আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৯ (২)
সুরভী আক্তার
মেঘার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে যায় । যেনো প্রবল ঝংকার তুলে দুনিয়া কেঁপে ওঠে তার নিকট । ভাইয়ের আদেশে হাসে অবুঝের ন্যায় , অথচ আঁখি কোটর ফেটে পানি বেরোতে চাইছে । নোনা জলে টইটুম্বুর দুচোখ । মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে মুখ খোলে করুন স্বরে….
” ভাইয়া ,,, হঠাৎ কি বলছো বলতো ! ক.. কিসের ডিভোর্স পেপার ?
তুমি এসেছো থেকে আমার সাথে কথাই বলো নি সেভাবে । আমি তোমাকে কিছুই বলতে পারিনি । কত কথা জমিয়ে রেখেছি সামনাসামনি বলবো বলে । অনেক কিছু বলার আছে তোমায় । তার আগে এই কাগজ , এটা কেনো করিয়েছো তুমি ? আগে শুনবে তো আমার কাছে !
” কি শুনবো ?
ওকে বোঝাতে বিচলিত হয়ে পড়লো মেঘা……
ইয়াশের হাত দুটি আঁকড়ে ধরলো ।
” ভাইয়া , ভাইয়া তুমি জানো…..আমরা ওনাকে যেমন ভেবেছিলাম , উনি মোটেও অমন নন । তুমি তো ওনাকে চেনোই না । কথাই বলো নি এখনো । কথা বললে ঠিক বুঝবে দেখো । উনি খুব ভালো , ভাইয়া । বিশ্বাস করো , আমি চিনেছি ওনাকে । উনি এখন আর আগের মতো নেই । আমি জানি , যা হয়েছে তাতে ওনাকে ভুল বুঝেছি আমরা । কিন্তু সেটা শুধুই ভুল । উনি অন্যরকম । নেশা করেন না । সিগারেট খান না এখন । জানো, আমি এক বলাতেই উনি সব ছেড়েছেন । ভাইয়া ,, উনি আমাকে ভালোবাসেন ।
মেঘার হাঁসফাঁস কন্ঠের শেষ কথায় ইয়াশ রক্ত চক্ষু পাত করে ।
এমন অগ্নি চোখে ভড়কায় রমনী । ছিটকে ইয়াশের হাত ছাড়ে ।
” কি বললি ?
ইয়াশের ধারালো স্বর । মেঘার কম্পিত হালকা উত্তর…..
” উনি আমাকে ভালোবাসেন ভাইয়া !
” আর তুই ?
মেঘা চিবুক নামালো । পেঁচিয়ে উত্তর করলো…..
” আমি ডিভোর্স দিতে চাই না ওনাকে । আ…আমি এই সম্পর্ক টা টিকিয়ে রাখতে চাই ।
ইয়াশ হাত মুঠিয়ে নেয় । চোয়াল খিচে চোখ বন্ধ করে । নিজের বোনের উপর ঔদ্ধত্য হয় নি আজ অবধি । আজও পারলো না । জমে রাখা রাগ সংবরণ করে চড়া গলায় আদেশ করলো পূণরায়…..
” ডিভোর্স পেপারে সাইন কর মেঘা । এক্ষুনি মানে এক্ষুনি । আর কিচ্ছু শুনতে চাই না আমি ।
মেঘার মাথায় এবার যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো । চোখ ছাপিয়ে দুফোঁটা পানি গড়ালো অজান্তেই । সে আবার ইয়াশের হাত টেনে ধরে । গুড়িয়ে যায় ভেতর থেকে । কাকুতি করে…
” ভাইয়া ,, প্লিজ । তুমি আগে একটা বার রৌদ্রের সাথে কথা বলো । সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাবে । তুমি ওনাকে চিনবে ভালো করে । দেখবে , উনি সম্পুর্ন আলাদা ।
বিপরীতে তিরষ্কারের হাসি হাসলো ইয়াশ । কিছুটা শব্দ করে । ফিরলো বোনের দিকে ।
” আলাদা ? আর আমি আবার চিনবো ওকে ?
হাহহ্ , ওকে তিল পরিমাণ চেনাও বাকি নেই আমার । তুই কদিন ধরে চিনিস ওকে ? সেই তো পাঁচ বছর আগে দেখেছিস । কতটুকু ছিলি তখন ? তারপর দেখলি এই কদিন আগে । এ কদিনে চিনে ফেললি ? বুঝে ফেললি ওকে ? আরে আমি ওকে চিনি নয় বছর ধরে । নয় বছর ,, বুঝেছিস ? কম সময় নয় ! তোর থেকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি ওকে । ওর ব্যাপারে মুখ খুলতে বাধ্য করাস না আমায় । সহ্য করতে পারবি না । বোকা মাথায় দুদিনে যা ইমোশন ঢুকিয়েছিস , ঝেড়ে ফেল সব । রৌদ্র ভালো নয় । ওর খারাপ দিকটা তোর সামনে আনতে চাইছি না আমি । সাইন কর …..
মেঘা বুঝলো না । একটু শব্দ করে কেঁদে উঠলো ।
” কি খারাপ দিক আছে ওনার ! কি বলছো তুমি ? ওনাকে কি করে চেনো ? ওনার খারাপ দিক কি , উনি ছন্নছাড়া বেপরোয়া নেশা খোর , তাইতো ? কিন্তু এখন উনি নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলেছেন বিশ্বাস করো । উনি বেপরোয়া নেই । পরোয়া করেন আমার । শোনেন আমার কথা । নেশা করেন না বদলে গেছেন ।
” সিরিয়াসলি ? পরশু রাতে একসাথে সিগারেট খেয়েছি আমরা !
থেমে যায় মেঘা । কান্না বিজড়িত গলায় দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকে আসে কোথাও একটা । সে এসব মানতে নারাজ ! রৌদ্রের থেকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না । লোকটা যে তার সর্বস্ব জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে । এখন যে আর কুল নেই ।
মেঘা কাঁদে কিছুক্ষণ । শব্দহীন কান্না । ফিকড়ে ওঠে মাঝে মাঝে । ইয়াশ তাকালো না ওর দিকে । লম্বা শ্বাস টেনে ধরা গলায় বলল…..
” এ দুনিয়ায় তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল ? কি পাসনি জীবনে ? কি দেইনি আমি তোকে ? মানছি আমি অসময়ে তোকে ফেলে রেখে গেছিলাম । কিন্তু সেসময় তোকে কাছে নেওয়ার উপায় ছিলো না আমার । তুই জানিস সবটা । কথা তো এটা ছিলো না । কথা ছিলো সময় এলে তুই আমার সাথে চলে যাবি । আমার দুনিয়াকে আমি সাথে নিয়ে যাবো । এখন পাল্টি খাচ্ছিস কেনো ? ভাইয়া তুচ্ছ হয়ে গেলো ?
” না ভাইয়া । এমন নয় । আই লাভ ইউ ।
বাট , আই অলসো লাভ রুডভিক কাবির রৌদ্র । আমি ওনাকে ছাড়তে পারবো না আর । প্লিজ ভাইয়া,,,
” সাইন কর ।
ইয়াশের এক নির্দেশ । মেঘা ফিকড়ে ওঠে । অস্ফুটে ডাকে…
” ভাইয়া ! প্লিজ !
” সাইন কর মেঘা । সময় নেই আমাদের হাতে ।
পাঁচদিন পর ফ্লাইট । এসব ঝামেলা চুকে গেলে আর বাঁধা থাকবে না ।
আর সহ্য করতে পারলো না একবিংশী । কেঁদে উঠলো । ইয়াশ ওর দূর্বলতা । আর রৌদ্র ও তাই । সে ছাড়তে পারবে না রৌদ্র কে , অবাধ্য হতে পারবে না ইয়াশের কথায় ।
ভেজা গাল মুছে এলোমেলো কদমে বাইরের দিকে ছুটলো মেঘা । পালাতে চাইলো এসব থেকে । ইয়াশ পিছু ডাকে…..
” মেঘা…..
শোনে না একবিংশী ।
বোনের নুপুরের ক্ষিণ নিক্যনের শব্দ মুছে যেতেই ডিভানে শরীর এলিয়ে দিলো ইয়াশ । চোখ বুজে নিলো ভারী যন্ত্রনায় । গলা কাঁপছে , সাথে হাত-পা । মেঘার চোখের পানি তার বড্ড দূর্বলতা । তাইতো একবারও কান্নারত বোনের পানে তাকাতে পারে নি ।
চোখ দুটি জ্বলছে ভীষণ । গরম হয়ে আসছে । আঁখি কার্নিশে ভেজা ভেজা কিছু অনুভব করলো তপ্ত যুবক । অক্ষিপটের ধার ঘেঁষে ক্ষুদ্র এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো । শ্বাস পড়লো ভারাক্রান্ত বুক চিরে । বিড়বিড়ালো নিজের মাঝে…….
” আমার থেকে তুই সব কেড়ে নিলি রুডি ? সব ! কিচ্ছু রাখলি না । না বন্ধু , না ভালোবাসা, আর না একমাত্র সম্বল টা । সেটাও গুছিয়ে কেড়ে নিলি ? কি ক্ষতি করেছিলাম তোর ? এবার আমি বাঁচবো কাকে নিয়ে ? কেউ যে রইলো না আমার ! কেউ না…. আমি কেবলই নিঃস্ব ।
আরো কয়েক ফোঁটা তিক্ত পানি গড়ায় একই ধারায় ।
মেঘা ছুটে এসে দরজা আটকে দিয়েছে ধাম করে । মুখ চেপে কেঁদে উঠলো একান্তে একলা হয়ে । এলোমেলো হয়ে গেলো সে । তড়িঘড়ি করে ফোন খুঁজলো । খুঁজে নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে কল লাগালো রৌদ্রের ফোনে । বরাবরের মতো লোকটা বাধ্যের ন্যায় প্রথম বারেই কল রিসিভ করলো । এক গাল হেসে বললো আদুরে গলায়…..
” হেয়য়য় জান পাখি ! কি হলো , ভার্সিটির ইভেন্ট শেষ ? নিতে আসবো ?
মেঘা লোকটার এমন আবেগঘন কণ্ঠে ফুঁপিয়ে ওঠে । রৌদ্রের কানে পৌঁছায় সেই ফোঁপানির মৃদু রেশ । ওদিকে বিচলিতের ন্যায় ছ্যাত করে ওঠে সে ।
” সুইটহার্ট , কি হয়েছে ? কাঁদছিস তুই ? এই বল না , কি হয়েছে ? আমার মনে হলো কান্নার শব্দ শুনলাম তোর ।
ইভারা , কি হয়েছে জান । ঠিক আছো তুমি ?
মেঘা অতি কষ্টে কান্না গিলে নেয় । বলে আধো আধো স্বরে…..
” কোথায় আপনি ? এক্ষুনি বাড়িতে আসুন প্লিজ । আপনাকে এক্ষুনি লাগবে আমার । এক্ষুনি মানে এক্ষুনি । প্লিজ চলে আসুন ।
” হ্যাঁ আসছি তো , এক্ষুনি আসছি আমি । জাস্ট দশ মিনিট সময় দাও,জান । আমি চলে আসবো খুব শীঘ্রই । তুমি ঠিক আছো , বলো আগে !
” হু ।
মেঘা আর কিছু না বলেই ফোন কাটলো । মেঝেতে বসলো আলগোছে । হাঁটু জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো ।
ঠিক মিনিট দশেকের মাথাতেই রৌদ্রের হন্তদন্ত আগমন ।ঠাস করে সদর খুলে হুড়মুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলো । বেপরোয়া ছেলেটার শরীরের অবস্থা অনেকটা এলোমেলো । কথা রাখতে সব তুচ্ছ করে ছুটে এসেছে ।
বাড়িতে ঢুকে কোনো দিকে তাকালো না । ধড়ফড় করে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো । ছেলের এমন উদ্বিগ্ন অবস্থা দেখে পেছন থেকে রুবিনা কাবির ডেকেও সাঁড়া পেলেন না ।
আপন টানে ছুটে যায় বেপরোয়া যুবক । মেঘার ঘরের দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলে । ডাকে উদগ্রীব হয়ে…..
” MP ?
মেঘা সেই একই অবস্থাতেই হাঁটু জড়িয়ে বসে ছিলো । রৌদ্রের ডাকে ধ্যান ভাঙল । কেঁপে উঠলো খন্ডিত হৃদয় । বিচলতি হয়ে নিজেও ডাকলো…..
” রৌদ্র !
রৌদ্র তেড়ে যায় । মেঘার সামনে অগ্রসর হতেই নিজে কিছু করার আগে মেঘা উন্মাদের ন্যায় আছড়ে পড়লো ওর নাজেহাল বুকে । লোকটাকে শক্ত করে জড়িয়ে পিঠ খামচে ধরলো । ধেয়ে আসা কান্না চাপতে হিমশিম খেলো । কেঁদে ফেললো এক পর্যায়ে ।
রৌদ্র ওকে আগলে নেয় । ধড়ফড় করে হেতু না জানা অবধি । তোলপাড় অন্তঃস্থল । শুধোয় হাঁসফাঁস করে…..
” কি হয়েছে সানি ? এমন করছো কেনো ? কেঁদেছো কেনো তুমি ? বলো আমায় ? ভার্সিটিতে কিছু হয়েছে ? কেউ কিছু বলেছে ? কে কি বলেছে বলো একবার , জানে মেরে ফেলবো তাকে আমি ।
মেঘা সামলায় নিজেকে !
” কেউ কিছু বলে নি আমায় । কিন্তু আমি আপনাকে চাই রৌদ্র । সারাজীবন চাই ! গোটা জীবন সাথে থাকতে চাই আপনার ? বলুন আপনি আমার হয়ে থাকবেন !
” এইতো আমি আছি , আর থাকবো । আমি তো তোমারই । তুমি চাইলেও তোমার , না চাইলেও তোমার । কারন তুমি বাধ্যতামূলক আমার ।
” আমি আপনাকে ডিভোর্স দেবো না !
রৌদ্র খেয়ালে ফেরে । চোখ কুঁচকায়….
” ডিভোর্স ? কি বলছো হঠাৎ ?
” হু । আমি আপনার থেকে বিচ্ছেদ চাই না । মরে যাবো ।
ভাইয়া আমাকে নিয়ে অনেক দূর চলে যাবে রৌদ্র ,, আমি যেতে চাই না । আমি আপনার সাথে থাকতে চাই । সারাজীবন আপনার সাথে থাকতে চাই । প্লিজ আমাকে আটকান । আমি আপনাকে ডিভোর্স দেবো না । ভাইয়া ডিভোর্স পেপার রেডি করেছে । আমি সাইন করিনি ।
আপনি ভাইয়াকে বোঝান প্লিজ । বলে দিন আপনি আমাকে ভালোবাসেন ।
রৌদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে নিমিষেই । খিচে ফেলে দাঁত মুখ । হাত মুঠিয়ে উদ্যত হয় রাগে….
” হোয়াট ? ডিভোর্স পেপার ? ওর সাহস কি করে হয় এসব করার ? আমি তো ছাড়বো না ওকে….
রৌদ্র রাগে বাঁধন ছাড়াতে গেলে মেঘা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে । ক্লান্ত হয়ে বললো……
” আমি আমার ভাইয়া কে ভীষণ ভালোবাসি, রৌদ্র । আমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই । ওর কথার অবাধ্য হতে পারবো না আমি । ও আমার সব । আর আপনিও । আমি কাউকেই ছাড়তে পারবো না । আপনি প্লিজ ভাইয়ার সাথে শান্ত হয়ে কথা বলুন । ভাইয়া বুঝবে আপনাকে । দেখবেন , সব মেনে নেবে । ও আমার সুখ চায় । আপনি দেখিয়ে দিন , আপনি আমাকে সুখে রাখতে পারবেন ।
শান্ত হলো রৌদ্র । চোখ বুজে সামলে নিলো ক্ষুব্ধতা । মেঘার পিঠে হাত রাখলো আলগোছে…..
বললো ঠান্ডা হয়ে…..
” হু , দেখিয়ে দেবো !
” মানিয়ে নেবেন ভাইয়াকে ?
” নেবো !
” খুব শান্ত হয়ে বোঝাবেন , কেমন ?
” হু , বোঝাবো ।
” অধৈর্য হবেন না , রাগবেন না বলুন !
” আচ্ছা ।
এজন্যই এতো জরুরি তলব ? কাঁদছিলে এ কারনেই ?
মেঘার ওর বুকের মধ্য থেকেই মাথা নাড়ালো হ্যাঁ বোধক । মৃদু হাসলো রৌদ্র । খানিকক্ষণ বাদ রমনীকে আলগোছে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলো । ভেজা চোখ,মুখ মুছিয়ে দিলো আজলে নিয়ে । কপালে গাঢ় চুম্বন আঁকলো । এতক্ষণে ভার দাবিয়ে হালকা করে দৃষ্টি তুলে তাকালো একবিংশী । সহসা রৌদ্রের চেহারা দেখে আঁতকে উঠলো অবিলম্বে ।
লোকটার কপালে, ঠোঁটের কোণে , বাম চোয়ালের ধারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষতচিহ্ন । দগদগে ঘা । রক্ত তাজা । টকটকে তরল গড়িয়ে পড়ার চিহ্ন রেখে গেছে ।
মেঘা ছ্যাঁত করে ওঠে । ঘোলাটে চোখে পুরো দৃষ্টিতে রৌদ্র কে পরখ করে । লোকটার ডেনিমে ধুলো , ছেড়া হাতের কাছে । বাম হাতের উপরি পিঠে ছুলে যাওয়া ক্ষত । রক্ত ছোপ ছোপ । এলোমেলো পুরো ।
মেঘা ঢোক গিললো । ব্যাস্ত হয়ে লোকটার চোয়ালে হাত তুললো । আলগোছে ক্ষতচিহ্ন ছুঁইয়ে দিয়ে বললো ভড়কানো গলায়……
” রৌদ্র , এসব কি করে হলো ? কি হয়েছে এসব ?
রৌদ্রের অবিসন্ন জবাব…..
” তাড়াহুড়ো করে ড্রাইভ করতে গিয়ে বাইক থেকে পড়ে গেছিলাম । বাট , নাউ আ’ম অল রাইট । ডোন্ট প্যানিক সুইটহার্ট !
মেঘা বিমুঢ় লোচনে তাকিয়ে রয় । লোকটার ঠোঁটে হাসি । আচ্ছা পাগল লোক তো ! ক্ষত বিক্ষত শরীরে হাসছে ? আবার বলছে, ঠিক আছেন উনি ! ইশশ্, কি অবস্থা শরীরের ।
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো মেঘা । ওষ্ঠ উল্টালো । ওর জন্যই অতিষ্ঠ হয়ে ছুটে এসেছে এই লোক । আর সেজন্যই এ দশা ।
নাক টানলো রমনী ।
” ব্যথা পেয়েছেন খুব বেশি ? লেগেছে তাই না ? ইশশ্ , ছুলে গেছে কিভাবে দেখুন তো ! নিজের খেয়াল রাখতে পারেন না, রাইনো মুখো ! যন্ত্রণা হচ্ছে ভীষণ ?
” হু ! একটু আদর করে দাও ! সেরে যাবে !
লোকটার আবেশিত চাহনা । মেঘা চোখ সরু করলো । একটু খানি উঁচু হয়ে বাম চোয়ালের পাশের ছোট্ট ক্ষতটাতে আলগোছে ঠোঁট ছোঁয়ালো । ওরনার এক কোণে জমাট রক্ত মুছিয়ে দিতে দিতে বললো ……
” এভাবে ছুটে আসতে কে বলেছিলো ?
” তুমি ! ডেকেছো আমায় , ছুটে আসবো না ? তক্ষুনি চেয়েছিলে আমায় । দেরি করে ফেলেছি আসতে ।
” তাই বলে পাগলের মতো এক্সিডেন্ট করবেন ?
” পাগলের মতো নয় , আমি তো পাগলই তোমার জন্য । হয়ে গেছে পাগলের দ্বারা একটা পাগলামো ।
” উঠুন এখন !
আবারো ভেজা চোখ মুছে রৌদ্র কে নিয়ে ঘর ছাড়লো সে ।
নিচে নামতেই ছেলের এমন অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন রুবিনা কাবির । রৌদ্র বসতেই তড়িঘড়ি করে ছুটে গেলেন…..
” এ কি , তোর অবস্থা এমন কেনো ? কি করেছিস তুই ? ছুলে গেছে কি করে হাত পা ?
” বাইক থেকে পড়ে গেছিলাম, মম । টেনশন করো না, কিচ্ছু হয় নি ।
বিচলিত হয়ে পড়লেন রুবিনা কাবির ।
মেঘা ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে পাশে বসেছে । মুখ ভার । কথা বললো না । রৌদ্র কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তুলোয় অয়েনমেন্ট নিয়ে আলগোছে ক্ষত চিহ্নে চেপে ধরলো । চিনচিনে ব্যাথায় দাঁত চেপে খিচলো রৌদ্র । চোখ খিচে নিলো । মেঘা কাতর চোখে পরখ করলো তা । স্টিরি-স্ট্রিপ লাগিয়ে ক্ষত ঢাকলো ।
মেঘার এমন টুকটাক যত্নে ঠোঁট ফেটে তৃপ্তিময় হাসলো বেপরোয়া যুবক । রুবিনা কাবিরের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে রমনীর খোঁপায় আটকানো ক্লিপটা খুলে নিলো একটানে । অভ্যাসবশত এক গোছা চুল টেনে চেপে ধরলো নাকের ডগায় । দীর্ঘ শ্বাসে ঘ্রাণ টানলো উন্মত্তের ন্যায় ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৯
মেঘা আড়চোখে রুবিনা কাবির কে দেখে অপ্রস্তুত হয় । বিড়বিড় করে বকা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় ঝটপট ।
ওদিকে করিডোরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিচের সবটা তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করলো এক তপ্ত যুবক । তার প্রতিক্রিয়া খুব একটা বোঝা দায় । চোয়াল শক্ত হলেও ভঙ্গুর দৃষ্টি জোড়া । ক্রোধ হীন নরম চাহনি ।
এক পর্যায়ে দৃষ্টি বুজে বুক ভরে দীর্ঘ শ্বাস টানলো ।
