যেই তুমি এলে পর্ব ১৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
সকল আনুষ্ঠানিকতার রেশ কেটে গিয়ে আহমেদ নিবাস পুনরায় ফিরে এসেছে তার পরিচিত নিস্তব্ধ রূপে। বাড়িময় আজ মানুষজনের বালাই নেই। চারপাশে বিরাজ করছে কেবলই নীরবতা। তবে মাঝে মাঝে সেই নীরবতা কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়ে ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসছে অর্নার বেগমের নারী কণ্ঠটা।
মোবাইল সামনে ধরে হুমায়রার সাথে ভিডিও কলে কথা বলছেন তিনি। দুবোনের মধ্যে সেই তখন থেকে কথা কাটাকাটি হচ্ছে কাইফার বাড়ি ফেরা নিয়ে। হুমায়রা এবার খানিকটা অসহায় গলায় বললেন,
“ বোন আমার, আজকে যদি তুই কাইফাকে না পাঠাস তো তোর দুলাভাই যদি আমার উপর রেগে যাবে! ”
“ রাগবে না। আমি কথা বলব দুলাভাইয়ের সাথে। ”
“ এসবের দরকার টা কি বলতো? তুই এখন ওকে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়। অন্য সময় নাহয় আবার গিয়ে বেড়িয়ে আসবে। ”
“ আমি ভালো করেই জানি, তোমরা যে পরে কত আসতে দেবে! ”
“ দেব বললাম তো! ”
“ শুনো হুমায়রা আপু, তুমি এমন করো কেন? মানুষ খালার বাড়িতে এসে মাসের পর মাস থাকে আর তুমি ওকে একটা সপ্তাহও থাকতে দিচ্ছ না? নিজে তো আসোই না আবার মেয়েটাকেও থাকতে দিচ্ছ না! ”
“ ও তো বেশিরভাগ সময় মাদ্রাসাতেই থাকে। আমার কাছেই তো থাকে অল্প কিছু দিনের জন্য! ”
“ আচ্ছা এখন ওসব বাদ, কাইফা আরও দুদিন পরে যাবে। এই সপ্তাহ টা শেষ হোক। এর আগে আমি কিছু শুনছি না। ”
অর্নার দৃঢ় কণ্ঠে কথাটা শেষ হতেই ওপাশ থেকে হুমায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ এসব কোনো কথা! এখন আমি তোর দুলাভাইকে কী বলব? ”
“ যা সত্যি সেটাই বলবে। বলবে– তোমার শালী কাইফাকে আরও দুদিন নিজের কাছে রাখতে চায়। ”
প্রতিউত্তরে ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসার আগেই অর্না ফের বলে উঠলেন,
“ আচ্ছা, তোমার কিছু বলতে হবে না। আমিই কথা বলব ভাইয়ার সাথে। ”
“ ঠিক আছে, কথা বলে দেখ তবে। ”
অর্না মৃদু হেসে কথাটা বলতেই ওপাশ থেকে হুমায়রাও আর কিছু বললেন না। অতঃপর এখানেই সমাপ্তি ঘটল দুবোনের দীর্ঘ কথাবার্তার।
কাইফা রুম থেকেই মা-খালার সব কথা শুনল। খালামনির আগেই মায়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। কাইফাও বাড়ি ফেরার জন্য বেশ আগ্রহী ছিল। কিন্তু অর্নার ধমক খেয়ে রমণী পুরোপুরি চুপ হয়ে গিয়েছে। এখন খালামনির সিদ্ধান্ত মোতাবেকই আরও দুদিন এখানে থাকা হবে।
অবশ্য এখানে থাকতেও তেমন একটা খারাপ লাগে না। তবুও বাড়ির জন্য মনটা কেমন টানছে।
অর্না বলেছেন, আগামীকাল তারা সবাই নাকি কোথাও ঘুরতে যাবেন। জায়গাটা এখনো নির্ধারিত হয়নি। রিক্ত ফিরলে তার সঙ্গে কথা বলেই সবকিছুর বন্দোবস্ত করা হবে। তারপর ট্যুর শেষ করে এসেই কাইফাকে বাসায় দিয়ে আসা হবে।
কাইফা আপাতত সেসব নিয়ে ভাবছে না। তার মস্তিষ্কজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য এক ভাবনা।
গতকাল রাতে ঋষিতা আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছে কাইফার। আজ সকালে চলে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষণ ভদ্রমহিলার আচরণে বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিকতা ছিল না। কাইফাকে দেখে এমন স্বাভাবিক ছিলেন, যেন তাকে চেনেনই না (রিক্তর বউ রূপে বুঝানো হয়েছে)। এমনকি বাড়ির সবার সামনেও তার সঙ্গে একজন সাধারণ মেহমানের মতোই আচরণ করেছেন।
অথচ দুবছর পর কাইফাকে এখানে দেখে তার বেশ অবাক হওয়ার কথা ছিল। তাহলে কি উনি কাইফাকে আগে থেকেই চিনতেন? জানতেন, সে অর্নার বোনের মেয়ে?
আর রিক্ত? সেও কি জানত?
সেদিন তাকে বাঁচানোর পেছনেও কি তাহলে কোনো কারণ ছিল?
কিন্তু কাইফার সঙ্গে তো ওদের কারোরই আগে কখনো দেখা হয়নি। তাহলে চিনবে কীভাবে? হয়তো নাম শুনেছিল? অর্নার কাছ থেকে? কিংবা আরও আগে থেকেই কোনোভাবে তার সম্পর্কে জানত?
এত এত প্রশ্নের ভিড়ে কাইফা নিজেকেই যেন ঘুলিয়ে ফেলল।
প্রশ্নগুলো একটার পর একটা মাথায় আসছে, অথচ কোনোটারই উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সে। লোকটাকে নিয়ে যতই ভাবে, ততই যেন নতুন কোনো রহস্যের দরজা খুলে যায়।
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল কাইফা। আর ভাবতে গেল না মানুষটাকে নিয়ে।
রাত নয়টার দিকে রিক্ত বাসায় ফিরল। অর্না বেগম তখনও জেগে ছিলেন। রিক্ত ফিরতেই তাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসলেন। কথা উঠল আগামীকালের ফ্যামিলি ট্যুর নিয়ে।
অর্না আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, কাইফা যাওয়ার আগে সবাই মিলে দু-তিন দিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসবেন। রিক্তের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারই ঠিক হলো।
সিদ্ধান্ত হয়ে যেতেই আর দেরি করা হলো না। রাতের মধ্যেই সমুদ্রের কাছাকাছি একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে পরিবারের জন্য প্রয়োজনমতো স্যুট বুক করা হলো।
পরদিন সকালে,
ট্যুরের কথা শুনতেই যেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হলো। তড়িঘড়ি করে প্রয়োজনীয় সব জামাকাপড় ব্যাগে পুরে নিতে শুরু করল সবাই। কারও মুখে হাসি, কারও চোখেমুখে উত্তেজনা–সব মিলিয়ে বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দের আমেজ। রোহান তো সকাল সকাল এক দফা নাচের পর্বও শেষ করে ফেলেছে।
হালকা নাস্তা সেরে খুব ভোরেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলো ওরা।
গাড়ির পেছনের সিটে পাশাপাশি বসেছে রোশনী, অর্শী আর কাইফা। সামনের সিটে রোহানকে কোলে নিয়ে বসেছেন অর্না বেগম। আর স্টিয়ারিংয়ে রিক্ত।
গাড়ি ছুটে চলল শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে দূরের পথের দিকে। কখনো টুকটাক কথাবার্তা, কখনো হাসাহাসি, আবার কখনো নিজেদের ফোনে ব্যস্ত হয়েই সময় কেটে যেতে লাগল। কেউ মোবাইলে স্ক্রোল করছে, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে পথের দৃশ্য উপভোগ করছে।
তবে বেশ খানিকটা পথ পেরোতেই কাইফার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
প্রথমে অস্বস্তি লাগছিল সামান্য। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পেটের ভেতরটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠতে শুরু করল। গলায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে বসে রইল সে। অর্শী পাশে বসে বিষয়টা লক্ষ্য করতেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ কী হয়েছে আপি? শরীর খারাপ লাগছে? ”
কাইফা কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই মুখে হাত চাপা দিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল।
“ তোমার কি বমি আসছে!”
রোশনীর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা। সামনের সিট থেকেও অর্না বেগম দ্রুত পেছনে ফিরে তাকালেন। বোনঝি অবস্থা দেখে সাথে সাথে বলে উঠলেন,
“ রিক্ত, গাড়িটা একটু থামাও বাবা।”
রিক্ত দেরি করল না। তৎক্ষনাৎ রাস্তার পাশে নিরাপদ জায়গা দেখে গাড়িটা থামিয়ে দিল।
কাইফাকে কিছুক্ষণ সামনের সিটে বসানো হলো। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলে হয়তো অস্বস্তিটা কিছুটা কমবে—এই ভেবেই অর্না বেগম তাকে সামনে বসতে বললেন। কিন্তু ততক্ষণে বমিভাব বেশ চেপে বসেছে।
রিক্ত গাড়ি থেকে নেমে কাছের একটা মার্কেটের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর হাতে ওষুধ আর পানির বোতল নিয়ে ফিরে এল।
“ এটা খেয়ে নাও। ”
রিক্ত ওষুধটা কাইফার দিকে বাড়িয়ে দিল।
কাইফা কোনো কথা না বলে ওষুধটা নিয়ে পানি দিয়ে খেয়ে নিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পরিস্থিতি খানিকটা সামলে এলো। অতএব আবারও গাড়ি চলতে শুরু করল।
বাকি পথটুকু কাইফা অনেকটাই চুপচাপ রইল। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও শরীরের দুর্বলতাটা যেন ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করছিল।
অবশেষে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ওরা গন্তব্যে পৌঁছাল।
গাড়ি থামতেই সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু কাইফা গাড়ি থেকে নামার আগেই হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠল। কোনো রকমে দরজা খুলে বাইরে ঝুঁকতেই বমি করে ফেলল সে।
“ কাইফা!”
অর্শী আর রোশনী দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল। অর্না বেগম তাড়াতাড়ি রোহানকে নিয়ে একটু দূরে সরে যেতে বললেন। কিন্তু ততক্ষণে আরেক বিপত্তি।
কাইফাকে দেখে রোহানেরও বমি চলে এলো।
“ ও মা! রোহান! ”
অর্না বেগম ছেলেটাকে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলেন। আসার পথে গাড়িতে বসে হাবিজাবি ফাস্টফুড খেতে খেতেই এসেছিল রোহান। তার ওপর কাইফার বমির দৃশ্যটা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।
এদিকে অর্শী আর রোশনীরও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বমির গন্ধে ওদের দুজনের অবস্থাও নাজেহাল হতে লাগল।
“ রোশনী, অর্শী তোমরা নেমে যাও। ”
রিক্তর কথা মোতাবেক গাড়ির অপর পাশের জানালা খুলে নেমে গেল ওরা।
সবকিছুর মাঝে কাইফা বমি শেষ করে আবার গাড়ির সিটে এসে নেতিয়ে পড়ল। মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে মেয়েটার, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
রিক্ত নিঃশব্দে এগিয়ে এসে তার দিকে পানির বোতলটা বাড়িয়ে দিল।
“ পানি খাও। ”
দুর্বল হাতে বোতলটা নিয়ে অল্প অল্প করে পানি খেল কাইফা। তারপর বোতলটা ফিরিয়ে দিয়ে আবারও মাথাটা সিটের সঙ্গে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল।
রিক্ত কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ আর ইউ ওকে? ”
কাইফা চোখ না খুলেই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মুখে কোনো শব্দ বের হলো না।
“ নামবে? ”
রমণী এবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে রিক্তের দিকে তাকাল। কণ্ঠটা একেবারেই ক্ষীণ।
“ভালো লাগছে না… পরে যাব।”
রিক্ত আর কিছু বলল না।
গাড়ির দরজাটা টেনে বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়াল সে। সামনের অংশে হেলান দিয়ে মোবাইল স্ক্রোল করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর অর্না বেগম, অর্শী আর রোশনী ফিরে এল।
কিন্তু ততক্ষণে কাইফার চোখ জড়িয়ে এসেছে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, অসুস্থতা আর ওষুধের প্রভাবে কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে, নিজেও টের পায়নি।
অর্না বেগম গাড়ির দিকে এগিয়ে এসে কাইফাকে ডাকতে যাবেন, ঠিক তখনই রিক্ত মাথা তুলে শান্ত গলায় বলে উঠল,
“ শী ইজ টায়ার্ড, ডোন্ট ডিস্টার্ব হার! ”
অর্না বেগম থেমে গেলেন।
“ রিসোর্টে গিয়ে রেস্ট নিবে নাহয়। এখানে ওর..”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রিক্ত স্থির কণ্ঠে বলে উঠল,
“ আমি এখানেই আছি, তোমরা যাও। ”
“ কিন্তু…”
“ এখন ওকে জাগালে আরো খারাপ লাগবে। ”
“ আচ্ছা,তাহলে আমরা যাই। ”
অর্না বেগম একবার গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কাইফার দিকে তাকালেন। তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করল,
“ চলো। ”
অর্না বেগম একবার গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কাইফার দিকে তাকালেন। তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করলেন,
“চলো।”
রোশনী মায়ের সঙ্গে পা মেলাতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। মনে পড়ল গতকাল রিক্তের আইডিতে পাঠানো সেই মেসেজটার কথা—যেটা এখনো ডেলিভার হয়নি। সে খানিকটা এগিয়ে এসে রিক্তের সামনে দাঁড়াল।
“রিক্ত ভাইয়া, আপনার **** নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপ আইডিটা কি অ্যাক্টিভ নেই?”
“না, ওটা এখন এক্টিভ নেই। মাঝে মাঝে দরকার পড়লে লগ ইন করা হয়।”
“ও আচ্ছা!”
রোশনী আর কিছু বলল না। বুঝতে পারল, মেসেজ ডেলিভার না হওয়ার কারণটা তাহলে এটাই। মুহূর্তেই মনের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটুকু খানিকটা হালকা হয়ে গেল তার। হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্থান ত্যাগ করল সে। যেতে যেতেই ভাবল– রিক্তের নতুন নাম্বারটা মায়ের কাছ থেকে নিয়ে নেবে। পুরোনো আইডিতে আর মেসেজ পাঠিয়ে লাভ নেই!
কিছুক্ষণ পর কাইফার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে প্রথমেই অচেনা নীরবতা টের পেল সে। মাথাটা এখনও ভারী। শরীরটাও যেন নিজের ওজনটুকু বহন করতে চাইছে না।
ধীরে ধীরে উঠে বসতেই নিজেকে শূন্য গাড়িতে আবিষ্কার করল। তৎক্ষণাৎ ভ্রূ জোড়া কুঁচকে গেল রমণীর। সন্ধানী নেত্র আশপাশে তাকাতেই সামনে দেখতে পেল পরিচিত একটি পুরুষ অবয়ব।
“ এইযে শুনছেন? ”
ঘুমজোড়ানো কণ্ঠটা কর্ণপাত হতেই বনেটের সাথে হেলান শরীরটা সোজা করল রিক্ত। পরপর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছে তাকাল।
“ বাকিরা সব কোথায়? ”
“ ওরা রিসোর্টের ভিতরে চলে গেছে। ”
জবাব শুনে কাইফা কিয়ৎক্ষণ নীরব রইল। এর মাঝেই ফের ভেসে এল রিক্তের ভরাট গলা,
“ নামবে? ”
“ হুম। ”
ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল সে। পরপর মাথাটা খানেক ঝাকিয়ে নিল। ততক্ষণে রিক্ত সামনে পা বাড়িয়ে বলল,
“ চলো। ”
কাইফা নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে এগোতে লাগল। অতঃপর মিনিট তিনেকের মাথাতেই ওরা রিসোর্ট অব্দি চলে গেল। কাইফাকে রিসোর্টের ভিতর পৌঁছে দিয়ে রিক্ত গাড়ি পার্ক করতে চলে আসলো।
পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী আলোয় ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত। পশ্চিম আকাশে অস্তমিত সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল জলরাশির বুকে। একের পর এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তীরে, আবার ফিরে যাচ্ছে আপন ছন্দে। চারপাশজুড়ে পর্যটকদের কোলাহল, হাসি-আনন্দ আর সমুদ্রের গর্জন মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অন্যরকম আবহ।
দুপুরের সেই ক্ক্লান্তি ভাব কাটিয়ে আহমেদ পরিবারের সবাই ইতোমধ্যে চলে এসেছে সমুদ্রের পারে। কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে, কেউ পরস্পরের দিকে পানি ছুড়ে দিচ্ছে। রোহান তো আনন্দে একেবারে বেসামাল। কখনো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আবার কখনো কাউকে ভেজানোর উদ্দেশ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে।
অথচ এসবের মাঝেও খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাইফা যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতে।
নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বিশাল জলরাশি দেখছে সে। নোনা বাতাসে হিজাবের লেয়ারগুলো মৃদু দুলছে। পরনে বরাবরের মতোই বোরকা, মাথায় একাধিক লেয়ার বিশিষ্ট হিজাব– শুধু একজোড়া চোখই উন্মুক্ত। যেখানে এখন বিস্ময় আর মুগ্ধতার অপূর্ব ছাপ।
জীবনে এত বিশাল সমুদ্রকে এত কাছ থেকে দেখা হয়নি তার। তাই চারপাশের কোলাহল যেন ধীরে ধীরে তার কাছে ফিকে হয়ে আসছে। দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি আর তার ওপর পড়ে থাকা অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোতেই আটকে আছে কাইফার সমস্ত মনোযোগ।
অন্যদিকে খানিকটা অদূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল রিক্ত। এক হাতে ফোন, অন্য হাতে রোহানের ক্যামেরা। ছেলেটা কিছুক্ষণ আগেই ক্যামেরাটা তার কাছে জমা দিয়ে গেছে।
কথার মাঝেই হঠাৎ চোখ চলে গেল সামনের দিকে।
রোহান হাতের কোষে পানি নিয়ে ছুটছে। আর তার সামনে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে কাইফা। শিশুটি রমণীকে ভেজাতে চাইছে। আর সে পালাতে পালাতেই হাসছে। সেই হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে।
কাইফার মাথায় রোহানের সাদা ক্যাপটা বসানো ছিল, দৌড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটাও একটু একটু করে কাত হয়ে যেতে লাগল।
রিক্তের ফোনের ওপাশের কথাগুলোও যেন মুহূর্তে গুরুত্ব হারাল।কথা বলতে বলতেই স্থির হয়ে গেল তার দৃষ্টি। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে।
তারপর কোনো এক অদৃশ্য তাড়নায় হাতে থাকা ক্যামেরাটা তুলে নিল। ফোনের কথোপকথন একপাশে রেখেই ক্যামেরার লেন্স তাক করল ছুটন্ত দুজনের দিকে।
এক মুহূর্ত। তারপর—
ক্লিক।
অজান্তেই বন্দি হয়ে গেল বিকেলের সেই ছোট্ট দৃশ্যটা।
কাইফার উড়তে থাকা হিজাবের লেয়ার, মাথায় বেখাপ্পাভাবে বসে থাকা সাদা ক্যাপ, আর চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই হাসি।
রিক্ত আরও কয়েক মুহূর্ত ক্যামেরার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তাদের দিকে।
তাকে এগিয়ে আসতে দেখে রোহানের দৌড় থেমে গেল। কাইফাও থেমে গেল কয়েক পা দূরে।
মানুষটাকে অকস্মাৎ নিজের দিক এগোতে দেখে সামনে কাইফা খানিকটা ইতস্তত করে তাকাল। পরপর চোখ তুলে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ কিছু বলবেন? ”
কোনো উত্তর দিল না রিক্ত। বরং হঠাৎ হাত বাড়িয়ে কাইফার মাথায় থাকা সাদা ক্যাপটা একটানে একটু নিচে নামিয়ে দিল। মুহূর্তেই ক্যাপের কিনারা এসে ঢেকে দিল তার দুটো চোখ।
কাইফা হতভম্ব হয়ে গেল।
“ এটা কি করলেন? ”
রিক্তের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“ দুনিয়াবাসীকে তোমার প্রাণঘাতী নয়নের ঘাত হতে বাঁচলাম! ”
বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। ধীর পায়ে ফিরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী যেন বলল।
“ কী ভয়ানক! যখনই ওর চোখ হাসে,
আমার হৃদয় কেন এমন মর্মান্তিক ফাঁসে! ”
কথাগুলো কাইফার কানে ঠিকঠাক পৌঁছাল না। সে শুধু মাথার ওপর নেমে আসা ক্যাপটা সরিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া মানুষটার দিকে। এর মাঝেই মানব সামনে আগুয়ান অবস্থাতেই হুট করে বলে উঠল,
“ ক্যাপটা যেন উপরে না তুলা হয়! ”
“ কেন? উপরে তুললে কী সমস্যা? ”
অকপটে জানতে চাইল রমণী। উত্তরে বরাবরের মতোই শোনা গেল পরিচিত গম্ভীর স্বর,
“ সমস্যা এখনো হয়নি তবে এভাবেই চলতে থাকলে সামনে খুব সাংঘাতিক সমস্যা হবে। ”
“ মানে! ”
“ নাথিং! জাস্ট যেটা বলেছি সেটা মেনে চলো। ”
যেই তুমি এলে পর্ব ১২ (২)
কাইফা কিছু বলতে নিয়েও থেমে যায়। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই! এই নিরুত্তর ব্যক্তির কাছ থেকে উত্তরের আশা করাই বোকামি। মেয়েটা কথা বাড়াল না তবে রিক্তর কথাও অমান্য করল না।
