ঠিক তখনই দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো ইনায়া। ও নিজের কোটটা হাতে নিয়ে নিচে নামতেই ডাইনিং হলের মাঝখানে এক সুদর্শন পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক হলো।
ইনায়া সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই আদিল মির্জা নিজের বড় ভাতিজির দিকে তাকিয়ে আনন্দঘন গলায় বললেন, “মা ইনায়া, দেখো কে এসেছে! আমাদের ইয়াশ দেশে ফিরেছে।”
বড় চাচুর কথা শুনতেই ইনায়ার চোখ দুটো এক মুহূর্তে বিস্ময়ে চড়কগাছে উঠল। ও নিজের হাত থেকে কোটটা সোফার ওপর রেখে পুরো দুই মিনিট অপলক চোখে চেয়ে রইল ইয়াশের দিকে। এতগুলো বছর পর ভাই অবশেষে দেশে ফিরেছে, ভাবতেই ও কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ইয়াশকে দেখতে এখন সত্যিই মারাত্মক সুন্দর আর আকর্ষণীয় লাগছিল। সুঠাম ও চওড়া দেহের অধিকারী, ধবধবে সাদা ফর্সা গায়ের রঙের সাথে ব্যাকব্রাশ করা কুচকুচে কালো চুল, আর চোখের সেই গভীর বাদামী মণি দুটো তাকে সাধারণ পুরুষদের চেয়ে একদম আলাদা করে তুলেছিল। ইনায়া এক বুক আবেগ চেপে হালকা একটু হেসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো ইয়াশ? কত বছর পর দেখা আমাদের”
ইয়াশ নিজের সেই পাথরের মতো গম্ভীর মুখটাতে কোনো আলগা আবেগের ছোঁয়া না এনে নিজের ভারী গলায় সংক্ষেপে উত্তর দিল, “হুম, ভালো আছি।”
ইনায়া সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। এরপর ও নিজের পাশে হা করে মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ারার দিকে তাকাল। কাল রাতের সেই “কিডনি চোর” আর “সাইকো ছিনতাইকারী” যে আসলে ওর চাচাতো ভাইয়া, এই সত্যটা হজম করতে না পেরে কিয়ারা তখনো চোখ বড় বড় করে ইয়াশের দিকে চেয়ে ছিল। ইনায়া কিয়ারার পিঠে আলতো একটা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কীরে? এভাবে হা করে মূর্তির মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর ইয়াশ ভাইয়ার সাথে কথা বল? ছোটবেলায় তো সারাদিন শুধু ‘ইয়াত ভাইয়া… ইয়াত ভাইয়া…’করে ওর কোল থেকে নামতেই চাইতি না!”
ইনায়ার এই এক লাইনের কথা যেন কিয়ারার মাথায় মস্ত বড় এক বজ্রপাত ঘটাল। সে যেন পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই লোকটা আসলে ওর চাচার ছেলে? কিয়ারার ছোটবেলার অন্যান্য সব স্মৃতি পনেরো বছরের ধুলোবালিতে ধুয়ে মুছে ঝাপসা হয়ে গেলেও, ওর মনের নিভৃত কোণে যে একটা খুব আদরের ভাইয়া ছিল, তা খুব ভালো করেই মনে ছিল। আর কাল রাতের সেই চুমু খাওয়া, শাড়ি পরিয়ে দেওয়া গম্ভীর মানুষটাই কি তাহলে ওর সেই হারিয়ে যাওয়া ভাইয়া? কিয়ারা কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে একদম চুপ করে রইল।
ইনায়া বোনের এমন ছন্নছাড়া ভাব দেখে আবার একটু তাগাদা দিল, “কীরে বুনু? কী হলো তোর? কথা বল ভাইয়ার সাথে?”
কিয়ারা তখন এতটাই অপ্রস্তুত, নার্ভাস আর বিষম খাওয়ার ঘোরে ছিল যে নিজের মগজের সব কটা তার যেন এক সেকেন্ডে ওলটপালট হয়ে গেল। ও থতমত খেয়ে, ইয়াশের দিকে তাকিয়ে উল্টো-পাল্টা শব্দ মিলিয়ে বলে উঠল,
“ভালো আছি মামুন আছো…!”
ব্যাস, কিয়ারার মুখ থেকে এমন অদ্ভুত ও অর্থহীন উল্টো-পাল্টা খিচুড়ি কথা বের হওয়া মাত্রই খাবার টেবিলের চারপাশটা এক মুহূর্তে পিনপতন নীরবতায় ডুবে গেল। আদিল মির্জা, আবির মির্জা থেকে শুরু করে ইনায়া সবাই নিজের হাতের চামচ আর চায়ের কাপ থামিয়ে একযোগে কিয়ারার দিকে হাঁ হয়ে তাকাল। এই মেয়ে সকাল সকাল নাস্তা খেতে এসে এসব কী আবোল-তাবোল বকছে?
ইনায়া নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে কপালে হাত দিয়ে বলল, “অ্যাঁ? কী বললি তুই?”
কিয়ারা নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে গেল। ও চট করে নিজের চিবুক নামিয়ে ওড়নাটা টেনে মাথা চুলকাতে চুলকাতে কোনোমতে শুধরে নিয়ে বলল, “আই অ্যাম সরি… মানে, কেমন আছেন?”
কিয়ারার বোকা বোকা কাণ্ড, লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর তোতলামি দেখে ইয়াশের ভেতরের সব রাগ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ওর মনে হাসির ঢেউ আছড়ে পড়ল, যদিও নিজের পাথরের মতো শক্ত গম্ভীর মুখে ও তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ পেতে দিল না। ও কিয়ারার চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি ছুড়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমি রুমে যাচ্ছি। দুই মিনিটের মধ্যে আমার রুমে একটু কফি পাঠিয়ে দাও।”
কথাটা বলেই ও আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে সবার মনোযোগ নষ্ট করল না। লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আর ডাইনিং টেবিলের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে কিয়ারা নিজের ফোন আর কফির কাপের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল আজ থেকে উনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরু, কিন্তু তার আগেই ঘরের ভেতর এই কোন ভয়ংকর ঝড় এসে হাজির হলো!
ইয়াশ ওপরে চলে যেতেই খাবার টেবিলে এক ভারী নীরবতা নেমে এলো। আদিল মির্জা নিজের চায়ের কাপটা পিরিচের ওপর রেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আবির মির্জার দিকে তাকিয়ে কিছুটা আফসোসের সুরে বললেন, “ভেবেছিলাম হয়তো বড় হলে একটু হাসিখুশি, প্রাণবন্ত হবে। কিন্তু তা আর হলো না। পনেরো বছর আগে যেমন খিটখিটে আর গম্ভীর ছিল, তেমনই রয়ে গেল। আমি আসলে ওকে একটু ছটফটে আর হাসি-খুশি দেখতে চেয়েছিলাম। ও বড্ড অগোছালো”
আবির মির্জা ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মৃদু হাসলেন। তিনি বললেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে আস্তে আস্তে, বড় ভাই। ও তো মাত্রই দেশে ফিরল। পরিবেশটার সাথে খাপ খাওয়াতে একটু সময় তো লাগবেই। তাছাড়া ও এখন সাতাশ বছরের যুবক, এবার ওর একটা গতি করো। ওকে ভালো একটা দেখে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। ঘরে একটা বউ আসলে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে, নিজের দায়িত্ব বুঝে ও শান্ত হয়ে যাবে। তবে তার আগে আমাদের কিয়ারার বিয়েটা ধুমধাম করে হয়ে যাক।”
কিয়ারার বিয়ে শব্দ দুটো কান দিয়ে মগজে পৌঁছানো মাত্রই কিয়ারা জলের গ্লাসটা ঠাস করে টেবিলের ওপর নামিয়ে আবার মারাত্মকভাবে কাশতে শুরু করল,
কাল রাতে বিয়ে, আর এই লোকটার সাথে নিজের নাম জড়িয়ে যাওয়ার ভীতি ওকে যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল।
আদিল মির্জা কিয়ারার কাশির তোড় দেখে হালকা হাসলেন। ওনার চতুর মনে তখন অন্য এক খেলা চলছিল। তিনি কিয়ারার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আদুরে গলায় বললেন, ” কিয়ারা, তুমি ইয়াশের জন্য একটু কফি বানাও তো সোনা? তুমি তো খুব ভালো কফি বানাতে পারো।”
আবির মির্জাও মেয়ের দিকে তাকিয়ে সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ মা, যাও। জলদি বানিয়ে দিয়ে এসো ভাইয়াকে।”
ঠিক তখনই ইনায়া নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সোফা থেকে নিজের কোটটা তুলে নিল। জ্যাকেটটা গায়ে গলাতে গলাতে বলল, “টাইম হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা তাহলে আমি এখন আসি, টাটা!”
আবির মির্জা মেয়ের ব্যস্ততা দেখে একটু ধমকের সুরে বললেন, “আরে, নাস্তাটা অন্তত শেষ করে যাও!”
ইনায়া দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “এখন একদম টাইম নেই পাপা, পরে চেম্বারে গিয়ে কিছু একটা খেয়ে নেবো।”
কথাটা বলেই ও নিজের পার্সটা নিয়ে হনহন করে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কিয়ারা আর কোনো বাহানা খুঁজে না পেয়ে অগত্যা কিচেনের দিকে পা বাড়াল কফি বিনস, দুধ আর চিনি মিশিয়ে ও এক মগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি তৈরি করল। মগটা ট্রে-তে নিয়ে ও ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার সেই করিডোরটার দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে ইয়াশের শোবার ঘর।
এই বাড়ির এই দিকটায় কিয়ারার শেষ কবে আসা হয়েছিল, তা ও নিজেও মনে করতে পারল না। ইয়াশ চলে যাওয়ার পর ওনার রুমটা সবসময় লক করাই থাকত। ইয়াশের ঘরের দরজার লকটা খোলাই ছিল, কিয়ারা আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢোকা মাত্রই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ওর হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।
এমনিতেই মেঘলা আবহাওয়ার কারণে পুরো মির্জা বাড়িটা আজ একটু ঠান্ডা, তার ওপর এই লোকটা নিজের ঘরের এসি একদম ১৬ ডিগ্রিতে চালিয়ে রেখেছে! কিয়ারা নিজের হাত দুটো কুঁকড়ে মনে মনে ভাবল, “আল্লাহ রে! এত ঠাণ্ডার মধ্যে কোনো সুস্থ মানুষ থাকে? তার ওপর কাল রাতে নিজে ভিজল, সারা গায়ে কাল অত জ্বর দেখলাম, আর এখন এই বরফ ঘরের ভেতর বসে আছে? আস্ত একটা মগা শালা”
কিয়ারা ট্রের ওপর কফির মগটা শক্ত করে ধরে পুরো ঘরটায় চোখ বুলাল। চারপাশটা বড্ড নিস্তব্ধ, ঘরের খাটের ওপর ইয়াশের স্যুট আর শার্টটা একপাশে ডাঁই করে রাখা। পুরো ঘরে কোথাও ইয়াশের দেখা মিলল না। ঠিক তখনই ভেতরের এটাচড ওয়াশরুমের ওপাশ থেকে ঝরঝর করে শাওয়ারের পানির পড়ার স্পষ্ট শব্দ কিয়ারার কানে এলো। লোকটা ওয়াশরুমে গোসল করছে। কিয়ারা এক বুক স্বস্তির শ্বাস ফেলে ভাবল, কফির মগটা টেবিলের ওপর রেখেই ও চোরের মতো চটপট এখান থেকে কেটে পড়বে।
ওয়াশরুমে পানির শব্দ তখনো চলছে। ও আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ানো নিরাপদ মনে করল না। যেই না ও চোরের মতো পা টিপে টিপে রুম থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে এক জোড়া শক্তিশালী হাত এসে এক ঝটকায় ওকে নিজের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে জড়িয়ে নিল।
কিয়ারা আতঙ্কে একদম চুপ মেরে গেল। ও পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল, ওয়াশরুম থেকে গোসল শেষ করে সদ্যই বের হয়েছে ইয়াশ। ওর চুলগুলো তখনো আধাভেজা, পরনে কেবল একটা কালচে ট্রাউজার, আর উন্মুক্ত সুঠাম বুকের ওপর পানির কণাগুলো চকচক করছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ওর বাদামী চোখ দুটো রাগে একদম টকটকে লাল হয়ে আছে। কিয়ারা হুট করে এই অবস্থায় ওকে দেখে নিজের মুখের সব ভাষা হারিয়ে ফেলল।
ইয়াশ এক হাত দিয়ে কিয়ারার নরম গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমাকে একলা ফেলে রেখে পালিয়ে এসেছিস তুই বেয়াদব”
কিয়ারা নিজের গালটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ওর মুখ কুঁচকে বলল, “তা তো কী করতাম ? আপনার মতো ওই মোটকা হাতিরে কোলে করে নিয়ে আসতাম নাকি? নিজে তো মরার মতো হা করে ঘুমাচ্ছিলেন!”
নিজের বাটারফ্লাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে ইয়াশ চোখ গরম করে ধমকে উঠল, “শাট আপ, স্টুপিড!”
কিয়ারা ওর গায়ের ঠান্ডা পানির ছোঁয়া পেয়ে আরও বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে ছাড়ুন আমাকে!”
ইয়াশ ওর কোনো কথাই শুনল না। ও নিজের এক হাত দিয়ে কিয়ারাকে শক্ত করে ধরে রেখে অন্য হাতে এক টানে রুমের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ড্রয়ারটার দিকে। ড্রয়ারের একদম নিচ থেকে ও Handcuff বের করে আনল। কিয়ারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক পলকে ওটার একপাশ কিয়ারার কব্জিতে আর অন্যপাশ নিজের হাতের সাথে খটাস করে লক করে দিল।কিয়ারা নিজের হাতটা আটকা পড়তে দেখে ছটফট করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল, “কী আজব! এসব কী নোংরা জিনিস পড়াচ্ছেন কেন আমাকে? হাত ছাড়ুন!”
ইয়াশ নিজের ঠোঁটের কোণে এক চরম শয়তানি আর পিশাচের মতো তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও কোনো উত্তর না দিয়ে কিয়ারাকে এক আলতো ধাক্কায় বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। কিয়ারা বিছানায় পড়ে গিয়েই নিজের পা দুটো ছুড়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল, “একদম লাথি মেরে দেবো কিন্তু বলে রাখলাম! ছাড় আমাকে, শালার লুচ্চা কোথাকার!”
‘লুচ্চা’ গালিটা শুনে ইয়াশের জেদ যেন আরও চড়ে গেল। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও বিছানায় কিয়ারার ওপর সামান্য ঝুঁকে, এক ঝটকায় কিয়ারার টি-শার্টের নিচের অংশটুকু ওপরে তুলে দিল। কিয়ারার উন্মুক্ত নরম পেটের ওপর নিজের মুখটা শক্ত করে গুঁজে দিয়ে এক এক করে ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে লাগল।
নিজের পেটের ওপর এমন স্পর্শ পেয়ে কিয়ারার পুরো শরীর অপমানে আর এক অজানা অনুভূতিতে শিউরে উঠল। ও নিজের হাতকড়া পরা হাতটা নাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে জোরে চিৎকার করে বলল, “আপনি… আপনি আমার বড় ভাই হন! ছিঃ!”
‘ভাই’ শব্দটা শোনা মাত্রই ইয়াশের মাথাটা পুরো বিগড়ে গেল। ও নিজের দাঁত দিয়ে কিয়ারার পেটের নরম চামড়াতে সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল!
“আহহহ!” কিয়ারা ব্যথার চোটে এক তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠল। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
ইয়াশ কিয়ারার পেটের সেই কামড়ের দাগটার ওপর নিজের আঙুলটা আলতো করে বুলিয়ে দিয়ে বরফশীতল, ভারী গলায় বলল, “আর কোনোদিন নিজের মুখে ওই ফালতু শব্দটা উচ্চারণ করবি না মুরগির বাচ্চা । তুই কাল রাত থেকে আমার বিয়ে করা বউ, মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে রাখ”
কথাটা বলেই ইয়াশ হাতকড়ার চাবি দিয়ে লকটা খুলে কিয়ারাকে ছেড়ে দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। আলমারির দিকে গিয়ে ভেতর থেকে একটা পুরনো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি বের করে নিয়ে এলো। ও ছবিটা এনে কিয়ারার চোখের সামনে ধরল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিয়ারার কান্নার বেগ এক পলকে থমকে গেল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে বারো বছরের এক ধবধবে ফর্সা, গম্ভীর কিশোর নিজের কোলে চার বছরের এক গোলুমুলু পুচকে মেয়েকে আগলে ধরে আছে। আর সেই পুচকে মেয়েটা এক গাল নিষ্পাপ হাসি নিয়ে সেই কিশোরের মুখের দিকে চেয়ে আছে।
ইয়াশ ছবির ওপর নিজের আঙুল বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুই আর আমি। চিনতে পারছিস এবার?”
কিয়ারা নিজের বড় বড় কুচকুচে কালো চোখ জোড়া মেলে সেই পুরনো ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। আবছা আলো, গালের সেই ছোট কাটার দাগ আর এই চেনা ছবি সব কিছু মিলে ওর মস্তিষ্কের ঝাপসা স্মৃতির ধুলোবালি এক নিমেষে পরিষ্কার হয়ে গেল। ওর আবছাভাবে মনে পড়ে গেল সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা। ও ইয়াশের চোখের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট, ভাঙা গলায় বলল, ” আপনিই তাহলে আমার ইয়াশ ভাইয়া?”
ইয়াশ নিজের শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে এক গাল বাঁকা হেসে বলল, “হুম বউ, আর আমি তোমাকে ছোটবেলায় ডায়পার ও চেঞ্জ করিয়ে দিয়েছি, এখন তার বদলে আমাকে একটা চুমু দাও”
ইয়াশের মুখে এমন লজ্জাজনক কথা শুনে কিয়ারা এক মুহূর্তে পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ও নিজের জীবনের সব রাগ আর অপমান এক করে মনে মনে ভাবল এই লোককে আল্লাহ কি দিয়ে তৈরি করেছে ছিঃ! ও নিজের টি-শার্টটা টেনে নিচে নামাতে নামাতে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“আপনার মুখে বড় বোমা পড়ুক, বেয়াদব লোক কোথাকার!”
ইয়াশ নিজের ফর্সা কব্জির পুরনো রুপোর ব্রেসলেটটা নাড়াচাড়া করতে করতে আবার কিয়ারার দিকে এক পা এগিয়ে এলো। ওর বাদামী চোখে তখন এক পিশাচের মতো চাদর জড়ানো শয়তানি চাউনি।
ও কিয়ারাকে আবার ক্ষেপানোর জন্য কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ” টি-শার্ট টা কি আর একটু ওপরে তুলবো? পেটে চুমু খাওয়া শেষ, এবার উপরে ট্রাই করি?”
