প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮২
সাইদা মুন
সকাল বাজে পাঁচটা। ফজরের আজান কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল মেহরীনের। রাতে মেহেদি অনুষ্ঠান থেকে ঘরে ফিরতেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে অবশেষে উঠে বসল।
এক পাশে তনিমা তাহিয়া, অন্য পাশে ফারিন ফারিহা। নিচে রাফাসহ আরও তিনজন মেয়ে শুয়ে আছে। বিয়ে বাড়ি বলে কথা, কোনো ঘরই খালি নেই। গ্রাম থেকে সবাই তো এসেছেই, তার ওপর শহরের আত্মীয়-স্বজনেরাও একে একে বাড়িতে উঠেছে। প্রতিটা ঘর মানুষে ঠাসা। মেহরীনের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। যে মেয়েটার জীবনটাই একসময় ছিল তুচ্ছ, জন্মের পর থেকে যে কারও কাছে নিজের কোনো মূল্য খুঁজে পায়নি, আজ তার জন্যই এত আয়োজন। এত মানুষ, এত ব্যস্ততা, এত ভালোবাসা, সবকিছু যেন শুধু তাকে ঘিরেই।
আস্তে ধীরে বিছানা থেকে নামল মেহরীন। ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। টিপটিপ পায়ে এগিয়ে গেল তালহার দরজার কাছে। দরজাটা ঠেলে ভেতরে উঁকি দেবে কি না, কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। আবার ভাবল, ভেতরে তালহা ছাড়াও তার কাজিনরা ঘুমিয়ে আছে। এভাবে দরজা খোলা ঠিক হবে না। শেষ পর্যন্ত তালহাকে দেখার ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখল সে।
ধীর পায়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরের জানালাটা খুলতেই বাইরে থেকে দমকা এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে নিল মেহরীন। মন ভরে শ্বাস নিল। সকালের এই সতেজ বাতাসটা যেন একেবারেই নির্মল, একেবারেই নিখাদ। একপাশে চায়ের পানি বসিয়ে অন্য পাশে একটা প্যান চড়িয়ে দিল। বেশ খিদে পেয়েছে তার। ভাবল, একটা ডিম পোচ করে ব্রেডের সঙ্গে খেয়ে নেবে।
যেই ভাবা, সেই কাজ। চা হতে হতেই ডিম পোচ করে নিল। দুটো ব্রেডের মাঝখানে ডিমটা দিয়ে ছোট্ট একটা স্যান্ডউইচ বানিয়ে খেয়ে নিল দ্রুত। এরই মধ্যে চাও হয়ে গেল। গরম চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। সিঁড়ির কাছে যেতে নিয়েও হঠাৎ থেমে গেল মেহরীন। তিতলি বেগমের ঘরের দরজাটা আধখোলা। ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল৷ জায়নামাজের ওপরই কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছেন তিতলি বেগম। হয়তো নামাজ পড়ে তসবিহ পড়তে পড়তেই কখন ঘুমিয়ে গেছেন, টেরও পাননি।
মেহরীনের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। আস্তে করে ঘরে ঢুকে বিছানা থেকে পাতলা কম্বলটা তুলে নিল। তারপর যত্ন করে তিতলি বেগমের গায়ে জড়িয়ে দিল। পাশেই বিছানা করে নিচে শুয়ে আছেন তালহার মামিরা। বিছানাজুড়ে আরও কয়েকজন পরিচিত মহিলা ঘুমিয়ে আছেন। সবাইকে মেহরীন চেনে না, তবে সবাই তাকে চেনে, তালহার বউ হিসেবে। মৃদু হেসে ঘরের দরজাটা আলতো করে এঁটে বেরিয়ে এল সে। ঘুমাক শান্তিতে সবাই। আর একটু পরেই তো উঠে পড়বে। তারপর শুরু হবে কাজ আর কাজ। বিয়ে বাড়িতে রেহাই আছে নাকি কারও।
ছাদের দরজাটা আস্তে করে খুলল মেহরীন, যেন কোনো শব্দ না হয়। তারপর ভেতরে পা রাখতেই মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে গেল। চারপাশ একেবারে শান্ত, নিরিবিলি। আকাশটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠেনি। পূর্ব আকাশে কেবল আলো ফুটতে শুরু করেছে। নরম নীলের গায়ে ছড়িয়ে আছে ভোরের আবছা আভা। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ধীরে ধীরে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগল মেহরীন। চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে পুরো ছাদে এক চক্কর মেরে এসে দাঁড়াল ছাদের ডান পাশে। এই জায়গা থেকেই নিচে তার শ্বশুরের কবরটা দেখা যায়।
রেলিংয়ের কাছে এসে নিচের দিকে তাকাতেই মেহরীনের কপাল হালকা কুঁচকে গেল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। তালহা দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে জিয়ারত করছে সে। মেহরীনের চোখ দুটো মুহূর্তেই কোমল হয়ে এল। হাতে ধরা চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলল সে। আর সেখান থেকে সরল না। ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে দূর থেকে দেখতে লাগল নিজের মানুষটাকে। ভোরের নরম আলোয় সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে থাকা তালহাকে অন্যরকম স্নিগ্ধ লাগছে। একদম নিজের মতো। একদম আপন। সে নীরবে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাকে দেখার জন্যই যেন ভোরটা আজ এত সুন্দর হয়ে উঠেছে।
তালহা কবর জিয়ারত করে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। কবরের ওপর পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো একে একে সরিয়ে দিল। কবরটা পরিষ্কার করল। তারপর কিছুক্ষণ নীরবে বাবার কবরের ওপর হাত বুলাতে লাগল। স্পর্শটা যেন মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার কাছাকাছি পৌঁছানোর একমাত্র উপায়। কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে আস্তে ফিসফিস করে বলল,
—আব্বু, দেখেছো? বাড়িতে কত মানুষ তোমার ছেলের বিয়ের জন্য। তোমার কত শখ ছিল, ছেলের বিয়েতে সবাইকে দাওয়াত দিবা। চাচ্চুরা তোমার সেই শখটা পূরণ করেছে। কিন্তু আমার ভালো লাগছে না, আব্বু। এত মানুষের ভিড়েও কেমন জানি একটা শূন্যতা অনুভব করছি। তোমাকে খুব মিস করছি।
কণ্ঠটা ক্রমশ ভারী হয়ে এল। কিছুক্ষণ থেমে ধরা কন্ঠে বলল,
—সেই ছোট তালহার মতো করে এখন বলতে ইচ্ছে করছে, কখন আসবে আব্বু? ছেলের শুভদিনে দোয়া দিতে আসবে না?
কথাগুলো শেষ করার আগেই চোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। ঠোঁট কেঁপে উঠল তার। আর কিছু বলতে পারল না। কত বছর পেরিয়ে গেছে বাবাকে ছাড়া। কত বড় হয়ে গেছে দেখতে দেখতে। তবুও বাবার কবরের সামনে দাঁড়ালে বয়সটা যেন হঠাৎ কমে যায়। পৃথিবীর সব শক্ত মানুষগুলোর আড়াল সরিয়ে বেরিয়ে আসে সেই ছোট্ট তালহা, যে এখনো বাবার জন্য অপেক্ষা করে।
আর বেশিক্ষণ সেখানে বসল না সে। হাতের পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনের চোখ দুটোও এতক্ষণে ভিজে গেছে। তালহা তার বাবার সঙ্গে ঠিক কী কথা বলেছে, তা সে জানে না। জানে না, কতটা কষ্ট বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছে মানুষটা। তবে একটা জিনিস সে নিজের চোখে দেখেছে, তালহা কেঁদেছে। নিজের মানুষটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে মেহরীনের বুকটাও কেমন ভার হয়ে উঠল। ইচ্ছে করল, ছুটে গিয়ে মানুষটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিছু না বলে শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে। তাই আর দেরি করল না। সেখান থেকে চলে যেতে থাকা তালহাকে ডেকে উঠল,
—এই শুনছেন..
তালহা বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েও পরিচিত কণ্ঠটা শুনে থেমে গেল। এক মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশে তাকাল। তারপর চোখ গেল ওপরের ছাদের দিকে। মেহরীনকে দেখামাত্রই তার কপাল হালকা কুঁচকে গেল। বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—এত সকালে উঠলে কেন? ঘুমাওনি তুমি?
মেহরীন মৃদু হেসে বলল,
—ঘুম ভেঙে গেছে। আপনি ছাদে আসুন না।
তালহা মাথা নেড়ে বলল,
—ওয়েট আসছি।
এইটুকু বলেই দ্রুত পা ফেলল বাড়ির দিকে। মেহরীনও এবার ধীরে ধীরে ছাদের অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এই পাশটা থেকে পূর্ব আকাশটা স্পষ্ট দেখা যায়। সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠেনি, তবে আকাশের কিনারাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা আভা। হাতে ধরা চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলল মেহরীন। এক চুমুক চা খেল। তারপর কাপটা রেলিঙের রেখে, আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। অপেক্ষা করতে লাগল তালহার জন্য।
তালহা কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাদে এসে হাজির। মেহরীনকে ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তালহা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। দূর আকাশে সূর্যের সোনালি আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের শেষ অন্ধকারটুকু যেন আলোর কাছে নীরবে হার মানছে। মেহরীনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল তালহা। মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে আকাশ দেখছে।
তালহা একটু ঝুঁকে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
—কী দেখছেন এত মনোযোগ দিয়ে?
মেহরীন মৃদু হাসল। চোখ সরাল না আকাশ থেকে বলল,
—কী সুন্দর না আকাশটা? সূর্যটা আস্তে আস্তে তার কিরণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশটা একটু একটু করে সোনালি হয়ে যাচ্ছে।
তালহাও মৃদু হাসল। দুহাত পকেটে রেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে সামনের দৃশ্যটা দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব। ভোরের বাতাস, পাখির ডাক সব মিলিয়ে মুহূর্তটা কোমলতায় ছেয়ে আছে। হঠাৎ তালহা মেহরীনের বাঁ দিকে হাত তুলে বলল,
—ওইদিকে দেখো তো। ওটা কী?
মেহরীন কৌতূহলী হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই তালহা ঠোঁট ছুইয়ে দিল তার ঘাড়ে। মেহরীন অপ্রস্তুত হয়ে দাড়াল। তালহা ঠোঁট কামড়ে হেসে রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখে তখন সেই চেনা দুষ্টু হাসি। তালহা মেহরীনের উপর মনোযোগ দিয়ে বলল,
—আপনি আপনার কাজ করুন, আমি আমারটা করি।
মেহরীন মিছে রাগ দেখিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কথায় আছে না, টুপির নিচে শয়তান। ওইটা যে সত্যিই, আজকে বুঝলাম!
তালহা সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
—তুমি আমাকে শয়তান বললে?
মেহরীন নির্দ্বিধায় মাথা নাড়িয়ে বলল,
—হ্যাঁ, বলেছি।
এবার তালহা একটু গম্ভীর হয়ে, ভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—আমি শয়তান?
তালহার এমন সিরিয়াস মুখ দেখে মেহরীন আর হাসি সামলাতে পারল না। খিলখিল করে হেসে ফেলল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে এগিয়ে গিয়ে দুহাত দিয়ে তার কোমড় জড়িয়ে ধরল। মাথাটা রাখল তালহার বুকে। মেহরীনের এমন আকস্মিক আলিঙ্গনে তালহাও যেন মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে প্রিয়তমাকে আরও শক্ত করে আগলে নিল বুকে। মেহরীন তার বুকে নাক ঘষে খুব আপন করে বলল,
—আপনি আমার সব।
তালহা কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মেহরীনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ধীর কণ্ঠে বলল,
—আমাতে এতটা মত্ত হয়ে যেও না। আল্লাহ না করুক, আমার কিছু হয়ে গেলে আমার মায়ের মতো সারাজীবন হারানোর কষ্টটা বুকের ভেতর চাপা দিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তোমাকেও।
কথাটা শুনতেই মেহরীনের বুকটা ধক করে উঠল। মুহূর্তেই যেন সমস্ত আনন্দ কোথায় হারিয়ে গেল। অজানা এক ভয় তাকে গ্রাস করল। তালহাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—এমন কথা মুখেও আনবেন না। একদম না। আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না। কোথাও না।
মেয়েটার কণ্ঠের কাঁপুনি আর ভয়টা তালহা বুঝতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কথার সুর বদলে ফেলল। মেহরীনের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
—যাচ্ছি না তো কোথাও। তোমার কাছেই ছিলাম, আছি, আর থাকবও।
দুপুর বারোটা বাজে। ফারিনকে ঘিরে বসে আছে সবাই। একেকজন একেক প্রশ্ন করায় ফারিন একসময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। বিরক্ত হয়ে সবাইকে থামিয়ে বলল,
—আরে ভাই, ব্রেকআপ করেছি আমি। তোদের এত সমস্যা কিসের?
তাহিয়া তার হাত চেপে ধরে বলল,
—সমস্যা মানে? রাগারাগি হয়, সেটা স্বাভাবিক। তাই বলে ব্রেকআপ করে ফেলবি?
মেহরীনও পাশে বসে বলল,
—সেটাই তো। ব্রেকআপ সবকিছুর সমাধান না। নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে নে।
তনিমা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
—রিশাদ ভাইয়া নিচেই আছে। তালহা ভাইদের সঙ্গে কাজ করছে দেখলাম। দাঁড়া, ডেকে আনছি।
কথাটা শুনেই ফারিন তড়িঘড়ি করে তার হাত টেনে ধরে বলল,
—খবরদার, যাবি না!
তনিমা বিরক্ত হয়ে বলল,
—আজব তো, তুই ঠিক কি চাস বলত?
ফারিন মুখ গোমড়া করে বলল,
—আমি ঠিক করতে পারব না। যে দোষ করেছে, সে-ই ঠিক করবে।
—তাহলে ডেকে আনি রিশাদ ভাইকে। সেই ঠিক করবে।
—না। সে নিজে থেকে এসে ঠিক করলে করবে, নয়তো দরকার নেই।
মেহরীন এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল,
—আজব! এ আবার কেমন কথা? দেখছিস বিয়ে বাড়িতে এসেও শান্তিতে নেই। এই কাজ, সেই কাজ কত কিছুই করছেন। তার ওপর এত মানুষের ভিড়ে হয়তো তোর সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলার পরিবেশই পাচ্ছেন না। তাই বলে সব ঠিক করতে পারছে না। তুই একটু সুযোগ করে দিবি না?
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—না। একদম না।
মেহরীন আর কিছু বলল না। বুঝতে পারল, ফারিনের রাগ এখনো যথেষ্ট চড়া। এই মুহূর্তে তাকে বোঝানো সম্ভব হবে না। বাকিরাও চুপ করে গেল। এর মধ্যেই মেহরীনকে ডাকতে চলে এল ফাইজা। তাকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল। এবার তাকে কাঁচা হলুদের জন্য সাজানো হবে। একটু পরেই বাড়ির সব মহিলারা মিলে ছাদে কাঁচা হলুদ মাখিয়ে দুধ দিয়ে গোসল করাবে তাদের। মেহরীনের সঙ্গে তাহিয়াও বেরিয়ে গেল। তাদের পিছু পিছু তনিমাও বেরিয়ে এল। তবে ফারিন ঘরেই রয়ে গেল। তাকে জামা বদলাতে হবে। নতুন জামাটা হাতে নিয়ে সে বাথরুমে ঢুকে গেল।
এদিকে তনিমা এদিক-ওদিক কাউকে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে পুরুষ মানুষে গমগম করছে পুরো উঠোন। একদিকে ডেকোরেশনের লোকজন ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে, অন্যদিকে রান্নার লোকজনের ছোটাছুটি। তার ওপর অতিথিদের ভিড় তো আছেই। এত মানুষের মাঝে তনিমা এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছিল। ঠিক তখনই একটা ছেলে তার দিকে এগিয়ে এল।
—তুমি তাহিয়ার ফ্রেন্ড না?
কণ্ঠস্বর শুনে তনিমা সেদিকে তাকাল। তারই বয়সী একটা ছেলে। তবে ছেলেটাকে সে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হলো না। তনিমার তাকানো দেখে ছেলেটা মুচকি হেসে বলল,
—আমি রামিম। রিতু আপুর মামাতো ভাই। কাল মেহেদি অনুষ্ঠানে এসেছিলাম।
পরিচয়টা শুনে তনিমা হালকা হাসল,
—ওহ, আচ্ছা।
রামিম এবার জানতে চাইল,
—কাউকে খুঁজছ?
তনিমা একটু ইতস্তত করে বলল,
—জি, আসলে…
কথার মাঝেই সেখানে এন্ট্রি নিল তাহসান। পাশেই রান্নার লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিল, তাদের দেওয়া লিস্টটা ঠিক আছে কি না, কী কী রান্না হবে, সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিল। তবে হঠাৎ তনিমাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, আর তার পাশে রিতুর মামাতো ভাই রামিমকে দেখে ভালো লাগল না। এক মুহূর্তও দেরি না করে সেদিকে এগিয়ে এল সে।
—রামিম, কী অবস্থা?
তাহসানের কণ্ঠ শুনে থেমে গেল তনিমা। রামিমও তার দিকে ফিরে তাকাল। হাসিমুখে বলল,
—এই তো ভাইয়া, ভালোই।
—কখন এলে?
—একটু আগে।
তাহসান একপলক তনিমার দিকে তাকাল। তারপর হাসতে হাসতেই রামিমকে বলল,
—তা ভাইয়ের বিয়েতে এসে এমনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বললে তো চলবে না। কাজে লেগে পড়ো।
তার কথায় রামিম মাথা নেড়ে বলল,
—আমি আসার পর থেকেই ভাবতেছি কী করব। কিন্তু সবাই সবদিকে কাজে লেগে আছে। আমি আর কোনো কাজই পাচ্ছি না।
তাহসান এদিক-ওদিক তাকিয়ে ডেকোরেশনের লোকজনের দিকে ইশারা করে বলল,
—ওই যে স্টেজের ওদিকে যাও। খেয়াল রেখো, ওরা যেন ডিজাইনটা উল্টোপাল্টা করে না ফেলে। তোমাকে ডিজাইনটা হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দিচ্ছি।
রামিম একবার তনিমার দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
—আচ্ছা ভাইয়া।
বলেই সেদিক থেকে চলে গেল। তাহসান এবার তনিমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মোবাইল বের করে হোয়াটসঅ্যাপে ডিজাইনের ছবিটা রামিমকে পাঠিয়ে দিল। তারপর দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে তনিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—এখানে কী করছো? বাইরে যে এত বাইরের লোকজন আছে, জানো না?
তনিমা নিচু স্বরে বলল,
—আসলে রিশাদ ভাইকে খুঁজতে এসেছিলাম।
তাহসানের ভ্রু কুঁচকে গেল,
—তাকে কী দরকার?
তনিমা আমতা-আমতা করে বলল,
—দরকার ছিল।
তাহসান কপাল কুঁচকে বাঁদিকে তাকাল। রিশাদ সেদিকেই আছে। সেদিকে গরুর কাটছে। গরু কাটার কাজে হাত লাগাচ্ছে সেও। একজন গরুর ঠ্যাংটা আলগা করে দিতেই রিশাদ রশি দিয়ে সেটা ওপরে বেঁধে ঝুলিয়ে দিল। এরপর একজন মাংস ছাড়ানোর কাজে লেগে গেল।
তাহসান জায়গায় দাঁড়িয়েই জোরে ডেকে উঠল,
—রিশাদ!
তাহসানের ডাক শুনে রিশাদ তার দিকে ফিরে তাকাল। ভ্রু তুলে ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে? তাহসানও ইশারায় তনিমার দিকে দেখাল। রিশাদ বুঝতে পারল, সম্ভবত তাকে দরকার। হাতের রক্ত বালতির পানিতে ভালো করে ধুয়ে সে এগিয়ে এল। কাছে এসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—কী অবস্থা, তনিমা? কেমন আছো?
তনিমা মুচকি হেসে বলল,
—এই তো ভাইয়া আলহামদুলিল্লাহ ভালোই। আপনি?
—আমিও আছি কোনোরকম। তা, ডাকলে যে? কোনো দরকার?
তনিমা বলল,
—আসলে ফারিন ডাকছিল আপনাকে।
ফারিনের নাম শুনতেই রিশাদ চমকে উঠল,
—ফারিন ডাকছে আমাকে? কিন্তু কেন?
—জানি না। বলল আপনাকে ডেকে দিতে। কী যেন বলবে।
রিশাদ এবার অবাক সুরে জিজ্ঞেস করল,
—সে এখন কোথায় আছে?
—তাহিয়ার রুমে।
রিশাদ মাথা চুলকে বলল,
—আচ্ছা, তোমরা থাকো। আমি তাহলে যাই। গিয়ে দেখি ম্যাডাম কী বলেন।
তনিমা হেসে মাথা নাড়তেই রিশাদ সেদিক থেকে চলে গেল। রিশাদ চলে যেতেই তনিমা এবার তাহসানের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
—খেয়েছেন কিছু, নাকি খাটতে খাটতে খাওয়ার কথাই মনে নেই?
তাহসান স্বাভাবিক গলায় বলল,
—নাস্তা করেই কাজে লেগেছি।
—যাক, ভালো কাজ করেছেন।
কথাটা শেষ হতে না হতেই তাহসান আচমকা তনিমার হাত ধরে এক টানে তাকে নিজের পাশে নিয়ে এল। তনিমা হকচকিয়ে তার দিকে তাকাতেই দেখল, বড় একটা ডেগ নিয়ে একজন লোক একেবারে তার পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো লোকটার সঙ্গে ধাক্কা লেগেই যেত। তাহসান তখনও তনিমার বাহু ধরে রেখেছে। কপালে রাগের ভাঁজ ফেলে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনারা দেখেশুনে হাঁটতে পারেন না? মানুষের ওপর দিয়েই হেঁটে যাবেন নাকি?
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দুঃখিত বলে জানাল, আর হবে না। তারপর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। তাহসান এবার ধীরে ধীরে তনিমার বাহু থেকে হাত সরিয়ে নিল। তবে কপালের রাগী ভাঁজটা তখনও কাটেনি। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—যাও, ভেতরে যাও।
তনিমা কিছু বলল না। নিশ্চুপে মাথা নেড়ে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। তাহসানও আর সেদিকে না তাকিয়ে নিজের কাজে ফিরে গেল।
রিশাদ তাহিয়ার ঘরের সামনে এসে বাইরে থেকে দরজায় টোকা দিল। ভেতরে তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল ফারিন। সে ভাবল, হয়তো কোনো মেহমান এসেছে। তাই চুলে চিরুনি চালাতেই চালাতেই বলল,
—আসুন..
দরজা ঠেলে রিশাদ ভেতরে ঢুকতেই আচমকা পেছন থেকে কেউ দরজাটা টেনে বাইরে থেকে লাগিয়ে দিল। ঠাস করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে দুজনেই চমকে পেছনে ফিরল। রিশাদকে দেখেই ফারিনের চোখ কপালে উঠে গেল। তড়িঘড়ি করে দরজার কাছে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—আপনি এখানে কী করছেন? এই দরজা কে লাগিয়েছে? খোল বলছি, দরজা খোল।
রিশাদও অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি ডাকোনি আমায়?
ফারিন তেজি গলায় বলল,
—আমি কেন আপনাকে ডাকতে যাব?
রিশাদ এবার দুহাত কোমরে রেখে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—ওহ, এই ব্যাপার। আমিও বলি, ম্যাডাম আবার এত লক্ষ্মী হলো কবে থেকে? নিজে থেকে ডেকে ঝামেলা মেটাবে, ভাবতেই পারছিলাম না।
ফারিন রেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল,
—এই! একদম আমার নামে আজেবাজে কথা বলবেন না।
রিশাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—সে সাহস আছে নাকি আমার?
ফারিন গরম চোখে তাকিয়ে বলল,
—দরজা খুলতে বলুন।
রিশাদ একেবারে ভাবলেশহীনভাবে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল বলল,
—তোমার বান্ধবী। তুমিই বলো।
ফারিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ডাকাডাকি করল। কিন্তু বাইরে থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তাকে এভাবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিশাদ হেলান দিয়ে বলল,
—সামনে এসে দাঁড়াবে, নাকি তুলে আনব?
ফারিন নাক-মুখ কুঁচকে ধপধপ করে পা ফেলে এগিয়ে এল। এই ছেলের ওপর তার একদম ভরসা নেই। যা বলে, সত্যিই করে বসতে পারে। রিশাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কী?
রিশাদ শান্ত গলায় বলল,
—Look at me.
ফারিন বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখের বিরক্তি উধাও হয়ে মুখে ফুটে উঠল দুশ্চিন্তার ছাপ। রিশাদের গলার একপাশে লালচে রক্ত লেগে আছে। ফারিন মুহূর্তেই তার কাছে এগিয়ে গিয়ে গলায় হাত রাখল,
—এই আপনার গলায় কী হয়েছে? রক্ত কেন? কীভাবে কেটেছে? কিছু লাগাননি কেন?
বলতে বলতেই সে রিশাদের গলার সেই জায়গাটা এদিক-ওদিক করে দেখতে লাগল। ফারিনের এমন ব্যস্ততা দেখে রিশাদের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা তার ওপর যতই রাগ করে থাকুক, তার সামান্য কিছু হলেই যে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে যায়, এই ব্যাপারটা রিশাদের ভীষণ ভালো লাগে। হঠাৎই সে দুহাত দিয়ে ফারিনের কোমর আঁকড়ে ধরে বলল,
—কাটেনি। গরু কাটছিলাম। তারই রক্ত হয়তো লেগে গেছে।
কথাটা শুনে ফারিন হাত দিয়ে দ্রুত রক্তের জায়গাটা মুছে দেখল। সত্যিই কোনো কাটা দাগ নেই। শুধু রক্ত লেগে ছিল। এবার যেন তার হুঁশ ফিরল। সে যে রেগে আছে। তড়িঘড়ি করে রিশাদের কাছ থেকে সরে যেতে চাইল,
—দেখি, ছাড়ুন। আমাকে টাচ করেছেন কোন সাহসে?
রিশাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—ব্যক্তিগত সাহসে।
—ছাড়ুন।
—বেশি চেঁচামেচি করলে কিন্তু কোলে বসিয়ে রাখব।
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। রাগী চোখে রিশাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—কী সমস্যা আপনার?
রিশাদ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমার সমস্যা তুমি।
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
—তো ছেড়ে দিন না। সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
রিশাদ এবার একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল,
—ছাড়তে পারব না। আজ আব্বু-আম্মু আসবে। আমি তোমার কথা বলে দিয়েছি। মূলত তোমাকে দেখতেই আসছে।
কথাটা শুনে ফারিনের মুখের সমস্ত রাগ যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে দ্রুত বলল,
—কিইই! আমাকে আগে বলেননি কেন? ইয়া আল্লাহ, আমি তো কিছুই করিনি। ফেসিয়ালও করিনি, চুলে শ্যাম্পুও করিনি। আমার এই অবস্থায় দেখলে তো মুখের ওপর রিজেক্ট করে দেবে. দেখি, ছাড়ুন। আমার অনেক কাজ আছে।
রিশাদ ফিক করে হেসে ফেলল। ফারিনের চিন্তিত মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তুমি যেমন আছো, তেমনই কোনো অপ্সরার চেয়ে কম না। তাছাড়া আমার আব্বু-আম্মু তোমাকে হবু পুত্রবধূ হিসেবে দেখতে আসছে। তারা তোমাকে রিজেক্ট বা এক্সেপ্ট, কোনোটাই করতে না। তাদের ছেলে বউএ সিলেক্ট করে ফেলেছে। এখন শুধু তাদের দেখার পালা।
রিশাদের কথা শুনে ফারিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। রিশাদ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মেয়েটা যেন একটা পুরো প্যাকেজ। এই হাসছে, এই কাঁদছে, এই রাগ করছে, এই অভিমান করছে, আবার পরমুহূর্তেই লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলছে। একটা মেয়ের যে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত রকম মুড বদলাতে পারে, ফারিনকে না দেখলে হয়তো রিশাদ কোনোদিনই বিশ্বাস করত না। কিছুক্ষণ নীরবতা কেটে যাওয়ার পর রিশাদ নরম স্বরে বলে উঠল,
—আই এম সরি, জান। আর হবে না এমন। যা করেছি, সবকিছুর জন্য সরি।
ফারিন এবার অভিমানে মুখ ভার করে তার দিকে তাকাল,
—আপনি আবারও না জেনেশুনে সরি বলছেন? কী করেছেন, সেটাই মনে নেই আপনার।
রিশাদ ঠোঁট উল্টে অসহায় মুখ করল। তারপর ফারিনের কোমর থেকে হাত সরিয়ে তাকে পাশে বসাল। দুহাতে তার দুগাল আলতো করে আগলে নিয়ে মুখটা একটু কাছে এনে বলল,
—জান দেখো, কখন কোন আচরণে বা কোন কাজে তুমি কষ্ট পেয়ে যাও, সেটা যদি মুখ ফুটে না বলো, তাহলে কি আমি সবসময় বুঝতে পারব? আমাকে একটু তো মায়া করো। খালি বলে দাও আমার দোষটা কী। তাহলে আবারও ক্ষমা চাইব।
ফারিন চোখ নামিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মন খারাপ করা কণ্ঠে বলল,
—আপনি ওই মেয়েটাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়েছেন।
রিশাদ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—কোন মেয়ে?
ফারিন এবার রেগে তার দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—কালকের মেহেদি অনুষ্ঠানের খাবারের সময় যেই মেয়েটাকে পানি এগিয়ে দিয়েছিলেন।
রিশাদ হতাশ চোখে তাকাল,
—এটা কোনো কথা হলো? আমি তো সবার খাবার পরিবেশন করছিলাম। তার মাঝেই পানিটা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে দিয়েছিলাম। কসম, আমি অন্য কোনো ইন্টেনশনে এগিয়ে দিইনি।
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কিন্তু ওই মেয়েটা তো অন্য ইন্টেনশনে নিয়েছে। আপনাকে দেখে পুরোটা সময় মুচকি মুচকি হাসছিল।
রিশাদ অসহায় কণ্ঠে বলল,
—এখন কার মনে কী আছে, সেটা কি আর আমি জানি? এখানে আমার দোষটা কোথায়, বলো?
—দোষ আপনারই। আপনি কেন মেয়েটাকে উল্টাপাল্টা ভাবার সুযোগ করে দেবেন?
রিশাদ ফুঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বুঝতে পারল, তার দোষ না থাকলেও ফারিন আজ তাকে দোষী বানিয়েই ছাড়বে। তাই আর তর্ক বাড়াতে চাইল না। দুই কান ধরে বলল,
—এই যে, কানে ধরছি। নেক্সট টাইম থেকে আর হবে না।
ফারিন আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—যদি হয়?
রিশাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তাহলে আপনি যে শাস্তি দেবেন, সেটাই মাথা পেতে নেব। এবার অন্তত আমাকে একটু শান্তি দিন।
বলেই দুহাত মেলে বুকে আসার ইশারা করল। ফারিন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হেসে ফেলল। পরক্ষণেই ছুটে এসে রিশাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রিশাদও পরম ভালোবাসায় তাকে আগলে নিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকে জড়িয়ে রাখার পর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—তোমার এই অহেতুক ঝামেলার কারণে কাল পুরোটা রাত কী অসহ্য কেটেছে, জানো তুমি?
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে রাগী স্বরে বলল,
—অহেতুক ঝামেলা করেছি আমি?
রিশাদ হকচকিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল,
—না, না! একদম যুক্তিসংগত ঝামেলা ছিল।
বলেই ফারিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, কোনোভাবেই তাকে বুক থেকে সরাতে চায় না। বলা যায় না, আবার কখন রেগে যায়।
ছাদের একপাশে সবাই মেহরীন আর তালহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরীনের গায়ে কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি, বাঙালিয়ান স্টাইলে পরানো। হাতে, কানে, কপালে গাঁদা ফুলের গহনা। হলুদের রঙে আর ফুলের সাজে মেয়েটাকে যেন একেবারে অন্যরকম লাগছে। পাশেই সাদা পাঞ্জাবি পরে বসে আছে তালহা। তাদের ঘিরে সবাই মিলে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে গীত গাইছে। বিশেষ করে দাদি-নানিরা যেন এই গীত গাওয়ায় একটু বেশিই মজা পাচ্ছেন। তাদের নিজেদের সময়ের সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দের একটুকরো যেন আজ আবার ফিরে পেয়েছেন। নাতি আর নাতবউকে মাঝখানে রেখেই গীতের তালে তালে কেউ হাত নাড়ছেন, কেউ কোমর দোলাচ্ছেন, কেউবা ঘুরে ঘুরে নাচছেন। তালহা-মেহরীন হাসিমুখে দেখছে তাদের এই উচ্ছ্বাস। একসময় দুজনের চোখাচোখি হতেই দুজনেই আরও প্রশস্ত করে হেসে ফেলল।
ওদিকে রিতু একটু দূরে চেয়ারে বসে পুরো দৃশ্যটা ভিডিও করছে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সে। তাই তো বেচারি ভাইয়ের বিয়েতে ইচ্ছা থাকলেও নাচতে পারছে না। তবে বসে থেকে আনন্দে কোনো কমতি রাখছে না। সবার গীত গাওয়া শেষ হতেই এবার শুরু হলো হলুদ মাখানোর পালা। একে একে সবাই কাঁচা হলুদ বাটা নিয়ে তালহা-মেহরীনের গালে, কপালে, হাতে-পায়ে হলুদ মাখিয়ে দিতে শুরু করল। সবার আগে তালহার দাদি হলুদ নিয়ে মেহরীনের সামনে বসলেন। হলুদ মাখাতে মাখাতে তিনি মজা করে বললেন,
—আজ তো রানীর মতো বসে হলুদ মাখছিস। কাল থেকে কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে হলুদের গুঁড়ো দিয়ে তরকারি রাঁধতে হবে। সেটা মনে আছে তো?
মেহরীন হেসে মাথা নাড়ল। পাশ থেকেই তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—এই বুড়ি, আমার বউয়ের মনে ভয় ঢুকাতে আসবে না। সে আজ যেমন রানী আছে, কালও রানীই থাকবে।
দাদি মুখ বাঁকিয়ে মেহরীনের গলায় হলুদ লাগাতে লাগাতে বললেন,
—বউটা না যেন হীরের টুকরা। কিছু বললে হজম করতে পারে না, সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা ছুড়ে।
তালহাও কম না দাদির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—বউ আমার হীরের টুকরাই।
তাদের এই মিছে ঝগড়া দেখে আশপাশে থাকা সবাই হেসে উঠল। দাদিও মুখে বিরক্তির ভাব ধরে রাখলেও ঠোঁটের কোণে হাসি লুকাতে পারলেন না। দাদি হলুদ মাখিয়ে উঠে যেতেই এবার মেহরীনের নানি এসে বসলেন। হাতে হলুদ নিয়ে তিনি মেহরীনের দুগালে, কপালে আর গলায় আলতো করে হলুদ লাগাতে লাগলেন। এরমাঝেই হঠাৎ করেই তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। মেহরীন হকচকিয়ে গেল। তিতলি বেগম সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে মাকে ধরে বললেন,
—কী হয়েছে, আম্মা? কাঁদছো কেন?
তিনি চোখ মুছতে মুছতে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
—মেহরীনকে দেখে ওর মায়ের চেহারাটা ভেসে উঠতেছে। শেষবারের মতো এভাবেই এমন সাজেই হলুদ ছুয়ে দিয়েছিলাম আমার মেয়েটাকে…
কথাটা বলতে বলতে আবারও চোখ ভিজে উঠল তার। মেহরীন নিশ্চুপ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ভার হয়ে এসেছে। সেও কাঁদতে চায়। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আজ সে কাঁদবে না। এই আনন্দের মুহূর্তে নিজের মন খারাপের ছায়া ফেলে সে অন্য কারও মন খারাপ করে দিতে চায় না। তাই নিজেকে শক্ত করে বসে রইল।
তিতলি বেগম মাকে অনেকটা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সেখান থেকে নিয়ে গেলেন। এরপর ভারী পরিবেশ পরিবর্তন করতে একে একে সবাই এসে হলুদ মাখাতে লাগল। কেউ মজা করছে, কেউ আশীর্বাদ দিচ্ছে, কেউবা নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা জানাচ্ছে। এরমধ্যে তাহিয়ারা তো ফাইজলামি করে পুরো মুখেই হলুদ মাখিয়ে দিয়েছে। তবে পুরোটা সময় মেহরীন প্রায় চুপই ছিল। তার মনের অবস্থা তালহার চোখ এড়াল না। এসবের ফাঁকেই সে মেহরীনের এক হাত শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। মেহরীন ধীরে ধীরে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তারপর চোখ তুলে তালহার দিকে তাকাল। তালহার চোখে কোনো কথা নেই। আছে শুধু একরাশ আশ্বাস। সে যেন নীরবেই বলল, আমি আছি। মেহরীন কয়েক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ছোট্ট এক টুকরো হাসি।
সকলের হলুদ দেওয়া শেষ হতেই এবার এলো বর-বউয়ের মাথায় দুধ মেশানো পানি ঢালার পালা। এটাতেও নাকি একটা নিয়ম আছে। পানি শুধু বিবাহিতরাই ঢালতে পারবেন। তাই তো বেচারি তাহিয়ারা মনখারাপ করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একে একে সব বিবাহিত মহিলারা মিলে কলসিটা ধরলেন। তালহা আর মেহরীনকে আরও গা ঘেঁষে পাশাপাশি বসানো হলো। দাদি দুজনের মাথা পাশাপাশি করে লাগিয়ে দিলেন। এবার দুজনের মাথার ওপর একটা কোলা ধরা হলো। আস্তে আস্তে সবাই মিলে সেই দুধ মেশানো পানি ঢালতে শুরু করল তার উপর। কোলার ভেতর দিয়ে পানি ছেঁকে দুজনের মাথার ওপর ধীরে ধীরে পড়তে লাগল। একসময় সেই পানির ধারা বেয়ে দুজনের চুল, মুখ, পোশাক ভিজতে লাগল। তালহা আর মেহরীন একে অপরের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে একে অপরের চোখে তাকিয়ে আছে। কোনো কথা নেই মুখে শুধু দুজনের চোখে ফুটে আছে প্রশান্তির হাসি। এ হাসি শুধু আনন্দের নয়। এ হাসি তাদের পূর্ণতার। আর দূরে বসে রিতু সেই মুহূর্তটুকু নিখুঁতভাবে বন্দি করে নিল তার ক্যামেরায়, একটি ছবিতে, যেখানে দুইজন মানুষের চোখে ঠোঁটে লেখা ছিল তাদের পুরো ভালোবাসার গল্প।
দুজন পুরোপুরি ভিজে একাকার হতেই সবাই থামল। এবার উঠে দাঁড়াল দুজন। তাদের হলুদ পর্ব শেষ। এবার ঘরে গিয়ে গোসল করে নিবে। তালহা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে মহিলাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে নিচে নামতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দাদি পেছন থেকে ডেকে উঠলেন,
—এই, কোথায় যাচ্ছিস?
তালহা ঘুরে তাকিয়ে বলল,
—ঘরে, গোসল করব না?
দাদি চোখ কপালে তুলে বললেন,
—তো তোর বউকে রেখে যাচ্ছিস কেন? কে নিয়ে যাবে?
তালহা একটু থেমে আশপাশে তাকিয়ে বলল,
—আমি তো ভাবলাম, তোমরা আছো…
দাদি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
—বিয়ে করছিস তুই, আর বউ সামলাব আমরা? এত সোজা নাকি? এক্ষুনি কোলে করে নিয়ে ঘরে দিয়ে আসবি।
কথাটা শুনতেই মেহরীনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মা-চাচিদের বয়সী সব মহিলাই আশপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সবার সামনে তাকে কোলে করে নিয়ে যেতে বলছে। লজ্জায় মেহরীন একবার এদিকে, একবার ওদিকে তাকাতে লাগল। মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে তালহার মুখে তো ইতিমধ্যেই দুষ্টু হাসি ফুটে উঠেছে। দাদির কথায় আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মেহরীনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
—আগে বলবা না? আমি তো আমার বউকে সামলাতে যেকোনো টাইমে রেডি।
কথা শেষ করার আগেই ফট করে মেহরীনকে পাঁজাকোলে তুলে নিল তালহা। মেহরীন হকচকিয়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দুহাত দিয়ে তালহার গলা জড়িয়ে ধরল। চারপাশ থেকে মুহূর্তেই হাসির রোল উঠল। মেহরীন লজ্জায় মুখটা তালহার বুকের কাছে লুকিয়ে ফেলল। তবে তালহা বেশ উপভোগ করছে। তাকে নিয়ে যেতে লাগল।
পেছন থেকে নানি হেসে বললেন,
—নিজের দায়িত্ব ভুললে চলবে না কিন্তু।
তালহা পেছনে না ফিরেই বলল,
—এই দায়িত্ব তো সারাজীবনের জন্য নিলাম, এমন মহা মূল্যবান দায়িত্ব ভোলা যায় নাকি?
সবাই মিটিমিটি হেসে উঠল। তিতলি বেগম হেসে বললেন,”পাগল ছেলে”। এরপর তারা তারা মিলে ছাদের সব গুছানো শুরু করল। তালহাও মেহরীনকে নিয়ে ঘরে পৌঁছে গেছে। পা মাটিতে পড়তেই মেহরীন এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঝটপট বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার লজ্জায় রাঙা মুখটা দেখে তালহা মাথা চুলকে মিটিমিটি হাসল। হাসতে হাসতেই মাথা নাড়িয়ে তালহা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। হলুদ রঙের কাপড় আর ফুলে চারদিক সাজানো হয়েছে বড্ড সুন্দর করে। আলোকসজ্জার সঙ্গে ফুলের সাজ মিলিয়ে পুরো বাড়িটাকেই আলোময় করে তুলেছে। বড় স্টেজটায় পাশাপাশি বসে আছে তালহা আর মেহরীন। মেহরীনের পরনে হলুদ লেহেঙ্গা। সঙ্গে মানানসই অলংকার, মুখে ভারী সাজ আর মুখজুড়ে মায়াবী হাসি। আজকের হলুদের সাজে তাকে ঠিক যেন জীবন্ত কোনো পুতুলের মতো লাগছে। কখনো হাসছে, কখনো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, আবার কখনো তনিমা কিংবা তাহিয়াকে ডাকছে।
পাশে বসা তালহার পরনে হলুদ শেরওয়ানি আর সাদা পায়জামা। হাতে চিরচেনা ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা। ব্যস, তার সাজ এতটুকুই। পুরোটা সময় তার চোখ এক জায়গাতেই আটকে আছে, মেহরীনের ওপর। মেয়েটা যেন হলুদের ছোঁয়ায় আরও রূপবতী হয়ে উঠেছে। যতবারই তাকাচ্ছে, ততবারই নতুন করে মুগ্ধ হচ্ছে তালহা। এখন যেন চোখ সরানোই দায়।
মেহরীন তখন স্টেজের পাশেই তনিমা, ফারিন আর রাফির কাণ্ড দেখে হাসছে। তিনজনের মধ্যে সেই লেভেলের ঝগড়া লেগেছে। কে কাকে কী বলছে, তার ঠিক নেই। তাহিয়া এখন এখানে নেই। রিতুর শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন। ফাইজার সঙ্গে সেও তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। সঙ্গে ফাইজার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও এসেছে। বেচারি রিতু সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তেমন কিছুই করতে পারছে না। তাই বোনের দায়িত্বটা ফাইজা ও তাহিয়া নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
মেহরীন তাদের কান্ড দেখে হাসতে হাসতেই পাশে ফিরল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার হাসি থেমে গেল। তালহা একধ্যানে তার দিকেই চেয়ে আছে। পলক ও যেন ফেলছে না। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কী এত দেখেন?
তালহা ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েই বলল,
—আমার বেটারহাফকে, আমার সুইটহার্টকে, আমার অনলি মাইনকে, আমার বিউটিফুলকে, আমার দ্য মোস্ট ওয়ান্ডারফুল লেডিকে, আমার বাবুর আম্মুকে, আমার বউকে…
মেহরীন গালভরে হেসে ফেলল। এক হাতে তার মুখটা চেপে ধরল থামাতে হেসে বলল,
—ফ্লার্ট করছেন, মশাই।
তালহা হাতটা সরাল। একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
—ফ্লার্ট করে দেখাবো?
বলেই সে স্টেজের অন্যপাশ চাইল। সেদিকে সাউন্ড বক্সের কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার বন্ধুরা। চারপাশের হইচইয়ের মাঝেই আচমকা তালহা জোরে ডেকে উঠল,
—রিশাদ।
ডাক শুনে সবাই ঘুরে তালহার দিকে চাইল। তালহা চোখ টিপ দিতেই রিশাদরা মুহূর্তেই বুঝে গেল, তাদের বন্ধু এবার কিছুমিছু করতে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গ দিতে হবে। তালহা বেশ গম্ভীর স্বরে বলল,
—আজকের আকাশে চাঁদ দেখেছিস?
কথাটা শুনেই রিশাদদের মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। তুর্য সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
—আজকের আকাশের চাঁদটা কই রে? এই, তোরা কি দেখছিস?
একজন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—না না, দেখছি না তো।
—আসলেই দেখা যাচ্ছে না।
বলেই একেকজন মিছিমিছি আকাশের দিকে তাকাতে লাগল। চারপাশের মানুষজনও এবার কৌতূহলী হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহরীনও অবাক চোখে তালহার দিকে চেয়ে আছে। তালহা এবার মুচকি হেসে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আকাশে দেখবি কী করে? চাঁদ তো আমার পাশে বসে আছে।
মুহূর্তেই তারা চেঁচিয়ে উঠল। কেউ শিস বাজিয়ে উঠল, কেউ হাততালি দিল, কেউ আবার বাহবা দিতে লাগল। তাদের অবস্থা দেখে বাকিরাও মিটিমিটি হেসে ফেলল। এসবের ভিড়ে মেহরীন লজ্জায় একেবারে নুইয়ে পড়ল। দ্রুত তালহার হাতে চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল,
—এসব কোন ধরনের কথা? লজ্জা-শরম খেয়ে বসেছেন নাকি? সবার সামনে কী সব বলছেন।
তালহা মৃদু হেসে এবার আরও জোরে বলল,
—আমার বউ বলছে, আমার লজ্জা-শরম নেই। তোমরাই বলো, পুরুষ মানুষের আবার লজ্জা-শরম থাকতে হয় নাকি?
আশপাশ থেকে একসঙ্গে জোরে “না” ধ্বনি ভেসে এল। মেহরীন তালহাকে থামাতে হাত খামচে ধরল। ঠোঁট চেপে বসে আছে। তালহা বাকাঁ হেসে চেয়ে আছে। আপাতত এখানে কমবয়সীরাই উপস্থিত। মুরুব্বিরা অনুষ্ঠান শুরু হলে ভেতর থেকে এসে যোগ দেবেন। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে তালহা বউকে লজ্জায় ফেলতে ব্যস্ত।
এদিকে তাহিয়ারা দশ-বারোজন মেয়ে একপাশে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বিপরীতে রাফি, মেহেদি, তালহার মামাতো ভাইরা ও রিশাদরাসহ আরও কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে। রাফি বেশ ভাব নিয়ে বলল,
—স্টেজ তো আমরাই ফাটাবো। তোরা তো খালি লাফালাফি করতে পারিস।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে হাত উঁচিয়ে বলল,
—চ্যালেঞ্জ দিবি না, শালা। নাচের দিকে তো আমরাই এগিয়ে।
মেহেদি রাফির কাধ চেপে ধরে ভাব নিয়ে বলল,
—লাফালাফি সবাই-ই পারে। তাই বলে তো ভালো নাচ পারো মনে করলে তো হবে না।
তাহিয়া রেগে ভাইয়ের দিকে চাইল। লেগে গেল তর্কাতর্কি। তাদের কথা কাটাকাটির মাঝেই সেখানে এসে উপস্থিত হলো ফারিস। পরনে হলুদ পাঞ্জাবি, গলায় ঝুলছে সাদা ওড়না। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে তাহিয়ার সামনে দাঁড়াল,
—বাব্বাহ, এত কনফিডেন্স।
ফারিসকে দেখামাত্রই তাহিয়ার কণ্ঠের জোর যেন খানিকটা কমে গেল। হাতটা নামিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—তো আবার কী?
রিশাদ এগিয়ে এসে ফারিসের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—তাহলে চল, হয়ে যাক কম্পিটিশন।
সবাই একসঙ্গে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কিসের কম্পিটিশন?
রিশাদ বলল,
—ডান্স চ্যালেঞ্জ। একবার মেয়েরা নাচবে, একবার ছেলেরা। দর্শক যাদের পারফরম্যান্স ভালো বলবে, তারাই উইনার। আর শেষে যে দল হেরে যাবে, তাদের জন্য থাকবে ডেয়ার।
কথা শেষ করে বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল রিশাদ। তার প্রস্তাবে ছেলেরা একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। কারণ তারা সবাই মিলে আগেই ডান্স প্র্যাকটিস করে রেখেছে। এখন শুধু স্টেজ ফাটানোর পালা। নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসও আকাশছোঁয়া। ছেলেদের এমন আত্মবিশ্বাস দেখে মেয়েরা অবশ্য একটু চিন্তায় পড়ে গেল। সবাই একে অপরের সঙ্গে ফিসফিস করে পরামর্শ করতে লাগল। শেষমেশ ফারিন এগিয়ে এসে রিশাদের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়াল। দুহাত বুকের ওপর গুটিয়ে সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড। তবে এক শর্তে…
রিশাদ সোজা হয়ে দাঁড়াল কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—কী শর্ত?
ফারিন এবার দুষ্টু হেসে বলল,
—গান বিপরীত দল সিলেক্ট করবে। যেমন, আমাদের গান আপনারা সিলেক্ট করবেন আর আপনাদের গান আমরা।
সঙ্গে সঙ্গেই সব ছেলেরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
—কিইইই।
ছেলেদের মুখ মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল। তারা তো মাত্র একটা গানেই ডান্স প্র্যাকটিস করেছে। এর বাইরে অন্য কোনো গান দিলে কীভাবে নাচবে, সেটাই তাদের মাথায় আসছে না। তবে মেয়েদের এই ক্ষেত্রে কনফিডেন্ট বেশি। তারা যেকোনো গানে নাচতে পারবে। একে অপরের মুখ দেখাদেখি ক্রুতে করতে রাফি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানিয়ে বলল,
—একদম না। গান যার যার ইচ্ছেমতো হবে।
তনিমা চোখের সামনে আঙুল তুলে আঙুলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলল,
—ভয় পেয়ে গেছিস নাকি? তাহলে এখনই হার মেনে নে।
রাফা এবার বলল,
—ভাইয়া আপনারা পারবেন না। বাদ দেন।
রাফি দাঁত পিষে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—সুন্দরী মেয়েদের চুপচাপই মানায়। সো চুপ থাকো।
রাফা দাঁত কিরমির করে তার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কাটল। ফারিহা পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
—আপনারা পারবেন না। হুদাই এত মানুষের মাঝে নিজেদের প্রেস্টিজ নষ্ট না করে এক কাজ করুন, হার মেনে নিন। আমরা কাউকে বলব না।
তনিমাও সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল,
—হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমরা দয়া দেখাব।
মেয়েদের এমন আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তায় ছেলেদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। এরই মধ্যে তুর্য প্রায় জোর করেই তাহসানকে টেনে নিয়ে এসেছে। নাচ-গানের এসব ব্যাপারে তাহসানের কোনো আগ্রহই নেই। কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত তাকে আসতেই হয়েছে। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবার কথাবার্তা শুনছিল সে। মেয়েদের এমন চ্যালেঞ্জ আর খোঁচাখুঁচি তার বেশ গায়ে লাগল। দয়া দেখাবে শুনে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
—এক্সকিউজ মি। নাচ কি মেয়েরাই শুধু পারে? ছেলেরাও পারে। চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড। তোমরা যে গানই দিবে সেটাতেই আমরা নাচব।
তাহসানের কথা শুনে মুহূর্তেই সবাই হকচকিয়ে গেল,
—এই এই! কী বললি?
— আরে ভাই, এ কী করলেন। কথা বলে শর্ত চেঞ্জ করা যেত।
—সর্বনাশ। কাম ঘটাইয়া ফেলছে।
রাফি করুণ কন্ঠে বলল,
—উত্তেজনার বশে সিদ্ধান্ত নিতে নেই স্যাররর..
তাহসান থমথমে মুখে সবার দিকে তাকাল। সত্যি বলতে, কথাটা বলার সময় এত কিছু তার মাথায় আসেনি। এখন সবার কথা শুনে নিজেও খানিকটা থমকে গেল। আমতা-আমতা করে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই তনিমা মুচকি হেসে বলল,
—চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্ট করে ফেলেছেন। এখন যদি মত বদলান, তাহলে কিন্তু আপনারা হেরে গেলেন।
তাহসান একটু ভেবে এবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখ পিটপিট করে তনিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমরা একবারও বলেছি যে আমরা মত বদলাব?
তাহসান এবার আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
—আমরা তোমাদের দেওয়া গানেই নাচব। আর জিতবও।
তারপর ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—Be confident boys. আমরা চাইলে সব পারি।
তাহসানের কথাটা শেষ হতে না হতেই ছেলেরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮১
—ইয়েসসস! আমরা সব পারি!
চারপাশে আবারও হাসি-উল্লাসে পরিবেশ জমে উঠল। এরপর একে একে দুদল আলাদা হয়ে গেল। মেয়েরা একদিকে জড়ো হয়ে ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল। অন্যদিকে ছেলেরাও মাথা ঘামাতে বসে গেল। দু’দলের উদ্দেশ্য একটাই, বিপক্ষ দলকে এমন গান দেওয়া, যাতে স্টেজে উঠেই তারা হ্যস্তনস্ত হয়ে যায়।
