কিস অফ বিট্রেয়াল শেষ পর্ব
লামিয়া রহমান মেঘলা
আহিরের বিয়ে শেষ হওয়ার পর সিকদার নিবাস যেন হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গিয়েছে। গত কয়েকটি দিন কত হইচই, কত আনন্দ, কত গান-বাজনা আর উৎসবের আবেশে কেটেছে। সবকিছু মিলিয়ে সিকদার নিবাস যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। অথচ আজ সেই বাড়িটাই কেমন নিস্তব্ধ, শান্ত। উৎসবের রেশটুকু এখনো কোথাও কোথাও লেগে থাকলেও আগের সেই কোলাহল আর নেই।
আজকাল শিমুলও আগের মতোই সবকিছুকে উপভোগ করা শুরু করেছে। মানুষের মনে হিংসা আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই হিংসাকে যদি কেউ নিজের ভেতরেই দমন করতে পারে, তবেই তো তার মধ্যে সত্যিকারের মনুষ্যত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
সেরিনও বেশ কিছুদিন ধরে খুব আনন্দেই কাটিয়েছে। কিন্তু কায়ান গতরাতে জানিয়েছে, তারা পরশু ফিরে যাবে। কথাটা শোনার পর থেকেই সেরিনের মনটা ভীষণ খারাপ। সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। এতদিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে সবার প্রতি কেমন যেন এক অদৃশ্য মায়া জন্মে গেছে।
আহিরের আজ মেলানি হয়ে গেল। থাকার অবশ্য আর কোনো অজুহাতও নেই।
সব লাগেজ গোছানো হয়ে গিয়েছে। কায়ান বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে, আর সেরিন বানু মির্জাকে বিদায় জানাচ্ছে।
কায়ান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে জেবরান।
জেবরান মৃদু স্বরে বলল,
“ভাই, সাবধানে থাকবেন।”
কায়ান হেসে বলল,
“তুই আয় শিমুলকে নিয়ে একদিন। বাচ্চা দুটোকে রেখে। একান্ত সময় কাটাস।”
কথাটা শুনেই জেবরানের কান লাল হয়ে গেল। একটু ইতস্তত করে সে বলল, “আসব ভাই। বলছিলাম যে, আমাকে চাচা বানানোর কোনো প্ল্যান আছে কি?”
কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কিছুদিন আগ পর্যন্তও সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল একটি বেবি নেওয়ার জন্য। নিজের একটা সন্তানকে ঘিরে কত স্বপ্নই না দেখেছিল সে। কিন্তু ধীরে ধীরে কায়ান নিজের ভেতর এমন এক ভয়ঙ্কর সত্যকে উপলব্ধি করেছে, যার কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে ওঠে।
সে এবং সেরিনের মাঝখানে আসা প্রতিটি কিছুকেই সে হিংসা করে।
সেরিনের মনোযোগ যখন অন্য কারও দিকে যায়, তখনও তার ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা জন্ম নেয়। আর এখন তার সবচেয়ে বড় ভয়, যদি একদিন তাদের নিজেদের সন্তানও তাদের দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়, তখন যদি সে সেই সন্তানকেও হিংসা করে বসে।
নিজের এই অদ্ভুত অনুভূতিটাকেই সে ভয় পায় কায়ান।
কায়ানকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে জেবরান কাঁধে হাত রেখে তাকে নাড়া দিল।
“ভাই, কি ভাবছো?”
কায়ান যেন হঠাৎই নিজের ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ জেবরানের দিকে তাকিয়ে থেকে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“না, কিছু না।”
সেরিন ততক্ষণে চলে এসেছে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে কায়ান গাড়িতে উঠল। শেষবারের মতো সবার দিকে তাকিয়ে বিদায় জানিয়ে তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
পথ পেরোতে পেরোতে বিকেল গড়িয়ে এলো।
কক্সবাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশের রঙ বদলে গেছে। বিকেলের ম্লান রক্তিম সূর্যের আলো ধীরে ধীরে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। ঢেউয়ের গায়ে সূর্যের শেষ আলো এসে যেন সোনালি আর রক্তিম আভা তৈরি করেছে। দূর থেকে সমুদ্রটাকে মনে হচ্ছে এক বিশাল আয়না, যেখানে অস্তগামী সূর্য নিজের শেষ সৌন্দর্যটুকু রেখে যাচ্ছে।
হঠাৎ সেরিন গাড়ির ভেতর থেকেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
“থামান একটু। ওই বিচে যাই।”
কায়ান গাড়ি থামাল।
রাস্তাটা একেবারেই বিচের পাশ দিয়ে চলে গেছে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি নারকেলগাছ। হালকা বাতাসে তাদের পাতাগুলো মৃদু শব্দে দুলছে। ওপারে সমুদ্র, আর তার ঠিক ওপরে সূর্যটা যেন ধীরে ধীরে দিগন্তের বুকের ভেতর ডুবে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা এতটাই অপূর্ব যে কিছুক্ষণের জন্য সেরিনের চোখ আটকে রইল সেখানে।
পরক্ষণেই সে গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেল সমুদ্রের দিকে।
কায়ানও গাড়ি থেকে বের হলো।
তার চোখ গিয়ে থামল সেরিনের ওপর।
সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সেরিন দুহাত ছড়িয়ে দিল। সমুদ্রের নোনা বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। বাতাসের প্রতিটি স্পর্শে তার মুখে ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মনে হচ্ছে, এতদিনের জমে থাকা ক্লান্তি, বিষণ্নতা আর অস্থিরতা সবকিছুই যেন এই বিশাল সমুদ্রের কাছে এসে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।
কায়ান গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নীরবে তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সীর দিকে।
তার চোখে তখন আর সমুদ্র নেই, নেই অস্তগামী সূর্যের অপরূপ সৌন্দর্যও। তার সমস্ত দৃষ্টি আটকে আছে শুধু সেই এক রত্তি মেয়েটির ওপর।
তার গোটা পৃথিবীটাই যেন ওই এক রত্তি মেয়ের মাঝে সমাহিত।
গোটা কয়েক দিন ভিলায় কেউ না থাকায় চারপাশটা যেন ধুলো আর অগোছালো নীরবতায় ঢেকে ছিল। সবকিছু গুছিয়ে নিতে নিতে সেরিনের অবস্থা একেবারে বেহাল। কায়ান অবশ্য বারবার বলেছিল,
“কাল মেড আসবে। আজ এতটা কষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।”
কিন্তু সেরিন সে কথা শোনার পাত্রী নয়। এই সংসারটা তার নিজের হাতে গড়া, তাই নিজের সংসারকে নিজের হাতেই গুছিয়ে রাখতে চায় সে। একেকটা জিনিস জায়গামতো রাখতে রাখতে ক্লান্তিতে যখন মেয়েটার মুখ মলিন হয়ে উঠছিল, তখন আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি কায়ান।
শেষমেশ সেও হাত লাগাল কাজে।
দু’জনের সম্মিলিত চেষ্টায় ধীরে ধীরে ভিলাটা আবার তার পুরোনো রূপ ফিরে পেল। ঘরের অগোছালো ভাব কেটে গিয়ে চারপাশে ফিরে এলো পরিচিত উষ্ণতা। সারাদিনের ব্যস্ততায় কখন যে রাত গভীর হয়ে গেছে, দু’জনের কেউই খেয়াল করেনি।
ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁতেই কাজ থামল।
সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে দু’জনেই ফ্রেশ হয়ে গোসল সেরে বেডরুমে ফিরে এলো। খাবারের চিন্তা অবশ্য কায়ান আগেই করে রেখেছিল। বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে রেখেছিল সে। তাই রাতের খাবার নিয়ে আর কোনো ঝামেলা রইল না।
সবশেষে ঘরের আলো নিভে এলো।
বিছানায় শুয়ে সেরিনকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল কায়ান। মেয়েটা ক্লান্ত শরীরটা স্বস্তিতে তার বুকে এলিয়ে দিতেই কায়ান চোখ বন্ধ করল।
সারাদিনের পরিশ্রমে শরীরটা অবসন্ন, অথচ মনের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
এই মেয়েটাই যেন তার সমস্ত ক্লান্তির শেষে একমাত্র আশ্রয়। দিনের যত ব্যস্ততা, যত দুশ্চিন্তা, যত অস্থিরতা, সেরিনকে বুকের মধ্যে পেলেই সবকিছু কেমন নিঃশব্দে থেমে যায়।
কায়ানের বাহু আরও একটু শক্ত হলো সেরিনকে ঘিরে।
চোখ বন্ধ করে সে অনুভব করল, দিনের শেষে পৃথিবীতে তার সবচেয়ে বড় শান্তির জায়গাটা আসলে কোনো বিলাসী ভিলা নয়, কোনো নিঃশব্দ ঘরও নয়।
তার শান্তি এই মেয়েটা।
সেরিন। তার বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা তার একান্ত সুখ।
গোটা তিন বছর পর।
হাতের ওপর কিছুর কোমল স্পর্শ অনুভব হতেই কায়ানের চোখ খুলে গেল। সমুদ্রের মাতাল হাওয়া ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। নোনাজলের গন্ধ মিশে থাকা সেই বাতাসে চারপাশটা কেমন অদ্ভুত মায়াময় হয়ে উঠেছে।
চোখ মেলতেই কায়ানের দৃষ্টি থেমে গেল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেরিনের ওপর।
সেরিনের পরনে গ্র্যাজুয়েশন কোট। মুখজুড়ে একরাশ আনন্দ আর চোখেমুখে লুকানো উত্তেজনা। আজ তার জীবনের বিশেষ একটি দিন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে।
ভার্সিটি থেকে সেরিন অনেকটা জোরপূর্বকই কায়ানকে সঙ্গে করে বিচে নিয়ে এসেছে। শুধু একটাই কথা বলেছিল,
“সারপ্রাইজ আছে। আপনি চলুন।”
কায়ানও আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মেয়েটার আবদারের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হয়েছে তাকে।
কিন্তু এখন চোখ খুলে নিজের হাতে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে কায়ান যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলল।
তার হাতে একটি প্রেগন্যান্সি কিট।
কায়ানের চোখ ধীরে ধীরে বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। তারপর সে তাকাল সেরিনের দিকে। সেরিনও নীরবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি, অথচ চোখের গভীরে স্পষ্ট এক অদ্ভুত আবেগ।
আজকের দিনটা কায়ানের জন্য এমনিতেই ছিল গর্বের।
গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে যখন সেরিনের নামটি ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন অজান্তেই কায়ানের বুকটা গর্বে ফুলে উঠেছিল। এতগুলো বছরের পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর স্বপ্নের শেষে মেয়েটা সম্পূর্ণ সিজিপিএ নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে।
এটা সত্যিই অসাধারণ।
তার নিজের ভালোবাসার মানুষটি আজ নিজের যোগ্যতায় এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যা নিয়ে গর্ব না করে থাকা অসম্ভব।
আর এখন সেই গর্বের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটি সংবাদ এসে মিশেছে।
কায়ান আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। মুহূর্তেই সেরিনকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।
কণ্ঠে বিস্ময় আর আবেগ মিশিয়ে বলল,
“এটা সত্যি?”
সেরিন তার বুকে মুখ লুকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ। সকালেই বুঝতে পারলাম। ভাবলাম, ভার্সিটির কাজটা শেষ করেই বলব।”
কায়ান কিছু বলল না।
শুধু আরও শক্ত করে সেরিনকে জড়িয়ে ধরে রইল।
তার চোখের কোণে জমে উঠেছে অশ্রু। সেরিন তা বুঝতে পারছে। গত কয়েক বছরে তাদের ভালোবাসার পরিমাণ যেন প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়েছে। একে অপরকে ছাড়া এখন একটি মুহূর্তও যেন অসম্পূর্ণ লাগে তাদের।
সেরিন এখন কায়ানকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল করতে পারে না। কায়ানের অবস্থাও একই। বলা যায়, দুজন দুজনের প্রতি সম্পূর্ণরূপে অবসেসড হয়ে গেছে।
তবু সেই ভালোবাসার মধ্যেও আজকের অনুভূতিটা যেন অন্যরকম।
কিছুক্ষণ সেভাবেই সেরিনকে বুকে আগলে রাখার পর কায়ান ধীরে ধীরে বলল,
“আজ সবাইকে খাওয়াব আমি।”
সেরিন মিষ্টি করে হেসে উঠল।
সমুদ্রের পাড়ে পাশাপাশি বসে রইল দুজন।
মাঝেমধ্যে উচ্ছ্বসিত ঢেউ এসে তাদের পায়ে আছড়ে পড়ছে, আবার ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রের বুকে। দূর বিস্তৃত নীল সমুদ্রটা যেন তাদের জীবনের পূর্ণতারই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
যে সমুদ্রকে ঘিরে একদিন তাদের গল্পের শুরু হয়েছিল, আজ সেই সমুদ্রের কাছেই এসে যেন তাদের গল্প পূর্ণতার নতুন অর্থ পেয়েছে।
সেরিন ধীর কণ্ঠে বলল,
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৯
“সমুদ্র থেকেই গল্পটার শুরু হয়েছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেই মিশে রইল সবটা, মিস্টার সিকদার।”
কায়ান মৃদু হেসে সেরিনের কপালে ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিল।
তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে ভালোবেসে যে বিশ্বাসঘাতকতার চুমু পেয়েছি, সেরিন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। তুমি আমাকে ভেঙেছ, তবু আমার ভালোবাসাটুকু কেড়ে নিতে পারোনি। শুধু একটা কথা মনে রেখো, You were born to be mine. তুমি আমার ছিলে, আমারই থাকবে।”
WE, TOGETHER, FOREVER
সমাপ্ত
