প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৪
insia isha chowdhury
নিলুফা খাতুন এখন হাসপাতালে ভর্তি। কেবিনের বাইরে নীরবে বসে আছে রাফি। তার পাশে বসে আছেন তার বাবা, নাজমুল সাহেব। কিছুক্ষণ আগেই নিলুফাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে ফিরোজ সাহেবও তার মেয়ে টিনাকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
কিছুক্ষণ পর নাজমুল সাহেব ছেলের সঙ্গে একান্তে কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করলেন। তাই রাফিকে নিয়ে একটু দূরে সরে গেলেন। দূর থেকে ফিরোজ সাহেবও বোঝার চেষ্টা করলেন, বাবা-ছেলের মধ্যে কী কথা হচ্ছে। কিন্তু তাদের কথোপকথনের কিছুই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন না।
নাজমুল সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন,
“কী এমন বলেছিস নিজের মাকে, যে নিলু এমন একটা কাজ করে বসল?”
রাফি কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিচু স্বরে বলল,
“আপনার বউ আমাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে। টিনার মতো একটা মেয়ের সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিতে চাইছে। শুধু নিজের মনের আশা পূরণ করার জন্য।”
“এটা কেমন ধরনের আচরণ, রাফি? নিলু তোর মা।”
রাফি এবার কষ্টভরা কণ্ঠে বলল,
“উনি আমার সঙ্গে যা করেছেন, এরপর ওনার ওপর আর কোনো বিশ্বাস নেই আমার। ‘মা’ ডাকটা একটা ভরসার জায়গা। সেই ভরসাটাই উনি আমার কাছ থেকে হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু… আমি কখনো ভাবিনি উনি নিজেরই ক্ষতি করার চেষ্টা করবেন। এটা দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেছি।”
নাজমুল সাহেব আর কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে ছেলের হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিলেন। চোখেমুখে ফুটে উঠল গভীর মমতা আর অসহায়ত্ব। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
“রাফি, আমার আর তোর মায়ের বিয়ের পর অনেক বছর কেটে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। দীর্ঘ বারো বছরের অপেক্ষার পর তুই আমাদের জীবনে এসেছিলি। তোকে পৃথিবীতে আনার সময় তোর মা অনেক সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা তখন বলেছিল, দুজনের মধ্যে হয় বাচ্চাকে বাঁচানো সম্ভব হবে, নয়তো তার মাকে।”
নাজমুল সাহেব চোখের পানি মুছে আবার বললেন,
“সত্যি বলতে কী, তখন আমি স্বার্থপরের মতো তোর মাকেই বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোর মা একেবারেই অনড় ছিল। ওর একটাই কথা ছিলযাই হোক না কেন, তুই যেন বেঁচে থাকিস। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি তোকে পেয়েছি, তোর মাকেও পেয়েছি।”
নাজমুল সাহেব ছেলের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বললেন,
“আমি জানি, তুই সূচনাকে অনেক ভালোবাসিস। কিন্তু ও এখন তোর অতীত। বাবা, তোকে নিজের বর্তমানটা নিয়েও ভাবতে হবে। তোর মা তোকে ভীষণ ভালোবাসে। ও কখনোই তোর খারাপ চায় না। আর একদিন না একদিন তোকে নিজের জীবন থেকে এগিয়ে যেতেই হবে।”
রাফি নির্বাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নাজমুল সাহেব এবার ভাঙা গলায় বললেন,
“বাবা, তুই টিনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা। তোর মা ছাড়া আমি একেবারেই অসহায়। নিলু যদি আবার নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে আমার পরিবার বলে আর কিছু থাকবে না। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।”
রাফি প্রাণহীন দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। নাজমুল সাহেবের চোখে অশ্রু। এতটা অসহায় অবস্থায় রাফি তার বাবাকে এর আগে কখনো দেখেনি। কিন্তু এত কিছু শোনার পরও রাফি কী উত্তর দেবে? সে বলতে চেয়েছিল—
“বাবা, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু তোমাদের কথায় আমি এই বিয়েতে রাজি হতে পারব না। আমি এখান থেকে পালিয়ে যেতে চাই। এই বাড়িতে, এই সম্পর্কের ভেতরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
কিন্তু আফসোস… কিছুই বলতে পারল না রাফি।
সময়ের স্রোতে কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল।
নিলুফা খাতুনের জ্ঞান ফিরেছে। হাতে খুব গভীর কোনো আঘাত লাগেনি। তবুও শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাফি আর নিজেকে সেখানে আটকে রাখতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত ধীর পায়ে মায়ের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। কেবিনের ভেতরে তখন টিনা, ফিরোজ সাহেব এবং নাজমুল সাহেব উপস্থিত ছিলেন। রাফি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার কিছু কথা আছে। আপনারা সবাই আপাতত এখান থেকে যান।”
রাফিকে আর কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। তিনজনই নীরবে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রাফি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নিলুফার বেডের পাশে বসে পড়ল।
ছেলেকে দেখে নিলুফা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই রাফি শান্ত গলায় বলে উঠল,
“আপনাকে আর নিজের ক্ষতি করতে হবে না। আমি আপনার কথা মেনে নিয়েছি। আমি টিনাকে বিয়ে করব।”
কথাটা শুনে নিলুফার চোখ মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। আনন্দ আর স্বস্তিতে বুকটা ভরে গেল তার। ছেলেকে কিছু বলার আগেই রাফি নীরবে উঠে দাঁড়াল। তারপর আর একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। রাফি কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই কিছুক্ষণ পর সবাই আবার ভেতরে ফিরে এল।
নিলুফার মুখে তখন বহুদিন পর এমন এক উজ্জ্বল হাসি, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,
“আমাকে কখন ডিসচার্জ দেবে? আমি যে কখন বাড়ি যাব আর সবকিছু গুছিয়ে রাখব!”
নাজমুল সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি অসুস্থ, নীলু। এখন আবার কিসের কাজের কথা বলছ?”
নিলুফা কিছুই শুনলেন না। আনন্দে উজ্জ্বল মুখে বললেন,
“কাজের কথা নয়? আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে! সবকিছু তো আমাকেই দেখতে হবে।”
নিলুফার কথায় কেবিনের ভেতর উপস্থিত তিনজনই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নিলুফা এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন,
“রাফি এইমাত্র আমাকে বলে গেল, ও টিনাকে বিয়ে করবে!”
কথাটা শুনে টিনার চোখ মুহূর্তেই বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। আনন্দ ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। কোনো রকমে নিজের শ্বাসটুকু সামলে কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ফুপি… তুমি সত্যি বলছ? রাফি আমাকে বিয়ে করবে?”
নিলুফা খুশিতে মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ, মা। সত্যি।”
তারপর পরম আনন্দে টিনাকে কাছে টেনে নিয়ে ওর মাথায় স্নেহভরা একটি চুমু এঁকে দিলেন।
তীক্ষ্ণ স্বরে আর্তনাদ করে উঠল সূচনা।
সুপ্তির সঙ্গে অসাবধানতাবশত ধাক্কা লেগে হাতে থাকা গরম দুধটুকু মুহূর্তেই সূচনার হাতের ওপর ছিটকে পড়েছে। তীব্র গরমে হাত জ্বলে উঠতেই ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল সে। হাতের জ্বালাপোড়ার অসহ্য যন্ত্রণায় মুহূর্তেই সূচনার চোখের কোণে জমে উঠল অজস্র অশ্রু। অথচ সুপ্তি তখনও তার কাছে এগিয়ে না এসে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। এদিকে নিজের ঘর থেকে সামান্য দূরত্বেই সূচনার সেই তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শুনে মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল প্রণয়। কোনো কিছু না ভেবেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
সুপ্তির চোখে প্রণয়কে এগিয়ে আসতে দেখেই ও হঠাৎ নিজের অবস্থান সামলে নিয়ে দ্রুত সূচনার কাছে চলে গেল। তারপর বিরক্তিকর স্বরে বলল,
“তুমি কি একটু দেখে চলতে পারো না?”
হাতের অসহ্য জ্বালাপোড়ায় সূচনা তখন দিশেহারা। চারপাশের কোনো কথাই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে অশ্রুতে, ঠোঁট কাঁপছে অনবরত। ঠিক তখনই প্রণয় ছুটে এসে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। উৎকণ্ঠায় সূচনার হাতজোড়া নিজের হাতে তুলে নিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“এসব কীভাবে হলো? হাতের এ কী অবস্থা হয়েছে!”
কথা শেষ করার আগেই সূচনার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রণয়ের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে সূচনাকে কোলে তুলে নিল। প্রণয়ের বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে সূচনা হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল। সূচনার কান্নার শব্দে প্রণয় আরো ব্যাকুল হয়ে উঠলো।
অন্যদিকে তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সুপ্তি বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠল,
“প্রথমত, নিজেই আমার সঙ্গে ধাক্কা খেল। আবার এখন পড়ে গিয়ে যত নাটক শুরু করেছে!”
প্রণয় দ্রুত সূচনাকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে তার জ্বলে যাওয়া হাতের ওপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দিতে লাগল। পানির শীতল স্পর্শ পেতেই প্রথমে সূচনা আরও জোরে কেঁদে উঠল। যন্ত্রণায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলের ডগায় মমতা মিশিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো মুছে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“কিছু হয়নি, লক্ষ্মীটি। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কেঁদো না।”
সূচনার কাঁপতে থাকা ঠোঁট থেকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বেরিয়ে এলো,
“আমার অনেক ব্যথা করছে…”
কথাটা শুনে প্রণয়ের বুকটা আবারও ভারী হয়ে উঠল। যতটা সম্ভব কোমল হাতে সূচনার পোড়া জায়গায় ওয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিল। তারপর কিছুক্ষণ পরপর হাতের ওপর আলতো করে ফুঁ দিতে লাগল,সূচনা তখনও নাক টানতে টানতে কাঁদছে। আর প্রণয় নীরবে সূচনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে একের পর এক ফুঁ দিয়ে চলেছে।
সুপ্তি করিডর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে রবিনের কণ্ঠ ভেসে এলো। ডাক শুনে থেমে পেছন ফিরে তাকাল সে। রবিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কী হয়েছে ভাইয়া? কোনো প্রয়োজন?”
রবিন তখনও ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল। সুপ্তিকে দেখে ফোনটা মিউট করে পকেট থেকে একটি নতুন ফোন বের করল। তারপর সেটি সুপ্তির হাতে দিয়ে বলল,
“এটা ঋতুর ফোন। নতুন। ওকে দিয়ে আয়।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না রবিন। দ্রুত পা বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
সুপ্তি কিছুক্ষণ ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ ঋতুর জন্য নতুন ফোন কেন? ওর তো ফোন আছেই! তবে যেহেতু রবিন নিজেই দিয়ে যেতে বলেছে, তাই আর বেশি কিছু না ভেবে ফোনটি হাতে নিয়ে ঋতুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
ঘরে ঢুকতেই দেখল, ঋতু তার ম্যাকবুকের সামনে বসে গোপাল ভাঁড় দেখছে। পাশে রাখা পপকর্নের বাটি থেকে একের পর এক পপকর্ন মুখে পুরছে। সুপ্তি এগিয়ে গিয়ে বক্সটি ঋতুর সামনে ধরতেই ঋতু হাতে থাকা পপকর্নের বাটিটা পাশে সরিয়ে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী?”
সুপ্তি বক্সটা ওর হাতে দিয়ে বলল,
“কী মানে? এটা তোর নতুন ফোন। রবিন ভাইয়া দিতে বলেছে। কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তোর তো ফোন আছেই, তাহলে আবার নতুন ফোন…”
‘নতুন ফোন’ কথাটা কানে যেতেই ঋতুর চোখ-মুখ মুহূর্তেই আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সুপ্তির কথা শেষ করার আগেই সে দ্রুত বক্সটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। পরম আগ্রহে বক্সটা খুলে ফোনটা বের করে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফোনটা দেখতে লাগল।
তার ভাই তার জন্য iPhone 17 Pro Max কিনে দিয়েছে! ফোনটা তো ইতিমধ্যেই ঋতু হারিয়ে ফেলেছিল। আর সেই হারানো ফোনের বদলে নতুন ফোন পাওয়ার আনন্দ গ্রাস করলো তাকে।
সুপ্তি ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,
“আমি তোকে কিছু জিজ্ঞাসা করছি। নতুন ফোন..”
ঋতু ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বুলাতে বুলাতে বলল,
“আরে, আর বলিস না! আমি আসলে আমার আগের ফোনটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাই ভাইয়াকে বলেছিলাম আমার জন্য একটা নতুন ফোন কিনে আনতে। তবে এই কথাটা আমি কাউকে বলতে মানা করেছিলাম। তাই তোকে বলিনি। আর বিশেষ করে আম্মু যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে। জানতে পারলে আমাকে ভীষণ বকবে।”
সুপ্তি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
“ও! তার মানে তুই ফোনটা হারিয়ে ফেলেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এই ফোনটা পছন্দ হয়েছে?”
ঋতু এবার মুখ তুলে এমনভাবে তাকাল, যেন এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে অদ্ভুত এক প্রশ্ন।
“একদম! অপছন্দ হওয়ার কোনো কারণ নেই। খুব পছন্দ হয়েছে!”
সুপ্তি মৃদু হেসে বলল,
“ঠিক আছে। তুই নতুন ফোন দেখ। আমার একটু কাজ আছে।”
কথাটা বলেই সুপ্তি ঋতুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
কিন্তু ঘর থেকে খানিকটা দূরে যেতেই সুপ্তির চোখে পড়ল শায়লা খাতুন এদিকেই আসছেন। নিজের খালামণিকে দেখে সুপ্তি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কী ব্যাপার খালামণি? কোথায় যাচ্ছ?”
শায়লা খাতুন স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“ঋতুর সঙ্গে একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
“কী নিয়ে কথা খালামণি?”
“ওই সোহেল আর ঋতুর বিয়ের ব্যাপারে।”
কথাটা শুনেই সুপ্তির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বিয়ে? কাল পর্যন্ত তো বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথাই ওঠেনি। বরং সুপ্তি ভেবেছিল, হয়তো বিয়েটা ভেঙেই গেছে। তাহলে আজ হঠাৎ আবার ঋতুর সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথা কেন?
শায়লা খাতুন নিজেই বলতে শুরু করলেন,
“সবাই সোহেল আর ঋতুর বিয়েতে মত দিয়েছে। ঋতুর ফুপুও ভীষণ খুশি। মুনতাহাত, রবিন আর প্রণয় ওদের কারও বিয়েতেই তো ও থাকতে পারেনি। তাই ঋতুর বিয়ের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। আর সোহেল ছেলেটাও ভালো। বিয়ে হলে মন্দ হবে না। এদিকে সোহেলের মা-বাবাও রাজি, সোহেল নিজেও রাজি। এখন শুধু ঋতুর মতামতটা জানা বাকি।”
‘ঋতুর মতামত’ কথাটা শুনতেই সুপ্তির বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। সে অস্থিরভাবে ঢোক গিলে ফেলল। কিছু না ভেবেই মুখ ফসকে বলে ফেলল,
“হ্যাঁ, তো ঋতু তো বিয়েতে রাজি।”
শায়লা খাতুন থমকে দাঁড়ালেন।
“কী বললি?”
সুপ্তি এবার বুঝতে পারল, কী ভয়ংকর ভুল করে ফেলেছে। তবুও পরিস্থিতি সামলাতে তাড়াতাড়ি বলল,
“বলছি, ঋতু তো এই বিয়েতে ভীষণ খুশি। ও সোহেলকে বিয়ে করতে চায়।”
শায়লা খাতুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেই সুপ্তি আরও যোগ করল,
“আসলে খালামণি, তোমরা আমাকে ওকে কিছু বলতে মানা করেছিলে। কিন্তু আমি নিজের কথা পেটে রাখতে পারিনি। তাই ওকে এই ব্যাপারে বলে দিয়েছিলাম। আর ও নিজেও বিয়েতে রাজি।”
শায়লা খাতুনের মুখ মুহূর্তেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“সত্যি? ঋতু তোকে বলেছে, ও বিয়েতে রাজি?”
“হ্যাঁ।”
উত্তরটা মুখ দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুপ্তির মনে হলো, সে যেন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। কিন্তু শায়লা খাতুন আর কোনো কথা না বলে সোজা ঋতুর ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।
সুপ্তি হতভম্ব হয়ে পেছন থেকে বলল,
“খালামণি! আমি তো বললাম ঋতু বিয়েতে রাজি। তুমি আবার ওর ঘরে যাচ্ছ কেন?”
শায়লা খাতুন অবশ্য কোনো উত্তর দিলেন না। সোজা মেয়ের ঘরে ঢুকে পড়লেন। মাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ঋতু ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,
“কী ব্যাপার আম্মু? কিছু বলবে?”
শায়লা খাতুন মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“সুপ্তি না বললে তো আমি কিছুই জানতে পারতাম না।”
ঋতুর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সুপ্তি তাহলে ফোন হারানোর কথাটা এখনই বলে দিয়েছে! সেই কথাই ভেবে ঋতু মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“উফ! এই সুপ্তিকে নিয়ে যে কী করব! ও তোমাকে সব বলে দিয়েছে, তাই না?”
শায়লা খাতুন হাসিমুখে বললেন,
“হ্যাঁ, বলেছে। আর আমি তো ভীষণ খুশি হয়েছি।
ঋতু এবার পুরোপুরি হতবাক।”
তার ফোন হারিয়ে গেছে। তার ভাই তাকে নতুন ফোন কিনে দিয়েছে এই কথা শুনে তার মা খুশি হয়েছে? কিছুতেই তো এই হিসাবটা মিলছে না।
“তুমি ঠিক আছো তো আম্মু? এসব শুনে তুমি খুশি হয়েছো?”
শায়লা খাতুন মেয়ের কাছে এগিয়ে এসে তার কপালে স্নেহভরে চুমু খেলেন।
“পাগলি মেয়েটা! এতে খুশি না হওয়ার কী আছে? আমি তো খুব খুশি হয়েছি। আল্লাহ আমার মেয়েটাকে সবসময় ভালো রাখুক।”
ঋতু মায়ের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে শুধু তাকিয়ে রইল। অন্যদিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সুপ্তির অবস্থা তখন আরও করুণ। এতক্ষণ সে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি তার প্রাণটাই বেরিয়ে যাবে।
ঋতু যদি জানতে পারে সে কী বলে ফেলেছে, তাহলে আজ তাকে কোনোভাবেই ছাড়বে না!
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তেমন কিছুই হলো না। শায়লা খাতুন মেয়েকে আদর করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যেতেই ঋতু সন্দেহভরা চোখে সুপ্তির দিকে তাকাল।
“আচ্ছা, তোর কি খুব দরকার ছিল আম্মুকে এসব বলার?”
সুপ্তি এতক্ষণ নিজের নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল হঠাৎ ঋতুর প্রশ্নে অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
“মানে, আমি যে ফোনটা হারিয়ে ফেলেছি আর ভাইয়া আমাকে নতুন ফোন কিনে দিয়েছে। এটা আম্মুকে বলার কী দরকার ছিল? কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না। আম্মুর ব্যবহারটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগল।”
সুপ্তি বুঝতে পারল, ঋতু সম্পূর্ণ উল্টো কিছু ভেবে বসে আছে। তাই সুযোগটা হাতছাড়া না করে বলল,
“হ্যাঁ, আসলে আমি তো বলতে চাইনি। ভুল করে বলে ফেলেছি। তবে বিশ্বাস কর, খালামণি একটুও রাগ করেননি। উল্টো তোকে বুঝেছে।”
ঋতু দরজার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, সেটাই তো দেখলাম। কিন্তু আম্মুকে একটু বেশিই খুশি মনে হলো।”
সুপ্তি মৃদু হেসে বলল,
“এমন কিছুই না। তুই বেশি বেশি ভাবছিস।”
কথাটা বলেই সুপ্তি মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, আপাতত বিপদটা কেটে গেছে!
“আর একটু… এখনই হয়ে যাবে।”
কথাটা বলেই প্রণয় যত্নসহকারে সূচনার ডান হাতের পোড়া স্থানে ব্যান্ডেজ করে দিল। সূচনার অশ্রুসিক্ত নয়ন দু’টি এখন নীরবে নিবদ্ধ প্রণয়ের মুখের দিকে। প্রণয় ব্যান্ডেজটা ঠিক করে দিতে দিতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো কীভাবে হলো?”
সূচনা মিনমিন করে বলল,
“আপনার জন্য গরম দুধ নিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ সুপ্তি আপুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে আমি পড়ে যাই। আর তখনই গরম দুধটা আমার হাতের ওপর পড়ে যায়।”
কথাটা শুনে প্রণয়ের মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
“ইস! তোমাকে কে বলেছে এসব করতে? হাতটার কী অবস্থা হয়েছে দেখেছো?”
সূচনা মনে মনে অন্য কিছু ভাবছিল। তাই প্রণয়ের কথায় তেমন মনোযোগ না দিয়ে ঠোঁট উল্টে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু আমার ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে। আমার ডান হাতেই কেন এমন হলো? এটা তো বাম হাতেও হতে পারত!”
প্রণয় বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
“চুপ করো! কী উল্টাপাল্টা কথা বলছো? তুমি এতটা কষ্ট পেয়েছো, এতেই আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। আর তুমি বলছো বাম হাতে পড়তে পারত!”
সূচনা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি তো আমার কষ্ট বুঝবেন না।”
“মানে?”
প্রণয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম স্বরে বলল,
“আচ্ছা, বুঝেছি। তুমি তোমার পড়ালেখার কথা ভাবছো, তাই তো? সমস্যা নেই। হাত ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু লেখার প্রয়োজন নেই। আর খাওয়ার সময় তোমাকে আমি নিজ হাতে খাইয়ে দেব।”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনার মাথাটা যেন হঠাৎ ঝিমঝিম করে উঠল। সে তো বিশেষ একটা দিনে প্রণয়কে চমকে দেওয়ার জন্য নিজের হাতে একটি উপহার তৈরি করছিল। আর এখন ডান হাতেই এমন চোট! উপহারটা তাহলে কীভাবে বানাবে?
কথাটা এই মুহূর্তে প্রণয়কে বলতেও পারছে না সে।
অভিমান লুকিয়ে সূচনা মৃদু স্বরে বলল,
“আপনি শুধু পড়ালেখা নিয়েই পড়ে থাকুন।”
প্রণয় বলল,
“উফ্, সূচনা! সামনে তোমার পরীক্ষা। এবার একটু সিরিয়াস হও।”
সূচনার চোখেমুখে সঙ্গে সঙ্গে অভিমানের ছাপ ফুটে উঠল।
“আমি হাতে ব্যথা পেয়েছি। আপনি তো জিজ্ঞেস করবেন, কী করলে আমার মন ভালো হবে, তা না করে শুধু পড়াশোনার কথা বলছেন!”
প্রণয় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাব। এবার তো মন ভালো হবে?”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনার মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“সত্যি? আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন?”
“হ্যাঁ। তুমি যেখানে বলবে, সেখানেই নিয়ে যাব।”
কথাটা শুনে সূচনা খুশিতে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই প্রণয় সতর্ক করে দিল,
“তবে হ্যাঁ, এখন দেশের বাইরে কোথাও যাওয়া যাবে না। তোমার পরীক্ষা সামনে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নেড়ে বলল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৩
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আমি পদ্মবিলে যেতে চাই।”
প্রণয় মৃদু হেসে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আমার ঘরের রানী। তোমাকে পদ্মবিলেই নিয়ে যাওয়া হবে।”
প্রণয়ের কথায় সূচনার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির এক চিলতে হাসি।
