Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ৪

যেই তুমি এলে পর্ব ৪

যেই তুমি এলে পর্ব ৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

তিমিরবিদারীর আগমনে আলোক উজ্জ্বল ধরিত্রী। অম্বর জুড়ে ছোটাছুটি করছে শুভ্র মেঘমালারা। সেই ছুটন্ত মেঘমালা দের মতোই আনন্দরা ছুটাছুটি করছে মির্জা নিবাস জুড়ে। সকলেই তখন বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। কৃশান হুমায়রা তখন বিছানায় শয়নরত। হুমায়রা ঘুমে মগ্ন আর কৃশান ক্লান্ত চোখে তার আদরের কন্যাকে দেখছে। কাইফার চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রুকণা পড়ছে। মাত্রই হসপিটাল থেকে বাবাকে নিয়ে বাড়ির সবার সাথে বাসায় ফিরেছে সে। ওর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সবার কাছে খুলে বলেছে রিক্তর আন্টি। সবকিছু শুনে প্রত্যেকে পারেন না তাকে মাথায় তুলে রাখেন। সে কি শুকরিয়া তাদের! রিক্তর আন্টি ঋষিতা আহমেদকে বারবার বলেছে আজকের দিনটা মির্জা নিবাসে কাটিয়ে যেতে, নয়তো খাওয়া দাওয়া করে বাসায় ফিরতে। তবে ভদ্রমহিলা কোনোকিছু তেই আগ্রহ দেখান নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই নিজ গন্তব্যে রওনা হন তিনি। কারো কোনো আবদারে কান দেন না। পুরোটা সময় কাইফা একেবারে নিশ্চুপ ছিল। তখনকার পুরোটা সময় কাইফা নিশ্চুপ ছিল কেবল অশ্রুসিক্ত নয়নে দেখে যাচ্ছিল নিজের বাবা- মাকে। কৃশান মেয়েকে অনবরত চোখের পানি বিসর্জন দিতে দেখে এই নিয়ে তৃতীয় বার ক্লান্ত গলায় বলল,

“ বাবা ঠিক আছি তো আম্মু! কান্না থামাও তুমি।”
কৃশানের ক্লান্ত কণ্ঠটা শুনতেই কাইফার বুক আরও ভারী হয়। তবুও বাবার কথায় নিজেকে ধাতস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে চোখ মুছে। পরপর নাছিমা বেগমকে শুধায়,
“ দাদি আম্মুর ঘুম ভাঙবে কখন? ”
“ ভেঙে যাবে একটু পরেই। চিন্তা করোনা ঘুম থেকে উঠে তোমাকে দেখলেই তোমার আম্মু ঠিক হয়ে যাবে। ”
পৃষ্ঠে চুপ রয় মানবী। এর মাঝেই শুনতে পায় ফুপির আদুরে কণ্ঠ,
“ এখন তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও আম্মু। ”
ইকরার সাথে তাল মিলিয়ে কৃশানও বলল,
“ হ্যাঁ বাবা, যাও ফ্রেশ হয়ে অসো তুমি। ”
“ সমস্যা নেই বাবা আমি এভাবেই ঠিক আছি।”
“ কই ঠিক আছিস তুই? যা গিয়ে ফ্রেশ হো তাড়াতাড়ি। হুমায়রা উঠলে দাদি তোকে ডাক দেব। এখন যা তুই। ”
জোর গলায় বললেন ইয়াসমিন বেগম। এবেলায় আর দ্বিরুক্তি করল না কাইফা। এক পল মায়ের মুখপানে চেয়ে কক্ষ ছাড়ল।

নিজের কক্ষে পা রাখতেই মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি খুঁজে পেল কাইফা। বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল সে। তবে চোখ বন্ধ করতেই মানস্পটে ভেসে উঠল একটা অপ্রত্যাশিত পুরুষালী কায়া। ফর্সা আদলের এক গুরুগম্ভীর সত্তা। যার সাথে গতকাল রাতেই দুনিয়ার সবচেয়ে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে কাইফা। যে সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই। কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কেবল চিরকাল এটি কাইফার জীবনে এক ভয়ানক অতীত হয়ে থাকবে। আচ্ছা ও কি ওর পরিবার থেকে এতবড় কথাটা লুকিয়ে রাখবে? বুঝ হওয়ার পর মায়ের কাছ থেকে কোনো কথাই লুকাতে শেখেনি সে। কিন্তু এ কথা কীভাবে বলবে? যখন প্রশ্ন আসবে- তোর স্বামী কোথায়? তখন কি উত্তর দিবে? আর সবচেয়ে ভয়ানক সত্য টাই বা কিভাবে বলবে যে, যার সাথে তার বিয়ে হয়েছে সে একজন নারী পাচারকারী! আদৌ কি এসব বলা সম্ভব?
পরক্ষণেই মেয়েটা ভাবে, যেখানে সম্পর্কটার কোনো অস্তিত্বই নেই সেখানে এসব বলেই বা কি কাজ? রিক্ত তো বলেই দিয়েছে এসব ভুলে যেতে। হ্যাঁ, কাইফা নিজেও ভুলতে চায় সবকিছু। মনে রাখতে চায়না এই জঘন্য ঘটনা। সময়ের অন্তরে অন্তর থেকে মুছে ফেলতে চায় ঐ ঘৃণীত লোকটাকে।

কাইফা ফ্রেশ হওয়ার মাঝেই ওর রুমে প্রবেশ করল হুমায়রা। ডাকতে লাগল অনবরত। মায়ের ব্যাকুল কণ্ঠে রমণী তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো। ওমনিই ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল হুমায়রা। ভাঙা গলায় উচ্চারণ করল,
“ মা আমার! কোথায় ছিলি তুই? আম্মু আরেকটু হলে পাগল হয়ে যেতাম। ”
মায়ের অবস্থা দেখে গলা ধরে আসে কাইফার। ওভাবেই থেমে থেমে জবাব দেয়,
“ আমি চলে এসেছি তো আম্মু। তুমি আর কেঁদো না! ”
জননীর অশ্রুরা থামে না। ঠিক কতক্ষণ মেয়েকে ধরে কাঁদতে থাকে জানা নেই। একটা সময় গিয়ে কান্নার গতি কমে আসে তার। মেয়ের মুখশ্রীতে অসংখ্য স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে আদুরে গলায় শুধায়,
“ কোথায় চলে গিয়েছিলি তুই? ”
কাইফা মাকে ধরে এনে প্রথমে বেডে বসায়। পরপর সময় নিয়ে রিক্তর আন্টির শেখানো মিথ্যাটাই বলে। জননীর সামনে মিথ্যা শব্দগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে কেমন যেন বুক কাঁপে রমণীর। তবে নিজেকে সামলে নেয়। সবটা শুনে প্রথমেই ঋষিতা বেগমকে খুঁজে হুমায়রা। পরক্ষণেই তার চলে যাওয়ার কথা বেশ আফসোস করে। এর মাঝেই নাজমিন বেগম সকলের উদ্দেশ্যে খাওয়ার জন্য হাঁক ছাড়েন। গতকাল থেকে এই অব্দি কেউ কিচ্ছুটি মুখে তুলেনি। অতএব সবাই খাওয়ার পর্বে যোগ দিতে চলে যায়।

পরদিন,
হুমায়রা আজ কৃশানের উপর বেশ চটে আছে। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে সেই সকালে যে মানুষটা কোথায় বেরিয়েছে বাড়ি ফিরেছে এই মাত্র অর্থাৎ একেবারে বিকেল করে। এর মাঝে একটি বারও ফোন কল করার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর নাতো তার কল ধরেছে। যতবার কল করেছে ততবারই নাম্বার বন্ধ পেয়েছে। যাওযার সময়ও তেমন কিছুই বলে যায়নি। শুধু বলে গিয়েছে- আমি একটু বেরোচ্ছি আসতে লেইট হতে পারে। হুমায়রা তখন রান্নায় ব্যাস্ত থাকায় এতটা ঘাটে নি। কেবল ব্যাস্ত গলায় জবাব দিয়েছিল- সাবধানে যাবেন। অতঃপর আর কোনো কথা হয়নি তাদের। তবে রান্না বান্নার কাজ শেষ করে মেয়েটা যখন কৃশানের নাম্বারে কল লাগাল ওমনিই নাম্বার সুইচ অফ বলাতে রমণীর মন ছটফট করে উঠল। লাগাতার কল ট্রাই করতে লাগল সে। প্রতিবার একই ফলাফল পেয়ে মেয়েটার স্ত্রী সত্তা তো ব্যাকুল! চিন্তায় দুপুরের খাবার অব্দি খায়নি।

অন্যদিকে কৃশান পুরো শপিং এর স্তূপ নিয়ে উচ্ছ্বাসিত হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ড্রয়িং রুমে বসে যার যার শপিং তার তার হাতে তুলে দিচ্ছে সে । কাইফার জন্য আলাদা স্মার্ট ফোন এনেছে। এতদিন কাইফা তার দাদির একটা পুরোনো, ভাদাইম্যা মোবাইল ইউজ করত। আজ নতুন ফোন পেয়ে তার কি খুশি! মেয়ের উৎফুল্ল মুখ দেখতেই ব্যস্ত কৃশান মির্জা। অথচ তার বউ যে কখন রেগে মেগে স্থান ত্যাগ করেছে সেদিকে খেয়ালই নেই।
হুমায়রা পরণের শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে বিছানা ঝাড়ছিল তখনি ড্রয়িং রুমের পর্ব শেষ করে নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করল কৃশান। প্রবেশ করে প্রথমেই স্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হালকা গলা খাঁকারি দিল। তবে পরিচিত নারীকায়া একেবারেই লাপাত্তা। শুধু হাতে থাকা ঝাঁটায় তুলনামূলক বেশি জোর প্রয়োগ করল সে। যেন ঝাঁটার শব্দের মাধ্যমেই রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কৃশান কিয়ৎক্ষণ পূর্ণ দৃষ্টিতে স্ত্রীকে পরখ করল। পরপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ডাকল,
“ এই হুজুরনী? ”
পরিচিত সম্বোধনের পৃষ্ঠে কোনোরূপ সাড়া পাওয়া গেল না। কৃশান বুঝতে পারল রাগের মাত্রা বেশ উঁচুতে পৌঁছেছে। সে ফের অন্য সম্বোধনে ডেকে উঠল,
“ এই কাইফার আম্মু? ”
“ …… ”
“ এই প্রাণপাখি? ”
“ ….. ”
“ এই বউ?

পরপর চারবার ডেকেও স্ত্রীর উত্তর পেতে ব্যর্থ হলো কৃশান। এবেলায় এসে হাতের শপিং টা বিছানায় রেখে ধপাস করে শুয়ে পড়ল সে। ঝাড়ার মাঝে মানুষটার এহেন কান্ডে মেজাজ আরো বিগড়ে গেল হুমায়রার। কিছুক্ষণ নাকের পাটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গটগট পায়ে চলে যেতে উদ্যত হলো রমণী। ওমনিই ওর পেলব হাত খানা খপ করে ধরে ফেলল মানব। হুট করেই বলে উঠল,
“ আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ
এতো ডাকি তবু কথা, কও না কেন বউ? ”
হুমায়রা চোখ ছোট ছোট করে ফিরে তাকাল। তেতে ওঠে বলল,
“ হাত ছাড়ুন আমা…! ”
মেয়েটা কথা শেষ করতে পারল না এর আগেই হাত ছাড়ার বদলে উল্টো হ্যাঁচকা টানে তাকে একেবারে নিজের বুকের উপর ফেলল কৃশান। হুমায়রার হতভম্ব হলো। চোখ বড় বড় করে রাগী গলায় শুধাল,

“ এইগুলো কি ধরনের অসভ্যতা? ”
“ স্যরি, মার্কেট যাওযার পরপরই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই তোমায় কল দিতে পারিনি। ”
“ আশেপাশের কারো থেকে ফোন নিয়ে একটু কল করা যেত না? ঘরে যে কেউ আপনার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে সেদিকে ধ্যান ছিল না আপনার? ”
কৃশান কিছুক্ষণ মনযোগ সহকারে হুমায়রার খিটখিটে সত্তাটাকে পর্যবেক্ষণ করল। ওর ক্ষণে ক্ষণে ফুলে ওঠা নাগের ডগা দেখে মনে হচ্ছে ঠিক যেন যৌবনের সেই সপ্তদশী, বয়সের ছাপ ওর চেহারায় মোটেও প্রভাব ফেলেনি। উল্টো পূর্বের সেই রোগা পাতলা শরীরের গড়ন পাল্টে রমণী যেন হালকা ভারী শরীরে আরেক নতুন রূপ ধারণ করেছে। যেই রূপে কৃশান এখনো বাড়াবাড়ি রকমের ঘায়েল হয়। সে অকস্মাৎ স্ত্রীর নাগের ডগা টেনে দিয়ে বলে,
“ এমনটা আর হবে না। এরপর এই অধম সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রথমে তোমার ব্যাকুলতাকে নিঃশেষ করবে ওকে? যাই হোক, রাগলে তোমাকে কিন্তু গরজিয়াস লেভেলের সুন্দর লাগে বউ! ”

স্বামীর শেষ কথায় না চাইতেও লজ্জারা গ্রাস করে হুমায়রাকে। এতো বছর হয়ে গিয়েছে অথচ ওর অনুভূতি যেন সেই পূর্বের মতোই। আজও মানুষটার লাগামহীন কথাবার্তায় লালিত হয় রমণীর কপোল। আর কৃশান ওর এই দিকটা বেশ মজা নিয়ে উপভোগ করে। স্ত্রীকে কাবু করতে ইচ্ছে করেই মাঝেমধ্যে এমন লাগাম ছাড়া কথাবার্তা বলে।
“ ধেৎ, কিসব বলছেন? বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন এখন অন্তত এসব নির্লজ্জ কথাবার্তা বাদ দিন বখাটে পুরুষ! ”
কৃশানের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে অতিষ্ট গলায় বলল রমণী। অথচ বিপরীতে মানুষটা তাকে আরো শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। গভীর গলায় বলল,

“ বুড়ো আর হলাম কই? আজো বউয়ের এই ভুবনময়ী রূপ দেখে আমি আর আমাতে নাহি রই! ”
“ ধুর, ছাড়ুন তো আমাকে! কিছুদিন পর মেয়ে বিয়ে দিবেন অথচ আপনার মুখে এখনো কিসব লাগামহীন কথাবার্তা! ”
“ হুম আসলেই তো, এটা তো ভেবে দেখি নি? তাহলে তো আরেকটা ছোট্ট দেশি টমেটো চাষের ব্যবস্থা করা দরকার! কি বলো বউ? ”
“ ইয়া আল্লাহ! আপনি থামবেন কাইফার আব্বু?”
ওর অবস্থা দেখে শব্দ করে হেসে ফেলে কৃশান। হুমায়রাও মাথা নুইয়ে হাসল। মুখ গুঁজল মানুষটার বুকে। পরক্ষণেই ভাবল কৃশানের বলা শেষ কথাটা নিয়ে। কাইফা হওয়ার পর আজকেই প্রথম সন্তানের কথা বলেছে কৃশান। যদিও সেটা সম্পূর্ণই মজার ছলে। তবে এর আগে কোনোদিনই দ্বিতীয় সন্তানের কথা মুখে আনেনি সে। উল্টো বাড়ির সবাই বললেও সে সবসময় এড়িয়ে চলেছে। কেননা কাইফা হওয়ার সময় হুমায়রার অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। যেই ভয় থেকে কৃশান আর সন্তানের কথা মাথাতেই আনেনি। কেউ সন্তানের কথা বললেই কাটকাট গলায় বলেছে- “ আমার অংশ হিসেবে আমার একমাত্র মেয়েই যথেষ্ট। আর কোনো অংশ আনতে গিয়ে আমার পরিপূর্ণ আমিটাকেই হারাতে চাইনা আমি! ”

ঢাকা গুলশান, রাস্তার মোড় ঘুরতেই চোখে পড়ে সারি সারি সুউচ্চ অট্টালিকা। গুলশানের এই বাড়িগুলো যেন একেকটা ছোটখাটো দুর্গ। আধুনিক কাঁচের দেয়াল আর সাদা মার্বেলের কারুকাজে ঘেরা প্রতিটি বাড়ির সামনেই সুনিপুণভাবে ছাঁটা বাগানের সবুজ ঘাস। তেমনি একটি বাড়ি হলো “আহমেদ নিবাস” গুলশানের অন্যান্য সুসজ্জিত অট্টালিকাগুলোর চেয়ে এই বাড়িটি যেন কিছুটা আলাদা, একটু বেশিই নিস্তব্ধ। বাড়িটির গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর দারোয়ানদের উপস্থিতিই যেন জানান দেয়, এখানে বাইরের পৃথিবীর কোলাহল প্রবেশাধিকার পায় না।
পেশীবহুল হাতে থাকা চুনোপুঁটির ন্যায় ছোট্ট সিগারেট টা বারান্দা দিয়ে ফেলে, নিজের ঘুটঘুটে অন্ধকার কামরায় প্রবেশ করল রিক্ত। পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করল। ওমনিই মোবাইলের কভারের সাথে আটকে গিয়ে কিছু একটা মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মৃদু মন্দ ঝুনঝুন শব্দে মুখরিত হলো নিস্তব্ধ কামরা। সাথে সাথেই মানবের দৃষ্টি পৌঁছাল মেঝেতে। পিংক কালারের পার্ল দ্বারা নিখুঁতভাবে তৈরি একটি ডেকোরেটিভ ফ্লাওয়ার হিজাব পিন জ্বলজ্বল করছে সেথায়। রিক্ত কিয়ৎক্ষণ বস্তুটিকে নিখুঁত দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করল। অতঃপর ঝিম করা দেহটা ঝুঁকিয়ে হাতে নিল বস্তুটি। মনে পড়ল বিকেলের ঘটনা।
আজ বিকেলে তার ফুপি ঋষিতা আহমেদ এই বস্তুটি নিয়ে এখানে তার নিকট এসেছিল। রিক্তকে গতকালই কল করে বলেছিল তার সাথে দেখা করে আসতে। তবে সে যায়নি। অগত্যা আজ তিনি নিজেই এসেছেন। এসেই বস্তুটি রিক্তর হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। গতকাল গাড়িতে নাকি এটা ফেলে গিয়েছিল কাইফা। ছেলেটা কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে বস্তুটির দিক তাকিয়ে থাকে পরপর অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলতে নেয়। কিন্তু বাঁধা দেন ঋষিতা আহমেদ। তিনি যেতে যেতে ভাইপোর উদ্দেশ্যে বলে যান,

“ বউ তো রাখতে পারলে না। বউয়ের একটা স্মৃতি অন্তত সাথে রাখো! ”
ঋষিতা আহমেদের কথাটুকু মনে পড়তেই তাচ্ছিল্য হাসি ফুটল মানবের পুরু ঠোঁটে। অন্ধকার কক্ষে সেই হাসি বড্ডো অদ্ভুতুড়ে মনে হলো। সে হুট করেই বস্তুটির দিক তাকিয়ে বলে উঠল,
“ বউয়ের স্মৃতি? হোয়াট আ ননসেন্স থিং! ইউ নো রিক্ত- বউ সংসার দ্যাট’স নট ইউর ওয়ার্ড! এসবের জন্য তোমার জন্ম হয়নি তোমার জন্ম হয়েছে এসব ধ্বংসের জন্য….! ”

যেই তুমি এলে পর্ব ৩

রিক্ত হিজাব পিনটার প্রতি তীব্র অনিহা প্রকাশ করে। তবে কেন যেন সেটাকে ফেলতে পারেনা। বরং হুট করেই ফোনের কভার খুলে কভারের নিচে পিনটা সযত্নে রেখে দেয়। অতঃপর মোবাইলের পিনের মতোই কাইফার হিজাব পিনটাও সর্বক্ষণ তার সাথে থেকে যায়।

যেই তুমি এলে পর্ব ৫