শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২২
আফীফা আফনান
ঘন জঙ্গলের আঁধার তখন ঘন থেকে আরও ঘনতর রূপ নিয়েছে। মেহুল অন্ধকারের বুক চিরে দ্রুত পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঝোপঝাড়ের কাটিং গাছের ডালপালা তার জামাকাপড়ে আটকে যাচ্ছে, গালে-হাতে আঁচড় কাটছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই! তার সমস্ত মনোযোগ কেবল সামনের দিকে ধাবমান সেই অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি আর বাতাস চিরে ভেসে আসা অস্ফুট শিশুর কান্নার আওয়াজের দিকে।
অপরদিকে রবিন লোকটা পাগলের মতো বাচ্চাটাকে বুকের কাছে চেপে ধরে জঙ্গলের গভীরে পথ করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু বাচ্চাটার অবুঝ ও ভীত কান্না অন্ধকারের মাতমে যেন আরও করুণ হয়ে বাজছে। আর মেহুল নিঃশব্দে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেই শব্দ অনুসরণ করে লোকটার পেছনে পেছনে পা ফেলছে, যাতে সে কোনোভাবে টের পেয়ে আরও দুর্গম কোথাও পালিয়ে না যায়।
ঠিক তখনই আকাশের সবকটা মেঘ যেন এক হয়ে ভেঙে পড়ল! থমথমে আবহাওয়াকে মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড করে শুরু হলো মুষলধারে প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টিপাতে পুরো জঙ্গল যেন ঝাপসা ও শীতল হয়ে উঠল। বৃষ্টির শব্দের তোড়ে চারপাশের অন্যান্য শব্দ ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু মেহুল তার প্রখর মনোযোগ আর কান্নার অস্পষ্ট স্পন্দনকে ভিত্তি করে একটানা হেঁটে চলছে, কারণ তার মন বলছে লাল তোয়ালেতে মোড়ানো বাচ্চাটা আর কেউ নয় তাদের পুঁচকুই।
ভিজে একসার হয়ে গেছে মেহুল। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ বেয়ে গড়াচ্ছে পানির ধারা, চারপাশে হাত বাড়ালেও কিচ্ছু দেখা যায় না—এমনই নিছিদ্র অন্ধকার! তবুও এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটল না সে। পুঁচকুকে যেকোনো মূল্যে নিরাপদে ছিনিয়ে আনতেই হবে—এই এক জেদ যেন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ সামনের অস্পষ্ট ছায়ামূর্তিটি থমকে দাঁড়াল! মেহুল দেখছে বাচ্চাটির কান্না থামানোর জন্য লোকটা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বেশ হাঁসফাঁস করছে। চারপাশের ভারী বৃষ্টি আর বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে লোকটার অবয়ব এখন মেহুলের একদম কাছে, মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে! মেহুল নিজের শ্বাস বন্ধ করে ঝোপের আড়ালে থমকে দাঁড়িয়ে চোখ জোড়া প্রখর করে তুলল।
এরি মধ্যে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হঠাৎ এক নৃশংস ও নির্মম কাণ্ড ঘটিয়ে বসল! বাচ্চাটি যখন কেঁদে চলেছে তখন কান্নার শব্দ বন্ধ করার জন্য সে সজোরে একরত্তি বাচ্চাটির নরম গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিল! বাচ্চাটাও ব্যথায় ও ভয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়ে আরও তীব্র স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। আর যার ফলে সসে বাচ্চাটির গলায় স্ব জোরে চাপ প্রয়োগ করলো। দৃশ্যটি দেখে মেহুলের বুকের ভেতরটা যেন এক নিদারুণ কষ্টে একদম মোচড় দিয়ে উঠল! চোখে রক্ত চড়ে গেল তার। সে রাগ আর ক্ষোভে অন্ধ হয়ে ভিজে যাওয়া মাটির ওপর থেকে একটা বেশ ভারী সাইজের ধারালো পাথর কুড়িয়ে নিল—পিছন থেকে লোকটার মাথায় আঘাত করে বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য।
কিন্তু মেহুল হাত উঁচিয়ে আঘাত করতে যাবে, ঠিক তখনই—
হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে এক জোড়া নির্মম ও প্রকাণ্ড শক্তিশালী হাত পেছন থেকে মেহুলের ঘাড় আর মুখ শক্ত করে চেপে ধরল!
মেহুল মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নড়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ পেল না। ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাল, কনুই দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করল—কিন্তু এক দানবীয় পুরুষালি শক্তির কাছে তার সমস্ত প্রতিরোধ যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল! লোকটি মেহুলকে দয়া রেশ-লেশহীন ভাবে টেনে-হিঁচড়ে অন্ধকারের ভেতর থেকে একঝাঁক ঝোপঝাড় পার করে সোজা সামনের ফাঁকা জায়গাটিতে নিয়ে এলো। সেখানে এসে মেহুলের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে সজোরে মাটিতে আছড়ে ফেলল!
মেহুল যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে ভিজে কাদা হয়ে থাকা মাটিতে গিয়ে পড়ল। পেছন থেকে আক্রমণকারী লোকটি সামনে থাকা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে খেঁকিয়ে উঠে বলল—
“ওস্তাদ! এই মাইয়া ঝোপের আড়ালে লুকাইয়া আপনার ওপর নজর রাখতেছিল!”
আকস্মিক এই কথায় সামনে থাকা লোকটা চট করে পেছন ফিরে তাকাল। মাটিতে কাদাপানিতে লুটিয়ে পড়া মেহুল তখন ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে কোনোমতে মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকাল… আর দেখামাত্রই তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল!
রবিন সাহেব!
কিন্তু বিকেলের রেস্টুরেন্টে দেখা সেই মার্জিত, ভদ্র, অমায়িক আর সুবেশধারী রবিন সাহেবের সাথে এই লোকটার দূরতম কোনো মিল নেই! লোকটার চোখেমুখে এখন থিকথিক করছে হিংস্রতা, নচ্ছাড় কুটিলতা আর এক পাচারকারীর পৈশাচিক লালসা। মেলহুকে নিজের সামনে দেখেই রবিন হিংস্র শেয়ালের মতো দাঁত কেলিয়ে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি দিল। অতঃপর মেহুলের একদম কাছে এগিয়ে এসে বুট জুতো দিয়ে মেহুলের হাতের পাশে আঘাত করে কর্কশ ও থুতু ছেটানো গলায় বলে উঠল—
”কী রে ছুঁড়ি?খুব যে হিরোইন হয়ে পিছু পিছু চলে এলি? ভেবেছিলি মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে আঘাত করে আমাদের পুলিশে ধরিয়ে দিবি, আর এই ছানাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবি? হুম!”
রবিনের বিকৃত ও কুৎসিত কণ্ঠস্বর শুনে মেহুল শিউরে উঠল। রেস্টুরেন্টের সেই দরদী বাবা সাজা মানুষটাই যে এমন এক নরপশু, তা ভেবে তার শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠল! এদিকে রবিন মুখ থেকে থুতু ফেলে বাচ্চাটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে হিংস্র গলায় বলল—
“মানতেই হবে তুই মেয়ে খুব বুদ্ধিমান। তোর বুদ্ধির জোড় আমি ওইদিনই টের পেয়েছিলাম যেদিন তুই, আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলি! কিন্তু এই রবিনকে তুই চিনিস না? আমরা বাচ্চা বেচি! বড় বড় লোক আমাদের থেকে লাখ লাখ টাকায় এই বাচ্চাগুলো কেনে! রেস্টুরেন্টে আইনি প্রক্রিয়ার ভাব দেখাচ্ছিলি না? এখন বল, তোর আইনি প্রক্রিয়া তোকে আর এই বাচ্চাকে কোন জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে আসে! এখন যদি আমি তোকে এই জঙ্গলেই পুঁতেও ফেলি তোর বাপের সাধ্যিও নেই খুঁজে বের করার!”
রবিনের কথা শুনে বৃষ্টির পানির সাথে মেহুলের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল পরম শঙ্কার জল।
কাদাপানিতে লুটিয়ে পড়া মেহুল ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেও নিজের কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে গেল। বৃষ্টির ধারাপাতে ভেসে যেতে থাকা চোখ দুটো মেলে সে রবিন নামক সেই নরপশুর হাতে থাকা অবুঝ নিষ্পাপ বাচ্চাটার দিকে তাকাল। অতঃপর কাতর, আকুল ও করুণ কণ্ঠে হাত জোড় করে কেঁদে উঠে বলল—
”ওকে ছেড়ে দিন, প্লিজ! বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন! ও তো একদম নিষ্পাপ, কোনো অপরাধ করেনি… আপনার বুকের ভেতর কি একটুও দয়া-মায়া নেই? একটা একরত্তি শিশুর সাথে এমন নৃশংসতা কেন করছেন, প্লিজ ওকে ফিরিয়ে দিন!”
মেহুলের এমন আকুল আকুতি আর অশ্রুসজল চোখের দিকে তাকিয়ে রবিন কোনো দয়া তো দেখালই না, বরং পৈশাচিক আনন্দে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল! ঝমঝমিয়ে পড়তে থাকা প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টির শব্দ চিরে সেই বিকট হাসি যেন পুরো থমথমে জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসি থামিয়ে রবিন মেহুলের দিকে এক পা এগিয়ে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। চোখ দুটো হিংস্রভাবে বড় বড় করে, মেহুলের দিকে থুতু ছিটিয়ে কর্কশ গলায় বলে উঠল—
”দয়া-মায়া! হাঃ! দয়া-মায়া দিয়ে কি আমার পেট ভরবে রে ছুঁড়ি! এই দয়া-মায়া বেঁচে কি আমার সংসার চলবে, নাকি পেটের ভাত আসবে? এই যে হাত-পা ছুঁড়তে থাকা বাচ্চাটা দেখছিস, এটার বাজারমূল্য কত জানিস? দুই লাখ টাকা! আস্ত দুই লাখ টাকা পাব আমি এটাকে এক শেঠের হাতে তুলে দিলে!”
মেহুল শিউরে উঠে ভেজা গলায় বলল, “টাকার জন্য এত বড় পাপ করবেন না… খোদাকে ভয় করুন!”
রবিনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিকৃত ও নিষ্ঠুর তাচ্ছিল্যের হাসি। সে মেহুলের মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
”পাপ আর পুণ্য দিয়ে আমার মতো মানুষের পেট চলে না, ডাক্তার ম্যাডাম! রক্ষসের আবার কিসের ভয় ডর! ভালো মানুষের মুখোশ পরে তোদের সামনে নাটক করি যাতে ঝামেলা ছাড়া বাচ্চাগুলোকে হাতে পাই। আর তুই কিনা সেই কাদা ঘেঁটে এই অন্ধকারের জঙ্গলে আমাদের পিছু পিছু চলে এলি? দয়া-মায়া আর খোদার গল্প শোনাতে এসেছিস? ঠিক আছে তোর কোন খোদা আজ তোকে আর এই বাচ্চাকে আমার হাত থেকে বাঁচায়, তা আমিও দেখতে চাই!”
রবিনের হিংস্র কথাগুলো শেষ হতে না হতেই সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার লোকটিকে উদ্দেশ্য করে গর্জনে বলে উঠল—
“ধর এটাকে! মুখ চেপে ধরে বাঁশঝাড়ের পেছনে নিয়ে চল! বেশি মাতব্বরি করার মজা আজ হাড়েনিশান বুঝিয়ে দেব এটাকে!”
রবিনের ইশারা পেতেই সেই লোকটা এক মুহূর্ত দেরি না করে হিংস্র পশুর মতো মেহুলের দিকে তেড়ে এলো! মেহুল ভিজে যাওয়া কাদার ওপর পিছিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে মৃত্যুর মতো এক হিমশীতল অন্ধকার চারপাশ থেকে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ফেলেছে!
“বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন প্লিজ, ও জন্ম থেকেই অভাগী! ওকে আর কষ্ট দেবেন না। ও খুব ছোট, এত কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। ওকে প্লিজ এভাবে আঘাত করবেন না। দরকার পড়লে আমাকে মারুন, কাটুন—তাও আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন!” মেহুল আরো একবার কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো এই আশাতে যে হয়তো সামনে দাড়ানো লোকটার হৃদয় একটু হলেও গলবে। কিন্তু নাহ, তার মাঝে কোন ভাবান্তর দেখা গেলো না। বরং লোকটার চোখেমুখে ফুটে উঠলো আরো হিংস্রতা।
আকাশের মেঘ চিরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। এই বৃষ্টির মাঝেই মেহুলকে পাশের বাঁশ ঝাড়ের পেছনে নিয়ে ফেলা হলো। পচা কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে মেহুল দু’হাতে বুক চেপে ধরে আরো একবার আকুতি করে উঠল, “ছেড়ে দিন না ওকে! ও একটা ছোট্ট, নিষ্পাপ বাচ্চা…”
চোখের সামনে ঠিক কয়েক হাত দূরে থিকথিকে বৃষ্টির ধারায় দাঁড়িয়ে থাকা রবিন নামক পাষণ্ড মানুষটি তখন শিশুটির পা দুটো ধরে হাওয়ায় ঝুলিয়ে রেখেছে। যার ফলে বাচ্চাটি ভয়ে ও ব্যাথায় সমানে কেঁপে কেঁপে উঠছে, যা দেখে মেহুল কাদাজলে লুটিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে। আর লোকটার মুখে ফুটে উঠেছে এক বিভৎস ও হিংস্র হাসি।
”আমাদের কাজে ছেড়ে দেওয়ার কোনো নিয়ম নাই, মেয়ে! হয় ধরো, নয় মারো,” বৃষ্টির শব্দের তোড় ছাপিয়ে লোকটা খসখসে গলায় হেসে উঠল, “আর এই বাচ্চাকে এখন ছাড়লে আমাদের মরণ। তাই এরে মরতেই হবে, আগে এ মরবে পরে তুই কারন আমরা কোন সাক্ষী রাখি না!”
”ওকে দয়া করে দিয়ে দিন, প্লিজ! আমি কসম করে বলছি, আমি কাউকেই কিছু বলব না! আপনি ওকে রেখে চলে যান…” মেহুলের কণ্ঠ কান্নায় বুজে আসছে, জলকাদায় হাত দুটো জোড় করে আকুতি ঝরছে তার।
”মামা বাড়ির আবদার নাকি! তোদের ছেড়ে দি আর পরে জেলে পচে মরি!”
বৃষ্টির অঝোর ধারার মাঝেই লোকটার বিকট অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে এক কদম মেহুলের দিকে এগোতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় লোকটা ঠান্ডা গলায় বলে উঠল, “ওস্তাদ, আর দেরি করা ঠিক হইবো না… একদম শেষ করে ফেলেন! যেন দেখে মনে হয় এক্সিডেন্ট। পালাইতে হবে তো, বাচ্চাটা যা চেঁচাচ্ছে মানুষজন এলো বলে।”
মুহূর্তের মধ্যে মুষলধারে পড়া বৃষ্টির শব্দের মাঝেই পুকুরের পানিতে ভারী কিছু ছিটকে পড়ার বিকট শব্দ—’ছপাং!’ আর সাথেই সাথে শিশুটির কান্নার শব্দটা বৃষ্টির তোড়ে এক নিমিষে মিলিয়ে গেল।
মেহুল স্তব্ধ হয়ে পুকুরের খোলা পানির দিকে তাকাল। বৃষ্টির অবিরাম ফোঁটা যেখানে আছড়ে পড়ছে, ঠিক তার নিচেই অন্ধকার পানিতে বুদ্বুদ তুলে সূক্ষ্ম কিছু একটা তলিয়ে যাচ্ছে… পানির ওপরটা ধীরে ধীরে একদম স্থির হয়ে আসছে। আর দৃষ্টি ঘোরাতেই দেখল লোকটার হাত দুটো এখন একদম খালি।
দৃশ্যটা বুঝতে মেহুলের মস্তিষ্কের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। আর তার পরমুহূর্তেই বিজলীর চমকানি আর ঝুম বৃষ্টির শব্দকে চিরে দিয়ে তার বুকের গভীর থেকে এক হিংস্র, বিভৎস আর্তচিৎকার ফেটে বের হলো। সেই গুমোট রাত আর ঝড়ের গর্জনকেও যেন তার হাহাকার এক নিমেষে কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম!
অতঃপর, সেকেন্ডের মাথায় কালবৈশাখীর ঝাপটার মতো কিছু একটা ঘটে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা পলক ফেলার সুযোগটুকুও পেল না। চোখের সামনে ঠিক যেখানে মেহুল হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছিল, পরক্ষণেই সেই স্থানটা একদম ফাঁকা! লোকটির চকিত দৃষ্টি পুকুরের দিকে যেতেই ভেসে এলো পানির ওপর ভারী কিছু ছিটকে পড়ার বিকট শব্দ—’ছপাং!’
কালো আঁধারে ঢাকা পুকুরের স্থির পানিতে ধড়ফড় করে আছড়ে পড়ল মেহুল! বৃষ্টির ঝমঝমিয়ে পড়া ঠাণ্ডা পানির তোড় আর বুকভাঙা হাহাকারকে তোয়াক্কা না করে সে এক ছটফটে বাঘিনীর মতো হাত-পা ছুঁড়ে পুকুরের কালচে, তলহীন পানিতে ডুব দিল! যে পানিতে ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে তলিয়ে গেছে একরত্তি সেই নিষ্পাপ শিশুটি!
বাচ্চাটিকে বাঁচাতে হবে—এই একটিমাত্র মন্ত্র তখন মেহুলের প্রতিটি রগে রগে আছড়ে পড়ছে। পানির তীব্র স্রোত আর অন্ধকারের বুক চিরে মেহুল গভীর থেকে গভীরে হাতড়াতে লাগল। পুকুরের তলদেশের কাদা আর কালচে শীতলতার মাঝেই তার হাত হঠাৎ গিয়ে স্পর্শ করল একখণ্ড নরম, তুলতুলে অবয়ব!
মেহুল আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে বাচ্চাটিকে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে গায়ের সমস্ত শক্তি নিংড়ে উপরে ভেসে উঠল। পানির ওপর মাথা তুলতেই সে এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাচ্চাটিকে বুকের ওপর চেপে ধরল। কিন্তু একরত্তি শিশুটির চোখ-মুখ তখন বন্ধ, শরীর একদম ঠাণ্ডা নিস্তেজ!
“ভাই! মাইয়া তো পানিতে লাফ দিছে!
পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রবিন আর তার সাথী লোকটি পানির দিকে হা করে তাকিয়ে ততক্ষণে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে! লোক দুটি ভাবতেও পারেনি—একটা সাধারণ মেয়ে এভাবে নিজের জীবনের পরাভব ভুলে মৃত্যুসম গভীর পানিতে লাফিয়ে পড়তে পারে!
রবিন চমক কাটিয়ে হিংস্রভাবে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, “শালা মাইয়া তো একদম পাগল! এত বড় সাহস! ধর এটাকে! পানি থেকে ওঠার আগেই শেষ করে দে!”
রবিনের সাথীটি কাদা ঠেলে পানির পাড়ে এসে ঝুঁকে মেহুলকে ধরে টেনে হিঁচড়ে তোলার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, মাতৃত্ব আর স্নেহের কাছে হেরে যাওয়া এক নারী কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে! মেহুল এক হাতে নিস্তেজ বাচ্চাটিকে পরম যত্নে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে রইল, আর অন্য হাতে জলের নিচ থেকে কুড়িয়ে আনা কাদার ভেতর থাকা একটা চোখা বাঁশের কঞ্চি সজোরে ঢুকিয়ে দিল লোকটির চোখের কোণে!
”আআআহ!”—যন্ত্রণা আর রক্তে ভেসে লোকটা বিকট চিৎকার দিয়ে পাড়ে কাদার ওপর লুটিয়ে পড়ল! কিন্তু লুটিয়ে পড়তে পড়তে সে নিজের হাতে থাকা ছুরিটি মেহুলের হাতে পুরে দিতে ভুললো না।
“পালান ভাই!”
শব্দটি কানে যেতেই ঘটনাটির আকস্মিকতায় পিছিয়ে যেতে শুরু করলো রবিন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো জঙ্গল আলোয় আলো করে ভেসে উঠল পুলিশের সার্চলাইটের তীব্র আলো! চারপাশ থেকে গমগম করে বেজে উঠল সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ!
হঠাৎ করেই থমথমে আর নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের জঙ্গল চিরে চারপাশ থেকে ডজন খানেক পাওয়ারফুল সার্চলাইটের প্রখর আলো আছড়ে পড়ল! চোখের পলকে লাল-নীল আলোর ঝলকানি আর পুলিশের সাইরেনে প্রকম্পিত হয়ে উঠল পুরো এলাকা।
”হাত ওপরে! কেউ এক পা নড়লে সোজা গুলি চালানো হবে!”—মাইকের বজ্রকণ্ঠের আদেশে পুরো পাচারকারী চক্রটাকে মুহূর্তেই কর্ডন করে সোজা হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিল পুলিশ ও বিশেষ বাহিনীর দল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেছনে পেছনেই অন্ধকারের ঝোপঝাড় ঠেলে হাঁপাতে হাঁপাতে ছটে এলো হুমা। সে চার পাশে উন্মাদের মতো চোখ বোলাতে লাগল, কিন্তু পুরো চত্বরে কোথাও মেহুলের অস্তিত্ব নেই! অতঃপর মেহুলকে না পেয়ে হুমা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
“কোথায় তুই মেহুল! কোথায় আছিস?
ঠিক তখনই কাদায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকা রবিনের দিকে তার নজর যেতেই হুমার চোখের মনি দুটো রাগে হিংস্র হয়ে উঠল! সে এক মুহূর্ত চিন্তা না করে সোজা এগিয়ে গেল। নিজের পা থেকে জুতোটা খুলে নিয়ে উন্মাদের মতো রবিনের মুখে ও গালে পর পর কয়েকটা সজোরে চড় আর বাড়ি বসিয়ে দিল!
”কৈ আমার মেহু? কী করেছিস তোরা ওর সাথে? কোথায় মেহুল!”—হুমা গলার সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
রবিন গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “জানি না! আমি কিছু জানি না!”
“এই একদম মিথ্যা বলবি না তুই সব জানিস! বল!”
“কইলাম তো জানি না! বালের মাইয়া সব শেষ কইরা দিলো।”
রবিন থেকে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে হুমা এবার কান্নাভেজা চোখে পাশে থাকা অফিসারের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “স্যার! ওদের ধরুন! জিজ্ঞেস করুন ওরা আমার বান্ধবীর সাথে কী করেছে! ওকে কোথাও পাচ্ছি না স্যার!”
দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করলেন না। তিনি এক লাফে এগিয়ে এসে রবিনের হাতের একটা আঙুল উল্টো দিকে মোচড় দিয়ে ধরতেই মড়মড় শব্দে রবিন যন্ত্রণায় বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল!
”আআআহ! স্যার ছেড়ে দেন! বলছি… বলছি! ওই যে… ওই মেয়েটা পুকুরে লাফ দিয়েছে! আর বাচ্চাটাকেও ওই পানিতেই ফেলা হইছে!”—রবিন ব্যথায় চিল্লাতে চিল্লাতে আঙুল দিয়ে পাশের বিশাল, থমথমে কালচে পুকুরটার দিকে ইঙ্গিত করল।
হুমা সহ উপস্থিত সবাই মুহূর্তেই চোখ ফেরাল পুকুরের দিকে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝে পুকুরের কালচে পানি তখন একদম স্থির, থমথমে আর নিঝুম! কোথাও কোনো বুদ্বুদ নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। পুরো পুকুরটা যেন এক নিঃশব্দ মৃত্যুর গহ্বর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! দৃশ্যটা দেখামাত্রই হুমার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! সে দু-হাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল—
“মেহুউউ! না স্যার, না! আমার বান্ধবী সাঁতার জানে না! ও সাঁতার কাটতে পারে না স্যার! ও ডুবে যাবে… প্লিজ আমার মেহুকে বাঁচান! কেউ একটু সাহায্য করুন!”
ঠিক তখনই স্থানীয় এক কনস্টেবল টর্চের আলো পুকুরের দিকে ফেলে শঙ্কিত গলায় বলে উঠল—
“স্যার! এই পুকুর মারাত্মক বিপদজনক! অনেক গভীর আর নিচে কচুরিপানা আর কাদার ঘোর প্যাঁচ আছে। আর কয়েক দিন আগেই তো এখান থেকে দুটো লাশ উদ্ধার হইছে! এখানে এখন নামা মানেই তো নিশ্চিত মৃত্যু!”
কথাগুলো শোনামাত্রই উপস্থিত জনতার মাঝে এক ভীষণ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। কেউ আফসোস করে বলতে লাগল, “আহা রে! এই রাক্ষসী পুকুরে একবার যে পড়ে, সে কি আর জ্যান্ত ফেরে?”
কারো মুখে আকুলতা, “আরে কেউ এ্যাম্বুলেন্স ডাকো! ফায়ার সার্ভিসকে খবর দাও দ্রুত!”
হুমা চারপাশের কথা শুনতে শুনতে মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়ল। সে উন্মাদের মতো দৌড়ে গিয়ে পুকুরের থিকথিকে কাদামাটির ওপর আছড়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে কাদা আঁকড়ে ধরে গলার নালি ফাটিয়ে চিল্লাতে লাগল—
“মেহু! তুই ফিরে আয় প্লিজ! তুই আমাকে একা ফেলে এভাবে চলে যেতে পারিস না! মেহুউউ!”
ঝুম বৃষ্টির ধারায় হুমার চোখের জল আর শরীরের কাদা এক হয়ে যেন এক নিদারুণ হাহাকার সৃষ্টি করল, কিন্তু—হঠাৎ……..
ঝমঝমিয়ে পড়তে থাকা ভারী বৃষ্টির শব্দের আড়ালে, থমথমে পুকুরের স্থির পানির মাঝখান থেকে একটা সূক্ষ্ম বুদ্বুদ ওঠার শব্দ ভেসে এলো!
হুমায়রা কেঁদে ওঠার মাঝেই চট করে কান খাড়া করল। ভিজে একসার হওয়া চোখে, ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকাল পানির ঠিক মাঝখানটায়! অতঃপর সে দেখলো অন্ধকারের বুক চিরে কালচে পানির নিচে যেন গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে! পানির ওপরটা এবার বেশ জোরে জোরে দুলতে শুরু করল!
হঠাৎই হুমার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল পানির দিকে… কিছু সেকেন্ডের মাঝেই কালকে পানির বুক চিরে, প্রলয়ঙ্করী অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল এক দীর্ঘ, সুগঠিত ও প্রকাণ্ড অবয়ব!
ঝুম বৃষ্টির ঝাঁপটায় আর অন্ধকারের ঘোরে প্রথমে অবয়বটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তবে ঠিক সেই মুহূর্তে, পেছন থেকে পুলিশের একটি পাওয়ারফুল সার্চলাইটের প্রখর সাদা আলো সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল সেই জলমগ্ন মূর্তিটির ওপর!
আর আলো পড়তেই হুমার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো! কারন পুকুরের কালচে পানি চিরে এক পা এক পা করে তীরের দিকে হেঁটে আসছে এক সুপুরুষ জলদানব! তার একহাতে পরম শক্ত করে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরা একরত্তি সেই ছোট বাচ্চাটি, আর অন্য প্রকাণ্ড দুটি বাহুর ওপর অচেতন, জলসিক্ত ও নিস্তেজ অবস্থায় শুয়ে আছে মেহুল!
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২১
লোকটি ধীর, অবিচল ও প্রচণ্ড দাপুটে পায়ে পানি চিরে কিনারের কাদামাটিতে এসে পা রাখল। তার গা বেয়ে ঝরছে পুকুরের শীতল জল, বুক চিরে বের হচ্ছে ভারী শ্বাসের উত্তাপ, আর চোখের তারায় এক অদ্ভুত প্রখর হিংস্রতা ও অধিকারবোধের অগ্নিশিখা! অতঃপর লোকটি কিনারায় এসে থামতেই হুমা কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে হা করে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠনালী একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে লোকটির ভেজা মুখের দিকে চেয়ে । তারপর একদম অস্পষ্ট, কাঁপানো আর তোতলা স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
”সা-সালমান… সালমান শাহ নেওয়াজ…! আপনি….?
