যেই তুমি এলে পর্ব ১২ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
পানির কলটা এখনো অনবরত ঝরে চলেছে।
ওয়াশরুমের ওয়াশবেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাতে সাদা শার্টটা আঁকড়ে ধরে আছে কাইফা। মনোযোগ দিয়ে বারবার আঙুল বুলিয়ে যাচ্ছে বুকের বাঁ পাশে লেগে থাকা মেহেদির দাগটার ওপর। কখনো পানি ঢালছে, কখনো সাবান ঘষছে। কিন্তু যতই চেষ্টা করছে, দাগটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাচ্ছে না। শুধু গাঢ় লালচে রঙটা একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে। মেয়েটার বিরক্তি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। ঠোঁট ফুলিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
“ এই একটা শার্টের জন্য এসবের কোনো মানে হয়! এটা ব্যতীত কি আর কোনো শার্ট নেই লোকটার! ”
কথার মাঝেও হাত থামাল না সে। আরও একবার দাগটার ওপর সাবান মেখে জোর খাটিয়ে ঘষতে লাগল। শেষবারের মতো পরিষ্কার পানি ঢেলে শার্টটা তুলে ধরল চোখের সামনে।
মেহেদির দাগটা পুরোপুরি উঠে নি তবে গাঢ় রঙটা হালকা ফিকে হয়ে এসেছে। কাইফা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা বন্ধ করল।
“ যতটুকু সম্ভব তো করলাম…”
মনে মনে কথাটা বলে ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই স্বভাববশত দৃষ্টি ঘুরিয়ে পুরো কক্ষটা একবার দেখে নিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার পদক্ষেপ থেমে গেল। ঘরে কেউ নেই।
কয়েক মিনিট আগেও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই। চারপাশে শুধু নিস্তব্ধতা। কাইফা খানিকটা বিস্মিত দৃষ্টিতে পুরো কক্ষটা আরেকবার দেখে নিল। তারপর হাতে ধরা শার্টটা নিয়ে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই–
খট…
দরজাটা খুলল না। ভ্রু কুঁচকে আবারও চেষ্টা করল সে। এবারও একই ফল। কাইফার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
“ দরজাটা কি বাইরে থেকে লক করে গেলেন উনি? কিন্তু কেন? ”
রমণীর অস্থির মস্তিষ্ক ঘটনার কারণ খুঁজতে লাগল। তবে কোনো উত্তর মিলল না। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে সে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল,
“ বাইরে কেউ আছেন? একটু দরজাটা খুলে দিন প্লিজ! ”
অপর পাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কাইফা ফের ডেকে উঠল,
“ এই যে, কেউ শুনতে পাচ্ছেন? ”
নিস্তব্ধ পরিবেশের কেবল রমণীর ব্যার্থ শ্বাস নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। কাইফা এবার ব্যালকনির দিক এগোলো। সেখান থেকে বাড়ির পেছনের দিকটা দেখা যাচ্ছে। চারপাশে নজর বুলিয়ে কারো সন্ধানই মিলল না।
“ এখন আমি কিভাবে বেরোব! লোকটা এত্তো বিটকেল খোদা তায়ালা! ”
কথাটা শেষ হতেই আবার ভেতরে ফিরে এল সে। দরজার কাছে গিয়ে আরেকবার ডাক দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই কক্ষের বাইরের করিডোরে ভেসে এলো কারও পায়ের শব্দ। কাইফা তৎক্ষনাৎ থেমে গেল। শব্দটা ক্রমশ দরজার কাছাকাছি আসতে লাগল। পরমুহূর্তেই বাইরে থেকে চাবি ঘোরানোর শব্দ–
ক্লিক..
দরজার লক খুলে গেল।
কাইফা অবাক হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইল। পরমুহূর্তেই দৃশ্যমান হলো কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির অবয়ব।
দরজার ওপাশে নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে রিক্ত। ঘর্মাক্ত মুখশ্রী, পরণের কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। মুখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ত ভাব। স্থির, শীতল দৃষ্টি কাইফার মুখে আটকে রেখেই ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সে। সামনে এসে ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে জানতে চাইল,
“ কাজ শেষ? ”
“ আপনি দরজা লক করে গিয়েছিলেন কেন? ”
উত্তরের বদলে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল কাইফা। রিক্ত নির্বিকার। প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো বা উদ্বেগের ছাপ দেখা গেল না তার মাঝে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কাইফার হাত থেকে শার্টটা নিয়ে দাগের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ এটা পরিষ্কার হয়েছে বলে তোমার মনে হচ্ছে? ”
কাইফা ঠোঁট চেপে রইল।
“ যতটুকু উঠেছে, উঠেছে। মেহেদির দাগ এর চেয়ে আর বেশি উঠবে না। ”
“ আমি যতটুকু বলেছিলাম, ততটুকু হয়নি। ”
বলেই শার্টটা আবার তার দিকে বাড়িয়ে দিল রিক্ত।
“ ঠিকমতো ধুয়ে আনো। ”
কাইফার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“ হোয়াট? আবার? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ আমি আর পারব না। ”
“ তোমার মতামত জানতে চাইনি আমি! ”
নিরাসক্ত স্বর। কাইফার মেজাজ এবার সত্যিই বিগড়ে গেল।
“ আপনার কি এটা ছাড়া আর কোনো শার্ট নেই? ”
“ সেটা জেনে তোমার কাজ নেই। ”
“ দেখুন এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আমি তো বললাম মেহেদির দাগ এর চেয়ে বেশি আর উঠবে না! ”
“ উঠবে কি উঠবে না, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে আমি যেটা বলেছি, সেটা করো। ”
মানুষটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কাইফা। কয়েক মুহূর্ত নীরব লড়াই চলল দু’জনের চোখে চোখে। শেষ পর্যন্ত বিরক্তিতে শার্টটা টেনে নিয়ে গটগট পায়ে আবার ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল রমণী।
ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই রিক্ত ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসল। মাথাটা পেছনে এলিয়ে চোখ বন্ধ করল। বাইরে অতিথিদের অস্পষ্ট কোলাহল ভেসে আসছে। ভেতরে শুধু পানির শব্দ। এভাবেই কাটল কিছুটা সময়।
হঠাৎ–
“ আহ…! ”
ব্যথায় চাপা একটা আর্তনাদ ভেসে এল ওয়াশরুম থেকে। রিক্ত চোখ মেলে সোজা হয়ে বসল। শিথিল ভ্রূ যুগল কুঁচকে গেল মুহূর্তেই। পদ যুগল ত্রস্ত ছুটল ওয়াশরুমের দিকে। দ্রুত দরজার কাছে গিয়ে কড়া নাড়ল।
“ কাইফা? ”
নামের মালকিন হতে কোনোরূপ সাড়া পাওয়া গেল না। কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল। কাইফা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওর দুই হাতের আর্দ্র আঙুলগুলো টকটকে লাল হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ঘষতে ঘষতে কয়েক জায়গার চামড়াও উঠে গেছে। রিক্তর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল। কিয়ৎক্ষণ জড় পদার্থের ন্যায় নির্জীব হয়ে রইল মানব। পরপরই চোয়াল শক্ত করে বলল,
“ এত জোরে ঘষার কী দরকার ছিল?”
“ আপনিই তো বলেছিলেন পরিষ্কার করতে। ”
কণ্ঠে সামান্য রাগ ও চাপা অভিমান নিয়ে বলল কাইফা। রিক্ত কোনো উত্তর না দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর পানে। পরমুহূর্তেই ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে গেল। ছোট্ট একটা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বের করে ফিরে এল।
“ এটা লাগাও কুইক! ”
কাইফা সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গেল।
“ লাগবে না। ”
“ লাগাতে বলেছি। ”
“ বলেছি তো লাগবে না। ”
কথাটুকু বলেই রিক্তকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো কাইফা। ওমনিই একটা সুদৃঢ় মুঠি আলতো অথচ দৃঢ়ভাবে তার কব্জিটা আটকে দিল। মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। বিস্মিত চোখে নিজের কব্জির দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল রিক্তর দিকে।
“ হাত ছাড়ুন। ”
রিক্ত কোনো উত্তর দিল না।
“ দেখুন হাত ছাড়ুন আমার। ”
তবুও মানুষটার মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। সেই একই স্থির দৃষ্টি। হঠাৎ কোনোরূপ কথাবার্তা হীন মেয়েটাকে সোফায় বসিয়ে দিল সে। রমণীর ভেতরের রাগ এবার চেপে রাখা গেল না।
“ আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আমার সঙ্গে এমন আচরণ করার কোনো অধিকার আপনার নেই। ”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। রিক্ত ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে বসে ওকে পূর্ণ দৃষ্টিতে পরখ করল। দৃষ্টিতে না ছিল রাগ, না উত্তেজনা- শুধু অদ্ভুত এক স্থিরতা।
“ অধিকার…! ”
ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট এক হাসির রেখা ফুটে উঠল মানবের। পরক্ষণেই ভেসে আসলো তার অত্যন্ত ঠান্ডা, স্থির কণ্ঠ-
“ যেই অধিকারের কথা আপনি বলেছেন, সেই অধিকার ঠিকঠাকভাবে দেখালে… এখন আপনি আমার বাচ্চার মা হয়ে যেতে, ম্যাডাম।
বাট, আ’ম নট ইন্টারেস্টেড ইন থিজ মেটার! সো, ডোন্ট সে ইট এগেইন। ”
শেষের বাক্য গুলো শুনতে সক্ষম হলো না কাইফা। প্রথমের সেই অচেনা সম্বোধন আর অপ্রত্যাশিত কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই রমণীর সমগ্র অস্তিত্ব যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চারপাশের সব শব্দ এক নিমিষে নিস্তব্ধ হয়ে এলো। সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে রিক্তর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন ঠিক শুনেছে কি না, সেটাই বিশ্বাস করতে পারছে না।
পরক্ষণেই গাল বেয়ে ধীরে ধীরে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জা, অপমান, রাগ, বিস্ময়—সব অনুভূতি একসঙ্গে এসে এমনভাবে তাকে গ্রাস করল যে কোনটার প্রতিক্রিয়া আগে দেবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারল না। মেয়েটা বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। কিছু বলতে চেয়েও পারল না। ঠোঁট দুটো কেবল কেঁপে উঠল ক্ষীণভাবে।
আর রিক্ত…
তার মুখে বরাবরের মতোই কোনো অনুভূতির ছাপ নেই। নির্বিকার ভঙ্গিতেই কাইফার কব্জিটা নিজের দিকে নিয়ে রেখেছে । হাতে ধরা মলমের ঢাকনাটা বন্ধও করেনি। কেবল ধীর, নিশ্চুপ হাতে লাল হয়ে যাওয়া স্থানে আলতো করে মলম লাগিয়ে দিতে ব্যস্ত সে।
কিছুটা মুহূর্ত নিস্তব্ধতার মধ্যেই কেটে গেল।
হাতের তালুতে মানুষটার শীতল স্পর্শটুকু আর সহ্য করতে পারল না কাইফা। হঠাৎ করেই নিজের হাতটা টেনে নিল সে। মুখটা তখনও লাল হয়ে আছে। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। মানুষের চোখে চোখ রাখার সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
“ আমি… আমি যাচ্ছি। ”
কাঁপা কণ্ঠে কোনোমতে কথাটা বলেই উঠে দাঁড়াল সে। এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা না করে দরজার দিক পা বাড়াল। এলোমেলো পায়ে দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করল। করিডোরে পা রাখতেই বুকভরা একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর। বিড়বিড় করে বলল,
“ কি অসভ্য লোক রে বাবা! ”
ঠিক তখনই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো রিক্ত। কথাটা কানে পৌঁছাতেই ঠোঁটের এক কোণ নিঃশব্দে খানিকটা বেঁকে উঠল মানবের। ক্ষণস্থায়ী সেই হাসিটুকু মিলিয়ে যেতেই স্বাভাবিক হয়ে এলো তার মুখশ্রী।
পরপর নির্বিকার ভঙ্গিতে একবার নিচের প্যান্ডেলের দিকে দৃষ্টি ফেলল। বিকেলের ব্যস্ততা আর নেই। বেশিরভাগ অতিথিই বিদায় নিয়েছেন। বাড়ির সামনেটাও অনেকটা ফাঁকা। দু-একজন কাজের লোক শুধু অনুষ্ঠানস্থল গুছিয়ে নিচ্ছে।
নিচতলার পরিবেশটা একবার নীরবে পর্যবেক্ষণ করল রিক্ত। তারপরই দরজায় তালা ঝুলিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। যেন এতক্ষণ সে কেবল এই মুহূর্তটারই অপেক্ষায় ছিল।
অতিথিদের বিদায় জানানোর ব্যস্ততা তখনও পুরোপুরি ফুরোয়নি অর্না বেগমের। একজনের পর একজনকে হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছেন তিনি। এমন সময় বিকেলের সেই ভদ্রমহিলাদের দু’জন আবারও এগিয়ে এলেন।
একজন মৃদু হেসে বললেন,
“ আচ্ছা আপা, আমরা তাহলে আসি। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা আবারও মনে করিয়ে দিই।”
অর্না বেগম হেসে বললেন,
“ বলুন।”
“ আপনার ভাগ্নির কথাটা কিন্তু ভুলে যাবেন না। সত্যি বলতে কী, মেয়েটাকে আমার খুবই ভালো লেগেছে। আজকাল এমন ভদ্র, পর্দাশীল আর মার্জিত মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না।”
পাশে দাঁড়ানো আরেকজনও সায় দিলেন।
“ আমারও তাই মনে হয়েছে। আল্লাহ চাইলে একদিন আপনার বোনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।”
অর্না বেগম সৌজন্যের হাসি বজায় রেখেই বললেন,
“ অবশ্যই। আগে ওদের সঙ্গে কথা বলি। তারপর ইনশাআল্লাহ দেখা যাবে।”
“ ঠিক আছে আপা। আমরা তাহলে অপেক্ষায় থাক…”
ভদ্রমহিলার কথা শেষ না হতেই অর্না বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন,
“ রিক্ত? এখন কোথায় যাচ্ছ তুমি? ”
তার চোখ অনুসরণ করে সকলে এবার রিক্তর দিকে নজর দিল। গায়ে কোট জড়িয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে গাড়ির দিক এগোচ্ছিল সে। পরিচিত নারী কণ্ঠটা কর্ণপাত হতেই কদম থামিয়ে জবাব দিল,
“ একটু বাইরে যাচ্ছি। ”
“ এখন? ”
“ হুম দরকার আছে। ”
“ আচ্ছা, সাবধানে যেও। ”
রিক্ত আর দাঁড়াল না। ব্যস্ত ভঙ্গিতে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল। স্টিয়ারিং ঘুরানোর সময় এক পল তীক্ষ্ণ চোখে চাইল অর্না বেগমের থেকে বিদায় নিতে থাকা মহিলা গুলোর দিকে। যে চাহনিতে লুকিয়ে রইল এক অদ্ভুত রহস্য।
প্রিয়
রাইয়ান আহমেদ রিক্ত,
আমার হৃদয়াবিষ্ট পুরুষ, আমার কিশোরীবেলার উন্মাতাল আবেগ, আমার যৌবনের প্রথম প্রেম, আমার জীবনের একমাত্র রঙিন বসন্ত—
আপনি কি জানেন, আপনি আমার ঠিক কতটা নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি?
উহু, জানেন না। জানলে হয়তো প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি পদে, প্রতিটি স্তরে আমাকে এভাবে উপেক্ষা করতে পারতেন না। আপনার অবহেলার তালিকার শীর্ষে হয়তো আমারই নাম, অথচ আমার গুরুত্বের তালিকায় আপনাকে ছাড়া আর কারও কোনো স্থান নেই।
আপনি আমাকে যতটা দূরে ঠেলে দিয়েছেন, আমি ঠিক ততটাই গভীরভাবে আপনাকে ভালোবেসেছি। কেন ভালোবেসেছি, তার কোনো ব্যাখ্যা আজও খুঁজে পাইনি। শুধু আপনার সেই গম্ভীর, ধারালো মুখশ্রী দেখলেই অদ্ভুত এক টান অনুভব করতাম। আপনার সেই মরুপ্রান্তরের সোনালি বালুকণার আভা মাখা চোখের মণি দুটোয় বারবার হারিয়ে যাওয়ার বাসনা জাগত।
অতঃপর আমি সত্যিই হারিয়ে গেলাম। ডুবে গেলাম আপনার সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের অতল গভীরে।
এখন বলুন তো, সেখান থেকে ফিরে আসার উপায়টা কী?
কাঁপা কাঁপা হাতে দীর্ঘ বার্তাটি লেখা শেষ করল রোশনী। বুকের ভেতরটা যেন ঢাকের তালে তালে কেঁপে উঠছে। দ্বিধাভরা চোখে পাশে বসে থাকা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ এটা পাঠানো কি ঠিক হবে? পরে যদি উনি খুব রেগে যান? ”
একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“ চিল, মাই গার্ল! কিছুই হবে না। বলবি এটা একটা ডেয়ার ছিল। ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার খেলতে গিয়ে সবাই এমন দুষ্টামি তো করেই।”
রোশনী অস্থির কণ্ঠে বলল,
“ তবুও… উনার রাগটা তো জানিস। প্লিজ, অন্য একটা ডেয়ার দে। এটা স্কিপ করি? ”
আরেকজন সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি জানাল,
যেই তুমি এলে পর্ব ১২
“ নো চান্স! জান-প্রাণ দিয়ে একজন মানুষকে ভালোবাসবি, অথচ তাকে সেটা বলার সাহস পাবি না? আজ যা হওয়ার হবে। আর এই ডেয়ারের মাধ্যমেই তো বুঝতে পারবি, উনার মনে তোর জন্য কোনো অনুভূতি আছে কি না।”
রোশনী আর কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত নীরবে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কাঁপছে, আঙুলগুলোও যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে।
অবশেষে খেলার নিয়মের কাছে নিজের ভয়কে হার মানিয়ে গভীর একটি শ্বাস নিল সে। তারপর চোখ বন্ধ করেই কাঁপতে থাকা আঙুলে চাপ দিল ‘Send’ বাটনে।
এক নিমিষেই প্রেমে ভেজা শব্দগুলো পৌঁছে গেল তার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত মানুষটির ফোনে।
