,
— সমস্যা নেই। আমি এখানেই বসে আছি। তুমি দোয়া পড়া শেষ করো।
ইফরাদের এমন ধৈর্য দেখে আনতারা মুগ্ধ হয়ে যায়। প্রথম দিনের সেই অধৈর্য ইফরাদ আর আজকের এই ধৈর্যশীল ইফরাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এতক্ষণ ধরে একটুও বিরক্তি বা রাগ ছাড়াই ইফরাদ অপেক্ষা করছে।আনতারা আর সময় নষ্ট করে না। মনোযোগ দিয়ে দোয়া পড়তে লাগল। দোয়া শেষ করতে আনতারার প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগল। এরপর আনতারা মোনাজাতে ধরে। মোনাজাতেও আরল প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল।
মোনাজাত শেষে আনতারা হালকা হেসে বলে,
— আল্লাহর রহমত কত সুন্দর! অধৈর্য ইফরাদকে আল্লাহ তাআলা বদলে কতটা ধৈর্যশীল করে দিয়েছেন!
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— অধৈর্য থেকে ধৈর্যশীল না হলে ইফরাদ থেকে তোমার রাদ হতাম কীভাবে?
আনতারা হালকা হেসে বলে,
— কিসের জন্য এত অপেক্ষা করছিলেন? বলুন?
— অপেক্ষা তো শুধুই তোমার জন্য করেছি।
আনতারা হেসে বলে,
— আমি বলতে চাচ্ছি, কি বলার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করেছেন?
ইফরাদ আগের মতোই বলে,
— বললাম তো, অপেক্ষা আমি তোমার জন্য করেছি।
— কিছু বলার নেই?
— আছে তো।
— কী? বলুন।
— সত্যি বলবো?
আনতারা আবারো হেসে উঠে।
— কী করছেন, ইফরাদ? এমন করছেন কেন?
ইফরাদও হেসে ফেলে।
— কী করছি?
আনতারা এবার জায়নামাজ থেকে উঠে সেটা ভাঁজ করতে করতে মুচকি হেসে বলে,
— বুঝেছি। আপনার আসলে কিছু বলারই নেই। এমনিই আমাকে জ্বালাতন করছেন।
কথা শেষ করে আনতারা জায়নামাজ নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই ইফরাদ উঠে দাঁড়িয়ে আনতারার হাত ধরে থামিয়ে বলে,
— ঘুরতে যাবো।
আনতারা ফিরে তাকায়। তারপর ইফরাদের চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
— অনুমতি নিচ্ছেন?
ইফরাদ কোমর জড়িয়ে আনতারাকে নিজের একদম কাছে টেনে এনে বলে
— তোমাকে সঙ্গে নিচ্ছি!
— এখন?
— হুমম। চলো যাই।
— হঠাৎ কী হলো আপনার?
— ফোনে একরকম, আর সামনে এসে আরেক রকম?
আনতারা হেসে বলে,
— অন্যরকম আবার কেমন?
ইফরাদ ঠোঁটের হাসিটা আরো গাঢ় হয়।
— অফিসে তো আমার সঙ্গে প্রেম। আর এখন শুধু দায়িত্বশীল বউ।
আনতারা ঠোঁট চেপে হেসে বলে
— তা দায়িত্বশীল বউ না হলে আপনাকে সামলাবো কিভাবে?
ইফরাদ দুষ্টু ইঙ্গিত করে বলে,
— দেখব, কীভাবে সামলাও!
কিন্তু আনতারা সেই ইঙ্গিত বুঝতে পারে না। বলে,
— সত্যিই আপনাকে সামলানো অনেক কষ্টকর।
ইফরাদ মুখটা আনতারার কানের কাছে এনে আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলে,
— সারাজীবন এই কষ্টটা নিতে পারবে না?
— আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, এমন মিষ্টি কষ্ট আমাকে দেওয়ার জন্য।
ইফরাদ হেসে বলে,
— রেডি হও।
— এখনই যাব?
— অফিস থেকে ছুটে এসেছি।
— কেন?
— এত বুদ্ধিমতী তুমি! এটাও বুঝো না?
— আপনাকে বোঝা অনেক দায়। এই ভালো, তো এই মেজাজ চটে গেল।
— বেশি রেগে যাই?
— সামান্য বেশি।
— আবার তুমি এসে যে শান্ত হয়ে যাই, সেটা তো বললে না।
আনতারা অবাক হওয়ার ভান করে বলে,
— সত্যি?
ইফরাদ ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে
— মিথ্যে নাকি?
আনতারা হেসে বলে,
— কী জানি।
— প্রমাণ দেখো না তুমি? তোমার কথা আমি মানি না, মনে হয়? তুমি জানো, আমি কখনো কাউকে সরি বলিনি। আমার ইগোতে লাগে। কিন্তু সেদিন তোমার কথায় মাম্মাকে সরি বলেছি। তারপর থেকে মাম্মার সঙ্গে আর কখনো উঁচু স্বরে কথা বলি না। শুধু তুমি মানা করেছো বলে। আরো কত কথা যে মানি তোমার! এসব এফোর্ট তোমার চোখে পড়ে না?
আনতারা ইফরাদের সাদা শার্টের ওপর পরা কালো কোটের কোণা নিয়ে খেলতে খেলতে মুচকি হেসে বলে,
— ওহ…..আচ্ছা, তাহলে ওগুলো আমি বলেছি বলে?
— তো আর কার কথায় হবে? নয়তো এই পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কারো এত ক্ষমতা হয়নি যে, ইফরাদকে নিজের কথায় চালাতে পারে।
আনতারা হেসে উঠে,
— আজকে আপনি একদম পাগল হয়ে গেছেন, রাদ।
— হুম। অফিসে আমার সঙ্গে এত দুষ্টুমি করে আমাকে ভাগিয়ে এনে এখন আবার এমন ভাব করছ, যেন কিছুই জানো না।
— অজানা কোথায়? আচ্ছা, আমি রেডি হচ্ছি। আপনি বরং চোখ-মুখে একটু পানি দিয়ে আসুন। আরাম বোধ করবেন।
— আপাতত আমার মন আরাম পাবে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হলে।
— আচ্ছা, কোথায় যাবেন?
— যেতে যেতে ঠিক করব।
— আচ্ছা, ছাড়ুন।
ইফরাদ আনতারাকে ছেড়ে মুচকি হেসে বলে,
— এখন একটু ছাড়ছি, যাতে তুমি রেডি হতে পারো। কিন্তু সারাজীবনের জন্য ছাড়ছি না।
ইফরাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আনতারা জায়নামাজটা তুলে চেয়ারের ওপর রেখে দেয়। তারপর আলমারির দিকে গিয়ে বোরখা বের করে। বোরখাটা পরতে যাবে, তখনি ইফরাদ বলে উঠে,
— সাজবে না?
আনতারা অবাক হয়ে তাকায়।
— বোরখা পরব। সাজার কী প্রয়োজন?
ইফরাদ হেসে আনতারার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
— বোরখা তো অন্যদের জন্য। বোরখার আড়ালের তোমাকে তো আমি দেখবো।
— সাজতে বলছেন?
— হুম। বেশি না, সামান্য সাজো।
আনতারা একটু ইতস্তত করে বলে,
— কিন্তু আমার তো সাজার মতো কোনো সরঞ্জাম নেই।
কথাটা শুনে ইফরাদের মনে পড়ে, সত্যিই তো! আনতারার তো কোনো মেকআপ প্রোডাক্ট নেই। সে তো কখনো কিনে দেয়নি। তাহলে থাকবে কীভাবে? ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— ওহ, সরি! আমার একদম মনেই ছিল না।
একটু থেমে আবার বলে,
— আচ্ছা, এখন আমি রাইনার কাছ থেকে এনে দিচ্ছি। পরে একদিন রাইনাকে নিয়ে শপিংয়ে গিয়ে নিজের জন্য কিনে নিও। মেয়েদের মেকআপের জিনিসপত্র তো আমি আর তেমন বুঝি না।
আনতারা আবার মিনমিনে বলে,
— কিন্তু আমি তো সাজতেও পারি না।
কথাটা ইফরাদের কাছে মোটেও অস্বাভাবিক লাগে না। সে শুরু থেকেই আনতারাকে খুব সাদামাটা রূপে দেখে এসেছে। তাই আনতারা মেকআপ করতে পারে না, এটা তার কাছে অবিশ্বাস্য কিছু না। ইফরাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে পারবে? না পারলেও সমস্যা নেই। আমি দিয়ে দেব।
আনতারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি লিপস্টিক দিতে পারবেন?
ইফরাদ দুষ্টু হেসে বলে,
— আমি লিপস্টিক দিতেও পারবো, তুলতেও পারবো।
কথাটা শুনে আনতারা লজ্জায় আর কিছু বলে না। ইফরাদ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর ইরাইনার রুমে ঢুকে। যদিও কারো অনুমতি ছাড়া তার রুম থেকে কিছু নেওয়া ঠিক না। কিন্তু আজ সে বিপদে পড়ে এসেছে। বউকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। এত সুন্দর একটা মুহূর্ত কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না। ইরাইনার ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দেখে, সারি সারি অনেকগুলো লিপস্টিক রাখা। তার কাছে সবগুলোই প্রায় একই রঙের মনে হলো। কোনটা নেবে, বুঝতে পারে না। শেষে মনে মনে ভাবে, সবই তো প্রায় একই রকম। তারপর একটা ডার্ক মেরুন রঙের লিপস্টিক তুলে নেয়।
সেটা নিয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়েও ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা একটা মাসকারা তার চোখে পড়ে। এটা সে চিনতে পারে। চোখের পাপড়িতে দেয়। সেটাও হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। নিজের রুমে ফিরে এসে দেখে, আনতারা ততক্ষণে কালো হিজাব বেঁধে ফেলেছে।
ইফরাদ জিনিস দুটো এগিয়ে দিয়ে বলে,
— এই নাও।
তারপর মাসকারাটা দেখিয়ে বলে,
— এটা, আই থিংক, মাসকারা।
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— এটা চিনি আমি। চোখের পাপড়িতে দেয়।
— গুড। এখন দ্রুত সেজে নাও। তারপর আমরা বের হব।
আনতারা প্রথমে খুব যত্ন করে চোখের পাপড়িতে মাসকারা লাগাতে শুরু করে। যদিও এটা তার প্রথমবার, তবু বেশ সুন্দরভাবেই লাগিয়ে ফেলে। এরপর ঠোঁটে ডার্ক মেরুন লিপস্টিক লাগায়। তারপর দুই ঠোঁট আলতো করে একসঙ্গে চেপে লিপস্টিকটা সুন্দরভাবে সেট করে নেয়। সবশেষে ইফরাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
— রাদ, ঠিক আছে?
এতক্ষণ ইফরাদ শুধু আনতারাকে সাজতে দেখছিল। কিন্তু সে একবারও আয়নায় দেখতে পায়নি, সাজের পর আনতারাকে কেমন লাগছে। আনতারা ঘুরে তার দিকে তাকাতেই ইফরাদ পুরো সাজে আনতারাকে দেখে। আর সেই মুহূর্তেই ইফরাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। চোখদুটো স্থির হয়ে রইল আনতারার মুখের ওপর। ধবধবে ফর্সা মুখ। বড় বড় ঘন চোখের পাপড়িতে কালো মাসকারা। ঠোঁটে গাঢ় মেরুন লিপস্টিক। আর বাঁ গালের ছোট্ট কালো তিল, সব মিলিয়ে আনতারাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
আনতারা ঘুরে তাকানোর সেই মুহূর্তেই ইফরাদ আছাড় খেলো আনতারার প্রেমে। বড়সড় ক্রাশ খেল। ইফরাদকে এভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে আনতারা মৃদু স্বরে বলে,
— ভালো লাগছে না?
কথাটা শুনে ইফরাদের ধ্যান ভাঙে। কোনোমতে বলে,
— ভালো লাগছে।
তারপর একটু থেমে বিড়বিড় করে বলে,
— অনেক ভালো লাগছে।
ইফরাদের সম্মতি পেয়ে আনতারা নিকাব পরে নেয়। তারপর চোখের ওপর নিকাবের পাতলা কাপড়টাও নামিয়ে দেয়। এবার ইফরাদ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। এতক্ষণ আনতারাকে এভাবে দেখে তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছিল। আনতারা পুরোপুরি রেডি হয়ে গেলে ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— ব্যাগ নেবে না?
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— ব্যাগ নেওয়া লাগবে?
— ব্যাগ নাও। সঙ্গে ফোনও রেখো।
আনতারা ইফরাদের কথামতো ফোনটা ব্যাগে রেখে ব্যাগটাও সঙ্গে নেয়। তারপর ইফরাদ হাসিমুখে বলে,
— তাহলে যাওয়া যাক?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি, চলুন।
ইফরাদ এগিয়ে এসে আনতারার হাতটা আলতো করে ধরল। তারপর দুজনে একসঙ্গে রুম থেকে বেরিয়ে এল।ইফরাদের পরনে সাদা শার্টের ওপর কালো স্যুট। আর আনতারা পরেছে কালো বোরখা। একসাথে কালো পোশাকে দুজনকে বেশ মানিয়েছে। নিচে নেমেই আনতারা ইফরাদকে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার আম্মুকে বলে যাবেন না?
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,
— না। মাম্মা দেখার আগেই বের হব।
— লুকিয়ে বের হচ্ছেন? আপনার আম্মু জানলে আপনার জন্য সমস্যা হবে?
ইফরাদ মৃদু হেসে আনতারার দিকে ঝুঁকে বলে,
— আপাতত আমি আমার এত ভালো থাকা মুডটা মাম্মার সঙ্গে তর্ক করে নষ্ট করতে চাই না। এই ভালো মুডটা নিয়ে তোমার সঙ্গে প্রেম করতে চাই।
আনতারা আর কিছু বলে না। ইফরাদ আনতারার হাতটা ধরে হাঁটতে থাকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুজনে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। ইফরাদ গাড়ির দরজা খুলে বাম হাতে দরজাটা ধরে রাখল। তারপর অন্য হাতটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দেয়। যাতে আনতারা সেই হাত ধরে গাড়িতে ওঠে। আনতারা একবার ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর নিজের হাতটা ইফরাদের হাতে রেখে শক্ত করে ধরে, গাড়িতে উঠে বসে। আনতারা বসতেই ইফরাদ দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর নিজে ঘুরে গিয়ে ড্রাইভারের সিটে বসে এবং দরজা লাগিয়ে আনতারার দিকে ঝুঁকে এল।
আনতারা হকচকিয়ে উঠে। তা দেখে ইফরাদ হেসে বলে,
— সিটবেল্ট লাগাচ্ছি। গাড়িতে কিছু করব না।
তারপর একটু থেমে চোখ তুলে চেয়ে বলে,
— আবার অনেক কিছুও করতে পারি।
কথাটা শুনে আনতারা লজ্জা পায়। ইফরাদ আনতারার সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয়। তারপর নিজের সিটবেল্ট পরতে পরতে জিজ্ঞেস করে,
— বলো, কোথায় যাবে?
আনতারা কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ ইফরাদদের এনজিওর কথা মনে পড়ে।
— আপনাদের না একটা এনজিও আছে?
ইফরাদের সিটবেল্ট লাগানো শেষ হলো। আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— হুম।
— সেখানে যাই?
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— এনজিওতে? ওখানে গিয়ে কী করবে?
— বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাব।
— কিন্তু আজ তো আমরা একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বের হয়েছি।
— তাহলে আপনার যেখানে ভালো লাগে, সেখানেই নিয়ে চলুন।
— পরে একদিন এনজিওতে যেও।
— আচ্ছা।
ইফরাদ গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করল। ইফরাদ ড্রাইভ করতে করতে বলে,
— নিকাবটা এখন তুলে রাখো। গাড়িতে তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
আনতারা ইফরাদের কথামতো নিকাবটা তুলে রাখে।মুহূর্তেই আনতারার মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠে। আসলে এতক্ষণ ধরে ইফরাদের বুকের ভেতরটা আনচান আনচান করছিলো তার ভীষণ সুন্দরী বউটাকে একবার মনভরে দেখার জন্য। চোখদুটো তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছিল। সেই তৃষ্ণা মেটাতেই আনতারাকে নিকাব তুলতে বলেছিলো। ভেবেছিল, একটু দেখলেই হয়তো মনটা শান্ত হয়ে যাবে।কিন্তু কে জানত, সে নিজেই ফেঁসে যাবে! আনতারা নিকাব তুলতেই সব হিসাব পাল্টে গেল। বুকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা অস্থিরতাগুলো আবার একসঙ্গে জেগে উঠে।
যে প্রশান্তিটুকু এতক্ষণ ধরে নিজেকে বুঝিয়ে ধরে রেখেছিল, মুহূর্তেই তা উধাও হয়ে গেল। এখন আর নিজের মনকে, এমনকি নিজের দৃষ্টিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ইফরাদ। আনতারাকে দেখে আবারো ইফরাদের শ্বাস ভারী হয়ে এল। গাড়ির এসি চললেও হঠাৎ ইফরাদের গরম লাগতে শুরু করে। আনতারার ঠোঁটে গাঢ় মেরুন লিপস্টিক দেখে বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠে।
ইফরাদ নিজের ঠোঁট আলতো করে ভিজিয়ে নিচু স্বরে বলে,
— এই লিপস্টিকটা নিয়ে ভুল করেছি।
আনতারা এতক্ষণ সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। ইফরাদ আস্তে করে বললেও কথাটা আনতারা শুনতে পারে। আনতারা কথাটা শুনে অবাক হয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
ইফরাদ ভারী গলায় বলে,
— ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে পারছি না।
আনতারা আর কিছু বলে না। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। ইফরাদ গাড়ি চালাতেই চালাতেই নরম স্বরে বলে,
— আনতারা, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।
আনতারা চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
— আজকে সেজেছি বলে?
ইফরাদ ধীর কণ্ঠে উত্তর দেয়।
— এতদিন সুন্দর ছিলে। কিন্তু আজ শ্বাস কেড়ে নেওয়ার মতো সুন্দর লাগছে।
কথাটা শুনে লজ্জায় আনতারার গাল লাল হয়ে উঠে। গালে কোনো ব্লাশ দেয়নি, তবু ইফরাদের কথার লাজে গাল দুটো একেবারে স্বাভাবিকভাবেই রাঙা হয়ে উঠে। স্বামীর দেওয়া একদম প্রাকৃতিক ব্লাশ। আনতারা লজ্জায় ডুবে আছে। ঠিক তখনি ইফরাদ ডান হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে নিজের বাম হাতটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— হাতটা দাও।
আনতারা অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
— হুম?
ইফরাদ আনতারার হাতের দিকে ইশারা করে আবার বলে,
— হাতটা।
আনতারা নিজের ডান হাতটা ইফরাদের হাতে রেখে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
ইফরাদ আনতারার হাতটা শক্ত করে ধরে মুচকি হেসে বলে,
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭
— তোমার হাতটা আমার হাতে থাকলে কোনো সমস্যা আছে?
আনতারা নিঃশব্দে হেসে দুই দিকে মাথা নেড়ে না বুঝায়। ইফরাদও হেসে বলে,
— গুড। বাধ্য বউ।
