ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৭
মারিয়াম ফুল
উপস্থিত মানুষজন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। অ্যাম্বুলেন্সের বিদায়ী সাইরেনের করুণ রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতে না যেতেই সাইরেন বাজিয়ে আসা তিনটি পুলিশের গাড়ি হঠাৎ করে পুরো সায়েদ বাড়িকে ঘিরে ফেলল। একের পর এক গাড়ি এসে থামতেই চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী ও থমথমে হয়ে উঠল। এমন সময়ে পুলিশের এভাবে হঠাৎ এসে পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলার দৃশ্য কারও কল্পনাতেও ছিল না। উপস্থিত সবার চোখে-মুখে একসঙ্গে ফুটে উঠল বিস্ময় , অজানা আশঙ্কা।
মাশফি চোখের কোণ মুছে ধীরে ধীরে সচকিত হয়ে সামনে এগিয়ে গেল। তার দৃষ্টি বারবার পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যের দিকে চলে যাচ্ছিল। অন্যদিকে মির্জা তখনও জানাজার খাটিয়ার শূন্য স্থানটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। চারপাশে কী ঘটছে, সেদিকে যেন তার কোনো খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ পুলিশের ভারী বুটের শব্দ কানে আসতেই সে চমকে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল সামনের দিকে। তার চোখেমুখে তখনও শোকের ভার, তবে সেই ভারের আড়ালে পুলিশের আকস্মিক উপস্থিতি নিয়ে এক অজানা প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন একজন বেশ জাঁদরেল চেহারার পুলিশ অফিসার। তার কাঁধে জ্বলজ্বল করছে এএসপি পদমর্যাদার ব্যাজ। দৃঢ়পদক্ষেপে তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে আঙিনার ঠিক মাঝখানে দাঁড়ালেন। তার উপস্থিতিতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি। এরপর গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“সায়েদ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কে কে আছেন এখানে?”
মেহের এতক্ষণ এক পাশে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসে ছিল… বেশ শান্তভাবেই। হঠাৎ পুলিশের বহর আর অফিসারদের দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সে। চোখের কোণে জমাট বাঁধা জলটুকু হাত দিয়ে মুছে নিয়ে নিজের পরনের ওড়নাটা আরও একটু ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল। নূর পুলিশ-কাছারি এসব ঝামেলা সবসময় খুব ভয় পায়। তার কোলের ছোট ছেলেটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে ঘুমন্ত ছেলেকে বুকে চেপে ধরে গুটিগুটি পায়ে এসে মেহেরের আড়ালে, ঠিক পেছনে দাঁড়াল।
ওপরতলায় এমন সময় মেহেরের ছেলের ঘুম ভেঙে গেছে।
সিলেটে আসার পর থেকে মেহের ছেলেকে সময় দিতে পারেনি। নিষ্পাপ প্রাণটা সারাদিন কখনো রুদ্রের কোলে, তো কখনো রেহানা চৌধুরীর কোলে জুড়ে ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম ভাঙার পর থেকেই ছেলেটা চিৎকার করে কান্না করছে। বিছানার পাশে বসে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল রুদ্র, নিজেই বুঝতে পারেনি। বিছানা জুড়ে থাকা ছেলেটা হঠাৎ ছোট্ট ঠোঁট দুটো উল্টে কান্না জুড়ে দিতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটাকে কোলে তুলে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।
— এই যে, বাবা! কাঁদছ কেন? ঘুম শেষ?
নিষ্পাপ প্রাণটা বাবার বুকের কাছে মুখ গুঁজে উয়া উয়া শব্দ তুলে কাঁদতেই থাকল। ছোট্ট শরীরটা কেঁপে উঠছে কান্নায়। রুদ্র মৃদু হাতে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবারও বলল, — আচ্ছা, আচ্ছা… বাবা তো আছি। কাঁদতে হবে না। এই যে, মায়ের কাছে যাচ্ছি, নিয়ে।
ছেলের কান্নার তোড় আরও একটু বাড়ে। সে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ছোট্ট হাত দুটো মুখের ভেতর পুরে চুষতে থাকে, তারপর আপনাআপনি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। রুদ্র বাচ্চার শুকনো মুখটা দেখে বুঝে —
গত কয়েক ঘণ্টা না খাওয়ার কারণে পেটে খিদে লেগেছে। মেহেরকে ডেকে বাচ্চার খাবারের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে রুম থেকে যখন রুদ্র বেরিয়ে আসে, ঠিক করিডোরে দাঁড়াতেই থমকে যায় সে। নিচে বেশ কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে! বাড়িতে একটু আগেই শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আর এই মুহূর্তে হঠাৎ পুলিশ? রুদ্রের কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন পা দুটো মেঝেতে আটকে যায়। ছেলেকে বুকের উষ্ণতায় চেপে ধরে ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে নিচের পরিস্থিতি দেখতে থাকে সে।
পুলিশের সামনে মাশফি এগিয়ে যায়, “আমি সায়েদ মাশফি। পুলিশ অফিসার, এখানে আপনারা কেন?”
“আমরা জানতে পেরেছি আপনাদের বাবা সায়েদ ইমরান আজ মারা গেছেন। আমরা দুঃখিত, মিস্টার সায়েদ। কিন্তু আইন কারও পরিবারের শোক দেখে থেমে থাকে না। এখন আমাদের পুরো সায়েদ বাড়ি তল্লাশি করতে হবে।”
এতক্ষণ মির্জা একদম চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ সে এগিয়ে এসে পুলিশ অফিসার নির্ণয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। “আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে কী বলছেন মাথায় আছে? আপনাদের সাহস হয় কীভাবে এই পরিস্থিতিতে সায়েদ বাড়ি তল্লাশি দেওয়ার?”
পুলিশ অফিসার নির্ণয় আড়চোখে পুরো বাড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তিনতলা বিশিষ্ট এই বাড়ি, যার ঘরের প্রতিটা কোণা আর বেলকনির ঝাড়বাতি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে তাদের অঢেল আভিজাত্যের কথা। তিনি ঠোঁটের কোণে হালকা এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
“এসব ডায়লগ আপনি বরং সিনেমা-মুভিতে মারুন, বেশ লাভ হবে, মিস্টার সায়েদ।” তারপর গম্ভীর মুখে পেছনে থাকা পুরো পুলিশ ফোর্সের দিকে তাকিয়ে হুকুম দিলেন, “তল্লাশি শুরু করো।”
সায়েদ মির্জা চেঁচিয়ে উঠল, “এসব কার নির্দেশে করছেন আপনি?প্রমাণ কী? কে অভিযোগ করেছে?”
পুলিশ অফিসার নির্ণয় বেশ কিছুটা শান্ত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন। “আপনার নামে ওয়ারেন্ট বের হয়েছে। শিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আপনার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ২৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ আর বেআইনিভাবে তার ভূমি দখলের কারণে।”
মির্জার চোখ-মুখ মুহূর্তেই কিছুটা ছোট ছোট হয়ে এল, গলার ভেতরের স্বর আটকে গেল ,তাও পুলিশ অফিসার নির্ণয়কে প্রশ্ন করল “প্রমাণ…?”
“সেটা আমার কাছে দেওয়া আপনার দায়িত্ব নয়, মিস্টার মির্জা। যা প্রমাণ হওয়ার তা আদালতেই প্রমাণ হবে। সাধারণ প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে আপনি আর আপনার কিছু গোপন চক্র এর সাথে সরাসরি জড়িত।”
কথাটা শোনামাত্রই নূর মেহেরের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ভয়ে ঘেমে উঠল, তার কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে মেহেরের ওড়নার কোণটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। অথচ মেহের শান্ত হয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। নূরকে এভাবে ভয়ে কাঁপতে দেখে মেহের নিজের চোখ-মুখ কঠোর করে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেয়ো না, ভাবি। যা হবে এখন, সবকিছুর জন্য শুধু প্রস্তুত থাকো।”
নূর ভয়ে খানিকটা আমতা আমতা করে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “মা….মানে…?”
“দেখো না ভাবি, কতদিন আর এই অমানুষটার সাথে সংসার করবে?তোমার উচিত ছিল… এই জানোয়ারের সংসার থেকে আরও আগেই বের হয়ে আসা। ”
নূর মেহেরের মুখ থেকে কথাটা শুনে আরও আতঙ্কে শিউরে উঠল। মেহের কি কিছু করেছে?এসব কী বলছে মেহের! এই ঝড়ের পেছনে কোনোভাবে কি মেহের নিজে জড়িত?
ঠিক তখন ভেতরের ঘর থেকে একজন কনস্টেবল দৌড়ে এসে অফিসার নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বলল, “স্যার! স্যার! এখান থেকে এই দেখুন… কিছু সাদা পাউডার পাওয়া গেছে।”
কথাটা শুনতেই অফিসার নির্ণয়ের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। মাশফি এতক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিল, সে সহ্য করতে না পেরে বলে উঠল, “এতক্ষণ ধরে আপনাদের বানানো গল্প আর মনগড়া কথা শুনছি। আজকে আমাদের বাবা মারা গেছেন, পুলিশ অফিসার…”
অফিসার নির্ণয়কে দেখে মনে হলো তিনি এসব কান্নাকাটিতে অভ্যস্ত। শান্ত গলায় বললেন, “দেখুন, আমি আগেও বলেছি… কারও বাড়িতে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে শোকের পাহাড় ভেঙে পড়লেও পুলিশের আইনের কাজ আটকে থাকে না।”
কনস্টেবল একটা পলিথিনে মোড়ানো ছোট প্যাকেট অফিসারের হাতে ধরিয়ে দিল। নির্ণয় প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। এরপর প্যাকেটটি নাকের কাছে নিয়ে সতর্কভাবে তার ভেতর থেকে আসা গন্ধ শুঁকলেন। গন্ধটা পেতেই মুখটা সামান্য কুঁচকে গেল তাঁর। বিরক্তি আর ধিক্কারের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ঠোঁট বাঁকিয়ে দুবার ‘তু তু’ করে উঠলেন।
রুদ্র ওপরতলার বেলকনি থেকে ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরে প্রতিটা দৃশ্য নীরবে দেখছিল। ছেলেও যেন শান্ত চোখে সবকিছু দেখছিল। তাই এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে বাচ্চা ছেলেটাকে নিচে না নিয়ে যাওয়াটাই রুদ্রের কাছে উত্তম মনে হলো।
পুলিশ অফিসার নির্ণয় কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা কার রুম থেকে পেয়েছ?”
“স্যার, নিচতলার গলি পার হয়ে শেষ দিকের ওই তালাবন্ধ রুমটা থেকে।”
নূরের বড় বড় চোখ দুটি আকস্মিক আতঙ্কে আরও প্রসারিত হয়ে গেল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, ‘ওটা তো মির্জার রুম ….সাধারণত ওই রুম সবসময় পিতলের ভারী তালায় লক থাকে, মির্জা সেখানে মাঝে মাঝে গিয়ে একা বসে থাকে। বাড়ির কোনো কাজের লোক বা সদস্যের সেখানে যাওয়ার বিন্দুমাত্র অনুমতি নেই। কেউ কোনোদিন মির্জার ভয়ে চেষ্টাও করেনি ওই গলির দিকে যাওয়ার। শুধু দু-একদিন শাশুড়ি সায়েদ কামিনীকে সেখানে ঢুকতে দেখা গেছে, যা কেউ কখনো আমলেও নেয়নি।
“আমি জিজ্ঞেস করেছি, এটা কার রুম?” পুলিশ অফিসার পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে হাঁক দিলেন।
বাড়ির সবাই আতঙ্কে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ নেমে আসা এই পরিস্থিতিতে যেন কারও মুখে কোনো কথা জোগাচ্ছে না। একে অপরের দিকে তাকালেও কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। ঠিক তখনই মেঘলা পরিস্থিতির সুযোগ বুঝে মুখ খুলল। গলা খানিকটা উঁচু করে অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই রুমটা তো বড় ভাইয়ার! কিন্তু ওই রুমে তো বড় ভাইয়া ছাড়া বাড়ির অন্য কেউ ঢোকে না, অফিসার।”
অফিসার নির্ণয় আবারও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুললেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছনের দরজা দিয়ে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য একটি বিশাল আকারের বক্স টেনে বাড়ির মাঝখানে নিয়ে এল। ভারী বক্সটা মেঝের ওপর রাখতেই চারপাশের নীরবতা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। বাড়ির প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কার্টনের দিকে স্থির হয়ে গেল। কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল, কেউ আবার স্তব্ধ হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। সায়েদ মির্জার কপাল বেয়ে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়তে লাগল, ঘাড়ের পাশটাও অঝোর ঘামে ভিজে উঠল। তাঁর চোখেমুখে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল অস্বস্তি আর আতঙ্ক।
অফিসার নির্ণয় পাশের আরেকজন পুলিশ অফিসারের দিকে চোখ তুলে ইশারা করলেন। ইশারা পেতেই সেই পুলিশ অফিসার দ্রুত এগিয়ে এসে হাতকড়া বের করলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সায়েদ মির্জার দুহাতে হাতকড়া পরিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো।
এরপর নির্ণয় ধীর পায়ে বক্সটির কাছে এগিয়ে গেলেন। পুলিশ সদস্যরা বক্সটি খুলে দিতেই ভেতরে রাখা জিনিসগুলোর দিকে চোখ পড়ল তাঁর। একে একে সেগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দেখে প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হলেন তিনি। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠল।
“বাহ! নাম-বেনামী একাধিক পিস্তল, কয়েক হাজার পিস ইয়াবা, সঙ্গে দামি মদের বোতলও রাখা! এখন এগুলোর ব্যাপারে কী বলবেন, মিস্টার সায়েদ?”
মির্জা আক্রোশে হুংকার করে উঠল, “এসব আমার না! আমাকে সুপরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হচ্ছে! এগুলো আমার কিচ্ছু না, আমি চিনিই না….. এগুলো কোথা থেকে এলো, কে রাখল ”
অফিসার নির্ণয়ের গলার আওয়াজ বেশ শান্ত শোনাল, “ওটা বিজ্ঞ আদালতে বিচারক সাহেবের সামনে বোঝা যাবে—কোনটা সত্য, আর কোনটা পাতানো মিথ্যা। আপনাকে আজ থেকে দীর্ঘ ৩ বছর আগে থেকেই পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ সন্দেহ করছিল। দেখুন, সত্যিটা কীভাবে চোখের সামনে চলে এলো….”
বাড়ির বাকি সদস্যদের দিকে একবার তাকালেন নির্ণয়। “আপনাদের পরিবারের সবার আলাদা আলাদা জবানবন্দি নেওয়া হবে। কেউ যদি মনে মনে ভাবেন পার পাওয়া যাবে, ভুল ভাবছেন।তারপর নিজের ফোর্সের দিকে ইশারা করে নির্ণয় বলে উঠলেন,
একে গাড়িতে নিয়ে চলো…”
নির্ণয়ের কাছ থেকে আদেশ পাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা মির্জার কলার চেপে ধরে একপ্রকার টানাহেঁচড়া করতে শুরু করল।
নিজের হাতে হাতকড়া লাগার অনুভূতিটা উপলব্ধি করতেই মির্জা হঠাৎ একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে নিজের দু-হাতে আটকে থাকা ঠান্ডা, ভারী লোহার হাতকড়াটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। সামান্য কয়েক ইঞ্চির সেই লোহার বন্ধন, অথচ তার ভেতরেই যেন আটকে গেল মির্জার সমস্ত শক্তি, সমস্ত দম্ভ। হাত দুটো নাড়ানোর সামান্য ক্ষমতাটুকুও যেন আর তার নিজের নেই। ক্ষমতার অহংকারে যে মানুষটা এতদিন পুরো সায়েদ বাড়িকে নিজের হাতের পুতুলের মতো চালিয়ে এসেছে, আজ জীবনে প্রথমবার সে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করল, ক্ষমতা থাকা আর নিজের সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারা এক জিনিস নয়। এতদিন যে আঙুলের ইশারায় মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেই আঙুলগুলোই আজ ঠান্ডা লোহার বন্ধনে অসহায় হয়ে ঝুলে আছে। গলার কাছে এসে আটকে গেল মির্জার অজস্র কথা, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। যে চোখে এতক্ষণও ছিল ক্ষমতার দম্ভ, সেই চোখের আলোই যেন এক লহমায় নিভে ছাই হয়ে গেল।
ঠিক তখনই মেহের কাউকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ধীর, শক্ত পায়ে পুলিশ অফিসারদের দিকে এগিয়ে গেল।
রুদ্র ওপর থেকে মেহেরের হঠাৎ এভাবে পুলিশের একদম কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়া দেখে ভেতরের বিরক্তি চেপে বিড়বিড় করল, “ঐ কুদ্দুস বয়াতি তোর মা! ঐ বেটা মানুষের দিকে এভাবে যাচ্ছে কেন? একবার শ্বশুরবাড়ি ঘুরে এসেছে বলে বুকের ভেতরের ভয়ডরও সব উবে গেছে নাকি?”
বাবার কোনো কথাই নিষ্পাপ প্রাণটা বুঝল না, সে শুধু নিজের ছোট্ট আঙুল চুষতেই ব্যস্ত। রুদ্র ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আঙুল খাওয়া বাদ দে, কুদ্দুস বয়রাতি! টাকা দিয়ে টিকিট কিনেও এসব ড্রামা দেখতে পারবি না…. “কিন্তু তোর মা ওদিকে যাচ্ছে কেন? আবার না কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে! বউ আমার এক পিস!” বলেই রুদ্র এক হাতে ছেলেকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
মেহের সরাসরি গিয়ে পুলিশ অফিসার নির্ণয়ের চোখে চোখ রেখে তাকাল। “প্লিজ অফিসার, আমাকে আমার ভাইয়ের সাথে মাত্র দুই মিনিট কথা বলতে দিন।”
নূর ইতোমধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়ে হাত-পা আছড়াতে শুরু করে দিয়েছে। মেঘলা দ্রুত নূরের পাশে গিয়ে নূরের হাত থেকে নূরের ছোট্ট ছেলেটাকে নিজের কোলে তুলে নিল। “ভাবি, প্লিজ অত কান্নাকাটি কোরো না! ধৈর্য ধরো… , সব একদিন ঠিক হয়ে যাবে।”
নূরকে মনে মনে সান্ত্বনা দিলেও মেঘলা খুব ভালো করেই জানে, কিছুই আর কোনোদিন ঠিক হবে না। আর এই নরকের সংসারে কোনো কিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। পাপীকে তার কৃত অপরাধের শাস্তি পেতেই হবে।
নূর হাউমাউ করে বিলাপ করতে লাগল, “ওরা মির্জাকে এভাবে ধরে নিয়ে যাবে… আমাদের এখন কী হবে? আমার… আমার নিষ্পাপ ছেলেটার কী হবে?কেউ আটকাও! প্লিজ, কেউ আটকাও ”
মির্জা এতক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও নূরের বুকফাটা কান্না শুনে যখন মেঘলার কোলে ঘুমিয়ে থাকা নিজের ছেলেটার দিকে তাকাল, তার বুকের ভেতরের এত বছরের সব অহংকার আর জেদ মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে ভেঙে গিয়ে এক অনাবিষ্কৃত খাঁটি পিতৃস্নেহ জেগে উঠল।
তার নিষ্পাপ চার মাসের ছেলেটা হাত-পা গুটিয়ে কী ভীষণ শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট বুকটা নিয়মিত ওঠানামা করছে, মুখজুড়ে লেগে আছে গভীর ঘুমের সরলতা। পৃথিবীর কোনো অন্ধকার, কোনো অপরাধ, কোনো বিচ্ছেদের খবরই যেন পৌঁছায়নি তার কাছে। এত মানুষের ভিড়, এত উত্তেজনা, এত ভয়াবহতার মাঝেও সে নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে নিশ্চিন্ত।
মির্জার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল ছেলেটার মুখের দিকে। ধাতব হ্যান্ডকাফে শক্ত করে বাঁধা হাত দুটো একবার অস্থিরভাবে কেঁপে উঠল। ইচ্ছে করছিল, সবকিছু ভুলে ছুটে গিয়ে একবার ছেলেটাকে বুকের ভেতর চেপে ধরতে। ছোট্ট শরীরটার উষ্ণতা শেষবারের মতো অনুভব করতে। কপালে একবার চুমু দিয়ে বলতে, বাবার কী অপরাধ, তা সে যেন কোনোদিন জানতে না পারে।
কিন্তু হাত দুটো বন্দি। পা দুটোও যেন আজ নিজের নয়। মির্জা শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইল তার ঘুমন্ত সন্তানের দিকে।
পুলিশ অফিসার এতক্ষণ ধরে পরিবারের এই নাটক দেখতেই ব্যস্ত ছিলেন। মেহের আর সময় নষ্ট না করে আবার বলল, “আই ওয়ান্ট টু টক টু মাই ব্রাদার, অফিসার।”
নির্ণয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনলি টু মিনিটস, ম্যাডাম।”
মেহের ধীরপায়ে মির্জার একদম কাছে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল। একবার করুণ চোখে মির্জার ঘুমন্ত ছেলের দিকে তাকাল, তারপর সোজা মির্জার চোখের দিকে। মেহেরের পাতলা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। বিড়বিড় করে নিচু স্বরে বলল, “আমার দেওয়া সারপ্রাইজটা ঠিক কেমন লাগল, ভাইয়া?”
মির্জা নিজের বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করল। “তার মানে… এসব নাটকের পেছনে তুই? এসব তুই করেছিস মেহু?”
মেহের তার দুই চোখের পাতা আলতো করে বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কেন, একদম পছন্দ হয়নি? এটা তো কেবল শুরু, ভাইয়া…”
মেহের আর মির্জার এই ব্যক্তিগত মুখোমুখি অবস্থান থেকে পুলিশ আর বাড়ির সবাই কিছুটা তফাতে সরে দাঁড়িয়েছিল, তাই ফিসফিস করে বলা কথাগুলো স্পষ্ট করে কেউ শুনতে পাচ্ছিল না।
মেহের বলল, “তোমাকে কি আরেকটা ছোট সারপ্রাইজ দিই?”
কথাটা বলেই ওপর থেকে সবে মাত্র নিচে নেমে আসা রুদ্রর দিকে মেহের একপলক ফিরে তাকাল। “দেখো, রুদ্রর কোলে যে বাচ্চাটাকে দেখতে পাচ্ছ? ও কিন্তু রুদ্রর রক্তের কেউ নয়…”
খানিকটা সময় নিয়ে মির্জার চোখ দুটো বড় বড় হতে দিল সে, তারপর মির্জার চোখের মনি দুটোতে চেয়ে আরেকটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “ওটা আমার আর অন্তুর সন্তান… আমার মৃত অন্তুর রক্ত!যাকে নর্দমার কীট বলে তোমরা মা আর ছেলে মেরে ফেলেছিলে।”
মির্জা তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর দিকে তীব্র চোখে তাকাল।
মেহের আবার বলল, “ওদিকে তাকিয়ে আর কোনো লাভ নেই, ভাইয়া। যার কোলে আজ আমার ছেলেকে দেখছ, এই পুরো পৃথিবীর বুকে সেটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কী ভাবছ তুমি? চাইলেই আবার কিছু একটা করে ফেলবে?
বিশ্বাস করো, ১০ মাস আগে যখন তুমি সব ছিনিয়ে নিলে, তখন কিন্তু আমি দুর্বল ছিলাম না… শুধু পেটের এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখাব বলে চুপচাপ অমানুষের মতো সহে গেছিলাম। কিন্তু আজ আমার সাথে যেকোনো অঘটন ঘটে গেলেও, ওই মানুষটা আমার বাচ্চাকে নিজের ছায়া দিয়ে সামলানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। পুরো দুনিয়ায় অন্তত এমন একজন মানুষ আছে, যাকে আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারি, নিজের সন্তানের জন্য ।”
মির্জার রাগে-ক্ষোভে নাকের দুটো পাতা ফুলে উঠল, কপালের আর হাতের রগগুলো ভেসে উঠল। “তুই আমার রক্ত হয়ে… নিজের ভাইয়ের সাথে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলি মেহু?”
মেহেরের মুখের হাসিটা আরও দ্বিগুণ চওড়া হলো।
“ঠিক এই কথাটা আজ থেকে ১০টা মাস আগে আমিও কেঁদে কেঁদে বলেছিলাম, তোমার কি একটুও মনে আছে ভাইয়া?” মেহেরের চোখের তারা দুটো মুহূর্তেই যন্ত্রণায় কেঁপে উঠল, চোখের কোণে জল জমে উঠল।
“মনে আছে তোমার… কত নির্মমভাবে সেদিন নিজের হাতে আমার অন্তুকে খুন করেছিলে? আমি সেদিন কোনো বিচার পাইনি, শুধু দূর থেকে পশুর সেই অত্যাচার দেখে গেছি… কিচ্ছু করার ক্ষমতা আমার ছিল না!”
মির্জা ভেঙে পড়ে একপর্যায়ে মিনতি করে বলল, “কিন্তু আমার… আমার নিষ্পাপ ছেলেটার কী দোষ ছিল মেহু? তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে তুই আমার সাথে এভাবে করতে পারিস না…”
মেহের আলতো করে মেঘলার কোলে থাকা অঘোরে ঘুমানো শিশুটির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাল। কত স্নিগ্ধ, কত শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে শিশুটি!
মেহের কঠিন গলায় বলল, “বরং তোমার হাত থেকে তোমার ছেলেটা চিরতরে বেঁচে গেল, ভাইয়া। একটা জঘন্য খুনির মতো মানুষের নাম বহন করে তাকে সমাজতলে বড় হতে হতো। তোমার মতো পশুর কুৎসিত ছায়া তার ওপর থাকলে ও-ও একদিন অমানুষই তৈরি হতো।”
মির্জা কান্না চেপে আবার আকুল হয়ে বলল,
“অন্তত আজকের এই দিনটাতে তুই এসব না চাইলেই পারতিস, মেহু! আজকে আমাদের বাবা মারা গিয়েছে… আজকে তো অন্তত…”
মেহেরের চোখের অবয়ব ততধিক কঠোর আর পাথর হয়ে রইল। “আমার অন্তুকে মারার সময় তোমার কি বুক কেঁপেছিল? কোনো ছাড় দিয়েছিলে তাকে?সে দুনিয়া ছাড়ার আগে জানতেও পারল না, তার অস্তিত্ব দুনিয়ায় আসতে চলেছে…আমার ….আমার অন্তু মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতেও পারল না যে সে বাবা হতে চলেছে… সামান্যতম দয়ামায়া কি সেদিন তাকে করেছিলে তুমি?”
কথা শেষ করেই পুলিশ অফিসার নির্ণয়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে মেহের শান্ত গলায় বলল, “নিয়ে যান এই অপরাধীকে… আমার চোখের সামনে থেকে চিরতরে সরিয়ে নিয়ে যান!”
নূর এবার কোনো বাধা না মেনে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধের মতো ছুটে এগিয়ে আসল, মেঘলা শত চেষ্টা করেও কোলের বাচ্চা সামলে নূরকে আর টেনে রাখতে পারল না। সে অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে এসে হাতকড়া পরা মির্জার শক্ত হাত দুটো দুই হাতে আঁকড়ে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।
নূরের ভেতরের আত্মাটা যেন এই এক মুহূর্তে ছিঁড়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছিল। সারাটা জীবন এই পুরুষটির হাতে অমানবিক নির্যাতন সয়ে এসেছে সে। কত রাত ভয়ে সিঁটকে এক কোণে বসে কেঁদেছে, কত শতবার গায়ে হাত ওঠার পর সেই আঘাত নীরবে সয়েছে!অথচ আজ যখন সেই ভয়ংকর মানুষটাই তার জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাচ্ছে, নূরের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় হাহাকার করে উঠল। সে মির্জাকে ভালোবাসে, নাকি কেবল তার ওই পশুর মতো দাপটটাকেই আজীবন ভয় পেয়ে এসেছে? নিজের এই দ্বিমুখী ভালোবাসার যন্ত্রণাতেই যেন সে আরও বেশি ধসে পড়ছিল।
তারপরেও নূরের অশ্রুসজল চোখে পুলিশ অফিসার নির্ণয়ের দিকে তাকিয়ে আকুল আর্তনাদে বলে উঠল, “না! ওনাকে নিয়ে যেতে পারবেন না।কোথাও যেতে দেব না আমি ওনাকে! মেহের, দোহাই লাগে তোর ভাইকে… আটকা! আমার দুধের সন্তানের কী হবে? আমার সংসারটা যে ধুলোয় মিশে ভেঙে ছারখার হয়ে যাবে। এ কেমন বিচার? এমন অন্যায় তো হতে পারে না!”
মির্জা নূরের দিকে নিচু নজরে তাকিয়ে গম্ভীর, গমগমে স্বরে বলল, “নূর, ভেতরে যাও। তোমাকে না শতবার বলেছি, ঘরের মহিলা মানুষ এভাবে সবার সামনে আসা আমি একদম বরদাশত করি না! ভেতরে যাও, বললাম তো। আমার কিচ্ছু হবে না। আমি ঠিক আবার ফিরে আসব।”
নূর বুক চেপে ধরে আরও কেঁদে উঠল, “তুমি… তুমি আজও আমাকে সেই একই হুমকি দিয়ে আটকাচ্ছ? সারাটা জীবন আমাকে ভয়ের শিকলে আটকে রেখেছ! কিন্তু আমি আজকে কারও কোনো বারণ মানব না… নিজের সন্তানের জন্য কি তোমার বুকের ভেতর এতটুকু মায়াদয়া জাগে না?”
মির্জা নিজের কোল খালি করা ছেলের নাম শোনামাত্রই হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে এল। চোখের পলক ফেলে সে সোজা নিচে নতমুখে নূরের দিকে তাকাল। এই অবুঝ মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের চোখ-মুখ আর পরনের সাজের কী বীভৎস অবস্থা করে ফেলেছে এই সামান্য সময়ের ঝড়ে! অথচ এই মা-বাবাহীন মেয়েটাকে জীবনে কম অবহেলা মির্জা করেনি। কথায় কথায় গায়ে হাত তুলেছে, তুচ্ছ কারণে বাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে, কোনো একটা সাধারণ দিনও কখনো সদয় হয়ে ভালোবাসেনি তার প্রতি। অথচ… এই নূরকে যখন চার বছর আগে মির্জা প্রথম দেখে পছন্দ করেছিল, তখন তার হাত দুটো ধরে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিল—এই এতিম, মা-বাবাহীন মেয়েটাকে সে নিজের রাজ্যের রানির মতো মাথায় করে আগলে রাখবে। অথচ বাস্তব জীবনে তার সিকিভাগও সে পূরণ করেনি।
আজকে মির্জার নিজের ভেতরে এক তীব্র, গুমরে ওঠা অপরাধবোধ হতে লাগল… প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতে লাগল বুকের বাঁ পাশে। নিজের নিষ্পাপ কলিজার টুকরো ছেলেটাকে এভাবে পিতৃহীন করে জেলে চলে যেতে হবে? আজ সকালেই সে নিজের জন্মদাতা পিতাকে হারাল, আর আজ বিকেলেই কি না নিজেকে আবার নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের বুক থেকে চিরতরে ছিঁড়ে চলে যেতে হবে?
পুলিশের উপস্থিত থাকা দুজন মহিলা সদস্য এগিয়ে এসে বেশ জোরজবরদস্তি করে নূরের বাহু ধরে মির্জার পাশ থেকে সরিয়ে নিল।
“ছাড়ুন আমাকে! আমাকে মির্জার কাছে যেতে দিন! আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না….” বলে নূর উন্মাদের মতো চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে লাগল। কিন্তু নূরের সেই বিলাপ আর করুণ চিৎকার কোনো আইন শুনতে পেল না, হাতকড়ার শব্দে মির্জাকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানের দিকে নিয়ে গেল পুলিশ।
মেহের ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকা নূরকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল। নিজের বুকের সাথে নূরকে চেপে ধরে মনে মনে অপরাধবোধে বিড়বিড় করল,
‘সরি ভাবি… শতবার সরি! আমি কোনোদিন চাইনি তোমার কোলের নিষ্পাপ সন্তানটা এভাবে হঠাৎ পিতৃহারা হোক। কিন্তু আমি যে কোনো রাতে ঘুমাতে পারিনি ভাবি! আমি ভুলতে পারিনি আমার… আমার সন্তানের বাবাকে মেরে ফেলার তীব্র কষ্ট। আমার সেই রাতের বুকফাটা আর্তনাদে হয়তো আসমানের ফেরেশতারা কেঁদেছিল, পৃথিবীর মাটি কেঁপেছিল… কিন্তু তোমার এই স্বামীর কান পর্যন্ত সেই চিৎকার পৌঁছায়নি !’
উপস্থিত সায়েদ বাড়ির আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-পড়শিরা পুলিশের এই কাণ্ড দেখে ভয়ে-লজ্জায় কানাঘুষো করতে লাগল। বেশ কয়েকজন মধ্যবয়সী প্রবীণ মহিলা এগিয়ে এসে অচেতনপ্রায় নূরকে ধরে উঠিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন। মেহের মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর, ক্লান্ত পায়ে মেঘলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘলার কোল থেকে হাত বাড়িয়ে নূর আর মির্জার ছোট ছেলেটাকে নিজের কোলে তুলে নিল।
—“ওর নাম কী ?”
“মিরাজ…” মেঘলা বিষণ্ণ গলায় আলতো করে জবাব দিল।
মেহের ভাতিজাকে জড়িয়ে ধরে তার গালে নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল পুতুলটার তুলতুলে গালে।
মেহেরের ভেতরে এক করুণ আত্মগ্লানি কেঁপে উঠল—সে জয়ী হয়েছে, মির্জাকে ধ্বংস করেছে ঠিকই; কিন্তু এই বাচ্চা যদি প্রশ্ন করে? ফুপি আমার বাবার সাথে এমন কেন করেছো? তখন মেহের কি উত্তর দিবে?
প্রতিশোধ কি সত্যিই পুরো আনন্দ এনে দেয়, নাকি একটা বিষাক্ত ক্ষত বুকে এঁকে দিয়ে যায়?
মেহের নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
“তুমি তোমার এই ফুপিকে মনের ভেতর কোনো ক্ষোভ না রেখে ক্ষমা করে দিয়ো, বাবাই… ফুপি নিজের ইচ্ছে থেকে বা শখ করে এসব করেনি। তোমার যাতে কোনো অভাব, অসুবিধা না হয়, তা দেখার জন্য সারাজীবন ভালোবাসার মানুষের অভাব হবে না, বিশ্বাস করো। তুমি একজন ভালো মানুষ হয়ে বড় হইয়ো… কিন্তু কখনো নিজের বাপের মতো হইয়ো না, সোনা।”
মেঘলা মেহেরের কাঁপা কাঁপা হাত দুটোর ওপর নিজের হাতটা রেখে আলতো করে চাপ দিল। মেহেরের দু-চোখ তখন নোনা জলে পুরোপুরি তলমল করছে। মেঘলা চোখের ইশারায় তাকে কান্নার না জন্য অনুনয় করল।
—- “ওকে নিয়ে গিয়ে ওর কান্নাকাটি করা মায়ের পাশে শুইয়ে দে, মেঘলা।”
মেঘলা মাথা দুলাল। তারপর মেহেরের কানের কাছে মুখ এনে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, “এবার কিন্তু… সায়েদ কামিনির পালা, মেহু…”
মেহের একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বাইরে ভাসিয়ে দিল। মুখে আর বাড়তি কোনো বাক্য ব্যয়ের প্রয়োজন বোধ করল না। সে সোজা ঘুরে কিছুটা দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল।
রুদ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মেহেরের শক্ত খোলসটা যেন এক নিমেষে খসে পড়ল। এতক্ষণ যাকে প্রতিশোধের আগুনে জ্বালানো এক বিধ্বংসী নারী মনে হচ্ছিল, রুদ্রর চোখের দিকে তাকাতেই সে যেন হঠাৎ ভীষণ আশ্রয়হীন হয়ে গেল।
মেহেরের চোখের পাতায় জমে থাকা লোনা জলটুকু উপচে পড়তে চাইছিল। সে ধীর, কাঁপা হাতে রুদ্রর শক্ত বাহুটা ছুঁল। চোখের তারা দুটো হালকা কাঁপছে। রুদ্র শান্ত চোখে তাকাল মেহেরের দিকে। বাতাসে তাদের দুজনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মিশে যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডের সেই নীরবতায় যেন পৃথিবীর সব শোরগোল থেমে গেল।
মেহের খুব নিচু, ভেঙে আসা কণ্ঠে শুধু বলল, “আমাকে আর আমার সন্তানকে সাথে করে নিয়ে যাবেন আপনার বাড়িতে?”
প্রশ্নটা ছাদ হয়ে নামা এক টুকরো আশ্রয়ের আকুতির মতো শোনাল।
রুদ্র কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল মেহেরের বিষণ্ণ, ক্লান্ত মুখখানার দিকে। তারপর একহাতে পরম যত্নে কোলজুড়ে রাখা বাচ্চাটাকে আরেকটু শক্ত করে বুকে চেপে ধরল, আর অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল মেহেরের কাঁপতে থাকা হাতের ওপর। আঙুলগুলোর শক্ত বাঁধনে সে বুঝিয়ে দিল—এই আশ্রয় আর কোনোদিন সরবে না।
—“আমি তো তোমাকে একা রেখে যাওয়ার জন্য আসিনি, মেহের। চলো, বাড়ি ফিরবে।”
পুরো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে থাকা রেহানা চৌধুরী আর হামজা চৌধুরী সায়েদ বাড়ির এই অদ্ভুত, বিধ্বংসী রূপ দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। বেয়াইয়ের বাড়িতে এসে এমন বিশৃঙ্খলা চোখে দেখতে হবে, তা তাঁদের কল্পনাতীত ছিল। রেহানা চৌধুরী শাড়ির আঁচলটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে মেহেরের দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“মেহের মা, আজকের এই রাতটা অন্তত এখানেই থেকে যাও… কাল সকালে না হয় রুদ্র তোমাকে আর আর আমার নাতিকে বাড়ি নিয়ে যাবে।”
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬ (২)
মেহের রেহানা চৌধুরীর দুটি হাত চেপে ধরে কান্নাজড়ানো ভাঙা স্বরে বলল, “আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও এই বাড়িতে থাকতে চাই না, মা… এটা কোনোদিন আমার নিজের বাড়ি ছিল না, আর কোনোদিন হবেও না! আপনারা কি আমাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যাবেন না?”
