Home এমপি রুশভিয়ান মির্জা এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২২

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২২

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২২
ফাতেমা তুজ জোহরা

রুশভিয়ানের ভেতরে এক ভ*য়ং*ক*র অস্থিরতা দা*উদা*উ করে জ্বলছিলো। এক মুহূর্ত সে স্থির থাকতে পারছিলো না। তার বুকের মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছিলো ইনান কোথায়? কে তাকে নিয়ে গেল রত্নকুঞ্জ থেকে । রুশভিয়ানের মনে সন্দেহ আরও গভীর হয়ে বসলো, সর্বপ্রথম নাম এলো তিয়াসার সে তো ইনানের ক্ষ*তি করার জন্য ওতপেতে থাকে। এই ধারনটাই তাকে পা*গ*ল করে তুলেছিলো যেন। তাইতে ছুটে এসেছে ঢাকা। এক মুহূর্ত দেরি করেনি সে। ঢাকার রাত তখন নীলচে আলোয় ডুবে আছে।গাড়িতে বসেও রুশভিয়ান শান্ত থাকতে পারলো না। হাত মুঠো করে জানলার দিকে তাকিয়ে রইলো। চোয়াল শক্ত, চোখ স্থির। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা যে করেই হোক ইনানকে ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরের ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে রুশভিয়ানের কালো গাড়িটা এসে থামল ঢাকার অন্যতম অভিজাত ক্লাবের সামনে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো রুশভিয়ান পিছনে পিছনে বেরিয়ে এলো আমির। সারারাতের নির্ঘুম চোখের ক্লান্তি স্পষ্ট, অথচ সেই ক্লান্তি তার শরীরকে একটুও ধীর করেনি। কপালের ওপর এলোমেলো পড়ে থাকা চুল, শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল, র*ক্তা**ক্ত চোখ সব মিলিয়ে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল , মানুষটা যেন বহুক্ষন ধরে নিজের ভেতরে কোনো ভ*য়ং*ক*র ঝড়কে আটকে রেখেছে। পরনে কালো শার্ট কুনই পর্যন্ত গোটানো। গলার কাছে দুটো বোতাম খোলা। এক হাতে ইনানের ওড়নাটা এখনো শক্ত করে বেঁধে রাখা আছে।

ক্লাবের বিশাল কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতর ঢুকলো গেল রুশভিয়ান আর আমির। বাইরে থেকে গেল গার্ড গুলো।
ক্লাবে প্রবেশ করতেই সঙ্গে সঙ্গে কানে এসে আ*ঘা*ত করলো উচ্চস্বরে বাজতে থাকা মিউজিক। চারদিকে ঝলমলে আলো, ধোঁয়াটে পরিবেশ, মানুষের কোলাহল, হাসাহাসি সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা যেন আলাদা একটা জগৎ। ক্লাবের ঝলমলে আলোয় কারো মুখ স্পষ্ট আবার কারো মুখ ঝাপসা হয়ে আছে। কিন্তু রুশভিয়ানের চোখে ঝাপসা যেন কিছুই ছিল না। সে একেকজনকে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই নাম ইনান। সে দ্রুত চারদিকে চোখ বুলিয়ে তিয়াসাকে খুঁজতে লাগলো। তিয়াসা সারাদিন যেখানেই থাকুক না কেন রাতের বেলা তাকে এই ক্লাবে আসতেই হয় । আর প্রতিদিন তার নিত্যনতুন ছে*লে*র প্রয়োজন হয়।
আমির একবার রুশভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ভিআইপি রুম গুলোতে খোঁজ নিতে গেল।
ক্লাবের একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে কিছু বলার আগেই রুশভিয়ান তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল যে লোকটা কথা হারিয়ে ফেলল। কর্মচারী গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে বলল উপরের ভিআইপি লাউঞ্জে তিয়াসা বসে আছে। রুশভিয়ান এক মুহূর্ত দেরি করলো না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তার ভেতরের উ*ত্তে*জ*না যেন আর ও ঘনীভূত হচ্ছিল।

ভিআইপি লাউঞ্জের এককোনে নরম আলোয় বসে আছে তিয়াসা। তার সামনে স্বচ্ছ গ্লাস। হাতে পানীয়, ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি। পরনে খোলামেলা পোশাক। চুল গুলো কাঁধ ছুয়ে নেমে এসেছে। তার পাশের সোফায় বসে আছে একজন তরুন। দুজনেই মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই কর্থাবাতা চলছে। ছেলেটার বয়স তিয়াসার থেকে বেজায় কম।বোঝায় যাচ্ছে আজকে রাতের জন্য এই ছেলেটা তার শি*কা*র। তিয়াসা ছেলেটার দিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই প্রচন্ড শব্দে খুলে গেল দরজাটা। তিয়াসার হাসি থেমে গেল, সামনে তাকিয়ে দেখলো রুশভিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রুশভিয়ান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গ*র্জে নয় বরং ভ*য়ং*ক*র শান্ত গলায় বলল,” ইনান কই?
তিয়াসা হকচকিয়ে গেল । সে এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলো না, সে পরক্ষণেই গম্ভীর স্বরে বলল,” কি বলছো তুমি? তোমার বউ কোথায় আছে আমি জানবো কেমনে?
রুশভিয়ান এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখে তখন কোন নম্রতা ছিল না, ছিল কেবল স*ন্দে*হ আর ক্ষো*ভ। রুশভিয়ান চি*ৎ*কা*র করে বলল,” ভান করবি না তিয়াসা? ইনান হঠাৎ কই গেল? আমার লোকজন অ*জ্ঞা*ন, সিসিটিভির ফুটেজ গায়েব, এগুলো সব আপনআপনি হইছে। এই গুলান তোর কাজ! তুই ডেভিডরে রত্নকুঞ্জে যাইতে বলেছিস?

রুশভিয়ানের কথা শুনে তিয়াসার মুখ চোখ শক্ত হয়ে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে সোজা উঠে রুশভিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে আত্নবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,” আমি জানি না তোমার বউ কই? আমি কোন ইনানকে দেখিনি?
অভিযোগের তীব্রতায় রুশভিয়ানের চোখ দুটো জ্ব*লে উঠছিলো। সে তিয়াসার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অথচ তিয়াসা এক চুল ও নড়লো না। রুশভিয়ানের প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে সে একের পর এক অস্বীকার করতে লাগলো। ইনানকে সে দেখেনি, জানে না, বুঝে না এই ছিলো তার একটাই কথা। কিন্তু সে অসহায় ভান রুশভিয়ানের চোখে আর ধরা দিল না। সে তিয়াসার মুখের ভেতরকার মি*থ্যাটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো। আর সেটা তাকে আরো হিং**স্র করে তুললো। সে গ*র্জে উঠে বলল,” মিথ্যা কইস না তিয়াসা, তুই জানস ইনান কই আছে।
তিয়াসা আগের বারের মতো মুখটাকে শক্ত করে বলল, ” আমি কিছু জানিনা, রুশভিয়ান।
তার এই অস্বীকার রুশভিয়ানের বুকের ভেতর আ*গু*ন , সে আর স*হ্য করতে পারছিলো না। মুহুর্তের মধ্যে সামনে থাকা কাঁচের টেবিলটা উ*ল্টে দিলো। গ্লাস, বোতল,বরফ,চেয়ার সবকিছু ছিঁ*টকে গিয়ে শব্দ তুললো মেঝেতে। ক্লাবের লাউঞ্জে আ*ত*ঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু রুশভিয়ানের চোখে এগুলো পড়লো না, তার মনে শুধু একটাই নাম,একটাই ক্ষো*ভ,সে হলো ইনান।

সে ক্লাবের ভেতর ভা*ঙ*চু*র শুরু করলো। ম*দে*র বোতল একটা একটা করে মেঝেতে আ*ছ*ড়ে ফেলতে লাগলো। কাউন্টারের দিকে এগিয়ে পুরো কাউন্টারে ম*দে*র বোতল গুলো দুইহাত দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। সামনে যা পেল সব ভেঙে গুড়িয়ে আচানাক কাঁচের দেয়ালে ঘু*ষি মা*র*তে মা*র*তে তার হাত কে*টে র*ক্ত বের হতে লাগলো কিন্তু সে থামলো না। বুকের ভেতরের অসহ্য য*ন্ত্র*না যেন হাতের আ*ঘা*তে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসছিলো। এমন সময় আমির এসে রুশভিয়ানের হাত ধরে আটকাতে নিলেই রুশভিয়ান তাকে সর্বশক্তি দিয়ে ধা*ক্কা মে*রে নিচে ফেলে দেয়।ক্লাবের লোকজন পিছনে হটতে লাগলো। কেউ কাছে আসার সাহস পেল না। তিয়াসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সে জানে রুশভিয়ানের রা*গের সামনে দাঁড়ানো মানে নিজের বি*প*দ নিজেই ডেকে আনা। তাই সে কিছু বললো না, না প্রতিবাদ না, করলো প্রতিরোধ। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে রুশভিয়ানের উন্মাদ ভা*ঙ*চু*র দেখছে।

রুশভিয়ান একসময় তিয়াসার সামনে দাঁড়িয়ে এসে বলল,” তুই সব জানোস, তুই জাইন্না বুইঝা আমারে ক*ষ্ট দেওয়ার লেইগা এইগুলা করতেছিস।
তিয়াসা চুপ, তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সে এখনো একটি বারও স্বীকার করলো না, কিন্তু চোখের দৃষ্টি তার বলেই দিচ্ছে সে আসল দো*ষী। সে ছিল ইনানকে রত্নকুঞ্জ থেকে বে*র ক*রে আ*নার মূল হাত। সেই পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড ছিলো তিয়াসা রহমান। ডেভিডের সঙ্গে পরিচয়,ইনানকে স*রি*য়ে দেওয়ার চাল,রত্নকুঞ্জের অস্থিরতা তৈরি করার ষ*ড়*য*ন্ত্র সবকিছুর পিছনে সে আছে। অথচ এখন দেখো কেমন নিজের মুখ বাঁ*চাতে নি*র্ল*জ্জ*ভা*বে সব অস্বীকার করছে।

রুশভিয়ান আবারো ঠান্ডা গলায় বলল,” তুই আছিলি তাই না, তুই ইনানরে রত্নকুঞ্জ থেইকা বা*ইর করার ফ*ন্দি করছোস কিয়তক্ষন থেমে বলল,” এখন বইলা দে আমার ইনান কই তারে কই লু*কা*ইয়া রাখছিস বল?
তিয়াসা তখন একটা ও শব্দ করলো না, তার মুখটা শক্ত, চোখ দুটো রুশভিয়ানের দিকে নিবদ্ধ। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন নিজের মধ্যে সত্যি টাকে গিলে ফেলেছে সে। রুশভিয়ানে প্রশ্ন, তার রা*গ,ভা*ঙ*চু*র,কোনটিই যেন তিয়াসার ঠোঁট খুলতে পারলো না। আলো আঁধারির মাঝে সবাই নির্বাক হয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুশভিয়ানের মেজাজ চর*মে পৌঁছে গেল। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে তিয়াসার সামনে দাঁড়ালো। চোখ তখন র*ক্তি*ম হয়ে আছে রুশভিয়ানের। তার ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকু ভে*ঙে গেল। পর মুহুর্তেই সে তিয়াসার গালে ঠা*স ঠা*স করে থা*প্প*ড় মে*রে দেয়। শব্দটাই এতটাই তী*ব্র ছিলো যে আশেপাশের মানুষ কয়েকজন আ*ত*ঙ্কে চমকে উঠলো। তিয়াসা ট*লে গেল, কিন্তু প*ড়ে গেল না। সে শুধু এক হাত উঁ*চিয়ে গাল চে*পে ধরলো তার।

রুশভিয়ান আর কোন কথা বললো না। তার বুকের ভেতর তান্ডব চলছে সে ঝট করে একটা চেয়ার তুলে ছু*ড়ে মা*র*লো কাঁচের দরজার দিকে। দরজার কাঁচ চূ*র্নবি*চূ*র্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। ক্লাবের ভেতর তখন শোরগোল আ*ত*ঙ্ক আর ভা*ঙ*চু*রের শব্দে এক বিভীষিকা ময় পরিবেশ তৈরি হলো। রুশভিয়ান ধ্বং*সে*র কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। যেন মানুষ নয় সে, একটা ক্ষু*দ্ধ ঝড়। রুশভিয়ান তিয়াসার দিকে শেষবারের মতো এমন ভাবে তাকালো, যেন এই মুখটাই তার সমস্ত সন্দেহের প্রমান। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্লাবের ভাঙা কাঁচ, ছড়িয়ে থাকা বোতল আর আ*ত*ঙ্কিত লোকজনের ভিড় পেরিয়ে বেরিয়ে গেল রুশভিয়ান । রুশভিয়ান কে বেরিয়ে যেতে দেখে তিয়াসার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটলো যা আমিরের চোখ এড়ালো না। আমির তিয়াসার দিকে তাকিয়ে ভিড় ঠেলে চলে গেল।
বাইরে এসে রাতের ঠান্ডা বাতাসে ও রুশভিয়ানের রা*গ কমাতে পারলো না। ববং রা*গ*টা আর ও তীক্ষ্ণ হলো তার। সে একবার চারদিকে তাকালো।

শহরের আলো, গাড়ির শব্দ, মানুষের চলাচল সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে চলছে। অথচ রুশভিয়ানের জীবনের ভেতরটা সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছে ইনান হারিয়ে। রুশভিয়ান শক্ত করে তার মাথার চুল গুলোকে টেনে ধরলো ডেভিড যতই তার বন্ধু হোক তাকে খুঁজে পাওয়া চারটেখানি ব্যাপার না। আর এই সময়টুকুতে যদি ইনানের কোন ক্ষ*তি করে দেয়। কথাগুলো ভাবতেই রুশভিয়ান মনটা অস্থির হয়ে উঠলো মুখের সামনে ইনানের প্রতিচ্ছবি জীবন্ত হয়ে ভাসতে লাগলো। এমন সময় আমির এসে রুশভিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,” ভাই ওই তিয়াসা ভাবিরে লু*কা*ই*য়া রাইখাছে, হেরে তু*ই*ল্লা লইয়া আইসা রত্নকুঞ্জের কুঠিরে রাখলে সব বইলা দিবে? রুশভিয়ান আমিরের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনে অনবরত মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ” না,এখন তিয়াসারে কিছু করতে হইবো না, আবার পুরো ভবিষ্যতে তার হাতে। আমাগো ডেভিডরে খুঁজতে হইবো, যত লোক লাগে লাগাইয়া দে তারে খুঁজতে সেই বলতে পারবো আমার ইনান কই আছে। আমির মাথা নেড়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল আরেকটা গাড়িতে। আর রুশভিয়ান ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।

এর মাঝখানে আরো একটা দিন গড়িয়ে গেল । একটা দিন নয় রুশভিয়ানের কাছে সেটা ছিলো দীর্ঘ, ভারী, অ*স*হ*নী*য় য*ন্ত্র*ণা । সময় যেন থেমে থেমে এগোচ্ছিল। ঘুমের ছোঁয়া তার চোখে লাগেনি টানা দুই রাত। ক্লান্তি ক্ষো*ভ, ভ*য় সবকিছু মিলে তার মুখের চেহারাটাই পাল্টে গিয়েছে। চোখের নিচে কালচে দাগ, ঠোঁটে শুকনো ভাব,চোয়ালে কঠিন জমাট বাঁধা শক্তি। সব মিলিয়ে রুশভিয়ান তখন এমন এক মানুষ, যার শরীর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরের ধৈর্য্য, শান্তি, স্থিরতা অনেক আগে ভে*ঙে গেছে।
ডেভিডের খোঁজে পুরো ঢাকা শহরের প্রায় প্রতিটা কোনা চষে ফেলেছে। বড় বড় ক্লাব, ক্যাসিনো, প*তি**ল*য়, ফাইভ স্টার হোটেল। আমির আলি, হাবিব সবাই ছুটছে। সব জায়গায় লোক গিয়েছে, কিন্তু ফল একটাই। ডেভিড কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবারই খবর এসেছে শূন্য হাতে। প্রতিবারই রুশভিয়ানের বুকের ক্ষ*ত*টা আর ও গভীর হচ্ছে আর প্রতিবারই সে নিজের ভেতরকার ভা*ঙ*ন লুকিয়ে রেখে শুধু একটাই কথা,” খোঁজো, সব জায়গা৷ খোঁজো।

শেষমেষ ডেভিডের খোঁজ মিললো সিলেটের একটা বড় ক্যাসিনো তে। ডেভিড সেখানে লুকিয়ে আছে। এমন খবর আসতেই রুশভিয়ানের বুকের ভেতর আ*গু*ন জ্বলে উঠলো।সে আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না ক্লান্ত শরীর,র*ক্তি*ম চোখ,বিপর্যস্ত মন সব কিছু উপেক্ষা করে সে সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা দিলো। গাড়ির ভেতরে বসে তার চোয়াল আর শক্ত হয়ে ছিলো, মনে হচ্ছিল দাঁত গুলো ভেঙে যাবে। জানালার বাইরের দৃশ্যপট গুলোর দিকে তাকিয়ে সে শুধু ভাবছিলো, ডেভিড যদি সত্যি এই সবের পেছনে থাকে, তাহলে আজ তাকে ছা*ড়বে না।
রুশভিয়ানের গাড়িটা থামলো সিলেটের নামকরা ক্যাসিনো তে। ক্যাসিনোর ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের কৃৃত্রিম জৌ*লু*স আর ম*দে*র ঝাঁঝালো গন্ধ রুশভিয়ানের রা*গ চরমে উঠে গেল। ঝলমলে আলো, চেঁচামেচি, হাসি,নাচ,কার্ডের টেবিল আর ধোয়ার ভিড়ে এমন এক পরিবেশ যেন এখানে মানুষের বিবেক কাজ করে না। রুশভিয়ান চারপাশে অনুসন্ধানি দৃষ্টিতে দেখে আমির কে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।রুশভিয়ানে চোখে কোন বিভ্রান্তি নেই, আছে শুধু খোঁজা। তারা দুজনে শেষমেষ একটা রুমের সামনে এলো। দরজাটা খানিক খোলা। ভেতর থেকে ভেসে আসছে হিন্দি গানের আওয়াজ,হাসির শব্দ, আর ম*দে*র গ্লাসের ঠোকাঠুকির ঝংকার। রুশভিয়ান লুঙ্গিটাকে উঁচিয়ে গিঁট মেরে সামনে একপা এগিয়ে গিয়ে দরজা ঠে*লে দিলো। ভেতরের দৃশ্য দেখে তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য আর ও গাঢ় হয়ে গেল।

ডেভিড একটা শোফায় বসে আছে আধশোয়া হয়ে। পাশে এক মেয়ে খো*লা*মে*লা পোশাক পরে বসে আছে, তাদের চারপাশে আবাধ্য,বিলাসী, অ*শ্লী*ল এক ফু*র্তি*র আবহ।
রুশভিয়ান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সব কিছু থমকে গেল। মেয়েটা চমকে গেল,ডেভিড ও মাথা তুললো। রুশভিয়ানের চেহারা দেখে প্রথমেই তার মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল ডেভিড এর।
রুশভিয়ান ভেতরে ঢুকেই দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করে তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। রুশভিয়ান ডেভিডের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,”ইনান ক*ই ” তখন তার গলায় ভ*য়া*ন*ক শান্তি, আর শান্তির মাঝে লুকিয়ে ছিলো বি*স্ফো*র*ন। ডেভিড কপাল কুচকে একবার রুশভিয়ানের দিকে তাকালো তার কৃত্রিম উদাসীনতা এনে বলল,”কি বলছো, ইনান কে সেটাই জানি না?
রুশভিয়ান এক পা সামনে এগিয়ে এসে শক্ত কন্ঠে বলল,” তুই জানোস ইনান কে, আর ইনান আমার বউ লাগে এটাও জানিস! রুশভিয়ানের গলায় এমন তীক্ষ্ণতা ছিল যা পুরো ঘরকে কাঁ*পিয়ে দেয়। মেয়েটা ভ*য়ে একপাশে সরে বসলো।

আর আমির দরজার মুখে একটা বড় চা*পা*তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পরিস্থিতি বুঝে প্রস্তুত।
ডেভিড কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,” আমি জানি না, কি বলছো এগুলো?
রুশভিয়ানের চোখ দুটো লা*ল হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারলো না। কয়েক কদম গিয়ে ডেভিডের ক*লা*র ধ*রে সোফায় থেকে টেনে তুলে স্ফু*লি*ঙ্গে*র ন্যায় বলল,” মিথ্যা কইস না ডেভিড,বল আমারে ইনানকে কই রে*খেছিস।
ডেভিড এবার মুখে জোর করে হাসি রাখার চেষ্টা করলো। কিন্তু রুশভিয়ানের হাতের চাপ টের পেয়ে তার ভেতরকার অস্বস্তি টা বেড়ে গিয়ে বলল,” পা*গ*ল হয়ে গেছো রুশভিয়ান, আমি কিছু জানিনা!
রুশভিয়ান ডেভিডকে দেয়ালের সাথে তুলে আছার মা**র*লো। দেয়ালের সাথে ডেভিডের কপাল লেগে কে*টে গিয়ে র*ক্ত বের হতে লাগলো। রুশভিয়ান গর্জে উঠে বলল,” তুই জানোস, তুই আমার ইনান কে ল*ই*য়া গেছিস রত্নকুঞ্জ থেইকা!

ডেভিড মুখ শক্ত করে থাকলো, এখন কিছু বলা মানে স্বয়ং মৃ**ত্যু তাই শেষ পর্যন্ত ভান ধরে রেখে বলল, ” তুমি আমাকে খামখা সন্দেহ করছো রুশভিয়ান ,আমি তোমার রত্নকুঞ্জে যায়নি?
ডেভিডের এই কথাটা শুনে রুশভিয়ানের মাথায় আ*গু*ন জ্ব*লে উঠলো। মনের মধ্যে ভেসে উঠলো ইনানের মুখ,রত্নকুঞ্জের ফাঁকা ঘর। সে তে*ড়ে*ফুঁ*ড়ে গিয়ে ডেভিডের কলার আরো শ*ক্ত করে চে*পে ধরে দাঁতে দাঁত চে*পে বলল,” আমি ভুল লোকের কাছে আসিনাই, তুই গিয়েছিলি রত্নকুঞ্জে। তুই সব জানোস,
ডেভিড প্রথমে মুখ বন্ধ করে থাকলে ও রুশভিয়ানের চোখে উ*ন্মা*দ আ*গু*নে*র কাছে নিজেকে আর আড়াল করতে পারলো না। এক পর্যায়ে চাপ,ভ*য় আহত অ*হং*কা*রে*র সে ফে*টে পড়ে বলল, ” হ্যাঁ আমি গিয়েছিলাম তোর বউকে ধ*রে আ*ন*তে, কিন্তু তার আগেই তোর বউ পা*লি*য়ে গিয়েছে? ডেভিড আবারো হতবাক গলায় বলল,” আমি মিথ্যা বলছি না, ওকে ধ*রা*র চে*ষ্টা করছিলাম, কিন্তু কিছু বুঝে উঠার আগেই …..

আর কিছু বলার সুযোগ পেল না ডেভিড, রুশভিয়ান এত জোরে ঘু*ষি মা*র*লো যে ডেভিডের মুখটা একপাশে ঘুরে গেল। তারপর আরেকটা,আরেকটা,, একটার পর একটা আ*ঘা*তে রুমের ভেতরের বাতাস যেন কেঁপে উঠলো। ডেভিড মাটিতে প*ড়ে গেল, কিন্তু রুশভিয়ান থামলো না। তার ভেতরে সমস্ত জমে থাকা ক*ষ্ট, রাতজাগা ক্লান্তি, ইনান কে হা*রা*নো*র ভ*য়,একটার পর একটা আ*ঘা*তে বেরিয়ে এলো, রুশভিয়ান মা*র*তে মা*র*তে বলল,” তুই আমার ইনানরে ল*ই*য়া আইছোস, তুই সব জাইন্না না জানার ভান করোছোস,বল তুই ওরে পা*চা*র কইরা দিসনি তো, বল আমারে! প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে রুশভিয়ান ডেভিডকে আ*ঘা*ত করতে লাগলো। আর ডেভিড মেঝেতে কা*ত*রা*তে লাগলো, মুখে র*ক্ত, চোখে ভী*তি। কিন্তু রুশভিয়ানের হাত তখন নিয়ন্ত্রণে নেয়। সে যেন থামতে পারছে না।

আমির শেষমেশ দৌড়ে এসে রুশভিয়ানের হাত শ*ক্ত করে আকড়ে ধরে বলল,” ভাই থামেন? কিন্তু রুশভিয়ান তখন ছুটতে চাইছে,আবার সে ডেভিডের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। মুখে নিঃশ্বাসের তীব্রতা রেখে রুশভিয়ান বলল,” ছাড় আমির! আজকে এই বা*ন্দার কাহিনী শে*ষ ক*রমু?
আমির শক্ত করে পিছনে টানতে টানতে বলল,” ভাই, আর না। এহনই ম*ই*রা যাইবো, দরকার হলে পরে মা*ই*রে*ন? রুশভিয়ান কয়েক সেকেন্ড আমির মুখের দিকে তাকিয়ে পিছু হটলো। কিন্তু তার চোখ তখনও ডেভিডের দিকে স্থির হয়ে আছে, সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো দ্বারা হয়তো বোঝাতে চায়ছে সে একটু ছাড় দেয়নি ডেভিড কে।

ডেভিড মেঝেতে প*ড়ে আছে অ*র্ধ*মৃ*ত, র*ক্তা*ক্ত,,কা*ত*র। তার মুখ থেঁ*ত*লে গেছে, গায়ে জোর নেই তার। সে কাশতে কাশতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আমির রুশভিয়ান কে জো*র করে বাইরে টেনে নিয়ে গেল।
রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর ও রুশভিয়ানের আমির কাছ থেকে নিজেকে ছা*ড়িয়ে নেয়। ডেভিডের মুখে পাওয়া অর্ধসত্য আর ভাঙা স্বীকারোক্তি তার ভেতরে নতুন স*ন্দে*হের বি*ষ ঢেলে দিলো, মনে হতে লাগলো ইনান কি তার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পা*লি*য়ে গিয়েছে। রুশভিয়ান কথাটুকু ভাবতে গিয়ে তার ভেতরটা ফে*টে যাচ্ছে । চৌত্রিশ বছরের জীবনে কাউকে ভালোবেসে জো*র করে আটকে রাখলে সে কি এমন করেই রেখে চলে যায়। নিজের প্রশ্নের নিজের কাছে মিললো না তার। সে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না । গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমিরের উদ্দেশ্য বলল,” ডেভিডরে রত্নকুঞ্জের কুঠুরীতে ব*ন্দি কইরা রাখ,এইডা বাইরে থাকলে আবার পা*লা*ই*তে চাইবো। আমির মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালো। রুশভিয়ান গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।

দুজন গার্ড এগিয়ে গিয়ে মাটিতে আ*ধ*ম*রা পড়ে থাকা ডেভিড কে টেনে তুললো। ডেভিডের শরীর তখন ভে*ঙে পড়া, চোখে আ*ত*ঙ্ক । সে কোন প্রতি*রোধ করার শক্তি পাচ্ছিল না। শুধু হাঁ*স*ফাঁ*স করছিলো। ডেভিড কে টে*নে*হিঁ*চ*ড়ে গাড়িতে তুলে রত্নকুঞ্জের দিকে রওনা হলো গার্ড গুলো। আর আমির আরেকটা গাড়ি করে রুশভিয়ানের পিছু নিলো সে।

হাইওয়ে রাস্তা তখন অস্বাভাবিক ভাবে ফাঁকা। চারপাশে কোন গাড়ি নেই, কোন মানুষের শব্দ নেই। শুধু দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা রাস্তার বাতি গুলো নিস্তেজ ভাবে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে । রুশভিয়ানের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে বসে আছে। চোখ সামনের রাস্তায়, কিন্তু মাথার ভেতর একটাই ভাবনা ইনান। গাড়িটা নির্জন বাঁক পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন হঠাৎ রুশভিয়ানের চোখ পড়লো দূরে থেকে আসা একটা ট্রাক।, বিপরীত দিক দিয়ে আসছে, তার গতি অ*স্বাভাবিক । ট্রাকটার উপস্থিত যেন কিছু একটা ভু*লের ইঙ্গিত দিচ্ছিলো। রুশভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে গেল। সে গাড়ি সা*ই*ডে নিতে হাত বাড়াল,কিন্তু তার আগেই …. সবকিছু ঘ*টে গেল এ*ক নিঃশ্বাসের মধ্যে।
ট্রাকটা হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে রুশভিয়ানের গা*ড়ি*র দিকে ঝাঁ*পি*য়ে পড়লো। তীব্র শ*ব্দ, টায়ারের ঘ*র্ষ*ন, স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সামলানোর ব্য*র্থ চেষ্টা করলো রুশভিয়ান।সব মিলিয়ে মুহুর্তটা ভ*য়া*ন*ক হয়ে উঠলো। রুশভিয়ান চোখ বড় করে ট্রাকটার দিকে তাকালো । কিন্তু পরমুহূর্তেই গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হা*রি*য়ে ফেলল। ধা*ক্কা*র তীব্রতায় রুশভিয়ানের গাড়িটা রাস্তার রেলিঙ ভে*ঙে খা*দে গিয়ে পড়লো। একটা বি*ক*ট শব্দ, ধুলা,আর ধা*ত*ব চি*ৎ*কা*র, নেমে এলো ভ*য়া*ন*ক নিস্তব্ধ অন্ধকার।

হাইওয়ে তখন ও ফাঁকা।ট্রাকটা ধীরে ধীরে কিছুটা দূরে গিয়ে থামলো। ভেতর থেমে নেমে এলো একজন মু*খো*শধারী লোক।সে চারপাশে একবার তাকিয়ে নিলো,সে নিশ্চিত হতে চাইছে আশেপাশে কেউ নাই তো। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে খুব শান্ত গলায় বলল,” কাজ হয়ে গেছে ”
ফোনের ওপাশ থেকে কি উত্তর এলো শোনা গেল না। কিন্তু লোকটার শরীরের ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল, সে নিজের দায়িত্ব খুব যথাযথ ভাবে পালন করেছে।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২১

অন্ধকার হাইওয়ে একপাশে তখন রুশভিয়ানের গাড়ি পড়ে আছে খাদে। কাঁচ ভাঙা,ধোঁ*য়া উঠছে, আর সে গাড়ির মধ্যে রুশভিয়ান আদো বেঁচে আছে কি না তা অজানা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে রাতের বুকে একটা নতুন বি*প*দ নেমে এলো। আর সে বি*প*দে*র আসল নাম হলো রুশভিয়ান। যাকে থামাতে, বিচ্যুত করতে সুন্দর একটা ফাঁদ পাতা হয়েছিলো।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here