সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বাইরে ভারি বাতাস বইছে । ঝড়ের সম্ভাবনা তীব্র। এখনো বৃষ্টির ফোঁটা ধরনীতে পরতে শুরু না করলেও, ধুলিঝড় হচ্ছে বলা যেতে পারে । একে তো গভীর হচ্ছে রাত, তার ওপর এমন বৈরি আবহাওয়া। ঈদের আগে ঘরের বাইরে প্রায় সব মানুষ। উপচে পরা ভিড়ের এই মানুষগুলো একপ্রকার ছোটাছুটি করে ঘরে ফিরতে মরিয়া । দোকানপাট গুলো বন্ধ করা হচ্ছে ঘটাংঘট শব্দ করে । রাস্তায় জ্যাম লেগে গিয়েছে । ঈশান বড্ড বিরক্ত মুখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে । সেই তখন থেকে বসে আছে একই জায়গায়। গাড়িটা একচুল পরিমানও এগোয়নি। আশেপাশের গাড়িগুলো অযথা হর্ন বাজিয়ে মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে একপ্রকার। তার গাড়িতে এই মূহুর্তে ড্রাইভার ছাড়া সে একা। সাজিদের গাড়ি পিছনে। নাঈম আর নিয়াজও সেখনেই। বিশাল গাড়িতে তার একা থাকার কারণ অবশ্য বিশেষ। এক বিশেষ অতিথি উঠবে তার সাথে। সে হয়তো ইতিমধ্যে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েও আছে । ঈশান ঝটপট ফোন বের করলো। কল লাগালো অমিতকে। রিসিভ হলো তৎক্ষনাৎ। ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া গেলো অমিতের ব্যাস্ত কন্ঠস্বর।
—’ স্যার, আপনি কতদূর? ‘
—’ তুমি কোথায়? ‘
—’ যেখানে থাকতে বলেছিলেন।’
—’ রিসিভ করেছো?’
—’ সাথেই আছে। ‘
—’ বিরক্ত হচ্ছে কি?’
—’ আপনার জন্য ছটফট করছে। ‘
শেষ কথাটা অমিত একপ্রকার ঠোঁট টিপে, অন্য দিক ঘাড় বাকিয়েই বললো। পাছে, ঈশান আবার ধমক লাগায়, সেই কারণে কৈফিয়ত দিতে যাবে তার আগেই কি মনে করে নিজেই থেমে গেলো । তবে ঈশান রাগ করলো না মোটেই। নিঃশব্দ হেসে বললো ওখানেই অপেক্ষা করতে। জ্যাম হালকা হচ্ছে । যদিও এরকম টেনেটুনে এগোবে আরকি। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য অবধি পৌছাতে, ঈশানদের গাড়ির সময় লাগলো প্রায় বিশ মিনিট। অথচ স্বাভাবিক সময় এ পথ পাঁচ মিনিটের। আশেপাশে তখনও অঢেল গাড়ি। কচ্ছপের মতো এগোচ্ছে। ঈশানের হাতে লোকেশন ম্যাপ। অমিত আশেপাশেই আছে। তার গাড়ি একটু একটু করে এগোচ্ছে ভিড় ঠেলে। জ্যামের যে অবস্থা, গাড়ি মোটেই সাইট করার মতো অবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাদেরই এইখানে আসতে হচ্ছে। ঈশান কপাল চেপে বসা। ইয়াজ মির্জাও আঁটকে আছে জ্যামে। তাদের গাড়ির থেকে প্রায় মাইল খানেক আগে তার গাড়ি। ট্র্যাকিং তো তাই বলছে! অমিতের দুরত্ব কমতেই নিজের গাড়ির কাচ নামালো প্রথমে সে। অমিত নিজেই এগিয়ে এসেছে এদিকটায়। ঈশান মৃদু হেসে গাড়ির দরজা টা খুলতেই, সম্মুখীন হলো একটা মিষ্টি হাসির। নয়নে নয়ন মিললো। হৃদপিণ্ডের ধুকপুক হলো একাকার। ঠোঁট টিপে ইশারা করলো চোখে চোখে। পুরুষালি হাতটা বাড়িয়ে দিতেই, সেখানে স্থান করে নিলো একখানা তুলতুলে নরম ছোট্টমতো হাত। ঈশান একপ্রকার হেঁচকা টানেই ভিতরে নিয়ে এলো তাকে। সোজা ফেললো নিজের কোলের ওপর। অমিতকে আর কিছু বলতে হলো না। সজোরে দরজা টা আঁটকে, সে গিয়ে বসলো ড্রাইভারের কাছে। গাড়ির ভিতরে বিশেষ বিলেতি কায়দায় পার্টিশন দেওয়া। ড্রাইভারের অংশ এবং পিছনে যাত্রী অংশের মাঝামাঝি। সুতরাং পিছনে এই মূহুর্তে যা যা ঘটবে, তা মোটেই দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা নয় অমিত বা ড্রাইভারের।
হাত বাড়িয়ে ভিতরের একপাশের আলো নিভিয়ে ঈশান বিনাবাক্যে মুখ গুঁজল রমনীর কন্ঠ দেশের ভাঁজে। শ্বাস ফেললো জোরে জোরে। ক্রমাগত নে’শায় আসক্ত একজন ব্যাক্তি, দীর্ঘদিন পর ড্রা’গ কাছে পেলে যেমনটা উন্মা’দের মতো শ্বাস টানে– ঈশানের অবস্থা অনেকটা তেমন। গলার খাঁজে মুখ গোঁজা অবস্থাতেই, মেয়েটার পাতলা কোমড়খানা একহাতে শক্ত করে চেপে অন্য হাতে নামিয়ে ফেললো গলার ওড়নাটা। সেটা পাশের সিটে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে আদুরে গলায় বললো,
—’ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে? ‘
নাকে-মুখে উত্তর নিলো মেয়েটা। দু-হাত বাড়িয়ে ঈশানকে আঁকড়ে ধরতে ধরতে বললো,
—’ উমমম, অনেক। ‘
—’ ঘেমে-নেয়ে একাকার একদম। জ্যামের মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে না থেকে, গাড়িতে অপেক্ষা করলেই হতো না? ‘
—’ উমমম। ‘
ঈশান অমিতকে গলা উঁচিয়ে ডাকে, এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিতে। মেয়েটার ঢিলে করে খোঁপা করে রাখা চুলগুলো ঘাড়ের ওপর পরে আছে। হাতের মুঠোয় চুলগুলোকে উচিয়ে ধরলো। যাতে করে, গরম টা না লাগে।
—’ চুলগুলো এতো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে কেনো? যত্ন নেওয়া হয়নি? ‘
—’ নাহ। ‘
—’ কেনো? ‘
—’ কার জন্য নিতাম? ‘
—’ নিজের জন্য। ‘
—’ যার জন্য নিজেকে এতটা গুছিয়ে, যত্ন করা– সেই যদি কাছে না থাকে, কোনোকিছুতে মন বসে? ‘
ঈশান হাসে। মেয়েটার গায়ের ঢিলেঢালা লং লেডিস শার্টটা আলতো হাতে কোমড়ের ওপর থেকে উঁচিয়ে ট্যিসু দিয়ে পিঠের ঘাম মুছে দিতে দিতে বলে,
—’ এইযে কাছে এখন ৷ ‘
পুরুষালি হাতের স্পর্শে মিয়িয়ে আসে মেয়েটা । ট্যিসু নিয়ে ছেলেটার হাত বিচরন করছে তার পোষাকের ভিতরে। সে হাত ঘুরেফিরে নির্মেদ উ’দর পেরিয়ে আরেকটু ওপরে উঠতেই মিনমিন করে উঠলো সে।
ঈশানের হাতটা চেপে ধরতে ধরতে বললো,
—’ দরকার নেই । এসিতে শুকিয়ে যাবে । ‘
—’ ঘাম শরীরে ঠান্ডা বসে যাবে। ‘
—’ তাহলে আমাকে দিন৷ আমি মুছে নিচ্ছি। ‘
ঈশান মুখ তোলে। মেয়েটার রক্তিম হয়ে আসা গাল দু’টোতে ছোট্ট করে চুমু এঁকে বলে,
—’ আমি মুছিয়ে দিলে সমস্যা? নাকি লজ্জা পাওয়া হচ্ছে। ‘
—’ কোনোটাই না ৷ দিন মুছিয়ে। সবেতে বেশি বোঝেন। ‘
ঈশান বাঁকা হেসে, নিজের হাতের কাজটুকু শেষ করলো। রমনীর মোমের মতো পা জোড়া তখন একপাশে। ঈশানের শক্ত হাতের জোরে একপ্রকার শূন্যেই উঁচু হয়ে গেলো মেয়েটার পাতলা শরীর। পর মূহুর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলে ঈশানের আরও খানিকটা ঘ’নিষ্টে। যেখানে পা জোড়া ঈশানের কো’মড়ের দু’পাশে। মেয়েটা কিছু বলার আগেই ঈশান বুকে জা’পটে ধরলো একদম। হিসহিসিয়ে বললো,
—’ হোল্ড মি ব্যাক, মাই লাভ।’
—’ কি হচ্ছে টা কি? এটা এমন পাগলামির জায়গা?’
—’ কিসের জায়গা এটা?’
—’ রাস্তা।’
—’ তো? ‘
—’ তো মানে! গাড়িতে আমরা। ‘
—’ গাড়িটা জ্যামে আঁটকে। ভিতরে আমরা দু’জন। বিরক্ত করার মতে একটা প্রানীও নেই। ড্রাইভার বা অমিত কেউ আমাদের দেখতেও পাবে না। না তো বাইরের কেউ পাবে। তাহলে? সমস্যা তো দেখছি না।’
—’ আর কোনো কথা নেই? সোজা জড়াজড়ি! ‘
—’ উহু, পরে সব। লেট মি ফিল ইউ। ‘
ঈশানের শক্ত হাতের চা’পে ব্যাথায় জর্জরিত হয় মেয়েলি শরীর। মেয়েটার ঢিলেঢালা শার্টের তিনটে বোতাম খুলে ব’ক্ষবিভাজনের মাঝে নাকমুখ ডুবাতেই মু’ষরে উঠলো মেয়েটা। দু’হাতে খা’মচে ধরলো ঈশানের মাথার চুল। আ’বেশে বন্ধ করে ফেললো চোখজোড়া। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বললো,
—’ আমরা একটা কাজে যাচ্ছি। ‘
—’ শিকার আমাদের হাতেই। ‘
—’তো? আমরা পৌছে যাবো এখনই।’
—-’ আরও ঘন্টা দেড়েক। শিকারও জ্যামে আটকেই। এতটুকু সময় ওয়েস্ট করার মানে হয়?
—’ কি করবেন? ‘
—’ আ’দর! ‘
ছেলেটার ভেজা আদরগুলো ছোটখাটো দং’শনে পরিনত হয়েছে এখন । মেয়েটা আর সহ্য করতে পারলো না। এলোমেলো হয়ে উঠছে সে। দু’হাতে ঠেলে সরাতে চাইলো ঈশানকে। ধমকে উঠলো ছেলেটা।
—’ তিতির, প্লিইজ সরিয়ে দিস না । কি করছি? চু’মুই তো খাচ্ছি? কতবড় একটা মিশনে যাচ্ছি। মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে এত রিস্কি কাজে যাওয়া উচিত? এনার্জির দরকার নাহ? ‘
তিতির মুচকি হাসলো। ঈশনের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে বললো,
—’ এতদিন এনার্জির দরকার হয়নি? বউ ছাড়া দূরে আছে দু সপ্তাহের বেশি। আজ হঠাৎ মনে হলো এনার্জির কথা? ‘
ঈশান নিজের স্ত্রীর শ’রীরের,তার অতি প্রিয় নরম স’ত্তায় ঠোঁট গুজে খানিক পরে অস্পষ্ট জবাব দিলো,
—’ তোকে জড়িয়ে ধরে যতটা শান্তি পাই, এ পৃথিবীতে আর কোথাও বোধহয় সে শান্তি নেই, তিতির। এখন আমার পাগলামি টা দেখছিস। মনে করছিস দেহের টানে এতো ঘনি’ষ্ট হচ্ছি? হুম? তা নয়। তোকে না ছুঁয়েও আমি যতটা অনূভব করি, যতটা জড়িয়ে থাকিস আমার সাথে – কল্পনাও করতে পারবি না তুই। বিশ্বাস কর৷ ইচ্ছে হচ্ছে বুক চি’ড়ে তোকে সেখানটায় লুকিয়ে রাখি। কি করলে কমবে এতদিনের দুরত্বের দহন। বুঝতে পারছি না। তাই এই শরীরি উন্মা’দনা।
তিতির বোঝে স্বামীর এই দহন। নিজেও যে পুড়েছে একই অনলে। ঈশানের কানের লতিতে ঠোঁ’ট ছুঁয়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
—’ আমি কি একবারও বলেছি আপনি দে’হের চাহিদায় আমার কাছে আসেন শুধু? বলিনি তো। আর এই আমি তো আপনারই। বুকে ভালোবাসা রেখে, যখন ইচ্ছে ছুঁয়ে দিতে পারেন। সে অনুমতি দেওয়া আছে আপনাকে । তাহলে কৈফিয়ত দিচ্ছেন কেনো? আমি আ’দর করবো কি এবারে? দ্যান, লেট মি ইজ ইওর মাইন্ড। ‘
আকুতি করে উঠলো ঈশান তৎক্ষনাৎ। অসহায় দৃষ্টি তাক করে বাচ্চাদের মতো বললো,
—’ প্লিইজ।’
তিতির সময় নষ্ট করে না। মুখ ঝুঁকিয়ে ঈশানের কাঁধে ঠোঁট ঠেকিয়ে প্রথমে একটা শব্দ করে চুমু আঁকে। তারপরই সজেরে কা’মড় বসায়। আচমকা আক্রমণে ঈশানও চমকেছে। ব্যাথায় গু’ঙিয়েও উঠলো। মেয়েটা কামড়ে দেবে কে জানতো। কামড়ের পরপরই ভেজা চু মুতে ভরিয়েও দিলো জায়গাটা। সেখানে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বললো,
—’ শক্ত করে ধরছেন না কেনো । ছটফট করছে গোটা শরীর । শান্ত করুন । ‘
—’ যে ছটফট হচ্ছে, তা থামাতে অন্য অনেক কিছু করতে হবে । করবো? সময় আছে ঘন্টাখানেক। ‘
—’ আপনার ঘন্টাখানেকে হবে! ‘
বাঁকা হাসলো ঈশান। মেয়েটার শার্ট গলিয়ে ন’গ্ন উদরে হাত ছুঁয়িয়ে ফিসফিস করে বললো,
—’ আমার টাইমিং সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে দেখছি। ‘
—’ আপনাকে গ্রহন করেছি। পুরেটা আত্মস্থ করবো না, তাই হয়! ‘
—’ তাও ঠিক। হবে না। এতটুকুতে কিচ্ছু হবে না। এতদিনের অ’ভুক্ত, বড্ড পাগলামি করে ফেলবো এখন গভীরে গেলে। এখন থাকুক। আপাতত শান্ত হয়ে জড়িয়ে থাক এই বুকে। আমার হৃদপিণ্ড টাকে থামতে দে। ফি’ল করতে দে তোকে৷। ‘
দেওয়ান বাড়ির আলো আজকে নেভেনি । থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে একপ্রকার। বাড়ির তিন তিনজন ছেলেমেয়ে নিখোঁজ। পুলিশ নাকি এখনো কিচ্ছু করতে পারেনি। রাইসুল দেওয়ান এ বেলা রীতিমতো বিরক্ত নিজের ছেলের ওপরে। ঈশানের সাথে দেখা করার আশায় কি না কি করেছে। ক্ষমতার যতটুকু ব্যবহার সম্ভব, করে গিয়েছে। অথচ সেই ছেলে না-কি একটাবারের জন্য দেখা করতে চায়নি। রাত গভীর হচ্ছে। গভীর হচ্ছে চিন্তারা । নাঈমের ভাষ্যমতে তিতির, তমা তাদের কাছে। সুরক্ষিত আছে। তাই যদি হয়। কিডনাপার দের হাত থেকে মেয়ে দুটো উদ্ধারই যদি হয়, তাহলে কেনো একটাবার তাদের সাথে একটু কথা বলিয়ে দিচ্ছে না। তমার বাবা- মা থেকে শুরু করে দেওয়ান বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ একসাথে জমায়েত হয়েছে। আগামীকাল ঈশানের কেসটা কোর্টে উঠবে। তার ভোর রাতের দিকে রওনা দেবে। যদিও সবাইকে বারংবার বলা হচ্ছে শুয়ে পরতে, তবে নানা আলাপ আলোচনায় চোখের পাতা এক করা সম্ভব হচ্ছে না কারোরই । রাহেলা কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তারই কাছ থেকে মেয়ে দুটোকে ওভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সে আটকাতে পারেনি। এই অনুশোচনা থেকে ম’রে যাচ্ছে একপ্রকার। আরেকটা অনুশোচনা বোধহয় আছে। তার ছেলের পরিচয়। রাহেলা স্বামীর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। লোকটা ঢাকা-সিলেট ছোটাছুটি করতে করতে রীতিমতো ভেঙে পরেছে। যতটুকু শক্ত হয়ে ছিলো, তিতির আর তমার এক্সিডেন্টে টার পর থেকে আরও তাকানো যাাচ্ছে না মুখের দিকে । আরও ঘন্টা খানেক এ-সব আলোচনা শেষে রাইসুল সাহেব সবাইকে একপ্রকার ধমকেধামকে নিজেদের ঘরে পাঠালেন । নিজেও স্ত্রীকে নিয়ে আসলেন নিজেদের ঘরে ।
—’ তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে, ঈশানের বাবা । ‘
ভদ্রলোক সবেই চোখের চশমাখানা টেবিলে রেখে কোমড় ঠেকিয়েছে বিছানায়। হাতের উল্টো পিঠে চোখজোড়া ডলে ভাঙা গলায় বললো,
—’ বলো । ‘
রাহেলা ইতস্তত করে খানিকটা। স্বামীর পাশে এসে বসে।
—’ আমি যদি বলি– ঈশান বা তিতির বা তমা। কাউকে নিয়েই চিন্তার কোনো দরকার নেই। শুনবে? ‘
—’ তা বললেই হয়? ঈশান দোষ করেনি। সেটা আমিও জানি। আমার ছেলে ও। তিতির তমা নাঈমদের হেফাজতে আছে। তাও মানলাম। কিন্তু তারপরও, ঈশানকে যতক্ষণ না অবধি ছাড়িয়ে আনতে পারবো। আর আমার মেয়েদুটোকে যতক্ষণ নিজের কাছে আনতে পারবো। ততক্ষণে এ চিন্তা যাবে না, রাহেলা। ‘
রাহেলা ঠোঁট টিপে বসে রয়। স্বামীর পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে সাহায্য করে। গুছিয়ে নেওয়া কথাগুলো এলোমেলো ঠ্যাকে।
—’ আমি তোমাকে না জানিয়ে একটা কাজ করে ফেলেছি। ‘
স্ত্রীর মুখাপানে তাকালেন ভদ্রলোক। ভ্রু উচিয়ে শুধালেন,
—’ কি করেছো ? ‘
—’ তোমার ছেলে…’
—’ আমার ছেলে! ঈশান কে নিয়ে কিছু?’
— ‘হ্যা। যদি বলি, তোমার ছেলের কিছু বিষয় আমি তোমার থেকে আড়াল করেছি। ‘
—’ কি বিষয়? ‘
—’ কোনটা রেখে কোনটা বলবো! ‘
—’ বলো তোমার মতো। ‘
বাইরে বোধহয় ঝড় হচ্ছে। ভেন্টিলেটর দিয়ে শীতল বাতাস হু হু করে ঘরে ঢুকছে। রাহেলার গলা কাঁপলো সামান্য।
—’ তোমার ছেলে ঢাকা থাকতে মোটেই কোনো সাধারণ বিজনেসের সাথে যুক্ত ছিলো না। আর না তো ও বর্তমানে শুধু আমাদের অফিস সামলায়। ‘
স্ত্রীর এতো ঠেকে ঠেকে বলা কথা বুঝলেন না ভদ্রলোক। চোখমুখ কুঁচকে শুধালেন,
—’ মানে? ‘
—’ মানে…আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। তোমার কাছ থেকে, তোমার ছেলের এতো বড় সত্যটা লুকানোর জন্য। আমার আর কিছু করার ছিলো না এছাড়া। তুমি না হলে, নিজের ছেলেকে ত্যাজ্য করতে। যেমনটা বলেছিলে। আমি তাই ওর এই কর্মকান্ডের কথা তোমাকে জানতে দিতে চাইনি। ও আসলে…’
চমকে তাকিয়েছে ভদ্রলোক। সে যা জেনে গিয়েছিলো। ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলো যা থেকে! তাতেই পা গেড়ে বসে আছে ছেলেটা!
—’ ও তারমানে সেই পথই বেছে নিয়েছে, যেটা থেকে আমি ওকে ফিরিয়ে এলেছিলাম? ‘
সিক্ত চোখজোড়া নামিয়ে নিলো রাহেলা। এ নিয়ে বাপ ছেলের মধ্যে এককালে কম অশান্তি হয়নি। শেষ অবধি বাড়িও ছেড়েছিলো ঈশান । রাহেলা অস্ফুটে বললো,
—’ হ্যা৷।’
—’ কবে থেকে তুমি জানতে এসব৷? ‘
—’ শুরু থেকে । ‘
—’ বছর ছয়েক আগ থেকে? ‘
রাহেলা অস্ফুটে উচ্চারন করলো, — ‘ হ্যা। ‘
স্তব্ধ হয়ে খনিকটা সময় বসেই রইলে পৌঢ়। স্ত্রীর দিকে তাকালেন অবধি না।
—’ এই একটা কারণে ওর গায়ে হাত অবধি তুলেছিলাম আমি, রাহেলা। তোমাকে অবধি তালাক দিতে চেয়েছিলাম। তোমার ছেলে রাগ করে ঘর ছাড়লো। বছর তিনেক পর ভদ্রলোক সেজে ফিরলো। আমার ভাগনি টাকে বিয়ে করলো । যদিও ও তা চায়নি। আমিই জোর করেছিলাম। মা’র কথা রাখতে। তোমার ছেলের এই রুপ টা আমার জানা থাকলে, তিতিরের এতো বড় সর্বনাশ আমি কখনো করতাম না। ‘
রাহেলা নাক টেনে কান্না আটকে মিনমিন করে বললো,
—’ মা জানতেন । ‘
আরেকদফা হোঁচট খেলেন লোকটা। অসহায় কন্ঠে বললো,
—’ এটা আমাদের সমাজের একটা অতি প্রচলিত কথা। ছেলে নষ্ট হয় মা আর দাদির জন্য। আমার বাড়িতেই ঘটেছে এমন একটা ঘটনা! দিনের পর দিন। বছরের পর বছর! আমারই অগচরে এসব ঘটে গিয়েছে। অথচ, আমি জানতেই পারিনি। আজকে তিতিরের এই অবস্থা তোমার ছেলের কৃতকর্মের জন্য। তা আর বুঝতে বাকি রইলো না আমার। আমি আমার মেয়েটার সর্বনাশ করলাম। তোমার ছেলে তো বোধহয় ভালোও বাসেনা …’
এবার স্বামীর কথা শেষ করতে দেয় না রাহেলা। ব্যাস্ত গলায় বলেন,
—’ ভুল হয়নি এখানে । ঈশান কে জোর করে দেওয়া হয়নি বিয়ে টা । ও পছন্দ করতো তিতির কে। তোমার ওপর রাগ থেকে মানা করতো বরাবর। কিন্ত ও চাইতো মেয়েটাকে । ‘
অবাক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রাইসুল সাহেব বললেন,
—’ বাহ্ । যা ঘটে এসেছে সবই পরিকল্পনা মাফিক। সবই জানতে তুমি । চুপ করে ছিলে! ছেলের অধঃপতন দেখছিলে? তিতিরের সর্বনাশ দেখছিলে? ‘
—’ সেরকম নয়। ‘
—’ চুপ, একদম চুপ । ‘
ধমকে উঠলেন লোকটি । দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
—’ তোমার ছেলেকে আমি ত্যাজ্য করবো। আমাকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাওয়ার অপরাধে। আমার বাড়ির মেয়ে দুটোকে ওর খেলার গুটি বানিয়ে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে। তিতির কে ছলনা করে বিয়ে করার অপরাধে। ‘
—’ তিতির কে ছলনা করেনি ও। আমরাই…’
আবার থামিয়ে দিলেন রাইসুল সাহেব। গায়ের পাঞ্জাবি টা ছুঁড়ে দিতে দিতে বললেন,
—’ তাহলে দিনের পর দিন ভালো না বাসার নাটক কেনো করলো । বাবা হয়ে বিষয়টা নিয়ে বলতে লজ্জা লাগছে। তুমি কি জানো– ওরা দীর্ঘদিন আলাদা ঘরে ঘুমাতো । ঈশান আমার মেয়েটাকে টর্চার করতো রীতিমতো। এখন কি মধুবাক্য আউরিয়ে মেয়েটাকে জাদু করেছে জানিনা। কিন্তু ওই ছেলে মোটেই ভালোবাসার নজরে দেখেনি মেয়েটাকে। দেখলে , বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব আসে ওর বউয়ের জন্য। আর ও তাতে হাসতে হাসতে অংশগ্রহণ করে? দিনের পর দিন, বিবাহিত বউকে আলাদা রাখে। আমাদের সামনেও কখনো, এখন পর্যন্ত ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখেছো? ‘
রাহেলা মহাসংকটে পরে এবারে। এমন করে লোকটা যে রেগে যাবে, তা তো সে জানতই। কিন্তু আজকে না জানিয়ে, শেষে বা কিই করতো। আর কতদিন নিজের বুকের ভেতরে চাপা রাখতো কথাগুলো। আজ বাদে কাল, নিশ্চয় সামনে আসতো বিষয়টা। আরও বাজে ভাবেই হয়তো আসতো। এইযে ছেলেটা এতো বাজে একটা কেসে ফেঁসে গিয়েছে। এইটাই কি কম! রাইসুল গজগজ করে উঠে পায়চারি করলেন গোটা ঘরজুড়ে। কপালে আঙুল চেপে খেদোক্তি ঝেরে বললেন,
—’ আঁধারের মানুষ তোমার ছেলে । তিতির কে আমি ওই কলুষিত অধ্যায়ের অংশ হতে আর দেবো না। বিয়ে টা হয়েছিলো। কেউ জানতে পারেনি। না জানিয়ে বিয়েটা দিয়েছিলাম। একপ্রকার ভালোই করেছিলাম। আলগোছে ওদের ডিভোর্স টা দিয়ে আমি আমার মেয়ের আরেক জায়গায় বিয়ে দেবো। কোনো সাধারণ ঘরের, সাধারণ জীবনযাপন করা ছেলের কাছে। এরকম মিথ্যাবাদি, বে’ইমান, ছল’না করা পুরুষের কাছে মোটেই নয়। একদম নয় । ‘
ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে সরু একখানা রাস্তা। খুব একটা মানুষের পদচারণা পরে না এখানটায়। কোনো এককালে হয়তো পরতো। ঢাকা শহরেও যে এরকম নিরবিলি জায়গা হয়, সেটা সম্ভবত এই ধরনের আঁধারের মানুষরা ছাড়া আর কেউই আন্দাজ করতে পারবে না । যদিও মূল ঢাকাতে নয় এটা। খানিকটা বাইরের দিকেই। এদিকে জঙ্গলেের বহর। ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে একটা মাঝারি আকাটের পুরানো কটেজ। ইট-পাথরের দেয়ালটা খসে খসে পরছে। ঈশানের বাঘের দৃষ্টি তখন ওই ঘরের দিকে তাক করা । পকেটের বন্দুক টা আলগোছে নিজের হাতের মুঠোতে নিয়ে এসে, ঘাড় বাঁকিয়ে অমিতকে সতর্কবাণী ছুড়ে দিয়ে বললো,
—’ তোমার ভাবি কে প্রটেকশন দিয়ো, অমিত। জেদি মেয়ে গাড়িতে থাকলনা। এ-সব কি ওর জন্য! ও পারবে সামলাতে? জীবনটা পাতা পাতা ওর জেদের কারণে। ‘
অমিত ঠোঁট টিপে হাসলো। তিতির ঈশানের ঠিক পেছনেই। তমার জন্য ছটফট করছে একপ্রকার। স্বামীর বিরক্ত ভাবটুকু খেয়ালই করলো না যেনো। ঈশানের লোকজন, একেকজন সবাই নিজেদের গাড়ি থেকে হুড়মুড়িয়ে বের হয়ে আসতেই। নিস্তব্ধতা কমলো খানিক টা। ঝরে থাকা শুকনো পাতার ওপর মচমচ শব্দ করে উড়লো। ঈশান সময় নষ্ট করে না আর। লম্বা পায়ের কদম ফেলে প্রবেশ করে ভিতরের দিকে৷ পিছু পিছু ছোটে আরও গোটা বিশেক মানুষ।
—’ তোমার বোন কি বলেছে জানো? ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সব পাপ মাফ করতে সে রাজি । কিন্তু আজকে যদি তোমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে সে কখনো ঈশান কে মাফ করবে না৷৷ এখন তুমিই বলো, তিতির যদি ঈশানকে মাফ করে দেয়। আমার লাভ না ক্ষতি? অবশ্যই ক্ষতি। আর কাল যদি খবরের হেডলাইন হয়। তোমার খু ন ঈশান আরশাদের হাতে৷ ভাবতে পারো ? চেকমেট? তাইনা বলো? হুম? ‘
তমা স্তম্ভিত্ব হয়ে তাকিয়ে রয় সামনের পুরুষটার দিকে। মানুষ ভিতরে এক, আর বাহিরে এক। কতটা নিখুঁত হতে পারে একটা মানুষের অভিনয়। তা কেউ এই লোকটাকে দেখে শিখুক। ইয়াজের দক্ষ, শক্তপোক্ত হাতটা তমার দিকে এলোমেলো ভঙ্গিতে বাড়াতেই, চিৎকার করে উঠলো তমা।
—’ আপনি একটা, সাইকোপ্যা’থ। তা কি জানেন ? এরকম নোং রা মানসিকতা, নোং রা রুপ নিয়ে…ছিহ্। তিতিরকে ভালোবাসেন! ভালোবাসা কি জানেন? অন্য নারীদের দিনের পর দিন স্প’র্শ করেন। আর ওকে ভালোবাসার কথা বলেন ? ‘
—’ কতটা ভালোবাসি, তা তোমাদের আন্দাজের বাইরে, সুইটহার্ট । ওর জন্য কি-ই না করেছি আমি! ‘
—’ খোদার হিসেব এতো সহজ না। এতো নোং রা মনমানসিকতা, চরিত্র নিয়ে ফুলের মতো মেয়েটাকে হাশিল করতে চান! ‘
আরও খানিকটা ঝুঁকলো লোকটা। শরীর থেকে কড়া পারফিউম এর ঘ্রান নাকে এসে বারি খাচ্ছে। লো’লুপতা ছেয়ে আছে গোটা মুখে। ফুল স্পিডে এসি দেওয়া সত্ত্বেও ঘামছে। ইয়াজ জিবে ঠোঁট ভিজিয়ে হাস্কিস্বরে বললো,
—’ যেদিন ওই ফুলটা স্প’র্শের সৌভাগ্য হবে। সেদিন থেকে সব নারী সঙ্গ বাদ। কসম। তার আগে আজকে তুমি আমাকে স’হ্য করবে। ‘
তমা হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে গেলো। পিঠ এসে ঠেকলো বিছানার হেড বোর্ডে । ইয়াজ বাঁকা হাসলো। ডানে বায়ে মাথা নাড়লো বিদ্রুপে। দু পা বিছানায় তুলে দিয়ে শক্ত হাত খানা বাড়িয়ে একঝটকায় সরিয়ে ফেললো মেয়েটার গলার ওড়নাখানা। সেটার জায়গা হলো মেঝেতে। তমার গলা চিড়ে অসহায় একটা আ র্তনাদ বেরিয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত ভাজ করে আড়াল করার প্রচেষ্টা করলে নিজেকে। ডাগর ডাগর আখিজোড়া পূর্ণ হলো নোনাজলে। ইয়াজ ততক্ষণে হাত চালিয়ে নিজের শরীরটাও উ ন্মুক্ত করে ফেলেছে। তমাকে এক ধাক্কায় বিছানায় শু য়িয়ে ফেলতেই আচমকা খুট করে শব্দ হলো। ইয়াজ ভ্রু কুঁচকে পিছন দিকে তাকানোর আগেই, নিজের গর্দানে শীতল বস্তুর স্পর্শ অনূভব করলে। অভিজ্ঞতা বললো এটা একটা ধাতব পি’স্তল!
—’ নারী মায়ের জা’ত। বউ ছাড়া কোনো নারীকে গভীরে স্প’র্শ করার অধিকার ধর্ম বা আইন, কেউ-ই দেয়নি । মেয়েটার হাত ছাড়। নয়তো আমি তোর গর্দানে গু’লি ছেড়ে দেবো । ‘
না ঘুরে, ব্যাক্তিটাকে পরক্ষ ভাবে না দেখেই চিনে ফেললো ইয়াজ । বলাবাহুল্য, খানিকটা চমকালোও। দরজা লক করে এসেছে। বাইরে শত প্রহরীর পাহারা। যা ভেদ করে ভিতরে আসা দুঃসাধ্য। তবে নিজেকে সামলে নিলো দ্রুত। নিজের থাবা থেকে তমা কে মুক্ত করলে, সজোরে ধাক্কা দিয়ে। বাঁকা গলায় বললো,
—’ আচমকা নারী জাতির ওপর এতো সম্মান জাগ্রত হলো ! ‘
—’ আচমকা! আচমকা কেনো হবে। আমি বৈধ দম্পতির, বৈধ সন্তান । এতোটাও কুশিক্ষায় বড় করে নি তারা আমাকে। এবং খোদাকেও ভয় পাই। সুতরাং অন্যায়ের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় মোটেই। ‘
তমার অশ্রু সিক্ত মুখের দিকে শ’কুনের দৃষ্টি তাক করে বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নিজের ঠোঁটের নিম্নাংশে চেপে ধরলো ইয়াজ। গমগমে গলায় বলে উঠল,
—’ তা কবে থেকে এই নীতি নৈতিকতা জাগ্রত হলো? যে আমার খেয়ে, আমার পরে, আমার পিঠেই ছু’ড়ি মারতে হলো! তাও আমার ভিলার বাথরুমে লুকিয়ে থেকে! যে কামড়ায় কি-না আমারি শিকার কে আঁটকে রাখা । ‘
—’ আমার নীতি নৈতিকতা বরাবরই ছিলো। ‘
ইয়াজ ততক্ষণে ঘুরে তাকালো। একপেশে অস’ভ্য একটা হাসি দিয়ে বিছানা থেকে নেমেও দাড়ালো। শীতল নজর ফেলে দু চোখ টিপে কাটকাট গলায় বলে উঠল,
—’ মেয়েটাকে একা টে’স্ট করতে চাচ্ছিলাম। এখন মনে হলো আপনি থাকলে বিষয়টা জমবে ভালো। দু’জন মিলে খাবার ভাগাভাগি করে খেলে কেমন হয়, ইনস্পেকটর তাহমিদ কায়েস? ‘
তাহমিদের হাতের ব’ন্দুকটা তখনো ইয়াজের দিকেই তাক করা। কেনোকিছুর বিপরীতেই ডিসট্রাক হওয়া যাবে না। নজর সরানো যাবে না ইয়াজের ওপর থেকে। এক লহমার জন্য তমার দিকে চোরা চাওনি ফেলে বললো,
—’ উহু, নিজের রিজিকের বাইরে একফোঁটার ওপরও লো’ভ নেই আমার, মিস্টার মির্জা। আর যে নারী আমার জন্য এই মূহুর্তে হা’রাম, তার জন্য তো আরও নেই। ‘
চোখ সরু হয়ে এলো ইয়াজের। তাহমিদ কায়েসের এই রুপ সে যে আশা করেনি আদৌ, সেটা মুখে না বললেও ঠিক প্রকাশ পেয়ে গেলো। তমা সামলে নিয়েছে নিজেকে। গায়ের ওড়না জড়িয়ে ফেলেছে শরীরে। ফুপাচ্ছে এখনো। তাহমিদ গম্ভীর মুখে বললো,
—’ একজন পুলিশের হাতে অন স্পট ধরা পরেছেন। রে* প করতে গিয়ে । চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের রেশ মাত্র নেই! ‘
—’ নেই তো। কারণ আমার ডেরায় প্রবেশ যতটা সহজ বের হওয়া ততটাই অসম্ভব। কি লাভ অন স্পট ধরে ফেলে? এতো এতো প্রমাণ জোগাড় করে। যদি না, জানটা নিয়ে বাইরের বের হতে না পারেন! ‘
কথাটা বলতে বলতে নিজের কোমড়ের লুক প্যান্টটাকে খানিকটা টেনে ওপরের দিকে তুললো। তাহমিদের হাত তখনো তাক করা ইয়াজের দিকে। তমা গুটিগুটি পায় বিছানা ছেড়ে নেমে আশ্রয় নিয়েছে ঘরের কোণায়। তাহমিদ গম্ভীর গলায় বললো,
—’ পালানোর পথ পাবেন না আপনি আর। সারেন্ডার করুন৷ ‘
ইয়াজের চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো যেনো। কপট ভয়ের ছাপ আনলো চোখেমুখে। দু-হাত উচিয়ে সারেন্ডার্ড করার ভঙ্গি করলো। তাহমিদ সতর্কতার সাথে লোকটাকে ইশারা করলো দরজা খুলতে।
ইয়াজও শুনলো। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজার লকটা খুলে বাইরে বের হলো। সঙ্গে তাহমিদও। তবে এতটা সহজ নয় মোটেই। অন্ধকার ঘরে একসাথে জ্বলে উঠলো অনেক গুলো আলো। চোখ ধাঁধিয়ে উঠলো একপ্রকার। ইয়াজের পরিকল্পনা মাফিক সব। সজোরে চিবুক বরাবর আঘাত পরলো তাহমিদের। একই সাথে আরেকটা আঘার পেট বরাবর। আচমকা দরজা খুলেই এমন হওয়ায় হতচকিত ছেলেটা। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই আঘাতে আঘাত পরলো পুনরায়। হাতের অস্ত্রখানা একপ্রকার ছিটকেই গেলো হাত থেকে তবে তা মেঝেতে পরার শব্দ পাওয়া গেলো না। তার আগেই সেটা স্থান পেলো মির্জার হাতে। সদ্বুদ্ধি ফিরে পাওয়ার আগেই তৃতীয় বারের মতো আঘাত পরতেই হাঁটু ভেঙে পরলো ছেলেটা। আলো নিভলো তৎক্ষনাৎ। স্বাভাবিক বলো জ্বলে উঠলো গোটা ঘরে। ততক্ষণে সব তাহমিদের হাতের বাহিরে। ঠোঁট কেটে র ক্ত বের হচ্ছে। হাতজোড়া ঝুলে আছে৷ দৃষ্টি মেঝেতে। নড়াচড়া থমকে গেলো কপালের বাঁ পাশটায় বন্দুকের নল ঠেকতেই। হিসহিসিয়ে উঠলো ইয়াজ।
—’ এতোই সোজা! ক বছর চাকরির? এতোই দক্ষ অফিসার হয়ে গেছেন, ইনস্পেকটর? ইয়াজ মির্জার বাড়িতে এসে, তারই কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে, তাকে হাজতে নেবেন! এতো বড় স্বপ্ন দেখার সাহস কে দেখিয়েছে ? ঈশান আরশাদ দেওয়ান? ‘
ক্ষনিকের মধ্যে যা ঘটে গেলো তাতে কেউ যদি সবথেকে বেশি হতভম্ব হয়, তাহলে সেটা হলো তমা। তাহমিদ কায়েস যে বাথরুমে লুকিয়ে, সে সেটা জানতো বহু আগে থেকেই। তমাকে দর্শন দেওয়া বাথরুমের ওই ব্যাক্তি, আর কেউ নয়। তাহমিদ কায়েস। তবে এত সহজে সবটা ঘুরে ফিরে ইয়াজের হাতেই চলে যাবে এটা আন্দাজ করেনি সে । হুশ এলো তাহমিদের গো ঙানি তে। । লোকটাকে রীতিমতো ধরাশায়ী করে ফেলেছে ইয়াজ।
খুব একটা বেশিক্ষন এই নিস্তব্ধতা বজায় রইলো না। হিংস্র প্রানীর মতো একপ্রকার ওত পেতেই ছিলো যেনো এখানাকার প্রানীগুলো। খচখচ পায়ের আওয়াজ পেতেই ঘেউ ঘেউ করে উঠলো মানুষ রুপি কুকুর গুলো। ঈশানের হাতও চললো তৎক্ষনাৎ। কোনো কিছু না দেখেই, অন্ধকার চললো গু লি। তবে সে নিজে এগোলো না। উল্টো হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে এসে বাঁ হাতের বন্ধনে আগলে নিলো তিতির কে। ঈশানকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো অমিত আর সাজিদ। সঙ্গে তাদের লোকজন। ঈশান তিতিরের মাথাটা নিজের বুকের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাস্ত গলায় শুধালো,
—’ ভয় পেয়েছিস? ‘
—’ হুম। ‘
ঈশান মেয়েটাকে নিয়ে পিছিয়ে আসে। তারই এক লোককে উদ্দেশ্য করে বলে সঙ্গে আসতে।
—’ গাড়িতে বসবি। ও তোকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাবে। আমি এদিকটা সামলে নেবো, তিতির। ‘
নাকচ করলে মেয়েটস ঈশানের প্রস্তাব। গাঢ় গলায় বললো,
—’ তা কি করে হয়। আমি না গেলে…’
আশেপাশে তড়িৎ দৃষ্টি বুলায় ঈশান। নিস্তব্ধ পরিবেশ, উত্তপ্ত হয়েছে এখন। অন্ধকারও আর নেই। আলে জ্বালা হইছে বাড়িরটার আশেপাশের। তীব্র গু’লির শব্দে। কানে তালা লাগার দশা তিতিরের। চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিচ্ছে বারংবার। ঈশান মেয়েটার মাথায় হাত রাখলো। দ্রুত স্বরে বললে,
—’ আমার এতটাও দূর্দিন আসেনি। বউকে নিয়ে এরকম একটা জায়গায় যাবো। নিজের স্বার্থে। ‘
—’ শুধু আপনার স্বার্থে তো নয়।’
— পুরো দুনিয়ার স্বার্থে হলেও, আমি তোকে নিয়ো সওদা করতে পারবো না। যা বলছি শোন। তুই গাড়ি…’
কথা শেষ করতে পারলো না ঈশান তার আগেই শোঁ শোঁ করে কোথা থেকে একটা ছুড়ি এসে বিধলো তার পাশের গাছটাতে। দু’হাতে মুখ চেপে আ র্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। ঈশান এক জটকায় আড়াল করলো বউকে। হুংকার ছেড়ে সমানের ছেলেটাকে আদেশ করলো ওদিকে গু’লি ছুড়তে। এদিকে কয়েকজন আসছে, আক্রমনের উদ্দেশ্যে, সেটা টের পেতেই পিছু হটলো ঈশান। তিতির কে বুকে আগলে কোনো ধরনের রিস্ক নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। না হলে ওই চুনোপুঁটি গুলোকে জ’বাই করতে দু বার ভাবতো না সে। এদিকটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। খানিকটা খাদের মতো। শুকনো পাতা দিয়ে ভর্তি জায়গাটায়। তিতিরকে এখানে রেখে যাওয়ারও উপায় নেই তার। ওপরে যুদ্ধ চলছে একপ্রকারে। অদূরে গাড়িতে নিয়াজ আছে। তার াকছ অবধি মেয়ে টাকে পৌছে দিয়ে আসতে পারলে নিশ্চিন্ত হয় সে। নিয়াজ হয়তো শুনতে পারছে এই শব্দগুলো। তবে, তার করা আদেশ ছিলো বের না-হওয়ার। ঈশান হতাশ হয়ে তাকায় তার বুকের ওপর কুঁকড়িমুকড়ি ধরে থাকা তুলতুলে মেয়েটার দিকে। বাঁ হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে শার্টের আস্তিন।
—’ এতো কাছে আসিস না। সি ডিউস হচ্ছি। ‘
এ লোক বলে কি! এটা কি সি ডিউস হওয়ার বা করার সময়! তিতির দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ সব জায়গায় আপনার নখরা লেগেই থাকে। ‘
—’ তুই কাছে থাকলে সবসময় মুড আসে। ‘
—’ ফালতু৷ ‘
—’ ক্ষেপছিস কেনো! আশ্চর্য। ক্ষেপা তো আবার উচিত। গাড়িতে রেখে আসতে চাইলাম। রীতিমতো কসম কাটিয়ে সাথে আসলি। এখন দেখ, আসা মাত্র আঁটকে গেলাম। তুই না থাকলে এসব গো লাগুলির ধার ধারি আমি? ঈশান আরশাদ দেওয়ান না-কি শত্রুর ভয়ে খাদে লুকিয়ে আছে। ‘
তিতির অন্ধকারের ঘাড় উচুলো। বিরবির করে বললো,
—’ তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো? আপনি শুধু আমার পরোয়া করছেন। নিজের না। আপনি ওদের সামনে বুক পেতে লড়াই করতে পারছেন না, আমার জন্য। আমি না থাকলে ঠিকই নিজের জীবনের রিস্ক নিতেন? ‘
স্বীকার করলো ঈশান। ধীর গলায় বললো,
—’ নিতাম । ‘
—’ মৃ’ত্যুতে ভয় নেই?’
—’ আছে। তবে নিজের মৃ’ত্যুতে না। তোর। তোকে নিয়ে কোনো রিস্ক আমি নেবো না। সম্ভব নয়। তোকে হারিয়ে ফেলতে পারি, এমন কোনো পথে পা বাড়াবো না কখনো। ‘
তিতির আচমকা নাক টানলো। অন্ধকারেও কিছু না দেখে ঈশান টের পেলো মেয়েটা কাঁদছে। তিতির ঠোঁট ছোঁয়াল ঈশানের অ্যাডামস এপেলের ওপর। মিহি সুরে বললো,
—’ একই বিষয় আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমিও ভয় পাই মৃ’ত্যুতে। ভয় পাই আপনাকে হারিয়ে ফেলার। তাহলে? কি করে নিজে সুরক্ষিত বসে থেকে আপনাকে যেতে দিতাম। ‘
গো লাগুলির আওয়াজ কমে এসেছে। ঈশানের হাতের ছোট্ট যন্ত্রটায় ভেসে এলো অমিতের কাটকাট আওয়াজ। জানালো এদিকটা পরিষ্কার হয়েছে। ভিতরে যাওয়া যাবে এখন। ঈশান স্বস্তির শ্বাস ফেললো। মেয়েটার কোমড় চেপে দাঁড়িয়ে আলগোছে তুলে নিলো কোলে। নিজে খাদের নিচে দাঁড়িয়ে তিতিরকে বসালো ওপরে। এতক্ষণ মেয়েটার মুখ সামান্য দেখতে পাচ্ছে সে। অদূরের আলোতে। কোমল হাত দুটো নিজের কাঁধে তুলে দিয়ে বিরবির করে বললো,
—’ সঙ্গে নেবো। আগে চু’মু দে তাহলে। ‘
—’ চু’মু?’
—’ ইমোশনাল ডায়লগ দিয়ে সি ডিউস করে ফেলেছিস । হৃদপিণ্ড ধড়ফড়িয়ে উঠেছে। ‘
তিতির বিরক্ত হলো। এটা এই রঙঢঙের সময়। আর ইমোশনাল ডায়লগ মানে! ঘাড় বাকিয়ে পিছনে তাকালো মেয়েটা। সদর দরজার ওখানে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে অমিতসহ বাকিদের। ঈশানের অপেক্ষা করছে তারা। তিতির ছেলেটার দিকে ঝুঁকে তাকালো। ঠোঁট উল্টে বাঁকা গলায় বললো,
—’ উহু, শুধু চু’মু কেনো? বা’সর করতে চাই আপনার সাথে। কতদিন আপনাকে কাছে পাই না বলুন তো। চলুন বা’সর করি৷ একবার এদিকে ওদের গোলাগুলির শব্দে কাঁপবো। আরেকবার আপনার মাতাল স্পর্শে, ভালোবাসার তীব্র শিহরনে কাঁপবো। রাজি? বলুন রাজি ? ‘
ঠোঁট উল্টায় ঈশান। মেয়েটা যে বিরক্ত হয়ে, তাকে টিচ করতে বললো কথাগুলো, তা সে দিব্যি টের পেলো। তিতিরের কোমড় ছেড়ে লাফিয়ে উঠলো খাদ থেকে। বিরবির করে বললো,
—’ তোকে তো আমি বাড়ি ফিরে, খা’টে দেখে নেবো। এতো শখ, তখন যদি মুখ ফুটে না বলিস! দেখবো তখন। ‘
এক এক করে ভারি পায়ের শব্দ পাওয়া গেলো গোটা ঘরে। ইয়াজেরই লোক সবাই। তবে খুব বেশি মানুষ নয়। তিন জন মাত্র৷ তাদের মুখাবয়ব দেখে ভ্রু কোঁচকালো ইয়াজ।
—’ কি হয়েছে ? ‘
জর্ডান তোতলায় খানিকটা। তাহমিদ কে ইশারা করে তপ্ত গলায় বলে,
—’ এই শু’য়োরের বাচ্চা, ঈশান আরশাদের সাথে হাত মেলায় নি, বস। এটা তো আরেক খেলোয়াড়। ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে তিতির ম্যাডাম…’
জর্ডানের মুখে তিতির নামটা শুনতেই খিঁচে উঠলো ইয়াজ ।
—’ তিতির? ‘
—’ তিতির এই শু’য়োরের কবজায়। ‘
ইয়াজ ফ্যাকাসে মুখে গর্দান ঝুকিয়ে তাহমিদের দিকে তাকাতেই , তাহমিদ বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ঠোঁটের র ক্তটুকু মুছে ফেললো। ঠোঁট উল্টিয়ে ইয়াজকে কটাক্ষ করে বললো,
—’ এখন ? উপায় ? ‘
—’ তিতির তোর কাছে কি করে? ‘
তাহমিদ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। হাঁটুর ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
—’ উড়ে উড়ে এসেছে ! তোর কি তাতে? তুই তো মজামস্তিতে আছিসই। থাক। ওকে আমি নিয়ে… ‘
গর্জে উঠলো ইয়াজ। তাহমিদের কলার চেপে ধরতেই, তাহমিদও একই কাজ করলো । চূড়ান্ত গালি দিতে যাবে তার আগেই কান্নামাখা একটা মেয়েলি গলার মৃদু আওয়াজে চকিত পিছন ফিরলো ইয়াজ। মেয়েটার চোখমুখ ফুলে গিয়েছে। কেটে গিয়েছে ঠোঁ টের নিম্নাংশ। কন্ঠদেশের ভাজে যতটা দৃশ্যমান অসংখ্য ছোপ ছোপ দাগ। রুহ কাঁপলো ইয়াজের। মুখের কাঠিন্য কমে আসতেই, আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা৷ অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠলো,
—’ রাহাত ভাইইই…’
ইয়াজ মির্জার হাত আলগা হলো । তাহমিদ কে ছেড়ে নিজেও অসহায় গলায় ডেকে উঠলো,
—’ পরী-ই? ‘
তিতির অঝোরে কাঁদছে। ভয়ে কুঁকড়ে আছে, তা দেখেই বলে দেওয়া যায় এক লহমায়। ভয় পাবেই না কেনো। মেয়েটা কন্ঠদেশে জ্বলজ্বল করছে মাঝারি আকারের একটা ধাতব ছুড়ি! মেয়েটার দু’হাত পিছমোড়া করে শক্ত করে ধরে আছে সাথের লোকটা। তিতিরের মাথা গিয়ে ঠেকেছে লোকটার বুকে। পিছনে একে একে জড়ো হলো সাত থেকে আটজন পুরুষ। বলাবাহুল্য কারোর মুখ দেখা গেলো না। আপাদমস্তক কালো কাপড়ে মোড়ানো যেনো। তিতিরকে আঁটকে রাখা বলিষ্ঠ পুরষটি আরও খানিকটা সতর্ক। তারও তীক্ষ্ণ চোখজোড়া বাদে আর কিচ্ছু দেখাা যায় না। মেয়েটা থরথর করে কাপছে, ঘেমে নেয়ে বিধ্বস্ত অবস্থা। তাহমিদ বাঁকা হেসে দুরত্ব তৈরি করলো ইয়াজের সাথে। তমা আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসার আগেই তিতিরের গলার ছু ড়িটা আরও গাঢ় করলো লোকটা। তাহমিদ গম্ভীর গলায় আদেশ ছুড়লো তমা কে,
—’ খবরদার মিস নুসাইবা দেওয়ান। ঘরের চৌকাঠ পার হবেন না। বোনকে জ’বাই হওয়া দেখতে চান? আশ্চর্য! ‘
তমার চিৎকার পরোয়া না করে সজোরে দরজাটা বাইরে থেকে লক করলে তাহমিদ। ধীরেসুস্থে গিয়ে তিতিরের পাশে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,
—’ রাহাত? রাহাত টা আবার কে? কাকে ডাকলো মেয়েটা? আপানকে, মিস্টার ইমতিয়াজ মির্জা? ‘
ইয়াজের কাঁপা হাত ততক্ষণে ইশারা করেছে নিজের লোকদের দিকে । জর্ডান সহ আর বাদবাকি দু’জন লোক নিজেদের হাতের অ স্ত্র নামিয়ে সরে গেলো অন্যদিকে।
—’ ওকে কোথা থেকে নিয়ে এলি? ‘
—’ বললাম না? উড়ে চলে এসেছে পাখি। নিজ থেকে। আমি শুধু বন্দি করে ফেললাম। এই পাখিকে খাচাতেই মানায় । ‘
—’ রাহাত ভাইই…!’ তিতিরের আরেকদফা ভাঙাা গলার ডাকে অসহায় তাকালো ইয়াজ। ধারালো অ স্ত্রটা একদম ছুঁইছুঁই হয়ে আছে মেয়েটার নরম ত্বক। যেনো একটু এদিক-সেদিক হলেই সর্বনাশ টা ঘটেই যাবে । রাহাত ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ ওকে ছাড় । ওর সাথে কোনো লেনদেন নেই তোদের । আমারই ভুল । ওকে একা ওভাবে বাড়িতে রেখে আসা৷ ‘
বাঁকা হাসলো তাহমিদ। চোখেমুখে রাজ্যের প্রশ্ন এনে ভিড় করিয়ে চিন্তিত গলায় বললে,
—’ ওর সাথে তোর সাথ কি? ওটা তো ঈশান আরশাদ দেওয়ানের বউ। তুই হাঁপাচ্ছিস কেনো ওর জন্য। ‘
রাহাত তখন ভীষণ অসহায়। চোখ রক্তিম হয়ে এসেছে । দু কদম এগিয়ে যেতেই, তিতির কে নিয়ে লোকটা তিন কদম পিছিয়ে গেলো।
—’ আমার সাথে যা লেনদেন আছে মেটা । তোর হিসেব আমার সাথে। ওর সাথে না। আমার বাড়ির ঠিকানা কি করে পেলি তোরা? পরী-ই? ভয় পেয়ো না। আমি আছি তো। ‘
—’ আমার সাথে এই লোকটা…’
তিতির কথা বলতে পারে না, ফুপিয়ে ওঠে।
—’ কি করেছে? কে করেছে? কার কথা বলছো? কি করেছিস ওর সাথে? ‘
ব্যাতিব্যাস্ত রাহাত কথাগুলে আউরিয়ে গেলো তাহমিদের দিকে তাকিয়ে। তাহমিদ দু’হাত তুলে সারেন্ডার্ড এর ভঙ্গিতে বললো,
—’ আমি না, আমি না। আমার জন্য ওই নারী হারাম। আমার দ্বারা এসব নোং রামি সম্ভয় নয়। তবে সবাই তো আর আমার মতো ভদ্রলোক নয়। তোর মতো দু’ষ্টুও আছে। যেমন আমার ওই বন্ধুটা। ওর নাকি মনে হয়েছে তিতির ওর জন্য হালাল। মেয়েটা সত্যিই পরী মাশাআল্লাহ। তুলে নিয়ে এখানে আসার সময়, নিজেকে সামলাতে পারেনি। তাই একটু আধটু… ‘
হুংকার ছেড়ে উঠলো ইয়াজ ওরফে রাহাত। ক্ষিপ্ত হা য়নার ন্যার গর্জন ছুড়ে বললো,
—’ কি করেছিস ওর সাথে। জা নে মে রে ফেলবো। ‘
—’ আমারও সময় লাগবে না এক সেকেন্ড। তোর পরী টাকে, খোদার কাছে পাঠিয়ে দিতে। দেখ। তাকা ওদিকে। রিস্ক নিতে চাস? ‘
রাহাতের মস্তিষ্ক ফাঁকা হলো নিমেষেই। ক্ষনিকের জন্য ভুলে গেলো নিজের সব হিংস্রতা। তিতিরের আর্তনাদ বুকে এসে লাগলো।
—’ আমাকে…আমার সব… রাহাত ভাই। আমাকে বাঁচাআন।’
রাহাত ব্যাতিব্যাস্ত নজরে তাকালে তাহমিদের দিকে। কন্ঠস্বর কাঁপলোই সামান্য।
—’ ওকে দে আমার কাছে। তার বদলে কি চাস? ‘
—’ তোর স্বীকারোক্তি। ‘
—’ কিসের স্বীকারোক্তি? ‘
—’ তোর পা’পের। ‘
—’ সব হবে। আগে ওকে দে আমার কাছে। ‘
হাসলে তাহমিদ।
—’ আমাকে বোকা লাগে? পাখি ছেড়ে দিই। আর ফুড়ুৎ করে উড়ে যাক। ‘
—’ কি স্বীকারোক্তি বল। কিন্তু ওর গলা থেকে ছু ড়িটা সরা। ‘
—’ মেয়েগুলোকে কেনো মা’রলি? ‘
রাহাত অসহায় হয়ে তিতিরের দিকে তাকালো। মেয়েটারও ভ্রু কুঁচকে এসেছে।
—’ সে-সব স্বীকারোক্তি আমি থানায় গিয়ে দেবো। তিতির কে ছেড়ে দে। এরেস্ট কর আমাকে । ‘
হতভম্ব তিতির, জড়িয়ে আসা গলায় শুধালো,
—’ থানায় গিয়ে স্বীকারোক্তি দেবেন মানে? কিসের মেয়ে? কিসের খু ‘ন। ‘
ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো মেয়েটা। আচমকাই তিতিরকে আঁটকে রাখা লোকটা নিজের হাত আলগা করতেই তিতির এগিয়ে যেতে পা বাড়ালো। কেউ আটকালোও না। তবে বেশিদূর এগোতেও দেওয়া হলো না। মেয়েটা নিজেই বসে পরলো মেঝেতে। ফুঁপিয়ে উঠে বললো,
—’ আ..আ..আপনি আবার কি করেছেন? সবাই আপনারা…যাকেই বিশ্বাস করিই। আমার বিশ্বাস নিয়ে আপনারা…’
দু’হাতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। রাহাত তখন রক্তিম চোখে তাকিয়ে। হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এসে কোনো কৈফিয়ত দেবে,তাার আগেই ঝড়ের মতো তিতির একটা কাজ করে বসলো। মেঝেতে পরে থাকা রাহাতেরই হাতের পিস্তলখানা, বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে নিয়ে ঠেকালো নিজের কপালে। চোখমুখ শক্ত করে চ্যাঁচিয়ে উঠলো।
—’ আপনিও কি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন, রাহাত ভাই? ঈশান আরশাদ দেওয়ানের মতো, আপনিও ঠকালেন আমাকে…হ্যা? বলুন। ‘
ঘরভর্তি সবাই পাথর হয়ে গেলো। তাহমিদ এগিয়ে আসতে চাইলে তিতির চিৎকার করে আদশ ছুড়লো কাউকে তার দিকে এগিয়ে না আসতে। উদভ্রান্তের মতো এদিক-সেদিক করে উঠলো।
—’ রাহাত ভাই, আপনিও ঠকালেন আমাকে? বলুন সত্যিটা। আমার কসম। কি এ-সব। তমা এখনে কেনো? আমার বোনকে আপনি… কে আপনি? ওরা ইয়াজ বলে ডাকছিলো। রাহাত ডাকছিলো না। তা মানলাম। কিন্তু… কিন্তু আপনি ওই মেয়েগুলো কে… সত্যি টা বলবেন কি? আপনার মতো বিশ্বাস আমি বোধহয় এ জীবনে কাউকে করিনি। এতগুলো বছর, আপনিও মুখোশ পরে ছিলেন? বলবেন না? না-কি আমি কিন্তু স্যুট করবো নিজেকে। এতে মিথ্যা, ছলনা, বে ইমানি নিয়ে আর বাঁচতে চাই না আমি। ‘
—’ পরী-ই। একটাবার…’
—’ খবরদার কথা ঘোরাবেন না। বারবার ঠকতে পারবো না। বাপ মা নেই আমার। স্বামী একজন ক্রি মিনাল, সব হারিয়ে আপনার কাছে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। মনকে শান্ত করলাম বোঝালাম। শেষ অবধি আপনিও কি-না একই ভাবে? আমার বেঁচে থাকাট আর উদ্দেশ্য কি? শেষমেশ কার কাছে গিয়ে ঠাঁই নেবো? এ পৃথিবীতে কে আছে আর যাকে আমি চোখবুঁজে বিশ্বাস করবো? কেউ নেই, কেউ নেই। আপনারা সবাই আমাকে ব্যবহারই করে গেলেন। ‘
রাহাত এতক্ষণে ভেঙে পরলো একেবারে। তিতির ছটফট করে কাঁদছে। মেয়েটার হাতের নড়াচড়াও ভীষন ভয়ংকর। যেকোনো মূহুর্তে গু’লি ছুটে যাবে পিস্তলের। এমন ভাবে চেপে ধরে আছে। রাহাতও মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসে পরলো। ভাঙার গলায় বলে উঠলো,
—’ কি জানতে চাও তুমি পরী? কোন সত্যি? এই মেয়েগুলোকে আমি খু’ন করেছি কি-না? আমিও একের পর এক খু’ন করেছি কি-না? হ্যা। করেছি। আমি করেছি এই খুনগুলো। আমি রে’প করেছি মেয়েগুলোকে। আমি সব করেছি৷ ‘
তিতিরের কান্না আঁটকে এলো। বিধ্বস্ত মুখটা রাহাতের মুখের দিকে তাক করে হত-বিহবল হশে শুধালো,
—’ এতো পা’প কেনো? কিসের তাগিদে? শেষপর্যন্ত ধ’র্ষন? রাহাত ভাই? আপনি না আমাকে ভালোবাসি বলেছিলেন। সঅব মিথ্যা? ঠিক ঈশান আরশাদের মতো! ছিহ্ ‘
প্রথমটায় মেয়েটার আশ্চর্যতা, পর মূহুর্তেই মেয়েটার চোখের তীব্র ঘৃনায় দুমড়েমুচড়ে উঠলো ছেলেটা। কাতর গলায় বললো,
—’ তোমাকে ভালোবাসা মিথ্যা ছিলো না। ‘
—’ আজকে তমাকে এনেছিলেন কি একই কাজ করতে? ‘
চোখবুঁজে ওপর-নিচ মাথা ঝাকালো রাহাত। দু’ফোটা নোনাজল গড়িয়ে পরলো চোখ থেকে। তিতির বাকরুদ্ধ প্রাায়। ঘরের বাকিরাও স্তব্ধ। তমার দরজা খোলা হয়েছে। নিস্তব্ধ ঘরে শুধু দু’টো মানুষের প্রশ্নোত্তর চলছে।
—’ বিগত তিন বছরের ওই সবগুলে রে*প আপনার করা? ‘
—’ সব । ‘
—’ কেনো? ‘
—’ প্রতিশোধ নিতে। ‘
—কিসের?
—’ ঈশান আরশাদের ওপর।। আমার ভাইকে মা র্ডার করার। আমার গেটা পরিবার কে তছনছ করে ফেলার। ‘
—’ কে আপনার ভাই? আপনার শুধু একটা বোন…’
—’ রাকিন! যাকে মে রে ফেলেছিলো ঈশান। ‘
—’ সেই ভিডিওই কি আপনি আমাকে দেখালেন, ইয়াজ মির্জা সেজে?’
—’ হ্যা। ‘
—’ তাই আপনি এতগুলো মা র্ডার করে গেলেন? কি হেতুতে? মেয়েগুলোর কি দোষ?’
স্থির, রক্তবর্ণ চোখে তাকালো রাহাত । একতরফা কাকে ব্লেম করা যায় আজকে? তিতির তখনো নিজের কপাল থেকে ব ন্দুকটা সরায় নি। আর না তো কমেছে মেয়েটার ক্ষি’প্রতা। মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আরও কতগুলো অস্ত্র সমেত তিতিরের পিছনেই দাড়িয়ে আছে। সব দিকে বন্দি সে। মেয়েটার যা জেদ। হয়তো নিজে কিছু করে বসবে, আর তা না হলে ও-ই লোকগুলো। রাহাত দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
ঈশানের সাথে তার প্রথম একটা রেষারেষি হয় আজ থেকে বছর ছয়েক আগে। রাকিন কে নিয়েই। রাকিন তখন সবে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে সে। ভাইয়ের সাথে ব্যবসায় হাত লাগায় টুকটাক। কঠিন ভাবে মাদকাসক্ত।
যদিও একই গুণাবলি তাদের তিন ভাইবোনের মধ্যেই ছড়িয়েছে হালকা পাতলা। তবে সে নিজের ওপর কাবু রাখতে পারলেও, পারেনি রাকিন। মদ, জু’য়া, মেয়ে এসবেই মেতে থাকতো। আর না তো কেউ শাসন করতো। বলাবাহুল্য সে নিজেও করেনি। কখনো করেনি। একপর্যায়ে ২০১৯ সালের চাঞ্চল্যকর একটা ধ র্ষন মামলায় জড়িয়ে পরে রাকিন। একদম সরাসরি জড়িয়ে পরা যাকে বলে। ঘটনায় মূলহোতা যে আসলে সেই ছিলো। সেখান থেকে, তাকে বের করে আনে রাহাত। তবে সে ছেলে শুধরানোর নয়। একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে যেতো। আর সে-সব আড়াল করতো রাহাত। এবং সেই ঘটনার জের ধরেই এক বর্ষন মুখর রাতে রাকিনের লা’শ ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গায়। কে বা কারা মেরেছে সেটা জানা যায় বহু পরে। জনসম্মুখে সে বিষয় সরাসরি না আসলেও, রাহাত জেনেছে নিজ ক্ষমতা বলে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান!
যার হাতে খু’ন হয়েছে তার ভাই। জেদ চাপলো রাহাতের। কলিজার টুকরা ছোট ভাইকে হারিয়ে পাথর হলো। ছেলেকে হারিয়ে তার মা পাগলপ্রায়। পরপর স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিওর, সব মিলিয়ে সয্যাসায়ি হলো রাহাতের মা– রানি মির্জা। সাজানো গোছানো সংসার টা তাশের ঘরের মতো এলোমেলো হয়ে এলো। রাহাত নিজেও ফেরেশতা ছিলেন না কোনোকালেই। বরং আন্ডারগ্রাউন্ডের অ ন্ধকার জগতের সাথে তার ওঠাবসা। পরিবারের এমন দূর্দশায় হিং স্র হয়ে উঠলো সে। প্রথমে রুষাকে পাঠালো ঈশানের কাছে এবং সে নিজেকে তৈরি করলো দেওয়ান দের নির্বংশ করতে। প্রথম টার্গেট হিসেবে তার কাছে খবর এলে দেওয়ান বাড়ির ছোট মেয়ের কথা। যে কিনা সবথেকে সহজে বাগে আনা যায়। দেওয়ান দের থেকে এতদূরে থাকে! তবে মূল অঘটন টা ঘটলো আদতে সেখানেই। তিতির কে খু ন করতে গিয়ে, নিজেই খু ন হলো বলা যায়। একটা বাচ্চা মেয়ে। তখন সবে ক্লাস এইটে বোধহয়। তাকে দেখে মূহুর্তের মধ্যে পানি হয়ে গেলো সমস্ত হিং স্রতা। ভুললো নিজের লক্ষ। বদল করতে হলো পরিকল্পনা। হিংস্রতা ভুলে ভদ্র সমাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে মরিয়া হলো। সৃষ্টি হলো তার দুটো সত্তার। ইমতিয়াজ মির্জা থেকে কলুষিত বিহীন ডাকনাম রাহাত গিয়ে পরলো ভদ্র সমাজে। আর ইমতিয়াজ মির্জা থেকে ইয়াজ, পরেই রইলো তার অতীতে।
তৈরি করলে অন্য পরিকল্পনা। যার অংশ হলো নূরি । যেমন করে সে নিজের অস্তিত্ব, পরিবার তছনছ করেছে। তেমন করেই অস্থির হলো ঈশানকে তছনছ করতে। তবে ভাগ্যের পরিহাসে তিতির ঘুরেফিরে বৈধ হয়ে গেলো ঈশানের জন্যই। ভুললো রাহাত কে। যে নারীর জন্য নিজের প্রতিশোধও ভুলতে বসেছিলো, নিজে একটু একটু করে আবিষ্কার করছিলো ভদ্রভাবে। আচমকা সেই নারী শত্রুর ঘরনি হয়ে গেলো! হিংস্রতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তার। আর তারপর…
একদমে কথাগুলো আউরিয়ে থামলো রাহাত। মুখের আদল এখন বেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মেঝের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে গেলো সে। মনে হয় কথাগুলো বলতেই চাচ্ছিলো সে তিতির কে। বলেই শান্ত হয়েছে। না বলতে পারার আক্ষেপে পুড়ছিলো এতদিন। তবে রাহাত যতটা আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলে গেলো, উপস্থিত কারোর চোখেমুখেই বিন্দুমাত্র মায়া বা মমতা কোনোটাই জাগ্রত হলো না। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষরেই এরকম একজন জঘন্য রে’পিস্টের প্রতি মায়া হতে পারে না। সম্ভবই নয়। যার নিজের অন্ধকার জীবনের পাপের রেশ ধরে একরপর এক নারী বলি হয়েছে। ভাইকে না শুধরিয়ে প্রশ্রয় দিয়েছে। সেই রে’পিস্ট ভাই শাস্তি পাওয়ার পর–নিজে একই কাজ করে গিয়েছে। আর সবকিছুর মাঝে ছোট্ট করে ভালোবাসার দোহাই দিলে, সব পাপ মাফ!!! কোন যুক্তিতে । তিতির দাঁড়ালো। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ একজন মানুষ। নিজের, নিজের ভাইয়ের, বোনের, পরিবারের পাপ গুলোকে যেভাবে দুঃখ ভারাক্রান্ত মুখ করে, আবেগ মিশিয়ে বললেন– একমাত্র পাগলেই হু হা করে দুঃখ মানাবে আপনার সাথে। আমরা কেউ-ই নিশ্চয় সেটা নই? ‘
রাহাত এতক্ষণে মুখ তুললে। তিতির যে এখন বড্ড স্বাভাবিক সেটা তারও নজর এড়ালো না। নরম গলায় বললো,
—’ আমি যা করেছি আমার ভাইয়ের খু নের প্রতিশোধ নিতে করেছি। আর তারপরও…তারপর তোমাকে পেতে। ‘
আচমকা শব্দ করে হেসে ফেললো তিতির। ভ্রু জোড়া নাচিয়ে বললো,
—’ আমাকে পেতে সিরিয়াল কি লার হতে হতো? রে পিস্ট হতে হতো? আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। একের পর এক জঘন্য কাজ গুলো করে, শেষমেশ ঈশান কে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন। হতোও তাই। যদি আমি বিশ্বাস করতাম এগুলো। ঈশানের বিরুদ্ধে তীল তীল করে সব প্রমাণ জোগাড় করেছেন আপনি। নিজের কৃতকর্ম গুলো ওর বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছেন। বড্ড সুপরিকল্পিত ভাবে। ‘
কটেজের বাইরে থেকে সাইরেনন বেজে উঠলো শব্দ করে। ওপাশে জানালা ভেদ করে ঘরের ভিতরে এসে হুমড়ি খেয়ে পরলো লাল আলোকরশ্মি। তিতির সেদিকে একনজর তাক করে শান্ত গলায় বললো,
—’ সারেন্ডার্ড করুন ইমতিয়াজ মির্জা ওরফে রাহাত ওরফে ইয়াজ মির্জা! অফিসার, এরেস্ট করুন ওনাকে। ‘
রাহাতের বোধহয় খানিকক্ষণ সময়ই লাগলো বিষয়টা বুঝতে। তিতির কি ছলনা করছে তার সাথে! মানে এতক্ষণ, শুরুতে মেয়েটা যে আর্তনাদ করলো, সে-সব! রাহাত এক মূহুর্তের জন্য অন্য দুনিয়ায় পৌছে গেলো বুঝি। ঝড়ের গতিতে দুরত্ব ঘোচালো তিতিরের সাথে। মেয়েটার হাতের পি’স্তলখানা থাবা দিয়ে কেড়ে, চে’পে ধরলে গলা। পিস্তল ঠেকালো ঠিক কপালের মাঝ বরাবর। দাঁতে দাঁত পিষে পিস্তল টা এলোপাতাড়ি স্যুট করতেই একটা গুলি আলগোছে গিয়ে বিধলো তাহমিদের হাঁটুর ঠিক নিচে। আ র্তনাদ করে চেপে ধরলো জায়গাটা।
—’ আমার সাথে ছলনা? আমার সাথে? তাই তো ব…’
মুখের খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে তিতিরকে, রাহাতের বাধন থেকে সরিয়ে আনলো তিতিরের পেছনে থাকা কালো কাপড়ের মুখোশধারী পুরুষটা। রমনীর পাতলা দেহ টাকে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে লেপটে নিয়ে বজ্রহুংকার দিয়ে বললো,
—’ কাকে ছোঁয়ার সাহস করিস, ব্লা’ডি মাদারফা…ওউকাত বুঝে কাজ করা যায় না। তাইনা? ম রবি তো অবশ্যই, এতো ছটফট কিসের? ‘
মূহুর্তের মধ্যে মুখের সমানের আবরণ টা এক টানে সরিয়ে ফেললো ঈশান। কালো কাপড়ের আবরণ সরতেই, তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার পুরুষটার পুরো মুখাবয়ব স্পষ্ট হলো। ঘর্মাক্ত, ফর্শা মুখে কালো মুখোশের দাগ বসে গিয়েছে। তিতিরকে আলগোছে টেনে সরিয়ে ফেললো। আড়াল করলো নিজের। রাহাতের মুখোমুখি হয়ে বাঁকা গলায় বললো,
—’ রাহাত! দেখার অনেক ইচ্ছে ছিলো। মুখোমুখি হয়েই গেলাম..। ইয়াজ মির্জার এই ফেরেশতা ভার্সনের সাথে অবশেষে সাক্ষাৎ। ভাবা যায়? ‘
তাহমিদের ক্ষিপ্ত চেহারা তখনো ইয়াজে নিবদ্ধ। ছেলেটার পাশেই তমা। মেয়েটা একটানে নিজের ওড়ানার অংশ নিয়ে বেঁধে দিলে মানুষটার পায়ের অংশ।। রাহাত অট্টহাসিতে ফাটলো। পকেটে হাত গুঁজে এগিয়ে এলে।
—’ আমাকে এতো কাঁচা খেলোয়াড় লাগে? বেচে ফিরে পারবি মনে হয়? তোর অজান্তেই চেকমেট দিয়ে বসে আছি আমি৷ ‘
ঈশান বোধহয় বিরক্তই হলে। চোখেমুখে সেই ছাপ ফুটে উঠলে। বিদ্রুপের হাসি হাসলে। পিস্তলটা নিয়ে রাহাতের বুকের বাঁ পাশের আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো,
—’ তোর সাথে দাবা টা খেললাম কখন, যে তুই “চেকমেট ” বলে বসে আছিস ! আশ্চর্য!
খেললাম তো “পাশা “। জিতলাম আমি। তাকা এদিক ওদিক। তাহলে? এতো উড়াউড়ির ফায়দা কি হলো! পরলি তো মুখ থুবরে। এখন বল তো,পাশা খেলায় জিতলে শেষে কি বলে? কিল? তাইনা!’
রাহাত সে কথায় পাত্তা দিলো না। খুঁজলো তিতিরকে।।ঈশানের খানিকটা পেছনে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলো মেয়েটাকে। চুলগুলো উঁচু করে খোঁপা করা। উষ্কখুষ্ক যদিও। ঘর্মাক্ত মুখে লেপটে আছে বেবিহেয়ার গুলো। আজকে এই প্রথম ওয়েস্টার্ন পোষাকে রাহাত দেখলো তাকে। একটা ব্যাগি জিনস পরনে, আর ঢিলেঢালা হাঁটুর ওপর অবধি চেক শার্ট। গলায় স্কার্ফ প্যাচানো। একহাতে পি স্তল। ঈশান আরশাদের বউ বলে কথা! আজকাল বন্দুকও ধরতে শিখে গিয়েছে। আর সেই বোকাসোকা বাচ্চাটি নেই এ মেয়ে। ঈশানকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে তিতিরকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ এরকম ধোঁকা দেওয়া তো আগে পারতে না, পরীই? স্বামীর কাছ থেকে শিখেছো বুঝি? হুম। কি সুন্দর ভালোবাসা, বিয়ে এসবের নাটক করে আমাকে ইমোশনাল বানিয়ে সত্য টা বের করে নিলে! ‘
তিতির ভ্রু উচোলো। যেনো অযৌক্তিক কিছু শুনেছে ।
—’ কোনো এক সিনেমায়, একটা ডায়লগ ভীষন মনে ধরেছিলো জানেন তো ।
মার্দ বে’ইমানি কারে তো – মাস্টারমাইন্ড,
ওউরাত কারে তো – ধোঁকা?
তা আমি আপনাকে, ধোঁকা কোথায় দিলাম ? আপনার বানানো স্ক্রিপ্টে জাস্ট নিজের মতো অভিনয় করলাম, এটা এখন ধোঁকা হয়ে গেলো! ইশশশ, দ্যাটস্ নট ফেয়ার! ‘
—’ সাচ আ বি*চ । ‘
রাহাত তিতিরকে গালি দিয়ে উঠলো আচমকাই। সজোরে পিস্তলের পিছন অংশ দিয়ে আঘাত পরলো রাহাতের মুখে। একপ্রকার থেঁ’তলে গেলো বোধহয় নাকটা। তিরতির করে তাজা র’ক্ত ছুঁটলে ছেলেটার নাক গড়িয়ে। ঈশানের আক্রমণ এতে টাই জোরে ছিলো যে, ব্যালেন্স রাখতে পারলো না সে। পিঠ গিয়ে ঠেকলো দেয়ালে।
—’ কোর্ট অবধি পৌছানোর সময়ও চাস না, নাকি? এখনি মরার চু’লকানি উঠেছে? ‘
—’ তুই নিজেই তো একটা খু নি, ঈশান। আমাকে কোর্ট ,জেল, আইনের ভয় দেখাস। ‘
ঈশান হাসলো। আশেপাশের উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বললে,
—’ আমাকে কে জেলে নেবে? এরা? পারবে? সে ক্ষমতা আছে ওদের? থাকলে আমি এখন জেলে না থেকে তোর সামনে কি করি? আমাকে না রে’প কেসে সয়ং তাহমিদ কায়েস এরেস্ট করেছিলো। তোর মতো জ্যোতিষিও আমারও টিকির নাগাল পেলো না! আমার আইডেনটিটি পেলো না! ছ্যাহ্! ‘
রাহাত মুখ খোলার আগেই মুখ খুললো তাহমিদ। বেচারা তখনো পা ছড়িয়ে মেঝেতে। পাশেই তমা। ঘরের নাটক শেষ না-হওয়া পর্যন্ত তার দিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই বোধহয়। ওদিকে তার সিনিয়র রা সবাই ঈশানের ওপাশে দাড়িয়ে। সয়ং এএসপি সাজিদ তালুকদার যেখানে একটি বাক্যও ব্যায় করছে না। সেখানে সে কি বলবে এখন। অসহায় গলায় ঈশানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ স্যার, হাসপাতালে নিন আমাকে । পুলিশের পাশাপাশি ভালো অভিনেতা হতে পারি। কিন্তু সুপার পাওয়ার নেই। যে রক্ত বের হচ্ছে। আপনার বোনের ওড়না তো বাঁধ মানছে না। আমি মরলে একটা গু নি মানুষ হারিয়ে ফেলবেন বলে দিলাম। আমার মতো অভিনেতা এ দেশে আর পুনরায় জন্মাবে না। নাকি আপনার বউয়ের জন্য বিয়ের সম্মন্ধ নিয়ে গেছিলাম জন্য, প্র তিশোধ নিচ্ছেন? ‘
ঈশান সেদিকে পাত্তা দেয় না। গুলিটা পাশ কেটে বেড়িয়ে গিয়েছে । রক্ত পরাও থেমেছে। নাটকে সেরাহ ছেলেটা। নিজের হাতের ছোট্ট একটা ডিভাইস সাজিদের হাতে গুঁজে দিতে দিতে একদম প্রফেশনাল গলায় বললো,
—’ এটা হেফাজতে রাখুন। আর তাহমিদ কে নিয়ে, তমা আর তিতির কে সমেত বেরিয়ে যান আপনারা। একে আমি নিয়ে আসছি। ‘
সাজিদ যেনো অনুগত। মাথা ঝাকালো তৎক্ষণাৎ। আর বন্ধু নেই। অন ডিউটিতে এখন। ঈশানের হাত থেকে ডিভাইসটা নিলো। রাহাত ভ্রু কুঁচকে আছে । তাহমিদ, সাজিদ সহ সবার এতো অতি বিনয়, আপনি আজ্ঞায় ভাবুকই হলো। তাহমিদের নজরে পরলো সেটা। ব্যাথায় জর্জরিত পা নিয়ে বিতৃষ্ণা মাখা গলায় বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৮ (২)
—’ তোর বাপ ওইটা । তারে এতো তোয়াজ করতেছি জন্য হ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে! চালাক মনে করছিলাম। সিরিয়াল কি’লার যেহেতু।। এ তো দেখি আস্ত আহাম্মক। যার পিছনে যুগ ধরে হাত ধুয়ে পরে আছিস, তার আইডেন্টিটি জানিস না? আইনরে আইন চেনায়! চেনোস এইটা কে? ‘
