ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯৩
শানজানা আলম
নাসির বাসায় ফিরেছে, কয়েকটা দিন ঝড়ের উপর গেল, কেউ কিছু করতে না পারলেও সমালোচনার ধাক্কা তাকে সামলাতে হয়েছে। ঐশি নামের আপদ বিদায় হয়েছে, এটা আপাতত শান্তির বিষয়।
মিসেস নওফেল নাসিরের সাথে বসেছেন। নওফেল সাহেব রেগে আছেন, নাসিরের সাথে আপাতত কথা বলতে চাচ্ছেন না। তার ফেসলস কম হয় নি। এত বড় সাহস ওই মেয়েটা পেলো কি করে, নাসির মেয়েটাকে হ্যান্ডেল করতে পারে নি।
কি করেছ মেয়েটাকে? – মিসেস নওফেল জানতে চাইলেন।
জানি না, ও আর আসবে না, এটা জানি- নাসির বলল।
আসবে না ঠিক আছে, কিন্তু কি করলে? মেরে ফেলেছ?- মিসেস নওফেল জানতে চান।
নাসির বলল, ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করার কোনো মানে নেই। নায়েব পাশা ওর ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
হুম, আমার কেন যেন মনটা কু ডাকছে, মনে হচ্ছে এই মেয়ে আবার আসবে!
নাসির ক্রুর হাসিতে বলল, ও বেঁচে না থাকলে আসবে কিভাবে, ওয়েট নায়েব পাশাকে ফোন করছি।
কয়েকবার ফোন করার পরে, নায়েব ফোন পিক করলো।
নাসির, বলো।
কাজ হয়ে গেছে? – নাসির জিজ্ঞেস করল।
কি কাজ? – নায়েব প্রশ্ন করল।
তোমার সাথে নিশ্চয়ই আমি পোংগা মারার প্ল্যান করব না, ঐশির ব্যবস্থা করেছ?
নায়েব পাশা বলল, হুম, ও আর আসবে না।
কি করেছ?
নায়েব পাশা বলল, কার এক্সিডেন্ট।
সিওর তো?
হুম, মিডিয়াতে খবরটা আসতে দেই নি, কারন ঐশি ভাইরাল ফেস, এখন প্রচুর কাঁটাছেড়া হবে।
তুমি বডি দেখেছ?
নাসির, সেটার আর কোনো প্রয়োজন নেই। পুরোনো সব কিছু ভুলে যাবে বলেছ তুমি! আর কি কোনো কিছুর দরকার আছে?
না, দরকার নেই, ওর বাড়িতে খবর দিয়েছ?
মিসেস নওফেল ইশারায় বললেন, নাসির, এত ডিটেলে তোমার জানার দরকার নেই।
নায়েব পাশা বলল, আমি জানি না ওর ডিটেল কিছু।
বাড়ি কোথায় বা অন্য কিছু!
নাসির বলল, রাখছি তাহলে, টেক কেয়ার।
নায়েব পাশা ফোন রেখে দিলো।
রাতের আঁধারে তাহিরা বেগম আর ঐশির বাবা ঢাকায় রওনা হয়েছেন। ঐশির সাথে শেষবার কথা হয়েছিল ভোররাতে, দুইদিন পেরিয়ে গেলেও
ঐশির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। ঢাকায় গিয়ে থানায় মিসিং ডায়েরি করতে হবে।
এই মফস্বল শহরে তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব না। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই আড়ালে কথা বলছে, এত নোংরা ঘটনা, এর আগে কেউ কখনো দেখেনি৷ এই কাজগুলোর জন্য এহসানকে বলা সম্ভব নয়, অথৈ শুধু এটুকুই বলেছে, ঢাকায় চলে আসতে, ঢাকায় এসে খোঁজ খবর করতে।
অথৈ নায়েব পাশাকে ফোন করেছিল, তবে নায়েব পাশাকে ফোনে পাওয়া যায় নি। এহসান বলেছে, অথৈ এর নম্বরটা সম্ভবত পাশা ব্লক করে দিয়েছে, আর নায়েব পাশা অবশ্যই কিছু জানে। ঐশিকে এত এত টানা হ্যাচড়া হয়েছে, এই বিষয়ে এহসান আগ বাড়িয়ে কোনো খোঁজ খবর করতেও পারছে না।
অথৈকে শুধু শান্ত থাকতে বলেছে, ঐশি সহজ মেয়ে না। সে যেখানেই আছে, ভালোই থাকবে। এহসানের কথাটা অথৈ মনে মনে বিশ্বাস করতে চাইছে। বাবা মা আসলে তাদের নিয়ে এহসান মুভ করতে পারবে, তবে এহসান বা অথৈ কেউই এই বিষয়টা নিয়ে ঘাটাতে চাচ্ছে না।
ঐশি সোহানা শেখের ডিটেল পেয়ে গেছে। মুখে মাস্ক দিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে ঐশি ওরফে সোহানা শেখ সকালে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে পৌঁছাল। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সে ভারতের ফুলবাড়ি ল্যান্ড পোর্টে প্রবেশ করল।
সীমান্ত পেরিয়ে যখন সে ভারতের মাটিতে পৌঁছাল, তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
সেখান থেকে সড়কপথে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল।
কলকাতায় ওবেরয় গ্রান্ড হোটেলে তার জন্য বুকিং ছিল। রুমে পৌঁছে জানালার পর্দা সরিয়ে সোহানা শহরের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার কলকাতা ধীরে ধীরে আলোয় ভরে উঠছে। দূরে যানবাহনের সারি, মানুষের ব্যস্ততা, আর অচেনা শহরের অসংখ্য গল্প যেন তাকে নতুন করে ভাবতে শিখাচ্ছে। ফোনের ওপাশ থেকে অদৃশ্য কারো নির্দেশনায় সে পুতুলের মত চলতে শুরু করেছে।
কলকাতার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশাল কাঁচঘেরা টার্মিনালে দাঁড়িয়ে ছিল সোহানা শেখ।
তার হাতে ছিল একটি ছোট ব্যাগ। ব্যাগে খুব বেশি কিছু নেই—কয়েকটি জামাকাপড় আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস।
জানালার ওপারে সারি সারি বিমান দাঁড়িয়ে আছে। দূরের রানওয়েতে একটি উড়োজাহাজ ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। সেই দৃশ্য দেখে সোহানার মনে হলো, মানুষও কি এভাবেই নিজের অতীতকে পেছনে ফেলে অজানার দিকে উড়ে যেতে পারে?
সোহানা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে মুম্বাই ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে উড়ে চলল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯২
বিমানে নিজের আসনে বসে জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে রইল। রানওয়ের আলোগুলো একসময় সরু রেখার মতো পেছনে সরে যেতে লাগল। বিমান যখন মেঘের ভেতর ঢুকে পড়ল, নিচের শহরটি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঐশিকে পেছনে ফেলে আমাদের গল্পে সোহানা প্রবেশ করল আজ থেকে।
