মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০
jannatul firdaus mithila
“ কারণ, তায়েফ এহসান আমার বাবা!”
সপ্তদশীর কম্পিত কণ্ঠে আওড়ানো বাক্যযুগল বাতাসের তীব্রতায় যেন ঝংকার তুললো নিরুর কর্ণকুহরে! বিস্ফোরিত রূপ ধরল কাজলদিঘী চোখদুটো। বিস্ময়াবহে ওষ্ঠপুটে বাড়লো খানিক দুরত্ব। সম্মুখের সপ্তদশীর ক্ষুদ্রকায় বদনে চেপে রাখা হাতদুটো আনমনে কেঁপে উঠল তার। ঢিলে হলো পরক্ষণে। চোখদুটোতে একরাশ বিভ্রম ঢেলে ক্ষীণ কন্ঠে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল,
“ ক-ক-কী ব-বললেন? তা-তায়েফ এহসান…!”
অন্তঃকোণের ব্যথায় জর্জরিত মাহি। দু’হাতে বুক চেপে রেখে কাঁদতে কাঁদতে আওড়াল,
“ আমার আব্বু!”
এক অদৃশ্য ঝটকায় তক্ষুনি পেছন দিকে ছিটকে পড়ে গেল নিরু। দিশাহীন কায়দায় ছলছলে চোখদুটো নিয়ে তাকালো এদিক-ওদিক। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বারংবার শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে, সিক্ত জিভ ঠেলে ভেজালো শুকনো অধরজোড়া। কম্পিত কণ্ঠে আধো আধো বুলিতে আওড়াল,
“ আমার পিসির খু-খু-খুনির মেয়ে আমাদের বাড়িতে থাকছে? তা-ও আবার এতোগুলা দিন ধরে? অধীর দা.. হ্যাঁ, হ্যাঁ, অধীর দা’কে জানাতে হবে। অধীর দা’কে জানাতে হবে সব।”
বেভুলার ন্যায় বাক্যগুলো আওড়াতে লাগল নিরু। নিজ কম্পিত বদনখানা দু’হাতে জড়িয়ে ধরল তৎক্ষনাৎ। খানিকবাদে হুট করেই চাইলো ক্রন্দনরত মাহি’র পানে। মুহুর্তেই অষ্টাদশীর চোখেমুখে ফুটে উঠল এক আকাশসম ঘৃণার ছাপ। চোয়ালের পেশী হলো টানটান। একমুহূর্তের জন্য নিজের সকল দয়ামায়া ভুলে গেল নিরু। অধীর রায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতিটি তীক্ষ্ণ, তিক্ত অভিজ্ঞতার কাহিনী আনমনে কল্পনার দৃশ্যপটে ভেসে উঠতেই হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো নিরু। বিধ্বংসী রণমুর্তির ন্যায় গর্জে উঠে আচমকা এগিয়ে এসে ক্ষুব্ধ থাবায় আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর নরম চুলের গোছা। সহসা কান্না গিলে ককিয়ে ওঠে মাহি। দৃষ্টিভরা অসহায়ত্ব নিয়ে একপলক তাকালো ক্ষুব্ধ নিরুর পানে, যে আপাতত হিং স্র রাগে গজগজ করছে। মাহি তৎক্ষনাৎ দু’হাতে নিজ চুলের গোছা ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত হলো। দূর্বল, অসহায় কন্ঠে শুধালো ,
“ কষ্ট হচ্ছে আপু! ছেড়ে দিন দয়া করে।”
নিরু ছাড়লো না। উল্টো মায়াবিনীর কন্ঠে নিজ উদ্দেশ্যে ‘আপু ’ সম্বোধন শুনে হিতাহিত জ্ঞান হারালো নিজের। তক্ষুনি বাহাতের শক্ত চাপড়ে পিষ্ট করল রমণীর তুলতুলে পেলব গাল। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় তৎক্ষনাৎ গাল বেঁকে গেল বোকা মাহি’র। তীব্র ব্যথায় গালের ত্বক জ্বলতে লাগলো পরমুহূর্তে। বেচারি ডুকরে উঠলো এবার। একহাতে গালের ত্বক চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো অঝোরে। রমণী চাইলেই প্রতিবাদ করতে পারতো। চাইলেই পাল্টা আঘাত করতে পারতো নিরুকে। তবে রমণীর ক্ষুদ্র মস্তিষ্কজুড়ে এমুহূর্তে চলছে এক আকাশসম দ্বিধাদ্বন্দ্ব! মনে মনে চলছে বাবা-র প্রতি অগাধ বিশ্বাস ধরে রাখার নিরব যুদ্ধ। রমণীর বুকভরা কষ্ট আগে থেকেই দূর্বল করছে তাকে। তার ওপর নিরু ছুঁড়ল তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ,
“ তোর বাবা ছাড় দিয়েছিল আমার অধীর দা’কে? ছাড় দিয়েছিল ঐ ছোট্ট বাচ্চাটাকে? ছাড় দিয়েছিল এই সমাজের মিথ্যে আরোপ থেকে? দেয়নি। দেয়নি সে! তাহলে তুই কোন সাহসে ছাড় চাচ্ছিস আমার কাছে? একটা সাপের নেউটা হয়ে এতগুলো দিন আমাদের বাড়ির ছাঁদের তলায়, আমাদেরই সঙ্গে দিন কাটাচ্ছিস, অথচ আমরা কি-না টেরই পেলাম না? বল এখানে কেনো এসেছিস তুই। কোন স্পর্ধায় পা রাখলি আমার বাড়িতে?”
ছলছল চোখজোড়া তক্ষুনি উঁচায় মাহি। দেখল নিরুর অগ্নিমূর্তি ভাবখানা। অধর নাড়িয়ে দু’টো বাক্য আওড়াতেই যাবে, ওমনি টান পড়ল নরম চুলের গোছায়। নিরু টানছে মাহি’র চুল! জোরালো হাতে টানতে টানতে মেয়েটাকে দাঁড় করাচ্ছে দূর্বল পায়ে। মাহি ঠিকঠাক দাঁড়ালো কি-না সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখালো না নিরু, বরং সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে তক্ষুনি সপ্তদশীর চুলের গোছা শক্ত করে খামচে ধরে পা বাড়ালো কাছারিঘরের বাইরে। দূর্বল মাহি কুঁচকে রেখেছে মুখ। বারংবার চেপে ধরছে নিরুর হাত। তাতেও যেন বিন্দুমাত্র টলেনি নিরু। লম্বা লম্বা কদমের ধুপধাপ পদধ্বনিতে মুখরিত করতে লাগলো নিস্তব্ধতায় মোড়ানো চারপাশ।
মুহূর্ত কয়েক পেরুলো বোধহয়!
সামনেই দুর্গাপূজাে। জমিদার বাড়িতে আগাম আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে বহুদিন আগে। উৎসব ঘিরে জমিদারবাড়ির প্রতিটি প্রান্ত এখন ব্যস্ততায় মুখর। অগণিত দক্ষ সাজসজ্জাকর্মী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ করে যাচ্ছে মহলের আনাচে-কানাচে। কেউ আলোকসজ্জায় ব্যস্ত, কেউ অলংকরণে, কেউ-বা প্রাঙ্গণের সাজসজ্জায়! চারপাশে কর্মচাঞ্চল্যের বাড়তি ব্যস্ততায়, কারো নাগাল পাওয়াও যেন দায়।
এরইমধ্যে সকল ব্যস্ততার দেয়ালে চিঁড় ধরিয়ে অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে পা রাখলো জমিদার পুত্রী। গটগট করে আগাচ্ছে পা। তার পিছুপিছু প্রায় টেনেহিঁচড়ে আনা হচ্ছে আরেক রমণীকে। কিছুটা পথ এগিয়ে এসেই হঠাৎ থেমে গেল নিরু। পরক্ষণেই কোনো প্রকার সতর্কতাবার্তা ছাড়াই দুর্বল রমণীটিকে একপ্রকার উচ্ছিষ্টের ন্যায় ছুঁড়ে ফেলল মেঝের ওপর। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় দূর্বল মাহি কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল শক্ত মেঝেতে। মুহুর্তেই সপ্তদশীর হাত-পায়ের কোমল ত্বকে লাগলো তীব্র ঘর্ষণ । কোথাও কোথাও চামড়া উঠে গিয়ে ক্ষতও সৃষ্টি হলো বোধহয়।
এরূপ আচাঁনক ঘটে যাওয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৃশ্যে চারপাশের কর্মব্যস্ততা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল যেন। উপস্থিত গৃহকর্মীরা চমকে উঠলেন খানিক। কয়েকজন কেমন কপাল কুঁচকালেন জমিদারপুত্রীর ওমন ঔদ্ধত্যে। আবার কেউ কেউ সমস্ত কাজ ফেলে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা অসহায় মাহির দিকে। অথচ জমিদারপুত্রীর মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার ছাপ নেই, বরং কাজলদিঘী চোখজোড়া তাঁর জ্বলছে ক্রোধের দাবানলে। একমুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠস্বরে আওয়াজ তুললো নিরু।
“ বাবা! মা!”
অষ্টাদশীর এরূপ গর্জনে কেঁপে উঠল অন্দরমহলের প্রতিটি দেয়াল। জলোচ্ছ্বাসের বেগে পরমুহূর্তেই মেয়ের কন্ঠ পেয়ে অন্দরমহলে ছুটে এলেন সুদীপা রায়। আশপাশ থেকে সকল কাজ-কম্য ফেলে কানাই দা-ও ছুটে এলেন যেন। সঙ্গে এলো বাড়ির আর-ও কতক পরিজন। উদ্বেগ নিয়ে ছুটে আসতেই তাদের দৃষ্টি গিয়ে আচমকা ঠেকলো মেঝেতে পড়ে থাকা নতুন মেয়েটার দিকে। মুহুর্তেই কপাল কুঁচকে গেল কানাই দা’র। দু-কদম এগিয়ে এসে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ একি! উনি এভাবে মাটিতে পড়ে আছে কেনো? কি হয়েছে উনার? দেখি, দেখি!”
বলতে বলতেই সাহায্যকারী হাতদুটো মাহি’র পানে বাড়ালেন কানাই। ওমনি তার বাড়ন্ত হাত দু’খানা একযোগে আঁকড়ে ধরল নিরু। কানাই ভড়কালেন। সহসা সন্দিষ্ট নেত্র তুলে তাকালেন বোনের পানে। নিরু কেমন দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ খু-নির মেয়েকে ধরো না কানাই দা। অপবিত্র হয়ে যাবে তোমার হাত।”
বিস্ময়ে চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেল কানাইয়ের। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই নিরু কেমন তাচ্ছিল্যের সহিত হাসলো। দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের পানে। আঁচানক ভারী গাম্ভীর্যের সঙ্গে আওড়াল,
“ উনাদের খবর দাও মা। বলে দাও, দীর্ঘ ২৪টা বছর ধরে তাঁরা যার অপেক্ষায় দিবারাত্রি এক করে যাচ্ছে, অবশেষে তাঁর অংশ এ বাড়িতে পা রেখেছে।”
তক্ষুনি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন সুদীপা রায়। বিভ্রমে আওড়ালেন,
“ কে সেই অংশ?”
মুখে প্রতুত্তর করলো না নিরু। ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে কেবল নজর ঘুরিয়ে তাকালো মেঝেতে পড়ে থাকা ক্রন্দনরত মাহি’র পানে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ হওয়া স্বত্বেও ঘেমে-নেয়ে একাকার হিমাংশু রায়। দৃষ্টি ঝুঁকিয়ে জড়সড়ভাব নিয়ে বসে আছেন দাবা কোটের সম্মুখে। অপরপ্রান্তে বসে থাকা রূঢ় মানবের কুটিল চোখদুটো নিষ্পলক আকারে তার পানে নিবদ্ধ। যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে লোকটাকে! হিমাংশু রায় ঘাবড়াচ্ছেন ভীষণ। খানিকবাদে নিজ থেকেই নিরবতা ভেঙে আমতা আমতা স্বরে শুধালেন,
“ ইয়ে মানে…অধীর! আমি আসলে,”
মুহুর্তেই বলিষ্ঠ ঘাড়টা কেমন কাত হয়ে গেল মুগ্ধের। মুখাবয়বে নামলো অদ্ভুত এক শান্তভাব। ভয়ংকর ঠান্ডা কন্ঠে মাঝপথে বলে উঠল,
“ ওকে মে’রেছিস?”
আঁতকে ওঠেন হিমাংশু রায়। নির্দয়ের এরূপ ঠান্ডা কন্ঠ যে বড্ড পরিচিত তার নিকট। ঝড় আসার পূর্বে মুহূর্তের জন্য পরিবেশে যেমন নেমে আসে এক অদ্ভুত শান্তভাব, আজ, এমুহূর্তে রূঢ় মানবের কন্ঠেও নেমেছে একইরকম ভাবস্রোত। হিমাংশু রায় ঢোক গিললেন। ভয়ার্ত আবহে চোখদুটো সামান্য উঁচিয়ে যেই-না চোখাচোখি করবেন, ওমনি সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো অতর্কিত জোরালো আক্রমণ! বলিষ্ঠের শক্ত হাতের হিং স্র থাবা আচমকা চেপে ধরল মধ্যবয়স্কের কন্ঠা। সহসা ভড়কালেন হিমাংশু রায়। অধর নাড়াতে চাইলেন, তবে পারলেন না রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের রুষ্ট শক্তির সনে। ধীরে ধীরে হাতের জোর বাড়াচ্ছে মুগ্ধ। কটমট শব্দ তুলছে তার দাঁতকপাটি। চোখেমুখে নেমে এসেছে আগুনের তীব্র লেলিহান! রাগের তোড়ে অন্ধ মাফিয়া বিস্ট, তক্ষুনি দাঁত খিঁচে অন্যহাতের শক্ত পাঞ্চ বসালেন মধ্যবয়স্কের নাকমুখ বরাবর। মুহুর্তেই তীব্র আঘাতে একপ্রকার থেঁতলে গেল হিমাংশু রায়ের নাকমুখ। নাসারন্ধ্রের তুলতুলে হাড় ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে এলো ল হু। সম্মুখের উপরিভাগের দাঁতকপাটি হতে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল দু’খানা দাঁত। মুগ্ধ থামলো না এটুকুতে। একের পর এক জোরালো পাঞ্চে পুরোপুরি থেঁতলে দিতে লাগলো মধ্যবয়স্কের মুখমণ্ডলের হাড়। হিমাংশু রায় চিৎকার ছুড়ঁছেন। কন্ঠার তীব্র ব্যথায় চিৎকার শোনা যাচ্ছে গোঙানির ন্যায়।
সুদর্শনের মুখাবয়বে লেপ্টে আছে অদৃশ্য আগুন! সম্মুখে বসে থাকা হিমাংশু রায়ের মুখমণ্ডলের যাচ্ছে তা-ই অবস্থা করেও শান্তি হলো না তার। পরপরই লোকটার কন্ঠা ছেড়ে দিয়ে চোখের পলকে আঁকড়ে ধরল মধ্যবয়স্কের ঘাড়ের ত্বক। শক্ত হাতের জোরে এক টানে লোকটার ঘাড় নুইয়ে আহত মুখটা ঠেকালো দাবার কোটের সনে। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল,
“ যেখানে আমার ইউজ করা সামান্য টিস্যুও অন্য কেউ স্পর্শ করার অধিকার রাখে না,সেখানে তুই আমার প্রপার্টি ছুঁয়ে দিলি কোন সাহসে বাস্টা’র্ড? তাও আবার মা-রার উদ্দেশ্যে!”
দূর্বল হিমাংশু রায় গোঙাচ্ছেন শুধু। হাতদুটো কোনমতে তুলে এনে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াস করলেন তিনি। ঠিক তখনি রূঢ় মানবের রুক্ষ হাত উল্টে ধরল হিমাংশু রায়ের বাহাতটা। দক্ষ কৌশলে বেচারার হাতের কব্জিসন্ধি ভেঙে দিলো পরপরই। মুহুর্তেই গগনবিদারী চিৎকারে ফেটে পড়েন আহত মধ্যবয়স্ক। দূর্বল দেহে বাড়ালেন মোচড়ামুচড়ি! তাতে অবশ্য পাত্তা দিলো না মুগ্ধ। বরং হাত ঘুরিয়ে কোমরের পিঠে গুঁজে রাখা রিভলবারটা বের করে এনে, আলগোছে চেপে ধরল হিমাংশু রায়ের মাথার খুলি বরাবর। দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ তুই আমায় বাঁচিয়েছিলি কোনো একদিন! তাই আজ আমি তোর প্রানভিক্ষা দিলাম বান্দীর ছেলে। শোধবোধ হলো সব! বাট নেক্সট টাইম আমার বান্দীর মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে, তোর খুলি উড়িয়ে দিতে ন্যানো সেকেন্ডও ভাববো না আমি। মাইন্ড ইট!”
কাঁশছেন হিমাংশু রায়! কাশির সঙ্গে মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে তাজা লহু। মস্তিষ্কজুড়ে অগাধ প্রশ্ন থাকলেও এমুহূর্তে ঠোঁটের ডগা বাকশূন্য তার। মনে হচ্ছে, অচিরেই হারাবেন জ্ঞান!
রাত ৯টা বেজে ৪৫ মিনিট!
অন্ধকার কাজে গা ডুবিয়ে বসে আছে এডউইন! ধীরলয়ে কুয়োর ওপর থেকে ঝুলে থাকা মোটা দড়ি বেয়ে ছোট ছোট সিঁড়িতে পা ঠেকিয়ে উঠছে ওপরে। সর্বাঙ্গে তাজা লহুর তীব্র উপস্থিতি তার, ফর্সা মুখশ্রীতে গম্ভীর আবহ স্পষ্ট! দাঁতকপাটির মধ্যভাগে আঁটকে রেখেছে একখানা ধারালো চাপাতি। যথাসম্ভব সর্তকতার সঙ্গে মাথা তুলছে ওপরে।
অন্ধকার ঘন-জঙ্গল! কুয়া হতে মাথা তুলে সর্তক দৃষ্টে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে এডউইন। আশেপাশে কারো উপস্থিতি টের না পেয়ে ধীরলয়ে উঠে এলো সে। একলাফে কুয়া থেকে বের হয়ে এসে দাঁড়ালো কুয়ার পাশ ঘেঁষে। অতঃপর বলিষ্ঠ হাতে ফটাফট কুয়োর ঢাকনাটা টেনে দিয়ে আঁটকে দিলো কুয়োর মুখ। ধারালো চাপাতিটা দাঁতকপাটির ফাঁক হতে নামিয়ে এনে, মুখ ভরে থুতু ফেললো এডউইন। র ক্তে ভেজা ধারালো চাপাতিটা খানিক ঝাড়তে ঝাড়তে বিরক্ত মুখে শুধালো,
“ ব্লা’ডি এসহোলের বড়ো ছিদ্র! গার্লফ্রেন্ডের চাইতেও বেশি ক্লান্ত করে দিলো আমায়। বাস্টা”র্ড একটা!”
একযোগে ৯টা দামী দামী বিলাসবহুল গাড়ি এসে সদ্য থামলো জমিদার বাড়ির প্রশস্ত ওয়াক ওয়েতে। সারিবদ্ধ গাড়িগুলোর ইঞ্জিনও থামেনি পুরোপুরি, তার আগেই সবক’টা দুয়ার খুলে গেল গাড়িগুলোর। কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদম তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। বড্ড শৃঙ্খলায় পরক্ষণেই বুক চিতিয়ে তাঁরা দাঁড়ালো ওয়াকওয়ের দু’পাশে। প্রত্যেকের পরনে একইরকম কালো পোষাক! হাত দু’খানা জড়িয়ে ধরে আছে অস্ত্র! প্রায় মুহুর্ত কয়েকবাদেই একদম মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা রেঞ্জ রোভার ব্র্যান্ডের গাড়িটির দুয়ার খুলে গেল। ওপাশ থেকে দু’জন বলিষ্ঠদেহী পুরুষ নেমে এলেন পরপর। তারা ঘুরে এসে দাঁড়ালেন গাড়ির এপাশে। দু’জনার মধ্য থেকে একজন অতি বাধ্যতায় হাত বাড়ালেন নিজের। ঠিক তখনি গাড়ির ভেতর থেকে একখানা চামড়া কুঁচকানো ওয়াকিং স্টিক চেপে রাখা হাত একপ্রকার উপেক্ষা করল বলিষ্ঠের বাড়ন্ত হাতটা। এক নিরব আত্ম অহমিকায় ধীরেসুস্থে গাড়ি থেকে বার করল নিজ দেহটা। মুহুর্তেই দৃশ্যমান হলো — সফেদ রঙা ভেস্তি (লুঙ্গি) কোমরের সনে ভাঁজ করে পরে থাকা এক বৃদ্ধ লোক! গায়ে তার একখানা কালো রঙা কুর্তা। গলায় মোটা মোটা গোল্ডের চেইন। মুখভর্তি লম্বা লম্বা সাদা দাঁড়ি। বাবরিছাঁটা ধবধবে সাদা চুলগুলো যেন তেল দিয়ে টেনে ঝুঁটি বেঁধে রেখেছে পেছনের দিকে। দু’হাতে তার চকচক করছে গোল্ডের আংটিগুলো। চোখে শোভা পেয়েছে একখানা কালো রঙা রোদচশমা। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা জ্বলন্ত সিগার!
বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে রইলো একমুহূর্ত! চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল এক-আধবার পরোখ করল জমিদার বাড়িটা। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ফোঁটালো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। অস্ফুটে বিড়বিড় করল,
“ নাথিং চেঞ্জড!”
দাম্ভিকতায় মোড়ানো ব্যস্ত কয়েকজোড়া পা মাত্রই জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ ঘটালো। ওমনি সকলের অস্থির দৃষ্টিযুগল একত্রে নিক্ষিপ্ত হলো আগত মানবদের দিকে। ঘৃণার অবোধ্য জালে আঁটকা পড়া অষ্টাদশী মুহুর্তেই ভঙ্গুর ভাবস্রোতে আবির্ভূত হলো। টলমল কদম জোড়া তক্ষুনি অগ্রসর হলো তার। ভরে ওঠা চোখের ঝাপ্সা দৃষ্টি অনড় হলো সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের পানে চেয়ে। রমণীর টলমল কদমে জোর কমতেই সে এবার বিধ্বস্তের ন্যায় ছুটলো। ঝড়ো হাওয়ার ন্যায় ছুটে এসে আচানক একহাত ছড়িয়ে লুটিয়ে পড়লো বৃদ্ধর পায়ের কাছে। বৃদ্ধ গম্ভীর! তাকিয়ে আছে অদূরে। নিরু কাঁদলো এবার। বুকভাঙা কাতর আর্তনাদে কাঁপতে লাগল তার ক্ষুদ্র বদন। বৃদ্ধ কিয়তক্ষন গম্ভীর মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে আচানক গমগমে গলায় শুধালো,
“ কোন হে ওহ?”
( কে সে?)
কাঁদতে থাকা নিরু এবার বিনাবাক্যে নিজ বাহাতের তর্জনী ঠেকালো অদূরের মেঝেতে জড়োসড়োভাব নিয়ে বসে থাকা মাহি’র পানে। মুহুর্তেই কয়েকজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আছড়ে পড়ল কম্পিত সপ্তদশীর পানে। বৃদ্ধ শক্তমুখে তৎক্ষনাৎ ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে ইশারা করল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু-বলিষ্ঠ পুরুষকে। তক্ষুনি লোক দু’টো ছুটলো মাহি’র দিকে। একজন তো এগিয়ে এসে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই জোরালো পায়ে আঘাত করে বসলো রমণীর ক্ষুদ্র বদনে। মুহুর্তেই মেঝেতে ফের হেলে পড়ে মাহি। এবার সে বাকশূন্য। একপ্রকার অনুভূতিশূন্যের ন্যায় ঘাড় বাকিয়ে তাকালো নতুন লোক দু’টোর দিকে। বলিষ্ঠদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে হাত চালালো রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানায়। জোরালো চাপড়ে পিষে দিলো মেয়েটার নরম গালের ত্বক। সহসা কেটে গেল মাহি’র ঠোঁটের একাংশ।
অঙ্গন ভর্তি মানুষগুলোর সম্মুখে নির্দোষ মানবী মা-র খাচ্ছে! সুদীপা রায় বড্ড খুশি। নিরু কাঁদছে এখনো। বৃদ্ধের পায়ের কাছে ঠেকিয়ে রেখেছে মাথা। ওদিকে দূর্বল মাহি এবার নিজ বদনের তাল সইতে না পেরে তক্ষুনি চিৎ হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে। অত্যাচারী একজন তৎক্ষনাৎ একখানা ধারালো তলোয়ারের হাতল দু’হাতে চেপে ধরে আহত সপ্তদশীর মাথার ওপর আঘাত করতে উদ্যোত হলো। এহেন কান্ড দেখে তৎক্ষনাৎ চোখমুখ কুঁচকে নিলো মাহি। ধারালো তলোয়ারটা তার কপাল স্পর্শ করতে গেলেই, আচানক একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে নিজেকে উৎসর্গ করল তলোয়ারের নিচে! রুক্ষ হাতের অমসৃণ তালু দিয়ে সহসা চেপে ধরল ধারালো তলোয়ারটা। তলোয়ারের তীক্ষ্ণ আঘাতের অভিঘাতে মুহুর্তেই র ক্তে টইটম্বুর হলো বলিষ্ঠের হাতের মুঠো। টুপ টুপ করে কয়েক ফোঁটা লহু গিয়ে গড়িয়ে পড়ল সপ্তদশীর মুখমণ্ডলে। ত্বরিত চোখদুটো মেলে তাকায় মাহি। দৃষ্টিপটের সম্মুখে ঝুঁকে থাকা রূঢ় মানবকে দেখে, অজান্তেই বুকের ভেতরটা কেমন ধ্বক করে উঠল তার। এদিকে, মুগ্ধ কেমন র*ক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সম্মুখের অত্যাচারীর পানে। রাগের তোড়ে তাঁর চোয়াল কাঁপছে। বলিষ্ঠ হাতদুটোর মাসেলগুলো আগের চাইতে ফুলেফেঁপে হয়েছে দ্বিগুণ! ঘাড়ের সবক’টা রগ দৃশ্যমান হয়েছে ইতোমধ্যেই।
রূঢ় মানব সময় নিলো না। আহত হাতের জোরালো টানে তক্ষুনি তলোয়ারটা ছিনিয়ে আনলো অত্যাচারীর হাত থেকে! পরক্ষণেই পলক ফেলতে না ফেলতে তলোয়ারটা দক্ষ কৌশলে ঘুরিয়ে এনে এক ঝটকায় আড়পার করে দিলো অত্যাচারীর উদর বরাবর। তক্ষুনি মুখগহ্বর হতে লহু ছিটকে বেরিয়ে এলো লোকটার। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সবাই! হতভম্ব হলেন জমিদার বাড়ির সকলে। আহত হিমাংশু রায় গৃহকর্মীর ঘাড়ের ওপর হাতভর দিয়ে সদ্যই এসে দাঁড়িয়েছিলেন অন্দরমহলে। তবে দৃশ্যপটের সম্মুখে এহেন দৃশ্য দেখে মুহুর্তেই জমে গেলেন তিনি। ওদিকে, অন্দরমহলের আদ্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ কেমন গম্ভীর মুখে দেখছে সবকিছু। তার মধ্যে তেমন হতবাকতার ছাপ নেই।
মুগ্ধ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য! একটানে লোকটার উ দ র হতে ধারালো তলো য়ারটা বের করে এনে, ফের ঢুকিয়ে দিলো একইস্থানে! এবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না লোকটা। একপ্রকার ছটফট করতে করতে পড়ে গেলেন মেঝেতে। রূঢ় মানব একমুহূর্ত থামলো। ত্রস্ত ঘাড় বাকিয়ে তাকালো মেঝেতে পড়ে থাকা মাহি’র পানে। মুহুর্তেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা পরিলক্ষিত হলো তার বদনে। সপ্তদশীর আহত কপাল, কে টে যাওয়া ঠোঁটের একাংশ! সবকিছু কেমন তীরের ফলার ন্যায় বিঁধতে লাগল তার অন্তরে। মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ ছুটে এলো রমণীর ধারে। দু’হাতের অসামান্য জোরে মেয়েটাকে তুলোর ন্যায় তুলে এনে দাঁড় করালো নিজ সম্মুখে। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অনুভুতিশূন্য রমণীর পেলব গালদুটোয় হাত ঠেকিয়ে ব্যাকুল কন্ঠে আওড়াল,
“ কে করেছে? কে করেছে এসব? বল একবার… তাকা আমার দিকে।”
মাহি কাঁপছে ভীষণ! তার ছলছলে চোখদুটো ধীরলয়ে তাক হলো বেপরোয়া যুবকের পানে। মুহুর্তেই সম্পূর্ণ পৃথিবী দুলে উঠল মুগ্ধের। রমণীর চোখদুটো তার নিকট অভিযোগ করছে। সঠিক সময়ে তার পাশে না থাকার তীক্ষ্ণ অভিযোগ! তৎক্ষনাৎ হাসফাস বেড়ে গেল মুগ্ধের। উন্মত্ত হলো কর্মকাণ্ড! রমণীকে নিজের বড্ড কাছে টেনে এনে উদ্বিগ্ন স্বরে আওড়াল,
“ না না! এভাবে তাকাস না। এই তো, এই যে আমি এসেছি। আর ভয় নেই! আর কোনো ভয় নেই। কে করেছে এসব বল? কে তুলেছে তোর গায়ে হাত?”
“ আমি তুলেছি!”
কথার মাঝে অন্যত্র হতে ভেসে আসা নারী কন্ঠে থেমে গেল মুগ্ধের অস্থির বাক্যালাপ। ধীরলয়ে দৈবাৎ শক্তিতে কাত হলো বলিষ্ঠ ঘাড়টা। অগ্নিদৃষ্টিযুগল আচানক গিয়ে ঠেকল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরুর পানে। মুহুর্তেই চোয়ালের পেশি টানটান হলো রূঢ় মানবের। গায়ে ছড়ালো তেজ! সে আলগোছে হাত নামিয়ে দিলো মাহি’র নরম গালদুটোর ওপর থেকে। পরপরই বলিষ্ঠ দেহটা ঘুরিয়ে এনে, পায়ে টানলো গতি। ক্ষুব্ধ বাঘটা মেয়ের পানে অগ্রসর হচ্ছে বলে ভড়কালেন সুদীপা রায়। ত্রস্ত এগিয়ে এসে দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দাঁড়ালেন মেয়েকে আড়াল করে। শক্ত মুখে আওড়ালেন,
“ ওর মা-রার পেছনে কারণ আছে অধীর! তুমি যে-ই মেয়েকে এ বাড়িতে তুলে এনেছো সে-ই মেয়ে আর কেউ নয়, তোমার চিরশত্রু তায়েফ এহসানের মেয়ে।”
“ তো?”
যুবকের ঠান্ডা, নির্লিপ্ত প্রতুত্তরে আকাশ থেকে পড়লেন সুদীপা রায়-সহ উপস্থিত সকলে। নিরুর চোখদুটো যেন এক্ষুনি বিস্ময়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড়। হিমাংশু রায় এতক্ষণ যাবত নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার মনে হচ্ছে গায়ে জোর পেয়েছেন আকস্মিকভাবে। তেতে উঠে কদম বাড়িয়ে এগিয়ে আসবেন, ঠিক তখনি স্ত্রী তাঁর মুখ খুললো যমের সম্মুখে দাঁড়িয়ে।
“ তো? তো মানে? তোর মা’র খু**নের জন্য ওর বাপ দায়ী, সেটা জানার পরও তুমি এতোটা শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো অধীর? তুমি কি ভুলে গিয়েছো তোমার মায়ের প্রতিশোধ? ভুলে গিয়েছো মায়ের কষ্টের পরিণতিগুলো? ওর বাপ তোমার মায়ের সঙ্গে এতকিছু করলো আর তুমি ওকে এতো সহজে ছেড়ে দিচ্ছো? অথচ তোমার উচিৎ ছিল ওকে মে*রে….!”
বাকিটা পূর্ণ করবার পূর্বেই আচমকা রমণীর গ্রীবাদেশে আক্রমণ বসলো মুগ্ধের হিং স্র থাবার। অসামান্য জোরে রমণীর কন্ঠার হাড়গোড় একপ্রকার ভেঙে দেবার প্রয়াসে মত্ত সে। ধীরলয়ে উঁচিয়ে তুলছে রমণীর ভারী দেহটা! হিং স্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ দোষ করলে ওর বাপ করেছে, ও না। তাহলে ওর মতো নির্দোষকে মা-রার কথা মুখে আনিস কোন সাহসে কু***বাচ্চা?”
এরূপ হুংকারে পুরো অন্দরমহল জুড়ে একপ্রকার অস্থিরতা ছেয়ে গেল যেন। নিরু চিৎকার দিয়ে ছুটে এলো মা’কে বাঁচাতে। তা-ই যেন কাল হলো মেয়েটার কপালে! রূঢ় মানবের দু’হাত চেপে মা’কে ছাড়ানোর প্রয়াস করতে গেলেই, আচানক তার-ও কন্ঠনালী চেপে ধরে মুগ্ধ! আজ সকল বাঁধ ভুলে গিয়ে দু-মা-মেয়েকে একযোগে উচিঁয়ে তুললো শূন্যে। হিমাংশু ত্রস্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছুটে এলেন। আশেপাশের যত লোক ছিলো সকলে ছুটে এলেন তার দেখাদেখি। কেউ কেউ ভুলক্রমে দু’হাতে চেপে ধরল মুগ্ধের বলিষ্ঠ হাতদুটো। ছাড়াতে চাইলো দু মা-মেয়েকে। তবে বালাইষাট! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষটা টললোও না খানিক। উল্টো জোর বাড়ালো হাতের।
নিরু চোখ উল্টে নিচ্ছে ক্রমশ! নিশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় তাঁর। হিমাংশু রায় ছটফট করছেন স্ত্রী -সন্তানের জন্য। যুবকের হাতদুটো টানতে গিয়ে বারংবার ব্যর্থ হয়ে যে-ই না পিছু ঘুরবে, ওমনি পেছন থেকে আগত বলিষ্ঠ পুরুষ একখানা মোটা বাঁশ এনে তৎক্ষনাৎ আঘাত করে বসলো রূঢ় মানবের পিঠে। মুহুর্তেই শুকনো বাঁশটা কেমন খরখর করে ভেঙে গেল ইস্পাত-দৃঢ় মানবের গায়ে। হতভম্ব বনে গেল অত্যাচারী লোকটা! হতবাক দৃষ্টে তাকালো হাতে থাকা ভাঙা বাঁশটার দিকে। একি লোক রে বাবা! আঘাত করতে গিয়ে বাঁশটাই ভেঙে গেল? এ মানুষ না পাহাড়? মুগ্ধের ট্যাটুশৈলীতে অঙ্কিত ফর্সা পিঠে আঘাতের ছাপ বসেছে তীব্র! তবুও এরূপ জোরালো আঘাতের অভিঘাতে খুব একটা নড়চড় করেনি মুগ্ধ। স্রেফ শক্ত হাতের জোরে দু মা-মেয়েকে বাতাসের সনে ছুঁড়ে ফেললো দু’দিকে। মুহুর্তেই দু’ধারে ছিটকে পড়ল নিরু আর সুদীপা রায়। সুদীপা রায় জ্ঞান হারিয়েছেন ইতোমধ্যেই। নিরু কাশছে ভীষণ!
এদিকে মুগ্ধ এবার ঘাড় বাকিয়ে তাকালো আঘাত করা লোকটার পানে। তরঙ্গের ন্যায় একবার ঝাঁকাল বলিষ্ঠ বদন। তা দেখে আঁতকে উঠে লোকটা! ত্বরিত বাঁশের খণ্ডাংশ হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে লাগালো ভোঁদৌড়। মুগ্ধও ছুটলো এবার! তাকে প্রতিহত করতে বৃদ্ধের সঙ্গে আগত লোকগুলো এগিয়ে এসে মা’রতে উদ্যোত মাফিয়া বিস্টকে। অথচ বোকা তাঁরা জানেই না, তাঁরা যার ওপর হাত তুলতে এসেছে — তার দিকে চোখ তুলে তাকানোও নিষেধ! বডিগার্ড গুলো একত্রে ছুটে এলো মুগ্ধের দিকে। কেউ উঁচাল লাথি, তবে তা বলিষ্ঠ পুরুষের গায়ে আঘাত হানার পূর্বেই সুদর্শনের শক্ত পায়ের বলিষ্ঠ লাথির আক্রমণে ছিটকে গেল কয়েক হাত দূরে। কেউ আনলো অস্ত্র! তাকে দক্ষ হাতের কৌশলে বেঁধে নিলো মুগ্ধ। কারো পেটে দিয়ে বসলো শক্ত হাতের পাঞ্চ!
এডউইন ততক্ষণে এগিয়ে আসতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। একাই প্রতিহত করে ছাড়লো সবক’টা ইদুর ছানাকে। ওদিকে, গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ এবার আলগোছে গা এলিয়ে বসল পেছনে রাখা চেয়ারে। এক ঝটকায় পায়ের ওপর পা তুলে গমগমে গলায় শুধালো,
“ আবে এক কাপ চায় লে আও কোয়ি। এসি সিন বিনা চায় থোড়েই দেখনে মে মাজা আতা হে।”
মাফিয়া বিস্ট বেধড়ক মারধর করে যাচ্ছে চুনোপুঁটিদের। পুরো অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গন ভরে গিয়েছে আহত লোকেদের স্তুপে। কেউ কেউ কাতরাচ্ছে! কেউ হারিয়েছে প্রাণ। কেউবা ম-রার ভয়ে গুটিয়েছে গা। অদূরেই অর্ধনিমীলিত চোখে কাতরাচ্ছে লোকটা, যিনি কিছুক্ষণ আগে বাঁশ দিয়ে আঘাত করেছে মুগ্ধের গায়ে। বলিষ্ঠ ক্ষুব্ধ মানব এবার পা ছোটালো তার দিকে। পথিমধ্যে মেঝেতে পড়ে থাকা র**ক্তাক্ত তলোয়ারটা তুলে নিলো একহাতে। এগিয়ে এসে আচমকা লোকটার বুক বরাবর চাপলো নিজ বলিষ্ঠ পা! তলোয়ারটা প্রায় উঁচিয়ে তুলতেই অদূর থেকে এতক্ষণে চিৎকার দিয়ে ওঠেন হিমাংশু রায়। ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন,
“ একটা যেন-তেন দু’পয়সার মেয়ের জন্য পুরো বাড়িতে এমন তান্ডব চালানোর কি আছে অধীর? ও তো…!”
মধ্যবয়স্কের কথাটা শেষ হবার পূর্বেই রূঢ় মানব আচানক দেখিয়ে বসলেন নিজ চিরচেনা হিং স্র তা। সম্মুখে পায়ের তলায় পড়ে থাকা বেচারা লোকটার কন্ঠা বরাবর ঠেকিয়ে রাখা ধারালো অ স্ত্রটা আড়পার করে দিলেন মুহুর্তেই! এহেন অতর্কিত নৃ শং সতায় স্তব্ধ বনে গেলেন হিমাংশু রায়। হতভম্বতার রেশ কাটতে না কাটতেই মুগ্ধ করে বসল আরেক কান্ড! তক্ষুনি মৃ ত প্রায় লোকটাকে দু’হাতে শূন্যে তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ক্ষুব্ধ কন্ঠে তুললো হিং স্র গর্জন!
“ স্ত্রী হয় আমার! কোনো যেন-তেন দু’পয়সার মেয়ে নয়, বরং অধীর রায়ের অর্ধাঙ্গিনী হয় ও। সো কল হার মিসেস অধীর রায়!”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯ (২)
বলেই লোকটাকে হিমাংশু রায়ের আহত গায়ের ওপর ছুঁড়ে ফেলল মুগ্ধ। এদিকে তাঁর এমন অকপট স্বীকারোক্তিতে তাজ্জব বনে গেলেন সকলে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অনুভূতি শূন্য সপ্তদশীর চোখদুটো বোধহয় ঝাপ্সা হয়ে এলো এবার। অথচ এরূপ বাক্যবাণ যে কোনো একজনের নির্মল হৃদয়টা ক্ষত-বিক্ষত করে দিলো মুহুর্তেই! ঘোলাটে করে দিলো চোখ। নিশ্বাস আঁটকে দিলো গলার কাছে!
