Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২০

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২০

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২০
অধরা মিনহা

ইফরাদ আনতারার গালে স্লাইড করতে করতে চোখে চোখ রেখে বলে,
— আমি যদি জাহান্নামে নিয়ে যাই, তাহলেও যাবে কোনো প্রশ্ন ছাড়া।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না।
ইফরাদ ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে,
— না?
— জাহান্নামে কেন যাবো? আপনি তো আপনাকে নিয়ে জান্নাতে যেতে চাই।
ইফরাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,

— আচ্ছা।
— একবার ইনশাআল্লাহ বলুন?
ইফরাদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— বললে কী হবে?
— ইনশাআল্লাহ বলবেন, কে বলতে পারে আল্লাহ তাআলা কুন ফায়া কুন বলে দিলেন? তখন কবুল হয়ে যাবে। জান্নাতে আমাদের জন্য জায়গা বরাদ্দ হয়ে যাবে।
আনতারার কথা শুনে ইফরাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। নরম স্বরে বলে,
— ইনশাআল্লাহ।
আনতারা মুচকি হেসে সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— ইনশাআল্লাহ।
থেমে আনতারা বলে,
— থাকুন, আমি কফি নিয়ে আসছি।
ইফরাদ আনতারার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
— তোমার ওপর দিয়ে সারাদিন অনেক ধকল গেছে।
আনতারা ইফরাদের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে মৃদু হেসে বলে,

— ওই ধকল আমার কেটে গেছে। এখন আমার শরীরে যথেষ্ট শক্তি আছে।
ইফরাদ আনতারার গালে হাত রেখে আদুরে ছোঁয়ায় বলে,
— জেদি মেয়ে!
— মোটেও জেদি না আমি। জেদি তো আপনি। আমার স্বামী আরেক নারীর হাত থেকে কফি খাবে? আমি দেব না।
ইফরাদ মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে,
— জেলাসি?
আনতারা গাল ফুলিয়ে বলে,
— স্বামীর ভাগ কাউকে দেব না।
ইফরাদ হেসে উঠে। তারপর দুই হাত দিয়ে আনতারার দুই গাল আলতো করে ধরে আদর করে, নাক ঘষে আদুরে স্বরে বলে,

— আমি নিজেকে ভাগ হতেই দেব না। আমি শুধু আমার মাই জানার।
ইফরাদের কথায় আনতারা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।।তারপর আস্তে করে বলে,
— জি, সঠিক বুঝেছেন।
ইফরাদ হেসে ফেলে। আনতারা আবার বলে,
— আপনি থাকুন। আমি নিয়ে আসছি। একদম মানা করবেন না।
— ওকে, যাও। ব্ল্যাক কফি এনো।
— আচ্ছা।
আনতারা আয়নার সামনে গিয়ে ওড়নাটা সুন্দর করে হিজাবের মতো বাঁধতে লাগল। এরপর ওড়নার এক পাশ দিয়ে মুখটাও ঢেকে নেয়। আনতারার এমনভাবে রেডি হওয়া দেখে পেছন থেকে ইফরাদ বলে উঠে,
— আমি ভাবছি, বাড়ির সব মেইডদের কাজ থেকে বের করে দেব।
আনতারা অবাক হয়ে ঘুরে তাকায়।

— কেন?
ইফরাদ এগিয়ে এসে বলে,
— বাড়ির মালকিনের সমস্যা হবে, এমন কোনো কাজ এই বাড়িতে হবে না। এমন কোনো কিছুই থাকবে না।
আনতারা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— সমস্যা কার হয়?
— তোমার। এই বাড়িতে পর্দা মেইনটেইন করতে তোমার খুব কষ্ট হয়।
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— বাড়িতে পুরুষ না থাকলেও যে আমি খোলামেলা চলব, এমন না। দুনিয়াতে যদি কোনো পুরুষ না-ও থাকে, তাহলেও একজন নারীর পর্দা করতে হবে। তবে হ্যাঁ, বাড়িতে পরপুরুষ না থাকা আমার জন্য ভালো।
ততক্ষণে আনতারার হিজাব বাঁধা শেষ হয়ে গেছে। ওড়নার এক পাশ হাতে নিয়ে সেটা দিয়ে মুখ ঢেকে আনতারা রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। দ্বিতীয় তলার করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সোজা কিচেনে চলে গেল। কিচেনে আগে থেকেই একজন মেইড ছিল। আনতারাকে দেখে সে জিজ্ঞেস করে,

— কিছু লাগবে, ম্যাম?
আনতারা বলে,
— ওনার জন্য কফি বানাব।
তারপর চুলায় একটা সসপ্যান বসিয়ে তাতে পানি গরম করল। পানি গরম হলে একটা মগে ঢেলে তাতে কফি পাউডার মিশিয়ে নেয়। এরপর কফির মগ হাতে নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি বেয়ে আবার দ্বিতীয় তলার করিডোরে উঠতেই আনতারার চোখে পড়ল, ইফতিন টেরেস থেকে বের হচ্ছে। ইফতিন আনতারাকে দেখামাত্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। আনতারা সেই দৃষ্টি টের পেয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত রুমের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পারল না। ইফতিন এগিয়ে এসে তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
আনতারা বাধ্য হয়ে মাথা তুলে তাকাল। ইফতিন স্থির দৃষ্টিতে আনতার দিকে তাকিয়ে রইল। আনতারার শুধু চোখজোড়াই দেখা যাচ্ছে, মুখের বাকি অংশ সম্পূর্ণ ঢাকা।ইফতিন প্রথম দিন আনতারার মুখ দেখেছিল। কিন্তু সেই মুখ সে ভুলে গেছে। ওই মুখশ্রী এখন আর তার মনে নেই। আনতারা দেখতে কেমন, সেটাও তার মনে পড়ে না।
আনতারা গলার স্বর নিচু করে বলে,

— পথ আটকিয়েছেন কেন?
ইফতিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— এত পর্দা? চরিত্র তো ভালো না।
আনতারার চোখ কঠিন হয়ে গেল।
— মুখ সামলে কথা বলুন। বড় ভাইয়ের বউ আমি আপনার!
ইফতিন সামান্য শব্দ করে হেসে উঠে।
— বউ? কে? সম্মানের খাতিরে ঘাড়ে বোঝাটাকে বউ বলে না।
আনতারা প্রতিবাদ করে বলে,
— আমি বোঝা না, রাদের!
ইফতিন সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,
— তো চাওয়া? চায় আপনাকে? পছন্দ করে নিয়ে এসেছে আপনাকে?
আনতারাও দমে না।
— পছন্দ করে বিয়ে না করলেও এখন পছন্দের। আমার জন্য উনি সবার সঙ্গে লড়ে। আমার ওপর কোনো কথা সহ্য করতে পারে না।
ইফতিন তীর্যকভাবে হেসে বলে,

— শুনুন, একটা হচ্ছে চাওয়া। আর একটা হচ্ছে মেনে নেওয়া। মেনে নেওয়া মানে বাস্তবটাকে অস্বীকার করতে না পারা। দুইটার পার্থক্য জানেন? আপনি ব্রোর চাওয়া না, মেনে নেওয়া। আর এটা আমার মুখের কথা না। ব্রোর কথা।
আনতারার মুখে কোনো উত্তর এল না। ইফতিন আনতারাকে এভাবে দমিয়ে দিতে পেরে আরো মজা পেল। তারপর বলে,
— আর রইল লড়ে যাওয়া? ওটা জলদির প্রেম। আর জলদির প্রেম জলদিই উড়ে যায়।
আনতারা এবার দৃঢ় গলায় বলে,
— বিবাহবন্ধনের হালাল প্রেম জলদিই উড়ে যাওয়ার জন্য দেয়নি আল্লাহ তাআলা। এটা আর পাঁচটা হারাম সম্পর্কের প্রেম না।
ইফতিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে,
— ব্রোর প্রেম উড়ে যাবে। গ্যারান্টি দিলাম। এক্সপেরিয়েন্স আছে।
— যাদের আল্লাহ তাআলা জোড়ায় জোড়ায় তৈরি করেছেন, তাদের কেউ আলাদা করতে পারে না। পুরো দুনিয়া মিলেও না।
ইফতিন ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে,

— কথাটা কি নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য?
আনতারা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আপনাকে আমার আর রাদের শক্ত বন্ধনের ধারণা দিয়েছি। আমার আর রাদের বিয়ে আল্লাহ তাআলা লিখেছেন।
— তাই নাকি?
আনতারার ধৈর্য এবার শেষের দিকে। সে কফির মগটা শক্ত করে ধরে বলে,
— বেশি কথা বলবেন, গরম কফি ছুড়ে মারব মুখে।
ইফতিন এক পা এগিয়ে এসে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে আনতারার দিকে ঝুঁকে বলে,
— মারুন, ছুড়ে। দেখি, আমি আপনার সাহস দিন দিন কতটুকু বাড়ছে!
আনতারা অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে পানি এসে জমল। কিন্তু সে কাঁদে না। অনেক কষ্টে কান্না আটকে ধরে আসা গলায় বলে উঠে,
— আপনাদের সবার শত্রুতা কিসের আমার সঙ্গে? আপনারা কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন?
ইফতিন এবার কঠিন গলায় বলে,
— আমার ভাইকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করা, তারপর তাকে আমার মাম্মার বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া, তাকে বশ করা, এগুলো কি আপনার কাছে সামান্য মিস, তালেবান?

কথার শেষের সেই মিস, তালেবান শব্দদুটো আনতারার কানে ঠিকমতো পৌঁছায় না। ইফতিনের প্রথম কথাগুলোই তার বুকের ভেতর এমনভাবে আঘাত করেছে যে, মুহূর্তেই তার চোখে পানি এসে গেল। সারাদিনের এতকিছুর পর নতুন করে এসব কথা শোনার মতো শক্তি আর তার শরীরে অবশিষ্ট নেই। মনটা ভেতর থেকে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। তবুও আনতারা সাহস হারায় না। করুক এসব। সে ধৈর্য ধরে থাকবে।
আল্লাহ ধৈর্য ধরতে বলেছেন। আর যে মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসা করে ধৈর্য ধরে, তার জন্য বাকি সবকিছু আল্লাহ সহজ করে দেবেন। ধৈর্য ধরে যদি শেষ পর্যন্ত ইফরাদকে পাওয়া যায়, তাহলে সে ধৈর্য ধরবে। যত কষ্টই হোক, যত কথা শুনতে হোক, যত বাধাই আসুক, ইফরাদকে পাওয়ার আশায় আনতারা ধৈর্য ধরে থাকবে।
ইফতিন ঠান্ডা গলায় বলে,

— ভয় পেলেন? পাওয়া উচিত আপনার। এই বাড়ির সুখ আপনার কপালে সইবে না। আই প্রমিজ, মিস তালেবান।
আনতারা নিজের ভেতরটুকু শক্ত করে সাহস সঞ্চয় করে।তারপর দৃঢ় গলায় বলে,
— আমার আল্লাহ যদি আমার কপালে সুখ লিখে রাখেন, তাহলে পুরো দুনিয়া মিলেও সেই সুখ মুছে দিতে পারবে না। চেষ্টা করতে থাকুক। আমিও আমার আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে ধৈর্য ধরে আছি।
একটু থেমে আনতারা বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (৪)

— যেতে দিন। ওনার মাথা ধরে আছে। কফির জন্য অপেক্ষা করছেন।
ইফতিন আর কোনো কথা বলল না। নীরবে পথ ছেড়ে দিল। ব্যস, আনতারা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। হাঁটছিল না, প্রায় ছুটেই যাচ্ছিল। যত দ্রুত সম্ভব এই জায়গা থেকে সরে গিয়ে ইফরাদের কাছে যেতে চায়। ইফরাদ পাশে না থাকলে তার ভয় হয়।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২০ (২)