Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৭ (২)

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭ (২)

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭ (২)
জাবিন ফোরকান

“আমি শুরুতেই বলেছিলাম, এই সম্পর্ক শুধুমাত্র একটা প্রয়োজন। সেখানে তুমি যদি নিজেকে অনুভূতির বেড়াজালে বেঁধে ফেল সেই দায় তো আমার নয়, রাইট?”
চোখের সামনে এ কোন ইরাম বসে আছে? সাইবান আজ একটুও চিনতে পারছেনা। চিনতে পারছে না এতকাল যাবৎ জন্মদাত্রী ভেবে আসা মাকে, চিনতে পারছেনা ভালোবাসার মানুষটাকে। এই দুনিয়া এত স্বার্থপর কেন? সাইবানের মাঝে রাগ, দুঃখ, অভিমান, কষ্ট, যন্ত্রণা কোনো অনুভূতিই আর হচ্ছে না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। রূপ বদলানো মানুষগুলোকে দেখছে যাদের সে আপনের চাইতেও আপন ভেবে এসেছে। ইরামের চেহারা অতীব শান্ত। ওই চেহারায় কোনো আক্ষেপ, মায়া, করুণা কিছুই নেই। অচেনা এক রমণী। যার সম্পর্কে সাইবানের কোনো ধারণাই নেই। ইরাম স্বামীর মায়াবী মুখটার দিকে তাকাল। সেখানে এখনো বিশাল অবিশ্বাস। সাইবান কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে তার কোলের উপর রাখা হাতটা ধরতে চাইল, কিন্ত শেষমেষ ধরলনা। মাথা নিচু করে পথ হারানো শিশুর মতন আতঙ্ক নিয়ে ফিসফিস করল,

“আপনি শুধু একটিবার বলুন সবকিছু মিথ্যা। আমি এক বাক্যে আপনাকে বিশ্বাস করে নেব।”
“এত বোকা কেন তুমি?”
নির্দয়ভাবে বলল ইরাম। ঝুঁকে এসে সাইবানের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘোরাল। বলল,
“তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমি জানি। তবে একটা সত্যি কথা বলি? তুমি আমি মানুষটাকে ভালোবাসো, আমার পরিচয়গুলোকে নয়। ডিভোর্সি, পরপুরুষের বাচ্চার মা, এগুলোই আমার স্বতন্ত্র পরিচয়। তুমি ভালোবাসো সেই ইরামকে, যে ইরাম এককালে তোমার কমফোর্ট জোন ছিল। অকলুষিত ছিল। যাকে তুমি মনের কথা সব খুলে বলতে পারতে বিনা দ্বিধায়। যার সামনে তোমাকে মুখোশ পরে চলতে হতনা। তুমি ব্যক্তি ইরামকে ভালোবেসেছ। মা ইরামকে ভালোবাসতে পারোনি। ডিভোর্সি ইরামকে ভালোবাসতে পারোনি। নাহলে যখন সত্যিটা জানলে, তখন তোমার প্রথম প্রশ্নই নিজের মেয়ে বলে ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছ? এটা হতো না আলাদিন।”

সাইবান কিছু বলতে পারলনা। বাক্যহারা সে। মস্তিষ্ক কোনোকিছুর তাল মেলাতে পারছে না। ইরাম অপর হাতটাও সাইবানের গালে ঠেকাল। দু হাতের আজলায় তার মুখটা তুলে বলে গেল,
“এজন্য আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমাদের সমাজটাই এমন। এই সমাজের জীব আমরা, তাই আমাদের মানসিকতাটা জন্মগত। চাইলেই আমরা সেটাকে উপেক্ষা করতে পারিনা। দিনশেষে সত্য এটাই যে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার কারো অনুভূতি নিয়ে আর কিছু যায় আসেনা। এই বিয়েটা আমি আমার ছেলের স্বার্থে করেছিলাম। সেই স্বার্থ অনেকটাই হাসিল করে ফেলেছি। তবে আমি চাইনি, সত্যটা এভাবে তোমার সামনে খোলাসা হোক।”
সাইবান নিগূঢ় নয়নে তাকাল ইরামের দিকে। তার চোখ দুটো টলটল করে উঠল। শেষ একবার অতি আবেগঘন কণ্ঠে সে শুধাল,

“যদি…যদি এসব না হতো…যদি আমি কিছুই জানতে না পারতাম…তবে…তবে কি কোনো একদিন আপনি আমাকে নিজে থেকে সত্য বলতেন?”
ইরাম কয়েক সেকেন্ড গভীর দৃষ্টিতে সাইবানের মুখের পানে চেয়ে রইল। তারপর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে জানাল,
“না। কোনোদিন জানতে দিতাম না।”
এটুকুই। উঠে পড়ল ইরাম। সকলকে এড়িয়ে চলে গেল সিঁড়ির দিকে। দপদপ পা ফেলে উপরে উঠে আড়াল হয়ে গেল বেডরুমে। অপরদিকে তখনো সেখানে ঠাঁয় বসে রইল সাইবান। চোখে একফোঁটা অশ্রুও আর নেই তার। পিছনে তখনো সারিকা, সামিয়া এবং মিসির দন্ডায়মান। অথচ কেউ কিছু বলতে পারলনা। কী বলবে? শান্তনা দেয়ার মতন কিছুও তো আর বাকি নেই। অপরদিকে সামিয়া ভয়ে আছেন। তিনি কাছে গেলেই যদি তার ছেলে উত্তেজিত হয়ে পড়ে? যদি ঘৃণার চোখে তাকে দেখে? সেই দৃষ্টি তিনি সইতে পারবেন না।
অথচ সকলকে হতবাক করে দিয়ে বাড়ির সবথেকে দুষ্টু, বদমেজাজী, রগচটা আর বেপরোয়া ছেলেটা আজ কিছুই করলনা। না কোনো চিৎকার, না কোনো ভাঙচুর, না কোনো অতিপ্রাকৃত উপস্থাপন। ইরাম চলে যেতেই সেও মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। কারো দিকে তাকাল না। একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। আজ কেউ তাকে আটকাল না, পিছু ডাকল না। যেন এই বাড়ির মায়ার সম্পর্কটা তার জন্য ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।

বিশাল বিছানায় শরীর এলিয়ে বেশ শান্তি অনুভূত হলো অরণ্যর। বুকটা একটু হালকা লাগছে তার। আজ রাতে ভালো ঘুম হবে। মনে মনে ভাবলেও হৃদয়ের এক কোণে জমা হওয়া একটা খচখচে অনুভূতিকে সে কিছুতেই দূর করতে পারছেনা। বারবার ক্যাসেটের মতন চোখে ভাসছে আদালতের সেই দৃশ্যটা। সাইবান আর তার বুকে ইযান। অরণ্যর এবার বেশ রাগ হলো। বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল সে। এক হাতে চুল খামচে ধরল সে।
“যাহ শালা!”
দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে ইয়োগার আসনে বসে নিজেকে শান্ত করতে চাইল অরণ্য। অনেকটা সফলও হলো। তবে তার ধ্যান ভাঙল ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে। হাত বাড়িয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে সেটা নিয়ে অচেনা নাম্বার দেখে মেজাজ আবারও বিগড়ে গেল অরণ্যর। ইচ্ছা হলো ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে। কিন্তু শেষমেশ কি মনে করে যেন রিসিভ করল,
“হ্যালো?”
“পার্টি করছেন?”
ওপাশের কন্ঠটা শুনে জমে গেল অরণ্য। কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রত্যুত্তর করতে পারলনা। বিশ্বাসই হতে চাইলনা তার। বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখল অবিশ্বাস নিয়ে। যখন বুঝল, না, স্বপ্ন নয়, তখন তার চেহারায় বিরাট হাসি ফুটল। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ফোন কানে চেপে নতুন প্রেমে পড়া প্রেমিকের মতন ঢং করে বলল,

“অবশ্যই মিসেস মির্জা সওদাগর। ওয়ানা জয়েন?”
ওপাশ থেকে ইরামের ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ ভেসে এলো। এক সেকেন্ডের জন্য অরণ্যর মনে হলো, মেয়েটা বুঝি কাঁদছে। অথচ পরক্ষণেই তাকে অবাক করে দিয়ে ইরামের দৃপ্ত কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
“জি। পার্টি তো এবার আমি করব আপনার সঙ্গে।”
“গাড়ি পাঠাব? না না, আমি নিজেই আসছি। কোন ক্লাবে যাবে বলো?”
“কবরস্থান।”
অরণ্য হতচকিত হলো। পরক্ষণেই রুম কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসতে লাগল। শুষ্ক ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল,
“ওহ মাই ফেইস্টি কিটেন! তোমার সাথে শুধু কবরস্থান কেন? কবরে যেতেও রাজী আছি। খুঁড়তে বলব একটা? একসাথে ঘর বাঁধব দুজন।”
কয়েক মুহূর্ত ইরাম কোনো কথা বললনা। অরণ্য ভাবল ফোন কেটে দিয়েছে বুঝি। তাই সে ডেকে উঠল,

“হ্যালো? বলতে বলতে স্বপ্ন দেখাও শুরু করে দিয়েছ নাকি?”
“আপনি আজ অনেক খুশি, তাইনা অরণ্য? কারণ আপনার খুশি আমার কষ্টের সমানুপাতিক।”
অরণ্য এক সেকেন্ডের জন্য থমকাল। ইরামের কন্ঠটা অন্যরকম শোনাচ্ছে। ঠিক রাগী নয় আবার দুঃখীও নয়। কেমন যেন, ঘোলাটে, ভরাট, অদ্ভুতুড়ে। ইরামকে এভাবে কথা বলতে সে আগে শোনেনি। সে চুপ করে গেলেও ইরাম থেমে নেই,
“আমি কি ভেবেছিলাম জানেন? ভেবেছিলাম আপনাকে এড়িয়ে যাওয়াটাই আসল আত্মরক্ষা। ভেবেছিলাম যদি আমি দূরে সরে যাই, চুপ থাকি, ভালো থাকি, নিজের মতন থাকি তাহলে আপনি আমার জীবনে দখলদারিত্ব করতে আসবেন না। সেটা আমার প্রথম ভুল ছিল। আর আমার দ্বিতীয় ভুল হলো আপনার বিরুদ্ধে অন্য কাউকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা। আমি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম, আমার ছেলেটাকে সকল কলুষতা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম, অন্যকে ঢাল বানিয়ে নিজের হাত সাফ রাখতে চেয়েছিলাম। বুঝতে পারিনি, ছু*রি দিয়ে ডাব কাটা যায়না, তার জন্য দা কে মাঠে নামতে হয়।”

এবার সত্যিই কেমন যেন লাগল অরণ্যর। চেহারাটা কঠিন হয়ে উঠল তার। এই মেয়ে কি কোনোভাবে তাকে হুমকি দিচ্ছে? সেই সাহস তো তার ভালোবাসার ইরামের কস্মিনকালেও ছিলনা! অরণ্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আমাকে ছাড়া থাকতে থাকতে তুমি দিশেহারা হয়ে পড়েছ। তোমাকে তো বলেছিলামই কবিতা, আমার দুয়ারে তোমাকে ফিরতেই হবে। এইযে, দুয়ার খোলাই আছে, পায়ে পায়ে চুপটি করে চলে এসো। আমি তোমাকে এমন সুখ দেব যা তোমাকে অতীতের অরণ্য মির্জা সওদাগরও দিতে পারেনি।”

“সুখ তো আমি আপনাকে দেব, মরণের সুখ।”
অরণ্যর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। কিন্তু সে পাল্টা কিছু বলার আগেই ইরাম পুনরায় বলল,
“আপনি এবার খুব ভয়ানক জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছেন। আপনি হাত দেয়ার আগে বুঝতে পারিনি, জায়গাটা আসলেই কতটা ভয়ানক হয়ে উঠেছে আমার জন্য। ইযানের গায়ে এক লোক এ*সিড মা*রতে চেয়েছিল, সোজা দা ঢু*কিয়ে দিয়েছি তার পিঠে। তাহলে আমি আপনার সঙ্গে কি করব মিস্টার মির্জা? ভাবতে থাকুন আর প্রস্তুত থাকুন। কারণ ইরাম কিবরিয়া অসহায়, ভীতু হলেও ইযানের মা ভয়ংকর দুঃসাহসী, স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর!”
ফোনটা কেটে গেল। অরণ্য বাকরুদ্ধ বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে।

অনুরাগের বাবা মা আজ বাড়িতে নেই। গিয়েছেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। দুদিন সেখানেই থাকবেন তাই বাড়িটা পুরোপুরি ফাঁকা। সেই ফাঁকা বাড়ির ভেতরে বসেছে বন্ধুদের আসর। তবে আজকের আসরে কোনো আনন্দ নেই, হাসি ঠাট্টা নেই, একে অপরের সঙ্গে মজা করার বালাই নেই। শুধু খাঁ খাঁ শূন্যতা। বাতাসটা কেমন যেন ভারী। টেবিলের উপর বরফের বাকেটে দুটো বোতল। চারপাশে গ্লাস। আফনান আর নীরব হালকা পাতলা চুমুক দিলেও অনুরাগ এক ফোঁটা ঠোঁটে ছোঁয়ায়নি। বসে আছে সে বন্ধুর পাশে। সাইবান টেবিলের উপর মাথা রেখে চুপটি করে চোখ বুঁজে আছে। তার মাথার কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে দুটো ক্যান। কয়েকটা ফাঁকা গ্লাস। একটা গ্লাসের নিচে এখনো খানিকটা স্বর্ণালী তরল ভাসছে। সাইবানের অন্য হাতে জ্বলছে সিগারেট। একসঙ্গে দুটো ধরিয়েছে সে। ক্ষণে ক্ষণে অলসভাবে ঠোঁটে দিচ্ছে। বন্ধুদের এমন আড্ডা আগে প্রচুর হলেও সাইবানের বিয়ের পর থেকে একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সিগারেট, ড্রিংকিং ছাঁটাই করে ফেলেছিল ছেলেটা পুরোপুরি। ড্রিংকসের প্রতি আগেও খুব একটা নেশা ছিল না, সিগারেটই যা আসক্তি ছিল। ইরাম আর ইযান জীবনে আসায় সেই আসক্তি ত্যাগ করেছিল সে। অথচ আজ, বুদ হয়েছে আবারও। অনুরাগের বিষয়টা পছন্দ হচ্ছে না। উপরন্তু আফনান আর নীরবের ভূমিকাও ভালো লাগছে না। বন্ধুদের ইশারা করল সে সাইবানকে বোঝাতে, তবে কেউই বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারাও রেগে আছে। তাদের বন্ধুর সাথে এমনটা কেন হবে?

কিছুক্ষণ পর সাইবান নড়েচড়ে উঠল। ঘুম থেকে জেগেছে যেন। হাতের সিগারেট দুটো ফেলে দিয়ে বাকেটের নতুন আরেকটা বোতলের দিকে হাত বাড়াল। সমস্ত মুখ তার লালচে হয়ে গিয়েছে, নেশার ঘোরে একটু টলছেও। নাক টানছে, চোখ দুটোতে যেন হাজার রাত্রির জমানো ঘুম বাসা বেঁধেছে। বোতলটা সাইবান ধরতে পারলনা। এর আগেই অনুরাগ খপ করে তার হাত ধরে বলল,
“আর না। এবার বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে।”
সাইবানের ভ্রু কুঁচকে এলো।
“তোর…টাকায় কিনেছি…শালা?!”

থাপড়ে অনুরাগের হাতটা সরিয়ে বোতলটা তুলে নিল সাইবান। তার জিভ জড়িয়ে গিয়েছে, কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে। তবুও ক্ষান্ত দিলনা সে। কামড়ে ক্যাপ খুলে বোতলে সরাসরি চুমুক দিল। গ্লাসে ঢেলে পানি বা সোডা মেশানোরও প্রয়োজনবোধ করলনা। ঢকঢক করে পান করতে লাগল যেন তরল পানি গলায় ঢালছে। খানিকটা ঠোঁটের কোণ বেয়ে তার গলা বেয়ে গড়িয়ে নেমে গেল বুক অব্দি। পরোয়াও করলনা। অনুরাগ বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল, শক্ত গলায় বলল,
“নিজেকে সামলা সাইবান। এখন পাগলামি করার সময় না। তোর একটা গোটা পরিবার আছে, কত দায়িত্ব মাথায় আছে। জানি তোর কষ্ট হচ্ছে, তবুও। প্লীজ। গেট আ হোল্ড অব ইওরসেল্ফ। তুই পুরুষ মানুষ।”

বোতল থেকে মুখ সরিয়ে খানিক কাশল সাইবান। তারপর বুক চেপে আচমকা বলে উঠল,
“কেন? পুরুষ মানুষ বলে কি বুকের ভেতর মন বলে কিছু নেই? পুরুষ মানুষ বলে কি আমার খারাপ লাগে না? সামলাবো? কীভাবে সামলাবো আমি? ২৫ টা বছর যাকে মা বলে ডেকেছি, সে নাকি আমার মা না! এতগুলো দিন যাকে ভালোবেসে এসেছি, সে নাকি আমায় ভালোবাসে না! কীভাবে বিশ্বাস করব আমি? কীভাবে মানতে বলিস আমাকে? ২৫ বছরের হিসাব আমি একদিনে কীভাবে হজম করব?”
সাইবানের আঁখিজোড়া টলটলে হলো। অথচ এক ফোঁটা অশ্রুও সে গড়াতে দিলনা। চোখ বুঁজে বোতলে আবারও চুমুক দিল। যতটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকুও শেষ করে ফেলল।

“সরি টু সে বাট, এই বিয়ে নিয়ে আমার আগেই খটকা লেগেছিল। সামিয়া আন্টির জোরাজুরি, তোর চাইতে বয়সে বড় একজন মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য করা, একটুখানি সন্দেহ তো হবেই। নেহায়েত বন্ধু বলে তখন মুখ ফুটে কিছু বলিনি। তাছাড়া তুই ওদের জন্য যা করেছিস, এরপর আর বলার মুখ ছিল না আমার। তোকে এভাবে ঠকাবে আমিও ভাবতে পারিনি।”
ধীরস্থিরভাবে বলল নীরব। টেবিলে আঙুল ঘষছে সে আনমনে। সাইবান বন্ধুর কথা শুনলেও কিছু বললনা। মজে রইল পানীয়ে। অনুরাগ নীরবকে ধমক দিল,
“এই চুপ! তোকে কেউ কারো চরিত্রের বিশ্লেষক বানিয়েছে? কেইস লড়তে লড়তে মাথাটা গেছে একদম। আগুন লেগেছে, কোথায় দমকল বাহিনী হয়ে পানি ঢালবি তা না পেট্রোল ছেটাচ্ছিস।”
ভ্রু কুঁচকে এবার খানিকটা গম্ভীর হলো অনুরাগ,
“তাছাড়া কোনো মানুষকে কখনো একপাক্ষিক বিচার করা উচিত না। সবাই এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়না।”

“কিন্তু তুই কি অস্বীকার করতে পারিস সাইবানের সঙ্গে ওদের গোটা গুষ্টি মিলে অন্যায় করেনি?”
নীরবের যুক্তির পিছনে এবার চুপ করে গেল অনুরাগ। মাথা থেকে ওসব চিন্তা ঝেড়ে বন্ধুর দিকে মনোযোগ দিল। আফনান একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে। তাই সে হঠাৎ নিজের গ্লাস উঁচিয়ে জোর গলায় বলে বসল,
“সব ওই বুড়ি মহিলার দোষ! ডিভোর্সি ভাম কোথাকার! স্বামীর একটু আদর সোহাগ পেয়েছে তো তাই মাথায় উঠে গিয়েছে। ওটাকে পায়ের নিচে তিনবেলা উত্তম মধ্যমের উপর রাখার দরকার ছিল। ৩২ বছরের আন্টি, বুড়ির সাথে বুইড়া দাদু বিয়ে না বসে ফাঁসিয়েছে আমার আলাভোলা জুয়ান বন্ধুটাকে। সাংঘাতিক লোভী মহিলা! ঠকবাজ! জোচ্চর!”

প্রথমটায় চারদিকে পিনপতন নীরবতা রইল। কেউই কিছু বললনা। অতঃপর টলতে টলতে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সাইবান। ঘুরে আফনানের কাঁধে হাত রাখল। উঠিয়ে দাঁড় করাল। আফনানও চোখে খানিক ঝাপসা দেখছে বিধায় কিছু বুঝতে পারলনা। সরলভাবে বন্ধুর সামনে দাঁড়াতেই আচমকা সাইবানের শক্তিশালী ঘুষি আছড়ে পড়ল তার চোয়াল বরাবর। ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল আফনান। কুঁকড়ে গেল ব্যথায়। কান্ড দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল বাকিরা। সাইবান ঝুঁকে আফনানের কলার ধরে সপাসপ দুই গালে দুটো থাপ্পড় দিল। দাঁত কিড়মিড় করে হিংস্র কন্ঠে বলল,
“হুশ করে কথা বলবি! পরেরবার মাটিতে পুঁতে ফেলব, হারামজাদা!”
অনুরাগ আর নীরব দৌঁড়ে এসে তাদের ছাড়াল। আফনান বেকায়দায় পড়ে গিয়েছে। বন্ধুর কাছে এমন আগ্রাসী আচরণ আশা করেনি। নীরব তাকে সোফায় বসিয়ে পানি দিল। অপরদিকে অনুরাগ সাইবানকে টেনে পিছিয়ে নিল।

“মাথা ঠাণ্ডা কর। পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই?”
ঝটকা দিয়ে অনুরাগের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সাইবান। সামান্য টললেও টেবিল ধরে নিজেকে সামলে ফেলল। হাতের উল্টোপিঠে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছল। তারপর কারো দিকে না তাকিয়েই বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে। সবাই প্রথমটায় তাজ্জব বনে গেল। অনুরাগ নীরবকে বলল,
“তুই আফনানকে নিয়ে এখানেই থাক। আমি ওকে বাড়ি দিয়ে আসি।”
নীরব সায় জানাল। অনুরাগ বাবার গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেল। মাঝরাতের দিকে সাইবানকে বাড়িতে পৌঁছে দিল সে। সারা রাস্তা অনেক কিছু বোঝাল। তবে সাইবান কোনো উত্তর করলনা। চুপচাপ বসে থাকল সিটে। বাড়ি আসতেই নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল গাড়ি থেকে। অনুরাগের দিকে ফিরেও তাকালনা। ড্রাইভিং সিটে বসে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে পারল অনুরাগ। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে বসল তার আঙুল। বন্ধুর জন্য আপাতত সে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা বাদে আর কিছুই করতে পারবেনা।

সাইবানের শারীরিক দুলুনি কমেছে। নেশার ঘোর কমে এসেছে। একদম সাধারণভাবেই সে বাড়িতে ঢুকল যেন কিছুই হয়নি। সমস্ত হলরুম ফাঁকা। শুধুমাত্র দূরে সোফার এক কোণায় একটা ছায়ামূর্তি বসমান। সাইবান জানে ওটা সামিয়া। তবে তার দিকে এগোলনা সে। পুরোপুরি উপেক্ষা করে সুনসান বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দুই তলায়। নিজের রুমে পৌঁছাল। ওহ, নিজের রুম আবার কী? এই বাড়িটাই তো তার হক নয়, সেখানে আর রুম! তবুও হালকা চাপানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। প্রথমটায় অস্বচ্ছ দেখতে পেল। চোখ পিটপিট করতেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হলো। সময়টা মাঝরাত হলেও এখনো জাগ্রত ইরাম। বিছানার পাশে ক্রিবে যথারীতি ঘুমে আচ্ছন্ন ইযান। ইরাম দাঁড়িয়ে নিজের বেশকিছু শাড়ি ভাঁজ ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখছে। তার চেহারাটা শান্ত। অথচ চোখ দুটো কেমন যেন ফোলা ফোলা। লালচে হয়ে আছে। মুখেও ফোলা ভাব। অন্য কোনো সময় হলে সাইবান প্রশ্নবাণে জর্জরিত করত তাকে। আজ কিছুই বললনা। নিঃশব্দে ঢুকে বিছানার এক কোণায় বসে পড়ল।

ইরাম নিজের কাজ থামিয়ে একনজর স্বামীকে দেখল। তারপর পুনরায় কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে কাজ জারি রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ড্রিংক করেছ কেন?”
সাইবান নড়ল না, কোনো উত্তর দিলনা। ঠাঁয় বসে রইল ওভাবেই। ইরাম শাড়ি শেষ করে এবার কামিজগুলো ভাঁজ করতে লাগল। ইযানের কাপড় চোপড় ইতোমধ্যে গোছানো হয়ে গিয়েছে তার। অনেকটা সময় দুজনের মাঝেই অদ্ভুতুড়ে নীরবতা রইল। তারপর একদম হঠাৎ করেই মুখ খুলল সাইবান। জড়ানো খসখসে গলায় বলল,
“আপনি বলেছিলেন যদি আমি না চাই তাহলে আপনি আর আপনার ছেলে আমার জীবন থেকে চলে যাবেন।”
“বলেছিলাম।”

স্বীকার করে নিল ইরাম। কাজ থামিয়ে এবার নাইটস্ট্যান্ড থেকে পানির বোতল তুলে নিল। গ্লাসে ঢেলে ধীরপায়ে এগিয়ে স্বামীর সামনে দাঁড়াল। হাতে দিলনা। নিজের ধরল ঠোঁটের সামনে। সাইবানও আপত্তি করলনা। চুমুক দিয়ে পান করে নিল। ঘোলাটে চোখে দেখল ইরামকে। পানি পান শেষ হতেই ইরাম গ্লাসটা সরিয়ে রাখল। সাইবান হাতের উল্টোপিঠে মুখ মুছে জিজ্ঞেস করল,

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭

“আপনার ডিলটা এখনো বহাল আছে?”
“হুম।”
সাইবান দীর্ঘ এক মিনিট ইরামের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর গলায় বলল,
“দ্যান লেটস্ গেট ডিভোর্সড।”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৮