ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯২
শানজানা আলম
তাহিরা বেগম দুপুরে অথৈকে ফোন করলেন। ঐশির ফোনটা সুইচড অফ বলছে। অথৈ অস্থিরতার মধ্যে ছিল। যতই বলুক, সে কিছুই ভাববে না, নিজের বোনের বিষয়ে চিন্তা না করে থাকতে পারছিল না। আবার বাড়তি চিন্তা তার শরীরের পক্ষে ভালো হবে না, সেটাও জানে, পরিস্থিতি এমন হয়েছে, অথৈ কিছুই সামলাতে পারছে না। নিজের মনের উপর তো আর হাত নেই। এহসান ফাকে ফাঁকে টেক্সট করে যাচ্ছে।
মায়ের ফোন দেখে, অথৈ রিসিভ করল।
তাহিরা বেগম ভালো মন্দ জিজ্ঞেস না করে জানতে চাইলেন, ঐশির সাথে কথা হয়েছে?
না মা।
কোনো যোগাযোগ করে নি?
না। লাইভ দেখেছি। তুমি দেখো নি?
তাহিরা বেগম উত্তর দিলেন না।
অথৈ বলল, আমি তোমাকে গয়নার রিসিট দিয়েছিলাম, বিশ্বাস করো নি।
তাহিরা বেগম বললেন, ঐশির বাসার এড্রেসটা দিস।
অথৈ বলল, আমি জানি না।
এটা কেমন কথা?
সেটা তো তোমার ক্ষেত্রেও হয় মা, তুমি জানো না আপু কোথায় থাকে, কি করে! কোনো প্রশ্নও করো নি! টাকা পয়সা খরচ করছে, মানে ভালো আছে!
অথৈ, তর্ক করার সময় না এখন। ঐশি ফোন করলে বলবে, বাড়িতে চলে আসতে।
তাহিরা বেগম ফোন রেখে দিলেন।
ঐশির বাবাকে তাহিরা বেগম বললেন, ঐশিকে ফোনে পাচ্ছি না। আমাদের ঢাকা যাওয়া প্রয়োজন।
ঐশির বাবা বললেন, ঢাকা তো ছোট কোনো জায়গা না, কোথায় খুঁজব ঐশি কে? ওর ফোনের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
তাহিরা বেগম বললেন, এহসান বলেছিল, ওদের বাসায় চলে যেতে। এখানে এত কথাবার্তা, বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না, আত্মীয় স্বজন একটু পর পর একেকজন ফোন করতেছে, তুমি এহসানকে ফোন করো।
-শেষ পর্যন্ত এহসান! যাকে এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছ! ইগোতে লাগবে না?
তাহিরা বেগম বললেন, ইগোতে লাগার বিষয়ে নেই এখন। ঐশিকে নিয়ে আমরা চলে আসব।
এহসানকে ফোন করে ঐশির বাবা কথা বললেন।
শশুরের ফোন দেখে, এহসান কোনো কথা বাড়ালো না। বুঝতে পারলো, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন। দুর্বল সময়ে তার পাশে এহসান আর অথৈ ছাড়া কেউ নেই।
এহসান বলল, গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছে, সে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।
ঐশির বাবা ইতস্তত করে বললেন, একটা মিসিং ডায়েরি করে রাখব?
এহসান বলল, আপনি যেটা ভালো মনে করেন!
স্থানীয় থানায় ঐশির বাবা ডায়েরি করতে চাইলেন, তবে থানা থেকে জিডি নিলো না। তাকে বলা হলো, এখান থেকে তো মিসিং হয় নি। এখানে জিডি করে কোনো লাভ নেই।
একটু পর পর তাহিরা বেগম ঐশিকে ফোন করে যেতে লাগলেন। কিন্তু ফোনটা সুইচড অফ। কোনো ভাবেই ফোনে পেলেন না ঐশিকে।
হোটেল থেকে আপাদমস্তক ঢাকা আবায়া পরে বের হয়েছিল ঐশি। বিল পে করা হয়ে গিয়েছিল আগেই।
গাড়িতে উঠে বসার পরে তার আর কিছুই মনে নেই।
জ্ঞান ফিরলো তখন সন্ধ্যা পেরিয়েছে। মাথাটা হালকা ঝিম ঝিম করছে, তার সাভার যাওয়ার কথা ছিল।
নিজেকে একটা সুসজ্জিত ঘরে আবিস্কার করল ঐশি। হাতের কাছে ফোন, ব্যাগ কিছুই নেই।
ঐশির জ্ঞান ফিরতে কোথাও একটা ট্যা টু করে রিং বেজে উঠল, একটা সিম্ফোনি সেট! ফোনটা দেখে পিক করল ঐশি, হ্যালো- ভাঙা ভাঙা স্বরে ঐশি হ্যালো বলল।
ঐশি- জ্ঞান ফিরেছে তাহলে!
কে আপনি, আমি কোথায়? নায়েব পাশা? এটা কার বাড়ি?
আস্তে ধীরে সব জানতে পারবে ঐশি। তবে এখন এই মুহুর্ত থেকে তুমি আর ঐশি নও, তোমার নাম সোহানা, সোহানা শেখ! বুঝতে পেরেছ?
-কে আপনি? আমার নাম কেন পাল্টাবে?
ঐশি হতভম্ব হয়ে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওপাশ থেকে বলা হলো, সোহানা শেখ নামের এনআইডি, পাসপোর্ট সবই তুমি পেয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পরে তোমাকে একটা মাইক্রো করে বর্ডারে নিয়ে যাওয়া হবে। বর্ডার ক্রস করে কলকাতা, সেখান থেকে ফ্লাইট ধরে মুম্বাই।
ওখানে কয়েকমাস থাকবে তুমি। কি করতে হবে, সেটা জেনে যাবে টাইম টু টাইম।
ঐশি বলল, কিন্তু আমাকে বিস্তারিত বলুন, আমাকে একটা ফোন করতে হবে।
তুমি আর কোনো ফোন করতে পারবে না, বাইরের পৃথিবীর কাছে ঐশি হারিয়ে গিয়েছে। শোনো মেয়ে, তোমাকে একটা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। গ্রুম করে তোমাকে একটা মিশনের জন্য তৈরি করা হবে। নাসিরের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইলে, এর থেকে ভালো সুযোগ তুমি আর পাবে না। ঐশি হয়ে বাংলাদেশে তুমি বাঁচতে পারবে না, তোমাকে মারার জন্য কিলার এপয়েন্ট করা হয়ে গেছে!
ঐশি চমকে উঠল, কিন্তু বাবা, মা অথৈ-
-কিচ্ছু করার নেই, ওদের কাছে তোমাকে মিসিং হয়ে থাকতে হবে।
-আমাকে কি করতে হবে?
– জানতে পারবে, কিছু খাবার পাঠানো হচ্ছে খেয়ে তৈরি হয়ে নাও।
– আপনি কে?
– আমি কেউ না, আমার পরিচয় তোমার এই মুহুর্তে জানার দরকার নেই- বলে লাইনটা কেটে গেল!
ঐশি ফোন করার চেষ্টা করতে গেল, কিন্তু ব্যালান্স জিরো। নেট কানেকশন নেই, এটা ছোটো একটা হ্যান্ডসেট!
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯১
নাসির তাকে মারতে কিলার ভাড়া করেছে, এত বেপরোয়া! ডেনজারাস! ঐশি বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু নাম পরিচয় পাল্টে ঐশিকে ঠিক কি করতে হবে মুব্বাই শহরে? দেহ ব্যবসা?
না সেরকম মনে হলো না, নিশ্চয়ই নিজের অজান্তে সে একটা চক্রে ঢুকে পড়েছে, সেটা কি আসলে!
কিভাবে জানা যাবে? মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে, কোথা থেকে কোথায় এসে পড়ল ঐশি! বাবা মা কোথায় খুঁজবে তাকে?
