লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫০
নুসাইবা আরা নুরি
ফুয়াদের কথায় হাসে মেহেরাজ।অন্ধকারের হাসি অন্ধকারেই মিলিয়ে যায়।তা কারোর চোখে পড়ে না।মেহেরাজ হাত ঘড়ির দিকে একবার নজর বুলিয়ে ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে বলে,
-পুরো মিশন টার জন্য আমার ফ্রেন্ডদের একজন নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে বিষর্জন দিয়েছে চিরতরে।শুধুমাত্র নিজের বাবা-মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে আর এই মিশনে জয়েন হওয়ার কারনে।তাহলে আমি কিভাবে সব হাতের কাছে পেয়ে ওকে হারতে দেখবো।আমি চাই আমার দ্বারা আমার সব বন্ধুদের মুখেই হাসি ফুটে উঠুক।তারা সবাই নতুন করে সফলতার হাসি হাসুক।
মেহেরাজের কথায় ফুয়াদ শান্ত অথচ গর্বিত গলায় বলে,
-আপ্নার মতো ভালো মানুষ খুব কম হয় স্যার।আপনি আসলেই উত্তম একজন।আপনার মতো বন্ধু পেয়ে আপনার বন্ধুরা ধন্য।
ফুয়াদের কথায় মেহেরাজ হাসে তারপর ফুয়াদের দিকে তাকিয়ে বলে,
-আমি তাহলে আজ আসি।কোনো দরকার পড়লে জানিও।আর সব সময় চোখ কান খোলা রাখবে।
-ইয়েস স্যার।
মেহেরাজ গাড়িতে উঠে বসে।তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাজারের উদ্দেশে রওনা দেয়।গাড়ি চালাতে চালাতে মেহেরাজের নজর যায় পাশের সিটে রাখা বক্স দুটোর দিকে।একটা খুব সুন্দর করে রেপিং করা।ওর ভিতরে একটা ফোন আছে।মেহেরাজ আগেই ফোনটা ফুয়াদকে দিয়ে ফোনের লোকেশন তাদের রাডার সাথে কানেকশন করে নিয়েছে।যাতে শ্রেয়সী কখন কি করে সব হাল চাল সে টের পায়।
আর দ্বিতীয় বক্স টা।খুব চিকন।ভিতরে একটা সিরিঞ্জ আর কয়েকটা কাচের ছোট শিষি যার ভিতরে অজ্ঞান নাশক ওষুধ।মেহেরাজ হাসলো ওগুলো দেখে তারপর বিড়বিড় করে বলল,
-আমি তোমাকে কষ্ট দিতে পারতাম না লিটল বার্ড
নিজের বাবা তার অপকর্মের কারনে যখন জেল এ যাবে তখন তুমি তা মেনে নিতে পারতে না।তাই তার শাস্তি আমি নিজেই দিয়ে দিয়েছি।আর আমি চাই ও না এই মিশনের একটা অংশে তুমি জড়িয়ে পড়ো।তাই আজকের পর মিশন সম্পুর্ন না হওয়া অব্দি প্রতিদিন রাতে তোমার সঙ্গি হবে এই স্লিপিং ইনজেকশন।
নিজের কথায় নিজেই হাসে মেহেরাজ।শিষি গুলোর পাওয়ার বেশি পুরো বারো ঘন্টা অজ্ঞান রাখবে তবে শরীরে কোনো সাইড ইফেক্ট করবে না বা বুজতেও পারবে।সিরিঞ্জ টাও স্পেশাল।ফুয়াদ কে দিয়ে পুরো বক্স টা কানাডা থেকে ইনপোট করা শুধু মাত্র শ্রেয়সীর জন্য। কারন মেহেরাজ অগ্রিম সব কিছুই ভেবে রেখে দিয়েছে।এমন কি সামনে কি হবে সব ই মেহেরাজের ভাবনার ভিতরে দাবার চালের মতো সাজানো।
তোহারা যে ফ্লাটে উঠেছে সেই ফ্লাট টা বেশ বড়।বিশাল একটা ডাইনিং।একটা ড্রয়িং রুম।তিন্টে বেড রুম।একটা কিচেন।সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস আগে থেকেই ছিলো বলে কারোর কোনো সমস্যা নেই।
মেহেরাজ বাইরে যাওয়ার কিছুক্ষন পর তোহা শ্রেয়সী আর মিলিকে নিয়ে একটা ঘরে চলে যায়।তারপর বাইরে এসে ইভানদের ইশারা করতেই ইভান আর তুহিন ও আগে থেকে কিনে আনা ফুল গুলো বারান্দা থেকে বের করে এনে মেহেরাজের ঘরে ঢুকে পড়ে।হটাৎ প্লানিং করেছে তারা।যদিও মেহেরাজ জানতো না তবে ফুল এর গন্ধ পেয়ে যখন চেক করেছে তখন সবাই শিকার করেছে।তবে শ্রেয়সী কে কেও এখোনো এসব কিছু খুলে বলেনি।সব কিছুই গোপন।
সবাই চাই যেহেতু আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো তখন তো সংসার টা হয়ে উঠেনি।এবার অন্তত সংসার টা সুন্দর করে গুছিয়ে নিক।দুজন দুজনের কাছাকাছি থাকুক।সেটা ভেবেই আজ রাতের প্লানিং।যদিও মেহেরাজ এসব মানা করেছিলো তবে কেও তার কথা শোনেনি।
বিছানার উপরে পা উঠিয়ে বসে আছে শ্রেয়সী। তার সামনে মিলি এক এক করে মেকাপ সামগ্রি সাজিয়ে রাখছে।আর তোহা অন্য পাশে শাড়িটা ঠিক করছে।শ্রেয়সীর ভিষণ লজ্জা লাগছে এখন।তার আর বুজতে বাকি নেই আজ কি হতে চলেছে।তার মনের এতোদিন বাসনা আজ পুরন হবে।আজ থেকে লোক্টার মুখ দেখেই ঘুমাবে।আবার ঘুম ভাংবেও তার মুখ দেখে।
ভাবতেও লজ্জা লাগছে শ্রেয়সীর।শ্রেয়সী ভাবনার মাঝে তোহা ডেকে উঠলো শ্রেয়সী তোহার দিকে মাথা উচু করে তাকাতেই তোহা শান্ত নয়নে শ্রেয়সীর লজ্জা মাখা মুখের দিকে তাকাল।কিছু একটা ভেবে আর ডাকলো না।শ্রেয়সী পাশে এসে বসে বলল,
-চোখ মুখ এতো শুকনো লাগছে কেন ননদিনী।কি বেপার লজ্জা ও পাচ্ছো দেখছি।
তোহার কথায় শ্রেয়সী আরো লজ্জা পেলো ভিষন।মাথা নিচু করে নিলো সাথে সাথে।তা দেখে মিলি হেসে কিছু বলতে উদ্দোত হতেই তোহা ইশারায় চুপ করিয়ে দিলো মিলিকে।তারপর শ্রেয়সীর পাশে গিয়ে বসলো।বেশকিছুক্ষন কাটার পর তোহা শান্ত গলায় বলল,
-ননদিনী একটা কথা জিজ্ঞাসা করি??
তোহার কথা মুখ উচু করে তাকায় শ্রেয়সী তারপর বলে,
-জ্বী ভাবি বলো??
-তুমি মেহু কে সত্যি ভালোবাসো তো???
তোহার প্রশ্ন শুনে মিলি মিটিমিটি হাসে শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে।শ্রেয়সী আরো লজ্জা পেয়ে যায়।তবে উত্তর দেয় না।তোহা তা দেখে ঠোঁট টিপে মুচকি হাসে।সে জানে শ্রেয়সী মেহেরাজ কে ভালোবাসে।তবে আজকের রাতের মনের ভয়টা দূর করে দেওয়া দরকার তাই এই প্রশ্ন করা।তোহা বিছানার উপরে তার পাশে রাখা তোহার জন্য কেনা শাড়ি টা হাতে তুলে নিয়ে বলে,
-শাড়িটা মেহুর এক দেখায় পছন্দ হয়েছে।ও কখোনো কোনো জিনিস সহজে পছন্দ করেনা তবে তোমাকে শাড়িতে দেখার ওর শখ।তোমার সামনে মুখ ফুটে বলতে পারেনি।যদি তুমি লজ্জা পাও।তাও আজ বলল সন্ধাই বুজতে পারছো হয়তো।বিয়েতেও শাড়ি নিতে চেয়েছিলো তবে তোমার কম্ফোর্ট ফিল এর জন্য লেহেঙ্গা দিয়েছে।তাই যদি তোমার মনে হয় ওর জন্য শাড়ি টা পড়বে।তাহলে পরিয়ে দিবো।তুমি আমার বোনের মতো।তাই বলছি আমাদের মন রক্ষায় না শুধু তোমার মনে যদি বলে মেহুর জন্য পরবে তাহলেই পরাবো।
তোহার কথা গুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনলো শ্রেয়সী আর মিলি।শ্রেয়সীর লজ্জা লাগছে এখোনো।ভাবির সামনে কিভাবে বলবে মানুষটার কাছে থাকার জন্য সে সব করতে রাজি এখন।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে তোহা আবার বলল,
-মেহুর বাড়িতে ফেরার সময় হয়ে গেলো।পরবে কি বলো।যদি পরো তাহলে সব রেডি করে রাখবো খাওয়ার পরে রেডি করবো।আর নাহলে গুছিয়ে তুলবো।
তোহার কথায় মাথা নিচু রেখেই শ্রেয়সী শান্ত গলায় বলল,
-তোলা লাগবে না ভাবি।পরিয়ে দেন।
শ্রেয়সীর কথায় তোহা আর মিলি ঠোঁট টিপে হাসে।মিলি বলে,
-খাওয়ার পরে পইরো??
মিলির কথায় তোহা বলে,
-না না এখনই পরায়।খাবার নিয়ে আসলে ননদিনীর টা আমি ঘরের ভিতরে নিয়ে আসবোনি।নয়তো লেট হয়ে যাবে।
তোহার কথায় মিলি ও স্বায় দেয়।তোহা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে শ্রেয়সী কে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দেয় ফ্রেশ হয়ে আসতে।শ্রেয়সী চলে গেলে তোহা আর মিলি ও সব গুছাতে শুরু করে।ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা বেলি ফুলের গাজরা রাখা।সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের চারিপাশে।
রাত বারোটা বাজে ঘড়ির কাটায় টুং-টুং আওয়াজে তা জানান দিচ্ছে।গাধাঁ আর রজনীগন্ধা ফুলের মিশ্রনে সাজানো বিছানার মাঝ বরাবর হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে শ্রেয়সী।বিছানার চাদরের উপরে গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়ানো।মেঝেটে গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে একটা বিশাল লাভ আকানো আর তার ভিতরে পাপড়ি দিয়ে লেখা -মেহেরাজ শ্রেয়সীর প্রনয়রাত্রী- লেখাটা যতবার চোখে পড়ছে ততবারই শ্রেয়সী লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তাকে প্রায় দেড় ঘন্টা আগে ঘরে বসিয়ে রেখে গেছে তোহা আর মিলি।যাওয়ার আগে শ্রেয়সী অনেক কিছু বুজিয়ে গেছে যদিও সব শুনতে গিয়ে শ্রেয়সীর লজ্জায় মাটির নিচে চলে যেতে মন চাচ্ছিলো।তাও শুনতে বাধ্য হয়েছে।তারপর ওরা দরজা চাপিয়ে চলে গেছে।
তখন মেহেরাজ বাড়িতে আসার পর সবাই খাবার খাওয়া শেষ করে যদি মেহেরাজ জান্তো শ্রেয়সী কোথায় তবুও খোজ নিয়েছিলো।শ্রেয়সীর অগোচরে একবার এসে ঘরে উকি মেরেছিলো ভেবেছিলো শ্রেয়সী দেখতে পায়নি।তবে আয়নার প্রতিবিম্বে শ্রেয়সীর নজরে আটকে ছিলো মেহেরাজ।
তারপর সাজানো শেষ এ তুহিন কে নক করতেই সবাই বাইরে চলে যায়।তখন মিলি আর তোহা মিলে শ্রেয়সী কে মেহেরাজের ঘরে দিয়ে এসেছিলো।ঘরে ঢুকে শ্রেয়সী আরো অবাক হয়েছিলো পুরো ঘর সাজানো বিশেষ করে বিছানা ফুল দিয়ে সাজানো।এক মুহুর্তের জন্য শ্রেয়সীর গলা শুকিয়ে যায় তখন।এমন এক যায়গায় কল্পনা করে নি কখোনো সে আর আজ সে তার কল্পপুরুষের ই বাসর ঘরে।
হটাৎ দরজার ছিটকানি লাগানোর শব্দে ঘোর কেটে যায় শ্রেয়সীর।মুখ উচু করে তাকায় দরজার পানে।ঘরে নিলাভো ড্রিম লাইটের আলোয় মেহেরাজকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।কালো ট্রাওজার আর সাদা টিশার্ট পরনে ধীরে ধিরে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায়।চোখ ঘুরিয়ে তাকায় শ্রেয়সীর দিকে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৯
শ্রেয়সীর হটাৎ কিছু মনে পড়তেই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় তারপর মেহেরাজের পা ছুয়ে সালাম করতে যেতেই মেহেরাজ শ্রেয়সীকে বাধা দেয়।শ্রেয়সীর দু বাহু উচু করে ধরে সোজা করে দাড় করিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে।শ্রেয়সী কেপে উঠে।বুকের হৃদপিন্ডের উঠা-নামার গতি বেড়ে গেছে।মেহেরাজ বুজতে পেরে হাসে।তারপর বলে,
-তোমার অবস্থান আমার বুকে পায়ে নয়।সেজন্য পায়ে হাত দিয়ে সালাম না করে বুকে ঝাপিয়ে পড়ে একরাশ স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিও আমার অন্তরের মধ্যেখানে মাই লাভলি ওয়াইফি।
