Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৪

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৪

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৪
YASH

ইনায়া কেয়ারাকে কোলে নিয়ে নিজেদের রুমে চলে এলো। বিছানায় ওকে বসিয়ে দিতেই দরজার দিকে চোখ গেল দুজনের। আবির মির্জা ঘরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বাবার ক্লান্ত হাসিমুখটা দেখামাত্রই কেয়ারা বিছানা ছেড়ে এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়লো।
আবির মির্জা দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতেই সে ডানপিটে পাখির মতো উড়ে গিয়ে তাঁর কোলে উঠে বসল।
পুতুলের মতো ছোট্ট কেয়ারাকে বুকে জড়িয়ে নিতেই আবিরের সারাদিনের ক্লান্তি, সব মানসিক চাপ যেন কর্পূরের মতো উবে গেল।

কেয়ারা আবিরের গলাটা তার ছোট্ট দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে একদম গাল ঘেঁষে ঝুলে পড়লো। চোখ দুটো টিমটিম করে মায়াবী কন্ঠে আবদার মিশিয়ে বললো, “তেয়ারা পাপাকে অনেক মিছ তরেছে!”
মেয়ের মুখে এমন আধো-আধো মিষ্টি কথা শুনে আবিরের বুকটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল। সত্যিই এক পাকা বুড়ি হয়েছে মেয়েটা! কত সাধনা, কত মানত আর প্রার্থনার পর এই ছোট্ট প্রাণটাকে নিজের জীবনে পেয়েছেন তিনি। জীবনের এক চরম শূন্যতার মাঝে এই মেয়েটাই তো তাঁর বেঁচে থাকার নতুন আলো। আবির কেয়ারার নরম গালে একটা চুমু খেলেন। উথলে ওঠা আবেগ সামলে নিয়ে বেশ নরম গলায় বললেন, “পাপাও তার এই পুতুল মাকে অনেক মিস করেছে।”
বাবার আদুরে কথায় কেয়ারা একদম হেসে কুটিকুটি হয়ে গেল। তার দুই গালে মিষ্টি টোল দুটো ভেসে উঠলো। সে আবিরের চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো, “পাপা, তুমি তেয়ারা আর ইনু আপুর জন্য তিছু আনো নি?”
আবির মির্জা মেয়ের এই কৌতূহল দেখে মৃদু হাসলেন। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে কাছে ডাকলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ মা, এনেছি তো। আমার দুই মায়ের জন্যই অনেক অনেক চকলেট এনেছি।”
কথাটা শেষ করেই আবির মির্জা তাঁর সাথে থাকা বড় ব্যাগটি টেবিলের ওপর রাখলেন। একে একে সেখান থেকে বের হতে লাগলো কেয়ারা আর ইনায়ার পছন্দের সব লোভনীয় জিনিস। চিপসের বড় বড় প্যাকেট, হরেক রকমের চকলেট, কিউট কাপ কেক আর সুস্বাদু পেস্ট্রি থেকে শুরু করে রকমারি মজাদার খাবারের পসরা সাজিয়ে দিলেন টেবিল জুড়ে। টেবিল ভর্তি খাবারের এই পাহাড় দেখে কেয়ারা তো আনন্দে ইনায়ার হাত ধরে ছটফট করতে লাগলো। মির্জা বাড়ির এই ঘরটিতে যেন এক নিমিষেই এক টুকরো আনন্দ এসে ভর করলো।
টেবিল ভর্তি চকোলেট আর চিপস দেখে কেয়ারা আনন্দে নাচানাচি করলেও ইনায়ার মুখটা হঠাৎ কেমন যেন ছোট হয়ে গেল।

তার চেহারায় এক অজানা আশঙ্কার ছায়া। সে চট করে কেয়ারার হাতটা ধরে বেশ গম্ভির গলায় বললো, “বুনু, একটা কথা শোনো। তুমি আর কখনো ইয়াশের রুমে বা ওর কাছে যাবা না।”
বড় বোনের মুখে এমন নিষেধাজ্ঞা শুনে কেয়ারার চঞ্চলতা এক নিমেষেই দমে গেল। সে অবাক হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো, “তেনো যাবো না আপি?”
ইনায়া কেয়ারার কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো, “তুমি দেখো নি আজকে ও স্কুলের ক্লাসরুমে কীভাবে ওই ছেলেটাকে ধিসুম-ধিসুম করে মেরেছে? ওর রাগ দেখো নি কত ভয়ংকর? ও যদি কোনোদিন কোনো কারণে রেগে গিয়ে তোমাকেও ওভাবে মেরে বসে, তখন কী হবে? ওর থেকে একদম দূরে থাকবা তুমি।”
আপ্পির মুখে ইয়াশ ভাইয়ার এই কথা শুনে কেয়ারার ছোট্ট মনটা ভেঙে গেল। সে কিছুটা কাঁদো কাঁদো গলায় প্রতিবাদ করে বললো, “উঁহু! ভাইয়া তেয়ারাকে মাববে না আপি।”
ইনায়া এবার একটু কড়া গলায় ধমক দেওয়ার সুরে বললো, “ওর কোনো বিশ্বাস নেই, রেগে গেলে মেরেই দিতে পারে। আমি বলছি তুমি ওর কাছে যাবে না, একদম দূরে থাকবে। আর যদি ওর কাছে যাও, তাহলে আপু কিন্তু তোমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলবে না।”
আপ্পি কথা বলবে না এই হুমকিটা কেয়ারার জন্য মস্ত বড় শাস্তি। সে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। একদিকে ইয়াশ ভাইয়া, অন্যদিকে আপ্পি। সে নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে একটুখানি জায়গা দেখিয়ে মন খারাপ করে বললো, “আচ্ছা তেয়ারা ভাইয়ার তেকে এত্তু দূরে তাকবে।”

মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে এত গম্ভীর আলোচনা করছে, তা এতক্ষণ আবির মির্জা চুপচাপ শুনছিলেন। এবার তিনি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন, “মা, ছোট বোনকে এইরকম ভয় দেখিয়ো না তো। ইয়াশ আর যাই করুক, নিজের বোনকে কখনো মারবে না। ও ওইরকম ছেলে না।”
ইনায়া তার বাবার দিকে ফিরে কিছুটা জেদ মেশানো গলায় বললো, “পাপা, তুমি জানো না ও আজকে স্কুলে মারামারি করেছে!ওর কাছে থাকলে ও যেকোনো দিন কেয়ারাকেও মেরে দিতে পারে।”
আবির মির্জা হেসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, “মারবে না মা। ও এখনো ছোট মানুষ, এই বয়সের ছেলেরা একটু-আধটু মারামারি করেই থাকে। তাছাড়া ও বাইরের একটা ছেলেকে মেরেছে বলে কি বোনকেও মারবে?”

বাবার এমন কথায় ইনায়া একটু দমে গেল। সে মনে মনে ভাবলো পাপা হয়তো ঠিকই বলছে। তবুও নিজের ভেতরের আশঙ্কাটা পুরোপুরি কাটাতে না পেরে মুখটা কুঁচকে বললো, “তাও ঠিক কিন্তু তবুও কেয়ারাকে ওর সাথে ওতো বেশি মিশতে হবে না।”
‘মিশতে হবে না’ কথাটা শুনতেই কেয়ারার চোখের কোণ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো। সে আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারলো না। শব্দ করে কান্না জুড়ে দিয়ে ভাবলো সে কেন ভাইয়ার সাথে মিশবে না? ভাইয়া তো তাকে কত আদর করে
কেয়ারার এই আকস্মিক কান্না দেখে ইনায়া একদম ভড়কে গেল। আবির মির্জাও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ইনায়া তাড়াতাড়ি কেয়ারাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে নরম গলায় বললো, “আচ্ছা বাবা আচ্ছা, কাঁদো না। ঠিক আছে, যেও ভাইয়ার কাছে। আর বারণ করবো না, প্রমিজ।”
আপ্পির মুখে প্রমিজ শব্দটা শুনেই কেয়ারা কান্না থামিয়ে আবার একটা মিষ্টি হাসি দিল।
দুই মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে, তাদের ঘুম পাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আবির মির্জা।

রাত বেশ গভীর হলেও চোখের ঘুম উধাও। তিনি আদিল মির্জার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলেন আদিল মির্জাও তখনো জেগে আছেন। দুই ভাই মিলে খাটের একপাশে বসে গভীর রাত অব্দি ব্যবসার কিছু অত্যন্ত জরুরি ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন। দেশের বাইরের নতুন প্রজেক্ট এবং রাজনৈতিক কিছু জটিলতা নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে রাতের শেষ প্রহর পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটলো, তা তারা টেরই পেলেন না।
পরদিন সকাল…
আজকে ছুটির দিন হওয়ায় পুরো মির্জা বাড়িতে এক শান্ত পরিবেশ। স্কুল-কলেজ বা অফিসের তাড়া নেই কারও। তবে ইনায়ার ঘুম ভেঙেছে বেশ সকালেই। সে বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে গেল রান্নাঘরে। ছুটির দিনে কিচেনে গিয়ে রান্নার আন্টিদের গল্পগুজব করা ইনায়ার একটা অনেক দিনের অভ্যাস।
এরপর ও রুমে চলে গেলো ইনায়া দেখলো ঘুম থেকে উঠেই কেয়ারা সারা ঘর জুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে।
ইনায়া জোর করে ওকে এক জায়গায় বসিয়ে নাস্তা খাইয়ে দিল। এরপর দুই বোন মিলে বিছানায় বসে পুতুল খেললো এরপর বেশ কিছুক্ষণ মন দিয়ে টিভিতে কার্টুন দেখলো।
কার্টুন দেখা শেষ হতেই কেয়ারা হঠাৎ এক অদ্ভুত জেদ ধরে বসলো। সে ইনায়ার জামা টেনে ধরে আবদার করলো, “আপি, তেয়ারা শালি পলবে!”

ইনায়া তো হেসেই কূল পায় না। সে কেয়ারাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু কেয়ারা কিছুতেই শুনবে না। তার এক কথা সে শাড়ি পরবেই, অন্যথায় কান্না শুরু করবে। বোনের চোখের কোণে পানি জমতে দেখে ইনায়া আর না করতে পারলো না। সে ওয়ারড্রব খুলে তাদের মায়ের একটা লালচে ওড়না বের করলো। চার বছরের ছোট্ট শরীরে সেই ওড়নাটাই কুঁচি আর আঁচল দিয়ে কোনো রকমে শাড়ির মতো করে পেঁচিয়ে দিল। শুধু তাই নয়, কেয়ারার সাজ সম্পূর্ণ করতে আলমারি থেকে লাল টিপ এনে ওর কপালে পরিয়ে দিল, আর ঠোঁটে হালকা করে একটু লাল লিপস্টিক মাখিয়ে দিল।

কেয়ারা কোথাও একটা শুনেছে যে বউরা শাড়ি পরে, তাই সে-ও আজকে শাড়ি পরে মনে মনে বউ সেজে গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখেই তার খুশি আর ধরে না! সে ওড়নার আঁচলটা এক হাতে ধরে খুশিতে নাচতে নাচতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা আবির মির্জা আর আদিল মির্জাকে গিয়ে নিজের শাড়ি দেখালো। দুই ভাই তো পুতুলের মতো সাজা এই পিচ্চি মেয়েটাকে দেখে হেসেই খুন। আবির মির্জা কোলে তুলে নিয়ে অনেক আদর করলেন।

বাড়ির সবাইকে নিজের সাজ দেখানো হলেও কেয়ারা খেয়াল করলো, একজন মানুষকে তখনো দেখানো হয়নি। সে হলো তার ইয়াশ ভাইয়া। কেয়ারা নিজের ওড়নার শাড়িটা দুই হাতে আলতো করে চেপে ধরে গুটিগুটি পায়ে দৌড়ে গেল ইয়াশের ঘরের দিকে। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকে দেখলো ইয়াশ তখনো বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কেয়ারা একদম সাবধানে খাটের ওপর উঠে গেল। তারপর ইয়াশের মুখের খুব কাছে ঝুঁকে নিজের ছোট্ট হাতটা ইয়াশের মাথায় আর চুলে বুলিয়ে দিল।
মাথায় স্পর্শ পেতেই ইয়াশ সাথে সাথে চোখ খুললো। ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে যা দেখলো, তাতে সে পুরো থমকে গেল! কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার চোখের পলক পড়লো না। কপালে লাল টিপ, ঠোঁটে লিপস্টিক আর গায়ে লাল ওড়নার শাড়ি জড়ানো কেয়ারাকে হুবহু একটা জীবন্ত পুতুল লাগছে।
কেয়ারা ইয়াশের বাদামী চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের দুই গালে টোল ফেলে লাজুক হেসে বললো, “তেয়ারা শাড়ী পরেচে ভাইয়া, তেয়ারাকে বউ বউ লাগচে না?”

ইয়াশ ঘুমঘুম চোখেই কেয়ারার দিকে তাকিয়ে রইলো। সে ফিসফিস করে বলে উঠলো, “এসব পরে কেন এসেছিস আমার সামনে? চল, তোকে আমি এখনই বিয়ে করবো।”
বিয়ে শব্দের মানে না বুঝলেও কেয়ারা খুশিতে খিলখিল করে হেসে উঠলো। সে এক লাফে খাট থেকে নিচে নামতে গেল। কিন্তু পায়ের কাছে মায়ের সেই বড় ওড়নার আঁচল পেঁচিয়ে থাকায় সে ভারসাম্য রাখতে পারলো না। উষ্টা খেয়ে সরাসরি মেঝের শক্ত কাঠের ওপর পড়ে গেল কেয়ারা।
“বাটারফ্লাই”

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৩

ইয়াশের বুক চিরে এক তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এলো। সে এক সেকেন্ডে ও দেরি না করে খাট থেকে নিচে নেমে ছিটকে গিয়ে কেয়ারাকে নিজের দুই বাহুর মাঝে তুলে নিলো। ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। শক্ত মেঝেতে আঘাত লাগার কারণে কেয়ারার নিচের ঠোঁটের একপাশটা ফেটে সামান্য রক্ত জমতে শুরু করেছে। তীব্র ব্যথায় কেয়ারা চোখ বন্ধ করে ইয়াশের গলার কাছে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। আর ইয়াশ নিজের বুকে জড়িয়ে থাকা কেয়ারার ঠোঁটের ওই আঘাতের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের রাগে কাঁপতে লাগলো। সব দোষ ইডিয়ট বেডের বেয়াদবটা তার বাটারফ্লাই কে কষ্ট দিলো? ইয়াশ কেয়ারাকে কোলে নিয়েই একটা জোড়ে লাথি বসিয়ে দিলো বেডে, এরপর একটানে কেয়ারার শাড়ী খুলে ফেললো।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৫