Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৩

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৩

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৩
insia isha chowdhury

ভোরের কোমল আলো ধীরে ধীরে রাতের আঁধার সরিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারের বুক চিরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে এক মায়াবী স্নিগ্ধতা। তবুও আকাশের মন এখনো ভালো হয়নি। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে চারপাশটা কেমন যেন মায়াময় হয়ে উঠেছে।প্রণয় তার চড়ুই পাখিটাকে নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তার মুখটা গুঁজে আছে সূচনার গলায়। আর সূচনা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। ঘুম ভাঙার পরও কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল সূচনা। তারপর পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার দিকে। কী ভীষণ শান্ত দেখাচ্ছে প্রণয়কে!

যে মানুষটা গতকাল পর্যন্ত একরোখা, বেপরোয়া আর রাগে অগ্নিমূর্তি হয়ে ছিল, সেই মানুষটাই এখন শিশুর মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সূচনার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। হাত বাড়িয়ে প্রণয়ের কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চুলগুলো আরও একটু এলোমেলো করে দিল সে। হঠাৎ সূচনার স্পর্শে প্রণয় সামান্য নড়ে উঠল। তারপর অজান্তেই সূচনাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল।
সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে গেল।
সে আঙুলের ডগা দিয়ে ধীরে ধীরে প্রণয়ের কপালে অদৃশ্য নকশা কাটতে লাগল। গভীর মমতায় নিজের প্রিয় মানুষটাকে দেখতে লাগল। একসময় তার দৃষ্টি গিয়ে থামল প্রণয়ের চোখের পাতায়। তারপর পেলব নাক, উঁচু নাসারেখা পেরিয়ে শেষমেশ গিয়ে আটকাল ঠোঁটের কাছে। মুহূর্তেই সূচনা নিজের মনেই লজ্জা পেল। আচ্ছা, সে কি সত্যিই এতটা বেহায়া হয়ে গেছে?
এভাবে কেন দেখছে প্রণয়কে? পরক্ষণেই নিজের মনকে নিজেই বোঝাল। প্রণয় তো তার একান্ত আপন মানুষ। তার ভালোবাসার মানুষ। তার ওপর অধিকারটাও তো সবচেয়ে বেশি তারই।
ভাবনাটা মনে আসতেই সূচনা আলতো করে প্রণয়ের নাকটা টেনে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“দেখো তো, ঘুমিয়ে থাকলে আপনাকে কতটা শান্তশিষ্ট লাগে! অথচ কাল পর্যন্ত কী ভীষণ বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন!”

কথাটা বলেই মৃদু হেসে উঠল সে। তারপর সাহস করে প্রণয়ের কপালে এঁকে দিল ছোট্ট একটি চুম্বন।
এতকিছুর পরও যখন প্রণয়ের ঘুম ভাঙল না, সূচনার সাহস আরও একটু বেড়ে গেল। সে চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে প্রণয়ের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িভরা গালে আলতো করে আরেকটি চুমু এঁকে দিল।
অথচ সূচনা বুঝতেই পারলো না প্রণয়ের ঘুম অনেক আগেই ভেঙে গেছে। চোখ বন্ধ রেখেই এতক্ষণ সে তার চড়ুই পাখিটার সমস্ত কাণ্ড উপভোগ করছিল। নিজের হাসি আর মনের ভেতর জেগে ওঠা অনুভূতিগুলোকে কোনোমতে সামলে রেখেছে প্রণয়। বরং মনে মনে অপেক্ষা করছিল আরও একটি চুমুর জন্য। কিন্তু সূচনা তাকে হতাশ করে দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই প্রণয় আচমকা তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। আকস্মিক টানে সূচনা হকচকিয়ে গেল। আর তার বিস্ময় আরও বাড়িয়ে দিয়ে প্রণয় মুচকি হেসে বলল,
“তুমি আমার এক গালে চুমু দিয়েছ, আরেক গালে কে দেবে?”
সূচনার চোখ কপালে উঠে গেল।
“কী! তার মানে আপনি জেগে ছিলেন?”
প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

“হ্যাঁ, একদম। না হলে তো জানতেই পারতাম না, আমার বউ আমাকে এতটা ভালোবাসে। তবে আমাকে চুরি করে চুমু দেওয়ার কোনো দরকার নেই। তুমি যখন ইচ্ছা, যতবার ইচ্ছা আমাকে চুমু দিতে পারো।”
সূচনার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি প্রণয়ের মুখের ওপর হাত রেখে বলল,
“উফ! চুপ করুন তো, অসভ্য লোক কোথাকার।আপনি এত খারাপ! ঘুমিয়ে থাকার ভান করে সব দেখছিলেন!”
সূচনার হাতটা এখনো প্রণয়ের মুখের ওপর। প্রণয় এক মুহূর্তও দেরি না করে সেই হাতের তালুতে আলতো করে চুমু এঁকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সূচনা লজ্জায় হাত সরিয়ে নিল।
“উঠুন তো আমার ওপর থেকে!”
প্রণয় যেন কথাটা শুনে আরও মজা পেল।
‘যাক বাবা! সুযোগের সদ্ব্যবহার তুমি করলে, চুমু তুমি আমাকে দিলে, আর এখন আবার আমার ওপরেই রাগ দেখাচ্ছ? তুমি তো আমার ইজ্জতই লুটে নিয়েছ!”
সূচনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

“কী! কী বললেন আপনি? আমি আপনার ইজ্জত লুটে নিয়েছি? মানে! আমি তো ভাবতেই পারিনি আপনি এতটা খারাপ! তাড়াতাড়ি আমাকে ছাড়ুন। আমার কিন্তু ভীষণ রাগ হচ্ছে!”
প্রণয় তাকিয়ে দেখল, সূচনা সত্যিই রাগে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই রাগী মুখটা দেখে তার দুষ্টুমি যেন আরও বেড়ে গেল। হঠাৎই প্রণয় সূচনার পেটে কাতুকুতু দিতে শুরু করল।
“এই যে, দেখি তুমি আর কিভাবে রেগে থাকো!”
পরক্ষণেই সূচনার হাসির শব্দে ঘরটা মুখর হয়ে উঠল। সূচনা কোনোমতে বললো,
“প্রণয়! থামুন… হা হা… আর না!”
হাসতে হাসতে সূচনার চোখে পানি চলে এল। কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে সে প্রণয়ের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করল। শেষমেশ আর কোনো উপায় না পেয়ে তার হাতেই হালকা করে কামড় বসিয়ে দিল। প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিয়ে অবাক চোখে তার দিকে তাকাল।
“এমন জংলি বিড়ালের মতো আচরণ কেন?”
সূচনার চোখে তখনও দুষ্টু ঝিলিক। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে সে বলল,
“আচ্ছা, এটা যদি জংলি বিড়ালের মতো আচরণ হয়, তাহলে আপনাকে একটা কথা বলে রাখি এই আচরণ কিন্তু আপনিই আমাকে শিখিয়েছেন!”

সময় সকাল ১১টা ১৫ মিনিট।
প্রণয় আর সূচনা এসে পৌঁছেছে মির্জা বাড়িতে। বাড়ির দরজায় পা রাখতেই দুজনেই খানিকটা থমকে গেল। বাড়িতে এত মানুষের উপস্থিতি দুজনের কাছেই বেশ অপ্রত্যাশিত লাগলো।
দূরদেশ অস্ট্রেলিয়া থেকে হঠাৎ করে চলে এসেছে প্রণয়ের একমাত্র ফুপু, আর তার স্বামী এবং ফুপাতো ভাই হিমেল। প্রণয় তাদের দেখেই ওর মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। এছাড়াও ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সামিরা এবং রাশেদ হোসেন। এই অসময়ে সোহেলর বাবা মা কে দেখে প্রণয় কিছুটা অবাক হয়ে গেল। কিন্তু সূচনার জন্য দৃশ্যটা সম্পূর্ণ নতুন। এখানে উপস্থিত কাউকেই সে চেনে না। তাই প্রণয়ের হাত শক্ত করে ধরে নীরবে চারপাশের মানুষগুলোকে দেখছিল সে।
বসার ঘরে তখন বেশ জমজমাট আড্ডা। সবাই গল্প গুজব করতে ব্যস্ত। প্রণয় সূচনার হাতটা নিজের মুঠোয় রেখেই সামনে এগিয়ে যেতেই হিমেল দ্রুত উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“কেমন আছো ভাইয়া?”
হিমেল প্রণয়ের ফুপাতো ভাই। বয়স সতেরো ছেলেটা ভীষন চঞ্চল। প্রণয় হেসে হিমেলের পিঠ চাপড়ে বলল,
“ভালো আছি। তোরা হঠাৎ করে চলে এলি! আমি তো কিছুই জানতাম না।”
হিমেল হেসে বলল,

“কেউই জানত না। হঠাৎ করেই সবাইকে সারপ্রাইজ দিয়ে দিলাম।”
প্রণয় মৃদু হেসে এবার সূচনাকে সঙ্গে নিয়ে তার ফুপুর সামনে এগিয়ে গেল। প্রণয় কিছু বলার আগেই মুনতাহা বেগম স্নেহভরা দৃষ্টিতে সূচনার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন। তারপর মমতাভরা হাতে সূচনার গালে আলতো করে হাত রেখে বললেন,
“বাহ্! ভাবি মেয়ে তো মাশাআল্লাহ, বেশ সুন্দরী। আমাদের প্রণয়ের সঙ্গে ভীষণ মানিয়েছে।”
হঠাৎ এমন প্রশংসায় সূচনা একটু লজ্জা পেয়ে নিজের নজর নিচের দিকে নামিয়ে নিলো। আর তারপর প্রণয়ের দিকে তাকালো। সূচনা তো বুঝতেই পারছে না যে ইনি কে? প্রণয় সূচনার দৃষ্টি বুঝতে পেরে মৃদু হেসে আস্তে করে বলল,
“আমার একমাত্র ফুফুজান।”
সূচনার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে মুনতাহা বেগমের দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, ফুফুজান।”
মুনতাহা বেগম সস্নেহে সূচনার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম, মা।”

ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘর থেকে আনা খাবারগুলো রিমা ও সুপ্তি পরিবেশন করতে শুরু করল। সুপ্তি দেখল সূচনা ডার্ক ব্লু রঙের কামিজ পড়ে আছে। খুব সুন্দর করে হিজাব পড়েছে আর প্রণয় ও ব্লু রঙের টি-শার্ট পড়ে আছে‌‌। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তারা ইচ্ছা করে ম্যাচিং করে ড্রেস পড়েছে। দুজনকে একসাথে এত সুন্দর লাগছে দেখেই সুপ্তির ভেতরটা একদম জ্বলে উঠলো। সুপ্তি শতভাগ নিশ্চিত ও যদি প্রণয় কে ওর বিয়ের আগের দিন কনফেস করতো তাহলে কোনদিনই প্রণয় সূচনাকে বিয়ে করত না। রিমা দ্রুত সূচনার পাশে গিয়ে বসল। তারপর মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এখন কেমন আছো, সূচনা? তোমার বাবার অসুস্থতার কথা শুনে তো অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলে।”
বাবার কথা মনে পড়তেই সূচনার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“আসলে বাবাকে যে ভীষণ ভালোবাসি! তাই বাবার কষ্টটা একদমই সহ্য করতে পারিনি।”
সঙ্গে সঙ্গেই সুপ্তি শান্ত গলায় বলল,

“যাকে ভালোবাসো, তাকে আগলে রাখতে হয়। ভালোবাসার মানুষ যে কারণে কষ্ট পাবে, সেই কারণটাকেই তো দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত।”
সুপ্তির কথার অন্তর্নিহিত অর্থ সূচনা ঠিক বুঝতে পারল না। মেয়েটা আসলে কী বোঝাতে চাইছে, সেটাই ভাবতে লাগল সে। ঠিক তখনই সামিরা চারপাশে তাকিয়ে বললেন,
“আচ্ছা, সবাই তো আছে। কিন্তু ঋতু আম্মুকে কোথাও দেখছি না কেন?”
শায়লা খাতুন কিছু বলার আগেই করিডর থেকে ভেসে এলো ঋতু ও তামজিদের কণ্ঠস্বর। দুজন মিলে চকোলেট ভাগাভাগি করে খাচ্ছিল। তবে তামজিদের অভিযোগ, ঋতু তার ভাগের চেয়ে বেশি চকোলেট নিয়ে নিয়েছে। আর সেই অভিমানে এখন সে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। ঋতু কিছুতেই তামজিদকে শান্ত করতে পারছিল না। অবশেষে তামজিদ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা শায়লা খাতুনের কাছে গিয়ে নালিশের সুরে বলল,
“দাদি, ফুপি আমার সব চকোলেট খেয়ে নিয়েছে!”

বাড়িভর্তি মানুষের সামনে নিজের কাণ্ড এভাবে প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় ঋতু ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেল তার। তামজিদের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলল,
“বাবা, আমি কি তোমাকে চকোলেট কিনে দিই না? এভাবে সবার সামনে আমার মান-সম্মান শেষ করে দিচ্ছ কেন?”
তারপর সবার সামনে তামজিদের হাত ধরে মৃদু হেসে বলল,
“আসলে ও আরও কিছু চকোলেট চাইছে, তাই এমন বায়না করছে। আমি ওকে উপরে নিয়ে গিয়ে সব চকোলেট দিয়ে দিচ্ছি।”
কথাটা বলেই ঋতু তামজিদকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে শুরু করল। মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে শায়লা খাতুন বললেন,

“মেয়েটা এত বড় হয়েছে, তবুও ওর এই বাচ্চামি স্বভাবটা আর গেল না!”
এরপর সামিরার দিকে তাকিয়ে একটু সংকোচের সঙ্গে বললেন,
“ভাবি, কিছু মনে করবেন না।”
সামিরা হেসে উত্তর দিলেন,
“কী যে বলেন, ভাবি! আমি আবার কী মনে করব?”
তখন সুপ্তি বলল,
“জ্বী আন্টি, ঋতু অনেক ভালো। এটা তো তামজিদের সঙ্গে ওর ছোটখাটো একটা মজা। খুনসুটিও বলতে পারেন। সত্যি বলতে, ঋতু ভীষণ গুণী একটা মেয়ে।”

ইতিমধ্যেই বাড়ির প্রায় সবাই জেনে গেছে এই বিষয়ে যে সোহেল ও ঋতুর বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। শুধু প্রণয় আর সূচনা বাড়িতে না থাকায় তারা এখনো বিষয়টি জানে না। এমনকি ঋতুও পুরোপুরি কিছু জানে না। কারণ এখনো পর্যন্ত কেউ তার সঙ্গে সরাসরি এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। বরং সুপ্তি যথাসম্ভব ঋতুকে বিষয়টি আঁচ করতে দেয়নি। সুপ্তি সবার সামনে হাসিমুখে কথা বললেও ভেতরে যে ওর এমন একটা অস্থিরতা কাজ করছে যা ও কাউকে বলে বোঝাতে পারছে না! সোহেলের মা-বাবা এখনো মনে করছে যে সোহেল ঋতুকে পছন্দ করেছে। কিন্তু আসলে তো সোহেল তাকে পছন্দ করেছে। সুপ্তি চাইছে যেভাবেই হোক সোহেল আর ঋতুর বিয়েটা যেন হয়ে যায়।
সামিরা ও রাশেদ হোসেন মূলত এসেছেন সবাইকে রাজি করাতে তাদের ছেলে সোহেলের সঙ্গে যেন ঋতুর বিয়ে হয়। বলতে গেলে সামিরা ও রাশেদ হোসেন নিজের ছেলেকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। এমনকি সোহেল নিজেও জানেনা যে তার মা-বাবা আজ মির্জা বাড়িতে এসেছে।
বিয়েটা পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যেই তাদের মির্জা বাড়িতে এসেছে সামিরা ও রাশেদ। কিন্তু আজ আবার ঋতুর ফুফুরা হঠাৎ চলে আসায় বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আলোচনা করার সুযোগই হয়ে ওঠেনি। শায়লা খাতুন এ বিষয়ে প্রণয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন। তাই ইশারায় ছেলেকে একটু আড়ালে যেতে বললেন। প্রণয়ও মায়ের ইশারা বুঝে তার সঙ্গে অন্যদিকে চলে গেল।
একটু নিরিবিলি জায়গায় এসে শায়লা খাতুন মৃদু স্বরে বললেন,

“বাড়িতে এত মানুষ, ঠিকমতো কথাই বলতে পারছি না। তোর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
“হ্যাঁ মা, বলো।”
শায়লা খাতুন কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,
“সোহেলের মা-বাবা ঋতুর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। সোহেল ঋতুকে বিয়ে করতে চায়।”
কথাটা শুনে প্রণয় মুহূর্তের জন্য বেশ অবাক হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী বলছ এসব? ঋতু তো সবেমাত্র পড়াশোনা করছে!”
“হ্যাঁ, পড়াশোনা তো করছে। তবে সোহেল ছেলেটাও তো ভালো।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক। সোহেল ভালো ছেলে। কিন্তু ঋতুর পড়াশোনার কী হবে?”
শায়লা খাতুন শান্ত গলায় বললেন,

“এই কারণেই আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা চাইছি, এখন শুধু সোহেলের সঙ্গে ঋতুর কাবিনটা করে রাখতে। ঋতুর পড়াশোনা শেষ হলে সোহেল ওকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে। আর এই বিষয়ে সোহেলের পরিবার রাজি হয়েছে। আর আজ ওরা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু একটু আগেই তোর ফুফুরা এসে পড়ায় আর ভালো করে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। আর তোর বাবাও এই বিষয়ে সন্তুষ্ট। এখন তুই বল, তোর কী মত? সোহেলের সঙ্গে যদি ঋতুর বিয়ে হয়, তাহলে কেমন হবে?”
প্রণয় কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“দেখো মা, সোহেল ভালো ছেলে, সেটা আমি মানি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন আমার বোনের মতামত।”
শায়লা খাতুন সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,
“অবশ্যই। আমার মেয়ের মতামতই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

নিলুফা সোজা ছেলের ঘরের দিকে চলে গেলেন। হাতে করে খাবারের ট্রে নিয়ে এসেছেন। গতকাল রাতেও রাগ করে রাফি নিজ ঘরে চলে গিয়েছিল। অথচ এখন এতটা বেলা গড়িয়ে গেলেও ছেলেটা ঘর থেকে বের হয়নি। রাফির এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না নিলুফা। আপাতত নিজের হাতে ছেলেকে একটু খাবার খাইয়ে দিতে চান।
বেশ কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দেওয়ার পর অবশেষে ভেতর থেকে দরজা খুলল। রাফি বিরক্ত মুখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী সমস্যা?”
“সমস্যা মানে? সময় কত গড়িয়ে গেছে, তোর কোনো হিসেব আছে? এখনো পর্যন্ত সকালের খাবারটুকুও তোর পেটে পড়েনি।”
রাফি বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,

“আমার খিদে নেই। আপনাকে এখানে আসতে বলেছে কে? আপনি চলে যান।”
নিলুফা আর বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। বিরক্ত কণ্ঠে বললেন,
“খিদে নেই মানে কী?”
কথাটা বলেই হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল বিছানার ওপর। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
বিছানার ওপর রাফির লাগেজ রাখা। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জামাকাপড় একে একে গুছিয়ে ব্যাগে ভরছে রাফি। নিলুফার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
“এসবের মানে কী? তুই জামাকাপড় গুছাচ্ছিস কেন? কোথায় যাচ্ছিস?”
রাফি মায়ের সঙ্গে আর কোনো কথা কাটাকাটি না করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি আর কিছুদিনের মধ্যেই কানাডায় ফিরে যাচ্ছি। তাই সবকিছু গুছিয়ে রাখছি।”
কথাটা কানে যেতেই নিলুফার মনে হলো, মুহূর্তের মধ্যেই ওনার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। রাফি যদি সত্যিই এবার কানাডায় চলে যায়, তাহলে রাফিকে আবার ফিরিয়ে আনা কতটা কঠিন হবে সেটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
হাতে থাকা খাবারের ট্রেটা পাশের টেবিলের ওপর রেখে দ্রুত ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন নিলুফা। কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে তিনি বললেন,

“তুই এভাবে কী করে চলে যেতে পারিস, রাফি?”
রাফি নির্বিকার ভঙ্গিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী করে আবার যাব? যেভাবে মানুষ যায়, সেভাবেই যাব।”
“তুই আমার কথাটা একবারও শুনবি না? এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললি, অথচ আমাকে একবার বলার প্রয়োজনও বোধ করলি না?”
রাফির চোখেমুখে এবার জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“যেখানে আপনি আমার পুরো জীবনটাই ধ্বংস করে দেওয়ার আগে একবারও ভাবেননি, সেখানে আপনাকে এসব বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।”

কথাটা তীরের মতো গিয়ে নিলুফার হৃদয়ে বিঁধল।
তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বারবার নিজের ভাইয়ের বলা কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। তাঁর ভাই ঠিকই বলেছিল রাফিকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। তাহলেই হয়তো এই সমস্যার একটা সমাধান হবে। রাফি বিয়ে করে সংসারে জড়িয়ে পড়লে আর এত সহজে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারবে না।
কোনো কিছু না ভেবেই নিলুফা ছেলের হাত আঁকড়ে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন,
“রাফি, আমার কথাটা শোন। আমার জান, আমার বাচ্চা… মায়ের কথাটা একবার শোন। আমি চাই, তুই টিনাকে বিয়ে কর।”
রাফি এক ঝটকায় মায়ের হাত সরিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

“হাস্যকর! ভীষণ হাস্যকর! আমি আর টিনাকে বিয়ে করব? তাও আবার আপনার কথা মেনে? স্বপ্ন দেখতে থাকুন। সেই স্বপ্ন কোনোদিন বাস্তব হবে না।”
নিলুফা এবারও নাছোড়বান্দার মতো বললেন,
“আমার কথা শোন। টিনার সঙ্গে তোর বিয়ে হলে তোর জীবনটা সুন্দর হয়ে যাবে। টিনা একদম পারফেক্ট এই বাড়ির বউ হওয়ার জন্য।”
রাফি তৎক্ষণাৎ পাল্টা জবাব দিল,

“টিনাকে যদি আপনার এতটাই পারফেক্ট মনে হয়, তাহলে ওকে এই বাড়িতেই রেখে দিন। সারা জীবনের জন্য রাখুন। আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ওই ফালতু মেয়েটাকে আমি, রাফি, কোনোদিনই বিয়ে করব না।”
নিলুফা বুঝতে পারলেন, কথায় কোনোভাবেই ছেলেকে নরম করা সম্ভব নয়। তাঁর ছেলে আরও একরোখা, আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাঁর কান্না, অনুরোধ কোনো কিছুই যেন রাফির মনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলছে না। মুহূর্তের আবেগে নিলুফা আর কিছু না ভেবেই খাবারের ট্রেতে থাকা ছোট একটি চাকু হাতে তুলে নিলেন।
দৃশ্যটা চোখে পড়তেই রাফি হতভম্ব হয়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই নিলুফা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
“তুই যদি আমার কথা না শুনিস, তাহলে আমি এখনই নিজের ক্ষতি করে ফেলব।”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হাত থেকে চাকুটি নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু নিলুফা এক পা পিছিয়ে গেলেন। রাফি এবার আতঙ্ক কন্ঠে বলল,

“পাগল হয়ে গেছেন নাকি? কী করার চেষ্টা করছেন? চাকুটটা ফেলে দিন!”
নিলুফা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন,
“না! তুই আমার কথা না শুনলে আমি এক মুহূর্তও…”
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই রাফি মরিয়া হয়ে বলল,
“এসব বন্ধ করুন! এসব করে আপনি আমাকে ম্যানিপুলেট করতে পারবেন না। আমি কোনোদিনই টিনাকে বিয়ে করব না।”

রাফির কথাটা শেষ হতে না হতেই নিলুফা হঠাৎ নিজের হাতের কবজির কাছে চাকুটি চালিয়ে দিলেন। মুহূর্তেই রাফির চোখের সামনে ঘটে গেল ভয়াবহ দৃশ্যটি। রাফি হতভম্ব হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। নিলুফার শরীরটা মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে এলো। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেই রাফি ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেলল।
রাফি কল্পনাও করেনি, তার মা সত্যিই এমন কিছু করে বসবেন। এতক্ষণ যে কথাগুলোকে সে নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ভেবেছিল, সেগুলো যে এতটা ভয়াবহ পরিণতি নেবে তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। মাকে নিজের বাহুডোরে আঁকড়ে ধরে রাফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বুকফাটা চিৎকারে বলে উঠল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩২

“মা! চোখ খোলো! এটা কী করলে তুমি? বাবা! তুমি কোথায়?”
কাঁপতে থাকা হাত দুটোয় মাকে শক্ত করে আগলে নিয়ে রাফি মুহূর্তের মধ্যেই তাঁকে কোলে তুলে নিল।
তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here